বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে নানামুখী চাপ আর গঞ্জনার মধ্যে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে তিন বছর তিন মাস কাটিয়ে মেয়াদপূর্তির আগেই বিদায় নিলেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
নব্বই পরবর্তী বাংলাদেশে তিনি দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি, যাকে মেয়াদ পূর্তির আগেই ইস্তফা দিতে হল। এই সময়ে আর কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে এত বিচিত্র অভিজ্ঞতা আর এতটা কঠিন সময় পার করতে হয়নি।
বঙ্গভবনবাসের এই ৩৯ মাসে সাহাবুদ্দিন দুটি জাতীয় নির্বাচন দেখেছেন। তিনজন সরকারপ্রধানকে শপথ পড়িয়েছেন। নজিরবিহীন এক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে একজন সরকারপ্রধানের দেশত্যাগের সাক্ষী হয়েছেন।
দূতাবাস থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি নামিয়ে ফেলার পর তাকে ক্ষোভ পুষে রাখতে হয়েছে বুকের মধ্যে। সাংবিধানিক নিয়ম রক্ষার খাতিরে নিজের রাজনৈতিক আদর্শের বিপরীত বয়ান উচ্চারণ করতে হয়েছে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে। দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমকে বলতে হয়েছে, “আমার ভালো লাগে না।”
কিন্তু ২০২৪-২৫ সালের ঝঞ্ঝামুখর ওই সময়ে পদত্যাগ করার বাস্তবতাও তার ছিল না। গত সাড়ে তিন দশকে আর কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে এতটা অসহায় পরিস্থিতিতে দেখেনি বাংলাদেশ।
মো.সাহাবুদ্দিনের বিদায় বেলায় তার মূল্যায়ন করতে গিয়ে সংসদ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজামউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির খুব বেশি ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ নেই। তবে চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সময় ‘ইতিবাচক ভূমিকা’ রাখতে পেরেছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন, তা না হলে জটিলতা আরো বাড়তে পারত।
আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান বলছেন, রাষ্ট্রপতির মত মর্যাদাপূর্ণ পদে যাওয়ার জন্য যে ব্যক্তিত্ব, সততা, নিষ্ঠা থাকা দরকার, তার কতটুকু সাহাবুদ্দিনের মধ্যে ছিল, তা এখনও ‘প্রশ্নবিদ্ধ’।
‘আমিই তো ঝড় ওঠাচ্ছি’
টানা দুই বারের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ২০২৩ সালে অবসরে যাওয়ার সময় তার উত্তরসূরি হিসেবে আওয়ামী লীগ যখন মো. সাহাবুদ্দিনকে মনোনয়ন দিল, রাজনৈতিক অঙ্গনের অনেকের কাছেই সেটি ছিল বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বা সরকারের প্রভাবশালী কোনো মন্ত্রী নন, জাতীয় রাজনীতিরও প্রথম সারির পরিচিত মুখ নন, এমন একজনকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে মনোনয়ন দেওয়া হবে, তা খুব কম মানুষই অনুমান করেছিলেন।
রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার জন্য সরকারপ্রধানের ডাক পেয়ে মো. সাহাবুদ্দিন নিজেও সম্ভবত বিস্মিত হয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশনে গিয়ে নিজের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, “সবই আল্লাহর ইচ্ছা।”
তবে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের কাছে তার কয়েকটি পরিচয় ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পাবনায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক শাসনের সময় রাজনৈতিক কারণে কারাবন্দিও হন।
পরে আইন পেশায় যোগ দেন। বিচার বিভাগে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন। জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসর নেওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার ছিলেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক অতীত, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অবস্থান এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে সামনে আনে।
সংসদে আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে অন্য কোনো প্রার্থী না থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন তিনি।
দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজ জেলা পাবনায় নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেওয়া একটি তাৎক্ষণিক মন্তব্যের কারণে মো. সাহাবুদ্দিন ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসেন।
২০২৩ সালের ১৬ মে পাবনায় গিয়ে এক নাগরিক সংবর্ধনায় যোগ দেন সাহাবুদ্দিন। অনুষ্ঠান শেষে তিনি যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ শুরু হয় কালবৈশাখী। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব সেদিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
এ সময় বক্তব্য দিতে দিতেই রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলে ওঠেন, “কিসের ঝড়, ঝড় উঠুক, আমিই তো এখানে ঝড় ওঠাচ্ছি।”
রাষ্ট্রপতির মুখে এমন মন্তব্যে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে হাসির সৃষ্টি হয়। তখনো কেউ কল্পনা করেননি, কেমন ঝড়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গভবনে মো. সাহাবুদ্দিনের প্রথম বছর ছিল গতানুগতিক, দেশের পরিবেশ ছিল শান্ত। ওই বছরের শেষ দিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে।
বিরোধী দলগুলোর নির্বাচন বর্জন, আন্দোলন, সহিংসতা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা মূলত সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ তার দায়িত্ব পালনের বাস্তবতাই বদলে দেয়। পরবর্তী দুই বছরে তিনি এমন সব ঘটনার মুখোমুখি হন, যার নজির বাংলাদেশে খুব কমই আছে।
দুই নির্বাচন, তিন সরকারপ্রধানের শপথ, এক অভ্যুত্থান
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদকালের প্রথম বড় রাজনৈতিক ঘটনা। বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে ওই নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থবার সরকার গঠন করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ নেন।
কিন্তু কয়েক মাসের ব্যবধানে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল বদলে যায়। জুলাই-অগাস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন, সহিংসতা, প্রাণহানি এবং শেষ পর্যন্ত ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি—স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায়ের সাক্ষী হন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে চড়ে ভারতে চলে গেলে তার বাসভবন, তার কার্যালয় এমনকি জাতীয় সংসদেরও দখল নেয় জনতা। বিশৃঙ্খলা আর সহিংসতার মধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের বেশিরভাগ মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ জ্যেষ্ঠ নেতা আত্মগোপনে চলে যান।
হাসিনা আমলের কোনো কিছু অবশিষ্ট না থাকলেও অনিবার্য পরিণতির মত বঙ্গভবনে থেকে যান মো. সাহাবুদ্দিন। সেই সংকটময় সময়ে বঙ্গভবনের ওপর গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব বর্তায়।
সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর রাষ্ট্রপতিকে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের উদ্যোগ নিতে হয়। তাকেই সংসদ বিলুপ্ত করার আদেশ দিতে হয়।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত চাওয়ার পর তার ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ৮ অগাস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি।
সেই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক অবস্থান অপরিবর্তিত থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা পুরোপুরি বদলে যায়।
যে রাষ্ট্রপতি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাকেই নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে অধ্যাদেশে পরিণত করতে তাকেই সই দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সারতে হয়।
কিন্তু আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া রাষ্ট্রপতি কেন অভ্যুত্থানের পর বঙ্গভবনে থেকে যাবেন, সেই প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও আন্দোলনের নেতারা প্রকাশ্যে তার পদত্যাগ বা অপসারণের দাবি জানান।
২০২৪ সালের অক্টোবরে একটি সাক্ষাৎকারে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, তিনি শুনেছেন শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন, কিন্তু তার কাছে সেই পদত্যাগের কোনো দালিলিক প্রমাণ বা নথি নেই।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি পরে সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিয়েছিলেন এবং সেই মতামতের ভিত্তিতেই পরবর্তী সাংবিধানিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ওই বক্তব্য প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের সমালোচনা করেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন তার পদত্যাগ দাবি করে। বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভও হয়।
তখন বিএনপি সাংবিধানিক সংকট তৈরির আশঙ্কা তুলে রাষ্ট্রপতিকে সরানোর বিরোধিতা করেছিল। শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার আর সে পথে যায়নি।
তবে সব মিলিয়ে দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটছিল রাষ্ট্রপ্রধানের চেয়ারে থাকা সাহাবুদ্দিনের। নির্বাচনের আগে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর সরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, “আমি বিদায় নিতে আগ্রহী। আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই।”
সেদিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পক্ষ থেকে সরাসরি যোগাযোগ করে কখন পদত্যাগ করতে চান জানতে চাইলে রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, “নতুন সরকার আসলে… নতুন সরকার বললে, অনুরোধ করলে।”
কেন পদত্যাগের কথা ভাবছেন, সেই প্রশ্নে তার উত্তর ছিল, “আমার ভালো লাগে না।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাকে কোণঠাসা করে রাখা, বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলো থেকে তার ছবি সরিয়ে ফেলা এবং বঙ্গভবনের প্রেস উইং সংকুচিত করায় ‘অপমানবোধ’ করার কথাও পরে বলেছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলেও রাষ্ট্রপতি তখন পদত্যাগ করেননি। ১৭ ফেব্রুয়ারি তার কাছেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং নতুন সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা শপথ নেন।
এর পরের পরিস্থিতি মো. সাহাবুদ্দিনের জন্য অনেকটা সহনীয় হয়ে আসে।
বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার
নির্বাচনের পর ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে কালের কণ্ঠকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মো. সাহাবুদ্দিন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন।
মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে নানা ‘চক্রান্ত’ হয় দাবি করে তিনি বলেন, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ‘চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার অনেক পাঁয়তারা’ হয় সে সময়।
“আমি দৃঢ়চিত্তে আমার সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলাম। যে কারণে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি। বিশেষ করে অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে উপড়ে ফেলার অসংখ্য ছক ব্যর্থ হয়েছে,” বলেছিলেন সাহাবুদ্দিন।
তার সেই দুঃসময়ে বিএনপির কাছ থেকে ‘শতভাগ সমর্থন’ পাওয়ার কথাও বলেছিলেন তখনকার রাষ্ট্রপ্রধান।
তিনি বলেছিলেন, “আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ওই কঠিন সময়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিলেন। তারা তখনো সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন।
“বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আমার মনের মধ্যে অনেক কৌতূহল জমা ছিল। কিন্তু আমি পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম, তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল! আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে গত ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুরুর পর জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউট করেন।
রাষ্ট্রপতির ভূমিকা, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় তার অবস্থান এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের প্রতিবাদে তারা এ কর্মসূচি নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
তখনও বিএনপির মন্ত্রী-এমপিরা সংবিধানের বিধানের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পক্ষে কথা বলেন।
হঠাৎ পদত্যাগ
স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য গত মে মাসে লন্ডনে ঘুরে আসেন রাষ্ট্রপতি। পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, স্টাফ নার্স ও বঙ্গভবনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও তার সঙ্গে ছিলেন।
১২ মে কেমব্রিজের রয়াল প্যাপওয়ার্থ হাসপাতালে রাষ্ট্রপতির এনজিওগ্রাম করা হয়। সে সময় হৃদযন্ত্রের একটি ধমনিতে গুরুতর ব্লক শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে এনজিওপ্লাস্টি করে একটি স্টেন্ট বসানো হয়।
নয় দিন পর দেশে ফেরেন রাষ্ট্রপতি। তখন বঙ্গভবনের প্রেস বিভাগ ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের বরাতে তার শারীরিক অবস্থা ‘স্থিতিশীল ও সন্তোষজনক’ বলে জানিয়েছিল।
গত দেড় মাসে রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে খুব বেশি আলোচনা দেশের রাজনীতির অঙ্গনে ছিল না। গত ২২ জুলাই প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের এক ফেইসবুক পোস্ট ঘিরে হঠাৎ করেই আবার রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের গুঞ্জন শুরু হয়।
সায়ের ফেইসবুকে লেখেন, “আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। এর চাইতেও বিস্ময়কর খবর হলো নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির কোনো শীর্ষ নেতার পরিবর্তে পছন্দের তালিকায় রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।”
রাষ্ট্রপতির দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা এবং তার ঘনিষ্ঠ একজন বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। তবে স্পিকার দেশে না থাকায় পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি বিলম্বিত হচ্ছে।
চিকিৎসার জন্য গত ১৯ জুলাই ব্যাংককে গিয়েছিলেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। আগামী ২৬ জুলাই তার ফেরার কথা ছিল। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সফর সংক্ষিপ্ত করে তাকে শুক্রবার দুপুরে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
এরপর বিকাল সোয়া ৪টার দিকে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে নিজেই পদত্যাগের কথা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন মো. সাহাবুদ্দিন।
পদত্যাগের বিষয়ে প্রশ্ন করলে রাষ্ট্রপতি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা তো সর্বজনবিদিত, আমার মুখ থেকে শুনে কী লাভ? আই অ্যাম সিক, সো ইট ইজ ডান।”
পদত্যাগপত্রে তিনি দাবি করেন, চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর তার ‘সুদৃঢ় ও ইতিবাচক’ ভূমিকার কারণেই সাংবিধানিক বিপর্যয় এড়াতে পেরেছিল বাংলাদেশ।
আর পদত্যাগের কারণ হিসেবে বলেন, তিনি নানা রোগে আক্রান্ত। ‘শারীরিক ও মানসিক অসমর্থ্যতার’ কারণে রাষ্ট্রপতির মত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
ইতিহাস কীভাবে মনে রাখবে?
রাজনীতিবিদ, বিশ্লেষক, বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন মনে করেন, ইতিহাস একটি কারণেই রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে মনে রাখতে পারে।
“বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাতো খুবই সীমিত, আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। তো উনি সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেছেন, এটা মোটাদাগে বলা যায়।”
সংসদ বিষয়ক গবেষক নিজামউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির খুব বেশি ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ না থাকলেও চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সময় তার ভূমিকা রাখার বড় সুযোগ ছিল।
“উনি সেই মুহূর্তে সুপ্রিম কোর্টের মতামত না চাইলে, রেফারেন্স না চাইলেতো এক ধরনের স্টেলমেট লেগে যেতে পারত সেখানে।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের এই সাবেক অধ্যাপকের মতে, ২০২৪ সালের অগাস্ট মাসের অস্থির ওই সময়টায় মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা ইতিবাচকই ছিল।
“আমি মনে করি জনমতের পক্ষে তার অবস্থানটা ছিল। যদিও আওয়ামী লীগের কারণে উনি ওখানে। উনি চাইলে হয়তো বেঁকেও বসতে পারতেন, এখানে বেঁকে বসার সুযোগ ছিল। তো সেখানে উনি জনমত, আন্দোলনকারীদের উপর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই দেখা যাচ্ছিল যে, সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে তার একটা ভূমিকা ছিল। আমি মনে করি, যেটা একটা পজিটিভ দিক রয়ে গেছে তার।”
সংসদ ভেঙে দেওয়ার মত মৌলিক সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতির দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও সাহাবুদ্দিনকে বাস্তবতার খাতিরে তা ‘করতে হয়েছে’ বলে মন্তব্য করেন নিজামউদ্দিন আহমদ।
চব্বিশের ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করার কথা বললেও পরে মানবজমিন সম্পাদককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওই পদত্যাগপত্র না পাওয়ার কথা বলেছিলেন সাহাবুদ্দিন; বিষয়টিকে তার ‘বিতর্কিত মতামত’ বলতে চান নিজামউদ্দিন।
আবার মতাদর্শের দিক দিয়ে ভিন্ন মেরুর বাসিন্দা হলেও গত পাঁচ মাসে বিএনপি সরকারের কথা মতই চলেছেন সাহাবুদ্দিন। সে প্রসঙ্গ ধরে নিজামউদ্দিন বলেন, “পতিত সরকারের মনোনীত প্রেসিডেন্ট হয়েও এরা যা চেয়েছেন, যা করতে বলছেন, ঠিক সেভাবে উনি করে গেছেন।
তবে আওয়ামী লীগ আমলে রাষ্ট্রপতি পদে সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করার বিষয়টি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান।
তিনি বলেন, “দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়িত্বসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাকে নিয়ে বিতর্ক ছিল। বাংলাদেশে অনেক যোগ্য লোক থাকার পরও আওয়ামী লীগ একজন বিতর্কিত লোককে নির্বাচিত করেছিল। আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী আচরণের কারণে এ ধরনের একজন লোককে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষ বাধা দিতে পারে নাই।
ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রপতির মত একটা সম্মানজনক পদে এ ধরনের একজন ব্যক্তিকে গ্রহণ করে নিতে হয়েছিল।
মাহবুবুর রহমান মনে করেন, চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রশ্ন আসে। নতুন করে আরো সংকট যাতে না হয়, সেজন্য সাহাবুদ্দিনকে বাদ দেওয়ার চিন্তা থেকে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সরে এসেছিল। তাতে তার পদ রক্ষা পায়।
কিন্তু ওই সময়ে ১৫-২০ দিন যে মহাসংকট গিয়েছিল, ওই সময়ে উনার মহা ভূমিকা থাকতে পারত। উনার তো কোনো ভূমিকা নাই। ৫ অগাস্টের পরে শান্তি-শৃঙ্খলায় উনার কোনো ভূমিকা নাই। সেটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো, সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে কওমি ধারার সাত ইসলামি দলকে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক ঐক্যের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তাতে সাত দলই তাদের প্রস্তাবনা ও রূপরেখা জমা দিয়েছে। তবে এসব প্রস্তাবনায় কী কী বিষয় রয়েছে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি হেফাজত বা সংশ্লিষ্ট কোনো দল। সাত দলের মহাসচিব ও দায়িত্বশীল নেতাদের বক্তব্যে জানা গেছে, ঐক্যের আদর্শিক ভিত্তি, অন্য রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সম্পর্ক, নির্বাচন ও রাজনৈতিক কর্মকৌশল, নেতৃত্ব কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নতুন দলকে যুক্ত করার প্রক্রিয়া নিয়ে দলগুলো পৃথক প্রস্তাব দিয়েছে। গত ১৬ জুলাই হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে সাত ইসলামি দলকে নিয়ে ঐক্যের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সাধারণ রাজনৈতিক জোটের বাইরে ইসলামপন্থিদের স্বতন্ত্র একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই ছিল এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। এর অংশ হিসেবে দলগুলোকে ৩ আগস্টের মধ্যে হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর কাছে জোট গঠনের রূপরেখা জমা দিতে বলা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাত দলই তাদের প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে। দলগুলোর বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মোটামুটি অভিন্ন অবস্থান থাকলেও এর কাঠামো ও রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কেউ অন্য রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নতুন প্ল্যাটফর্মে থাকার পক্ষে, আবার কেউ অন্য জোটে থেকেও নতুন ঐক্যের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ রাখতে চায়। একইভাবে কেউ জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে, আবার কেউ নির্বাচনকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত নিজ নিজ দলের এখতিয়ারে রাখার কথা বলেছে। আদর্শিক ভিত্তি কী হবে? সাত দলের প্রস্তাবনায় সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে আদর্শিক সামঞ্জস্যের বিষয়টি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং ইসলামী ঐক্যজোটের বক্তব্যে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা ও আদর্শকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি এসেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, রাজনৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে কাছাকাছি দৃষ্টিভঙ্গি, হাক্কানি উলামায়ে কেরামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা পোষণের কারণে প্রাথমিকভাবে নিবন্ধিত সাতটি ইসলামি রাজনৈতিক দল এই ঐক্যে থাকবে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা বলেন, তাদের রূপরেখায় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নীতি ও আদর্শের ওপর অবিচল থাকাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আদর্শিক কোনো আপত্তি বা মতপার্থক্য থাকলে সম্পৃক্ত না থাকার বিষয়েও দলটির অবস্থান রয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মহিউদ্দীন বলেন, জোটে অন্তর্ভুক্ত হতে হলে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা ও আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। কোনো দলের নীতি, আদর্শ বা কর্মকাণ্ড আকিদাবিরোধী হলে উপদেষ্টা পরিষদ সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার রাখবে। ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী বলেন, যেহেতু এটি ইসলামি দলগুলোর ঐক্য, তাই আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা এখানে প্রাধান্য পাবে। কেউ তা লঙ্ঘন করলে ঐক্যে থাকতে পারবে না। তবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব প্রকাশ্যে জানায়নি। অন্য জোটে থাকা যাবে কি না? নতুন ঐক্যের সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক জোটের সম্পর্ক থাকবে কি না, এ প্রশ্নেই সাত দলের মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রস্তাবনায় অন্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা বা ঐক্য বজায় না রাখার কথা বলা হয়েছে। দলটির নেতা শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, ঐক্যে যুক্ত দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেও অন্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা বা ঐক্য করতে পারবে না। অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনে করছে, সাত দলের ঐক্য হলেও তাদের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানে এর প্রভাব পড়বে না। দলটির মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, রাজনৈতিক ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেক দলের নিজস্ব এখতিয়ার থাকা উচিত। দলটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন বলেন, কোনো রাজনৈতিক জোটে থাকা অবস্থাতেও ইসলামি দলগুলো ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। হেফাজতের পক্ষ থেকেও তাদের বর্তমান জোট ছাড়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি। এর বিপরীত অবস্থান খেলাফত মজলিসের। দলটির নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমি বলেন, হেফাজতের আহ্বানে গঠিত নতুন জোটের কোনো দল একই সঙ্গে অন্য জোটে থাকলে নতুন করে একত্রিত হওয়ার উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনও অন্য বড় রাজনৈতিক দল বা জোটের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করে নতুন জোটে শরিক হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। নির্বাচন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে সাত দল কীভাবে অংশ নেবে, সেটিও প্রস্তাবনাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। দলটির নেতা শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, সমঝোতার ভিত্তিতে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নির্বাচনকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তকে নিজ নিজ দলের এখতিয়ারে রাখার পক্ষে। খেলাফত মজলিসও দলগুলোর নিজেদের রাজনৈতিক কৌশল নিজেরাই নির্ধারণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দলটির নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমি বলেন, পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে প্রত্যেক দল নিজেদের চলার পথ ও কৌশল নির্ধারণ করবে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রস্তাবনায়ও নতুন জোটকে দেশের রাজনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখার উপযোগী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট ও নেজামে ইসলাম পার্টির প্রস্তাব এখনো বিস্তারিত জানা যায়নি। নেতৃত্ব কীভাবে হবে? নতুন জোটের নেতৃত্ব কাঠামো নিয়েও একাধিক দলের প্রস্তাবনায় পৃথক পরিকল্পনা রয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ স্থায়ী একক নেতৃত্বের পরিবর্তে সাত দলের শীর্ষ নেতাদের সম্মানজনক অবস্থান এবং লিয়াজোঁ কমিটির মাধ্যমে কর্মসূচি ও নীতি নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে। প্রত্যেক দল থেকে দুজন করে প্রতিনিধি নিয়ে লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন স্থায়ী বা নির্দিষ্ট দায়িত্বশীল না রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। দলটির প্রস্তাব অনুযায়ী, জোটের বিভিন্ন কর্মসূচি ও বৈঠকে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর আমিররা পর্যায়ক্রমে নেতৃত্ব দেবেন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পক্ষ থেকে নির্দিষ্টসংখ্যক সদস্য নিয়ে একটি বিশেষ ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। জোটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনও প্রতিটি শরিক দল থেকে দুজন বা তিনজন প্রতিনিধি নিয়ে সমন্বয় কমিটি বা মজলিসে শূরা গঠনের প্রস্তাব করেছে। তবে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও ইসলামী ঐক্যজোটের নেতৃত্ব কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি। নতুন দল যুক্ত করার প্রক্রিয়া নতুন কোনো দল বা সংগঠনকে ঐক্যে যুক্ত করার বিষয়েও কয়েকটি দলের প্রস্তাবনায় নির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, নতুন কোনো রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক সংগঠনকে ঐক্যে যুক্ত করতে হলে সাত দলের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনও এককভাবে নতুন কোনো দলকে যুক্ত করার বিপক্ষে। দলটির প্রস্তাব অনুযায়ী, শূরা সদস্য ও উপদেষ্টা পরিষদের যৌথ আলোচনার মাধ্যমেই নতুন দল অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। অন্য দলগুলোর এ বিষয়ে প্রস্তাব এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। হেফাজতের ভূমিকা কতটা থাকবে? হেফাজত এই ঐক্যপ্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী বা তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কতটা ভূমিকা রাখবে, সে বিষয়েও দলগুলোর প্রস্তাবনায় ভিন্নতা রয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রস্তাবনায় হেফাজতের মধ্যস্থতায় ঐক্যের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনও হেফাজতের তত্ত্বাবধান বা নিগরানিতে ঐক্যের পক্ষে। খেলাফত মজলিসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের চলার পথ ও কৌশল নিজেরাই নির্ধারণ করা উচিত। তবে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ইসলামী ঐক্যজোটের এ বিষয়ে অবস্থান এখনো বিস্তারিত জানা যায়নি। শর্ত ভাঙলে কী হবে? ঐক্যের শর্ত ভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট দলের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়েও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রস্তাবনায় কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। দলটির নেতা সুলতান মহিউদ্দীন বলেন, কোনো দলের নীতি, আদর্শ বা কর্মকাণ্ড আকিদাবিরোধী হলে উপদেষ্টা পরিষদ সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। ইসলামী ঐক্যজোটও আকিদা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে একই ধরনের অবস্থানের কথা জানিয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রস্তাবনায় হেফাজতের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতৃত্বশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও শর্ত রাখা হয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ঐক্যের বাইরে কোনো রাজনৈতিক পক্ষকে হেফাজতের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতৃত্বশীল ব্যক্তিরা সমর্থন দিতে পারবেন না। মূল পার্থক্য কোথায়? সাত দলের বক্তব্যে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বড় ধরনের বিরোধ নেই। তবে ঐক্যটি কী ধরনের হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ চাইছে রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে সাত দলের ঐক্য, জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে সমন্বিতভাবে অংশগ্রহণ এবং অন্য রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে আলাদা সমঝোতা না করা। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ জোর দিচ্ছে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নীতি ও আদর্শের ওপর অবিচল থাকা এবং একটি বিশেষ ফোরামের মাধ্যমে ঐক্যের কার্যক্রম পরিচালনার ওপর। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস চাইছে সমমনা কওমিপন্থি দলগুলোর ঐক্য বজায় থাকুক, তবে রাজনৈতিক ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তে প্রতিটি দলের নিজস্ব এখতিয়ার থাকুক। একই সঙ্গে দলটি তাদের বর্তমান রাজনৈতিক জোটে থাকার বিষয়টিকেও নতুন ঐক্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করছে না। খেলাফত মজলিস চাইছে নতুন ঐক্যে যুক্ত দলগুলো অন্য কোনো জোটে একসঙ্গে না থাকুক। তবে দলগুলোর নিজেদের রাজনৈতিক কৌশল নিজেরাই নির্ধারণের পক্ষে তারা। বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি সমমনা দলগুলোর ঐক্যের কথা বলেছে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে সক্রিয় থাকার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন চায় হেফাজতের তত্ত্বাবধানে কওমি স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে নতুন ঐক্য গড়ে উঠুক। একই সঙ্গে অন্য বড় রাজনৈতিক দল বা জোটের সংস্রব ত্যাগ করে নতুন জোটে যুক্ত হওয়া এবং সমন্বয় কমিটি বা মজলিসে শূরার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। ইসলামী ঐক্যজোট চায় ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা প্রাধান্য পাক এবং কেউ তা লঙ্ঘন করলে ঐক্যে রাখা না হয়। শনিবারের বৈঠকের দিকে নজর সাত দলের প্রস্তাবনার এসব বিষয় নিয়ে এখনো হেফাজতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। প্রস্তাবনাগুলো নিয়ে আলোচনা করেই পরবর্তী কাঠামো নির্ধারণের কথা রয়েছে। হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী জানান, সাত দলের ঐক্য ও তাদের প্রস্তাবিত রূপরেখা নিয়ে দায়িত্বশীলরা বৈঠক করবেন। শনিবার ঢাকায় অনুষ্ঠেয় বৈঠকের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হতে পারে। ফলে ওই বৈঠকেই স্পষ্ট হতে পারে, সাত দলের প্রস্তাবনার কোন কোন বিষয় গ্রহণ করা হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটি আদর্শিক সমঝোতা, নাকি একটি কার্যকর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
গণভোটের রায় প্রতিষ্ঠিত হলে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমদ রাষ্ট্রতপতি হতেন বলে মনে করছে জামায়াতে ইসলামী। বৃহস্পতিবার ( ১২ আগস্ট) তার পক্ষে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে এ মন্তব্য করেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। জামায়াতের এই নেতা বলেন, সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত দিতে পারার কথা ছিল। গণভোটের রায় প্রতিষ্ঠিত হলে কর্নেল অলি বিপুল ভোটে বিজয়ী হতেন সাংসদদের ভোটে। গণভোটের রায় কার্যকর করলে বিএনপি বিতর্কমুক্ত থাকতে পারতো। সচিবালয়ে রাজনৈতিক দলের শীর্ষ বৈঠক কাম্য নয় বলে এ সময় মন্তব্য করেন হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। সব তথ্য উপাত্ত সুনিপুনভাবে জমা দেওয়া হয়েছে। এ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ব্যতিক্রম। বরাবর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকেই প্রার্থী দিতে দেখা গেছে। এবার ১১ দল প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র চর্চার নতুন ধারা তৈরি করতে ১১ দল প্রার্থী দিয়েছে। হার–জিত ১১ দলের কাছে মুখ্য নয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতাই মূল। বিএনপি কলা কৌশল করে সংসদে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে।
থাইরয়েডের সমস্যা এখন অনেকের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। শরীরের ওজন হঠাৎ বেড়ে বা কমে যাওয়া, সবসময় ক্লান্ত লাগা, চুল পড়া, মাসিক অনিয়ম কিংবা হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে থাইরয়েডের সমস্যা আছে কি না, তা নিয়ে সচেতন হওয়া দরকার। থাইরয়েড হলো গলার সামনের দিকে থাকা ছোট, প্রজাপতির মতো একটি গ্রন্থি। এটি শরীরের শক্তি ব্যবহার, তাপমাত্রা, হৃদস্পন্দন, ওজনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। থাইরয়েড বেশি সক্রিয় হলে তাকে অতিসক্রিয় থাইরয়েড এবং কম সক্রিয় হলে স্বল্পসক্রিয় থাইরয়েড বলা হয়। তবে ঘরে বসে থাইরয়েডের সমস্যা পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায় না। আয়নার সামনে ঘাড় পরীক্ষা করে শুধু কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন বোঝা সম্ভব। নিশ্চিত হতে রক্ত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। ঘরে বসে ঘাড় পরীক্ষা করবেন যেভাবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, কয়েকটি সহজ ধাপে ঘাড় পরীক্ষা করা যায়। প্রথমে আয়নার সামনে দাঁড়ান। ভালো আলোতে দাঁড়িয়ে গলার নিচের অংশ পরিষ্কারভাবে দেখুন। থাইরয়েডের জায়গাটি চিহ্নিত করুন। এটি চিবুকের নিচে ও কলারবোনের ওপরের দিকে গলার সামনের অংশে থাকে। ঘাড় সামান্য পেছনে হেলান। এরপর এক চুমুক পানি পান করুন। পানি গেলার সময় ঘাড়ের দিকে তাকান। গলার ওই অংশে কোনো ফোলা, পিণ্ড, উঁচু হয়ে থাকা জায়গা বা অস্বাভাবিক নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে কি না, খেয়াল করুন। কয়েকবার পানি পান করে একইভাবে দেখুন। কোনো অস্বাভাবিকতা চোখে পড়লে নিজে থেকে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। থাইরয়েড কম কাজ করলে থাইরয়েড কম সক্রিয় হলে শরীরের বিভিন্ন কাজ ধীর হয়ে যেতে পারে। তখন দেখা দিতে পারে— সবসময় ক্লান্ত বা দুর্বল লাগা কারণ ছাড়াই ওজন বেড়ে যাওয়া ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া চুল পাতলা হয়ে যাওয়া বা বেশি পড়া কোষ্ঠকাঠিন্য মন খারাপ বা বিষণ্নতা অন্যদের তুলনায় বেশি ঠান্ডা লাগা মাসিক অনিয়ম শরীরে শক্তি কমে যাওয়া থাইরয়েড বেশি কাজ করলে থাইরয়েড বেশি সক্রিয় হলে শরীরের অনেক কাজ দ্রুত হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে— কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া অতিরিক্ত ঘাম হওয়া শরীর কাঁপা অস্থিরতা বা দুশ্চিন্তা ঘুমের সমস্যা গরম সহ্য না হওয়া যেসব লক্ষণ অবহেলা করবেন না ঘাড়ে দৃশ্যমান ফোলা বা পিণ্ড দেখা গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। বিশেষ করে পিণ্ড দ্রুত বড় হতে থাকলে, খাবার বা পানি গিলতে সমস্যা হলে, গলায় চাপ বা ভার অনুভূত হলে, কণ্ঠস্বর বসে গেলে কিংবা শ্বাস নিতে কষ্ট হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ঘাড়ে কোনো পিণ্ড দেখা গেলেই সেটি ক্যানসার—এমন নয়। থাইরয়েডের অনেক পিণ্ড ক্ষতিকর নয়। তবে পিণ্ডের ধরন জানতে চিকিৎসকের পরীক্ষা প্রয়োজন। প্রয়োজনে আল্ট্রাসনোগ্রাম ও কোষের পরীক্ষা করা হতে পারে। কারা বেশি ঝুঁকিতে থাইরয়েডের সমস্যা যে কারও হতে পারে। তবে নারীদের মধ্যে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া ৬০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি, পরিবারে থাইরয়েড রোগের ইতিহাস থাকা ব্যক্তি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি এবং গর্ভাবস্থা বা সন্তান জন্মের পরের সময়ে নারীদের ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে। শরীরে আয়োডিনের ঘাটতিও থাইরয়েড সমস্যার একটি কারণ হতে পারে। কোন রক্ত পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায় শুধু ঘাড় দেখে বা লক্ষণ মিলিয়ে থাইরয়েডের সমস্যা নিশ্চিত করা যায় না। চিকিৎসকের পরামর্শে কয়েকটি রক্ত পরীক্ষা করা হয়। থাইরয়েড উদ্দীপক হরমোন পরীক্ষা: থাইরয়েড স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে কি না, তা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। মুক্ত থাইরক্সিন পরীক্ষা: রক্তে সক্রিয় থাইরক্সিনের মাত্রা জানতে করা হয়। মুক্ত ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন পরীক্ষা: বিশেষ করে থাইরয়েড বেশি সক্রিয় কি না, তা বুঝতে এই পরীক্ষা করা হতে পারে। থাইরয়েড অ্যান্টিবডি পরীক্ষা: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাইরয়েডকে আক্রমণ করছে কি না, তা বোঝার জন্য করা হয়। কোন পরীক্ষা প্রয়োজন এবং পরীক্ষার ফলাফলের অর্থ কী—তা চিকিৎসকই ঠিক করবেন। ঘরে পরীক্ষা কেন যথেষ্ট নয় ঘাড়ে কোনো ফোলা বা পিণ্ড না থাকলেও থাইরয়েডের সমস্যা থাকতে পারে। আবার ঘাড়ে সামান্য পরিবর্তন দেখা গেলেও সেটি থাইরয়েডের সমস্যা নাও হতে পারে। তাই ঘরে বসে করা পরীক্ষা শুধু প্রাথমিকভাবে সতর্ক হওয়ার একটি উপায়। কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্লান্তি, ওজনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন, মাসিকের অনিয়ম, চুল পড়া, হৃদস্পন্দনের পরিবর্তন বা অন্য কোনো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পরিবারে থাইরয়েড রোগের ইতিহাস থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। শরীরে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে সেটি দীর্ঘদিন অবহেলা না করাই ভালো। সময়মতো পরীক্ষা করলে থাইরয়েডের সমস্যা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব। সূত্র: এনডিটিভি