মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যের অস্থিতিশীলতার মধ্যে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির বাইরে গিয়ে সৌদি আরব থেকে অতিরিক্ত ১ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে।এর মধ্যে ডিজেল ১ লাখ মেট্রিক টন ও ২৫ হাজার মেট্রিক টন গ্যাসোলিন আমদানি করা হবে। এই জরুরি আমদানিতে সরকারের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান ‘পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল’-এর কাছ থেকে জরুরি ভিত্তিতে এই জ্বালানি কেনা হচ্ছে। জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে বিশ্বজুড়ে সৃষ্ট অস্থিরতার মধ্যে জ্বালানি সংকট নিরসনে দেশীয় কূপ খননের পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন যোগানে জোর দিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়।সেই সঙ্গে এই খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় অর্থের বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে বলেও গণমাধ্যমকে জানিয়েছে মন্ত্রণালয় সূত্র। এরই পরিপ্রেক্ষিতে চলতি মাসে জ্বালানির যোগানে ১৭টি জাহাজের এলসি খোলা হয়। এর মধ্যে দেশে এসেছে মাত্র ৪টি এলসির জ্বালানি। পাশাপাশি ৬টি এলসির জ্বালানি এখনো অপেক্ষমাণ। এছাড়াও নিশ্চয়তা মেলেনি ৭টি এলসি সরবরাহের। অন্যদিকে আগামী এপ্রিলে জ্বালানির যোগানে ১৫টি জাহাজের এলসি খোলা হয়েছে। যা থেকে ১৩টি পার্সেল সরবরাহের সম্মতি পাওয়া গেলেও এ পর্যন্ত মাত্র ৩টি জাহাজের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বিদ্যমান এই সংকট নিরসনে সরকার প্রতিবেশী দেশ ভারত, চীন ও জাপানের কাছে সহযোগিতা চেয়েছে। তবে সেই প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ হওয়ায় এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে দ্রুত সরবরাহের প্রয়োজন পড়ায় মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরবর্তীতে সার্বিক যাচাই-বাছাই শেষে সৌদি প্রিন্সের মালিকানাধীন কোম্পানি পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনালকে চূড়ান্ত করা হয়।
ই-ভ্যাট সিস্টেমে অনলাইন রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা আগামী ২৯ মার্চ পর্যন্ত বাড়িয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আজ রোববার এনবিআরের প্রথম সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) নাহিদ নওশাদ মুকুল স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, পবিত্র ঈদুল ফিতর ও মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দীর্ঘ সময় সরকারি ছুটি থাকায় এবং ই-ভ্যাট সিস্টেমের সেবা কিছুটা ধীরগতির হওয়ায় জনস্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ৬৪-এর উপধারা (১ক)-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ই-ভ্যাট সিস্টেমে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ কর মেয়াদের অনলাইন রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা আগামী ২৯ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে।
দেশের বাজারে ফের স্বর্ণের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। এবার ভরিতে ২ হাজার ৬৮৩ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৬২ হাজার ২৬৫ টাকা নির্ধারণ করেছে সংগঠনটি। শনিবার (১৪ মার্চ) সকালে এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে বাজুস। নতুন এ দাম আজ সকাল ১০টা থেকেই কার্যকর হবে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) মূল্য কমেছে। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দর অনুযায়ী, দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেট স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৬২ হাজার ২৬৫ টাকায়। এছাড়া ২১ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি ২ লাখ ৫০ হাজার ২৬৮ টাকা, ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ ২ লাখ ১৪ হাজার ৬১৮ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের ভরি বেচাকেনা হচ্ছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৭৮৫ টাকায়। বিস্তারিত আসছে...
চলতি মাসের প্রথম ১১ দিনে দেশে এসেছে ১৯২ কোটি বা ১.৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে দেশে এসেছে ১৭ কোটি ৪৫ লাখ ডলার রেমিট্যান্স। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, চলতি মার্চের প্রথম ১১ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৯২ কোটি ডলার। আর গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ১৩৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ বছর ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত দেশে এসেছে ২ হাজার ৪৩৭ কোটি ৪০ ডলার রেমিট্যান্স। বছর ব্যবধানে যা বেড়েছে ২৩ দশমিক ২০ শতাংশ। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদকে ঘিরে প্রবাসীরা দেশে থাকা তাদের আত্মীয়-স্বজনদের কাছে প্রচুর পরিমাণে অর্থ পাঠাচ্ছেন। এতেই বাড়ছে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ। তবে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত চলমান থাকলে রেমিট্যান্স প্রবাহে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের জন্য ডিজেল সরবরাহের অনুরোধ ভারত পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। তিনি জানান, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজেদের জ্বালানির চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ তথ্য জানান। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভারতের ডিজেলের প্রাপ্যতা, শোধন ক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বিবেচনা করা হবে। তিনি জানান, ভারত প্রতিবেশী দেশগুলোতে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানির অন্যতম বড় সরবরাহকারী। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে ডিজেল সরবরাহের জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে এবং বিষয়টি বর্তমানে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত ২০০৭ সাল থেকে আসামের নুমালীগড় রিফাইনারি থেকে নৌপথ, রেলপথ এবং বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন ব্যবহার করে বাংলাদেশে পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ করছে। জয়সওয়াল বলেন, ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) সঙ্গে বিক্রয়-ক্রয় চুক্তির আওতায় নিয়মিত ডিজেল রপ্তানি চলছে। তবে ভবিষ্যৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে ভারতের নিজস্ব চাহিদা ও জ্বালানির প্রাপ্যতাও বিবেচনায় নেওয়া হবে। এদিকে বিপিসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রেজানুর রহমান জানান, নুমালীগড় রিফাইনারি থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে অন্তত ৫ হাজার টন ডিজেল বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে। বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, সোমবার বিকেল থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোতে আসামের নুমালীগড় রিফাইনারি থেকে ডিজেল পৌঁছানো শুরু হয়েছে। পাইপলাইনের মাধ্যমে ৫ হাজার টন ডিজেল পাম্প করতে প্রায় ৪৫ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। ভারতের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ ছাড়াও শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপসহ কয়েকটি দেশ একই ধরনের জ্বালানি সরবরাহের অনুরোধ করেছে, যা বর্তমানে বিবেচনাধীন রয়েছে।
আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘোষিত সরকারি ছুটির মধ্যেও তৈরি পোশাক শিল্পসংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে সীমিত পরিসরে ব্যাংক শাখা খোলা রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিশোধ এবং রপ্তানি বিল ক্রয়ের সুবিধার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (১০ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব অফ-সাইট সুপারভিশন থেকে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হয়। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ঈদের আগে নির্বাহী আদেশে ঘোষিত ছুটির দিন ১৮ মার্চ (বুধবার) এবং ঈদের ছুটি ১৯ মার্চ (বৃহস্পতিবার) পোশাক শিল্পসংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে বাণিজ্যিক ব্যাংকের নির্দিষ্ট শাখা সীমিত পরিসরে খোলা থাকবে। ঢাকা মহানগরীসহ আশুলিয়া, টঙ্গী, গাজীপুর, সাভার, ভালুকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবস্থিত তফসিলি ব্যাংকের তৈরি পোশাক শিল্পসংশ্লিষ্ট শাখাগুলোকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ছুটির দিন খোলা রাখতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, ওই দুই দিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত গ্রাহক লেনদেন চলবে। তবে অফিস কার্যক্রম চলবে দুপুর ২টা পর্যন্ত। এর মধ্যে দুপুর ১টা ১৫ মিনিট থেকে দেড়টা পর্যন্ত যোহরের নামাজের বিরতি থাকবে। এ ছাড়া ছুটির দিনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিধি অনুযায়ী ভাতা প্রদানের নির্দেশও দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে এটিএমসহ বিভিন্ন ডিজিটাল লেনদেন সেবা নির্বিঘ্ন রাখতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজ সোমবার জারি করা এক সার্কুলারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ঈদের ছুটিকালীন সময়ে অটোমেটেড টেলার মেশিন (এটিএম), পয়েন্ট অব সেল (পিওএস), কিউআর কোড, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, অনলাইন ই-পেমেন্ট গেটওয়ে এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এর মাধ্যমে লেনদেন যাতে স্বাভাবিক ও নিরবচ্ছিন্ন থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। সার্কুলারে বলা হয়, ব্যাংকগুলোকে সার্বক্ষণিক এটিএম সেবা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো এটিএম বুথে প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিলে তা দ্রুত সমাধান করতে হবে এবং পর্যাপ্ত নগদ অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া, এটিএম বুথগুলোর নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়েও ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাক। ব্যাংকগুলোকে সার্বক্ষণিক পিওএস সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতারণা প্রতিরোধে ব্যবসায়ী ও গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিকাশ, রকেট ও নগদের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রদানকারী ব্যাংক ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বিঘ্ন লেনদেন নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যেকোনো পরিমাণ লেনদেনের জন্য গ্রাহকদের এসএমএস অ্যালার্ট সেবার মাধ্যমে তথ্য জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, সরকার ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে ১৭ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত সাত দিনের ছুটি অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে পূর্বঘোষিত ঈদের ছুটির সঙ্গে অতিরিক্ত হিসেবে ১৮ মার্চকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানি তেল ও গ্যাসের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের ৬০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আনা হয়। প্রতি চার ব্যারেল ক্রুড তেলের মধ্যে এক ব্যারেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই তেল হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে আমদানি করা হয়। শিপিং অ্যানালিটিক্স কম্পানি কেপলারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এশিয়া থেকে প্রতিদিন ২৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল কেনা হয়, যার মধ্যে ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী ১৪.৭৪ মিলিয়ন ব্যারেল আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এশিয়ার দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি তেল রপ্তানি করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাক। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল দেশ হলো জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। জাপান তাদের চাহিদার ৯৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়া তাদের চাহিদার ৭০ শতাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। ২০২৪ সালে সিঙ্গাপুরও তেল আমদানির পরিমাণ ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭০ শতাংশ করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ চীন। দেশটি দৈনিক ৫.৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। এছাড়া তারা রাশিয়া ও কানাডা থেকেও তেল নিয়ে থাকে। উত্তর এশিয়ার দেশগুলোতে জাহাজে তেল পৌঁছাতে ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারতে তেল আসতে এক সপ্তাহের কম সময় লাগে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় এশিয়ার দেশগুলোতে তেলের সংকট নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ড ইতিমধ্যেই তেলের দাম নির্ধারণের প্রস্তুতি নিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং জানিয়েছেন, পেট্রলের দাম নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধ তাদের দেশের অর্থনীতির ওপর বিশাল বোঝা সৃষ্টি করেছে। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল সাধারণ মানুষকে আহবান জানিয়েছেন, যাতে তারা তেল মজুদ না করেন। এ ছাড়া আগামী ১৫ দিনের জন্য তেলের দাম বেঁধে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। গত কয়েক দিন ধরে দেশটির পেট্রল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে এবং অনেক পাম্পে সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম। ভিয়েতনামের অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, সাময়িকভাবে জ্বালানি পণ্যের ওপর থেকে ট্যাক্স প্রত্যাহারের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ফিলিপিন্সেও জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সংঘাত চলতে থাকলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে। এক বছরে তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ০.৪ শতাংশ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ০.১–০.২ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। তিনি জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়ে বক্তব্যে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া নতুন সংঘাত দীর্ঘদিন চললে বাজারে স্পষ্ট প্রভাব পড়বে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ দশমিক ৭৭ ডলারে পৌঁছেছে (এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত), যা ২০২০ সালে করোনা মহামারির পর এক দিনে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি। গত সপ্তাহেই তেলের দাম প্রায় ২৮ শতাংশ বেড়েছিল। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারেও পৌঁছাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাবে ইরান পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বিমান হামলায় ইরানের একাধিক তেল ডিপোসহ বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে। জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বাড়ছে। ফলে সরকারের ভর্তুকির চাপ দ্রুত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম আরও বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপ বাড়ার পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। বিদ্যুৎ বিভাগের একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছে দেশি-বিদেশি কোম্পানির পাওনা ইতোমধ্যে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আর্থিক সংকটকে আরও গভীর করছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত অনুযায়ী ভর্তুকি কমানোর চাপ থাকায় সরকার নীতিগতভাবে দ্বিধায় পড়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দামে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই—দুই ধরনের অপরিশোধিত তেলের দামই দ্রুত বেড়েছে। বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬ থেকে ৭ মিলিয়ন টন জ্বালানি তেল আমদানি করে, যার বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলার বাড়লে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। আর তা যদি ১৫০ ডলারে পৌঁছায়, তাহলে আমদানি ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করবে। দেশের জ্বালানি খাত মূলত আমদানিনির্ভর। অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। অন্যদিকে পরিশোধিত তেল আমদানি করা হয় চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে। দেশে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কনডেনসেট থেকে বিভিন্ন ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধাক্কা এলে দেশের জ্বালানি মূল্য দীর্ঘদিন স্থির রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অতীতেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে সরকারকে কয়েক দফা জ্বালানির মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে। সরকারি সূত্র বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির অনিশ্চয়তায় অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় জ্বালানি ব্যবহারে রেশনিং ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ খাতে সংকট আরও তীব্র। বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ কয়েক দশ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ায় সরকারকে হয় ভর্তুকি বাড়াতে হবে, নয়তো বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি আমদানি বিল, ভর্তুকি এবং বাজেট ঘাটতি বাড়বে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হবে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি মজুত বাড়ানো এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসের দিকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে শক্তিশালী আর্থিক সংস্কারের একটি ধারাবাহিক উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। রোববার অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে তার কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ এ আহ্বান জানান বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। বৈঠকে, আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদার করা এবং বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধির জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ সময় আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হলো বেসরকারি খাত। তিনি ডিসিসিআই প্রতিনিধিদলকে আশ্বস্ত করেন যে, বর্তমান সরকার বাণিজ্য, ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং শিল্পখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে, কারণ দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য বহুমুখী অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে আরও গতিশীল পুঁজিবাজার গড়ে তোলার জন্য সরকারের চলমান উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। তিনি আরও জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও বেশি বেসরকারি খাতমুখী করে গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে, যাতে আর্থিক নীতিমালা ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। মূলধনের প্রাপ্যতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি বলেন, বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, সারা দেশে শক্তিশালী ও টেকসই বেসরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি করা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। সাক্ষাৎকালে তাসকীন আহমেদ ঋণের সুদের হার কমিয়ে আনা এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে নীতি সুদের হার ধীরে ধীরে কমানোর প্রস্তাব দেন। তিনি প্রকৃত (অনিচ্ছাকৃত) ঋণখেলাপিদের জন্য ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান এবং ঋণ শ্রেণিকরণের সময়সীমা বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি এবং কাঠামোগত সংস্কারের সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা জোরদার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সক্ষম হবে। তিনি এসব গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়নে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। বৈঠকে ডিসিসিআইয়ের সিনিয়র সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো সালিম সোলায়মান উপস্থিত ছিলেন।
বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশের বাজারে আবারও কমেছে স্বর্ণের দাম। টানা দ্বিতীয়বারের মতো মূল্যবান এই ধাতুর দাম কমিয়েছে Bangladesh Jewellers Association (বাজুস)। এবার প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম কমানো হয়েছে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা। সোমবার (৯ মার্চ) সকালে বাজুস এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়। নতুন মূল্য অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৯৪৭ টাকা। এই দাম সোমবার সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হয়েছে। বাজুসের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ বা পিওর গোল্ডের দাম কমায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বর্ণের নতুন দর নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দর অনুযায়ী, দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৬৪ হাজার ৯৪৮ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫২ হাজার ৮৭৬ টাকা। ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ বিক্রি হবে ২ লাখ ১৬ হাজার ৭৭৫ টাকায়। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৯৪৩ টাকা। এর আগে গত দুই সপ্তাহে টানা ছয় দফায় স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তবে সর্বশেষ দুই দফায় তা কমানো হলো। বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম মোট ৩৮ বার সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪ দফায় দাম বাড়ানো হয়েছে, আর কমানো হয়েছে ১৪ দফায়।
মূল্যস্ফীতি আবার ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। যার অর্থ, নয় মাস পর আবার ৯ শতাংশের ঘরে গেল মূল্যস্ফীতি। গত বছরের মে মাসে ৯ দশমিক ০৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল। গত বছরের এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ। গত বছরের এপ্রিল মাসের পর ফেব্রুয়ারি মাসের মূল্যস্ফীতিই সর্বোচ্চ। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, পণ্য ও সেবার মূল্য সূচক ফেব্রুয়ারিতে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ হয়েছে। জানুয়ারিতে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। মূলত খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণেই মূল্যস্ফীতি এ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য মূল্যস্ফীতি জানুয়ারির ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ফেব্রুয়ারিতে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ হয়েছে। এতে স্থানীয় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম চড়া হয়েছে বলে বোঝা যায়। একই সময়ে খাদ্য-বহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে। জানুয়ারিতে খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশ ৮১ শতাংশ থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে ৯ দশমিক ০১ শতাংশে পৌঁছায়। অর্থাৎ, আবাসন, পরিবহণ, পোশাক ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে দাম বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। গত বছরের বেশি সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ক্রমাগত আরও বাড়ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও ১২ মাসের গড় হিসাবে জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি ছিল, যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে সংঘাত শুরুর আগেই প্রায় আড়াই লাখ টন এলএনজিসহ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে আসা ১৫টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এসব জাহাজে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল ও শিল্পকারখানার কাঁচামাল রয়েছে। বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, জাহাজগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দর থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। ওই সময় অঞ্চলটিতে সামরিক উত্তেজনা বাড়তে থাকলেও সংঘাত শুরু হওয়ার আগেই জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে জাহাজগুলো ধাপে ধাপে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাচ্ছে এবং সেখান থেকে পণ্য খালাসের কার্যক্রম চলছে। বন্দর সূত্রে জানা যায়, জাহাজগুলোর মধ্যে অন্তত চারটিতে মোট প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রয়েছে। এসব এলএনজি মূলত কাতারের রাস লাফান বন্দর থেকে আনা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাহিদা মেটাতে এই এলএনজি ব্যবহার করা হবে। এছাড়া, একটি জাহাজে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এসেছে, যা গৃহস্থালি রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ছোট শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত হবে। পাশাপাশি কয়েকটি জাহাজে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ফার্নেস ওয়েল, শিল্পখাতে ব্যবহৃত ডিজেলসহ অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য রয়েছে। অন্যদিকে কয়েকটি কার্গো জাহাজে বিভিন্ন শিল্প কাঁচামাল আনা হয়েছে। এর মধ্যে রাসায়নিক পদার্থ, পেট্রোকেমিক্যাল উপকরণ ও প্লাস্টিক শিল্পের কাঁচামাল রয়েছে, যা দেশের বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পে ব্যবহার করা হবে। বন্দর কর্মকর্তারা জানান, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে। সে কারণে সংঘাতের আগে জাহাজগুলো নিরাপদে বাংলাদেশে পৌঁছানো দেশের জ্বালানি ও আমদানি সরবরাহের জন্য স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে সংঘাত শুরুর আগেই হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে আসা ১৫টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এসব জাহাজে এলএনজি, জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্প কাঁচামাল রয়েছে। বন্দরে জাহাজ ভেড়ানো, পণ্য খালাস ও সরবরাহ কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হয়েছে। তিনি জানান, জাহাজগুলোর মধ্যে ‘লুসাইল’ ও ‘আল গালায়েল’ নামের এলএনজি ট্যাংকারও রয়েছে। সামুদ্রিক জাহাজের জ্বালানি, কয়েকটি কার্গো জাহাজে শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল এসেছে, প্লাস্টিক বা পেট্রোকেমিক্যাল কাঁচামাল কারখানার বিভিন্ন উপকরণ এগুলো বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প, প্লাস্টিক শিল্প, রাসায়নিক শিল্পে ব্যবহৃত হওয়ার পণ্য রয়েছে। এ বিষয়ে শনিবার এলএনজি জাহাজগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধি ইউনি গ্লোবাল বিজনেস লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ উপমহাব্যবস্থাপক মো. নুরুল আলম বলেন, চারটি জাহাজের চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানো প্রায় নিশ্চিত। তবে ‘লিবারেল’ নামে আরেকটি এলএনজিবাহী জাহাজ এখনো হরমুজ প্রণালির ভেতরে রয়েছে। জাহাজটিতে এলএনজি বোঝাই করা হয়েছে এবং এটি প্রণালি অতিক্রমের অপেক্ষায় আছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাহাজগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দর থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কার আগে তারা হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে নিরাপদে আরব সাগরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। এরই মধ্যে অধিকাংশ জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে এবং বাকিগুলোও পর্যায়ক্রমে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সংঘাতের আগে জাহাজগুলো নিরাপদে পৌঁছানো দেশের জ্বালানি ও আমদানি সরবরাহের জন্য স্বস্তির বিষয়।
এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) আমদানি বিল পরিশোধের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে। এখন রিজার্ভ আছে ৩৪ দশমিক ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী, এই রিজার্ভের পরিমাণ ২৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। রোববার (৮ মার্চ) বিকালে বাংলাদেশ ব্যাংক এ তথ্য জানিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, আজ (৮ মার্চ) গত দুই মাসের (জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি) আকুর বিল ১৩৬ কোটি ৮৭ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। এতে আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে দেশে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৯৩৮ কোটি ২৭ লাখ ৯০ হাজার ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবে দেশের মোট রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪১০ কোটি ২৭ লাখ ১০ হাজার ডলার। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবে মোট রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ৫৪৮ কোটি ৭৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার। আর আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল তিন হাজার ৭৬ কোটি ৪৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের সংকট সৃষ্টি হতে পারে, এমন গুঞ্জনের পরিপ্রেক্ষিতে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। আতঙ্কে মাত্রাতিরিক্ত বিক্রির চাপ বাড়ানোয় সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রোববার (৮ মার্চ) রীতিমতো ধস নেমেছে পুঁজিবাজারে। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমার পাশাপাশি মূল্যসূচকের বড় পতন হয়েছে। তবে ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। এর আগে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর গত সপ্তাহে লেনদেন হওয়া পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে চার কার্যদিবসেই দরপতন হয়। এতে এক সপ্তাহেই ডিএসইর প্রধান সূচক ৩৫৯ পয়েন্ট কমেছে। আর বাজার মূলধন কমেছে ২০ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা। এই পতনের পর রোববার ডিএসইতে লেনদেন শুরু হয় বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমার মাধ্যমে। ফলে লেনদেনের শুরুতে সূচক ঋণাত্মক হয়ে পড়ে। লেনদেনের সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দরপতনের মাত্র বাড়ে। ফলে ধস দিয়েই শেয়ারবাজারের লেনদেন শেষ হয়। দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইতে সব খাত মিলে দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে মাত্র ১০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট। বিপরীতে দাম কমেছে ৩৭১টির। আর ৯টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ২৩১ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৩৫ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১৩ পয়েন্টে অবস্থান করছে। আর বাছাই করা ভালো ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় ৯১ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৯১৯ পয়েন্টে নেমে গেছে। মূল্যসূচকের বড় পতন হলেও ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ৫৩১ কোটি ৮৮ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৪৫৯ কোটি ৪২ টাকা। এ হিসাবে আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন বেড়েছে ৭২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। অন্য শেয়ারবাজার সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই কমেছে ৪১৯ পয়েন্ট। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৬৪ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ১৪৫টির এবং ২টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। লেনদেন হয়েছে ১৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৪১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
দেশে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের আশঙ্কার মধ্যেই জ্বালানির মজুত বাড়ার সুখবর দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি জানিয়েছেন, নতুন করে দুটি জাহাজ নোঙর করায় দেশের জ্বালানি মজুত আরও বৃদ্ধি পাবে। রোববার (৮ মার্চ) দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাব–এ উত্তরাঞ্চল ছাত্র ফোরাম আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান। মন্ত্রী বলেন, রোববার সকাল ১১টার দিকে একটি জ্বালানিবাহী জাহাজ নোঙর করেছে এবং দুপুরের দিকে আরও একটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। এই দুটি জাহাজ থেকে জ্বালানি খালাস হলে দেশের মজুত পরিস্থিতি আরও স্বস্তিদায়ক হবে। তবে চলমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি ব্যবহারে সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আপাতত রেশনিং ব্যবস্থা চালু রাখা হবে বলেও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, অনেক পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। যেহেতু যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তেল শোধনাগারে হামলার ঘটনা ঘটছে, তাই বিদ্যমান জ্বালানি মজুত সাশ্রয়ীভাবে ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী আরও বলেন, যুদ্ধ কতদিন চলবে তা এখনো অনিশ্চিত। তাই আগাম সতর্কতার অংশ হিসেবেই সরকার এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকারের সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, যার প্রভাব সরাসরি জ্বালানি খাতে পড়েছে। তিনি বলেন, “আমরা একটি ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছি। ঋণের বোঝা নিয়ে দায়িত্ব নিতে হয়েছে। এর মধ্যেই যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, ফলে প্রতিদিনই জনগণের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হচ্ছে।” এ সময় জ্বালানির দাম বাড়ানো নিয়ে গুজব না ছড়ানোর আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বিরোধী পক্ষের পক্ষ থেকে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বাড়ানো হবে। তবে আপাতত জ্বালানির দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। তিনি আরও বলেন, “আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি মজুত করার প্রয়োজন নেই। দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।” সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরের পথে এবং বন্দরে ভিড়ছে ১০টি জাহাজ। হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার আগেই পারস্য উপসাগর ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে রওনা হওয়া এসব জাহাজ একে একে বন্দরে পৌঁছাতে শুরু করেছে। রোববার (৮ মার্চ) ৮টি জাহাজের তথ্য নিশ্চিত করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম। চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, এসব জাহাজে মোট প্রায় পৌনে ৪ লাখ টন জ্বালানি পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে চারটি জাহাজে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), দুটি জাহাজে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), এবং বাকি চারটি জাহাজে ডিজেল, ফার্নেস তেল ও কনডেনসেটসহ বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি পণ্য রয়েছে। কাতার থেকে প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার টন এলএনজি নিয়ে ‘আল জোর’ ও ‘আল জাসাসিয়া’ নামে দুটি জাহাজ ইতোমধ্যে বন্দরে পৌঁছেছে। এছাড়া ‘লুসাইল’ ও ‘আল গালায়েল’ নামে আরও দুটি এলএনজিবাহী জাহাজ যথাক্রমে সোমবার ও বুধবার বন্দরের জলসীমায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। মোট চারটি জাহাজে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার টন এলএনজি রয়েছে। এসব জাহাজ কাতারের রাস লাফান বন্দর থেকে সংঘাত শুরুর দুই থেকে সাত দিন আগে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় সরকার খোলাবাজার থেকে তুলনামূলক বেশি দামে দুটি এলএনজি জাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা এখনও বন্দরে পৌঁছায়নি। বাংলাদেশে এলপিজির বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমদানি করা হয়। সংঘাত শুরুর আগেই ওমানের সোহার বন্দর থেকে ২২ হাজার ১৭২ টন এলপিজি নিয়ে ‘সেভান’ নামে একটি জাহাজ রোববার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এর আগে একই বন্দর থেকে ‘জি ওয়াইএমএম’ নামে আরেকটি এলপিজিবাহী জাহাজ ১৯ হাজার ৩১৬ টন এলপিজি নিয়ে বন্দরে পৌঁছেছে। দুই জাহাজে মোট ৪১ হাজার ৪৮৮ টন এলপিজি রয়েছে। এলপিজির মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার টন এনেছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি, বাকি এলপিজি এনেছে জেএমআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস লিমিটেড। এছাড়া দেশের ডিজেল মজুত কমতে থাকায় ৩১ হাজার টন ডিজেল নিয়ে ‘এসপিটি থেমিস’ নামের একটি জাহাজ বন্দরের পথে রয়েছে। জাহাজটি আগামী ১২ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। অন্যদিকে, মালয়েশিয়া থেকে ১৪ হাজার টন কনডেনসেট নিয়ে ‘হুয়া সুন’ নামের একটি জাহাজ ইতোমধ্যে বন্দরে পৌঁছেছে। এই কনডেনসেট থেকে ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও এলপিজি উৎপাদন করা হয়। পাশাপাশি সিঙ্গাপুর থেকে ৪০ হাজার টন ফার্নেস তেল নিয়ে আরও দুটি জাহাজ বন্দরে এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে দাম বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় চাহিদার তুলনায় বেশি তেল কিনতে শুরু করেছেন ভোক্তারা। ফলে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে হঠাৎ করে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। খুচরা বাজারে এখনো সরকার নির্ধারিত দামে তেল বিক্রি হলেও সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক ক্রেতা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কিনছেন। এতে বাজারে চাপ আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। রাজধানীর শেওড়াপাড়া, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, শাহজাদপুর, দক্ষিণ বনশ্রী ও মেরাদিয়া বাজারসহ বিভিন্ন এলাকার অধিকাংশ দোকানেই পাঁচ লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও এক বা দুই লিটারের বোতল সীমিত পরিমাণে মিললেও অনেক দোকানে সেটিও নেই। শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, তার প্রয়োজন ছিল দুই লিটারের একটি বোতল। কিন্তু আশপাশের কয়েকটি দোকান ও বাজার ঘুরেও না পেয়ে শেষ পর্যন্ত পাঁচ লিটারের বোতল কিনতে হয়েছে। মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটের ব্যবসায়ী হুমায়ুন কবির জানান, স্বাভাবিক সময়ে তিনি ডিলারের কাছ থেকে দিনে ৮–১০ কার্টন তেল আনতেন। কিন্তু গত কয়েক দিনে তা কমে দুই–তিন কার্টনে নেমে এসেছে। এতে বাজারে বোতলজাত তেলের সংকট তৈরি হয়েছে। বিক্রেতারা জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে তেল সরবরাহ তুলনামূলক কম। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনেক ক্রেতা আশঙ্কা থেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনছেন। ফলে বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। কারওয়ান বাজারে কয়েকটি ডিলারের দোকানে বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতারা ভিড় করছেন। তবে অনেকেই চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না। মগবাজার এলাকার বিক্রেতা মো. পলাশ বলেন, আগে যেখানে চার কার্টন তেল নিতেন, এখন ডিলার এক কার্টনের বেশি দিচ্ছে না। বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি ডিলার পর্যায়েও দাম কিছুটা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। পাঁচ লিটারের বোতল সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) ৯৫৫ টাকা থাকলেও আগে ডিলারের কাছ থেকে এটি প্রায় ৯৩০ টাকায় পাওয়া যেত। এখন অনেক দোকানদারকে ৯৫০ টাকা পর্যন্ত দিয়ে কিনতে হচ্ছে। এতে খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফা কমে গেছে। এদিকে বোতলজাত তেলের সংকটের মধ্যে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দামও বেড়েছে। কারওয়ান বাজারে গত চার দিনে খোলা সয়াবিন তেলের দাম কেজিতে প্রায় পাঁচ টাকা বেড়ে ১৯৮–২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা পাম তেলের দামও বেড়ে কেজিতে প্রায় ১৭০ টাকায় পৌঁছেছে। যদিও তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে সরবরাহ সংকটের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফ্রেশ ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল উৎপাদনকারী মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা নিয়মিত তেল সরবরাহ করছেন এবং উৎপাদনেও কোনো ঘাটতি নেই। রমজানকে সামনে রেখে অতিরিক্ত তেল আমদানিও করা হয়েছে। সিটি গ্রুপের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান সরবরাহ কমায়নি। তবে এলসি–সংক্রান্ত জটিলতার কারণে কিছু ছোট কোম্পানি তেল আমদানি করতে পারছে না। পাশাপাশি রমজানে চাহিদা বৃদ্ধি এবং কিছু মানুষের মজুদের কারণেও বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ জানিয়েছেন, বাজারে সরবরাহ সংকটের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তার সময় চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছেছে জ্বালানিবাহী ৮টি জাহাজ। রোববার (৮ মার্চ) সকালে জ্বালানিবাহী এসব জাহাজ বন্দরে নোঙর করে। জাহাজগুলো ২৮ ফেব্রুয়ারির আগেই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আগেই পারস্য উপসাগরীয় দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ১০টি জাহাজ চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয় এবং সেগুলো পৌঁছাতে শুরু করেছে বলে জানা গেছে। চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানো ও পথে থাকা এসব জাহাজের মধ্যে চারটিতে রয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং দুটিতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। এছাড়া ডিজেলসহ বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি পণ্য নিয়ে আরও চারটি জাহাজ এসেছে। সব মিলিয়ে এসব জাহাজে প্রায় পৌনে চার লাখ টন তেল-গ্যাস রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা এবং তেহরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার কারণে হরমুজ প্রণালি ঘিরে পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে বিশ্বজুড়ে তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে ইরাক, ইরান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব—এই সাত দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য আনা-নেওয়া হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রণালির পাশের দেশ ওমান থেকেও ওমান উপসাগরীয় পথে পরিবহন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। পারস্য উপসাগর থেকে এ প্রণালি পেরিয়ে ওমান উপসাগর, আরব সাগর, ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর হয়ে বাংলাদেশে জাহাজ আসে। এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বন্দরে কতগুলো জ্বালানিবাহী জাহাজ আসছে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় গত শুক্রবার জ্বালানি তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির দ্বি-বার্ষিক নির্বাচন আগামী ৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে ভোটারদের আইডি কার্ড বিতরণের শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৩১ মার্চ মঙ্গলবার। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে ভোটারদের আইডি কার্ড সংগ্রহের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। আজ শনিবার চেম্বারের যুগ্ম সচিব নুরুল আবছার চৌধুরী এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানিয়েছেন। তিনি জানান, আগামী ৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য দ্য চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রি’র নির্বাচনের ভোটার আইডি কার্ড বিতরণের শেষ সময় ৩১ মার্চ মঙ্গলবার। ইতোমধ্যে যে সকল প্রতিষ্ঠান ভোটার আইডি কার্ড সংগ্রহ করেননি উক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে উল্লেখিত সময়ের মধ্যে স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ অরিজিনাল চেম্বার সার্টিফিকেট প্রদর্শনপূর্বক অফিস চলাকালীন আইডি কার্ড সংগ্রহ করার জন্য অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। চেম্বার নির্বাচনে ভোটার আইডি কার্ড প্রদর্শন ব্যতীত ভোট প্রদানের সুযোগ থাকবে না। এরআগে চেম্বারের নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান চট্টগ্রামের স্থানীয় সরকার পরিচালক মনোয়ারা বেগম স্বাক্ষরিত অপর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় দ্য চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির দ্বিবার্ষিক নির্বাচন-২০২৫ এর প্রার্থী ও ভোটারদের জানানো যাচ্ছে যে, পূর্ব তফসিল অনুযায়ী গত ৩০ অক্টোবর স্থগিত করা ভোট গ্রহণ কার্যক্রম বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ২৬ ফেব্রুয়ারির (২৬.০০.০০০০.১৫৬.০২৪.৯০ (অংশ-২).৫২ সংখ্যক স্মারক) আইনগত মতামতের ভিত্তিতে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির অর্ডিনারি ও অ্যাসোসিয়েট গ্রুপের ১৮ জন পরিচালক নির্বাচনের ভোট গ্রহণ কার্যক্রম আগামী ৪ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে নিরবচ্ছিন্নভাবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত আগ্রাবাদের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি চেম্বারের নোটিশ বোর্ড, ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া সদস্যদেরকে এসএমএসের মাধ্যমে অবহিত করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, গত ১ নভেম্বর এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও আদালত ৩০ অক্টোবর ওই নির্বাচন স্থগিত রাখার আদেশ দেয়।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ইরানের পাল্টা হামলার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এতে বড় পাঁচ ধরনের চাপের মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায়, বিশেষ করে গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একযোগে কয়েকটি বড় চাপ তৈরি হতে পারে গ্যাস সংকট, বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়া, কৃষিতে সেচ ব্যাহত হওয়া, শিপিং ব্যয় বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে অনিশ্চয়তা। এসব মিলেই তৈরি হতে পারে এক ধরনের ‘পারফেক্ট ইকোনমিক স্টর্ম’। বর্তমানে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে গ্যাস সরবরাহ ঘিরে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানার চাহিদা মেটাতে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে। এই এলএনজির বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার ও ওমান থেকে। এসব জাহাজের প্রধান নৌপথই হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই রুট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় নতুন এলএনজি কার্গো আসা বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী এলএনজি কার্গো না এলে দেশে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এতে প্রথম ধাক্কা লাগবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসনির্ভর হওয়ায় গ্যাস সংকট দেখা দিলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গিয়ে লোডশেডিং বেড়ে যেতে পারে। গ্যাস সংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়তে পারে শিল্পখাতে। গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হলে রপ্তানিনির্ভর শিল্পে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। গ্যাসের পাশাপাশি অপরিশোধিত তেল সরবরাহেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। এই তেলও পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালি হয়ে। সৌদি আরবের বৃহত্তম তেল টার্মিনাল রাস তানুরা এলাকায় ড্রোন হামলার পর লোডিং কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ায় সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলছে, পরিকল্পিত আমদানি সূচি ঠিক থাকলে তাৎক্ষণিক সংকটের আশঙ্কা নেই। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। বিপিসির হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে দেশে ডিজেল ২ লাখ ১৪ হাজার ৬২ টন (প্রায় ১৪ দিনের চাহিদা), অকটেন ৩৬ হাজার ৬৪০ টন (২৮ দিন), পেট্রোল ২১ হাজার ৯২ টন (১৫ দিন), জেট ফুয়েল ৬০ হাজার ২০ টন (৩০ দিন), ফার্নেস অয়েল প্রায় ৯৩ দিনের ও কেরোসিন প্রায় ২৪১ দিনের মজুত রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মজুত স্বল্পমেয়াদি সংকট সামাল দিতে সক্ষম হলেও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত হলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে। কৃষি খাত : বোরো মৌসুমে সেচ সংকটের আশঙ্কা জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে কৃষি খাতে। বর্তমানে দেশে বোরো ধান চাষের মৌসুম চলছে, যেখানে সেচের জন্য বিপুল পরিমাণ ডিজেল ও বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। ডিজেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেলে বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পও সমস্যায় পড়বে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশ্বের বড় অংশের ইউরিয়া সার পরিবাহিত হয় হরমুজ রুট দিয়ে। ফলে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সারের দাম বাড়তে পারে। ডিজেল ও সারের ওপর একযোগে চাপ তৈরি হলে বোরো উৎপাদনে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ার পাশাপাশি চালের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বাণিজ্য ও রপ্তানি খাত : বাড়ছে শিপিং ব্যয় মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রপথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় অনেক আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি বিকল্প রুট ব্যবহার শুরু করেছে। অনেক জাহাজ এখন আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ হয়ে চলাচল করছে। এতে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের সময় ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি যুদ্ধঝুঁকির কারণে ‘ওয়ার রিস্ক সারচার্জ’ নামে অতিরিক্ত বিমা খরচ আরোপ করা হয়েছে। এতে কন্টেইনারপ্রতি কয়েক হাজার ডলার অতিরিক্ত ব্যয় যোগ হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেটররা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে অপারেশনাল খরচও দ্রুত বাড়ে। কিন্তু চুক্তিভিত্তিক নির্ধারিত রেট থাকায় অনেক ক্ষেত্রে এই বাড়তি খরচ সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই মাত্রা ছড়াতে পারে ভোগ্যপণ্যের বাজারেও খাতুনগঞ্জ ট্রেড এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রহমান মিন্টু কালবেলাকে বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো পণ্যের ঘাটতি নেই। তবে এই সংঘাত যদি আরও কিছুদিন স্থায়ী হয় তবে সয়াবিন তেলের উপর সরাসরি প্রভাব পড়বে। এছাড়া বাকি অন্য কোনো পণ্যে তেমন একটা আশঙ্কা নেই। তবে যুদ্ধস্থগিত না হলে অন্যান্য পণ্যের ও দাম বাড়বে। এলসি জটিলতা এর মূল কারণ থাকবে। রপ্তানিনির্ভর তৈরি পোশাক খাতও বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের কারণে চাপে পড়তে পারে। বিদেশি ক্রেতাদের ওপর এই বাড়তি খরচ চাপানো কঠিন হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।