বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ঋণ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী এবং করের আওতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। তিনি আরও জানান, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে বর্তমান সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং চলমান সংকট থেকে দেশকে বের করে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আজ (রোববার) পরিকল্পনা কমিশনে এনইসি সম্মেলনকক্ষে ন্যাশনাল মাল্টি স্টকহোল্ডার কন্সাল্টেশন অন বাংলাদেশ গ্রেডিশন রেটিনেস এসেসমেন্ট শীর্ষক সেমিনারের সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি চ্যালেঞ্জপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এ অবস্থায় দেশের অর্থনীতিকে সুশৃঙ্খল ও স্থিতিশীল করতে সুপরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে কিছু বড় প্রকল্প যথাযথ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি ছাড়া গ্রহণ করায় দেশের ওপর ঋণের চাপ বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে, যা অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। খন্দকার মুক্তাদির বলেন, ‘ইতোমধ্যে যে ঋণ নেওয়া হয়েছে, তা যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা এবং ভবিষ্যতে নতুন প্রকল্প গ্রহণে আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে বাস্তবসম্মত ও ফলপ্রসূ প্রকল্প নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ কর ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত সন্তোষজনক নয় এবং তা বাড়ানো প্রয়োজন। তবে হার বাড়ানোর পরিবর্তে করের আওতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তিনি বলেন, আমাদের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনও করের আওতার বাইরে রয়েছে। তাই করের হার বাড়ানো নয়, বরং করের আওতা বিস্তৃত করে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানোর মাধ্যমে বিদ্যমান ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং একই সঙ্গে উন্নয়ন কার্যক্রমকে টেকসই ধারায় এগিয়ে নিতে হবে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি; জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল এবং জাতিসংঘের ইউএন-ওএইচআরএলএলএসের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি রাবাব ফাতিমাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
মালয়েশিয়া থেকে ৩৪ হাজার টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রামের বন্দরে এসে পৌঁছেছে চীনের পতাকাবাহী ‘শান গ্যাং ফা জিয়ান’ নামের একটি জাহাজ। আজ (শনিবার) সকালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, জাহাজটি শুক্রবার দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে, বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়া চ্যানেলে পৌঁছেছে। জাহাজটি ২৯ মার্চ মালয়েশিয়া থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। এর স্থানীয় এজেন্ট প্রাইড শিপিং লাইনস। প্রাইড শিপিং লাইনসের ম্যানেজিং পার্টনার নজরুল ইসলাম জানান, জাহাজে ৩৪ হাজার টনের কিছু বেশি ডিজেল রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫-৬ হাজার টন ডিজেল বহির্নোঙরে ছোট জাহাজে খালাস (লাইটারিং) করতে হবে। এই কাজ শেষ করতে অন্তত দুই দফা অপারেশন প্রয়োজন। তিনি আরও জানান, সবকিছু ঠিক থাকলে রোববার জাহাজটি পতেঙ্গার ডলফিন জেটিতে ভিড়তে পারে। এর আগে, শুক্রবার দুপুর ২টায় সিঙ্গাপুর থেকে আসা ‘ইয়ান জিং হে’ নামের আরেকটি জাহাজ ২৭ হাজার ৩০০ টন ডিজেল নিয়ে পদ্মা অয়েলের ডলফিন জেটি-৬-এ খালাস কার্যক্রম শুরু করেছে। এটি রোববার বন্দর ত্যাগ করবে। জাহাজটির স্থানীয় এজেন্টও প্রাইড শিপিং। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানিয়েছেন, চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বার্থিং দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর এটি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানো দশম ডিজেল জাহাজ। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পাইপলাইনে থাকা সরবরাহের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প উৎস থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে ব্যাংকগুলোর অফিস এবং লেনদেনের নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকারের ঘোষিত পরিবর্তিত অফিস সময়সূচির সঙ্গে সমন্বয় করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। শনিবার (৪ এপ্রিল) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। রবিবার (৫ এপ্রিল) থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নতুন এই সময়সূচি অনুযায়ী দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। নতুন সময়সূচিতে যা থাকছে— কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, রবিবার থেকে ব্যাংকগুলোর লেনদেন ও অফিস কার্যক্রম নিচের সময়সূচি অনুসরণ করবে— বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়েছে, সমুদ্র, স্থল ও বিমানবন্দর এলাকায় (পোর্ট ও কাস্টমস এলাকা) অবস্থিত ব্যাংকের শাখা ও উপশাখাগুলো আগের নিয়মেই সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে। এ ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট জারি করা ‘ডিওএস সার্কুলার লেটার নং-২৪’ এর নির্দেশনা বহাল থাকবে। এ ছাড়া দেশের সরকারি-বেসরকারি সব অফিসেরও নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করেছে সরকার। রবিবার থেকে সরকারি-বেসরকারি সব অফিসের কার্যক্রম চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রাতে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সংবাদমাধ্যমকে এ তথ্য জানান মন্ত্রিপরিষদসচিব নাসিমুল গনি। তিনি বলেন, এখন থেকে দেশের সব শপিং মল-দোকানপাট সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। আর বিয়ে বা অন্য কোনো অনুষ্ঠানে আলোকসজ্জা না করতেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং বিশ্বের নৌবাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় দেশে দেশে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। এর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে খাদ্যমূল্যেও। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স গতকাল শুক্রবার এক প্রতিবেদনে বলেছে, জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় মার্চ মাসে বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম আগের মাসের তুলনায় ২.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য সূচক মার্চে ১২৮.৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যা ফেব্রুয়ারির সংশোধিত স্তরের তুলনায় ২.৪ শতাংশ বেশি। মূল্যবৃদ্ধির এই ধারা চলছে টানা দুই মাস ধরে। শস্য, মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য, ভোজ্যতেল, চিনিসহ সব প্রধান পণ্যের দামই এ সময় বেড়েছে। বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য সূচক অনুযায়ী, মার্চে খাদ্যশস্যের মূল্য সূচক মাসিক ভিত্তিতে ১.৫ শতাংশ বেড়ে ১১০.৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে এবং বার্ষিক ভিত্তিতে বেড়েছে ০.৬ শতাংশ। ভোজ্যতেলের দাম টানা তৃতীয় মাসের মতো বেড়েছে। এ পণ্যের মূল্য সূচক পৌঁছেছে ১৮৩.১ পয়েন্টে, যা গত ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৫.১ শতাংশ বেশি। আর বার্ষিক হিসাবে মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে ১৩.২ শতাংশ। এফএও জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে পাম তেলের দাম ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ের পর সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। পাম তেলের দাম এখন সয়াবিন তেলকেও ছাড়িয়ে গেছে, যার পেছনে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামের বৃদ্ধির বিষয়টি মূল ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে মাংসের মূল্য সূচক মার্চে গড়ে ১২৭.৭ পয়েন্ট হয়েছে, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় ১ শতাংশ এবং এক বছর আগের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি। দুগ্ধজাত পণ্যের মূল্য সূচক মাসে ১.২ শতাংশ বেড়ে ১২০.৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, তবে এটি ২০২৫ সালের মার্চের স্তরের চেয়ে ১৮.৭ শতাংশের নিচে রয়েছে। এফএওর প্রতিবেদনে বলা হয়, চিনি বা খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনে প্রধান কারণ ছিল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে বিশ্বের শীর্ষ চিনি রপ্তানিকারক দেশ ব্রাজিল হয়তো আখ থেকে চিনি তৈরির বদলে ইথানল উৎপাদনের দিকে ঝুঁকবে। সংস্থাটি বলছে, চিনির দামের ওপর বাড়তি চাপের আরেকটি কারণ হলো—মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ফলে বাণিজ্য প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা। এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো এক বিবৃতিতে বলেন, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। এখন তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে খাদ্যমূল্য দ্রুত বাড়ছে। তবে বৈশ্বিকভাবে পর্যাপ্ত শস্য মজুদ থাকায় পরিস্থিতি এখনো মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে আছে। তবে ম্যাক্সিমো তোরেরো সতর্ক করে বলেছেন, ইরান সংঘাত যদি ৪০ দিনের বেশি স্থায়ী হয় এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, তাহলে কৃষকরা উৎপাদনে বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারেন। তাঁরা চাষের পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারে কিংবা ফসল পরিবর্তন করতে পারেন। এদিকে ইরানের অবকাঠামোতে আরও জোরালো হামলার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রায় পাঁচ সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখনো পুরো অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করছে এবং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারেও প্রভাব ফেলছে। ফলে দ্রুত সমাধান খুঁজে বের করতে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে। সূত্র : রয়টার্স
বাংলাদেশে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪.৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গতকাল (বৃহস্পতিবার) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে এ চিত্র উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও জানায়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি ‘বিপিএম-৬’ অনুসারে, বাংলাদেশে বর্তমান রিজার্ভের পরিমাণ ২৯.৮১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
তদারকির অভাবে ঈদের পর থেকেই অস্থির হয়ে উঠছে ভোজ্যতেলের বাজার। সরকারকে চাপে ফেলে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম আরেক দফা বাড়াতে নতুন করে কারসাজি শুরু করেছে ৫ থেকে ৬টি কোম্পানির প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। রমজান মাসের শুরু থেকেই ওই চক্রটি পরিকল্পিতভাবে ডিলারদের মাধ্যমে খুচরা বাজারে তেলের সরবরাহ কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দিয়েছে। এতে রোজা শেষে ঈদের পর বাজারে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে বোতলজাত সয়াবিনে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে—মুদি দোকানগুলো দিনে ২০ কার্টন চাহিদা দিলেও সরবরাহ পাচ্ছে মাত্র ২ থেকে ৪ কার্টন। এ অবস্থায় চাহিদা বাড়ার সুযোগে খোলা সয়াবিন তেলের দামও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে লিটারে প্রায় ৩০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। গত বছরের ১০ নভেম্বর সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৯ টাকা বাড়ানোর অনুমতি চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। ২৪ নভেম্বর আবারও মূল্য সমন্বয়ের সুপারিশ করা হলেও সে সময় মন্ত্রণালয় সাড়া দেয়নি। এরপর ব্যবসায়ী সংগঠনটি অনুমতি ছাড়াই খুচরা পর্যায়ে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৯ টাকা বাড়িয়ে ১৯৮ টাকা নির্ধারণ করে। নতুন মূল্য উল্লেখ করে বাজারে তেল সরবরাহ করায় ভোক্তাদের বাধ্য হয়ে বাড়তি দামেই কিনতে হয়। তৎকালীন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং ব্যবসায়ীদের শোকজ করা হয়। পরে বৈঠকের মাধ্যমে লিটারে ৬ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। এতে আগের বাড়তি ৯ টাকা থেকে ৩ টাকা কমিয়ে নতুন দাম কার্যকর করা হয়। রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক ও দুই লিটারের বোতল সয়াবিন তেলের তীব্র সংকট রয়েছে। কোথাও কোথাও ৫ লিটারের বোতল সীমিত পরিমাণে পাওয়া গেলেও ছোট বোতল প্রায় নেই। ফলে অনেক ক্রেতাই বাধ্য হয়ে খোলা তেলের দিকে ঝুঁকছেন, যা লিটারপ্রতি ২০৫ থেকে ২০৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে—সরকার নির্ধারিত ১৭৬ টাকার তুলনায় অনেক বেশি। মুদি ব্যবসায়ীরা জানান, রমজানের শুরু থেকেই কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। তাদের দাবি, ডিলারদের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে এই সংকট তৈরি করা হয়েছে, যাতে বাজারে চাপ সৃষ্টি করে নতুন করে দাম বাড়ানো যায়। অন্যদিকে ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ বলছে, পরিবহন সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানিকারক দেশগুলোর নীতিগত পরিবর্তনের কারণেও সরবরাহে প্রভাব পড়ছে। ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টদের মতে, তদারকির দুর্বলতার সুযোগেই বাজারে এমন কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। তারা মনে করেন, শক্ত নজরদারি না থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে তেলের সরবরাহ লাইন কিছুটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় সরকার বিকল্প উৎসের সন্ধান করছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং কাজাখস্তান থেকে তেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নাসিমুল গনি বলেন, সরকার সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখছে এবং এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ৯টায় জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক শুরু হয়। রাত প্রায় পৌনে ১১টা পর্যন্ত প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলে এই বৈঠক। পরে সেখানে ব্রিফিংয়ে বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, বৈঠকটি বিশেষ পরিস্থিতিতে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টা কাজ করছেন এবং যাতায়াতের সময় বাঁচাতে ও যানজট এড়াতে এখানেই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অফিস-আদালতের সময় এক ঘন্টা কমিয়ে এনেছে সরকার। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকাল নয়টা থেকে বিকেলে পাঁচটার পরিবর্তে অফিস চলবে চারটা পর্যন্ত। এ ছাড়া দেশের সব দোকানপাট, বাণিজ্য বিতান ও শপিং মল সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে বন্ধ থাকবে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাসের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। ব্যাংকগুলো চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত, তবে আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করতে বিকেল ৪টায় ব্যাংক বন্ধ হবে। তবে কাঁচাবাজার, ওষুধের দোকান এবং খাবারের দোকানের মতো জরুরি সেবাগুলো এই নির্দেশনার আওতামুক্ত থাকবে।
কাজাখস্তান থেকে ১ লাখ টন তেল কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের (অপারেশন অনুবিভাগ) যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী। বুধবার (১ এপ্রিল) এ তথ্য জানান তিনি। মনির হোসেন চৌধুরী জানান, বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি তেল কেনার প্রস্তাব পাচ্ছি। কাজাখস্তান থেকে ১ লাখ টন জ্বালানি তেল কেনার প্রস্তাব পেয়েছি। এর পুরোটাই ইএন৫৯০-১০ পিপিএম সালফার মানমাত্রার ডিজেল। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এ তেল কেনা হবে। তিনি বলেন, প্রতি ব্যারেল ডিজেল ৭৬ ডলারে কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সস্তায় পেলে কিনতে অসুবিধা নেই। সচিব বলেন, শুধু প্রস্তাব পেলেই হবে না। প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করে সরবরাহ নিশ্চিতের বিষয় আছে।
ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে পারে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর এমন ইঙ্গিতের পর বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে উত্থানের আভাস দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রেকর্ড চাঙ্গাভাবের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে এশিয়াতেও। বুধবার (১ এপ্রিল) লেনদেনের শুরুতেই এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় বলে জানিয়েছে The Guardian। এদিন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান সূচক কসপি এক ধাক্কায় ৬ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক বেড়েছে প্রায় ৪ শতাংশ। তাইওয়ানের তাইএক্স সূচকও ৪ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। এছাড়া হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক ১ দশমিক ৯ শতাংশ এবং চীনের সাংহাই কম্পোজিট ইনডেক্স ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধান সূচকেও দেখা গেছে ১ দশমিক ৭ শতাংশ উত্থান। বিশ্লেষকদের মতে, এই চাঙ্গাভাবের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য। তিনি জানিয়েছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হতে পারে। যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমনের এমন ইঙ্গিত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। এর আগেই যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার গত এক বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী দিন পার করেছে, যার ইতিবাচক প্রভাব এখন এশিয়ার বাজারগুলোতেও প্রতিফলিত হচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি সত্যিই যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটে, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের বাজারেও অস্থিরতা কমে আসতে পারে, যা বিশ্ববাজারে আরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশ গত দুই দশকে উচ্চ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, বিপুল রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং তরুণ কর্মশক্তির কারণে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান নীতির ধারাবাহিকতা থাকলে দেশটির অর্থনীতি মাঝারি মানের প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে পারবে। তবে অতিমাত্রায় তৈরি পোশাক নির্ভরতা পরিবর্তনশীল বিশ্বে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক জার্নালের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এসব কথা বলা হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ অ্যাস এ ফ্রান্টিয়াল মার্কেট : গ্রোথ, ইনফ্রাস্ট্র্যাকচার, গ্যাপস অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট রিস্কস’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের উন্নয়নে জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৭ কোটির বেশি জনসংখ্যার এই দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি, যা রপ্তানিমুখী খাতে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা এনে দিয়েছে। তবে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৬০.৯ শতাংশ থেকে ৫৮.৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যার প্রধান কারণ নারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়া। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪.৮ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬.৩ শতাংশ হতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলেছে, আর্থিক ও রাজস্ব স্থিতিশীলতা নীতির ওপর নির্ভর করে ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪.৭ শতাংশ অর্জিত হবে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে তৈরি পোশাক রপ্তানির মোট মূল্য প্রায় ৩৮.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যার মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র যথাক্রমে প্রায় ৫০ শতাংশ ও ১৮.৭২ শতাংশ অংশ দখল করে। যুক্তরাজ্য ও কানাডা মিলিয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ এবং জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও তুরস্কসহ অপ্রচলিত বাজারগুলো প্রায় ১৬ শতাংশ রপ্তানি আয়ের উৎস। গত দুই দশকে পোশাক রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০১৬ সালের ২৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫ সালে প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ পোশাক খাত থেকে আসে, যা একটি একক খাতের ওপর কাঠামোগত নির্ভরতা নির্দেশ করে। সেই সঙ্গে প্রবাস আয়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থিতিশীলতার উপাদান হিসেবে কাজ করছে। যদিও উচ্চমূল্যের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে বাংলাদেশ এখনো কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আইএমএফের মতে, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি এবং জটিল বিধি-নিষেধ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও ঋণ পরিবেশকে প্রভাবিত করছে। তাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) উন্নয়ন, চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি এবং বৈশ্বিক শুল্ক সংস্কার বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে, বিশেষত পোশাক খাতে নির্ভরতার কারণে। ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি ৪৮.২৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যার ৮০ শতাংশের বেশি আসে পোশাক খাত থেকে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার, যেখানে প্রায় ১৮ শতাংশ পোশাক রপ্তানি যায়। এই নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ শৃঙ্খলার নিয়ম-কানুন, শ্রমমান তদারকি এবং সম্ভাব্য শুল্ক পরিবর্তন বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করছে। যদিও উৎপাদন খরচ কম, তবে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পায় না এবং প্রায় ১৯ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়, যা লাভের মার্জিন কমায়। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের ফলে বাণিজ্য সুবিধা হারানোর ঝুঁকিতেও রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, এই সুবিধা কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যেতে পারে। তাই শ্রম, পরিবেশ ও পণ্যের মান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঝুঁকি কমাতে চামড়া, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল খাতসহ উচ্চমূল্যের পণ্যে বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন। উচ্চ প্রবৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিভিন্ন কাঠামোগত ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। আইএমএফের মতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মুদ্রাস্ফীতি ৯-১০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে, যা ব্যবসার খরচ বাড়ায় এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০২৫ সালে রাজস্ব ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের নিচে থাকবে, যা অবকাঠামো উন্নয়নে সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। রপ্তানি খাতের ৮০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাকনির্ভর হওয়ায় এটি বড় ঝুঁকি তৈরি করে, কারণ বৈশ্বিক চাহিদা বা নীতির পরিবর্তনে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ ঝুঁকি কমাতে উচ্চমূল্যের পোশাক, চামড়া, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, ফার্মাসিউটিক্যাল ও আইসিটি খাত উন্নয়ন জরুরি। অবকাঠামো ও লজিস্টিক সমস্যাও বিনিয়োগের দক্ষতা কমায়। বন্দর জট, পরিবহন বিলম্ব ইত্যাদি রপ্তানি ব্যয় বাড়ায়। যদিও গভীর সমুদ্রবন্দর ও রেল উন্নয়ন প্রকল্প চলছে, তবে বাস্তবায়নে বিলম্ব ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা বড় বাধা। এলডিসি উত্তরণের ফলে উচ্চ শুল্ক ও কঠোর মানদণ্ডের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
নতুন পে স্কেল নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে বর্তমান সরকারের নিজস্ব কমিশন গঠন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত পে কমিশনের রিপোর্টকে সরাসরি গ্রহণ না করা উচিত। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সকালে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) কার্যালয়ে ‘বাজেট ঘিরে নাগরিক ভাবনা ও প্রত্যাশা’ শীর্ষক প্রাক্-বাজেট মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি। ড. দেবপ্রিয় বলেন, বিগত সরকার তাদের মেয়াদের শেষ সময়ে পে স্কেল সংক্রান্ত যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তমান সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে এক ধরনের ‘প্রলম্বিত দায়’ তৈরি হয়েছে। নতুন সরকারের ওই উদ্যোগটি নিজস্বভাবে শুরু করা উচিত বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেছেন, ‘এই সরকারের নিজের মতো কমিশন গঠন করে এটাকে বিবেচনা করা উচিত। যেখানে আগের সরকারের পে কমিশনের রিপোর্টটি একটা উপাদান হিসাবে বিবেচনা করতে পারে। প্রশ্মহীনভাবে এটাকে বিবেচনা করার সুযোগ উনাদের নেই।’ রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে পারলে রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রাজনৈতিক শক্তি না থাকায় এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়নি। তবে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের জন্য প্রথম বছরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘চুরি করা টাকা ফেরত আনতে হবে। দেশের ভেতরে ও বাইরে যেসব সম্পদ জব্দ করা হয়েছে, সেগুলো দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় বিক্রি করে অর্থ দেশে আনতে হবে।’
দেশের বাজারে আবারও স্বর্ণের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) মূল্য বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এবার ভরিতে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭১১ টাকা নির্ধারণ করেছে সংগঠনটি। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সকালে এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে বাজুস। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) মূল্য বেড়েছে। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন এ দাম আজ সকাল ১০টা থেকেই কার্যকর হবে। দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭১০ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৭১ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ২১২ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে গত শনিবার (২৮ মার্চ) বিকেলে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছিল বাজুস। তখন ভরিতে ৪ হাজার ৪৩৩ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করেছে ২ লাখ ৪১ হাজার ৪৪৫ টাকা নির্ধারণ করেছে সংগঠনটি। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৩০ হাজার ৪২২ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৩০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৬০ হাজার ৮৪৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
দেশজুড়ে অবৈধ জ্বালানি মজুতের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে গত ৩ মার্চ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত ২৬ দিনে মোট ২ লাখ ৮ হাজার ৬৫০ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। সোমবার (৩০ মার্চ) এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য নিশ্চিত করেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী। তিনি জানান, অভিযানের অংশ হিসেবে সারাদেশে মোট ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এতে ১ হাজার ৫৩টি মামলা দায়ের করা হয় এবং ১৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উদ্ধারকৃত জ্বালানির মধ্যে ডিজেলের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি—প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯৬৫ লিটার। এছাড়া ২২ হাজার ৫৩৯ লিটার অকটেন এবং ৪৬ হাজার ১৪৬ লিটার পেট্রোল উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযান চলাকালে অবৈধ মজুতের সঙ্গে জড়িতদের কাছ থেকে মোট ৭৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। সরকার জানিয়েছে, জ্বালানি খাতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে অবৈধ মজুত ও পাচারকারীদের তথ্য দিলে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কারের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তদারকি জোরদারে দেশের প্রতিটি জেলায় বিশেষ ভিজিলেন্স টিম গঠন করা হয়েছে এবং জনগণের সুবিধার্থে তাদের মোবাইল নম্বর প্রকাশ করা হয়েছে। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পাশাপাশি পেট্রোল পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ এবং জ্বালানি ডিপোর নিরাপত্তায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।
দেশের ইতিহাসে একক মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে চলতি মার্চে। মাস শেষ না হতেই প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার, যা নতুন রেকর্ড। এর আগে একক মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল ২০২৫ সালের মার্চে; ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার। সোমবার (৩০ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য জানিয়েছেন। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, পবিত্র রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে পরিবারের বাড়তি খরচ মেটাতে প্রবাসীরা বেশি অর্থ পাঠিয়েছেন। ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ভালো প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসের প্রথম ২৯ দিনে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩৪৯ কোটি মার্কিন ডলার। বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২২ টাকা) অনুযায়ী, এর পরিমাণ প্রায় ৪২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি। এটিই দেশের ইতিহাসে একক মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছিলেন ৩০২ কোটি বা ৩ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের ফেব্রুয়ারির তুলনায় এ বছর একই মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে রেমিট্যান্স ছিল ২৫২ কোটি ডলার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত দেশে এসেছে মোট ২ হাজার ৫৯৪ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ২ হাজার ১৭৪ কোটি ডলার। এদিকে প্রবাসী আয় বাড়ায়, বিভিন্ন আমদানির দায় পরিশোধের পরও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে। সোমবার (৩০ মার্চ) দিন শেষে মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-এর বিপিএম–৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে রিজার্ভের পরিমাণ ২৯ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশের প্রথম অরেঞ্জ বন্ড হিসেবে সাজিদা ফাউন্ডেশনের ১৮৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার কর্পোরেট বন্ড ইস্যুর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সোমবার (৩০ মার্চ) বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১০০৬তম জরুরি কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সভা শেষে বিএসইসির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত বন্ডটি নন-কনভার্টিবল, ফুললি রিডিমেবল, আনসিকিউরড এবং অরেঞ্জ জিরো-কুপন বৈশিষ্ট্যের। বন্ডটির মেয়াদ হবে ২ থেকে ৩ বছর এবং এর ডিসকাউন্ট রেট নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ শতাংশ থেকে ১১.৫০ শতাংশের মধ্যে। প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে ইস্যুর অনুমোদন পাওয়া এই বন্ডে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিরা বিনিয়োগ করতে পারবেন। বন্ডটির প্রতি ইউনিটের অভিহিত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৩ টাকা। সংস্থাটি জানায়, এই বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ সাজিদা ফাউন্ডেশন তাদের মাইক্রোফাইন্যান্স কার্যক্রমের পোর্টফোলিও শক্তিশালী ও সম্প্রসারণে ব্যবহার করবে। পাশাপাশি এ অর্থ বিশেষভাবে দেশের নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে বিনিয়োগে ব্যয় করা হবে। এছাড়া বন্ডের অর্থ পরিবেশ ও সামাজিক মানদণ্ড মেনে ব্যবহার করা হবে—এ মর্মে ইমপেক্ট ইনভেসমেন্ট এক্সচেঞ্জ (আইআইএক্স) থেকে সেকেন্ড পার্টি অপিনিয়ন (এসপিও) নেওয়া হয়েছে। এই বন্ডের ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসি এবং অ্যারেঞ্জার হিসেবে কাজ করবে ব্র্যাক ইপিএল ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। বন্ডটি শেয়ারবাজারে লেনদেনের জন্য অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ডে (এটিবি) তালিকাভুক্ত হওয়ার শর্তে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর আবারও ‘জিরো ওয়েটিং টাইম’ অর্জন করেছে। এখন আর কোনো জাহাজকে বহির্নোঙরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। জাহাজগুলোকে বহির্নোঙরে অপেক্ষা করতে না হওয়ায়, এখন জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম কমেছে ও আমদানি-রপ্তানির গতিও বেড়েছে এবং ব্যবসায়ীদের সময় ও খরচ কমেছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্দরে জাহাজ জট তো নেই-ই, এখন কোনো জাহাজকে জেটিতে বার্থিং পেতে ১৫-২০ দিন বহির্নোঙরে (জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম) বসে থাকতে হচ্ছে না। দিনে দিনেই মিলছে বার্থিং। বহির্নোঙরে এখন জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় শূন্য। সব জাহাজ সরাসরি বন্দরে প্রবেশ করছে বলে জানায় বন্দর কর্তৃপক্ষ। সোমবার (৩০ মার্চ) চট্টগ্রাম বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, এই অর্জন দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার বড় প্রমাণ। এতে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও শক্তিশালী হচ্ছে এবং তৈরি হচ্ছে আরও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। তিনি আরও বলেন, সমন্বিত পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারের সহযোগিতাতেই এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে। আর এর ফলে জাহাজ দ্রুত খালাস ও লোডিং করতে পারছে, টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কমেছে ও পণ্য সরবরাহও আরও দ্রুত হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, এই অর্জনের ফলে ব্যবসায়িক ব্যয় কমছে, সরবরাহ ব্যবস্থা আরও নির্ভরযোগ্য হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের সক্ষমতা দৃশ্যমান হচ্ছে। তারা আরও জানায়, সমন্বিত পরিকল্পনা, নিবিড় তদারকি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের মাধ্যমে এই সাফল্য এসেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ আশা করছে যে এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে, ‘জিরো ওয়েটিং টাইম’ ভবিষ্যতে স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হবে এবং দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমও আরও গতিশীল হবে। এর আগে, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রথমবার জিরো ওয়েটিং টাইম অর্জন করে চট্টগ্রাম বন্দর। এরপর অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ধারাবাহিকভাবে এ অবস্থা বজায় ছিল। তবে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শেষ ভাগ থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে কর্মবিরতি ও কিছু জটিলতায় কার্যক্রমে ছন্দপতন ঘটে। পরবর্তী সময়ে পূর্ণোদ্যমে কার্যক্রম চালু হওয়ায় আবারও বহির্নোঙরে জাহাজের অপেক্ষার সময় শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, ঈদের ছুটির সময়ও বন্দরে ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম চালু রাখা হয়। তিনি আরও বলেন, ঈদের আগে জাহাজের অপেক্ষার সময় ৩ থেকে ৫ দিনে উঠলেও কর্তৃপক্ষের বাড়তি নজরদারি ও সমন্বয়ের ফলে আউটার অ্যাংকরেজে অপেক্ষার সময় আবার শূন্যে নেমে আসে। এতে জাহাজ দ্রুত পণ্য ওঠানামা করে বন্দর ত্যাগ করতে পারছে বলে জানান বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব। সৈয়দ রেফায়েত হামিম আরও বলেন, এতে শিপিং কোম্পানির সময় ও খরচ কমছে। আমদানিকারকেরা দ্রুত পণ্য পাচ্ছেন এবং রপ্তানিকারকেরা সময়মতো পণ্য পাঠাতে পারছেন। তিনি বলেন, লজিস্টিকস খরচ কমায় পণ্যের বাজার মূল্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে, যার সুফল পাচ্ছেন ভোক্তারা। বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব আরও বলেন, মূলত রমজান মাসের শুরু থেকেই সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ওয়েটিং টাইম শূন্যে রাখতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঈদের ছুটিতেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রোস্টার ডিউটির মাধ্যমে কার্যক্রম চালু রাখা হয় বলে জানান তিনি।
ক্যামেরুনের ইয়াউন্দেতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ১৪তম মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন (এমসি১৪)-এর সাইডলাইনে গতকাল (রোববার) বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারে বৈঠক হয়েছে। প্যালেস দে কংগ্রেসে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং নিউজিল্যান্ডের ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট মন্ত্রী টড ম্যাকক্লে অংশ নেন। এ সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমানসহ উভয় দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে নিউজিল্যান্ডের মন্ত্রী ও তার প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানিয়ে দু’দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি নবনির্বাচিত সরকারের লক্ষ্য তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশ বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে চায় এবং বাণিজ্যভিত্তিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নে কাজ করছে। মন্ত্রী আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট আরসিইপি (আরসিইপি)-এ যোগদানের বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা উল্লেখ করেন এবং এক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন কামনা করেন। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের ভূ-অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী এ জোটে দেশটির অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি আরও জানান, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে বাজার বহুমুখীকরণের কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষর করেছে এবং কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে আলোচনা চলছে। নিউজিল্যান্ডের মন্ত্রী টড ম্যাকক্লে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রশংসা করে বলেন, আরসিইপি জোটে বাংলাদেশ একটি উপযুক্ত অংশীদার হতে পারে। তিনি এ জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির জন্য অন্যান্য সদস্য দেশের সঙ্গে সমন্বয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে একটি দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) আলোচনার প্রস্তাব দেন। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক বার্তা পৌঁছানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী নিউজিল্যান্ডের মন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। জবাবে টড ম্যাকক্লে আমন্ত্রণ গ্রহণ করে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ সফরের আগ্রহ প্রকাশ করেন। বৈঠক শেষে উভয় পক্ষ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নতুন অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র অনুসন্ধানে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
মালয়েশিয়া থেকে ২৭ হাজার ৩০০ টন পরিশোধিত ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসছে ট্যাংকার ‘পিভিটি সোলানা’। আজ সোমবার (৩০ মার্চ) চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আসার কথা রয়েছে। পরে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করে আগামীকাল মঙ্গলবার বন্দরের ডলফিন জেটিতে জাহাজটি বার্থিং করার পরিকল্পনা আছে। আজ চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, মালয়েশিয়া থেকে ২৭ হাজার ৩০০ টন ডিজেল নিয়ে ‘পিভিটি সোলানা’ নামের একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর অভিমুখে আসছে। তিনি জানান, চলমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও দৃশ্যমান। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জ্বালানিবাহী জাহাজ খালাসকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, শুধু সমুদ্রপথেই নয়, ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড (এনআরএল) থেকেও পাইপলাইনের মাধ্যমে ইতিমধ্যে ৭ হাজার টন ডিজেল দেশে এসে পৌঁছেছে। তবে ৩১ মার্চ ভারত থেকে আরও একটি পার্সেল আসার কথা থাকলেও অফিশিয়াল প্রক্রিয়াগত কারণে সেই জ্বালানি তেল আসবে আরও কয়েকদিন পর। চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, ‘গত ৩ থেকে আজ ৩০ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে এলএনজি, এলপিজি, ক্রুড অয়েল, গ্যাস অয়েল, বেস অয়েলসহ বিভিন্ন জ্বালানি নিয়ে ৩৩টি জাহাজ এসেছে। আজ পিভিটি সোলানা আসার কথা রয়েছে। আগামী ৪ এপ্রিল এলএনজি নিয়ে আরেকটি জাহাজ আসবে। এর আগে, গত ২৬ মার্চ ৩১ হাজার টন পরিশোধিত ডিজেল নিয়ে আসা একটি জাহাজ খালাস করে ইতোমধ্যে বন্দর ত্যাগ করেছে। বন্দরের সচিব বলেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা অগ্রাধিকারভিত্তিতে তেলবাহী জাহাজ ভেড়ানো ও দ্রুত পণ্য খালাসে সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছি। বিপিসি ও বন্দর কর্তৃপক্ষের এই তৎপরতাকে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ডিজেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখার একটি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, নতুন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও গ্রামীণ অবকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করা এবং গ্রামীণ জনগণের জীবনমান উন্নয়নকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তিনি আজ সংসদে সরকারি দলের সংসদ সদস্য মো. আখতারুজ্জামান মিয়ার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন। তিনি জানান, পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া ৫০০টিরও বেশি প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ১০ শতাংশেরও কম এবং প্রায় ১ হাজার ৩০০টি প্রকল্প বর্তমানে পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে; যেখানে অপচয় ও দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তিনি বলেন, এ তথ্য সরকারি নথির ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং যেহেতু প্রকল্পগুলো পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া, তাই এ বিষয়ে মন্তব্য করার সুযোগ সীমিত। তবে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বর্তমান সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় নেওয়া প্রকল্পগুলো গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করা এবং গ্রামীণ জনগণের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, 'আমরা যদি গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে চাই এবং গ্রামীণ জনগণের জীবনমান উন্নয়ন করতে চাই, তাহলে প্রথম অগ্রাধিকার হতে হবে গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন।' খসরু বলেন, সরকার বাস্তবমুখী ও জনবান্ধব প্রকল্প গ্রহণে কাজ করছে; যা সরাসরি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উপকারে আসবে এবং দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে। তিনি আরও বলেন, সংসদ সদস্যরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে উন্নয়ন প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারেন এবং কোনো প্রকল্প স্থানীয় জীবনমান উন্নয়ন ও জীবিকা বৃদ্ধির জন্য উপযোগী ও কার্যকর হলে তা ভবিষ্যতে বাস্তবায়নের জন্য বিবেচনা করা হবে। মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, কার্যকর প্রকল্প বাস্তবায়ন ও গ্রামীণ উন্নয়ন উদ্যোগের মাধ্যমে আগামী দিনগুলোতে আরও ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক সংবাদ দেওয়া সম্ভব হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বহির্বিশ্বের সঙ্গে দেশের লেনদেনের ভারসাম্যে (বিওপি) সমর্থন দিতে ২০০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। আইএমএফ এবং অন্যান্য কয়েকটি উৎস থেকে এই ঋণ নেওয়ার প্রাথমিক আলোচনা চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান আজ রোববার অর্থনীতি বিষয়ক সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এক প্রশ্নের উত্তরে ওই তথ্য দেন। তবে তিনি বলেন, সতর্কতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশ যাতে এই অবস্থায় ভালো থাকে, সেই চেষ্টা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করছে এবং সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছে। বিভিন্ন প্রাক্কলনের ভিত্তিতে নানা বিষয় আলোচনা হচ্ছে। সব কিছুই যে সিদ্ধান্ত আকারে আসবে, তাও নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এই সভায় জ্বালানি তেলের বাড়তি দর এবং সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে গভর্নর বলেন, এই মুহূর্তে দ্রুত সমাধান নেই। প্রথমত– জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার। দ্বিতীয়ত– খরচ যতটুকু সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রেখে মূল্যস্ফীতি সামাল দেওয়া দরকার। সরকারের চেষ্টা আছে, দ্বিপক্ষীয় কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে কিছু করা যায় কিনা। সরকার নানা উৎস থেকে জ্বালানি নেয়। কোন জায়গা থেকে কি সুবিধা পাওয়া যায় সরকার দেখছে। তিনি বলেন, সরকারকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জানানো হচ্ছে, জ্বালানি তেলের মূল্য কতটুকু বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কেমন প্রভাব পড়বে। প্রভাব অবশ্যই পড়বে। জ্বালানি আমদানির জন্য যাদের সঙ্গে স্থির মূল্যে চুক্তি আছে, সেখানে হয়তো সমস্যা হবে না। প্রসঙ্গত, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় অতিরিক্ত অর্থের যোগান পেতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের আইএমএফ সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে গত সপ্তাহে জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি। পরে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের জুনে ৮০ কোটি ডলার বাড়িয়ে এ কর্মসূচির আকার ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। বাকি রয়েছে ১৮৬ কোটি ডলার। আগামী জুলাই মাসে ষষ্ঠ ও সপ্তম কিস্তির অর্থ একসঙ্গে প্রায় ১৩০ কোটি ডলার ছাড় পেতে পারে বাংলাদেশ। আজকের আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আরও বলেন, তার কাছে সব সময় মনে হয়েছে, আর্থিক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকা উচিত নয়। তিনি চেষ্টা করছেন, কোনো ধরণের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ যাতে আর্থিক খাতে না আসে। পাচার করা অর্থ উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রায়ই এ বিষয়ে বৈঠক করছি। অবশ্য চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারের সাফল্যের বৈশ্বিক হার খুব সামান্য। তারপরও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমরা এ বিষয়ে বাইরের যে এজেন্সির মাধ্যমে কাজ করছি, তার সঙ্গে অধিকাংশ ব্যাংকের চুক্তি হয়ে গেছে। মূলত ব্যাংকের যেসব অর্থ পাচার হয়েছে, সেগুলো আদায়ের জন্য এই প্রচেষ্টা। গভর্নর বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করার মাধ্যমে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানো সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমানের অন্যতম নীতি। এ জন্য কৃষি ও এসএমএই খাতে গুরুত্ব বাড়ানো হচ্ছে। এছাড়া আগে থাকা বন্ধ এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বন্ধ ফ্যাক্টরির জায়গাগুলোতে উৎপাদন শুরু করতে সহায়তা দেওয়া অন্যতম অগ্রাধিকার। মত বিনিময় সভায় আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার, ড. হাবিবুর রহমান, জাকির হোসেন চৌধুরী, ড. কবির আহমেদ এবং মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে এই সংস্কার যেন সংস্থাটির মৌলিক নীতিমালাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। গতকাল ক্যামেরুনের ইয়াউন্দেতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ১৪তম মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন (এমসি-১৪)-এ বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ করণীয় শীর্ষক সেশনে তিনি একথা বলেন। ‘ডব্লিউটিও রিফর্ম: ফান্ডামেন্টাল ইস্যুস’ শীর্ষক এ অধিবেশনে খন্দকার মুক্তাদির বলেন, ডব্লিউটিও-এর মূল ভিত্তি হলো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যনির্ভর উন্নয়নকে উৎসাহিত করা। বৈষম্যহীনতা ও অন্তর্ভুক্তির নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ঐকমত্যভিত্তিক ও নিয়মভিত্তিক এই বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থা উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহের পাশাপাশি স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা নিশ্চিত করেছে। তিনি বলেন, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট এবং কোভিড-১৯ মহামারির সময় ছাড়া গত তিন দশকে উন্নত দেশগুলোর মধ্যম আয় ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিদ্যমান বাণিজ্য ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রমাণ করে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এই সংস্কার যেন সংস্থাটির মৌলিক নীতিমালাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘ সময় ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে গড়ে ওঠা বর্তমান কাঠামো সংস্কারের নামে নষ্ট করা উচিত নয়, কারণ বিশ্বের অধিকাংশ অর্থনীতি এই নিয়মভিত্তিক বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সংস্কার প্রক্রিয়া অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে। যাতে ব্যবস্থার অখণ্ডতা বজায় থাকে, পূর্বের অর্জনগুলো অক্ষুণ্ন থাকে এবং সকল সদস্য দেশের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উন্নয়নমুখী ফলাফল নিশ্চিত করা যায়। উল্লেখ্য, মিনিস্ট্রিয়াল কনফারেন্সে সদস্য দেশসমূহ বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। এবারের সম্মেলনে ১৬৬টি সদস্য দেশের বাণিজ্যমন্ত্রী ও প্রতিনিধিগণ অংশ নিয়েছেন। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে। প্রতিনিধিদলে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানসহ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জেনেভাস্থ বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ অংশ নিচ্ছেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।