মতামত

‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের মহিষ: সত্যিই কি বিরল প্রজাতি?

এবার কোরবানি ঈদের আগে নারায়ণগঞ্জের একটি খামারে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের একটি মহিষ নিয়ে বেশ আলোচনা তৈরি হয়। সাদা-ক্রিম রঙের শরীর, মাথায় সোনালি ঝুঁটির মতো লোম, গোলাপি আভাযুক্ত নাক—সব মিলিয়ে মহিষটি দ্রুত মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রে চলে আসে।   সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর মহিষটি দ্রুত ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ হয়ে ওঠে; পরে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও জায়গা করে নেয়।   সংবাদমাধ্যমে মহিষটির ওজন প্রায় ৭০০ কেজি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কেউ একে বিরল প্রজাতির মহিষ বলছেন, কেউ বলছেন বিদেশি জাত, আবার কেউ বলছেন অদ্ভুত বা অলৌকিক প্রাণী। ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—এই মহিষটি কি সত্যিই কোনো বিরল প্রজাতির?   প্রাণিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকার। অ্যালবিনো মহিষ কোনো আলাদা জাত বা প্রজাতি নয়। এটি মহিষের শরীরে দেখা দেওয়া একটি বিরল জিনগত বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ কোনো মহিষের গায়ের রং সাদা, ক্রিম বা ফ্যাকাশে হলেই সেটি নতুন জাতের মহিষ হয়ে যায় না। অ্যালবিনিজম আসলে কী অ্যালবিনিজম সত্যিকার অর্থে একধরনের জিনগত অবস্থা। এটি বিরল, তবে এটি কোনো জাত নয়। জিনগত পরিবর্তনের কারণে প্রাণীর দেহে মেলানিন নামের রং সৃষ্টিকারী পদার্থ কমে গেলে বা না থাকলে এমন রং দেখা যায়। মেলানিন হলো প্রাণীর শরীরের স্বাভাবিক রং তৈরির প্রধান উপাদান। মানুষের চুল, ত্বক ও চোখের রং যেমন মেলানিনের ওপর নির্ভর করে, তেমনি গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, হরিণ, পাখিসহ অনেক প্রাণীর গায়ের রংও মেলানিনের কারণে তৈরি হয়। যে প্রাণীর শরীরে মেলানিন বেশি থাকে, তার রং সাধারণত গাঢ় হয়। আর মেলানিন কম থাকলে বা অনুপস্থিত থাকলে শরীরের রং সাদা, ক্রিম, ফ্যাকাশে বা গোলাপি আভাযুক্ত হতে পারে। বাংলাদেশে সাধারণত মহিষের গায়ের রং কালো বা গাঢ় ধূসর। কারণ, তাদের শরীরে রং সৃষ্টিকারী পদার্থ স্বাভাবিকভাবে বেশি থাকে। কিন্তু কোনো মহিষের শরীরে জন্মগত কারণে এই পদার্থ তৈরি কম হলে তার রং স্বাভাবিক কালো না হয়ে সাদা বা ফ্যাকাশে হতে পারে। কেন এমন হয় প্রাণীর শরীরের রং, লোমের ধরন, শিংয়ের গঠন, চোখের রং—এসব অনেক কিছু নির্ভর করে জিনের ওপর। জিন হলো শরীরের ভেতরের একধরনের নির্দেশনা, যা মা-বাবা থেকে সন্তানের মধ্যে আসে। কখনো কখনো এই জিনে পরিবর্তন ঘটে। সেই পরিবর্তনের ফলে শরীরে মেলানিন তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। তখন প্রাণীর গায়ের রং স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক হালকা হয়ে যায়। এটাই অ্যালবিনিজমের মূল কারণ। সহজভাবে বলা যায়, এটি কোনো খাবার, ওষুধ, খামারির বিশেষ কৌশল বা পরিবেশের কারণে হয় না। এটি জন্মগত জিনগত বৈশিষ্ট্য।   পৃথিবীতে কি এ রকম ঘটনা আগে ঘটেছে   হ্যাঁ, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাদা বা অ্যালবিনো মহিষের ঘটনা আগে দেখা গেছে। তাই নারায়ণগঞ্জের ভাইরাল ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষটি একেবারে পৃথিবীর প্রথম ঘটনা নয়। তবে বাংলাদেশে এ ধরনের মহিষ খুবই বিরল। ব্রাজিলে মুররাহ জাতের মহিষের একটি পালে অ্যালবিনিজম নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে।   ওই গবেষণায় দেখা যায়, মেলানিন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ জিনে পরিবর্তনের কারণে মহিষগুলোর শরীরে অ্যালবিনো বৈশিষ্ট্য দেখা দেয়। অর্থাৎ মহিষের মধ্যেও অ্যালবিনিজম বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত ঘটনা।   থাইল্যান্ডেও সাদা বা অ্যালবিনো মহিষ নিয়ে মানুষের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। দেশটির বিভিন্ন মহিষ প্রদর্শনীতে সাদা মহিষ দেখা যায়। সাম্প্রতিক সময়েও সেখানে দামি সাদা মহিষ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ‘সাদা মহিষ’ নামে যেসব ঘটনা আলোচিত হয়, তার সবই আমাদের দেশের পানিমহিষ নয়। কোনোটি হতে পারে বাইসন, কোনোটি হতে পারে অন্য ধরনের প্রাণী, আবার কোনোটি হতে পারে আংশিক রংহীন। তাই সব সাদা প্রাণীকে একভাবে অ্যালবিনো বলা ঠিক নয়।   সাদা হলেই কি অ্যালবিনো না, সাদা বা ফ্যাকাশে রঙের সব প্রাণী অ্যালবিনো নয়। কোনো প্রাণীর গায়ে সাদা দাগ থাকতে পারে, কোনো প্রাণী আংশিক সাদা হতে পারে, আবার কোনো জাতের প্রাণীর রং স্বাভাবিকভাবেই হালকা হতে পারে। অ্যালবিনো প্রাণীর ক্ষেত্রে সাধারণত শরীরের রং খুব ফ্যাকাশে হয়। চোখ, নাক, মুখের চারপাশ বা ত্বকে গোলাপি আভা দেখা যেতে পারে। তবে শুধু চোখে দেখে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায় না। নিশ্চিত হতে হলে পশুচিকিৎসা পরীক্ষা, শরীরের রং পর্যবেক্ষণ, বংশগত তথ্য এবং প্রয়োজনে জিন পরীক্ষা দরকার।   তাহলে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষটি কী? সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও বর্ণনা অনুযায়ী, মহিষটির শরীরে অস্বাভাবিকভাবে ফ্যাকাশে রং, মাথায় সোনালি ধরনের লোম এবং গোলাপি আভাযুক্ত অংশ রয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্য অ্যালবিনিজম বা রং-ঘাটতির সঙ্গে মেলে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও এটিকে বিরল অ্যালবিনো মহিষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।   তবে বৈজ্ঞানিকভাবে সবচেয়ে সতর্ক ভাষা হলো—মহিষটি সম্ভবত অ্যালবিনিজম বা জিনগত রং-ঘাটতিযুক্ত। কিন্তু এটি কোনো আলাদা প্রজাতি নয়।   প্রাণীর কল্যাণের প্রশ্ন মেলানিন শুধু শরীরে রং দেয় না, সূর্যের তীব্র আলো থেকে শরীরকে কিছুটা সুরক্ষাও দেয়। তাই যেসব প্রাণীর শরীরে মেলানিন কম থাকে, তারা তীব্র রোদ ও আলোতে বেশি সংবেদনশীল হতে পারে। চোখেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ধরনের প্রাণীর জন্য ছায়াযুক্ত পরিবেশ, পর্যাপ্ত পানি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সুষম খাদ্য, নিয়মিত পশুচিকিৎসকের নজরদারি এবং অতিরিক্ত ভিড় থেকে দূরে রাখা জরুরি। ভাইরাল হওয়ার কারণে যদি মানুষ ভিড় করে, শব্দ করে, ছবি তোলে বা প্রাণীটিকে বারবার নাড়াচাড়া করে, তাহলে প্রাণীটি মানসিক চাপে পড়তে পারে। প্রাণী যতই বিরল বা আকর্ষণীয় হোক, তার কল্যাণ আগে ভাবতে হবে।   গণমাধ্যমে শব্দ ব্যবহারে সতর্কতা ‘বিরল প্রজাতির মহিষ’—এ ধরনের শব্দ শুনতে আকর্ষণীয় হলেও তা বিভ্রান্তিকর। কারণ প্রজাতি, জাত ও জিনগত বৈশিষ্ট্য এক জিনিস নয়। প্রজাতি মানে প্রাণীর বড় বৈজ্ঞানিক পরিচয়। জাত মানে একই প্রাণীর ভেতরে আলাদা গোষ্ঠী বা ধরন। জিনগত বৈশিষ্ট্য মানে জন্মগত কোনো বিশেষ লক্ষণ, যা শরীরে প্রকাশ পেতে পারে। তাই ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষকে বিরল প্রজাতি বলা ঠিক নয়। বরং বলা উচিত—বিরল জিনগত বৈশিষ্ট্যযুক্ত মহিষ।   ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামে ভাইরাল মহিষটি নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী চেহারার কারণে মানুষের মনোযোগ কেড়েছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে এটি কোনো নতুন জাত, নতুন প্রজাতি বা অলৌকিক প্রাণী নয়। অ্যালবিনিজম সত্যিকার অর্থে একধরনের জিনগত অবস্থা। এটি বিরল, তবে এটি মহিষের কোনো জাত নয়। জিনগত পরিবর্তনের ফলে শরীরে মেলানিন কমে গেলে বা অনুপস্থিত থাকলে প্রাণীর গায়ের রং এমন সাদা, ক্রিম বা ফ্যাকাশে হতে পারে। যেকোনো জাতের মহিষে বিরলভাবে এমন বৈশিষ্ট্য দেখা যেতে পারে।   তাই সবচেয়ে সহজ ও সঠিক কথা হলো, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষটি বিরল, কিন্তু বিরল প্রজাতির নয়; এটি বিরল জিনগত বৈশিষ্ট্যযুক্ত একটি মহিষ।   ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির শিক্ষক, গবেষক ও লেখক, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। akmhumayun@cvasu.ac.bd

মোঃ ইমরান হোসেন মে ৩১, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
এ এক অশনিসংকেত

অবস্থাটি ভীতিকর, তার চেয়েও বেশি শঙ্কার। বিষয়টিকে কখনো বলা হচ্ছে ‘অদৃশ্য মহামারি’, কখনো তুলে ধরা হচ্ছে একটি ‘প্রচ্ছন্ন অসুখ বলে’। যারা এই ব‍্যাধির শিকার, তারা চিহ্নিত হচ্ছে ‘যন্ত্র-পর্দা আসক্ত’ বা ‘যন্ত্রে বন্দী প্রজন্ম’ হিসেবে। মা–বাবা, অভিভাবক, শিক্ষক, বয়োজ্যেষ্ঠ‍সহ গোটা সমাজই চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন।   ঢাকার বিভিন্ন স্কুলে একটি সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে যে বিভিন্ন যন্ত্র-পর্দা শিশু-কিশোর-কিশোরীদের গ্রাস করেছে—সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে যন্ত্রগুলো। এমনটাই আন্দাজ করা গিয়েছিল। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইসিডিডিআরবি) ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল সময়কালে ঢাকার তিনটি বাংলা মাধ্যম এবং তিনটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ৬ থেকে ১৪ বছরের ৪২০ জন ছেলেমেয়ের ওপর এই সমীক্ষা চালিয়েছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ঢাকা শহরের ৬ থেকে ১৪ বছরের শিশু-কিশোর-কিশোরীরা প্রতিদিন প্রায় ৫ ঘণ্টা সময় কাটায় যন্ত্র-পর্দা দেখে। প্রায় ৮৩ শতাংশ শিশু-কিশোর-কিশোরীরা নির্দেশিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় চোখ আটকে রাখে পর্দায়। অন‍্য কথায়, প্রতি পাঁচজনের মধ্যে চারজনই সময়সীমা লঙ্ঘন করে। এর প্রতিক্রিয়াও সহজেই অনুমেয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে প্রতি ৩ জন শিশু-কিশোর-কিশোরীর ১ জন চোখের সমস্যায় ভুগছে; প্রতি ৫ জনের ৪ জনেরই নিয়মিত মাথাব‍্যথা হচ্ছে; ওজন বেড়ে যাচ্ছে ১৪ শতাংশ শিশু-কিশোর-কিশোরীর, প্রায় ২০ শতাংশের মানসিক স্বাস্থ্য বিঘ্নিত হচ্ছে এবং ঘুমের ব‍্যাঘাত ঘটছে। ফলে দেখা যাচ্ছে ছেলেমেয়েদের দেরিতে ঘুমানো, বারবার মাথাব্যথা কিংবা চোখের অস্বস্তি, খিটখিটে মেজাজ, নিজেকে গুটিয়ে ফেলা, পড়ায় কম মনোযোগ, খেলাধুলার প্রতি অনীহা ইত্যাদি। নানান সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যবহির্ভূত যেসব প্রতিক্রিয়া আছে, যা বর্তমান সমীক্ষায় আসেনি। প্রথমত, যন্ত্রের সঙ্গে বেশির ভাগ সময় কাটালে তা মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক এবং অন্তর্মুখী করে ফেলে, যা সামাজিক প্রক্রিয়ায় মানুষকে সীমিত করে ফেলে। সর্বদা পর্দায় দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখলে কথা বলার স্বাভাবিক প্রবণতা এবং সেই সঙ্গে আলাপচারিতার দক্ষতাও বিঘ্নিত হয়। সামাজিক মেলামেশা, অন‍্যদের সঙ্গে গল্প করা, সামাজিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণও তখন বোঝা বলে মনে হয়। সামাজিক মিথস্ক্রিয়া সেখানে বিঘ্নিত হয়। শিশু-কিশোর-কিশোরীদের সুস্থ মানসিক বিকাশে তা কাম‍্য হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, যন্ত্র-পর্দায় চোখ রাখা বেশির ভাগ শিশু-কিশোর-কিশোরীরা খেলাধুলা কিংবা বইপড়ায় খুব একটা আগ্রহী হয় না। মানি, খেলার মাঠের অপ্রতুলতা আছে। কিন্তু তার পরে যেটুকু আছে, তার তো ব‍্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু সমস‍্যা হচ্ছে যে যন্ত্র-পর্দায় আসক্ত ছেলেমেয়েরা মানসিকতার দিক থেকেই শারীরিক খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী হয় না। একই রকম অনীহা তাদের গড় ওঠে বই পড়াতেও। ফলে বইয়ের আনন্দময় জগৎ থেকেও তারা বঞ্চিত হয়। তৃতীয়ত, যন্ত্র-পর্দায় বিশাল সময়ে কাটালে ছেলেমেয়েদের শুধু যে সে পর্দায় আসক্তি কিংবা নির্ভরতা বাড়ে তা–ই নয়, অনেক সময় সে নির্ভরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে পর্দার যন্ত্রটি ছেলেমেয়েদের প্রাণভোমরা হয়ে দাঁড়ায় এবং সেটা থেকে কোনো রকমের বিযুক্তি তারা সহ‍্য করতে পারে না। নানান সময়ে দেখা গেছে যে এমন অবস্থা থেকে বহু মানসিক সমস্যার জন্ম হয়, যার ফলে অনেক অপঘাত ঘটে গেছে। ব‍্যক্তির জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য এটা অনভিপ্রেত। কেন ছেলেমেয়েরা ডিভাইসের প্রতি চরমভাবে আসক্ত? তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব তো সেখানে আছেই, যা অপ্রতিরোধ্য হলেও নিয়ন্ত্রিত করা যায় সুষ্ঠু ব‍্যবস্থাপনার মাধ্যমে। অল্প বয়সীরা বন্ধুবান্ধবের মাধ‍্যমেও যন্ত্র-পর্দায় উদ্বুদ্ধ হয়। অন‍্যান‍্যভাবে ব্যস্ত রাখার বিকল্প পন্থার অনুপস্থিতির ফলেও যন্ত্র-পর্দার দিকে তারা ঝোঁকে। মা–বাবার ব‍্যস্ততা এবং সময়ের অভাবও এখানে প্রভাব ফেলে। একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙন এবং পাড়া কিংবা মহল্লার মতো সামাজিক কাঠামোর বিলুপ্তি বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। শিশুদের খাওয়ানোর সমস‍্যা মোকাবিলায় যন্ত্র-পর্দার ব্যবহার আজ ঘরে ঘরে। প্রশ্ন হচ্ছে, কী করা যেতে পারে? অনেকেই বলেছেন যে ছেলেমেয়েদের যন্ত্র-পর্দা সময় দিনে দুই ঘণ্টার মধ‍্যেই বেঁধে দিতে। গবেষকেরা ছেলেমেয়েদের চোখের যত্নে ২০-২০-২০ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট যন্ত্র-পর্দা ব্যবহারের পরে ২০ ফুট কোনো একটি বস্তুর দিকে ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতে হবে। সেই সঙ্গে যন্ত্র-পর্দানির্ভর শিক্ষার কার্যকারিতার ব‍্যাপারেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে যন্ত্র-পর্দানির্ভর শিক্ষা সামনাসামনি শিক্ষার মতো কার্যকর নয়। মায়াবী নীল আলোর ক্ষতিকর প্রভাব এড়াতে বাচ্চাদের গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ছেলেমেয়েদের দলবদ্ধভাবে পড়াশোনা করা, পাঠাগারে যাওয়া, বাগান করাও যন্ত্র-পর্দা সময় কমিয়ে আনতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। ছেলেমেয়েদের যন্ত্র-পর্দা বেঁধে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কিছু নির্দেশিকা আছে। তাদের মতে, স্কুলগামী ছেলেমেয়েদের জন্য বিনোদনমূলক যন্ত্র-পর্দা সময় দুই ঘণ্টার মধ্যে থাকাই উচিত। দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের কোনো যন্ত্র-পর্দা সময় না রাখা এবং ৪ বছরের কম শিশুর জন্য যন্ত্র-পর্দা সময় প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা। নানান দেশ, যেমন অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এ নির্দেশিকাগুলো বাস্তবায়নের জন্য সচেষ্ট। যুক্তরাজ্য সরকার এ বছরের মার্চ মাসে একটি যন্ত্র-পর্দা সময় নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে যে দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুর জন্য প্রতিদিন সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা যন্ত্র-পর্দা সময় থাকা বাঞ্ছনীয়। তা ছাড়া শিশুদের একা যন্ত্র-পর্দা দেখার চেয়ে পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে দেখা ভালো বলে বলা হয়েছে। অস্ট্রেলীয় সরকার দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের কোনো যন্ত্র-পর্দা সময় না রাখার সুপারিশ করেছে। সেই সঙ্গে তারা বলেছে যে ৫ থেকে ১৭ বছরের ছেলেমেয়েদের জন্য বিনোদনমূলক যন্ত্র-পর্দা সময় দুই ঘণ্টার মধ্যে থাকাই উচিত। শিশু-কিশোর-কিশোরীদের জন্য সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারও সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এমন কোনো নির্দেশিকা নয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এমনটা থাকা দরকার এ বিষয়ে পারিবারিক কিংবা সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য। সবচেয়ে বড় কথা, প্রযুক্তির বিস্তার বন্ধ করা যাবে না। তবে সুষ্ঠু ব‍্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি সুষম ভারসাম্য সম্ভব।

মো: দেলোয়ার হোসাইন মে ২৯, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন খুলনার দর্শনীয় স্থানগুলো

নদী, বন, ঐতিহ্য, ইতিহাস আর আধুনিক বিনোদনের মিশেলে গড়ে ওঠা এই শহরে ঈদের ছুটিতে তৈরি হয় ভিন্ন এক উৎসবমুখর আবহ। কোথাও নদীর ঘাটে মানুষের ভিড়, কোথাও পার্কে শিশুদের উচ্ছ্বাস, আবার কোথাও সুন্দরবনের পথে পর্যটকদের ব্যস্ততা, সব মিলিয়ে খুলনা যেন হয়ে ওঠে জীবন্ত এক আনন্দ নগরী।   কম খরচে কাছাকাছি দূরত্বে একাধিক দর্শনীয় স্থান থাকায় পরিবার, বন্ধু কিংবা শিশুদের নিয়ে ঘুরতে খুলনাকে বেছে নিচ্ছেন অনেকেই। প্রকৃতির স্নিগ্ধতা আর ঐতিহ্যের ছোঁয়ায় ঈদের ছুটিতে খুলনার প্রতিটি গন্তব্যই এনে দেয় আলাদা অভিজ্ঞতা।   করমজল: একদিনেই সুন্দরবনের স্বাদ   দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে সুন্দরবন। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের প্রবেশদ্বার করমজল ঈদের সময় পর্যটকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ হয়ে ওঠে। নদীপথে বন ভ্রমণের সময় দুই পাশের সবুজ বন, পাখির ডাক আর নদীর শান্ত সৌন্দর্য ভ্রমণকে করে তোলে অন্যরকম। করমজলে রয়েছে কুমির প্রজনন কেন্দ্র, হরিণের অবাধ বিচরণ আর প্রাকৃতিক পরিবেশ কাছ থেকে দেখার সুযোগ। শিশুদের জন্য এটি যেমন আনন্দদায়ক, তেমনি শিক্ষামূলকও।   খুলনা শহর থেকে করমজলের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার। খুলনা থেকে মংলা হয়ে অথবা সরাসরি ট্রলার ও ইঞ্জিনচালিত নৌকায় সেখানে যাওয়া যায়। যাতায়াত খরচ সাধারণত ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে। প্রবেশ ফি প্রায় ২০ থেকে ৪০ টাকা।   ষাট গম্বুজ মসজিদ: ইতিহাসের সাক্ষী   ঐতিহাসিক ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ ঈদের ছুটিতে অন্যতম আকর্ষণ। ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের এই স্থাপনাটি মধ্যযুগীয় মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন। বিশাল গম্বুজ, প্রাচীন ইটের নির্মাণশৈলী আর চারপাশের শান্ত পরিবেশ ভ্রমণকারীদের ফিরিয়ে নেয় কয়েকশ বছর আগের ইতিহাসে। পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা এখানে ইতিহাসের সঙ্গে কাটান অন্যরকম সময়।   লনা শহর থেকে বাগেরহাটের দূরত্ব প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কিলোমিটার। বাস বা মাইক্রোবাসে যেতে সময় লাগে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। যাতায়াত খরচ সাধারণত ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা। প্রবেশ ফি বাংলাদেশিদের জন্য ৩০ টাকা।   শহীদ হাদীস পার্ক: নগরের ভেতরে সবুজের স্বস্তি   শহরের ভেতরে যারা থাকতে চান, তাদের জন্য রয়েছে শহীদ হাদিস পার্ক কিংবা স্থানীয় শিশু পার্কগুলো। খুলনা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত শহীদ হাদীস পার্ক ঈদের সময় পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা মানুষের ভিড়ে জমে ওঠে। সবুজ গাছপালা, খোলা মাঠ আর জলাধার মিলিয়ে এটি নগরের ভেতরে এক স্বস্তির জায়গা।   শিশুরা খেলাধুলায় মেতে ওঠে, আর বড়রা খোলা পরিবেশে কাটান নির্ভার কিছু সময়। বিকেলের দিকে পুরো পার্কজুড়ে তৈরি হয় প্রাণবন্ত পরিবেশ। শহরের যেকোনো স্থান থেকে রিকশা বা সিএনজিতে সহজেই এখানে পৌঁছানো যায়। যাতায়াত খরচ পড়ে প্রায় ২০ থেকে ৬০ টাকা। প্রবেশ ফি নেই।   রূপসা নদী ও খান জাহান আলী সেতু: সূর্যাস্তের রঙিন বিকেল   নদীমাতৃক খুলনার সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে রূপসা নদীর তীরে। বিশেষ করে বিকেলের সূর্যাস্তের সময় নদীর পানিতে লাল-কমলা আভা ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে মনোমুগ্ধকর।   খান জাহান আলী সেতু ঘিরে তরুণদের আড্ডা, ফটোগ্রাফি আর হাঁটাহাঁটিতে ঈদের সন্ধ্যাগুলো হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত। অনেকে শুধু সূর্যাস্ত দেখতেই ভিড় করেন নদীর ধারে। খুলনা শহর থেকেই রিকশা বা সিএনজিতে সহজে যাওয়া যায় এই এলাকায়। যাতায়াত খরচ সাধারণত ২০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে।     শিশুদের আনন্দে জমজমাট বিনোদন পার্কগুলো   ঈদের ছুটিতে শিশুদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে ওঠে খুলনার বিভিন্ন বিনোদন পার্ক। মুজগুন্নির উৎসব পার্ক, খালিশপুরের ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক ও জাহানাবাদ সেনানিবাস এলাকার বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে এ সময় উপচে পড়ে ভিড়। বিভিন্ন রাইড, খেলাধুলা আর খাবারের দোকান ঘিরে জমে ওঠে উৎসবের আমেজ।   পরিবার নিয়ে নিরাপদ ও আনন্দময় সময় কাটানোর জন্য এসব পার্ক বেশ জনপ্রিয়। রিকশা বা সিএনজিতে যেতে খরচ পড়ে সাধারণত ৩০ থেকে ১০০ টাকা। রাইড ও অন্যান্য বিনোদনের জন্য আলাদা খরচ হতে পারে ৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত।

মোঃ ইমরান হোসেন মে ২৮, ২০২৬
সি চিন পিং এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প।ফাইল ছবি: এএফপি
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইরানি তেল বাণিজ্যে চীনের কঠোর অবস্থান

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২ মে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ জারি করে। ২০২১ সালে তৈরি এক আইনের আওতায় এই নির্দেশ দেওয়া হয়। এর লক্ষ্য বিদেশি আইনের অন্যায্য চাপ ঠেকানো। সহজ করে বললে, এই নির্দেশে বলা হয়েছে—চীনের কিছু তেল শোধনাগারের ওপর আমেরিকা যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তা চীনের ভেতরে মানা যাবে না, কার্যকর করা যাবে না। যে পাঁচটি চীনা রিফাইনারিকে নিশানা করে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো—হেংলি পেট্রোকেমিক্যাল (দালিয়ান), শানডং জিনচেং পেট্রোকেমিক্যাল গ্রুপ, হেবেই শিনহাই কেমিক্যাল গ্রুপ, শৌগুয়াং লুকিং পেট্রোকেমিক্যাল এবং শানডং শেংসিং কেমিক্যাল। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, তারা ইরান থেকে তেল কিনছে। চীনের এই পদক্ষেপ শুধু কূটনৈতিক প্রতিবাদ নয়। এর আগে চীন অনেক সময় মুখে আপত্তি জানিয়েছে, কিন্তু এবার তারা সরাসরি আইন করে সে আপত্তির বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ তারা জানিয়ে দিল—ইরানের সঙ্গে তেল–বাণিজ্য রক্ষায় তারা আইনি শক্তিও প্রয়োগ করবে। এদিকে আমেরিকা অনেক দিন ধরেই ইরানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে তাদের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিদেশি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। লক্ষ্য ছিল—ইরানের তেল বিক্রি কমিয়ে দেওয়া। গত এপ্রিলের ২৪ তারিখে হেংলি পেট্রোকেমিক্যালকে আমেরিকার কালোতালিকায় তোলা হয়। বলা হয়, তারা বিপুল পরিমাণ ইরানি তেল কিনেছে, এমনকি গোপন জাহাজ ব্যবস্থার মাধ্যমেও লেনদেন করেছে। তবে তাদের কিছু সময় দেওয়া হয় ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার জন্য। আমেরিকার উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার। তা হলো—চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য ইরানের তেল কেনা কঠিন করে তোলা এবং অন্য দেশগুলোকেও ভয় দেখানো, যাতে তারা এই ধরনের লেনদেন না করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরানের তেল তুলনামূলক সস্তা। তাই চীনের স্বাধীন রিফাইনারিগুলোর কাছে এটি খুব আকর্ষণীয়। অন্যদিকে, ইরানের অর্থনীতির জন্য এই তেল বিক্রি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই সম্পর্ক শুধু ব্যবসা নয়, বরং তা রাজনীতি, জ্বালানিনিরাপত্তা এবং বড় শক্তির লড়াইয়ের অংশ। এই অবস্থায় চীনের নতুন নির্দেশটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। এতে বলা হয়েছে—আমেরিকার এই নিষেধাজ্ঞা তারা মানে না। এমনকি দেশের ভেতরে কেউ যদি তা মানতে চায়, সেটাও আইনত বাধা দেওয়া হবে। চীন এর জন্য আরেকটি আইনও ব্যবহার করছে, যার মাধ্যমে তারা বিদেশি নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে নিজেদের কোম্পানিকে রক্ষা করতে পারে। এর ফলে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো নিশ্চিন্তে ব্যবসা চালাতে পারবে, আর অযথা ভয় পেয়ে কাজ বন্ধ করে দেবে না। এই পদক্ষেপের বড় লক্ষ্য আমেরিকার ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ দুর্বল করা। এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা সরাসরি আমেরিকার নাগরিকদের জন্য নয়, বরং অন্য দেশের কোম্পানিগুলোকেও চাপ দেয়, যাতে তারা নিষিদ্ধ দেশের সঙ্গে ব্যবসা না করে। চীন ঠিক এই চাপটাই ভাঙতে চাইছে। চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য এটি একধরনের সুরক্ষা। এতে বলা হচ্ছে—আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা বৈধ নয়, তাই তা মানার দরকার নেই। এমনকি বিদেশি কোম্পানিগুলোকেও সতর্ক করা হচ্ছে—যদি তারা এই নিষেধাজ্ঞা মেনে চীনা কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাহলে চীনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। এর ফলে চীন ধীরে ধীরে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর দিকেও এগোতে পারে। ইরানের সঙ্গে তেল–বাণিজ্যে তারা নিজেদের মুদ্রা ব্যবহার করতে পারে, বা অন্য বিকল্প পদ্ধতিতে লেনদেন করতে পারে। তবে বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো এখনো সতর্ক থাকবে। তারা হয়তো ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা এড়িয়ে চলবে বা নিজেদের কাজ ভাগ করে নেবে। একদিকে থাকবে আমেরিকা, অন্যদিকে চীন। ফলে পুরোপুরি বিচ্ছিন্নতা না হলেও ব্যবসার পরিবেশ আরও জটিল হয়ে উঠবে। চীনের এই সিদ্ধান্তের পেছনে জ্বালানিনিরাপত্তার বড় ভূমিকা আছে। তাদের অনেক তেল আসে এমন দেশ থেকে, যেগুলো নিষেধাজ্ঞার আওতায় আছে। তাই এই সরবরাহ চালু রাখা তাদের জন্য জরুরি। ইরানের তেল চীনকে সুবিধা দেয়—খরচ কমায়, বিকল্প বাড়ায় এবং অন্য দেশগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষির শক্তি বাড়ায়। আবার চীনের বাজার ইরানের জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই সম্পর্ক চট করে ভাঙা কঠিন। এই নির্দেশ তাই শুধু আইনি সিদ্ধান্ত নয়, একটি কৌশলগত বার্তাও। এতে বলা হচ্ছে—চীন তার অর্থনৈতিক স্বার্থে আঘাত এলে চুপ করে থাকবে না। অনেক দিন ধরে চীন আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা থেকে কিছুটা লাভও করেছে। যেমন—তারা কম দামে তেল কিনতে পেরেছে। কিন্তু এবার তারা সরাসরি মোকাবিলার পথে হাঁটছে। এতে বোঝা যায়, দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। ইরানের জন্য এটি ভালো খবর। এতে বোঝা যাচ্ছে, সব দেশ আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা মানে না। আর আমেরিকার জন্য এটি নতুন চ্যালেঞ্জ, কারণ এতে তাদের চাপ প্রয়োগ কঠিন হয়ে যায়। সব মিলিয়ে, চীনের এই পদক্ষেপ একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বোঝা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞার লড়াই শুধু অর্থনৈতিক থাকবে না, আইনি লড়াইও বাড়বে। এখন দেখার বিষয়—চীন কতটা কঠোরভাবে এই আইন বাস্তবায়ন করে। যদি তারা শক্তভাবে আইনটি প্রয়োগ করে, তাহলে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য বড় সমস্যা তৈরি হবে। আর যদি শুধু কথার মধ্যে থাকে, তাহলে এটি মূলত রাজনৈতিক বার্তাই হয়ে থাকবে। বিশ্ব তেল বাজারের জন্যও এটি নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তেলের ব্যবসা এখন আরও বেশি রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে, আর আর্থিক ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। এই ঘটনাটি দেখাচ্ছে—একটি বড় অর্থনীতির বিরুদ্ধে একতরফা চাপ সব সময় কাজ করে না। আর চীন দেখিয়ে দিচ্ছে—আইন ব্যবহার করেও কীভাবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা যায়। দীর্ঘ মেয়াদে এটি হয়তো শুধু কয়েকটি কোম্পানিকে ঘিরে ঘটনা হিসেবে থাকবে না। বরং এটি এমন এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত, যেখানে এক দেশের চাপের জবাব অন্য দেশ আইনের মাধ্যমে দেবে। উমুদ শোকরি জ্বালানি কৌশলবিদ ও গালফ স্টেট অ্যানালিটিকস-এর উপদেষ্টা। মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

মারিয়া রহমান মে ১০, ২০২৬
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক। ছবি : সংগৃহীত
সদিচ্ছা থাকলে সংসদ থেকেও ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব : শাহদীন মালিক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারি। এর ৫ দিন পর মঙ্গলবার শপথ নিয়েছেন নবনির্বাচিত সদস্যরা। গঠিত হয়েছে নতুন সরকার ও নতুন সংসদ। তবে বিরোধী দলের সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও নেননি ক্ষমতাসীন দল বিএনপির এমপিরা। আর সে কারণে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই গেল। এ নিয়ে একটি গণমাধ্যমে বলেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক। উত্তর দিয়েছেন বেশ কিছু প্রশ্নের। প্রশ্ন : সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সংসদ সদস্যরা।এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়েছেন। এ অবস্থায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কী হবে? শাহদীন মালিক : এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। এটা একটা নতুন পরিস্থিতি, নতুন অভিজ্ঞতা। দুই পক্ষের কথা শুনে মনে হচ্ছে, এই পরিষদকে শপথ পড়াবেন কে? পরিষদে সভাপতিত্ব করবেন কে? জাতীয় সংসদের স্পিকারই কি এখানে সভাপতিত্ব করবেন? নাকি এখানকার জন্য আলাদা স্পিকার নির্বাচিত হবেন? এই বিষয়গুলোর সমাধান হয়নি।তাই দুই পক্ষের অবস্থান দুই রকম। প্রশ্ন : এর সমাধান কী? শাহদীন মালিক : সমাধান খুঁজতে হলে দেখতে হবে, সাধারণ মানুষ কী চায়। সাধারণ মানুষ কিন্তু জেদাজেদি চায় না। তারা চায় স্থিতিশীলতা। গত দেড় বছরের অস্থিরতার পর মানুষ এখন চায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক হবে ইত্যাদি।তাই সেদিকেই মনোযোগ দেওয়া উচিত। সাংবিধানিক কোনো ব্যাপার থাকলে বা আইনে কোনো পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হলে এখন তো সংসদ গঠিত হয়েছে। সংসদ আছে, সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে, যা কিছু হওয়া উচিত সংসদ থেকেই। প্রশ্ন : নতুন সরকার কেমন হয়েছে? শাহদীন মালিক : পত্রিকায় দেখলাম ৭০ শতাংশ এমপিই নতুন, মানে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েছেন। এখান থেকেই তো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রী হয়ে সরকারে গেছেন ওনারা। তার মানে এমপিদের মতো নতুন সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরাও অনেকে নতুন। তাই নতুন মন্ত্রিপরিষদ স্বাভাবিক হতে একটু তো সময় লাগবেই। প্রশ্ন : নতুন সংসদ কেমন হয়েছে? শাহদীন মালিক : একই উত্তর প্রায়। তবে সংসদ অধিবেশন শুরুর আগেই একটা ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ওনারা। খবরে দেখলাম বিরোধী দল ও সরকারি দল থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, সরকারি সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট নেবেন না সংসদ সদস্যরা। তার মানে সদিচ্ছা থাকলে সংসদ থেকেও ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। সূত্র : খবরের কাগজ

মারিয়া রহমান ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
ইসলামের দৃষ্টিতে জ্ঞানার্জন

মানবজাতির জন্য আল্লাহ প্রদত্ত গাইডলাইন পবিত্র কোরআন। হেরা পর্বতে আল্লাহর ধ্যানে থাকা অবস্থায় ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) হাজির হন রসুল (সা.)-এর কাছে। আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি রসুল (সা.)-কে কোরআনের যে আয়াতটি প্রথমে পৌঁছে দেন সেটি হলো ‘পড়, তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। মানবজাতিকে তিনি সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্ত থেকে। পড়, আর তোমার প্রতিপালক সম্মানিত, যিনি কলম দিয়ে শিক্ষা দিয়েছেন, যা তারা জানত না।’ সুরা আলাক-১-৫। কোরআনের এ আয়াতটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। যারা আল্লাহকে সব ক্ষমতার মালিক এবং জগৎ-মহাজগতের সবকিছুর স্রষ্টা হিসেবে বিশ্বাস করেন, যারা মুহাম্মদ (সা.)-কে তাঁর রসুল বলে স্বীকার করেন, যারা জিবরাইল (আ.)-কে ফেরেশতা হিসেবে বিশ্বাস করেন তাদের জন্য ওই আয়াতটি দিকনির্দেশনামূলক। পবিত্র কোরআনের সূচনা ‘পড়’ এই হুকুমসংবলিত শব্দের মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য জ্ঞান অর্জনকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছেন তা এ আয়াতটিতে স্পষ্ট। অথচ রসুল (সা.) নিজেই ছিলেন অক্ষরজ্ঞানহীন। তিনি অক্ষরজ্ঞানের অধিকারী না হলেও আল্লাহর ইচ্ছা এবং জাগতিক ও পারলৌকিক জ্ঞানের ভান্ডার কোরআনের বদৌলতে উম্মতদের আলোকবর্তিকা হিসেবে ভূমিকা পালন করছেন। আল্লাহ ও রসুল (সা.)-এর প্রতি বিশ্বাসের কারণেই মোমিনদের অবশ্য কর্তব্য হলো- জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী হওয়া। কারণ আমাদের যিনি স্রষ্টা তিনি মানবজাতির চলার পথের গাইডলাইন হিসেবে যে পবিত্র কোরআন নাজিল করেছেন তাতে প্রথমেই পড়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ পড়া অর্থাৎ জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে কোনোরকম হেলাফেলার অবকাশ নেই। আমাদের উচিত হবে নিজেদের যেমন জ্ঞানার্জনে মনোযোগী হওয়া, তেমন আমাদের শিশুসন্তানকেও সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা। সে যাতে কোরআন-হাদিস সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে তা নিশ্চিত করা। বড় হয়ে কর্মজীবনের উপযোগী শিক্ষাও সন্তানের জন্য নিশ্চিত করতে হবে। যাতে সন্তান বড় হওয়ার পর জীবিকার জন্য কারও মুখাপেক্ষী না হয়। রসুল (সা.) অপরের কাছে হাত পাতাকে অপছন্দ করতেন। তিনি তাঁর উম্মতদের স্বাবলম্বী হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। যে জাতি যত শিক্ষিত সেই জাতি তত উন্নত। শিক্ষা ব্যতিরেকে কোনো জাতির উন্নতি কল্পনা করা যায় না। জাগতিক ও পারলৌকিক উভয় জগতের সফলতা অর্জনে শিক্ষার বিকল্প নেই। এজন্য নৈতিক ও আদর্শভিত্তিক ঐশী শিক্ষার সমন্বিত শিক্ষা প্রয়োজন। শিক্ষা, অজ্ঞতা ও অন্ধকার দূর করে মানুষকে কল্যাণ ও সমৃদ্ধির পথ দেখায়। মানবতার মুক্তির মহাগ্রন্থ আল কোরআনের প্রথম অবতীর্ণ শব্দটি যেহেতু ‘পড়’ সেহেতু মানুষের কল্যাণ সাধনে শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। পবিত্র কোরআনে রসুল প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্য মানুষকে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দেওয়ার কথা বর্ণনা করে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই ওই সত্তা যিনি নিরক্ষরদের মাঝে স্বয়ং তাদেরই মধ্য থেকে একজন রসুল পাঠিয়েছেন যিনি তাদের তাঁর (আল্লাহর) আয়াত পাঠ করে শোনান, তাদের আত্মিক পরিশুদ্ধ এবং তাদের কিতাব (আল্লাহর বাণী) ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেন। অথচ এর আগে তারা স্পষ্ট অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল।’ সুরা জুমু’আ-২। ইসলাম জ্ঞানবিজ্ঞানে পান্ডিত্য অর্জন করা ও শিক্ষাদীক্ষায় দক্ষ ও সুশিক্ষা লাভ করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে। এজন্য ইসলামের প্রথম যুগের মনীষীগণ শিশুদের একত্র করে শিক্ষাদীক্ষা ও জ্ঞানবিজ্ঞানের শীর্ষে পৌঁছার প্রতি উৎসাহ প্রদান করতেন। হজরত হিশাম ইবনি উরওয়াহ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তাঁর সন্তানদের একত্র করে বলেন, হে আমার সন্তানেরা! তোমরা ইলম শিক্ষা কর। যদিও তোমরা আজ জাতির ছোট শিশু। আশা করা যায় অচিরেই তোমরা পরবর্তীদের বয়োজ্যেষ্ঠতে পরিণত হবে।   আর কোনো বয়োবৃদ্ধের জন্য এর চেয়ে খারাপ কোনো অবস্থা নেই যে, কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করা হলে তার কাছে কোনো ইলম (তথ্য) পাওয়া যাবে না। -সুনানে দারিমি। এ ব্যাপারে রসুল (সা.) এর দৌহিত্র হজরত হাসান (রা.)-এর একটি উৎসাহব্যঞ্জক ঘটনাও বর্ণিত আছে হজরত শুরাহবিল বিন সাঈদ (রহ.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, হজরত হাসান (রা.) তাঁর ছেলে এবং ভাতিজাকে ডেকে বললেন, হে আমার বৎস এবং ভাতিজা, তোমরা আজ জাতির ছোট শিশু-অচিরেই তোমরা পরবর্তীদের বয়োজ্যেষ্ঠতে পরিণত হবে। অতএব তোমরা ইলম শিক্ষা কর। তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি তা বর্ণনা করতে অথবা মুখস্থ করে সংরক্ষণ করতে সক্ষম না হয় সে যেন তা লিখে রাখে এবং তা নিজ ঘরে রেখে দেয় (সংরক্ষণ করে)।-সুনানে দারিমি। উল্লিখিত দুটি ঘটনা শিশুদের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে উৎসাহ প্রদানের দলিল ও প্রমাণের নির্দেশনা।

মো: দেলোয়ার হোসাইন ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
রোজা রেখে ইনজেকশন-ইনসুলিন নেওয়া যাবে কি?

রমজান মাসে রোজা রাখা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মুসলমানের ওপর ফরজ। শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ত্যাগ করা গুরুতর গুনাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন   يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৮৩)   তবে রোজা অবস্থায় অনেক সময় রোগীর ওষুধ গ্রহণ, ইনজেকশন নেওয়া বা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয় দেখা দেয়—এসব চিকিৎসা গ্রহণ করলে রোজা নষ্ট হবে কি না। সমসাময়িক ইসলামী চিন্তাবিদ ও ফকিহরা কুরআন-সুন্নাহর আলোকে এ বিষয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। নিচে ইনজেকশন, ইনসুলিন ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা সংক্রান্ত বিধান উপস্থাপন করা হলো।   রোজা রেখে ইনজেকশন ও ইনসুলিন নেওয়া যাবে কি? আধুনিক মাসায়েলার আলোকে বিশ্লেষণ   ইনজেকশন নেওয়ার বিধান রোজা অবস্থায় শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি ছাড়া অন্য যেকোনো চিকিৎসাগত কারণে ইনজেকশন নিলে রোজা নষ্ট হবে না—চাই তা মাংসে (ইন্ট্রামাসকুলার) দেওয়া হোক বা রগে/শিরায় (ইন্ট্রাভেনাস)।   কারণ ইনজেকশনের মাধ্যমে ওষুধ শরীরে প্রবেশ করে একটি অস্বাভাবিক পথ দিয়ে (অর্থাৎ মুখ, নাক বা স্বাভাবিক খাদ্যগ্রহণের পথ নয়)। ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, রোজা ভঙ্গ হওয়ার জন্য খাদ্য বা পানীয় জাতীয় কিছু স্বাভাবিক প্রবেশপথ দিয়ে পাকস্থলীতে পৌঁছানো শর্ত। ইনজেকশনের ক্ষেত্রে তা ঘটে না। (আল্লামা ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ৩৯৫; ইবনু নুজাইম, আল-বাহরুর রায়েক, খণ্ড ২, পৃ. ২৭৮; আপকে মাসায়েল আওর উনকা হল, খণ্ড ৩, পৃ. ২১৪)   ইনসুলিন গ্রহণের বিধান ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ইনসুলিন নেওয়া একটি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা। শরিয়তের দৃষ্টিতে ইনসুলিন নিলে রোজা ভঙ্গ হবে না। কারণ, ইনসুলিনও ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে এবং তা খাদ্য বা পানীয় হিসেবে গণ্য হয় না। এটি স্বাভাবিক খাদ্যগ্রহণের পথ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে না এবং পাকস্থলীতে পৌঁছায় না। ফলে রোজা নষ্ট হওয়ার কোনো কারণ সৃষ্টি হয় না। (ইবনে আবিদিন, খণ্ড ৩, পৃ. ৩৬৭; ইসলাম ও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান, পৃ. ৩২৭)   ডায়াবেটিস পরীক্ষা ও রক্ত নেওয়া ডায়াবেটিস রোগীরা নিয়মিত সুগার পরীক্ষা করেন। এ ক্ষেত্রে আঙুলে সূচ ফুটিয়ে একফোঁটা রক্ত নেওয়া হয়। ফকিহদের মতে, এতটুকু রক্ত নেওয়ার ফলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। কারণ, এতে শরীরে কোনো খাদ্য বা পানীয় প্রবেশ করে না; বরং অল্প পরিমাণ রক্ত বের হয়, যা রোজা ভঙ্গের কারণ নয়।   রোজা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তবে ইসলাম একটি সহজ ও বাস্তবসম্মত জীবনব্যবস্থা। অসুস্থ ব্যক্তির প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণে শরিয়ত বাধা দেয় না। ইনজেকশন (শক্তিবর্ধক না হলে), ইনসুলিন গ্রহণ এবং সুগার পরীক্ষা—এসবের মাধ্যমে রোজা নষ্ট হয় না বলে প্রখ্যাত ফকিহ ও সমসাময়িক আলেমরা মত দিয়েছেন।   অতএব, যারা দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন, বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীরা, তারা অযথা দুশ্চিন্তা না করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারেন। তবে জটিল বা বিশেষ পরিস্থিতিতে নিজ নিজ বিশ্বস্ত আলেম ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।   আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহিহভাবে রোজা পালনের তৌফিক দান করুন। আমিন।

মো: দেলোয়ার হোসাইন ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
ইসলামের দৃষ্টিতে সুশাসন

সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে দেশের মানুষ সুশাসনের প্রত্যাশায় ভোট দিয়েছে। ইসলাম সুশাসনের তাগিদ দেয়। ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.) ছিলেন বিশ্বের সেরা জ্ঞানীদের একজন। তিনি ছিলেন বিশ্বনবী (সা.)-এর  জামাতা। পুরুষদের মধ্যে আলী (রা.) প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলামের এই চতুর্থ খলিফা শাসক হিসেবে ন্যায়পরায়ণতার যে নজির রেখেছেন তা আজও প্রাসঙ্গিক। হজরত আলী (রা.)-এর খুতবাহ, বক্তৃতা, চিঠিপত্রের সংকলন ‘নাহজুল বালাগাহ’। এতে মিসরের গভর্নর হজরত মালিক আশতারকে লেখা খলিফা আলী (রা.)-এর চিঠিতে শাসন ক্ষেত্রে ন্যায় ও সুবিচার নিশ্চিত করার যে তাগিদ দেওয়া হয়েছে তা সর্বযুগে অনুকরণীয়।   হজরত আলী (রা.) মালিক আশতারকে লেখা চিঠিতে বলেন, অন্তরে ভাবাবেগ জাগ্রত হলে, কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ আল্লাহর অনুগ্রহ না হলে মানুষের অন্তঃকরণ তাকে পাপের দিকে নিয়ে যায়।...অতএব তুমি তোমার ভাবাবেগকে নিয়ন্ত্রণ কর এবং যা তোমার জন্য বৈধ নয়, সে কাজ থেকে তোমার অন্তরকে বিরত রাখ। নাহজুল বালাগার বক্তব্যে আমরা ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে পার্থিব সমস্যাবলির বাস্তব সমাধান লাভ করি। তেমনি এতে সমাজে সুবিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঐক্য ও নিরাপত্তা অর্জনের পথ খুঁজে পাই। যে লক্ষ্যে হজরত আলী (রা.) তাঁর গভর্নরকে লোকদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে সুবিচার অবলম্বনের নির্দেশ দেন। তিনি তাঁর চিঠিতে বলেন, ‘তোমার অন্তরকে তোমার অধীন জনগণের প্রতি ক্ষমা এবং তাদের প্রতি স্নেহ ও দয়া প্রদর্শনে অভ্যস্ত করে তোল। তুমি তাদের ওপর হিংস্র পশুদের ন্যায় চড়াও হইও না। তারা ভুল কাজ করতে পারে, তা ইচ্ছা করেই হোক বা উদাসীনতার কারণেই হোক। অতএব তুমি ঠিক সেভাবেই তাদের দিকে ক্ষমার হাত প্রসারিত করে দাও, যেভাবে তুমি পছন্দ কর যে আল্লাহ তোমার প্রতি ক্ষমা বিস্তার করে দিন। কারণ তুমি তাদের ওপরে স্থান লাভ করেছ এবং তোমার অধিনায়ক (আলী) তোমার ওপরে। আর যে তোমাকে নিয়োগ করেছে তার ওপরে আছেন আল্লাহ। তিনি (আল্লাহ) চেয়েছেন যে তুমি তাদের বিষয়াদি পরিচালনা করবে এবং তিনি তাদের মাধ্যমে তোমাকে পরীক্ষা করছেন।   হজরত আলী (রা.) সমাজে সুবিচারের বাস্তব রূপায়ণে বলেন : ‘ক্ষমা করার কারণে অনুতপ্ত হইও না এবং শাস্তি দিতে পেরে গর্বিত হইও না। ক্রোধের সময় দ্রুত পদক্ষেপ নিও না। এ কথা বলো না যে ‘আমাকে কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে। অতএব আমি যখন আদেশ দেব তখন অবশ্যই তা পালিত হতে হবে।’ কারণ তা অন্তরে বিভ্রান্তি ও দীনে দুর্বলতা সৃষ্টি করে এবং তা ব্যক্তিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। হজরত আলী (রা.) তাঁর গভর্নরকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন : ‘তোমার জন্য সর্বাধিক বাঞ্ছনীয় হওয়া উচিত তাই যা সর্বাধিক ন্যায়ানুগ, যা সর্বাধিক মাত্রায় সর্বজনীন সুবিচারপূর্ণ এবং তোমার অধীনদের পছন্দের দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বাধিক বোধগম্য। হজরত আলী (রা.)-এর ওই বক্তব্যে সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে সুবিচার বিস্তারের মর্মবাণী ও মানবিক আবেদন নিহিত রয়েছে, তা অনুধাবন করা যে কারও পক্ষেই সম্ভব। সম্ভবত সব পার্থিব শাসনব্যবস্থা পক্ষপাতিত্বের দোষে আক্রান্ত। আলী (রা.) এ ধরনের শাসনব্যবস্থার শাসকদের জালেম এবং এ কারণে নৈতিকতার মূল্যবোধ পদদলিতকারী ও মানবিকতার উদ্দেশ্য নস্যাৎকারী শোষক হিসেবে অভিহিত করেন। অবৈধ ও বেআইনি কার্যকলাপ এবং গোষ্ঠী বিশেষের প্রতি পক্ষপাতিত্বের মাধ্যমে যেভাবে জুলুম করা হয় তিনি তার বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কারণ এ ধরনের পরিস্থিতিতে সুবিচার বিস্তারের ধারণা হারিয়ে যায়। কেবল সেসব লোকই এ ধরনের জুলুমমূলক পদ্ধতি পরিহার করে চলেন, যারা আল্লাহকে ভয় করেন এবং তারা সমাজকে সেই দিকে পরিচালিত করেন। হজরত আলী (রা.) যেজন্য মালিক আশতারকে নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেন সমাজকে সবার, বিশেষ করে দরিদ্র ও বঞ্চিত লোকদের কল্যাণসাধনের লক্ষ্যাভিসারী করে গড়ে তোলেন। হজরত আলী (রা.) বলেন : যারা মুসলমানদের ধর্মীয় শক্তির স্তম্ভ এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষাস্বরূপ, তারা হচ্ছে সাধারণ জনগণ। অতএব তোমার উচিত তাদের দিকে বেশি মনোযোগী হওয়া ও তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা। হজরত আলী (রা.) এখানে গভর্নর মালিক আশতারকে যে পথনির্দেশ দিয়েছেন, এটাই হলো আজকের দিনে প্রকৃত গণমুখী শাসনব্যবস্থা। অত্যন্ত চমৎকারভাবে ইসলামের চতুর্থ খলিফা জনগণের স্বার্থরক্ষার্থে চেষ্টা-সাধনা চালানো ও তাদের দিকে মনোযোগী থাকার ওপরে গুরুত্বারোপ করেছেন। শাসক বা প্রশাসকদের পরামর্শদাতা বা উপদেষ্টাদের জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলি তুলে ধরেছেন। যা জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ তিনি সাধারণ জনগণকে ধর্মের স্তম্ভ, রাষ্ট্রের শক্তি ও শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা প্রাচীর বলে গণ্য করেছেন।

মো: দেলোয়ার হোসাইন ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬
প্রতীকী ছবি
ইসলামে রাজনীতি : ইবাদত, জবাবদিহি ও মানবকল্যাণ

রাজনীতি মানব সমাজ পরিচালনার একটি অপরিহার্য মাধ্যম। ইসলাম—রাজনীতিকে ধর্মের বাইরে কোনো বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে নয়, বরং এটিকে নৈতিকতা, জবাবদিহি ও জনকল্যাণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত করে। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে ইসলামী রাষ্ট্র ও নেতৃত্বের মৌলিক দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে সুরা হজের ৪১ নম্বর আয়াত ইসলামী রাজনীতির একটি সংক্ষিপ্ত অথচ পূর্ণাঙ্গ ইশতেহার হিসেবে বিবেচিত। এই আয়াতে ক্ষমতা লাভের পর ইসলামী নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র কী ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করবে তার সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। আয়াতে বলা হয়েছে—‘তাদের যদি আমরা জমিনে ক্ষমতা দান করি, তবে তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত আদায় করবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহরই হাতে।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৪১) আয়াতের আলোকে ইসলামী রাজনীতির চারটি মৌলিক ভিত্তি ও একটি নৈতিক পরিণতি সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়। ১. নামাজ কায়েম করা : ইসলামের মৌলিক স্তম্ভগুলোর মধ্যে নামাজ অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। যে পাঁচটি ভিত্তির ওপর ইসলাম দাঁড়িয়ে আছে এর মধ্যে নামাজ দ্বিতীয়। নামাজ ছাড়া ইসলামের মৌলিকত্ব অসম্ভব। ঈমানের পর ইসলামে নামাজের চেয়ে অধিক গুরুত্ব অন্য কোনো ইবাদত প্রদান করা হয়নি। ইসলামী রাজনীতির প্রথম অঙ্গীকার হলো নামাজ কায়েম করা। সব মানুষ আসলে নামাজি হয়ে গেলে দেশে কোনো বিশৃঙ্খলাই থাকবে না। কারণ নামাজ মানুষকে অবশ্যই অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখবে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ (মানুষকে) অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে।’(সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৫) কাজেই নামাজ শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও আল্লাহভীতির প্রতীক। যে রাষ্ট্র নামাজকে গুরুত্ব দেয়, সে রাষ্ট্র নৈতিক অবক্ষয় থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সচেষ্ট থাকে। ২. জাকাত আদায় : জাকাত ইসলামী অর্থনীতির মৌলিক স্তম্ভ। জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা সমাজে ধনী-গরিবের ব্যবধান কমায় এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। অতএব, ইসলামী রাজনীতির ইশতেহারে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতিশ্রুতি থাকা আবশ্যক। জাকাত ধনীদের সম্পদে গরিবদের অধিকার। জাকাত দানকারীদের নিজ দায়িত্বে জাকাতের সম্পদ জাকাত গ্রহিতাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘এবং তাদের (ধনীদের) ধন-সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের অধিকার।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ১৯) ৩. সৎ কাজের আদেশ : ‘সৎ কাজের আদেশ’ ইসলামী রাজনীতির গঠনমূলক দিক। ইসলামী রাষ্ট্র শুধু নিষেধের মাধ্যমে নয়, বরং শিক্ষা, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সমাজকল্যাণের মাধ্যমে একটি আদর্শ সমাজ গড়ে তুলতে চায়। সৎ কাজের প্রসার মানে হলো—নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা। এটি ইসলামী রাজনীতিকে ইতিবাচক ও জনমুখী করে তোলে। ৪. অসৎ কাজ থেকে নিষেধ : ইসলামী রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা। এর অর্থ হলো— দুর্নীতি, জুলুম, শোষণ ও নৈতিক অনাচারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। ইসলামী রাষ্ট্রে আইন হবে ন্যায়ভিত্তিক এবং প্রয়োগ হবে পক্ষপাতহীন। এ দিকটি ইসলামী রাজনীতিকে দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক করে তোলে। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা আবশ্যক, যারা কল্যাণের দিকে আহবান করবে, মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বারণ করবে। আর তারাই হবে সফল।’ (সুরা : আল-ইমরান, আয়াত :  ১০৪) ৫. আল্লাহর কাছে জবাবদিহির চেতনা : আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহর হাতে’—এটি ইসলামী রাজনীতির নৈতিক উপসংহার। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়; এর চূড়ান্ত পরিণাম আল্লাহর হাতে। এই বিশ্বাস শাসকদের অহংকার ও স্বেচ্ছাচারিতা থেকে বিরত রাখে এবং রাজনীতিকে ইবাদত ও আমানতের মর্যাদায় উন্নীত করে। পরিশেষে বলা যায়, সুরা হজের ৪১ নম্বর আয়াতের আলোকে ইসলামী রাজনীতির ইশতেহার হবে এমন একটি নীতিপত্র, যা নৈতিকতায় পরিশুদ্ধ, অর্থনৈতিকভাবে ন্যায়ভিত্তিক, সামাজিকভাবে কল্যাণমুখী এবং সর্বোপরি আল্লাহভীতিতে পরিচালিত। এই ইশতেহারে ক্ষমতা লাভের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে ক্ষমতা প্রয়োগের দায়বদ্ধতা বেশি গুরুত্ব পায়। তাই ইসলামী রাজনীতি মূলত ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বরং এটি মানবকল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের রাজনীতি। লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মারিয়া রহমান ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
গত রমজানের কাজা রোজা কি এখন রাখা যাবে

শারীরিক অসুস্থতা, সফর কিংবা নারীদের ঋতুস্রাবের মতো অপারগতার কারণে অনেক সময় রমজানের রোজা কাজা হয়ে যায়। মহান আল্লাহ দয়া করে এই রোজাগুলো পরবর্তী সময়ে আদায়ের সুযোগ দিয়েছেন।   বিশেষ করে রমজানের পূর্ববর্তী মাস শাবানে এসে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এত দেরিতে বা শাবান মাসে কাজা রোজা আদায় করা যাবে কি না।   কাজা রোজা আদায়ের সময়সীমা যেকোনো কারণে রমজানের রোজা ছুটে গেলে পরবর্তী রমজান আসার আগ পর্যন্ত বছরের যেকোনো সময় তা আদায় করা যায়। তাতে প্রায় ১১ মাস সময় থাকে। শওয়াল মাস থেকে শুরু করে শাবান মাস পর্যন্ত এই সুযোগ অবারিত।   আল্লাহ বলেছেন, অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তাকে অন্য দিনগুলোতে এই সংখ্যা পূরণ করে নিতে হবে। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৪)   শাবান মাসে কাজা আদায়: শেষ সুযোগ শাবান মাস হলো রমজানের ঠিক আগের মাস। যদি কেউ সারা বছর ব্যস্ততা বা অন্য কোনো কারণে বিগত বছরের রোজা আদায় করতে না পারেন, তবে শাবান মাসই হলো তাঁর জন্য শেষ সুযোগ। শাবান মাসে কাজা রোজা রাখাতে শরয়ি কোনো বাধা নেই।   আয়েশা (রা.) থেকে এই বিষয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল পাওয়া যায়। তিনি বলেন, “আমার ওপর রমজানের কাজা রোজা বাকি থাকত, যা আমি শাবান মাস ছাড়া আদায় করতে পারতাম না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৫০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৪৬)   হাদিস বিশারদগণের মতে, আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর খেদমতে ব্যস্ত থাকার কারণে আয়েশা (রা.) সারা বছর রোজা রাখতে পারতেন না, তাই তিনি শাবান মাসে সেই কাজাগুলো পূর্ণ করতেন। সুতরাং যাদের রোজা বাকি আছে তাদের জন্য এটি একটি অপরিহার্য সুযোগ।   দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা ও পরবর্তী রমজান যদি কোনো ব্যক্তি গত রমজানে অসুস্থ থাকার কারণে রোজা রাখতে না পারেন এবং সেই অসুস্থতা পরবর্তী রমজান আসা পর্যন্ত স্থায়ী হয়, তবে তবে তাকে বর্তমান রমজানের রোজা রাখতে হবে।   গত বছরের কাজা রোজাগুলো তাঁর জিম্মায় ‘বকেয়া ঋণ’ হিসেবে থেকে যাবে। সুস্থ হওয়ার পর তিনি সেগুলো আদায় করবেন। এক্ষেত্রে কোনো গুনাহ হবে না, কারণ আল্লাহ মানুষের সাধ্যাতীত কোনো বোঝা চাপিয়ে দেন না। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)   শাবান মাস শুরু হওয়ার পর প্রত্যেকের উচিত নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের বিগত রমজানের কোনো রোজা বাকি আছে কি না তা যাচাই করা।   যদি বাকি থাকে, তবে আর দেরি না করে শাবানের দিনগুলোতেই তা শেষ করা উচিত। কারণ এটিই হলো রমজানের প্রস্তুতির শ্রেষ্ঠ সময়।

মো: দেলোয়ার হোসাইন ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিরসনে মহানবী (সা.)

দারিদ্র্য ও বেকারত্বের সমস্যা শুধু আধুনিক বিশ্বের নয়, অতীতেও ছিল। রসুল (সা.) এর সমাধানে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর প্রথম নির্দেশনা ছিল-বেকার ব্যক্তিরা বসে না থেকে যেকোনো ধরনের কাজ ও পেশায় নিয়োজিত থাকা। নবীরাও বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তাঁরা মানুষের সামনে কর্মের এবং হালাল উপার্জনের উচ্চমানের আদর্শ ও দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। যেমন রসুল (সা.) হজরত দাউদ (আ.)-এর ক্ষেত্রে বলেন, ‘নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো কেউ খায়নি। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন’ (সহিহ বুখারি)।   কোনো বৈধ কাজই তুচ্ছ নয় রসুল (সা.) সব (বৈধ) কর্মকেই সম্মান, মর্যাদা ও গুরুত্বের চোখে দেখতেন। কেননা মানুষের কাছে হাত পাতা এবং তাদের সামনে লাঞ্ছিত হওয়ার চেয়ে নিজে কাজ করে খাওয়াই উত্তম। এ বিষয়টি রসুল (সা.) তাঁর হাদিসে ফুটিয়ে তুলেছেন এভাবে- ‘তোমাদের কেউ যদি পিঠে করে কাঠের বোঝা বয়ে আনে এবং তা বিক্রি করে, যার মাধ্যমে আল্লাহ তার চেহারাকে (ভিক্ষা করার লাঞ্ছনা থেকে) রক্ষা করেন, তার জন্য এটাই উত্তম-মানুষের কাছে হাত পেতে বেড়ানোর চেয়ে। যে হাত পাতার ফলে মানুষ তাকে কিছু দিতেও পারে, আবার নাও দিতে পারে।’ (সহিহ বুখারি)।   অর্থনৈতিক প্রকল্প তৈরিতে উৎসাহ প্রদান রসুল (সা.) বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রকল্প তৈরির ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করেছেন। তাদের বর্গা চাষের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। যেমন দরিদ্র ও নিঃস্ব অবস্থায় মদিনায় আগত মুহাজির মুসলমানদের সঙ্গে আনসার সাহাবীরা করেছিলেন। এ বিষয়ে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, আনসার সাহাবিরা রসুল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ‘আমাদের এবং আমাদের ভাইদের (মুহাজিরদের) মধ্যে খেজুরের বাগান ভাগ করে দিন।’   নবীজি (সা.) বললেন, ‘না।’ তখন তারা মুহাজিরদের বললেন, ‘আপনারা আমাদের বাগানে কাজ করুন, আমরা আপনাদের বাগানের ফলের মধ্যে অংশীদার করে নেব।’ তখন মুহাজিররা বললেন, ‘আমরা শুনলাম এবং মানলাম; অর্থাৎ তারা এই প্রস্তাবে রাজি হলেন (সহিহ বুখারি)।   স্বনির্ভরতার এক চমৎকার গল্প দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিরসনের এসব নীতি-আদর্শ ও মূল্যবোধ সাহাবায়ে কেরামের জীবনে দারুণভাবে জাগিয়ে তুলতেন রসুল (সা.)। এ ক্ষেত্রে চমৎকার ও একটি শিক্ষণীয় গল্প ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে। হজরত আনাস (রা.) বর্ণিত : একবার এক ব্যক্তি এসে নবীজি (সা.)-এর কাছে হাত পাতল। নবীজি (সা.) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার ঘরে কি কিছু নেই?’ লোকটি বলল, ‘একটি গালিচা আছে, যার কিছু অংশ আমরা পরিধান করি এবং কিছু অংশ বিছিয়ে রাখি। একটি পাত্রও আছে, তাতে আমরা পানি পান করি।’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘সেগুলো আমার কাছে নিয়ে এসো।’ লোকটি সেগুলো নিয়ে এলে মহানবী (সা.) তা হাতে নিয়ে বললেন, ‘এ দুটি কে ক্রয় করবে?’ এক ব্যক্তি বলল, ‘আমি এগুলো এক দিরহামে ক্রয় করব।’ নবীজি (সা.) তখন আরও দুইবার অথবা তিনবার বললেন, ‘কেউ কি এর অধিক মূল্য দেবে?’ আরেকজন বলল, ‘আমি দুই দিরহামে নেব।’ নবীজি (সা.) তখন ওই ব্যক্তিকে জিনিস দুটি দিয়ে তার থেকে দিরহাম দুটি গ্রহণ করলেন। এরপর সেই ব্যক্তিকে তা প্রদান করে বললেন, ‘এক দিরহাম দিয়ে খাবার কিনে পরিবার-পরিজনকে দাও এবং আরেক দিরহামে একটি কুঠারের ফলা কিনে আমার কাছে নিয়ে এসো।’ লোকটি তাই করল। এবার নবীজি (সা.) নিজ হতে সেই লৌহ কুঠারে একটি হাতল লাগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘যাও, তুমি এটা দিয়ে কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করো এবং পনেরো দিন অতিবাহিত হওয়ার আগে আমার সঙ্গে আর দেখা করবে না।’ লোকটি কুঠার হাতে চলে গেল। কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করতে লাগল। পনেরো দিন পার হলে সে নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলো। ইতোমধ্যে সে দশ দিরহাম উপার্জন করেছে। সে এর থেকে কিছু দিয়ে কাপড় এবং কিছু দিয়ে খাবার কিনল। এবার নবীজি (সা.) তাকে বললেন, ‘ভিক্ষার কারণে কেয়ামতের দিন মুখমণ্ডলে দাগ নিয়ে ওঠার চেয়ে এটাই তোমার জন্য উত্তম।’ এরপর নবীজি (সা.) আরও বললেন, তিন ব্যক্তি ছাড়া কারও জন্য অন্যের কাছে হাত পেতে বেড়ানো বৈধ নয়। ১. প্রচণ্ড দরিদ্র ব্যক্তি, ২. ঋণে জর্জরিত ব্যক্তি এবং ৩. যার ওপর রক্তপণ আছে, অথচ সে তা পরিশোধ করতে অক্ষম। (সুনানে আবু দাউদ : ১৬৪১)।

মো: দেলোয়ার হোসাইন ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
যে ৭ বিপদ আসার আগে আমল করতে বলেছেন মহানবী (সা.)

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা সাতটি জিনিস আসার আগে আগে দ্রুত আমলে লিপ্ত হও।    তোমরা কি অপেক্ষা করছ এমন দারিদ্র্যের, যা সবকিছু ভুলিয়ে দেয়? না এমন প্রাচুর্যের, যা অবাধ্য করে তোলে? না এমন রোগব্যাধির, যা অথর্ব করে তোলে? না এমন বার্ধক্যের, যা বুদ্ধি লোপ করে দেয়? না আকস্মিক আগত মৃত্যুর? না দাজ্জালের, সে তো এমন নিকৃষ্টতম অনুপস্থিত, যার আত্মপ্রকাশের অপেক্ষা করা হচ্ছে? না কিয়ামতের, যে কিয়ামত কিনা অত্যন্ত বিভীষিকাময় ও অতি তিক্ত? (তিরমিজি)   এ হাদিছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ উম্মতকে আমলে যত্নবান হয়ে বর্তমান সময়কে কাজে লাগাতে উৎসাহ দিয়েছেন। বর্তমান সময়কে কাজে লাগানোই প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ। ভবিষ্যতের অপেক্ষায় থাকা চরম নির্বুদ্ধিতা। কেননা বর্তমানে যে সুযোগ আছে, ভবিষ্যতেও তা পাওয়া যাবে এর কোনও নিশ্চয়তা নেই।   ভবিষ্যতে যেকোনো কঠিন বাধা সামনে এসে দাঁড়াতে পারে। অনেক বাধা এমন আছে, যার সম্মুখীন হলে আমল করার কোনো উপায় থাকে না।    এ হাদিসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেমন সাতটি বাধা উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হলো—১. অতি দারিদ্র্য।২. অতিরিক্ত ধনসম্পদ।৩. কঠিন রোগব্যাধি। ৪. অতি বার্ধক্য। ৫. আকস্মিক মৃত্যু। ৬. দাজ্জালের আবির্ভাব।৭. কিয়ামত।

মো: দেলোয়ার হোসাইন জানুয়ারী ৩১, ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
আল্লাহভীতি মুমিনের অনন্য বৈশিষ্ট্য

সব প্রশংসা একমাত্র আল্লাহপাকের জন্য। অগণিত সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক নবী মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ (সা.), তাঁর পরিবার ও সাহাবিদের ওপর।   কল্যাণ ও সাঠিক পথ অনুসরণের দিকনির্দেশনা রয়েছে মহাগ্রন্থ কোরআনুল কারিমে। এটি প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। এ কিতাবে আমাদের রব মুত্তাকিদের একটি বিশেষ গুণের কথা জানিয়েছেন। যারা হবে তাঁর ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও সম্মানের অধিকারী। আর এই গুণটি ইমানদারদের আবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্য এবং ইমানের সারকথা। ইমানের বাহন এবং ইহসানের পর্যায়ে পৌঁছার সোপান। মহান আল্লাহ বলেন-‘আমি মুসা ও হারুনকে দিয়েছিলাম মীমাংসাকারী গ্রন্থ ও মুত্তাকিদের জন্য উপদেশ, যারা না দেখেও তাদের রবকে ভয় করে এবং কিয়ামত সম্পর্কে থাকে ভীতসন্ত্রস্ত (আম্বিয়া : ৪৮-৪৯)।   কোরআনুল কারিমের সুরা ফাতির-এর ১৮ নম্বর আয়াত দ্বারা আল্লাহ বলেন, আপনি শুধু তাদেরই সতর্ক করুন, যারা তাদের রবকে না দেখে ভয় করে এবং সালাত কায়েম করে। আল্লাহ আরও বলেন, আমার বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী তারাই, কেবল তাঁকে ভয় করে (ফাতির-২৮)। আল্লাহর ভয় হলো : আল্লাহকে সম্মান প্রদর্শন ও তাঁর সম্পর্কে জেনে তাঁকে ভয় করা বান্দার কর্তব্য। এ ভয় তাঁর সুন্দর নাম ও উন্নত গুণাবলি, প্রশংসাযোগ্য হিকমতপূর্ণ কর্ম ও বিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে তাঁকে ভয় করা। এটাই বাস্তবসম্মত এবং পরিপূর্ণ ভয়, যার অধিকারীদের কথা আল্লাহ উপরিউক্ত আয়াত দ্বারা বুঝিয়েছেন। স্বীয় রব সম্পর্কে বান্দার জ্ঞান যত বৃদ্ধি পাবে তাঁর প্রতি বান্দার ভয় তত বেশি তৈরি হবে। অবশেষে সে ইহসানের পর্যায়ে উন্নীত হবে। ফলে সে এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন সে তাকে দেখছে। জান্নাত এমন ব্যক্তিরই নিকটবর্তী হবে এবং তাকেই ক্ষমার প্রতিশ্রুতিমূলক সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, আর জান্নাতকে এত কাছে নেওয়া হবে, যার সঙ্গে মুত্তাকিদের কোনো দূরত্ব থাকবে না। এই প্রতিশ্রুতি প্রত্যেক আল্লাহ অভিমুখী হিফাজতকারীর জন্য, যারা গায়ের অবস্থায় দয়াময় আল্লাহকে ভয় করেছে ও বিনীত চিত্তে উপস্থিত হয়েছে (ক্বাফ-৩১) আরও সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নিশ্চয় যারা না দেখেও তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার (মূলক-১২)। তাই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে তাকে ভয় করে এমন বান্দারাই সতর্কবাণী থেকে উপকৃত হয়। কেননা তাদের ভয় সত্য, যাতে কোনো কৃত্রিমতা নেই। আর এমন ভয়ের অধিকারীদেরই কিয়ামতের ময়দানে নির্ভয়ে বিশ্ব প্রভুর সামনে উপস্থিত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। নবীকুলের শিরোমণি মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যেদিন আরশের ছায়া ছাড়া কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ তাঁর আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন। এদের একজন হলো সেই ব্যক্তি, যাকে উচ্চবংশীয় রূপসী নারী আহ্বান জানায়, কিন্তু সে এই বলে তাকে প্রত্যাখান করে যে আমি আল্লাহকে ভয় করি। আরেকজন ওই ব্যক্তি, যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে, ফলে তার দুচোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হয় (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।   কোরআন ও সুন্নাহর দলিল প্রমাণ করে যে আল্লাহর ভয় দুই রকমের যা পরস্পর সংগতিপূর্ণ-এক. স্বীয় রবের ব্যাপারে বান্দার এই ভয়, যে তিনি তাকে কৃত গুনাহ অথবা ফরজ বিধান লঙ্ঘনের দায়ে শাস্তি প্রদান করবেন। আর এ ভয়ের ফলে পাপকর্ম বর্জন করে চলা। যে ব্যক্তি কোনো অপরাধ করার পর আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে তওবা করে তার দিকে ফিরে আসে, সেও এই ধরনের ভয়ের অধিকারী। এই ধরনের ভয় কেবল তারাই করে যারা তাদের রবকে সম্মান প্রদর্শন করে। দুই. আল্লাহকে ভয় করার আরেকটি উপায় হলো তাঁর সুন্দর নাম ও গুণাবলির মর্ম অনুধাবন করে তাঁর ইবাদত করা (সুরা : আল রাদ-৯-১০)। বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) বলেন, মুমিন বান্দা আল্লাহর পথে খরচ করে ও দান করে। কিন্তু তার হৃদয়ে আশঙ্কা থাকে যে এটা তার রবের কাছে পৌঁছবে কি না? এমন ব্যক্তিই প্রকৃত মুমিন, কারণ সৎ আমল করা সত্ত্বেও সে আত্মতৃপ্তিতে ভোগে না।   তাই আসুন! আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি হে আল্লাহ! আপনি আমাদের প্রকাশ্য, নির্জন ও সর্বাবস্থায় আপনার ভয়ে ভীত হওয়ার তওফিক দান করুন। যা আমাদের আপনার অবাধ্য হওয়ার পথে বাধা দেবে এবং আপনার ইবাদত পালনে উদ্বুদ্ধ করবে।

মো: দেলোয়ার হোসাইন জানুয়ারী ৩১, ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
মোরাকাবা বা ধ্যানের গুরুত্ব

আরবি মোরাকাবা শব্দের অর্থ নজরে রাখা, পর্যবেক্ষণ করা, ধ্যান করা। এর প্রতিশব্দ হলো তাফাক্কুর, অর্থ চিন্তা করা, গভীরভাবে চিন্তা করা। ইংরেজিতে মোরাকাবাকে গবফরঃধঃরড়হ বলে। সব নবী-রসুল মোরাকাবার মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। ইসলামের আত্মিক অনুশীলনের মাধ্যম হচ্ছে মোরাকাবা। হজরত রসুল (সা.) দীর্ঘ ১৫ বছর হেরা গুহায় মোরাকাবা বা ধ্যান করে আল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। মোরাকাবারত অবস্থায় তাঁর কাছে পবিত্র কোরআনে সুরা আল আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত নাজিল হয়। মোরাকাবার মাধ্যমেই রসুল (সা.) আল্লাহর পরিচয় লাভ করেন। রসুল (সা.) বলেন, ‘একবার আমি দীর্ঘ এক মাস হেরা গুহায় অবস্থান করলাম। অবস্থান শেষে গুহা থেকে বের হয়ে আমি খোলা ময়দানে চলছিলাম। পথিমধ্যে আমাকে আহ্বান করা হলো। আমি একে একে সামনে ও পেছনে, ডানে ও বামে তাকাতে লাগলাম। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না। অতঃপর আমাকে পুনরায় আহ্বান করা হলো। এবারও আমি কাউকে দেখলাম না। পুনরায় আহ্বান করা হলে, আমি মাথা তুলে দেখলাম- আমার মহান মালিক ঊর্ধ্বাকাশে আরশের ওপর অবস্থান করে আমাকে ডাকছেন। আমার শরীরে ভীষণ কম্পন শুরু হলো। আমি খাদিজা (রা.)-এর নিকট পৌঁছালাম এবং বললাম, আমাকে কম্বল দ্বারা আচ্ছাদিত করো। অতঃপর আমাকে কম্বল দ্বারা আচ্ছাদিত করা হলো। তারপর আমার ওপর পানি ছিটানো হলো। এ সময় আল্লাহ নাজিল করেন ‘হে কম্বলাবৃত রসুল! উঠুন, সতর্ক করুন এবং আপনার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন।’ (তাফসিরে কুরতুবি-২১ নম্বর খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৫)। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে মোরাকাবার ফজিলত : আল্লাহ বলেন, ‘(তাঁরাই তত্ত্বজ্ঞানী) যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহর জিকির করে এবং আসমান জমিন সৃষ্টির বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে।’ (সুরা আলে ইমরান : আয়াত ১৯১) মোরাকাবার ফজিলত সম্পর্কে রসুল (সা.) বর্ণিত বহু হাদিস রয়েছে। তিনি বলেন, ‘গভীরভাবে চিন্তা করা বা মোরাকাবার সমতুল্য কোনো ইবাদত নেই’ (তাফসিরে মাজহারি, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০০)। তিনি আরও বলেন, ‘রাত ও দিনের পরিবর্তনকারী আল্লাহকে নিয়ে এক ঘণ্টা মোরাকাবা করা ৮০ বছরের ইবাদতের চেয়ে উত্তম’ (তাফসিরে মাজহারি, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১০)। মোরাকাবার মাধ্যমে বান্দার অন্তরে তাকওয়া বা খোদাভীতি তৈরি হয়। এতে ইবাদতের একাগ্রতা ও মনোযোগ বৃদ্ধি পায়। রসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহকে ভয় করার পদ্ধতি ৪টি। ১। গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহর মোরাকাবা করা, ২। কল্যাণজনক কাজ করা, ৩। কিয়ামতের ব্যাপারে চিন্তা ও গবেষণা করা এবং ৪। আল্লাহর সমীপে মোনাজাত করা। (কালিমাতুর রাসুলিল আজম (সা.), পৃষ্ঠা ৯৪)। মোরাকাবার ফজিলত সম্পর্কে হজরত আলী (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, ‘এক ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করলেন, ওই আয়াতগুলো সম্পর্কে, যে আয়াতগুলো তাঁর কাছে অস্পষ্ট মনে হচ্ছিল, মহান আল্লাহর বাণী- ‘এরূপ লোকেরাই বেহেশতে প্রবেশ করবে, সেখানে তাদের দেওয়া হবে অফুরন্ত রিজিক।’ হজরত আলী (রা.) জবাবে বলেন, রসুল (সা.) ইরশাদ করেন, হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহর ফরমান, ‘আমার সম্মান প্রদর্শন হয়েছে অথবা আমার বন্ধুত্ব অবধারিত হয়েছে তাদের জন্য, যারা আমার মোরাকাবা করেছে, আমার শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি মহব্বত রেখেছে, কিয়ামত দিবসে তাদের চেহারা নুরানি হয়ে যাবে, তারা নুরের মিম্বরে অবস্থান করবে। তাদের দেহে থাকবে সবুজ পোশাক। আরজ করা হলো, ইয়া রসুল (সা.) তারা কারা? তিনি বলেন, তারা নবীও নন, শহীদও নন, বরং তারা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের ওপর ভালোবাসা স্থাপন করেছে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন স্বীয় রহমতে আমাদের তাদের দলভুক্ত করে দেন (মুসনাদে ইমাম আলী, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৩ ও ২২৪)। হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) তাঁর ‘গুনিয়াতুত তালেবিন’ কিতাবে উল্লেখ করেন- ‘মোরাকাবা দ্বারা মুজাহাদার পরিপূর্ণতা সাধিত হয়। ফেরেশতা জিবরাইল হুজুরে পাক (সা.)-এর কাছে জিজ্ঞাসা করেন যে, ইহসান কী? হুজুরে পাক (সা.) জবাবে বলেন, তুমি এমনভাবে ইবাদত করো, যেন আল্লাহ দেখছেন। আর যদি তোমার অবস্থা তেমনটা না হয়, তবে মনে করবে যে, আল্লাহ অবশ্যই তোমাকে দেখছেন। মোরাকাবা এটিই, বান্দা ইয়াকিন রাখবে যে, আল্লাহ তার সবকিছুরই খবর রাখেন। সদা-সর্বদা বান্দার মনে এই কথাটা জাগ্রত থাকার নামই মোরাকাবা। বান্দার জন্য যত রকম ভালো এবং কল্যাণকর বস্তু রয়েছে, সবকিছুর মূল হলো মোরাকাবা। সালেকের গন্তব্যস্থলে পৌঁছার জন্য মোরাকাবা হলো প্রধান অবলম্বন।’ (গুনিয়াতুত তালেবিন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৬ ও ২৫৭)। প্রখ্যাত ইসলামিক দার্শনিক ড. কুদরত এ খোদা বলেন, ‘যে ধ্যানের মাধ্যমে আল্লাহ ও রসুল (সা.)-এর পরিচয় জানা যায়, তাদের নির্দেশমতো চলা যায় ও সৃষ্টির তত্ত্ব সম্বন্ধে অবগত হওয়া যায়, তাকেই মোরাকাবা বলে।’

মো: দেলোয়ার হোসাইন জানুয়ারী ২৪, ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
জানা গেল পবিত্র রোজা শুরুর সম্ভাব্য তারিখ

প্রতিবছরের মতো আবারও নিকটে চলে এসেছে পবিত্র রমজান মাস। আর প্রায় এক মাস পরই শুরু হতে যাচ্ছে মুসলিম উম্মাহর সিয়াম সাধনা ও ইবাদতের এই মহিমান্বিত মাস। তবে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করেই রমজানের শুরু নির্ধারিত হবে।   দুবাইয়ের ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড চ্যারিটেবল অ্যাকটিভিটিজ ডিপার্টমেন্টের প্রকাশিত ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, আগামী ১৭ থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে পবিত্র রমজান মাস শুরু হতে পারে। সে হিসেবে ১৮ ফেব্রুয়ারি রমজানের সম্ভাব্য প্রথম দিন হিসেবে ধরা হচ্ছে। এ বিভাগের ২০২৬ সালের সরকারি ছুটি ও ধর্মীয় দিবসের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, পবিত্র রমজান মাসের শেষ দিন হতে পারে ১৯ মার্চ (বৃহস্পতিবার)। সে ক্ষেত্রে পরদিনই মুসলমানদের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্‌যাপিত হতে পারে। ২০২৬ সালের ক্যালেন্ডার অনুসারে রমজান মাস ১৯ মার্চ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে এ মাস ২৯ অথবা ৩০ দিনের হতে পারে। উল্লেখ্য, হিজরি বর্ষ গণনা করা হয় চাঁদের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে। বর্তমানে চলছে রজব মাস, আর হিজরি মাস সাধারণত ২৯ বা ৩০ দিনের হয়ে থাকে। এদিকে বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হতে যাচ্ছে পবিত্র সিয়াম সাধনার মাস রমজান।

মোঃ ইমরান হোসেন জানুয়ারী ১৫, ২০২৬
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এলাকায় রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির। ছবি : সংগৃহীত
রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের আশ্বাস বাস্তবায়ন কতদূর?

কক্সবাজারের উখিয়া–টেকনাফের পাহাড়ঘেরা রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির। ধুলোমাখা সেই পরিবেশে যখন জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একসঙ্গে ইফতারের টেবিলে বসেন, তখন সেটি কেবল একটি মানবিক সৌজন্য ছিল না। বরং তা ছিল বিশ্বের অন্যতম নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর প্রতি এক শক্তিশালী কূটনৈতিক বার্তা—যা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে রোহিঙ্গা সংকটকে আলোচনায় টেনে আনার প্রয়াস।   এই সংকট নিয়ে আমরা এমন এক সময়ে উত্তর খুঁজছি, যখন বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজায় রক্তক্ষয়, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সাম্প্রতিক ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে ব্যস্ত। ফলে রোহিঙ্গা সংকট ক্রমেই একটি ‘বিস্মৃত ট্র্যাজেডি’তে পরিণত হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের জন্য এটি কোনো মানবিক বিলাসিতা নয়—বরং জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য এক সুপ্ত টাইমবোম। রোহিঙ্গারা কি কেবলই আশ্রিত এক উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী? ইতিহাসের পাতা উল্টালে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। অষ্টম শতাব্দী থেকেই আরব, পারস্য ও মুর বণিকদের হাত ধরে আরাকান উপকূলে যে মুসলিম বসতি গড়ে ওঠে, সেখান থেকেই রোহিঙ্গা জাতিসত্তার বিকাশ। তারা মিয়ানমারের মাটিতে কোনো বহিরাগত নয়; বরং তারা ওই ভূখণ্ডেরই আদিবাসী উত্তরসূরি। ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত আরাকান ছিল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। ম্রাউক-ইউ রাজবংশের শাসনামলে এটি ছিল এক অনন্য সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের উদাহরণ। বৌদ্ধ রাজারা মুসলিম উপাধি গ্রহণ করতেন, রাজদরবারে বাংলা ও ফারসি সাহিত্যের চর্চা হতো। মহাকবি আলাওল ও মাগন ঠাকুরের মতো সাহিত্যিকেরা এই রাজদরবারের গৌরব ছিলেন। মিয়ানমার ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী উ নু রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রের একটি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। ১৯৬২ সাল পর্যন্ত তারা সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। অর্থাৎ আজ যাদের ‘রাষ্ট্রহীন’ বলা হচ্ছে, তারা একসময় রাষ্ট্র পরিচালনার অংশ ছিলেন। তাই রোহিঙ্গাদের অধিকার কেবল মানবিক নয়—এটি ঐতিহাসিক ও আইনি অধিকার। এই জনগোষ্ঠীর নিপীড়নের সূচনা হয় ১৭৮৪ সালে, যখন বর্মী রাজা বোডাওপায়া আরাকান দখল করেন। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে নাগরিক অধিকার হরণ, সাম্প্রদায়িক নির্যাতন ও রাষ্ট্রীয় নিধনযজ্ঞ শুরু হয়। ১৯৪২ সালের দাঙ্গা, ১৯৭৮ সালের ‘অপারেশন ড্রাগন কিং’ এবং সর্বশেষ ২০১৭ সালের জাতিগত নির্মূল অভিযান—প্রতিবার একই কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে। নাফ নদী আজ কেবল সীমান্ত নয়; এটি রোহিঙ্গাদের রক্ত ও কান্নার সাক্ষী। বড় পরিহাস হলো—মিয়ানমারের সামরিক জান্তা নিজেরাই এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গারা ঐতিহাসিকভাবে নেপিডোর প্রতি অনুগত ছিল এবং কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদে জড়ায়নি। বরং তারা ফেডারেল কাঠামোর ভেতরে নাগরিক অধিকার চেয়েছে। এই অনুগত জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করে জান্তা রাখাইন রাজ্যে নিজের শক্ত ভিত্তিটাই ধ্বংস করেছে। ফলে তৈরি হয়েছে ক্ষমতার শূন্যতা, যার সুযোগ নিয়েছে আরাকান আর্মি। আজ রাখাইনের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের অতীত কূটনৈতিক ব্যর্থতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০১৭ সালের সংকটে তৎকালীন সরকার মানবিক আবেগ ও আন্তর্জাতিক ইমেজ নির্মাণে বেশি গুরুত্ব দিলেও শক্ত কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগে ব্যর্থ হয়। ১৯৭৮ ও ১৯৯১ সালে যেভাবে মিয়ানমারকে বাধ্য করা হয়েছিল দ্রুত প্রত্যাবাসনে, সেই দৃঢ়তা তখন দেখা যায়নি। এর ফল আজ কক্সবাজার ও পার্বত্য অঞ্চলে জনতাত্ত্বিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতা। বর্তমানে মিয়ানমার কার্যত একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র। দেশটি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। জান্তা বাহিনী কোণঠাসা, আর বিদ্রোহীরা সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কাদের সঙ্গে প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা করবে—ক্ষমতাহীন জান্তা নাকি আরাকান আর্মি? এই দ্বিধাই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত স্বার্থ। চীন তার কিয়াকপু বন্দর ও পাইপলাইনের নিরাপত্তা চায়, ভারত তার ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির স্বার্থ রক্ষা করছে, আর যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা সংকটকে চীনের বিরুদ্ধে চাপের হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। এই বাস্তবতায় মানবিকতা গৌণ হয়ে পড়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে জাতিসংঘ মহাসচিবের ইফতার আয়োজন ছিল একটি প্রতীকী বার্তা। কিন্তু বাস্তবতা হলো—১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বহাল রেখে কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত রাখাইনে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনো মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। সমাধান কোথায়? উত্তর লুকিয়ে আছে এক ভিন্নধর্মী কূটনীতিতে। বাংলাদেশকে বুঝতে হবে, রাখাইনে জান্তা আর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক নয়। তাই ‘ট্র্যাক-টু ডিপ্লোম্যাসি’র মাধ্যমে আরাকান আর্মিসহ সব প্রাসঙ্গিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ জরুরি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে নিরাপদ অঞ্চল গঠন এবং রোহিঙ্গাদের নিজস্ব রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকাশের উদ্যোগ নিতে হবে।   রোহিঙ্গা সংকট কেবল মানবিক নয়—এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। এই সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, সীমান্ত অস্থিরতা তত বাড়বে। তাই রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নয়, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে নাগরিকত্বসহ মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই হতে পারে এই দীর্ঘ ট্র্যাজেডির একমাত্র টেকসই সমাধান।

মোঃ ইমরান হোসেন জানুয়ারী ০৭, ২০২৬
দারিদ্র্যের হার বাড়ছে কেন
দারিদ্র্যের হার বাড়ছে কেন

অর্থনৈতিক চাপ, যেমন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান হ্রাস এবং উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার কারণে দারিদ্র্য বাড়ে। এ ছাড়া, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ, বৈষম্যমূলক নীতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং একটি নির্দিষ্ট দারিদ্র্যের চক্রের কারণেও দারিদ্র্য বাড়ে। দারিদ্র্য বাড়ার আরেকটি কারণ হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি। জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ার কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, যা দরিদ্র পরিবারগুলোকে আরও দরিদ্র করে তোলে। এরপর আছে কর্মসংস্থান সংকট। পর্যাপ্ত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়া এবং মন্দার কারণে চাকরি হারানোর ফলে আয়ের উৎস কমে যায়। অর্থনৈতিক বৈষম্য সুবিধাভোগীরা আরও বেশি সুবিধা পায়, কিন্তু অনেক দরিদ্র ও নিম্ন-আয়ের মানুষ প্রয়োজনীয় পরিষেবা থেকেও বঞ্চিত হয়। সঠিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাবে মানুষ ভালো চাকরি পায় না এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয় না। বন্যা, খরা, ঝড় এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষি ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা দারিদ্র্য বাড়িয়ে দেয়। উচ্চ সুদের ঋণ বা অন্যান্য ঋণের জালে আটকা পড়া দারিদ্র্য আরও বাড়িয়ে তোলে। জ্বালানিসংকট, আর্থিক খাতের দুরবস্থা, উচ্চ সুদহার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম হারে মজুরি বৃদ্ধি, ক্রয়ক্ষমতা কম এসব সমস্যা তো অর্থনীতিতে আছেই। তবে বর্তমান সরকারের সময় যুক্ত হওয়া বড় দুটি উপাদান হচ্ছে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। এতে তৈরি হয়েছে আস্থাহীনতা। এ কারণে অর্থনীতি গতিহীন, বিনিয়োগ নেই, হয়নি বাড়তি কর্মসংস্থান। ফলে অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধিও সামান্য। সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজার বেড়ে ২৬ লাখ ২০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। বেকারত্ব বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের পরিবেশের অভাব এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহারকে দায়ী করা যায়। বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২০২৩ সালে ২৪ লাখ ৬০ হাজার থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ২৬ লাখ ২০ হাজার হয়েছে। বেকারত্বের হার ২০২৪ সালে সার্বিক বেকারত্বের হার ৪.৪৮ শতাংশ। এটি ২০২৩ সালের ৪.১৫ শতাংশ থেকে বেশি। অন্যদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ না থাকা এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার বেকারত্ব বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৩তম আইসিএলএসের ভিত্তিতে বিবিএসের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক জরিপ অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর শেষে দেশের শ্রমশক্তি ছিল ৭ কোটি ৬ লাখ নারী-পুরুষ। জরিপের সময় দেশে ৬ কোটি ৭৫ লাখ ১০ হাজার নারী-পুরুষ আগের সাত দিনে এক ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজ করেছে। অর্থাৎ, তারা কর্মে নিয়োজিত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ ৪ কোটি ৫৭ লাখ ৭০ হাজার এবং নারী ২ কোটি ১৭ লাখ ৪০ হাজার। যারা কর্মে নিয়োজিত নয় কিন্তু বেকার হিসেবেও বিবেচিত নয়, তারাই মূলত শ্রমশক্তির বাইরের জনগোষ্ঠী। এ জনগোষ্ঠীতে আছে শিক্ষার্থী, অসুস্থ ব্যক্তি, বয়স্ক, কাজ করতে অক্ষম, অবসরপ্রাপ্ত এবং কর্মে নিয়োজিত নয় বা নিয়োজিত হতে অনিচ্ছুক এমন গৃহিণীরা। উল্লেখ্য, প্রতি বছর কমপক্ষে ২০ লাখ মানুষ চাকরির বাজারে প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে ১৩-১৪ লাখ মানুষের দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান হয়। বাকিরা কাজের জন্য প্রবাসে যায়। তাই দুই দশক ধরে বেকারের সংখ্যা মোটামুটি ২৪-২৮ লাখের মধ্যেই রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৭৩৮ মার্কিন ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এ তথ্য দিয়েছে। এ হিসাবে সাময়িক হিসাব থেকে মাথাপিছু আয় ৪৬ ডলার কমে গেছে। সাময়িক হিসাবে মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৭৮৪ ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মাথাপিছু আয়, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) চূড়ান্ত হিসাব দিয়েছে। সেখানে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এ হিসাবে দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারও কমেছে। এক বছরে বেকার বেড়েছে দেড় লাখ। ২০২৫ চূড়ান্ত হিসাবমতে, দেশে বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২৬ লাখ ২০ হাজার। ২০২৩ সালে এটি ছিল ২৪ লাখ ৬০ হাজার। দেশে তিন মাসে বেকার বেড়েছে ৬০ হাজার। ২০২৫ সব মিলিয়ে এক বছরের ব্যবধানেও দেশে বেকার বেড়েছে। ২০২৪ সালে দেশে বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ। দারিদ্র্য হ্রাসে বাংলাদেশ সাফল্য দেখালেও ২০১৬ সাল থেকে দারিদ্র্য কমার গতি ধীর হয়েছে। এ সময় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও সেটি তুলনামূলক কম অন্তর্ভুক্তিমূলক। ফলে প্রবৃদ্ধির সুফল পেয়েছে ধনী মানুষরা। বর্তমানে দেশের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি একেবারে স্থবির হয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। এর ফলে দেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে যারা কর্মসংস্থানে রয়েছে, তাদের প্রায় অর্ধেক কম মজুরিতে কাজ করছে। ‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও বৈষম্য মূল্যায়ন ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক এ তথ্য উল্লেখ করেছে। এতে আরও বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২২ সময়ে চরম দারিদ্র্য ১২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং মাঝারি দারিদ্র্য ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অন্য যে কোনো অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়ের মুখে পড়ে আবারও দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়ে গেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রবৃদ্ধির সুফল পেয়েছে ধনী মানুষরা, ফলে আয়বৈষম্য বেড়ে গেছে। প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০১০ থেকে ২০২২—এ সময়ে বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে দারিদ্র্য হ্রাস করেছে। ফলে ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং আরও ৯০ লাখ মানুষ অতি দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। তাদের জীবনমানের উন্নতি হয়েছে, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, পয়ঃনিষ্কাশনের মতো জরুরি সেবাগুলো পাওয়া সহজ হয়েছে। তবে ২০১৬ সাল থেকে দারিদ্র্য কমার গতি ধীর হয়েছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কম অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে। ২০১৬ সালের পর থেকে তুলনামূলকভাবে কম অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিপথ বদলে গেছে। দেখা গেছে, প্রবৃদ্ধির সুফল পেয়েছে ধনী মানুষরা, ফলে আয়বৈষম্য বেড়ে গেছে। কৃষির ওপর ভর করে গ্রামীণ এলাকাগুলো দারিদ্র্য হ্রাসে নেতৃত্বের ভূমিকায় চলে গেছে। একই সময়ে শহরে দারিদ্র্য হ্রাসের হার কমেছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে চাইলে সবচেয়ে জরুরি হবে দারিদ্র্যবান্ধব, জলবায়ু-সহিষ্ণু এবং কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক কৌশল গ্রহণ।’ লাখ লাখ বাংলাদেশির জন্য দরিদ্র অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটি মাধ্যম অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন। প্রবাস আয় দারিদ্র্য কমাতে সহায়তা করেছে, তুলনামূলকভাবে গরিব পরিবার এটা থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়। কিন্তু দেশে অভিবাসী হওয়া কর্মীরা শহরের ঘিঞ্জি এলাকায় জীবনযাপন করে, যেখানে জীবনযাত্রার মান নিম্ন। আর সচ্ছল পরিবার ছাড়া আন্তর্জাতিক অভিবাসনের সুযোগ নেওয়া যায় না, কেননা বিদেশ যাওয়ার খরচ খুবই বেশি। যদিও বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বেড়েছে তবে সেখানে অদক্ষ ব্যবস্থাপনা রয়েছে এবং উপকারভোগী নির্বাচন লক্ষ্যভিত্তিক নয়। দেখা গেছে, ২০২২ সালে সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা পাওয়াদের মধ্যে ৩৫ শতাংশই ধনী পরিবার যেখানে অতি দরিদ্র পরিবারের অর্ধেকও এই সুবিধা পায়নি। তা ছাড়া, ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ বেশিরভাগ সময়েই লক্ষ্যভিত্তিক হয় না, এমনকি বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং সারে সরকার যে ভর্তুকি দেয়; তার সিংহভাগ অপেক্ষাকৃত ধনী পরিবারগুলো পায়। দারিদ্র্য এবং বৈষম্য কমাতে সহায়ক হবে এমন চারটি প্রধান নীতিগত করণীয় চিহ্নিত করেছে এ প্রতিবেদন। এগুলো হলো—উৎপাদনশীল খাতে কর্মসংস্থানের ভিত্তি মজবুত করা, দরিদ্র এবং ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য বেশি করে শোভন কাজের ব্যবস্থা করা, আধুনিক প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-সহায়ক বিধিবিধান তৈরি করে দরিদ্রবান্ধব বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং শক্তিশালী রাজস্ব নীতি ও কার্যকর এবং লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা শক্তিশালী করা। বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ এবং প্রতিবেদনটির অন্যতম লেখক সার্জিও অলিভিয়েরি বলেন, ‘বাংলাদেশ আঞ্চলিক বৈষম্য, বিশেষ করে পূর্ব-পশ্চিমের বৈষম্য বেশ কমিয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আঞ্চলিক বৈষম্য, বিশেষ করে শহর ও গ্রামের বৈষম্য বাড়িয়ে দিচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দারিদ্র্য মূল্যায়ন দেখিয়েছে যে, উদ্ভাবনী নীতি গ্রহণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, শহরে গুণগত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষিতে দরিদ্রবান্ধব মূল্য-শৃঙ্খল নিশ্চিত করা এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশ দারিদ্র্য হ্রাসের গতি পুনরুদ্ধার ও ত্বরান্বিত করতে পারে এবং সমৃদ্ধিতে সবার অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে পারে।’ লেখক: সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান-ন্যাশনাল এফএফ ফাউন্ডেশন

মোঃ ইমরান হোসেন ডিসেম্বর ১২, ২০২৫
যেভাবে জাতির ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠলেন
যেভাবে জাতির ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠলেন

হাসপাতালের সংকটময় বিছানায় শুয়ে থাকা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চারপাশে এখন সমগ্র জাতি নিঃশব্দ প্রার্থনায় নিমগ্ন। দল-মত-ধর্ম-বর্ণের ব্যবধান ভুলে সবাই তার জন্যই হাত তুলছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ পর্যন্ত সবার হৃদয়ে একই মিনতি—তিনি সুস্থ হোন।   বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো নেতার অসুস্থতা নিয়ে এমন সামষ্টিক আবেগ, এমন ঐক্যের বিস্তার আগে কখনো দেখা যায়নি। এই দৃশ্য বলে দেয়, খালেদা জিয়া শুধু একটি দলের নেত্রী নন; তিনি হয়ে উঠেছেন দেশের মানুষের গভীরতম মানবিক অনুভূতির প্রতীক। এই ভালোবাসা, এই ঐক্যের উৎস শুধুই তার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় নয়; উৎস তার চরিত্রে, তার মহত্ত্বে, তার অসীম সহিষ্ণু ও নিঃস্বার্থ হৃদয়ে। খালেদা জিয়া সেই বিরল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন, যিনি ক্ষমতায় থেকেও প্রতিপক্ষকে ঘৃণা করেননি আর ক্ষমতার বাইরে থেকেও বিদ্বেষকে রাজনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করেননি। বাংলাদেশের রাজনীতির উত্তপ্ত বছরগুলোয় তার আচরণ বারবার দেখিয়েছে মানুষকে ভালোবাসা, দেশকে ভালোবাসা, অন্যায়ের কাছে মাথানত না করা—এগুলোই তার রাজনীতির প্রধান ভিত্তি। তিনি চাইলে ভিন্ন জীবন বেছে নিতে পারতেন। একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধানের স্ত্রী হিসেবে তিনি বিলাস-স্বাচ্ছন্দ্যে ভরা জীবন কাটাতে পারতেন অনায়াসে। কিন্তু তিনি সেই পথ বেছে নেননি। তিনি প্রবেশ করেছিলেন রাজনীতির অনিশ্চিত গোলকধাঁধায়—শুধু জনগণের কল্যাণের টানে, গণতন্ত্রের দায়ে। এটি ছিল ত্যাগের সিদ্ধান্ত, কঠিন, কণ্টকাকীর্ণ, তবুও দৃঢ়। গণতন্ত্রের জন্য তার লড়াই শুধু এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ৯ বছরব্যাপী আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ফ্যাসিবাদী দমনপীড়নের বিরুদ্ধেও ছিল তার দীর্ঘ, নিরলস সংগ্রাম। জীবনের বহু সময় জেল, মামলা, গৃহবন্দিত্ব, অপমান, অপবাদ—সব তিনি সহ্য করেছেন এ বিশ্বাসে যে, গণতন্ত্রের আলো নিভে যেতে নেই। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন নিঃশ্বাস নিতে পারে স্বাধীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজে—এ আদর্শই তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। ফ্যাসিবাদের সামনে তিনি কখনো মাথা ঝোঁকাননি। রাজনীতির ইতিহাসে খুব কম মানুষ আছেন, যারা ক্ষমতার মোহ ছেড়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এতটা নিষ্ঠা ও স্থিতি নিয়ে দাঁড়াতে পেরেছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর বিপর্যস্ত একটি দলকে সংগঠিত করে তিনি যেভাবে পুনর্গঠন করেছিলেন, তা ছিল এক নীরব বিপ্লব। অভিজ্ঞতা কম থাকলেও নেতৃত্বের শক্তি ছিল তার ব্যক্তিত্বে, সৎ ইচ্ছায়, ধৈর্যে। বিএনপিকে তিনি শুধু একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার মেয়াদ ছিল দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ক্ষমতা বা পদ নয়; সবচেয়ে বড় অর্জন দেশের মানুষের স্নেহ, আস্থা ও শ্রদ্ধা। এ শ্রদ্ধার গভীরতা আজ অসুস্থতার মুহূর্তে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একজন মানুষ যখন হাসপাতালের বিছানায় শায়িত হয়ে দেশের মানুষের মনোভূমিকে এমনভাবে একত্রিত করে ফেলেন, সেটিই হয়ে ওঠে তার নেতৃত্বের সবচেয়ে সত্যিকারের মূল্যায়ন। তার জীবনে দুঃখ, সংগ্রাম, ক্ষতি ছিল প্রচুর। নিজের ও পরিবারের ওপর আঘাত আসবে জেনেও তিনি গণতন্ত্রের পথ ছাড়েননি। তার দুই পুত্রকে হারানো—একজনের মৃত্যু, একজনের দীর্ঘ নির্বাসন— এসবই ছিল তার জীবনের গভীরতম ক্ষত। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি। মহৎ হৃদয়ের মানুষরা সাধারণত ভেঙে পড়েন না—তারা নীরবে লড়াই করেন, কারও ক্ষতি চান না, কিন্তু অন্যায়ের কাছে নতও হন না। খালেদা জিয়ার জীবন তার উজ্জ্বলতম উদাহরণ। আজ যখন তিনি মৃত্যুপথযাত্রার মতো এক ভয়াবহ অসুস্থতার বিরুদ্ধে লড়ছেন, তখন জাতি বুঝতে পারছে—এ নারীর জীবন শুধু একটি রাজনৈতিক গল্প নয়; এটি এক অধ্যবসায়, সহিষ্ণুতা, মানবিক মর্যাদা ও ত্যাগের মহাকাব্য। সামাজিক মাধ্যমে যে অভূতপূর্ব দোয়া-প্রবাহ দেখা গেছে, তা কোনো প্রচারণার ফল নয়; এটি হৃদয়ের সাড়া। যারা কখনো তাকে ভোট দেননি, যারা তার দলকে সমর্থন করেন না, তারাও আজ প্রার্থনার অংশ হয়ে গেছেন—এটাই এক নেত্রীকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসার সর্বোচ্চ প্রমাণ। মানুষের ভালোবাসা কখনো মিথ্যা হয় না। রাজনীতির গল্প বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যে স্থান, তা যুগ পেরিয়েও থেকে যায়। আজ বেগম খালেদা জিয়া সেই বিরল স্থানে অবস্থান করছেন, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, মানবিক চরিত্রই তার পরিচয়। জীবনের সায়াহ্নে এসে তিনি হয়ে উঠেছেন জাতির ঐক্যের প্রতীক—এ এক আশ্চর্য, অথচ গভীর সত্য। জাতি তার সুস্থতা কামনা করছে শুধু একজন ব্যক্তির জন্য নয়, একটি ইতিহাসের জন্য, একটি আদর্শের জন্য, একটি মানবিকতার জন্য। তিনি যে পথ দেখিয়েছেন—সাহসের, ধৈর্যের, ন্যায়ের, আপসহীনতার; সে পথই আজ মানুষের মনে আলো জ্বেলে যাচ্ছে। রাজনীতিতে অনেকেই ক্ষমতার চূড়ায় ওঠেন, কিন্তু খুব কম মানুষ মানুষের হৃদয়ে থাকেন। খালেদা জিয়া সেই বিরল জননীসুলভ নেত্রী, যিনি পরিণত বয়সে, অসুস্থতার বিছানায় থেকেও জাতিকে একত্রিত করতে পেরেছেন। সেই ঐক্যই আজ তার প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা। এই প্রার্থনা-ভরা সময়ই তার প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি।

মোঃ ইমরান হোসেন ডিসেম্বর ১২, ২০২৫
ছবি : সংগৃহীত
চাকরি ও কর্পোরেট দুনিয়ায় বেতনব্যবস্থা কীভাবে এলো

দৈনন্দিন চাকরিজীবনের অন্যতম পরিচিত শব্দ—‘বেতন’। কিন্তু এই বেতনব্যবস্থা কি সবসময় এমন ছিল? করপোরেট দুনিয়ায় মাস শেষে টাকা পাওয়ার যে আধুনিক ব্যবস্থা, তা আসলে কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস, সাম্রাজ্য, যুদ্ধ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির বিবর্তনের ফল। ইতিহাসের প্রথম বেতনব্যবস্থা পাওয়া যায় আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে, খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সালে। মেসোপটেমিয়ার শহর–রাষ্ট্র উরুক, ব্যাবিলন ও সুমের অঞ্চলে শ্রমিকরা দিনের কাজের বিনিময়ে শস্য, যব বা রৌপ্যের পরিমাপ পেত। এই বেতন হিসাব করা হতো কাদার ফলকে কিুনিফর্ম লিপিতে। প্রত্নতত্ত্ববিদদের পাওয়া নথিতে যুক্ত আছে শ্রমিক কতটুকু যব পেল—তার সুনির্দিষ্ট হিসাব। তাই বলা যায়, বেতনের ‘আবিষ্কার’ কোনো ব্যক্তির নয়; বরং একটি সভ্যতার সাংগঠনিক ব্যবস্থার ফল। রোমান সাম্রাজ্যের সময় সৈন্যদের বেতন হিসেবে লবণ বা লবণ কেনার ভাতা দেওয়া হতো। লাতিন ভাষায় লবণ—‘সাল’; সেখান থেকেই আসে ‘সালারিয়াম’। আজকের ‘বেতন’ শব্দের ধারণা মূলত এই ‘সালারিয়াম’ থেকেই বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। রোমানরা প্রথম বুঝেছিল যে অর্থনীতি চালাতে হলে শ্রমকে মূল্যায়ন করতে হবে। সৈন্যদের মনোবল ধরে রাখা, কর কাঠামো তৈরি, আর্থিক প্রশাসনের উন্নয়ন—সব মিলিয়ে তারা বেতনব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ করে তোলে। মধ্যযুগে ইউরোপে গড়ে ওঠে গিল্ড ব্যবস্থা—কারিগর, কাঠমিস্ত্রি, ধাতু শ্রমিক, তাঁতি—সবাই গিল্ডে যোগ দিয়ে নির্দিষ্ট হারে বেতন পেত। এই সময় প্রথমবারের মতো বেতনের মধ্যে যুক্ত হয় দক্ষতার ভিত্তিতে পারিশ্রমিক, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, এক সমান কাজে এক সমান মজুরি এবং শিক্ষানবিশ/প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার পারিশ্রমিক। এগুলো পরবর্তীকালের শ্রম আইনের ভিত্তি তৈরি করে। ১৭৫০-১৯০০ সাল পর্যন্ত শিল্পবিপ্লবের সময় শ্রমিকরা গ্রাম থেকে শহরে আসতে শুরু করে। কারখানার মালিকদের প্রয়োজন হয় শ্রমিক ধরে রাখা, নিয়মিত উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং দক্ষ কর্মী দীর্ঘমেয়াদি নিয়োগে বাধ্য করা। এসব কারণে তৈরি হয় মাসিক বেতন, সাপ্তাহিক মজুরি, অতিরিক্ত সময়ের মজুরি (ওভারটাইম), বেতন কাটতি, বোনাস ও চুক্তিভিত্তিক বেতন স্কেল। কারখানার মালিকরা বুঝতে পারে—নিয়মিত বেতন দিলে শ্রমিক থাকবে, উৎপাদনও বাড়বে। এটাই আধুনিক করপোরেট বেতনব্যবস্থার ভিত্তি। ২০শ শতকের শুরুতে টেইলর, ফোর্ড ও ওয়েবারের মতো গবেষকেরা যখন আধুনিক ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞান তৈরি করলেন, তখন বেতন হয়ে গেল সংগঠনের অন্যতম কৌশলগত উপাদান। তাদের গবেষণায় দেখা গেল—উচ্চ বেতন উচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করে, কর্মদক্ষতা–ভিত্তিক বেতন কর্মীদের প্রণোদনা বাড়ায় এবং বেতনের স্বচ্ছতা কর্মক্ষেত্রে আস্থা তৈরি করে। এরপর তৈরি হয় মানবসম্পদ বিভাগ, বেতন গ্রেড, বেতন স্কেল, কর্মদক্ষতা সূচকভিত্তিক বোনাস, প্রভিডেন্ট ফান্ড, অবসরভাতা ও ভাতাব্যবস্থা। আজকের করপোরেট বেতনব্যবস্থা তাই পাঁচ হাজার বছরের যাত্রার ফল। উপসংহারে বলা যায়, বেতনের ইতিহাস শুধু অর্থনৈতিক নয়—এটি সভ্যতার বিবর্তন, রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সাম্রাজ্য, যুদ্ধ, শিল্পবিপ্লব এবং আধুনিক করপোরেট নীতির সমন্বিত ফল। মানুষের শ্রমের মূল্যায়নের এই যাত্রাই ধীরে ধীরে বেতনব্যবস্থাকে করেছে আরও বৈজ্ঞানিক, মানবিক ও প্রাতিষ্ঠানিক। লেখক : এম. ইমরান, বিশ্লেষক ও গবেষক  

খবর৭১ ডেস্ক, ডিসেম্বর ০৮, ২০২৫
ঐতিহাসিক সত্যের আলোকপাত: ফেরাউন ও রোমান সাম্রাজ্য সম্পর্কে কোরআনের ভবিষ্যদ্বাণী

ধর্মীয় গ্রंथে ইতিহাস কখনো কখনো প্রতীকী ভাষায় তুলে ধরা হয়। কিন্তু কোরআনের কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা নিখুঁতভাবে পরবর্তী সময়ের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। ফেরাউনের দেহ সংরক্ষণ কোরআনে বলা হয়েছে— “আজ আমি তোমার দেহকে সংরক্ষণ করবো, পরবর্তী যুগের জন্য নিদর্শন হিসেবে।” মিশরের ফেরাউন মুমিনাহ ছিল অজানা, কিন্তু ১৮৯৮ সালে মমি আবিষ্কার হলে— •শরীর অক্ষত •লাল সাগরে ডুবে মৃত্যুর প্রমাণ •কোরআনের বক্তব্যের যথার্থতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আলোড়ন তৈরি হয় রোমানদের পরাজয়–বিজয় ভবিষ্যদ্বাণী সূরা রূম–এ বলা হয়— “রোমানরা পরাজিত হলেও শীঘ্রই বিজয়ী হবে।” ইতিহাস দেখায়— •পারসিকদের কাছে রোমানরা পরাজিত হয়েছিল •ঠিক নয় বছরের মাথায় তারা আবার বিজয় অর্জন করে এ ঘটনাটি কোরআনের বর্ণনার সাথে বিস্ময়করভাবে মিলে যায়। লোহা—মহাজাগতিক উৎস থেকে আগত কোরআনে বলা হয়েছে— “লোহা নাযিল করেছি”—অর্থাৎ আনা হয়েছে। বিজ্ঞান দেখায়— •    পৃথিবীর কেন্দ্রের লোহা উল্কাপিণ্ড থেকে এসেছে •    সুপারনোভার বিস্ফোরণে লোহা উৎপন্ন হয় •    স্পেস ডাস্ট হয়ে পৃথিবীতে পড়ে এটি সপ্তম শতকের জ্ঞানের বাইরে। ফুটনোট: ১. British Museum Egyptology Papers ২. Roman–Persian War Chronicles ৩. Journal of Astrophysics   লেখক : এম. ইমরান, বিশ্লেষক ও গবেষক

খবর৭১ ডেস্ক, ডিসেম্বর ০৫, ২০২৫
আঙুলের ডগায় পরিচয়ের চাবিকাঠি: কোরআন ও আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞান

মানুষের আঙুলের ছাপ। আজ এটি পরিচয়ের সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। কিন্তু কোরআনে শতাব্দী আগেই বলা হয়েছিল— “আমি মানুষের আঙুলের ডগা পর্যন্ত পুনর্গঠন করতে সক্ষম।” এই উক্তি আজ বিজ্ঞানসম্মতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ফিঙ্গারপ্রিন্ট কেন অনন্য? আধুনিক forensic science দেখায়— •    পৃথিবীতে কোনো দুই মানুষের আঙুলের ছাপ এক নয় •    যমজ সন্তানেরও নয় •    আঙুলের ডগায় ৪০টির বেশি অনন্য প্যাটার্ন থাকে •    মৃত্যুপরবর্তী অবস্থাতেও ফিঙ্গারপ্রিন্ট শনাক্তযোগ্য আঙুলের ডগার এই অনন্যতা ১৯শতকেও অজানা ছিল। সপ্তম শতকে তো কল্পনাই অসম্ভব। ফিঙ্গারপ্রিন্ট: অপরাধ বিজ্ঞান বিপ্লব •    অপরাধী শনাক্ত •    জীবিত–মৃতদেহ শনাক্ত •    বর্ডার সিকিউরিটি •    মিলিটারি আইডেন্টিফিকেশন সবই আজ আঙুলের ডগা ভিত্তিক। কেন কোরআনের উল্লেখ বিশেষ? কারণ— •    আঙুলের ডগা মানব শরীরের অন্যতম ক্ষুদ্রতম অংশ •    এতে পরিচয়ের তথ্য সংরক্ষিত •    আধুনিক বায়োমেট্রিকস–এর ভিত্তি ফিঙ্গারপ্রিন্ট কোরআনের বর্ণনা আধুনিক forensic identification system-এর সাথে উল্লেখযোগ্য সামঞ্জস্য রাখে। ফুটনোট: ১. FBI Forensic Handbook ২. Journal of Identity Science   লেখক : এম. ইমরান, বিশ্লেষক ও গবেষক

খবর৭১ ডেস্ক, ডিসেম্বর ০৩, ২০২৫
Popular post
হাইকোর্টের রুল জারি, কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতি কেন অবৈধ নয়

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে। 

কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতি বিতর্ক : উদ্বেগে দুই শতাধিক কর্মকর্তা

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।   

অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না প্যাথলজি-রেডিওলজি রিপোর্টে সরাসরি চিকিৎসকের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক

প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।

কৃষি ব্যাংকের ‘ভুয়া সিবিএ সভা’ ঘিরে চাঞ্চল্য

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে।  অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

কৃষি ব্যাংকে ভুয়া সিবিএ নেতাদের কোটি টাকারও বেশি চাঁদাবাজি

অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।  

সপ্তাহের সেরা

ছবি : সংগৃহীত
জাতীয়

দাড়ি রেখে প্রশংসায় ভাসছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার

মারিয়া রহমান জুন ১১, ২০২৬