এবার কোরবানি ঈদের আগে নারায়ণগঞ্জের একটি খামারে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের একটি মহিষ নিয়ে বেশ আলোচনা তৈরি হয়। সাদা-ক্রিম রঙের শরীর, মাথায় সোনালি ঝুঁটির মতো লোম, গোলাপি আভাযুক্ত নাক—সব মিলিয়ে মহিষটি দ্রুত মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রে চলে আসে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর মহিষটি দ্রুত ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ হয়ে ওঠে; পরে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও জায়গা করে নেয়।
সংবাদমাধ্যমে মহিষটির ওজন প্রায় ৭০০ কেজি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কেউ একে বিরল প্রজাতির মহিষ বলছেন, কেউ বলছেন বিদেশি জাত, আবার কেউ বলছেন অদ্ভুত বা অলৌকিক প্রাণী। ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—এই মহিষটি কি সত্যিই কোনো বিরল প্রজাতির?
প্রাণিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকার। অ্যালবিনো মহিষ কোনো আলাদা জাত বা প্রজাতি নয়। এটি মহিষের শরীরে দেখা দেওয়া একটি বিরল জিনগত বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ কোনো মহিষের গায়ের রং সাদা, ক্রিম বা ফ্যাকাশে হলেই সেটি নতুন জাতের মহিষ হয়ে যায় না।
অ্যালবিনিজম সত্যিকার অর্থে একধরনের জিনগত অবস্থা। এটি বিরল, তবে এটি কোনো জাত নয়। জিনগত পরিবর্তনের কারণে প্রাণীর দেহে মেলানিন নামের রং সৃষ্টিকারী পদার্থ কমে গেলে বা না থাকলে এমন রং দেখা যায়।
মেলানিন হলো প্রাণীর শরীরের স্বাভাবিক রং তৈরির প্রধান উপাদান। মানুষের চুল, ত্বক ও চোখের রং যেমন মেলানিনের ওপর নির্ভর করে, তেমনি গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, হরিণ, পাখিসহ অনেক প্রাণীর গায়ের রংও মেলানিনের কারণে তৈরি হয়।
যে প্রাণীর শরীরে মেলানিন বেশি থাকে, তার রং সাধারণত গাঢ় হয়। আর মেলানিন কম থাকলে বা অনুপস্থিত থাকলে শরীরের রং সাদা, ক্রিম, ফ্যাকাশে বা গোলাপি আভাযুক্ত হতে পারে।
বাংলাদেশে সাধারণত মহিষের গায়ের রং কালো বা গাঢ় ধূসর। কারণ, তাদের শরীরে রং সৃষ্টিকারী পদার্থ স্বাভাবিকভাবে বেশি থাকে। কিন্তু কোনো মহিষের শরীরে জন্মগত কারণে এই পদার্থ তৈরি কম হলে তার রং স্বাভাবিক কালো না হয়ে সাদা বা ফ্যাকাশে হতে পারে।
প্রাণীর শরীরের রং, লোমের ধরন, শিংয়ের গঠন, চোখের রং—এসব অনেক কিছু নির্ভর করে জিনের ওপর। জিন হলো শরীরের ভেতরের একধরনের নির্দেশনা, যা মা-বাবা থেকে সন্তানের মধ্যে আসে। কখনো কখনো এই জিনে পরিবর্তন ঘটে।
সেই পরিবর্তনের ফলে শরীরে মেলানিন তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। তখন প্রাণীর গায়ের রং স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক হালকা হয়ে যায়। এটাই অ্যালবিনিজমের মূল কারণ। সহজভাবে বলা যায়, এটি কোনো খাবার, ওষুধ, খামারির বিশেষ কৌশল বা পরিবেশের কারণে হয় না। এটি জন্মগত জিনগত বৈশিষ্ট্য।
হ্যাঁ, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাদা বা অ্যালবিনো মহিষের ঘটনা আগে দেখা গেছে। তাই নারায়ণগঞ্জের ভাইরাল ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষটি একেবারে পৃথিবীর প্রথম ঘটনা নয়। তবে বাংলাদেশে এ ধরনের মহিষ খুবই বিরল। ব্রাজিলে মুররাহ জাতের মহিষের একটি পালে অ্যালবিনিজম নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে।
ওই গবেষণায় দেখা যায়, মেলানিন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ জিনে পরিবর্তনের কারণে মহিষগুলোর শরীরে অ্যালবিনো বৈশিষ্ট্য দেখা দেয়। অর্থাৎ মহিষের মধ্যেও অ্যালবিনিজম বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত ঘটনা।
থাইল্যান্ডেও সাদা বা অ্যালবিনো মহিষ নিয়ে মানুষের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। দেশটির বিভিন্ন মহিষ প্রদর্শনীতে সাদা মহিষ দেখা যায়। সাম্প্রতিক সময়েও সেখানে দামি সাদা মহিষ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ‘সাদা মহিষ’ নামে যেসব ঘটনা আলোচিত হয়, তার সবই আমাদের দেশের পানিমহিষ নয়। কোনোটি হতে পারে বাইসন, কোনোটি হতে পারে অন্য ধরনের প্রাণী, আবার কোনোটি হতে পারে আংশিক রংহীন। তাই সব সাদা প্রাণীকে একভাবে অ্যালবিনো বলা ঠিক নয়।
না, সাদা বা ফ্যাকাশে রঙের সব প্রাণী অ্যালবিনো নয়। কোনো প্রাণীর গায়ে সাদা দাগ থাকতে পারে, কোনো প্রাণী আংশিক সাদা হতে পারে, আবার কোনো জাতের প্রাণীর রং স্বাভাবিকভাবেই হালকা হতে পারে। অ্যালবিনো প্রাণীর ক্ষেত্রে সাধারণত শরীরের রং খুব ফ্যাকাশে হয়। চোখ, নাক, মুখের চারপাশ বা ত্বকে গোলাপি আভা দেখা যেতে পারে। তবে শুধু চোখে দেখে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায় না। নিশ্চিত হতে হলে পশুচিকিৎসা পরীক্ষা, শরীরের রং পর্যবেক্ষণ, বংশগত তথ্য এবং প্রয়োজনে জিন পরীক্ষা দরকার।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও বর্ণনা অনুযায়ী, মহিষটির শরীরে অস্বাভাবিকভাবে ফ্যাকাশে রং, মাথায় সোনালি ধরনের লোম এবং গোলাপি আভাযুক্ত অংশ রয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্য অ্যালবিনিজম বা রং-ঘাটতির সঙ্গে মেলে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও এটিকে বিরল অ্যালবিনো মহিষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বৈজ্ঞানিকভাবে সবচেয়ে সতর্ক ভাষা হলো—মহিষটি সম্ভবত অ্যালবিনিজম বা জিনগত রং-ঘাটতিযুক্ত। কিন্তু এটি কোনো আলাদা প্রজাতি নয়।
মেলানিন শুধু শরীরে রং দেয় না, সূর্যের তীব্র আলো থেকে শরীরকে কিছুটা সুরক্ষাও দেয়। তাই যেসব প্রাণীর শরীরে মেলানিন কম থাকে, তারা তীব্র রোদ ও আলোতে বেশি সংবেদনশীল হতে পারে। চোখেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ধরনের প্রাণীর জন্য ছায়াযুক্ত পরিবেশ, পর্যাপ্ত পানি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সুষম খাদ্য, নিয়মিত পশুচিকিৎসকের নজরদারি এবং অতিরিক্ত ভিড় থেকে দূরে রাখা জরুরি। ভাইরাল হওয়ার কারণে যদি মানুষ ভিড় করে, শব্দ করে, ছবি তোলে বা প্রাণীটিকে বারবার নাড়াচাড়া করে, তাহলে প্রাণীটি মানসিক চাপে পড়তে পারে। প্রাণী যতই বিরল বা আকর্ষণীয় হোক, তার কল্যাণ আগে ভাবতে হবে।
‘বিরল প্রজাতির মহিষ’—এ ধরনের শব্দ শুনতে আকর্ষণীয় হলেও তা বিভ্রান্তিকর। কারণ প্রজাতি, জাত ও জিনগত বৈশিষ্ট্য এক জিনিস নয়। প্রজাতি মানে প্রাণীর বড় বৈজ্ঞানিক পরিচয়। জাত মানে একই প্রাণীর ভেতরে আলাদা গোষ্ঠী বা ধরন। জিনগত বৈশিষ্ট্য মানে জন্মগত কোনো বিশেষ লক্ষণ, যা শরীরে প্রকাশ পেতে পারে। তাই ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষকে বিরল প্রজাতি বলা ঠিক নয়। বরং বলা উচিত—বিরল জিনগত বৈশিষ্ট্যযুক্ত মহিষ।
‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামে ভাইরাল মহিষটি নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী চেহারার কারণে মানুষের মনোযোগ কেড়েছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে এটি কোনো নতুন জাত, নতুন প্রজাতি বা অলৌকিক প্রাণী নয়। অ্যালবিনিজম সত্যিকার অর্থে একধরনের জিনগত অবস্থা। এটি বিরল, তবে এটি মহিষের কোনো জাত নয়। জিনগত পরিবর্তনের ফলে শরীরে মেলানিন কমে গেলে বা অনুপস্থিত থাকলে প্রাণীর গায়ের রং এমন সাদা, ক্রিম বা ফ্যাকাশে হতে পারে। যেকোনো জাতের মহিষে বিরলভাবে এমন বৈশিষ্ট্য দেখা যেতে পারে।
তাই সবচেয়ে সহজ ও সঠিক কথা হলো, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষটি বিরল, কিন্তু বিরল প্রজাতির নয়; এটি বিরল জিনগত বৈশিষ্ট্যযুক্ত একটি মহিষ।
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির শিক্ষক, গবেষক ও লেখক, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। akmhumayun@cvasu.ac.bd
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়টি নির্বাচন কমিশন (ইসি) সাংবিধানিক এখতিয়ার বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শনিবার (১ আগস্ট) রাতে বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, আজকের স্থায়ী কমিটির মিটিংটি ছিল একটি রুটিন মিটিং। সেখানে দেশের সার্বিক রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হলে মাননীয় স্পিকার অস্থায়ীভাবে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন এবং ৯০ দিনের মধ্যে এই নির্বাচন সম্পন্ন করার নিয়ম রয়েছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, নির্বাচন কমিশন যখনই তফসিল ঘোষণা করবে, তখনই দলীয় প্রার্থিতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রার্থী চূড়ান্ত করার সার্বিক দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যানকে অর্পণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘তফসিল ঘোষণার পর মনোনয়নপত্র জমা ও যাচাই-বাছাই হবে। একক প্রার্থী হলে ভোটের প্রয়োজন পড়বে না; তবে একাধিক প্রার্থী থাকলে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করে স্পিকারের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন ভোট গ্রহণের দিন নির্ধারণ করবে।’ স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী এ বছরের শেষ দিকে কিংবা আগামী বছরের শুরুর দিকে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দল সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি বজায় রাখছে। এর আগে গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক শুরু হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের বিষয়ে আলোচনা ছাড়াও দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও দলের বিভিন্ন বিষয় এবং আগামী দিনের কর্মপন্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠক দেড় ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খান, সালাহউদ্দিন আহমদ, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান এবং ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
রাষ্ট্রপতি পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন—এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও জনমনে জোর আলোচনা চলছে। বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা এবং দলের বাইরের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম আলোচনায় থাকলেও, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে সংসদনেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, অতীতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার তাড়াহুড়া করতে চাইছে না বিএনপি। বরং দলীয় আনুগত্যের পাশাপাশি দক্ষতা, বিচক্ষণতা, সাহসিকতা এবং সর্বজনগ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে দলটি। বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রে দলটি মূলত তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। প্রথমত, দেশ ও দলের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। দ্বিতীয়ত, দক্ষতা, প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতা। তৃতীয়ত, জাতীয় সংকটে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার মতো সাহসিকতা। দলটির নেতারা মনে করেন, অতীতের অভিজ্ঞতায় শুধু দলীয় আনুগত্য যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত হলেও রাজনৈতিক সংকটের সময়ে তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ক্ষেত্রে দলীয় প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। রাষ্ট্রপতি থাকাকালে কয়েকটি সিদ্ধান্ত ও অবস্থানের কারণে বিএনপির সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। পরে তিনি পদত্যাগ করেন এবং পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক অবস্থানও বিএনপিবিরোধী হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য থাকলেও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও নেতৃত্বের অভাব ছিল বলে বিএনপির ভেতরে মূল্যায়ন রয়েছে। অনেকের মতে, ওই সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার পরিণতিতে এক-এগারোর জরুরি সরকারের পথ তৈরি হয়। তবে ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের ভূমিকা বিএনপির কাছে ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। দলটির মতে, সে সময় তার দৃঢ় অবস্থানের কারণে সেনাপ্রধান লে. জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়া উচিত সৎ, মর্যাদাসম্পন্ন ও সর্বজনগ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তি। তার ভাষায়, রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের এক নম্বর ব্যক্তি। তাই এ পদে এমন একজনকে বসানো প্রয়োজন, যিনি ব্যক্তিগত সততা, গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদার প্রতীক হবেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরীও মনে করেন, নিছক দলীয় বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সমীচীন নয়। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত হলেও জাতীয় সংকটের সময়ে রাষ্ট্রপ্রধানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। তাই এমন একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি করা উচিত, যিনি কোনো দলের প্রতি অন্ধভাবে অনুগত না হয়ে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেবেন। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, যিনি প্রকৃত অর্থে দেশের অভিভাবক হতে পারবেন, তাকেই রাষ্ট্রপতি করা উচিত। তার মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জাতীয় স্বার্থ ও গ্রহণযোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারও বলেন, ‘দেশের রাষ্ট্রপতি হতে হবে একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক এবং পূর্ণাঙ্গ অর্থে দলনিরপেক্ষ ব্যক্তি। রাষ্ট্রপতি পদটি যেন কোনো দলীয় অন্ধ আনুগত্য বা কানাঘুষার কেন্দ্রবিন্দু না হয়। যিনি রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হবেন; জনগণ, দেশ এবং সংবিধানের প্রতি তার সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। বিশেষ করে, যে কোনো বিদেশি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তাকে শক্ত ও অনড় অবস্থান নিতে হবে। অতীতে আমরা রাজনীতি ও দলীয় প্রভাবমুক্ত রাষ্ট্রপতি খুব কমই দেখেছি। কিন্তু দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে ও বর্তমান প্রেক্ষাপটে, মানুষ দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে সক্ষম-এমন একজন নিরপেক্ষ ও যোগ্য রাষ্ট্রপতিই প্রত্যাশা করে।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা। বিতর্ক এড়িয়ে যোগ্য, গ্রহণযোগ্য ও সংকট মোকাবিলায় সক্ষম ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নিতে চায় বিএনপি।
নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস (এনআই) অ্যাক্টের অধীনে দায়ের করা চেক ডিজঅনার মামলার মূল উদ্দেশ্য চেকের অর্থ আদায় নিশ্চিত করা, আসামিকে কারাগারে পাঠানো নয়—এমন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, এ ধরনের মামলায় কারাদণ্ড শুধুমাত্র বিশেষ ও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে দেওয়া উচিত। ‘মো. আলাউদ্দিন বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য’ মামলায় বিচারপতি ড. মো. বশির উল্লাহর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২২ জুলাই এ রায় দেন। রায়ের লিখিত অনুলিপি বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) প্রকাশ করা হয়েছে। রায়ে বিচারিক আদালতের দেওয়া ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বহাল রাখা হলেও আসামির ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বাতিল করা হয়েছে। ‘কারাদণ্ড কঠোর শাস্তি, অর্থ আদায়ই আইনের উদ্দেশ্য’ রায়ে হাইকোর্ট বলেন, এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার মামলার মূল লক্ষ্য হলো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পাওনা অর্থ আদায় নিশ্চিত করা। কারাদণ্ড এই আইনের প্রধান উদ্দেশ্য নয় এবং তা কেবল বিশেষ পরিস্থিতিতেই প্রযোজ্য হওয়া উচিত। আদালত ‘আমান উল্লাহ বনাম রাষ্ট্র’ মামলার নজির উল্লেখ করে বলেন, চেক ডিজঅনার মামলায় কারাদণ্ড একটি অত্যন্ত কঠোর শাস্তি, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনটির উদ্দেশ্য পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখে না। আদালত ওই নীতির সঙ্গে পূর্ণ একমত পোষণ করেন। যেভাবে শুরু হয় মামলা মামলার নথি অনুযায়ী, গবাদিপশুর ব্যবসার জন্য মো. আলাউদ্দিন বরিশালের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা ঋণ নেন। পরে ঋণ পরিশোধের জন্য তিনি রূপালী ব্যাংক, বরিশাল বাজার রোড শাখার একটি চেক দেন। ২০২০ সালের ২ নভেম্বর চেকটি ব্যাংকে জমা দিলে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় তা ডিজঅনার হয়। এরপর আইনি নোটিশ দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করায় ২০ ডিসেম্বর ২০২০ এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়। নিম্ন আদালতের রায় বহাল থাকেনি ২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি বরিশালের তৃতীয় যুগ্ম দায়রা জজ আদালত মো. আলাউদ্দিনকে দোষী সাব্যস্ত করে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং চেকের সমপরিমাণ ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেন। পরবর্তীতে অর্থদণ্ডের অর্ধেক অর্থ জমা দিয়ে তিনি আপিল করেন। তবে আপিল আদালত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড বহাল রেখে আপিল খারিজ করে দেন। এরপর তিনি হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন। হাইকোর্টের চূড়ান্ত নির্দেশ হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের অর্থদণ্ড বহাল রেখে কারাদণ্ডের অংশ বাতিল করেন। একই সঙ্গে রায়ের কপি পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে অবশিষ্ট ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত আরও বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ না করলে আসামিকে দুই মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। তবে কারাদণ্ড ভোগ করলেও অর্থদণ্ড পরিশোধের দায় থেকে তিনি মুক্ত হবেন না। প্রয়োজন হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারা অনুযায়ী আইনগত প্রক্রিয়ায় বকেয়া অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।