ঢাকার শিল্পাঞ্চলে তীব্র গ্যাস সংকটের স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে ভোলার গ্যাস এলএনজি করে সরবরাহ করার কথা ভাবছে সরকার। দীর্ঘ মেয়াদে পাইপলাইন করে বরিশাল হয়ে ঢাকা বা খুলনা অঞ্চলে সরবরাহের পরিকল্পনাও রয়েছে। এলএনজি ও পাইপলাইন পদ্ধতিতে সরবরাহের বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করবে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি (জিটিসিএল)। মঙ্গলবার এক বৈঠকে জিটিসএলকে দায়িত্ব দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
দ্বীপজেলা ভোলায় রয়েছে তিনটি গ্যাসক্ষেত্র। এর মধ্যে ৯টি কূপ খনন করা হয়েছে। দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ১৯ কোটি ঘনফুট থাকলেও চাহিদা না থাকায় উত্তোলন করা হয় ৭ থেকে ৮ কোটি ঘনফুট। এখানে আরও ১৫টি কূপ খননের লক্ষ্যে কাজ করছে পেট্রোবাংলা। প্রস্তাবিত কূপগুলোর খনন শেষ হলে দৈনিক উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ কোটি ঘনফুট বাড়তে পারে। বর্তমানে ভোলায় গ্যাসের মজুত রয়েছে প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। এই মজুত আরও বাড়তে পারে। ফলে দেশের চলমান গ্যাস সংকটের সমাধান হিসেবে ভোলার গ্যাস কয়েক বছর ধরে আলোচনায় রয়েছে। এই গ্যাস কীভাবে দেশের মূল গ্রিডে আনা হবে, তা নিয়েই চলছে টানাপোড়েন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সীমিত আকারে সিএনজিতে রূপান্তর করে ঢাকায় সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই প্রচেষ্টা খুব বেশি এগোয়নি।
একদিকে এলএনজি আকারে গ্যাস পরিবহন, অন্যদিকে পাইপলাইনের দুটি রুট এখন আলোচনার টেবিলে। স্বল্প মেয়াদে এলএনজি আকারে গ্যাস আনার বিষয় সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। তবে দাম বেশি হওয়ায় এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ কম।
পাইপলাইন নিয়ে দুটি মত রয়েছে। একটি বরিশাল হয়ে সরাসরি ঢাকার আমিন বাজারে আসবে। অন্যটি বরিশাল হয়ে খুলনা যাবে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই ভোলা থেকে বরিশাল পর্যন্ত পাইপলাইনের সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়। সে সময় বরিশাল থেকে খুলনার চেয়ে ঢাকার গ্যাস নেওয়ার বিষয়ে বেশি জোর ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এলএনজির পাশাপাশি ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইনে আনার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর খুলনার রুটটি ফের আলোচনায়। এখন খুলনা হয়ে যশোর পর্যন্ত পাইপলাইন নেওয়ার কথাও ভাবা হয়েছে। তবে শিল্প মালিকদের দাবি, সবচেয়ে তীব্র গ্যাস সংকট যেহেতু ঢাকা-গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে, তাই ভোলার গ্যাসের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত শিল্পাঞ্চলের জন্য।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেনের মতে, ভোলার গ্যাস এখন শুধু একটি জেলার সম্পদ নয়। এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভরসা। তবে এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। স্বল্প মেয়াদে এলএনজি পরিবহন কিছুটা স্বস্তি দিতে পারলেও দীর্ঘ মেয়াদে পাইপলাইন, স্থানীয় শিল্পায়ন এবং নতুন অনুসন্ধান– এই তিনটি উদ্যোগকে সমন্বয় করেই এগোনো উচিত।
এ ব্যাপারে পেট্রোবাংলার পরিচালক (পরিকল্পনা) আব্দুল মান্নান পাটওয়ারী সমকালকে বলেন, ভোলার গ্যাস কীভাবে কাজে লাগানো যায় তার নানা উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে মঙ্গলবারের বৈঠকে।
এলএনজি ও পাইপলাইনে গ্যাস আনার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্প-কারখানার মাধ্যমে বাড়তি গ্যাসকে কাজে লাগানো যায় কিনা, পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। কোনো আলোচনাই এখনও চূড়ান্ত নয়। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
ভোলার গুরুত্ব
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, কিন্তু সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২৬০-২৬৫ কোটি ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকছে। যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিল্প উৎপাদনে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদনও দিন দিন কমছে।
এক সময় দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুটে। দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার উৎপাদনও দ্রুত কমছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে প্রতিদিন ১৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত, এখন তা ৮০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে।
খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের গ্যাস সংকট এখন আর শুধু জ্বালানি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ, বিনিয়োগ ও অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। একদিকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে, অন্যদিকে এলএনজি আমদানিও চাহিদা অনুযায়ী বাড়ানো যাচ্ছে না। নতুন টার্মিনাল ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা থাকায় গ্যাসের ঘাটতি বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ভোলার গ্যাস একটি বড় সমাধান হতে পারে।
১৯৯৫ সালে বাপেক্স ভোলার শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে এবং ২০০৯ সালে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। পরবর্তীকালে ভোলা নর্থ ও ইলিশা নামে আরও গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়।
সাম্প্রতিক থ্রিডি সিসমিক জরিপে শাহবাজপুর থেকে ইলিশা পর্যন্ত প্রায় ৬০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ২ দশমিক ৪২৩ টিসিএফ উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের সম্ভাবনা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া চরফ্যাসন এলাকায় টুডি জরিপে আরও ২ দশমিক ৬৮৬ টিসিএফ গ্যাসের সম্ভাবনার তথ্য মিলেছে। বিভিন্ন মূল্যায়নে ভোলার সম্ভাব্য মজুত পাঁচ থেকে আট টিসিএফ পর্যন্ত হতে পারে।
ব্যর্থ সিএনজি, ব্যয়বহুল এলএনজি
আওয়ামী লীগ সরকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইন্ট্রাকোকে সিএনজি আকারে ভোলার গ্যাস ঢাকায় আনার অনুমতি দেয়। প্রথমে দৈনিক ৫০ লাখ ঘনফুট এবং পরে আড়াই কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল। বাস্তবে দিনে সর্বোচ্চ ৮ থেকে ৯ লাখ ঘনফুট গ্যাস পরিবহন সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে সরবরাহ আরও কমেছে। অতিরিক্ত ব্যয়, পরিবহন জটিলতা ও সীমিত সক্ষমতার কারণে প্রকল্পটি কার্যত ব্যর্থ হয়েছে।
এই অবস্থায় সরকার নতুন পথ খোঁজে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বেসরকারি বিনিয়োগে ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাসকে এলএনজিতে রূপান্তর করে জাহাজে মূল ভূখণ্ডে আনা হবে। পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গত বছর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক হয়েছে। এফবিসিসিআই, বিজেএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। বৈঠকের পর মতামতের জন্য ১৬০টি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেয় পেট্রোবাংলা। তবে আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। অল্প কয়েক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছে। তারা প্রতি ঘনমিটার ৩০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত দাম বলেছে। তবে গত ২৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক গণশুনানিতে বিতরণ কোম্পানিগুলো এলএনজি করে ভোলার গ্যাস সরবরাহ করতে প্রতি ঘনমিটারের দাম ৪৭ টাকা ৫০ পয়সা প্রস্তাব করে। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, এত বেশি দামে গ্যাস কিনে প্রতিযোগিতামূলক শিল্প চালানো কঠিন হবে।
সূত্র জানিয়েছে, ভোলা থেকে এলএনজি আকারে গ্যাস আনার বিষয়ে ৯টি প্রতিষ্ঠান আগ্রহপত্র জমা দেয়। এখান থেকে গ্যাজপ্রম, সিসিডিসি, সিএমসিসহ ৪টি প্রতিষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হয়েছে।
গতকালের বৈঠকে অংশ নেওয়া একটি গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সমকালকে বলেন, ঢাকা-গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের তীব্র গ্যাস সংকটের স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে এলএনজির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে পাইপলাইনের বিষয়ে কথা হয়েছে।
বিইআরসির সর্বশেষ নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, বিদ্যমান শিল্পের জন্য পাইপলাইনের গ্যাস প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা। তবে নতুন শিল্প ও অতিরিক্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই দাম ৪০ টাকা। আর ভোলা থেকে সিএনজি করে আনা গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৪৭ টাকা ৬০ পয়সা।
পাইপলাইনের রুট
দীর্ঘদিন ধরে ভোলা-বরিশাল-খুলনা বা ভোলা-বরিশাল-ঢাকা পাইপলাইন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ঢাকা-বরিশাল অংশের পাইপলাইনের সম্ভাব্যতা যাচাই আওয়ামী লীগের আমলেই সম্পন্ন হয় এবং পরবর্তী সময়ে বরিশাল-ঢাকা পাইপলাইনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারও ভোলা-বরিশাল-ঢাকা পাইপলাইন বিষয়ে আগ্রহী ছিল। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সম্প্রতি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে নতুন সিদ্ধান্ত হয়। প্রথম ধাপে ভোলা-বরিশাল-খুলনা পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। এই গ্যাস যাবে খুলনার রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্রে। যশোর, খুলনা ও বরিশালে আবাসিকে গ্যাস দেওয়া হবে। রূপসা কেন্দ্রের বিদ্যুৎ যাবে সিরাজগঞ্জে। তখন সিরাজগঞ্জের বিদ্যুৎকেন্দ্রর গ্যাস এলেঙ্গা হয়ে চন্দ্রা, আশুলিয়ায় দেওয়া হবে। এরপর গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন পর্যাপ্ত থাকলে বরিশাল থেকে ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইন সম্প্রসারণ করা হবে।
ভোলা থেকে বরিশাল পর্যন্ত গ্যাস আনতে ২০২৩ সালে আনুমানিক এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৫ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের প্রস্তাব করেছিল জিটিসিএল। ঢাকার আমিনবাজার পর্যন্ত এই পাইপলাইনের মোট দৈর্ঘ্য হতে পারে প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার । বরিশাল-ঢাকা অংশের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘গ্যাজপ্রম’ এ প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়েছে। অন্যদিকে, ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে খুলনা পর্যন্ত গ্যাস নিতে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে।
শিল্প মালিকদের মতে ঢাকা ও গাজীপুর অঞ্চলে গ্যাসের সংকট বেশি। তাই ভোলার গ্যাস এ অঞ্চলের জন্য বেশি প্রয়োজন। তার বলেন, খুলনায় শুধু ৮০০ মেগাওয়াটের রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়া বড় কোনো শিল্প এখন পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি। তাই ঢাকার অগ্রাধিকার বেশি হওয়া উচিত।
স্থানীয় উন্নয়ন
অনেক বিশ্লেষকের মতে, ভোলার গ্যাস আগে স্থানীয় উন্নয়নেই ব্যবহার করা উচিত। সরকারি অর্থায়নে সার কারখানার জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং বিসিক শিল্পনগরী, শিল্পাঞ্চল ও ইপিজেড গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে শেলটেক সিরামিক কারখানা চালু করেছে এবং প্রাণ-আরএফএল বড় বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের মতে, হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গ্যাস পরিবহনের বদলে ভোলাতেই সার কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিরামিক, কাচ, রাসায়নিক ও গ্যাসভিত্তিক ভারী শিল্প গড়ে তোলা হলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন শিল্পবিপ্লব ঘটতে পারে। এতে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে ।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করতে আজ চট্টগ্রামে যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর সফর ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বাড়তি উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সামনে চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য তুলে ধরতে বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে জেলা প্রশাসন। সোমবার চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ঐতিহ্যবাহী জেএম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও প্রস্তুতি তদারককালে এসব কথা বলেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম। জেলা প্রশাসক বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। এটি আমাদের অহংকার, আমাদের শক্তি। এই সম্প্রীতির চিত্র আমরা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরতে চাই।’ জেলা প্রশাসক জানান, প্রধানমন্ত্রী সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন। সেখান থেকে সরাসরি জেএম সেন হলে যাবেন। সেখানে মন্দির পরিদর্শন ও সনাতন সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় করবেন। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগের পাশাপাশি আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণ এবং বক্তব্য দেবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, এসআরবি, বিজিবিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। জেএম সেন হলের পূজামণ্ডপের সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি নৃত্য ও গীতাপাঠসহ বিভিন্ন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে সনাতন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিশেষ উৎসাহ তৈরি হয়েছে। উৎসবকে আরও আনন্দঘন করার পাশাপাশি চট্টগ্রামের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য তুলে ধরতে প্রশাসন ও পূজা উদ্যাপন কমিটি একসঙ্গে কাজ করছে।
দুর্গাপূজার ছুটিতে বিশেষ সময়সূচিতে চলবে মেট্রোরেল। আগামী ২০, ২১, ২২ ও ২৪ অক্টোবর স্বাভাবিক সময়সূচির আদলে ট্রেন চলাচল করলেও ২৩ অক্টোবর (শুক্রবার) মেট্রোরেল চলবে বিকেল থেকে। এ সময় যাত্রীচাহিদা অনুযায়ী ট্রেনের চলাচলের বিরতি সমন্বয় করা হবে। ছুটির এই সময় ১০ থেকে ২০ মিনিট পরপর ট্রেন চলাচল করবে। সোমবার (১৯ অক্টোবর) ঢাকা মাস ট্রানজিট কম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) অপারেশন বিভাগের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ডিএমটিসিএলের প্রকাশিত সময়সূচি অনুযায়ী, নির্ধারিত চার দিনে উত্তরা উত্তর থেকে মতিঝিলগামী প্রথম ট্রেন ছাড়বে সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে। অন্যদিকে মতিঝিল থেকে উত্তরা উত্তরগামী প্রথম ট্রেন ছাড়বে সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে। দিনের বেশির ভাগ সময় ১০ থেকে ১২ মিনিট পরপর ট্রেন চলবে। রাতে যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী এ বিরতি বেড়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিট হবে। এ চার দিনে দুই দিক মিলিয়ে মোট ১৭১টি ট্রিপ পরিচালনা করা হবে। ২৩ অক্টোবর (শুক্রবার) উত্তরা উত্তর থেকে মতিঝিলগামী ট্রেন চলাচল শুরু হবে বিকেল ৩টায়। আর মতিঝিল থেকে উত্তরা উত্তরগামী ট্রেন চলবে বিকেল ৩টা ২০ মিনিট থেকে। এদিন দুই দিক মিলিয়ে মোট ৮২টি ট্রিপ পরিচালিত হবে। ডিএমটিসিএল জানিয়েছে, যাত্রী চাপ সামাল দিতে উত্তরা উত্তর স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্ম ও ডিপোতে দুটি অতিরিক্ত ট্রেন প্রস্তুত রাখা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব ট্রেন চালিয়ে চলাচলের বিরতি সমন্বয় করা হবে।
ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভ ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর কাছে পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ। তবে তার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন ম্যাক্রোঁ। একই সঙ্গে লুটপাটকারীদের মোকাবিলা ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য নতুন কৌশল প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। সোমবার (১৯ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্রান্সে চলমান সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার পেছনে পূর্বাভাস ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এলিসি প্যালেস জানিয়েছে, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার স্বার্থে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজকে দায়িত্বে বহাল থাকার কথা বলেছেন ম্যাক্রোঁ। পাশাপাশি চলমান সহিংসতা ও লুটপাট মোকাবিলায় দ্রুত নতুন কৌশল প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। সংকট নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য নতুন কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করতেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। সম্প্রতি ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ ও সহিংসতা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। গত শনিবার ছিল সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম সহিংস দিন। ওই দিন দেশটির বিভিন্ন শহরে সরকারি ভবনে আগুন দেওয়া হয়। শত শত দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অন্তত ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোমবার টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ স্বীকার করেন, বিক্ষোভ চলাকালে কয়েকটি শহরে পুলিশ পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনার মধ্যে নুনেজের পদত্যাগের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তাকে দায়িত্বে বহাল রেখেছেন ম্যাক্রোঁ। একই সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রমে নতুন কৌশল গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।