রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিন সরে দাঁড়ানোর পর কে হচ্ছেন বঙ্গভবনের পরবর্তী বাসিন্দা, দেশের রাজনীতিতে সেই আলোচনা শুরু হয়েছে।
সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি হিসেবে কারো কারো নাম আলোচনায় এলেও ক্ষমতাসীন দল বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেছেন, এটি এখনো ধারণাগত জায়গায় আছে।
তারা বলছেন, নতুন রাষ্ট্রপতি বেছে নেওয়ার ব্যাপারে দলে আলোচনা হবে; এরপর নির্বাচন হবে। সব মিলিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করাটা কোনো কোনো নেতা ‘অনেক সময়ের ব্যাপার’ মনে করছেন।
আবার কোনো কোনো নেতা আভাস দিয়েছেন, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে পারে সংবিধানের সংশোধনের পর, যেখানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ভারসাম্য আনার মতো প্রস্তাব রয়েছে।
২০২৩ সালে ২৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতির শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটলেও বঙ্গভবনে থেকে যান সাহাবুদ্দিন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অভ্যুত্থানের পক্ষের কয়েকটি সংগঠনের তুমুল আন্দোলন করলেও তিনি পদত্যাগ করেননি। রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা হলে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হবে, এমন যুক্তিতে বিরোধিতা করেছিল বিএনপি। ফলে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারও আর সে পথে হাঁটেনি।
শেখ হাসিনার সবশেষ সরকার, মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এবং ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের শপথ হয় সাহাবুদ্দিনের হাতেই।
এর মধ্যে বুধবার গুঞ্জন ওঠে, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। এর দুই দিন পর শুক্রবার ‘শারীরিক ও মানসিক’ সক্ষমতা না থাকার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি।
তার পদত্যাগের পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তিনিই রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব সামলাবেন।
সংবিধান অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে তা পূরণের জন্য নির্বাচন করতে হবে। এটি সর্বোচ্চ সময়সীমা; তার আগে যেকোনো সময় নির্বাচন হতে পারে।
তবে শিগগিরই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না দলের একাধিক নেতা।
তাদের মতে, বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিষয়টি না তোলা পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো কিছুই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
তবে যেদিনই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হোক, যেদিনই নাম ঘোষণা হোক, সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি কে হচ্ছেন, সেই আলোচনা ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পরেই শুরু হয়। সাহাবুদ্দিনের সরে দাঁড়ানোয় সেই আলোচনা আরো জোরালো হল।
২৩তম রাষ্ট্রপতির আলোচনায় কারা আছেন, সেই ধারণা দিতে গিয়ে বিএনপির নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মোটা দাগে ছয়জনের নাম বলেছেন।
এ তালিকায় আছেন— স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খান, আব্দুল মঈন খান ও ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী। অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নামও আছে।
এর মধ্যে হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও মির্জা ফখরুলের নাম আলোচনায় থাকার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের একজন নেতা।
এদের বাইরে যাদের নাম আছে, তাদের কথা এসেছে দলের স্থায়ী কমিটির অন্তত তিনজন সদস্যের মুখ থেকে।
অবশ্য দলের কোনো কোনো নেতা বলেছেন, পত্রপত্রিকায় অনেকের নাম আলোচনায় এলেও সবই ধারণাপ্রসূত; এখনো কোনো সিদ্ধান্তই হয়নি।
এ বিষয়ে দলের বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুক্রবার সন্ধ্যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সংবিধান অনুযায়ী তো স্পিকার ইতোমধ্যে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছেন। এরপর পার্টির সিদ্ধান্ত হবে, নির্বাচন হবে; অনেক সময়ের ব্যাপার আছে।”
সরকার কাউকে চিন্তা করছে কিনা, এমন প্রশ্ন করা হয় বিএনপির মহাসচিবকে।
জবাবে তিনি বলেন, “এটা তো আমি বলতে পারি না, আমি কোনো নাম জানি না।”
একই প্রশ্নে একই ধরনের জবাব আসে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর কাছ থেকেও, যিনি দলটির স্থায়ী কমিটিতেও আছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “এটা সত্যিকারার্থে জানা নেই। সবকিছু দেখছি, মিডিয়াতে যা আসছে।”
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির একজন নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, “নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনের আগে হওয়ার সম্ভাবনা নেই।”
সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হয়েছে ১৫ জুলাই। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের এক অধিবেশন সমাপ্তি ও পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের মধ্যে ৬০ দিনের বেশি বিরতি দেওয়া যাবে না। সে হিসেবে সেপ্টেম্বরে পরবর্তী অধিবেশন বসবে।
ক্ষমতাসীন দল সেপ্টেম্বরে অষ্টাদশ সংশোধনী সংসদে তুলতে পারে আভাস দিয়ে বিএনপির ওই কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে যে কমিটি গঠনের প্রস্তাব এসেছে, সেই কমিটির মাধ্যমে সংশোধনীর কার্যক্রম সামনে আসবে। সেই সংশোধনীতে জুলাই সনদের অনেক বিষয় যুক্ত হবে।
তার ভাষ্য, সেই সংশোধনীতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনার বিষয়ে কিছু প্রস্তাব আছে।
“বিএনপির তরফেও একই ধরনের প্রস্তাব আছে। ফলে ওই সংশোধনীর আগে সম্ভবত নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হচ্ছে না।”
বুধবার বিকালে প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের ফেইসবুক পোস্ট ঘিরে সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের গুঞ্জন শুরু হয়। সেই পোস্টে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির নামও তুলে ধরেন।
তবে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “যে সচিবের নাম এসেছে, তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই।”
সরকারের সঙ্গে যুক্ত, আবার দলের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পরিষদেও আছেন, এমন একজন নেতা বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের নাম আছে রাষ্ট্রপতির আলোচনায়।
রাষ্ট্রপতি কে হবেন, সে বিষয়ে ধারণা নেই দাবি করে একজন মন্ত্রী বলেছেন, “বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ দুজন মন্ত্রীর কেবল জানার সুযোগ আছে। এর বাইরে বিষয়টি এখনো আসেনি।”
এর আগে বিএনপির সংসদীয় দলের অনাস্থার মুখে ২০০২ সালের ২১ জুন পদত্যাগ করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী।
তখনকার স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার ওই দিন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে কার্যভার নিয়েছিলেন।
সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন।
ফলে কোনো দল উত্তরসূরি হিসেবে কারও নাম ঠিক করলেই তিনি রাষ্ট্রপতি হয়ে যাবেন না। তাকে প্রার্থী হতে হবে এবং আইন অনুযায়ী নির্বাচিত হতে হবে।
সংবিধানের ১১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনি কর্তা হিসেবে এই নির্বাচন পরিচালনা করেন।
নির্বাচন কমিশন সংসদ সদস্যদের হালনাগাদ ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও প্রকাশ করবে। স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে ঘোষণা করবে নির্বাচনের তফসিল।
বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর একজন বৈধ প্রার্থী থাকলে তাকে ভোট ছাড়াই নির্বাচিত ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোট নেওয়া হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট হয় প্রকাশ্যে, গোপনে নয়। প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি ভোট থাকে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
সরকার গঠনের পর প্রথম ৬ মাসে বিএনপি সরকারের অধিকাংশ নির্বাচনি অঙ্গীকার ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্ঠা ও দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, কোথাও ১০০ শতাংশ, আবার কোথাও ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন রিজভী। সরকারের ছয় মাসের অর্জনের বিস্তারিত পরিসংখ্যান শিগগির প্রকাশ করা হবে বলেও জানান রিজভী। তিনি বলেন, সরকারের ছয় মাসের অর্জনের লিখিত বিবরণ বা বুকলেট সাংবাদিকদের হাতে দেওয়া হবে। সেখানে পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খননসহ বিভিন্ন কর্মসূচির বিস্তারিত পরিসংখ্যান থাকবে। রিজভী বলেন, ছয় মাসের যে লক্ষ্য, সে লক্ষ্য অনুযায়ী মোটামুটি সবগুলোই পূরণ হয়েছে। কোথাও হয়তো ১০০ শতাংশ না হলেও সেখানে ৯৫ শতাংশ, ৯০ শতাংশ আছে। কোথাও ১০০ শতাংশ হয়েছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিতে সময় লেগেছে। পরবর্তী ছয় মাসে সরকারের কর্মসূচি আরও জোরালো ও দ্রুতগতিতে বাস্তবায়ন হবে বলেও প্রত্যাশা রিজভীর। দলের মহাসচিবের রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর পদত্যাগের বিষয়ে করা প্রশ্নের জবাবে রিজভী বলেন, আইনগতভাবে শপথ নেওয়ার আগে দলীয় পদ বা সরকারের অন্য কোনো পদ থেকে পদত্যাগ করার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে, নৈতিক কারণে দলের মহাসচিব পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন রিজভী। তিনি বলেন, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার থেকে খালেদা জিয়া কখনো বিচ্যুত হননি। এ কারণে তাকে রাজনৈতিক জীবনে দুঃখ, বেদনা, নিপীড়ন ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ভূমিকার কথা তুলে ধরে রিজভী বলেন, ছাত্র-জনতার সেই আন্দোলনের মূর্ত প্রতীক, মূল প্রেরণা ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে শনিবার ঢাকাসহ সারাদেশে বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বেলা ১১টায় এবং গুলশান কার্যালয়ে বাদ আসর দোয়া অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান তিনি। ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছিরের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস ঘিরে সংগঠনে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে রিজভী বলেন, এ বিষয়ে আজকে আমার কাছে এ ধরনের কোনো নির্দেশনা আসেনি। কোনো ডাইরেক্টিভস বা কোনো ইনস্ট্রাকশন আমার কাছে আসেনি। দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়ে থাকলেও তা তার জানা নেই উল্লেখ করে রিজভী বলেন, চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হবে। সংবাদ সম্মেলনের শেষদিকে খালেদা জিয়ার জন্মদিনের কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচারের জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, ম্যাডামের বিষয়টা আমাদের জাতির একটা আবেগের বিষয়। আমি মনে করি আপনারা এই বিষয়টিকে একটু গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরবেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপু, সহ-দপ্তর সম্পাদক মো. মুনির হোসেন, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য (দপ্তরের দায়িত্বে) ও প্রধানমন্ত্রীর গবেষণা কর্মকর্তা আব্দুস সাত্তার পাটোয়ারী, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য (দপ্তরের দায়িত্বে) তারিকুল আলম তেনজিং প্রমুখ।
বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ছোট করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে ‘মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামীর ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রের’ প্রতিবাদে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল ও মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম আয়োজিত সমাবেশে এ কথা বলেন তিনি। এরআগে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন ও রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল করেছে মুক্তিযোদ্ধা দল। এরপর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল করেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এরপর বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, আমার পরিচয় বাংলাদেশি, এটা একাত্তরের অর্জন। আমরা তাদের উত্তরসূরি, যারা সীমান্তে যুদ্ধ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ছোট করার চেষ্টা কারা করছে, সে প্রশ্ন তুলে রিজভী বলেন, যারা সেদিন স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে। এদের বীরত্বের ইতিহাস নাই, শুধু আছে দালালির ইতিহাস। রিজভী অভিযোগ করে বলেন, আওয়ামী লীগের কৃপা পাওয়ার জন্য জামায়াতে ইসলামী সব সময় চেষ্টা করে। ছিয়াশি সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে নির্বাচনে গেছে। ২০০৮ সালের পাতানো নির্বাচনে হুমকি দিয়ে বিএনপিকে নির্বাচন করার জন্য বাধ্য করেছে। তিনি আরও বলেন, জামায়াত জোরেশোরে বলেছে- পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলবে। যারা আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করছে, যে ভারতে প্রতিদিন মুসলমানদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এক কোটির মতো মুসলমানদের তাড়িয়ে দেবে, যারা ইসরাইলকে তাদের পিতৃভূমি বলে, তাদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলাম আঁতাত করতে চায়। জামায়াতে ইসলামী প্রধানের বাসভবনে আয়োজিত চিত্র প্রদর্শনীর প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, সেখানে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা’র কোনো ছবি নেই। সেখানে ৭ মার্চের শেখ মুজিবের ভাষণের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, ‘এখানেই বোঝা যায়।’ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতের ছাত্র সংগঠনের দাঁড়িপাল্লা আঁকার প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, ৭১-কে হালকা করে দেখিয়েছে। এগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একাত্তরের চেতনা আমাদের বুকের মধ্যে ছিল বলেই আমাদের সন্তানরা চব্বিশে শেখ হাসিনার মতো ফ্যাসিস্টকে তাড়িয়ে দিয়েছে। রিজভী আরও বলেন, আজকে খুবই চক্রান্তমূলকভাবে কোনটা বড় কোনটা ছোট এটা যাচাই করার চেষ্টা করছেন। এটাতে কোনো লাভ হবে না। এ জাতি স্বাধীনতা রক্ষা করতে জানে। জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন- সিনিয়র সহ-সভাপতি নজরুল ইসলাম, সহ-সভাপতি জাহেদুল হক শামীম ও সহ-সভাপতি ড. কে এম আই মন্টি প্রমুখ।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, নির্বাচনের আগে বলেছিলাম, উত্তরাঞ্চলের এই বৃহত্তর রংপুরকে কৃষির রাজধানী বানাব। কিন্তু আমরা সরকার গঠন করতে পারলাম না। সে কারণে বিএনপি সরকার গঠন করে তাদের খেয়াল-খুশিমতো দেশ পরিচালনা করছে। তিনি বলেন, আপনারা নাকি জামায়াত আর জাতীয় পার্টিকে ভোট দেন। সে জন্যই বর্তমান সরকারের একজন বড় নেতা বলেছেন, উত্তরাঞ্চলকে সারা জীবন পিছিয়ে পড়েই থাকতে হবে। সোমবার (১০ আগস্ট) দুপুরে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া কাজী আজাহার আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক জনসমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। জামায়াত আমির বলেন, এই বোনারপাড়ায় জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের দুই নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। তারা ভালো মানুষ ছিলেন। তারা নারীলোভী ছিলেন না, খারাপ মানুষ ছিলেন না, সন্ত্রাসীও ছিলেন না। তারপরও তাদের জীবন দিতে হলো। দেশে খুনের রাজনীতি কায়েম করতে দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, ক্ষমতার লোভ আর দখলদারির কারণে দেশ ছেড়ে গেছে, খুনের ঘটনা বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের রাস্তায় নামতে হবে। তাই আপনারা প্রস্তুত হোন, যেভাবে ২০২৪ সালে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। তিনি বলেন, আমরা একটি সোনার বাংলাদেশ গড়তে চাই। মায়েরা-বোনেরা এবং সব ধর্মের মানুষ নিরাপদে থাকবে। দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। চুরি, ডাকাতি, খুন, ছিনতাই, ধর্ষণ ও চাঁদাবাজি বেড়েছে। মানুষ আজ নিরাপত্তাহীন। এসব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে হবে। এর আগে ডা. শফিকুর রহমান নিহত জামায়াত-শিবির নেতার কবর জিয়ারত করেন এবং নিহতের স্বজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। গাইবান্ধা-৫ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়ারেস আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য অধ্যক্ষ সাহাবুদ্দিন, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, সংসদ সদস্য মো. আবদুল করিম, সংসদ সদস্য মাজেদুর রহমান, সংসদ সদস্য মাওলানা নজরুল ইসলামসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।