রাজধানীর শাহবাগে ফের তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়েছে। শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত জাতিসংঘের অধীনে করার দাবিতে এবং ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে আন্দোলনরতদের ওপর হামলার প্রতিবাদে চলা বিক্ষোভকে ঘিরে সেখানে উত্তেজনা বিরাজ করছে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল ছুড়েছে পুলিশ।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাত পৌনে ৮টা নাগাদ এই ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হাদি হত্যার তদন্ত জাতিসংঘের তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তরের দাবিতে এবং আন্দোলনরতদের ওপর হামলার প্রতিবাদে শাহবাগে বিক্ষোভ চলছিল। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ শাহবাগ থেকে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার দিকে যেতে চাইলে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। পুলিশের ধাওয়ায় আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে কাঁটাবন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দিকে চলে যায়। পুলিশ অবস্থান নেয় শাহবাগ থানার সামনে।
বর্তমানে শাহবাগ ও এর আশপাশের এলাকায় উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজমান রয়েছে।
এর আগে বিকেলে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে ইনকিলাব মঞ্চের আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। এতে সরকারি ভাষ্যে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবেরসহ অনেকে আহত হন।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় থেকে আন্দোলনকারীরা যমুনা অভিমুখে যাওয়ার সময় পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে এগোতে চাইলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। একপর্যায়ে গোটা এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, যমুনা ও এর আশপাশের এলাকায় বিক্ষোভ নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রথমে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বলপ্রয়োগ করেনি।
শুক্রবার বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে যমুনার অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে এবং একপর্যায়ে জলকামানের ওপর উঠে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে। সরকার স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে যে, এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো ধরনের গুলি ছোড়েনি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
‘প্রশাসন বা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের কাছে যে কেউ চাইলেই যে কারও বিরুদ্ধে মামলা করে কী করে? কীভাবে প্রশাসন টিস্যুর মতো ব্যবহৃত হতে পারে? মামলা করতে চাইলেই কি মামলা করা যাবে? এখানে কি কোনো ভেরিফিকেশন সিস্টেম নেই?’ এই প্রশ্নগুলো করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে এক আলোচনায় অংশ নিয়ে শিশির মনির এ কথাগুলো বলেন। ভুক্তভোগী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৬১টি ভুয়া মামলা দায়েরের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। শিশির মনির জানান, ওই ভুক্তভোগী পেশায় একজন সাধারণ লবণ ব্যবসায়ী। তাঁর বিরুদ্ধে একে একে মোট ৬১টি মামলা করা হয়। সব কটি মামলাতেই ‘মানব পাচারের’ অভিযোগ আনা হয়। এই আইনজীবীর সহায়তায় সম্প্রতি ওই ব্যক্তি সব মামলা থেকে জামিন পেয়েছেন। শিশির মনির বলেন, আইনি হেফাজতে নির্যাতনের ঘটনা বিচারব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতারই প্রতিফলন। সতর্ক করে তিনি বলেন, বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পর্যাপ্ত বিচারক নিয়োগ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে এই পুরো ব্যবস্থাটি একটি ‘নির্যাতনের যন্ত্র’ (টর্চার মেকানিজম) হয়েই থাকবে। এমন ব্যবস্থা গড়তে হবে, যেখানে দ্রুততম সময়ে মানুষের বিচার পাওয়া বা না পাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। আইনি হেফাজতে মৃত্যু ৪৮৬ আলোচনাসভায় ‘নির্যাতন প্রতিরোধ, প্রতিকার, ভিকটিমদের ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচার: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও করণীয়’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধিকারের পরিচালক (প্রোগ্রাম) মো. সাজ্জাদ হোসেন। প্রতিবেদনে ২০০১ থেকে ২০২৬ সালের ২২ জুন পর্যন্ত আইনি হেফাজতে মৃত্যুর তথ্য তুলে ধরা হয়। অধিকার জানায়, এই দীর্ঘ সময়ে দেশে সরকার পরিবর্তন হলেও হেফাজতে মৃত্যু থামেনি। গত ২৫ বছরে হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হয়ে ৪৮৬ জন মারা গেছেন। প্রবন্ধের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি আমলে ১৮৪ জন আইনি হেফাজতে মারা গেছেন, যা মোট মৃত্যুর ৩৮ শতাংশ। আর বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মারা গেছেন ২১৩ জন বা ৪৪ শতাংশ। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মৃত্যু হয়েছে ২৯ জনের (৬ শতাংশ)। এ ছাড়া বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত আইনি হেফাজতে দুজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। অধিকার আরও জানায়, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ৪৮টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন। সংস্থাটির মতে, শাসনামল বদলালেও আইনের কাঠামোগত ত্রুটির কারণে মানবাধিকার সংকট কাটছে না। নির্যাতন প্রতিরোধে সুপারিশ নির্যাতন প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য ‘অধিকার’ ১০টি সুপারিশ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্যাতনবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, স্বাধীন তদন্ত সংস্থা ও মনিটরিং সেল গঠন এবং একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা। এ ছাড়া গুম ও নির্যাতন রোধে বিশেষ আইনি সংস্কার, ‘শূন্য সহনশীলতা নীতি’ বাস্তবায়ন, ভুক্তভোগীদের জন্য ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানায় সংস্থাটি। অনুষ্ঠানে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব এবং ‘ডেইলি ওয়াদা’র এডিটর ইন চিফ শফিকুল আলম বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছাড়াও বড় বড় মামলায় নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়। এতে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিটি আদৌ প্রকৃত অপরাধী কি না, তা নিয়ে জনমনে সংশয় থেকে যায়। তিনি বলেন, শুধু আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করলেই হবে না; বরং পুরো নিরাপত্তা বাহিনী, তদন্তব্যবস্থা ও প্রসিকিউশন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। বিচারব্যবস্থাকে গণমুখী করতে সংস্কারের বিকল্প নেই। এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার পেছনে যারা যুক্ত ছিল, তাদের অপরাধের বিচার না হলে দেশ এগোবে না। পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর মানুষের বিরুদ্ধে যাওয়ার প্রবণতা ফ্যাসিবাদের সময়ে গড়ে উঠেছিল। রাষ্ট্রযন্ত্র যেভাবে দানব হয়ে উঠেছিল, সংস্কার ছাড়া তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা বলেন, বিগত সরকারের সময়ে গুম, খুন ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনা হবে। তিনি ন্যায়বিচারের স্বার্থে সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শরীফুল ইসলাম সতর্ক করে বলেন, জুলাই সনদের সঙ্গে প্রতারণা করা হলে পুরোনো নির্যাতনের সংস্কৃতিই ফিরে আসবে। জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ফয়েজুল হাকিম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংস্কারের যেসব উদ্যোগ ছিল, নতুন সরকার সংসদকে সব ক্ষমতার উৎস ভেবে সেগুলো বাদ দিয়েছে। তিনি আইনি হেফাজতে মৃত ব্যক্তিদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান। অধিকারের পরিচালক তাসকিন ফাহমিনার সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন দ্য ডেইলি স্টারের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাইমা ইসলাম, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মিরপুরে নির্যাতনে নিহত ইশতিয়াক হোসেন জনির ভাই ইমতিয়াজ হোসেন, জুলাই আন্দোলনের ভুক্তভোগী মুহাইমিন পুলক এবং শহীদ শেখ শাহরিয়ারের মা মমতাজ বেগম। বক্তারা দলমত–নির্বিশেষে সবার জন্য মানবাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
রাজধানীর সঙ্গে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সড়ক যোগাযাগ ব্যবস্থায় সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেওয়া পদ্মা সেতুর চার বছর পূর্ণ হলো আজ বৃহস্পতিবার। ২০২২ সালের ২৬ জুন পদ্মা সেতু দিয়ে শুরু হয় যান চলাচল। এরপর গত চার বছরে সেতু ব্যবহার করেছে আড়াই কোটিরও বেশি যানবাহন। বিপরীতে টোল আদায় হয়েছে তিন হাজার ৩৯২ কোটি টাকারও বেশি। তবে ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে তার প্রায় অর্ধেক টাকা। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ৩২ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হয় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের স্বপ্নের পদ্মা সেতু। মোট ব্যয়ের মধ্যে ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা অর্থ বিভাগ থেকে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষকে ঋণ হিসেবে দেয় সরকার। বর্তমানে সেতুর ওপর তলায় সড়ক পথে চলছে যানবাহন আর নিচ দিয়ে ছুটছে ট্রেন। পদ্মা সেতুর দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ সমকালকে জানান, পদ্মা সেতু থেকে টোল আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তার চেয়ে বেশিই আদায় হচ্ছে। তারপরও সবচেয়ে বড় বিষয় হলো এটা মানুষের ভোগান্তি লাঘবের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের বহুবিধ সুযোগ করে দিয়েছে। জানা গেছে, পদ্মা সেতু ২০২২ সালের ২৫ জুন উদ্বোধন হলেও পরদিন ২৬ জুন এই দিনে পদ্মা সেতুতে যান চলাচল শুরু হয়। পরের বছর ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর পদ্মা সেতুর রেলপথ উদ্বোধন হয়। পদ্মা সেতু হয়ে চালু হয় ঢাকা-ভাঙ্গা নতুন রেল নেটওয়ার্ক। আর ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর রেল লিঙ্ক প্রকল্প পুরোপুরি চালু হয়। এদিন রাজধানী থেকে পদ্মা সেতু দিয়ে ভাঙ্গা হয়ে নতুন পথে নড়াইল ও যশোর অতিক্রম করে খুলনা পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু হয়। রাজধানী থেকে মাত্র সাড়ে ৩ ঘণ্টায় খুলনা ও বেনাপোল পৌঁছানো যাচ্ছে ট্রেনে। তাই এখন দক্ষিণের মানুষ সড়ক ও রেলপথের সুফল পাচ্ছে। এই সেতু ব্যবহার করে দক্ষিণাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের সুযোগও রাখা হয়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলী জানিয়েছেন, ২০২২ সালের ২৫ জুন উদ্বোধনের পরদিন থেকে শুরু হয় যানবাহন চলাচলসহ টোল আদায় কার্যক্রম। গত বছর শুরু হয় ইলেকট্রনিক টোল সংগ্রহের কার্যক্রম (ই-টোল)। এ পদ্ধতিতে আর কোনো যানবাহনকে লাইনে দাঁড়িয়ে নগদ টাকায় টোল পরিশোধ করতে হবে না। কার্ডের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যানবাহনের টোল কর্তন করে নেবে কর্তৃপক্ষ। কত যানে কত টোল সেতু কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, উদ্বোধনের পর ২০২২ সালে ২৭ লাখ ৯০ হাজার ৪৬৫টি যানবাহন পদ্মা সেতু ব্যবহার করে। এ থেকে টোল আদায় হয় ৪০২ কোটি ৯৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৫০ টাকা। পরের বছর আয় হয় ৮১৪ কোটি ৬৮ লাখ। ২০২৪ সালে ৮৩৬ কোটি ৩৫ লাখ এবং ২০২৫ সালে ৮৮৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা আদায় হয়। আর চলতি বছরে গত ২৩ জুন পর্যন্ত আদায় হয়েছে ৪৪৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা। ওই দিন পর্যন্ত মোট টোল আদায় হয়েছে তিন হাজার ৩৯২ কোটি ১৬ লাখ এক হাজার ৪০০ টাকা। চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যানবাহন চলাচল করেছে ২০২৫ সালে ৭২ লাখ ৪১ হাজার ৫৮৭টি। অন্যদিকে সেতু চালুর পর থেকে গেল ঈদুল আজহার সময় এক দিনে টোল আদায় রেকর্ড গড়েছে পদ্মা সেতু। গত ৫ জুন ২৪ ঘণ্টায় ৫২ হাজার ৪৮৭টি যানবাহন সেতু ব্যবহার করে, যা পদ্মা সেতুর ইতিহাসে এক দিনে সর্বোচ্চ যানবাহন পারাপার। ওইদিন টোল আদায় হয় পাঁচ কোটি ৪৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা। এর পরদিন ২৪ ঘণ্টায় ৪০ হাজার ১১৮টি যানবাহন পার হয়। ওইদিন টোল আদায় হয় চার কোটি ৪৭ লাখ ৯৪ হাজার ৩০০ টাকা। যা পদ্মা সেতুর ইতিহাসে টোল আদায়ে সর্বোচ্চ পঞ্চম রেকর্ড বলে জানা গেছে। এক সেকেন্ডেই টোল পরিশোধ পদ্মা সেতুতে স্বয়ংক্রিয় ই-টোল ব্যবহার করা গাড়ির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। গত বছর ১৫ সেপ্টেম্বর এই পদ্ধতি শুরু হয়। বর্তমানে পদ্মা সেতুতে ই-টোলে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে টোল আদায়ের পরিমাণ আট কোটি টাকারও বেশি হয়েছে। এক সেকেন্ডের মধ্যেই টোল দেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাচ্ছে। পদ্মা সেতু ব্যবহারকারী কয়েকজন চালক জানান, ই-টোল ব্যবস্থায় নিবন্ধিত গাড়ি ইটিসি লেনে প্রবেশ করলে আরএফআইডি রিডার স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির ট্যাগ শনাক্ত করে। এরপর গাড়ির তথ্য যাচাই করে, টোলের পরিমাণ নির্ধারণ করে এবং ওয়ালেট থেকে অর্থ কেটে নেয়। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগে সাধারণত এক সেকেন্ডেরও কম। এরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যারিয়ার খুলে যায় এবং গাড়ি কোনো ধরনের বিরতি ছাড়াই সেতু পার হতে পারে। প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্টদের মতে, টোল সংগ্রহ ব্যবস্থায় এই স্বয়ংক্রিয়তা শুধু সময়ই বাঁচাচ্ছে না, একই সঙ্গে সড়ক ব্যবস্থাপনাকেও আরও দক্ষ করে তুলছে। এতে টোল সংগ্রহ আরও স্বচ্ছ হয়েছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এসপায়ার টু ইনোভেটের হেড অব প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট আবদুল্লাহ আল ফাহিম সমকালকে বলেন, এখন পর্যন্ত ১২ হাজারের বেশি যানবাহন প্ল্যাটফর্মটিতে নিবন্ধিত হয়েছে এবং আট কোটি টাকার বেশি টোল আদায় করা হয়েছে। এর ফলে যাতায়াতে স্বস্তি বেড়েছে, যানজট কমেছে এবং বিপুল পরিমাণ কর্মঘণ্টা সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে। সেতু কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বছরে এক হাজার ৬০০ কোটি টাকার কিছু বেশি টোল আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
‘অনিয়ম ও দুর্নীতির’ অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদের বক্তব্য শুনতে তাকে তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে পাঠানো এক নোটিসে তাকে আগামী সোমবার দুপুর ৩টায় সেগুনবাগিচায় কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়েছে। দুদকের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এ তথ্য জানালেও মাহবুব মোর্শেদের বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ এসেছে, তার বিস্তারিত বলতে পারেননি। অবশ্য বাসসের এমডি ও প্রধান সম্পাদকের দায়িত্বে থাকার সময় নিজের একটি গাড়ি আরেকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংবাদমাধ্যমেই ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল মাহবুব মোর্শেদের বিরুদ্ধে। তাকে তলবের নোটিসটি পাঠিয়েছেন দুদকের উপপরিচালক ও অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা এ কে এম মাহবুবুর রহমান। নোটিসে বলা হয়, “মাহবুব মোর্শেদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এর বিরুদ্ধে নানাবিধ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে আপনার বক্তব্য শ্রবণ ও গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন।” নোটিসে তাকে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের কপিসহ হাজির হতে বলা হয়েছে। চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ওই বছরের ১৮ অগাস্ট সাংবাদিক মাহবুব মোর্শেদকে দুই বছর মেয়াদে বাসসের এমডি ও প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জিতে বিএনপি সরকার গঠনের পরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি বাসসে গিয়ে কর্মীদের ‘বিক্ষোভের’ মুখে পড়েন মাহবুব মোর্শেদ। সেদিন অফিস থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর আর সেখানে ফেরেননি তিনি। পরে ফেইসবুক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, ‘মব তৈরি করে’ তাকে ‘অপসারণের’ জন্য চাপ তৈরি করা হয়েছে। এর পরদিন তার বিরুদ্ধে ওঠা ‘দুর্নীতির’ অভিযোগ তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। কমিটির কাছে তার বিরুদ্ধে আরও কিছু অনিয়মের অভিযোগ জমা পড়ার কথা বলেন বাসসের কর্মীদের কয়েকজন। সবশেষ ১ এপ্রিল এক প্রজ্ঞাপনে মাহবুব মোর্শেদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বাসসের এমডি ও প্রধান সম্পাদকের দায়িত্বে থাকার সময় মাহবুব মোর্শেদ নিজের একটি গাড়ি আরেকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংবাদমাধ্যমেই ভাড়া দেন বলে অভিযোগ ওঠে। ‘রেন্ট-এ-কার’ নামের গাড়ি ভাড়া দেওয়া ওই কোম্পানি গাড়ি ভাড়ার জন্য মাসে দেড় লাখ টাকা করে পেয়েছিল। কোম্পানির স্বত্বাধিকারী মো. আব্দুল কাদের মীনা তখন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “এখানে আমার মাধ্যমে গাড়ি দেওয়ার কারণে আমার কোনো কমিশন ছিল না, আমি এক টাকাও নিইনি। বিলটা আমার নামে পাস হইত, কিন্তু পুরো টাকাই তিনি (মাহবুব মোর্শেদ) নিয়েছেন।” ভাড়া পরিশোধের নথিতে একই কোম্পানির আরেকটি গাড়ি বাসসে ভাড়া দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। তবে সেই গাড়ির ভাড়া ছিল মাসে ৭০ হাজার টাকা। মাহবুব মোর্শেদের নামে থাকা গাড়ি বাসসে ভাড়া দেওয়া বিষয়ক নথিপত্রে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর বাসস থেকে একটি কার্যাদেশ দিয়ে ‘রেন্ট-এ-কার সার্ভিস’ নামে একটি কোম্পানির কাছে গাড়ি চাওয়া হয়। ১৬টি শর্ত জুড়ে দিয়ে পরের ১ ডিসেম্বর থেকে ‘প্রধান সম্পাদকের সার্বক্ষণিক দাপ্তরিক কাজের জন্য’ গাড়িটি চাওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী টয়োটা ব্র্যান্ডের এলিয়ন মডেলের একটি গাড়ি বাসসকে দেয় ‘রেন্ট-এ-কার সার্ভিস’। জ্বালানি, চালক ও অন্যান্য ব্যয়সহ মাসে দেড় লাখ টাকার বিল মেটানোর নথিতে গাড়ির নম্বরও রয়েছে। বিআরটিএর নথি অনুযায়ী গাড়িটির মালিক মাহবুব মোর্শেদ। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি ও ২ ফেব্রুয়ারি বাসস থেকে ওই গাড়ির ভাড়া বাবদ দেড় লাখ করে মোট তিন লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। তথ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি ২৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিলেও বাসসের সাবেক এমডির বিরুদ্ধে প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।