মতামত

পর্তুগালের ৭ নম্বর জার্সি পরা অধিনায়কের বিদায়ী মুহূর্ত, পেছনে জাতীয় দলের সতীর্থ ও দর্শকপূর্ণ স্টেডিয়াম।
এক ফুটবলীয় মহাকাব্যের সমাপ্তি

ফুটবল মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে অবসরের ঘোষণা কেবল একজন কিংবদন্তির বিদায় নয়; এটি আধুনিক ফুটবলের অন্যতম বর্ণাঢ্য ও দীর্ঘস্থায়ী জাতীয় অধ্যায়েরই সমাপ্তি। ৪১ বছর বয়সে পর্তুগালের জার্সি তুলে রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই সুপারস্টার। ২৩ বছরের অসামান্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তিনি হয়ে উঠেছেন পর্তুগিজ ফুটবলেরই এক অনন্য প্রতীক। পরিসংখ্যানও তাঁর অসাধারণত্বের সাক্ষ্য দেয়। পর্তুগালের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল—পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ উপস্থিতি ও সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড তাঁর দখলে। ছয়টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ, ২০১৬ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ২০১৯ ও ২০২৫ সালের উয়েফা নেশনস লিগ জয় তাঁর অর্জনের মুকুটে যুক্ত করেছে অনন্য মাত্রা। তবে এই বিদায় পুরোপুরি আবেগময় কোনো আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি নয়। জাতীয় দলের কোচ হোর্হে জেসুসের সঙ্গে খেলার সময় ও দলীয় ভূমিকা নিয়ে মতবিরোধের পর সেপ্টেম্বরে দলের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার ঘটনা তাঁর শেষ অধ্যায়কে কিছুটা বিতর্কিত করেছে। ওয়েলসের বিপক্ষে ২৪ সেপ্টেম্বরের ১-০ গোলের জয়টিই শেষ পর্যন্ত হয়ে থাকছে পর্তুগালের হয়ে তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক উপস্থিতি। ফলে বিদায়টি এসেছে কোনো আনুষ্ঠানিক শেষ ম্যাচ ছাড়াই। এখানেই বিষয়টি কেবল একজন তারকার প্রশংসায় সীমাবদ্ধ থাকে না। রোনালদোর অবদান যেমন প্রশ্নাতীত, তেমনি জাতীয় দলের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত মর্যাদা ও দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যে ভারসাম্যও অপরিহার্য।  একজন অধিনায়ক যত বড় মাপের খেলোয়াড়ই হোন না কেন, দলের স্বার্থে কোচের কর্তৃত্ব, কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং সম্মিলিত নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা জরুরি। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানেরও দায়িত্ব রয়েছে একজন কিংবদন্তির অবদান ও মর্যাদাকে যথাযথ সম্মান জানানো। রোনালদোর বিদায় তাই পর্তুগিজ ফুটবলের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি তুলে ধরে—ব্যক্তি যত বড়ই হোক, প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির ঊর্ধ্বে থাকতে হয়; আবার প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নির্মাণে ব্যক্তির অবদানও অবহেলা করা যায় না। পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন রোনালদোর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে এবং তাঁর সম্মানে বিশেষ আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কারণ, রোনালদো শুধু গোল বা ট্রফি এনে দেননি; বিশ্বমঞ্চে পর্তুগালের পরিচিতি বাড়িয়েছেন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম তরুণ ফুটবলারকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। এখন পর্তুগালের সামনে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলা এবং রোনালদো-পরবর্তী অধ্যায়ে দলকে এগিয়ে নেয়ার চ্যালেঞ্জ। তাঁর মতো একজন জীবন্ত কিংবদন্তীর বিকল্প রাতারাতি খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। তবে দলীয় সংহতি, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং নতুন প্রজন্মের ধারাবাহিক প্রতিভা বিকাশের মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। রোনালদোর বিদায় তাই শুধু শোকের নয়, স্বীকৃতিরও। তাঁর উত্তরসূরিদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা—প্রতিভা মানুষকে কিংবদন্তি করে, কিন্তু দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা ও দলীয় চেতনা সেই কিংবদন্তিকে ইতিহাসে স্থায়ী আসন দেয়।

নাসির উদ্দিন নভেম্বর ০৫, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতি, ট্রাম্পের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, মার্কিন ক্যাপিটল ভবন এবং ভোটারদের গণতান্ত্রিক অবস্থানের প্রতীকী সম্পাদকীয় চিত্র
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন: ট্রাম্পের প্রতি ভোটারদের স্পষ্ট বার্তা

সদ্যসমাপ্ত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল আসন-গণনার ফল নয়; এটি রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টির নীতি এবং রাজনৈতিক ভাষার বিরুদ্ধে ভোটারদের একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা। প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে এবং হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসও দখলের পথে, যা ট্রাম্পের বাকি মেয়াদে তাঁর আইনসভা-নিয়ন্ত্রণকে কার্যত দুর্বল করবে বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা। এ নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের সিনেটে ৫৩-৪৭ ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে চারটি আসনে জয় দরকার ছিল; শেষ পর্যন্ত তাঁরা সাতটি আসন জয় করে সিনেটে ৫৪-৫০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। টেক্সাস, ক্যানসাস ও সাউথ ক্যারোলাইনায় দশকের পর দশক পর প্রথমবারের মতো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হওয়া এই ফলাফলের তাৎপর্য আরও বাড়িয়েছে। মিশিগানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের বিজয় এই নির্বাচনের অন্যতম ঐতিহাসিক দিক। মিশরীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান এই চিকিৎসক রিপাবলিকান মাইক রজার্সকে হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হলেন। তাঁর জয় শুধু ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ের প্রতীক নয়; এটি দেখায়, ইসলামবিরোধী প্রচারণার মুখেও ভোটাররা অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির রাজনীতিকে গ্রহণ করেছেন। নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটে ফিলিস্তিনি-আমেরিকান আবের কাওয়াসের জয়ও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি নিউইয়র্ক আইনসভায় প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান ও হিজাব-পরা নারী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।  একই সঙ্গে ইলহান ওমর ও রাশিদা তালিব পঞ্চমবারের মতো হাউসে নির্বাচিত হয়েছেন; এবার অন্তত সাতজন মুসলিম কংগ্রেসে জায়গা করে নিয়েছেন।  এটি প্রমাণ করে, মার্কিন রাজনীতিতে বৈচিত্র্য ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্বের রূপ নিচ্ছে। এই নির্বাচন ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল মধ্যবর্তী নির্বাচন হতে যাচ্ছে। প্রার্থী ও বাইরের রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর মোট ব্যয় প্রায় ১১.৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে, যা ২০২২ সালের ৮.৯ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।  বাইরের গোষ্ঠীর ব্যয় প্রায় ৩.৯ বিলিয়ন ডলার এবং ‘ডার্ক মানি’ প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার—এই সংখ্যাগুলো নির্বাচনী রাজনীতিতে অর্থের ক্রমবর্ধমান প্রভাব তুলে ধরে।  গণতন্ত্রের জন্য প্রশ্ন হলো, এত বিশাল প্রচারণা-ব্যয় কি ভোটারের স্বাধীন সিদ্ধান্তকে শক্তিশালী করছে, নাকি ক্ষমতাধর অর্থের প্রভাব বাড়াচ্ছে? ট্রাম্পের সামনে এখন নতুন বাস্তবতা। কেননা কংগ্রেসে উভয় কক্ষ হারানো ট্রাম্পের আইন, বাজেট ও নিয়োগ নীতিকে ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত আইনসভার যাচাইয়ের মুখে ফেলবে। তবে ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী রোলাঁ লেসকিউরের সতর্কবাণী অনুযায়ী, পররাষ্ট্রনীতিতে ট্রাম্পের প্রভাব এখনো অনিশ্চিত ও অপ্রত্যাশিত থাকতে পারে।  বিদেশি কূটনীতিকরা মনে করছেন, দুর্বল ট্রাম্প বিশেষ করে ইরান-সংক্রান্ত নীতিতে আরও বেশি বিঘ্নজনক ভূমিকা নিতে পারেন। ডেমোক্র্যাটদের জন্য এই জয় স্বস্তির, কিন্তু আত্মতৃপ্তির নয়। ভোটাররা কেবল ট্রাম্প-বিরোধিতার জন্য নয়, মূল্যস্ফীতি, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতির জন্যও ভোট দিয়েছেন।  প্রতিনিধিত্বের এই বিজয় তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা নাগরিক অধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির কার্যকর নীতিতে রূপান্তরিত হবে।

নাসির উদ্দিন নভেম্বর ০৪, ২০২৬
এলপিজির দাম বাড়ছেই, সাধারণ মানুষের স্বস্তি কোথায়?
এলপিজির মুল্যবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতিঃ জনস্বার্থ রক্ষায় চাই কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ

দেশে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ২২৩ টাকা বেড়ে ২ হাজার ৬০ টাকা হওয়া কেবল জ্বালানি বাজারের মূল্য সমন্বয় নয়, এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও আর্থিক নিরাপত্তার ওপর নতুন চাপ। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটানোকে আরও কঠিন করে তুলছে। যখন খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহনসহ প্রায় প্রতিটি খাতেই ব্যয় বাড়ছে, তখন রান্নার জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পারিবারিক অর্থনীতিতে বাড়তি সংকট তৈরি করে বৈকি। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি আরামকোর চুক্তিমূল্য বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের কমিশন সমন্বয়কে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের জ্বালানির দাম সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাজারের প্রতিটি প্রতিকূলতার দায় কি কেবল ভোক্তাদেরই বহন করতে হবে? আমদানি ব্যয়, ব্যবসায়ীদের মুনাফা, পরিবহন ও বিতরণব্যবস্থার দক্ষতা এবং বাজারের প্রকৃত প্রতিযোগিতা—সবকিছুই কি সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে? সমস্যাটি আরও গভীর, কারণ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মানুষের আয় বৃদ্ধির সামঞ্জস্য নেই। এ বছরের সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮.৩৪ শতাংশ হলেও মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭.৯ শতাংশ। অর্থাৎ গড় হিসাবে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে। সংসারের ব্যয় মেটাতে ঋণনির্ভরতা বাড়লে তার প্রভাব শুধু বর্তমান মাসে সীমাবদ্ধ থাকে না; পরবর্তী মাসগুলোর আয়ও কিস্তি ও সুদের চাপে আটকে যায়। এ পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব শুধু মূল্য নির্ধারণ কিংবা বাজারে অভিযান পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করা, সরবরাহব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ এবং কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মুনাফার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অভিযান নিয়মিত, স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে হবে। অনিয়মের জন্য জরিমানা করাই যথেষ্ট নয়; অপরাধের পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাতিলসহ কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। চাল, ডাল, চিনি, পেঁয়াজ ও ভোজ্যতেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানি-সুবিধা, এলসি মার্জিন শিথিলকরণ এবং টিসিবির মাধ্যমে পণ্য বিক্রির মতো উদ্যোগ ইতিবাচক। কিন্তু এসব উদ্যোগের সুফল প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। একইভাবে, এলপিজির মূল্য নির্ধারণে গণশুনানি ও অংশীজনের মতামত গ্রহণ যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রয়োজন আমদানি ও বিতরণব্যবস্থার স্বচ্ছতা, বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা, শক্তিশালী ভোক্তা সুরক্ষা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয় বৃদ্ধির বাস্তবসম্মত নীতিও জরুরি। ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজ—সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীলতা ছাড়া এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে, বাজার নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা শুধু সরকারি ঘোষণায় প্রমাণিত হয় না; এর প্রমাণ মেলে সাধারণ মানুষ নির্ধারিত দামে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারছেন কি না, তার মধ্য দিয়ে। সাময়িক অভিযান নয়, চাই ধারাবাহিক তদারকি, জবাবদিহিতা ও কার্যকর সংস্কার। জনগণের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করা সরকারের অর্থনৈতিক দায়িত্বের পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখারও অপরিহার্য শর্ত।

নাসির উদ্দিন নভেম্বর ০৩, ২০২৬
চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরবাগডাঙ্গায় একই সড়ক নির্মাণকাজ ঘিরে দুই দফা উদ্বোধনী আয়োজন এবং উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দাবি
উন্নয়নের উদ্বোধন নয়, জনসেবার জবাবদিহিতা দরকার

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নে একটি সীমান্তবর্তী সড়কের নির্মাণকাজ একই দিনে দুইবার ‘উদ্বোধন’—এ ঘটনা প্রথমে হাস্যকর মনে হলেও মূলত এটি জনপ্রতিনিধিত্ব, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারের এক উদ্বেগজনক চিত্র। সকালে বর্তমান সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল এবং বিকেলে সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা পরিষদের প্রশাসক হারুনুর রশীদ একই সড়কে পৃথক অনুষ্ঠান করেন; এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি দাবি ও সমালোচনাও উঠেছে। প্রকৃত সমস্যা শুধু দুই নেতার প্রতিযোগিতা নয়। ৩ কিলোমিটার ৫৫০ মিটার দীর্ঘ এই সড়কে ব্যয় হচ্ছে ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৪০ হাজার ৫৩১ টাকা, যা জনকোষ থেকে বাস্তবায়িত উন্নয়ন কার্যক্রম।  সড়কটি সম্পন্ন হলে বিজিবির টহল ও সীমান্ত নজরদারির পাশাপাশি পদ্মাতীরবর্তী মানুষের যাতায়াত সহজ হবে—অর্থাৎ এর গুরুত্ব নিঃসন্দেহে জনগুরুত্বপূর্ণ।  কিন্তু নির্মাণকাজ শুরুর পরও এলজিইডি জানিয়েছে, সড়কের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এখনো হয়নি; দুজনই মূলত তদারকিতে গিয়েছিলেন।  তাহলে প্রশ্ন হলো, অসম্পূর্ণ প্রকল্পকে রাজনৈতিক প্রদর্শনীর মঞ্চ কেন? উন্নয়নকর্মে জনপ্রতিনিধির সম্পৃক্ততা অবাঞ্ছিত নয়। বরং সংসদ সদস্যের তদারকি, স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয় এবং ঠিকাদারি কাজের মান নিশ্চিতের দায়িত্ব একসঙ্গে কাজ করা উচিত। কিন্তু সেই সম্পৃক্ততা যখন কারা ‘উদ্বোধন করলেন’ তা নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন জনগণের প্রকৃত প্রশ্ন—সড়কের মান, সময়মতো সম্পন্ন হওয়া, ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ—অবহেলিত থাকে। এলজিইডি বলছে প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হবে; তাই এখনই প্রয়োজন কাজের অগ্রগতি ও গুণগত মান নিয়মিত প্রকাশ করা। সুশাসনকর্মীদের আশঙ্কাও যথার্থ—রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব উন্নয়নের চেয়ে শিষ্টাচারকে প্রাধান্য দিলে তার প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।  চাঁপাইনবাবগঞ্জে সড়ক ও অবকাঠামোগত সমস্যা নতুন নয়; সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, কিছু প্রকল্প মেয়াদ ও ব্যয় বাড়িয়েও শেষ হয়নি, আবার কোনো কোনো এলাকায় সড়কের অভাবে বছরের বড় অংশ পানিবন্দি থাকে হাজারো পরিবার।  এই বাস্তবতায় সরকারের উচিত শুধু নতুন সড়ক ঘোষণা নয়, বরং প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়সূচি, ব্যয় ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম জনসম্মুখে প্রকাশ করা সমাধানের পথ তিনটি। প্রথমত, স্থানীয় প্রশাসনকে প্রকল্প পরিদর্শন ও উদ্বোধনের সুস্পষ্ট প্রোটোকল তৈরি করতে হবে, যাতে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি প্রকল্পের মালিকানা দাবির প্রতিযোগিতায় পরিণত না হয়। দ্বিতীয়ত, এলজিইডি, দুদক ও স্থানীয় সরকার বিভাগকে ঠিকাদারি কাজের মান যাচাই এবং ব্যয়ের হিসাব নিয়মিত প্রকাশে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, দুই পক্ষের নেতাকেই প্রমাণ করতে হবে—জনগণের ভোট ও আস্থা কেবল ফিতা কাটার অধিকারের জন্য নয়, বরং সেবার মান বাড়ানোর জন্য। চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ চায় এমন সড়ক, যা বর্ষায় ডুববে না, নির্মাণের পর ভেঙে পড়বে না এবং যার জন্য কাউকে দুইবার ‘উদ্বোধন’ করতে হবে না। উন্নয়নের প্রকৃত উদ্বোধন হয় কাজ শেষ হলে, জনগণের সুবিধা নিশ্চিত হলে এবং প্রশাসনের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হলে।

নাসির উদ্দিন নভেম্বর ০২, ২০২৬
তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলন এবং শ্রমিক অধিকার নিশ্চিতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
শ্রমিকদের আন্দোলন, ন্যায্য মজুরি ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব

দেশের তৈরি পোশাকখাতে শ্রমিকদের টানা কয়েকদিনের আন্দোলন কেবল মজুরির হিসাব-নিকাশ নয়; এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাতের ন্যায্যতা, শ্রম-সম্পর্ক ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার এক পরীক্ষা। শ্রমিকরা সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকায় পুনর্নির্ধারণ, বকেয়া পরিশোধ এবং অন্যান্য পেশাগত সুরক্ষা চেয়ে রাজপথে নেমেছেন। শ্রমিকদের বর্তমান সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২,৫০০ টাকা, যা তাদের দাবির অর্ধেকেরও কম। খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহন ও চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান ব্যয় তাদের ক্রয়ক্ষমতাকে দুর্বল করেছে—এই বাস্তবতাই আন্দোলনের ভিত্তি। মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে; কিছু কারখানা পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় খুলেছে।  উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ও রফতানি ঝুঁকিতে পড়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক, তবে সমাধান শুধু কারখানা খোলা বা আন্দোলন দমনে নয়—শ্রমিকের ন্যায্য দাবির স্বীকৃতিতে। তবে লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হলো-- আজ ১ নভেম্বর সরকার শ্রম আইনের ১৩৮ ধারা অনুসারে ছয় সদস্যের সর্বনিম্ন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, যেখানে মালিক, শ্রমিক ও স্বাধীন প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, এবং মালিকপক্ষীয় সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-ও সংলাপনির্ভর সমাধানের আশা প্রকাশ করেছে।  কিন্তু মজুরি বোর্ড গঠন নিজে থেকে সমাধান নয়। বোর্ডের সুপারিশ যদি বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়, মুদ্রাস্ফীতি ও খাতের অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে অসন্তোষ পুনরাবৃত্তি হবে। তাই বোর্ডকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলকভাবে কাজ করতে হবে; শ্রমিক প্রতিনিধিদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশের টিয়ারগ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জের খবর এবং সংঘর্ষে নিরাপত্তাকর্মীসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের আহত হওয়ার প্রতিবেদন সত্যিই উদ্বেগজনক। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব; সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের নামে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা সাংবাদিকের কাজে হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। সাংবাদিকের মোবাইল কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ বিশেষভাবে গুরুতর। পেশাদার সাংবাদিকতা গণতন্ত্রের চোখ; তথ্য সংগ্রহে বাধা দেওয়া, ডিভাইস বাজেয়াপ্ত করা বা সাংবাদিককে হয়রানি করা জনস্বার্থের পরিপন্থী। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহিতা এবং সাংবাদিকের ডিভাইস ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা—এই তিনটি পদক্ষেপ অবিলম্বে নিতে হবে। স্থায়ী সমাধানের পথ মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি সরকার, মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে: - বাস্তবসম্মত জীবনযাত্রার ব্যয়ের ভিত্তিতে মজুরি কাঠামো নির্ধারণ এবং নিয়মিত পুনর্বিবেচনা। - বকেয়া মজুরি, ওভারটাইম ও অন্যান্য সুবিধা পরিশোধের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি। - কারখানায় কার্যকর শ্রমিক সংগঠন, অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ। - আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা: সাংবাদিকের কাজে হস্তক্ষেপ নয়, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ নয়। - রফতানি আয়ের ন্যায্য অংশ শ্রমিকদের মজুরি ও সুরক্ষায় বণ্টনের নীতি। পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড; কিন্তু এই অর্থনীতি টেকসই হতে পারে কেবল তখনই, যখন এর ভিত্তি হবে মর্যাদাপূর্ণ মজুরি, নিরাপত্তা ও সংলাপ। মজুরি বোর্ডের ঘোষণা সদিচ্ছার সূচনা হতে পারে—কিন্তু স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনের শাসন এবং শ্রমিকের কণ্ঠস্বরের প্রতি শ্রদ্ধা অপরিহার্য।

নাসির উদ্দিন নভেম্বর ০১, ২০২৬
ইনফোগ্রাফিকঃ এআই
প্রধানমন্ত্রীর প্রথম জাপান সফর, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবরের জাপান সফর ঘিরে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে চলছে নানামুখী আলোচনা। বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এ সফর বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। তবে এসব উদ্যোগের কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা ‘বিগ-বি’কে (BIG-B) ‘শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ বা অভিন্ন সমৃদ্ধির ধারণায় সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত। এ উদ্যোগের আওতায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং মাতারবাড়ী–মহেশখালী অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যোগাযোগ, জ্বালানি, লজিস্টিকস ও শিল্পায়ন এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সংযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় সহযোগিতার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জাপান আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি সরবরাহে সহায়তার জন্য বাংলাদেশ পেয়েছে ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের জরুরি ঋণ সহায়তা। অবকাঠামো খাতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু এবং ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্পের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত কার্যকর করার বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছে। চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণ, বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং জাপানি বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়তে পারে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতাও সফরের উল্লেখযোগ্য দিক। বাংলাদেশকে একটি প্যাট্রোল ভেসেল দেওয়ার ঘোষণা এবং জাপানের অফিসিয়াল সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্স কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি প্যাট্রোল বোট সরবরাহের উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এসব সহায়তা বাস্তবায়িত হলে উপকূলীয় নজরদারি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারে ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া অর্থনীতি, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং পরিবেশ-জলবায়ু খাতে সহযোগিতা বাড়াতে পাঁচটি দলিলে সমঝোতা হয়েছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক কেবল অবকাঠামো ও বিনিয়োগে সীমাবদ্ধ না থেকে বহুমাত্রিক অংশীদারত্বের দিকে এগোনোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে ঘোষিত বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রাকে তাৎক্ষণিক অর্থপ্রাপ্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে ঋণ সহায়তা, অবকাঠামো প্রকল্প এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহের ঘোষণা বাস্তব সুফলে পরিণত হতে প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ ও নির্দিষ্ট সময়সীমা। বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন, নীতিগত স্থিতিশীলতা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের তাৎপর্য কেবল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বা কয়েকটি প্রকল্পের অগ্রাধিকারে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতাকে ঘিরে ঢাকা–টোকিও সম্পর্কের নতুন কাঠামো গড়ে তোলার সম্ভাবনাই এর বড় প্রাপ্তি। এখন দেখার বিষয়-- সফরে ঘোষিত উদ্যোগগুলো কত দ্রুত, কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়িত হয়। প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তব ফলাফলে পৌঁছাতে পারলেই এ সফরকে প্রকৃত অর্থে সফল বলা যাবে।

নাসির উদ্দিন অক্টোবর ২৯, ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
বাংলাদেশ–জাপান অংশীদারত্ব: প্রতিশ্রুতি থেকে সমৃদ্ধির পথে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে আজ টোকিওতে দেয়া যৌথ ঘোষণা নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। এখন উল্লিখিত বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব অগ্রগতিতে রূপ দেওয়াই হলো আসল চ্যালেঞ্জ। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর যৌথ ঘোষণা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার বার্তা দিয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এক ট্রিলিয়ন ইয়েনে পৌঁছানোর সম্ভাবনা এবং এর মাধ্যমে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক। তবে সম্ভাবনা আর বাস্তব অর্জন এক নয়। এই সফরের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে ঘোষণাগুলোর বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর, স্বচ্ছ ও টেকসই হয় তার ওপর। জাপান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী। অবকাঠামো, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দেশটির সহযোগিতা বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এবার উৎপাদন শিল্প, কৃষি ও খাদ্য, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ওষুধশিল্পে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে। বিশেষত রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নে জাপানি বিনিয়োগ কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তবে বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাধা প্রশাসনিক জটিলতা, নীতির অনিশ্চয়তা, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং দুর্নীতির ঝুঁকি। কর, শুল্ক, লাইসেন্স ও অর্থ স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়ানোর যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তার বাস্তবায়ন জরুরি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা এখানে অপরিহার্য। বিনিয়োগকারীদের জন্য সমান সুযোগ, চুক্তির নিশ্চয়তা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে; পাশাপাশি অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত ও নিষ্পত্তিতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ‘শেয়ারিং প্রসপারিটি বিআইজি-বি’ উদ্যোগও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মহেশখালীসহ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলকে শিল্প, জ্বালানি, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হয়ে উঠতে পারে। তবে এ উন্নয়ন যেন শুধু অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থাকে। স্থানীয় কর্মসংস্থান, দেশীয় প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরকে প্রকল্পগুলোর অবিচ্ছেদ্য শর্ত করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি দ্রুত কার্যকর করার উদ্যোগকে বাস্তবসম্মত প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে উত্তরণের পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে রপ্তানিকারকদের প্রস্তুতি, শ্রমিকদের দক্ষতা এবং শিল্পের উৎপাদনশীলতা উন্নয়নে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল বিনিয়োগের অঙ্কে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির প্রশ্নেও পারস্পরিক স্বার্থ, আন্তর্জাতিক আইন এবং বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। এখন প্রয়োজন ঘোষণাগুলো বাস্তবায়নে সময়-নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ এবং দুই দেশের যৌথ পর্যালোচনা ব্যবস্থা। বিনিয়োগ কতটা এসেছে, কতটি মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং বাংলাদেশের শিল্প কতটা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করেছে—এসবের পরিমাপযোগ্য হিসাব থাকতে হবে। টেকসই অংশীদারত্বের প্রকৃত সাফল্য যৌথ ঘোষণার ভাষায় নয়, মানুষের জীবনে তার ইতিবাচক প্রভাবে। টোকিওর প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের সুযোগ হয়ে উঠুক—এটাই এখন প্রত্যাশা।

নাসির উদ্দিন অক্টোবর ২৭, ২০২৬
মাদক নির্মূলে কার্যকর ব্যবস্থা চাই, লোকদেখানো অভিযান নয়

যেকোনো সমাজেই মাদক নিয়ন্ত্রণ শুধু অভিযান, গ্রেপ্তার কিংবা কঠোর আইন প্রয়োগের বিষয় নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক, আইনি ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ। এর কার্যকর সমাধানে প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন এবং মাদকের সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার সুপরিকল্পিত উদ্যোগ। রোববার বাগেরহাটে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের দেয়া বক্তব্য এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। গত দুই মাসে মাদক-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ২৭ পুলিশ সদস্যকে কারাগারে পাঠানোর তথ্য দিয়ে তিনি বাহিনীর ভেতরেই শুদ্ধি অভিযান চালানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, চলতি বছর ২০ হাজার পুলিশ সদস্য নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, কিন্তু এত বড় বাহিনীকে একসঙ্গে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো অবকাঠামো নেই। তাঁর বক্তব্যের মূল তাৎপর্য স্পষ্ট—মাদক নির্মূলের দায়িত্ব যাদের, তাদের কেউ অপরাধে জড়ালে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা অসম্ভব। তবে গ্রেপ্তার বা কারাবাসের পাশাপাশি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাও জরুরি। আইজিপির ‘রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা’ ও ‘হোয়াইট-কলার অপরাধী’র প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ। মাদক ব্যবসায় সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতার চেয়ে অর্থায়ন, সরবরাহ ও সুরক্ষা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বেশি দায়ী হতে পারেন। তাই কেবল নিম্নস্তরের সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার নয়; তদন্ত ও বিচারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে বৃহত্তর নেটওয়ার্ককে আইনের আওতায় আনতে হবে। এর বাইরে মাদক ব্যবসায় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। কেবল খুচরা বিক্রেতা কিংবা নিম্নপর্যায়ের সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার করে এ অপরাধের মূলোৎপাটন সম্ভব নয়। বরং মাদকের অর্থায়ন, সরবরাহ ও অপরাধীদের সুরক্ষায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনের আওতায় আনতে হবে। সম্প্রতি রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে ইশরাক হোসেনের অংশগ্রহণ ও অস্ত্র প্রদর্শন ঘিরে বিতর্ক আইনের শাসন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। মাদক নির্মূলের নামে কোনো ব্যক্তি বা জনপ্রতিনিধির আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযান পরিচালনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব; জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা হওয়া উচিত প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আইনসম্মত পদক্ষেপে সহযোগিতা করা। গেন্ডারিয়ায় যৌথ অভিযানে বেশ ক'জনকে আটক করে কারাদণ্ড দেওয়ার খবরের পরও সংশ্লিষ্ট এলাকায় মাদক বিক্রয়ের চিত্র প্রকাশিত হওয়া উদ্বেগজনক। এটি বিচ্ছিন্ন অভিযানের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান এবং অপরাধের মূল নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নেওয়া। সরকার মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিলে তার সঙ্গে নিরপেক্ষ প্রয়োগ, সাক্ষ্যপ্রমাণভিত্তিক তদন্ত ও মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং পরিবারভিত্তিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে নির্বিচারে সন্দেহভাজন না করে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে হবে। মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ এবং সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ। অভিযানের সংখ্যা নয়, মাদকের বিস্তার রোধে অর্জিত স্থায়ী ফলাফলই হোক সরকারের সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি।

নাসির উদ্দিন অক্টোবর ২৫, ২০২৬
ইনানীতে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড ও কক্সবাজারের পর্যটন নিরাপত্তা সংকট
ইনানীর ট্র্যাজেডি: কক্সবাজারে পর্যটনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আঘাত?

কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন পর্যটকের প্রাণহানি শুধু একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নয়; এটি পর্যটন খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও প্রশাসনিক জবাবদিহির গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ। অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স না থাকা এবং আগেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরও একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে কার্যক্রম চালিয়ে গেল, সেই প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এই মৃত্যুর দায় নির্ধারণে ব্যর্থতা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের পথ খুলে দিতে পারে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটিতে অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছিল না। গত ১১ জুন প্রতিষ্ঠানটিকে ২১ দিনের মধ্যে ই-ফায়ার লাইসেন্স নেওয়ার নোটিশ দেওয়ার কথাও জানা গেছে। প্রশ্ন হলো, নোটিশ দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছিল? ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা চিহ্নিত করাই যদি প্রশাসনের শেষ দায়িত্ব হয়, তবে সেই তদারকির কার্যকারিতা কোথায়? নিয়ম লঙ্ঘনের পরও প্রতিষ্ঠান চালু থাকলে কেবল মালিকপক্ষ নয়, নজরদারির দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর ভূমিকাও খতিয়ে দেখা আবশ্যক। ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন ও রিসোর্টের ম্যানেজারকে আটকের খবর এসেছে। কিন্তু তদন্তের পরিধি যেন কেবল তাৎক্ষণিকভাবে দায়ী কাউকে শনাক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ, নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি, লাইসেন্সসংক্রান্ত অনিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করতে হবে। তদন্তের ফল প্রকাশ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হবে জবাবদিহির প্রকৃত পরীক্ষা। কক্সবাজার দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। এ খাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপুল কর্মসংস্থান, স্থানীয় ব্যবসা ও জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থ। কিন্তু পর্যটনকেন্দ্রে মানুষের জীবনই যদি নিরাপদ না থাকে, তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে পর্যটকদের আস্থা ধরে রাখা সম্ভব নয়। এমন ঘটনা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের মনে নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় তৈরি করতে পারে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পড়তে পারে পর্যটন ব্যবসায়। এ অবস্থায় কক্সবাজারসহ দেশের সব পর্যটন এলাকায় হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্টের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা জরুরিভিত্তিতে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। লাইসেন্স, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি নির্গমনপথ ও কর্মীদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে নিরাপত্তার শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হবে। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। ইনানীর এই মর্মান্তিক ঘটনা যেন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন কিংবা সাময়িক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। মানুষের জীবন রক্ষায় আইন প্রয়োগ, নিয়মিত তদারকি ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন প্রধান দায়িত্ব। পর্যটনশিল্পের সুনাম শুধু আকর্ষণীয় গন্তব্যে নয়, পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতার ওপরও নির্ভরশীল। এই মৌলিক সত্য উপেক্ষা করলে ইনানীর ট্র্যাজেডি কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পে দীর্ঘস্থায়ী আস্থার সংকটে রূপ নিতে পারে।

নাসির উদ্দিন অক্টোবর ২৯, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
মক্কা চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশের কেন সতর্ক থাকা উচিত

বাংলাদেশের মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়া উচিত কি না, বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের পাশে দাঁড়াবে কি না—এমন একটি প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়। বাংলাদেশ একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।   কিছু প্রশ্ন এ কারণেই সামনে আসে। বাংলাদেশ কি এমন একটি সামরিক জোটে প্রবেশ করবে, যার কৌশলগত অঙ্গীকার অন্য রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংঘাত দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর ধর্মীয় আবেগের ভিত্তিতে নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে দেওয়া উচিত।   একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র তার কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চয়ই অন্যের হাতে তুলে দিতে পারে না। বাংলাদেশ সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং অন্যান্য মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের সঙ্গে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বন্ধন ভাগ করে নিতে পারে। কিন্তু এসব দেশের প্রতিটি নিজস্ব জাতীয় অগ্রাধিকার, নিরাপত্তা-হিসাব এবং ভূরাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। এমন পরিস্থিতি অবশ্যই আসতে পারে, যখন তাদের স্বার্থ বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে এক হবে না।   বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের অংশ—এমন ভাবনা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নীতির ভিত্তি হতে পারে না। বাংলাদেশ তার জনগণ ও দেশের নিরাপত্তার জন্য দায়বদ্ধ। একটি অস্পষ্ট, রাষ্ট্রসীমা অতিক্রমকারী বৃহত্তর সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব বাংলাদেশ নিজের ওপর নিতে পারে কি না, সে ভাবনা থাকা উচিত বিষয়টি চূড়ান্ত করার আগে।   বাংলাদেশ অন্য দেশের শত্রুকে নিজের শত্রু বানাবে? সম্মিলিত প্রতিরক্ষা শুনতে আশ্বস্ত করার মতো মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এর অর্থ কী, সেটি প্রশ্ন করা জরুরি। যদি কোনো সদস্য রাষ্ট্রের ওপর হামলা হলে অন্য সদস্যদের প্রতিক্রিয়া জানানোর বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়, অথবা রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এমন একটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা বাংলাদেশ শুরু করেনি এবং নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলেও মনে করে না।   কিছু সম্ভাবনা বিবেচনা করা যাক। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভবিষ্যতে কোনো সংঘাত হলে বাংলাদেশ কঠিন অবস্থায় পড়তে পারে। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সংঘাত হলেও একই ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। তুরস্ককে ঘিরে কোনো আঞ্চলিক সংঘাত সৃষ্টি হলেও বাংলাদেশের ওপর ভিন্ন ধরনের চাপ আসতে পারে।   তাহলে কেন বাংলাদেশ এমন দায়িত্ব গ্রহণ করবে, যা তাকে তার তাৎক্ষণিক জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কহীন সংঘাতে পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করতে পারে?   বন্ধুর শত্রু স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের শত্রু হওয়া স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। আর এ কথা নিশ্চয়ই বলা বাহুল্য হবে না যে, পাকিস্তানের কৌশলগত অগ্রাধিকার বাংলাদেশের অগ্রাধিকার নয়। পাকিস্তানের নিরাপত্তা নীতি ভারতের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। কিন্তু ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভিন্ন। পানির বণ্টন, বাণিজ্য, সীমান্ত ও আঞ্চলিক স্বার্থসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের নয়াদিল্লির সঙ্গে বৈধ মতপার্থক্য রয়েছে। এসব বিরোধ বাংলাদেশের নিজস্ব কূটনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব অনুযায়ী পরিচালিত হওয়া উচিত। শুধু পাকিস্তান একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মিত্র হওয়ার কারণে সেসব বিরোধকে বৃহত্তর সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ বানানো উচিত নয়। ১৯৭১ সালের ইতিহাস এ পার্থক্য বজায় রাখার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশের উচিত ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্ক বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ অনুযায়ী নির্ধারণ করা, ইসলামাবাদের কৌশলগত হিসাব অনুযায়ী নয়।   বাংলাদেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এ বাস্তবতা যে কোনো বিমূর্ত ভূরাজনৈতিক সংহতির ধারণার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সীমান্ত, নদী, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং ব্যাপক জনগোষ্ঠীভিত্তিক যোগাযোগ ভাগ করে নেয়। তাই পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে—এমন একটি সামরিক জোটে যোগ দেওয়া বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি অপ্রয়োজনীয় কৌশলগত জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, যে সম্পর্কটি মূলত বাংলাদেশের ভূগোলই নির্ধারণ করেছে।   তবে এর অর্থ এই নয় যে, বাংলাদেশ ভারতের সব অবস্থান মেনে নেবে। এর অর্থ হলো, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বজায় রাখতে হবে। একটি সার্বভৌম বাংলাদেশকে তার একটি প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক অন্য একটি দেশের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার দ্বারা নির্ধারিত হতে দেওয়া উচিত নয়।   সৌদি আরব ও তুরস্কের নিরাপত্তা-হিসাব তাদের নিজ নিজ অঞ্চল ও ইতিহাস দ্বারা প্রভাবিত। সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চল ও ইরানের বিষয় রয়েছে। তুরস্কের কৌশলগত স্বার্থ মধ্যপ্রাচ্য, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং এর বাইরেও বিস্তৃত। পাকিস্তানের রয়েছে নিজস্ব দক্ষিণ এশীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ। বাংলাদেশ এগুলো কোনোটারই অংশীদার নয়। তাই ঢাকার নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে দূরবর্তী ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্বেচ্ছায় নিয়ে আসার যৌক্তিকতা খুবই সীমিত।   ইরানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি বা উপসাগরীয় কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়া জাহাজ চলাচল, জ্বালানি মূল্য, বাণিজ্যপথ এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল একটি দেশের জন্য তাই পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত শুধু সামরিক পরিণতি দিয়ে নয়, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতির দিক থেকেও মূল্যায়ন করতে হবে।   একটা কথা মনে রাখা দরকার, ‘মুসলিম বিশ্ব’ কোনো একক কৌশলগত পক্ষ নয়। উম্মাহর ধারণার গভীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু এটিকে একটি ঐক্যবদ্ধ ভূরাজনৈতিক সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর কোনো অভিন্ন পররাষ্ট্রনীতি নেই। সৌদি আরব ও ইরানের আঞ্চলিক স্বার্থের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। তুরস্কের নিজস্ব কৌশলগত অগ্রাধিকার রয়েছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা উদ্বেগ ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার উদ্বেগের মতো নয়। এমনকি উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যেও আঞ্চলিক বিভিন্ন প্রশ্নে সবসময় ঐকমত্য থাকে না। অতএব, কয়েকটি দেশ একই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত—এ বাস্তবতা একাই বাংলাদেশকে তাদের সম্মিলিত নিরাপত্তা কাঠামোর অধীনে নেওয়ার যথেষ্ট কারণ হতে পারে না।   ক্রমবর্ধমান বিভক্ত বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ রয়েছে—এমন দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার সক্ষমতা, যারা একে অন্যের সঙ্গে সবসময় সুসম্পর্কে থাকে না। ঢাকার দিল্লির গঠনমূলক সম্পর্ক প্রয়োজন। বেইজিংয়ের সঙ্গেও সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার প্রয়োজন।   উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজারভিত্তিক সম্পর্ক প্রয়োজন। তুরস্ক, জাপান এবং অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গেও সহযোগিতা বাংলাদেশের প্রয়োজন। পাশাপাশি পাকিস্তান ও ইরানের সঙ্গেও কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থ বাংলাদেশের রয়েছে। এ কূটনৈতিক নমনীয়তা দুর্বলতা নয়।   এটি বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পদ। একটি আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে যোগ দিলে এ নমনীয়তা কমে যেতে পারে এবং বাংলাদেশকে জোটের ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে দেখা শুরু হতে পারে। নিরাপত্তাগত সুবিধা যদি অত্যন্ত শক্তিশালী না হয়, তাহলে এর বিনিময়ে এ কৌশলগত স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া অপ্রয়োজনীয় মূল্য হতে পারে।   চুক্তির সমর্থকরা সামরিক প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, যৌথ মহড়া এবং কৌশলগত সহযোগিতার কথা বলতে পারেন। এসব অবশ্যই বৈধ ও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। কিন্তু এসব অর্জনের জন্য বাংলাদেশের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যোগ দেওয়া অপরিহার্য নয়। বাংলাদেশ নিশ্চয়ই তুরস্ক, সৌদি আরব এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর করতে পারে। প্রযুক্তি সংগ্রহ, সামরিক মহড়া, দক্ষতা বিনিময় এবং গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব—তবু কোনো সংঘাতে বাংলাদেশ কখন অংশ নেবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সার্বভৌম অধিকার বাংলাদেশের হাতে থাকবে।   সহযোগিতা মানেই সামরিক জোট নয়। এ পার্থক্য বাংলাদেশকে জোটে যোগদানের পূর্ণ কৌশলগত ঝুঁকি গ্রহণ না করেই সম্ভাব্য অনেক সুবিধা অর্জনের সুযোগ দিতে পারে।   সমর্থকরা যুক্তি দিতে পারেন যে, এ চুক্তি বাংলাদেশকে আরও বেশি কৌশলগত গভীরতা দেবে। কিন্তু কৌশলগত গভীরতা তখনই কার্যকর, যখন তা প্রকৃতপক্ষে নিরাপত্তা বাড়ায়।   যদি একটি জোট একই সঙ্গে নতুন দায়িত্ব, নতুন ভূরাজনৈতিক নির্ভরতা এবং সম্ভাব্য নতুন প্রতিপক্ষ তৈরি করে, তাহলে যা বাইরে থেকে কৌশলগত গভীরতা বলে মনে হচ্ছে, তা বাস্তবে কৌশলগত দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে। তাই বাংলাদেশের উচিত চুক্তিটিকে সদস্য হওয়ার মর্যাদা দিয়ে নয়, বরং একটি সরল হিসাবের মাধ্যমে বিচার করা।   বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক নিরাপত্তার অগ্রাধিকার সামরিক নিরাপত্তার চেয়েও বিস্তৃত। জাতীয় নিরাপত্তা শুধু অস্ত্র ও সামরিক জোটের বিষয় নয়।   বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার অর্থ কর্মসংস্থান, খাদ্য, জ্বালানি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জলবায়ু সহনশীলতা, জনস্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষাও।   প্রতিটি অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা অঙ্গীকারের আর্থিক ও রাজনৈতিক মূল্য রয়েছে। তাই একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এমন সামরিক দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা উচিত, যার সুফল অনিশ্চিত; কিন্তু পরিণতি যথেষ্ট বড় হতে পারে।   মনে হচ্ছে বাংলাদেশি বিশ্লেষকরা, বিশেষ করে যারা এ জোটে যোগ দেওয়ার পক্ষে, তারা বিষয়টিকে ভারতের চশমা দিয়ে দেখছেন। এ জোটের ফল যদি হয় সৌদি বনাম ইরান, কিংবা তুরস্ক বনাম ইসরায়েল সংঘাত, বাংলাদেশ তখন কী ভূমিকা নেবে, সেই আলোচনা এখানে করা দরকার। কিন্তু তার বদলে বেশিরভাগ আলোচনা আবর্তিত হচ্ছে এরকম একটি জোটে যোগ দিলে কীভাবে ভারতকে ‘প্রতিরোধ’ করা যাবে, তা নিয়ে। ইসলামপন্থি শিবিরের কারও কারও কাছে মুসলিম বিশ্বের দুই বড় সামরিক শক্তি তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে হাত মেলানোর এ সুযোগ হাতছাড়া করার মতো নয়।   বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্যে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রগুলোর সমতা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবদানও এমন একটি আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার প্রতিফলন, যা কোনো সামরিক জোটের সদস্য হওয়ার চেয়ে ভিন্ন।   শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়াও সবসময় এ নীতিতে দেশ চালিয়েছেন। আর এ কারণেই শান্তি ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতায় অবদান রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছে। তাই এমন কোনো জোট কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়ার আগে বাংলাদেশকে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে, যা ভবিষ্যতে তাকে তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের বাইরের সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে।   একটি ধারণা স্পষ্ট যে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি আমেরিকার মস্তক থেকে এসেছে। এ চুক্তি আমেরিকা করিয়েছে ইরানকে আগামী দিনের হিসাবে রেখে, ইসরায়েলকে সুরক্ষা দিতে। সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরানের বিরুদ্ধে নিজে সুবিধা করতে পারেনি। এবার কাজে লাগাবে ইরানের চির শত্রু সৌদি আরবকে। সরাসরি সৌদি আরব যুদ্ধে যাবে না। তাই সঙ্গে নিয়েছে তুরস্ক আর পাকিস্তানকে। আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরও কড়াকড়ি করবে আর সৌদিদের দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী যুদ্ধের ময়দান খুলতে যাচ্ছে আমেরিকা। পয়সা ঢালবে সৌদি আরব, অস্ত্র বেচবে তুরস্ক ও আমেরিকা আর কিছু ডলার পাবে পাকিস্তান।   আমাদের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন কীভাবে এ চুক্তিকে দেখছে, তা কি আমরা বিবেচনায় নিয়েছি? এসব প্রশ্নের জবাবই আসলে দিন শেষে ঠিক করবে বাংলাদেশের করণীয়।

মো: দেলোয়ার হোসাইন আগস্ট ৩০, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
ব্যাটারিচালিত রিকশা: সড়ক শৃঙ্খলার বড় বাধা

ঢাকার সড়ক ব্যবস্থা বহুদিন ধরেই যানজট, অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীনতার এক জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে চলছে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ যোগ হচ্ছে নগর পরিবহনে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। একসময় অলিগলি ও আবাসিক এলাকার পরিবহন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে ব্যাটারিচালিত রিকশা রাজধানীর প্রায় প্রতিটি সড়কে দাপটের সঙ্গে চলাচল করছে। প্রধান সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক, এমনকি বিভিন্ন ভিআইপি সড়কেও এসব যানবাহনের উপস্থিতি এখন নিয়মিত দৃশ্য। কাগজে-কলমে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নতুন কোনো বিতর্কের বিষয় নয়। ২০১৫ সালে সরকারের এক সিদ্ধান্তে ঢাকার প্রধান সড়ক এবং দেশের ২৩টি মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে হাইকোর্টও এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা ও নিয়ন্ত্রণমূলক নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আদালতের নির্দেশনা ও সরকারি সিদ্ধান্ত থাকা সত্ত্বেও রাজধানীর সড়ক এবং বিভিন্ন মহাসড়কে এসব যানবাহনের অবাধ চলাচল বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। ফলে সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—যে আইন বাস্তবে প্রয়োগই করা যায় না, সেই আইন থাকার অর্থ কী? ব্যাটারিচালিত রিকশা নিঃসন্দেহে নগরবাসীর জন্য একটি সহজলভ্য ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এটি লাখো মানুষের জীবিকার উৎস। কিন্তু একটি পরিবহন ব্যবস্থা তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন তা জননিরাপত্তা, ট্রাফিক শৃঙ্খলা এবং নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। দুঃখজনকভাবে রাজধানীতে চলাচলকারী অধিকাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রে সেই সামঞ্জস্য আজ অনুপস্থিত। কিন্তু এই সমস্যার মূল জায়গা হলো নিয়ন্ত্রণহীনতা। বর্তমানে রাজধানীতে চলাচলকারী অধিকাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশার কোনো সুনির্দিষ্ট নিবন্ধন নেই, চালকদের অধিকাংশের নেই প্রশিক্ষণ, আর যানবাহনের নিরাপত্তা মান নিয়েও রয়েছে বড় ধরনের প্রশ্ন।  এসব রিকশা সাধারণত স্থানীয়ভাবে তৈরি হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আধুনিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করা হয় না। ব্রেকিং সিস্টেম দুর্বল, কাঠামোগত স্থায়িত্ব সীমিত এবং গতি নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা অনুপস্থিত। অথচ অনেক চালক এসব যানবাহন উচ্চগতিতে চালান, যা যাত্রী ও পথচারী উভয়ের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে প্রতিনিয়ত বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা, প্রাণহানি ও আহত হওয়ার সংখ্যা। আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো রাজধানীর যানজট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল।  শুধু অলিগলি নয়, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড়, বাজার এলাকা ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সামনেও সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় এসব যানবাহন। অনেক ক্ষেত্রে রাস্তার একটি বড় অংশ কার্যত দখল করে রাখায় সড়কের কার্যকর প্রস্থ কমে যায় এবং যান চলাচলের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর পাশাপাশি যাত্রী ওঠানামার জন্য হঠাৎ থেমে যাওয়া, মোড়ের কাছে যত্রতত্র অবস্থান নেওয়া এবং অনিয়ন্ত্রিত পার্কিংয়ের কারণে অন্যান্য যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়। ফলে যানবাহনের দীর্ঘ সারি সৃষ্টি হয়ে যানজট আরও তীব্র আকার ধারণ করে।  প্রতিদিন কোটি মানুষের চলাচলের এ নগরীতে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত রিকশার অবাধ চলাচল নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও অকার্যকর ও বিশৃঙ্খল করে তুলছে। বিষয়টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদ্যুৎ ব্যবহার। বিভিন্ন গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দেওয়ার কাজে।  উদ্বেগজনক হলো, এই চার্জিংয়ের বড় একটি অংশ অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে জাতীয় গ্রিডের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। বিদ্যুৎ চুরি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, বিশেষ করে যখন দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। তবে বাস্তবতা হলো, শুধু নিষেধাজ্ঞা জারি করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কারণ ব্যাটারিচালিত রিকশার সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান। তাই প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত নীতি।  প্রধান সড়কে এসব যানবাহনের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ করতে হবে এবং নিবন্ধন ও ফিটনেস ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে চালকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে এবং অবৈধ চার্জিং স্টেশনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে সেটা হিতে বিপরীত হচ্ছে । সম্প্রতি কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার নিমসার বাজার এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা জব্দকে কেন্দ্র করে হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয়দের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়।  ঘটনাটি শুধু বিচ্ছিন্ন কোনো উদাহরণ নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সময় প্রায়ই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বাধার মুখে পড়তে হয়। সম্প্রতি রাজধানী থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা অপসারণের বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) একার পক্ষে কার্যকর সমাধান সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, এ সমস্যা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত ও যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। গত মঙ্গলবার (৩০ জুন) রাজধানীর মোহাম্মদপুরের লেক রোডে এআই ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের মামলা দায়ের ও যানবাহন মনিটরিং কার্যক্রমের উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। ডিএমপি কমিশনার জানান, ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তবে কেবল পুলিশের একক প্রচেষ্টায় এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ চলমান রয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সংঘাত ও জনদুর্ভোগ এড়ানোর স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এই সুযোগে এক শ্রেণির ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশা চালকের মধ্যে আইন অমান্যের প্রবণতা বাড়ছে এবং তাদের দৌরাত্ম্য ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।  কার্যকর ও ধারাবাহিক আইন প্রয়োগের অভাবে সড়কে এসব যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি সড়ক নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোতে পরিবহন ব্যবস্থার শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কঠোর নীতি অনুসরণ করা হয়। ঢাকার ক্ষেত্রেও সময় এসেছে বাস্তবসম্মত, কিন্তু দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়ার। নগরবাসীর নিরাপত্তা, সড়কের শৃঙ্খলা এবং টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার স্বার্থে রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। ঢাকার সড়ক কারও একক সম্পত্তি নয়; এটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তাই নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ করতে হলে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই। ঢাকাকে যদি সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য, নিরাপদ ও গতিশীল নগরীতে পরিণত করতে হয়, তাহলে এখনই সাহসী ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জনস্বার্থ, সড়ক নিরাপত্তা এবং নগর শৃঙ্খলার স্বার্থে রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশার নিয়ন্ত্রণহীন চলাচল বন্ধ করা আজ আর কোনো বিকল্প নয়; এটি সময়ের অপরিহার্য দাবি।

মারিয়া রহমান জুলাই ০৯, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
বাল্যবিয়ের করাল গ্রাসে থেমে যাচ্ছে লাখো ছাত্রীর স্বপ্ন

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের তাসলিম লিরা (ছদ্মনাম)। প্রবাসী বাবা মেয়েকে বিয়ে দিলেন ঢাকার এক স্বনামধন্য ব্যবসায়ীর সাথে। এইচএসসি পরীক্ষার ঠিক আগে আগে বিয়ে হওয়ায় রেজিস্ট্রেশন করেও বিয়ের হইহুল্লোড়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে আর যাওয়া হয়নি লিরার। কিন্তু ঢাকা বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেয়া তারই ননদের মেয়ের পরীক্ষার তদারকির সব ভার তাঁর কাঁধে।   ভাগনী সকালে পড়তে উঠলে নিয়ম করে উঠতে হয় লিরাকে। কী খাবে, পরীক্ষা কেন্দ্রে যাবার আগে কলম, এডমিড কার্ড সব ঠিকঠাক আছে কি না চেক করে দেওয়ার দায়িত্ব নববধূর। এই করতে গিয়েই যে নববধূর মনটা ভেঙে যায় তা দেখার কেউ নেই। বিবাহিত লিরার মন চলে যায় নিজের বান্ধবী সহপাঠীদের কাছে। তারওতো এই রকম করেই সবার সাথে সিরিয়াস মুডে পরীক্ষা কেন্দ্রে যাবার কথা ছিল। ছিল মাকে জড়িয়ে ধরে, বাবার আশীর্বাদ নিয়ে পরীক্ষার আসনে বসার। দীর্ঘশ্বাস ফেলে লিরা বলেন, এটা ভাগ্য! বিয়ে করলে সবদিক থেকে নিশ্চিত মা-বাবা তাই তাদের কথা মানতে হলো। আসলে কি তাই। লিরা, সানজিদা, দোলাদের মতো আরও কত লাখ লাখ নাম না জানা কিশোরী আজ বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত। বিয়ের পর লেখাপড়া চালানোর আশ্বাস থাকলেও আসলে কত জনের কপালে সেই সুযোগ হয়, বলতে গেলে জ্যোতিষশাস্ত্র জানতে হয় না। কিশোরীর গায়ে নববধূর ঘ্রাণ যাওয়ার আগেই নতুন মা হওয়ার আনন্দে বিভোর হয়ে যান তিনি। পড়ালেখার পাট তখন একেবারেই চুকে যায়। ঘর কন্যায় ব্যস্ততায় তখন দিন কাটে।   বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দেশজুড়ে শুরু হওয়া উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা, অন্যদিকে পরীক্ষাকেন্দ্রের বেঞ্চগুলো জানান দিচ্ছে এক নীরব ও বেদনাদায়ক হারিয়ে যাওয়ার গল্প। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে রেকর্ডসংখ্যক ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থীই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। দুই বছর আগে একাদশ শ্রেণিতে সাড়ম্বরে নিবন্ধ করা প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থীই ঝরে পড়েছেন।   শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই অস্বাভাবিক অনুপস্থিতির নেপথ্য কারণ খুঁজতে গিয়ে যে সত্যের মুখোমুখি হয়েছেন, তা একাধারে শিউরে ওঠার মতো চরম উদ্বেগের। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনুপস্থিত বা ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের তথ্য বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে যে তাদের মধ্যে প্রায় ৪১ শতাংশের পরীক্ষার আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। অর্থাৎ, বাল্যবিবাহই আজ উচ্চশিক্ষার পথে সবচেয়ে বড় সামাজিক দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।   শিক্ষা জীবনের সোনালী স্বপ্ন যখন ডানা মেলার কথা ঠিক তখনই এক বিপুলসংখ্যক কিশোরীকে বসতে হচ্ছে বিয়ের পিঁড়িতে। নোয়াখালী মহিলা কলেজের ছাত্রী ফাতিমা মাহি, পরীক্ষার বেঞ্চে বসার চেয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসাই তার কাছে সহজ মনে হয়েছে। প্রস্তুতির ঘাটতি এবং ফেসবুক টিকটকে ভাইরাল হওয়াটাই তার কাছে বেশি মজার। তার মতে আয় করা এখন অনেক সহজ। বিনোদন যখন আয়ের মাধ্যম হয় তখন কেন কষ্ট করে লেখাপড়া করতে হবে। যেখানে নিজের অফিস নিজের সময় মতো করব। কারো কোনো বকা নেই জবাবদিহিতা নেই, সার্টিফিকেট নিয়ে প্যারা নাই। ঠিক তার মতো ভাবনা পরীক্ষা না দেওয়া আরেক ছাত্রী নাবাহা বলেন, পড়তে ভালো লাগে না তাই আম্মুকে বলেছি এবার পরীক্ষা দেব না, মাও বললেন ঠিক আছে বিশ্রাম নাও।   গ্লোবাল ভিলেজ, প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের বেড়াজালে হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষা। সম্প্রতি দৈনিক সমকাল ও রেড অরেঞ্জ লিমিটেডে যৌথ উদ্যোগে ইয়ুখ শেয়ার-নেট প্রকল্প এবং অ্যাপ্লিফাই চেঞ্জের সহযোগিতায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘স্বপ্ন ও সংকট: বাল্যবিবাহ এবং কিশোরী গর্ভধারণ প্রতিরোধে তারুণ্যের অংশগ্রহণ’ শীর্ষক গোলটেবিলে বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা বাল্যবিবাহকে জরুরি সামাজিক সংকট ঘোষণা দিয়ে সচেতনতা বাড়াতে সরকার ও বেসরকারি সংগঠনগুলোকে একযোগে কাজ করার পরামর্শ দেন। আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ করে ২০১৭ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন (সিএমআরএ) সংশোধন করে ’বিশেষ বিধান’ ধারাটি অপসারণ কিংবা সংশোধনের দাবি জানান।   গবেষণায় দেখা যায়, দেশে বাল্যবিবাহের হার এখনও ৫১ শতাংশের বেশি, যা এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে দেশের প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ কিশোর-কিশোরী ভবিষ্যৎ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলেও তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।   বাল্যবিয়ের পাশাপাশি চরম দারিদ্র্য এবং পরীক্ষার পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাবও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবম বা দশম শ্রেণিতে বাল্যবিয়ের হার নিয়ে কিছুটা আলোচনা হরেও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এসে যে এত বিশালসংখ্যক ছাত্রী একই কারণে শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ছে, তা আমাদের দেশের জন্য একটি বড় অশনিসংকেত।   শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে ওপরের শ্রেণিতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কিছু শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য এবং এসএসসি পাসের পর অনেকে শিক্ষার্থীর কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হওয়া এ প্রনভতার উল্লেখযোগ্য কারণ।   ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব এসএম কামাল উদ্দিন হায়দার অবশ্য আরেকটি দিকের কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন, অনেক শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকার কারণে নির্ধারিত বছরেও পরীক্ষায় অংশ নেয় না; তারা পরবর্তী বছরগুলোতে পরীক্ষায় বসে।   তবে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, প্রস্তুতির অভাবের পেছনেও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে পারিবারিক চাপ ও বিয়েসংক্রান্ত মানসিক অস্থিরতা। একবার পড়াশোনার গতি থেকে ছিটকে পড়লে একটি মেয়েল পক্ষে পুনরায় পড়াশোনায় ফেরা গ্রামীণ সমাজ বাস্তবতায় প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।   জাতীয় এই ক্ষতি ও লাখো কিশোরীর স্বপ্নভঙ্গের বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, শিক্ষার এই দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আগামী দিনে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন গণ-ঝরে পড়া রোধ করা যায়, সে লক্ষ্যেই কাজ করবে মন্ত্রণালয়।   বাল্যবিয়ে শুধু একটি মেয়ের ব্যক্তিগত অধিকারই ক্ষুণ্ন করে না বরং এটি একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের চাকাকে স্তব্ধ করে দেয়। সাড়ে পাঁচ লাখ সম্ভাবনাময় তরুণের এই হারিয়ে যাওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এখনই যদি স্থানীয় প্রশাসন, অভিভাবক ও সমাজ সম্মিলিতভাবে বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে না তোলে, তবে আগামী দিনের বাংলাদেশ এক বিশাল মেধাবী ও স্বাবলম্বী নারী জনগোষ্ঠী থেকে বঞ্চিত হবে। পরীক্ষার টেবিলগুলো যেন আর শূন্য না থাকে কিশোরীদের খাতা-কলম যেন রান্নাঘরের ব্যস্ততায় হারিয়ে না যায়-এটাই হোক আজকের দিনে আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।   লেখক: সামিনা রোশনি এসোসিয়েট ম্যানেজার, ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি

মোঃ ইমরান হোসেন জুলাই ০৩, ২০২৬
‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের মহিষ: সত্যিই কি বিরল প্রজাতি?

এবার কোরবানি ঈদের আগে নারায়ণগঞ্জের একটি খামারে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের একটি মহিষ নিয়ে বেশ আলোচনা তৈরি হয়। সাদা-ক্রিম রঙের শরীর, মাথায় সোনালি ঝুঁটির মতো লোম, গোলাপি আভাযুক্ত নাক—সব মিলিয়ে মহিষটি দ্রুত মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রে চলে আসে।   সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর মহিষটি দ্রুত ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ হয়ে ওঠে; পরে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও জায়গা করে নেয়।   সংবাদমাধ্যমে মহিষটির ওজন প্রায় ৭০০ কেজি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কেউ একে বিরল প্রজাতির মহিষ বলছেন, কেউ বলছেন বিদেশি জাত, আবার কেউ বলছেন অদ্ভুত বা অলৌকিক প্রাণী। ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—এই মহিষটি কি সত্যিই কোনো বিরল প্রজাতির?   প্রাণিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকার। অ্যালবিনো মহিষ কোনো আলাদা জাত বা প্রজাতি নয়। এটি মহিষের শরীরে দেখা দেওয়া একটি বিরল জিনগত বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ কোনো মহিষের গায়ের রং সাদা, ক্রিম বা ফ্যাকাশে হলেই সেটি নতুন জাতের মহিষ হয়ে যায় না। অ্যালবিনিজম আসলে কী অ্যালবিনিজম সত্যিকার অর্থে একধরনের জিনগত অবস্থা। এটি বিরল, তবে এটি কোনো জাত নয়। জিনগত পরিবর্তনের কারণে প্রাণীর দেহে মেলানিন নামের রং সৃষ্টিকারী পদার্থ কমে গেলে বা না থাকলে এমন রং দেখা যায়। মেলানিন হলো প্রাণীর শরীরের স্বাভাবিক রং তৈরির প্রধান উপাদান। মানুষের চুল, ত্বক ও চোখের রং যেমন মেলানিনের ওপর নির্ভর করে, তেমনি গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, হরিণ, পাখিসহ অনেক প্রাণীর গায়ের রংও মেলানিনের কারণে তৈরি হয়। যে প্রাণীর শরীরে মেলানিন বেশি থাকে, তার রং সাধারণত গাঢ় হয়। আর মেলানিন কম থাকলে বা অনুপস্থিত থাকলে শরীরের রং সাদা, ক্রিম, ফ্যাকাশে বা গোলাপি আভাযুক্ত হতে পারে। বাংলাদেশে সাধারণত মহিষের গায়ের রং কালো বা গাঢ় ধূসর। কারণ, তাদের শরীরে রং সৃষ্টিকারী পদার্থ স্বাভাবিকভাবে বেশি থাকে। কিন্তু কোনো মহিষের শরীরে জন্মগত কারণে এই পদার্থ তৈরি কম হলে তার রং স্বাভাবিক কালো না হয়ে সাদা বা ফ্যাকাশে হতে পারে। কেন এমন হয় প্রাণীর শরীরের রং, লোমের ধরন, শিংয়ের গঠন, চোখের রং—এসব অনেক কিছু নির্ভর করে জিনের ওপর। জিন হলো শরীরের ভেতরের একধরনের নির্দেশনা, যা মা-বাবা থেকে সন্তানের মধ্যে আসে। কখনো কখনো এই জিনে পরিবর্তন ঘটে। সেই পরিবর্তনের ফলে শরীরে মেলানিন তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। তখন প্রাণীর গায়ের রং স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক হালকা হয়ে যায়। এটাই অ্যালবিনিজমের মূল কারণ। সহজভাবে বলা যায়, এটি কোনো খাবার, ওষুধ, খামারির বিশেষ কৌশল বা পরিবেশের কারণে হয় না। এটি জন্মগত জিনগত বৈশিষ্ট্য।   পৃথিবীতে কি এ রকম ঘটনা আগে ঘটেছে   হ্যাঁ, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাদা বা অ্যালবিনো মহিষের ঘটনা আগে দেখা গেছে। তাই নারায়ণগঞ্জের ভাইরাল ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষটি একেবারে পৃথিবীর প্রথম ঘটনা নয়। তবে বাংলাদেশে এ ধরনের মহিষ খুবই বিরল। ব্রাজিলে মুররাহ জাতের মহিষের একটি পালে অ্যালবিনিজম নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে।   ওই গবেষণায় দেখা যায়, মেলানিন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ জিনে পরিবর্তনের কারণে মহিষগুলোর শরীরে অ্যালবিনো বৈশিষ্ট্য দেখা দেয়। অর্থাৎ মহিষের মধ্যেও অ্যালবিনিজম বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত ঘটনা।   থাইল্যান্ডেও সাদা বা অ্যালবিনো মহিষ নিয়ে মানুষের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। দেশটির বিভিন্ন মহিষ প্রদর্শনীতে সাদা মহিষ দেখা যায়। সাম্প্রতিক সময়েও সেখানে দামি সাদা মহিষ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ‘সাদা মহিষ’ নামে যেসব ঘটনা আলোচিত হয়, তার সবই আমাদের দেশের পানিমহিষ নয়। কোনোটি হতে পারে বাইসন, কোনোটি হতে পারে অন্য ধরনের প্রাণী, আবার কোনোটি হতে পারে আংশিক রংহীন। তাই সব সাদা প্রাণীকে একভাবে অ্যালবিনো বলা ঠিক নয়।   সাদা হলেই কি অ্যালবিনো না, সাদা বা ফ্যাকাশে রঙের সব প্রাণী অ্যালবিনো নয়। কোনো প্রাণীর গায়ে সাদা দাগ থাকতে পারে, কোনো প্রাণী আংশিক সাদা হতে পারে, আবার কোনো জাতের প্রাণীর রং স্বাভাবিকভাবেই হালকা হতে পারে। অ্যালবিনো প্রাণীর ক্ষেত্রে সাধারণত শরীরের রং খুব ফ্যাকাশে হয়। চোখ, নাক, মুখের চারপাশ বা ত্বকে গোলাপি আভা দেখা যেতে পারে। তবে শুধু চোখে দেখে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায় না। নিশ্চিত হতে হলে পশুচিকিৎসা পরীক্ষা, শরীরের রং পর্যবেক্ষণ, বংশগত তথ্য এবং প্রয়োজনে জিন পরীক্ষা দরকার।   তাহলে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষটি কী? সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও বর্ণনা অনুযায়ী, মহিষটির শরীরে অস্বাভাবিকভাবে ফ্যাকাশে রং, মাথায় সোনালি ধরনের লোম এবং গোলাপি আভাযুক্ত অংশ রয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্য অ্যালবিনিজম বা রং-ঘাটতির সঙ্গে মেলে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও এটিকে বিরল অ্যালবিনো মহিষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।   তবে বৈজ্ঞানিকভাবে সবচেয়ে সতর্ক ভাষা হলো—মহিষটি সম্ভবত অ্যালবিনিজম বা জিনগত রং-ঘাটতিযুক্ত। কিন্তু এটি কোনো আলাদা প্রজাতি নয়।   প্রাণীর কল্যাণের প্রশ্ন মেলানিন শুধু শরীরে রং দেয় না, সূর্যের তীব্র আলো থেকে শরীরকে কিছুটা সুরক্ষাও দেয়। তাই যেসব প্রাণীর শরীরে মেলানিন কম থাকে, তারা তীব্র রোদ ও আলোতে বেশি সংবেদনশীল হতে পারে। চোখেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ধরনের প্রাণীর জন্য ছায়াযুক্ত পরিবেশ, পর্যাপ্ত পানি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সুষম খাদ্য, নিয়মিত পশুচিকিৎসকের নজরদারি এবং অতিরিক্ত ভিড় থেকে দূরে রাখা জরুরি। ভাইরাল হওয়ার কারণে যদি মানুষ ভিড় করে, শব্দ করে, ছবি তোলে বা প্রাণীটিকে বারবার নাড়াচাড়া করে, তাহলে প্রাণীটি মানসিক চাপে পড়তে পারে। প্রাণী যতই বিরল বা আকর্ষণীয় হোক, তার কল্যাণ আগে ভাবতে হবে।   গণমাধ্যমে শব্দ ব্যবহারে সতর্কতা ‘বিরল প্রজাতির মহিষ’—এ ধরনের শব্দ শুনতে আকর্ষণীয় হলেও তা বিভ্রান্তিকর। কারণ প্রজাতি, জাত ও জিনগত বৈশিষ্ট্য এক জিনিস নয়। প্রজাতি মানে প্রাণীর বড় বৈজ্ঞানিক পরিচয়। জাত মানে একই প্রাণীর ভেতরে আলাদা গোষ্ঠী বা ধরন। জিনগত বৈশিষ্ট্য মানে জন্মগত কোনো বিশেষ লক্ষণ, যা শরীরে প্রকাশ পেতে পারে। তাই ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষকে বিরল প্রজাতি বলা ঠিক নয়। বরং বলা উচিত—বিরল জিনগত বৈশিষ্ট্যযুক্ত মহিষ।   ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামে ভাইরাল মহিষটি নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী চেহারার কারণে মানুষের মনোযোগ কেড়েছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে এটি কোনো নতুন জাত, নতুন প্রজাতি বা অলৌকিক প্রাণী নয়। অ্যালবিনিজম সত্যিকার অর্থে একধরনের জিনগত অবস্থা। এটি বিরল, তবে এটি মহিষের কোনো জাত নয়। জিনগত পরিবর্তনের ফলে শরীরে মেলানিন কমে গেলে বা অনুপস্থিত থাকলে প্রাণীর গায়ের রং এমন সাদা, ক্রিম বা ফ্যাকাশে হতে পারে। যেকোনো জাতের মহিষে বিরলভাবে এমন বৈশিষ্ট্য দেখা যেতে পারে।   তাই সবচেয়ে সহজ ও সঠিক কথা হলো, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষটি বিরল, কিন্তু বিরল প্রজাতির নয়; এটি বিরল জিনগত বৈশিষ্ট্যযুক্ত একটি মহিষ।   ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির শিক্ষক, গবেষক ও লেখক, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। akmhumayun@cvasu.ac.bd

মোঃ ইমরান হোসেন মে ৩১, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
এ এক অশনিসংকেত

অবস্থাটি ভীতিকর, তার চেয়েও বেশি শঙ্কার। বিষয়টিকে কখনো বলা হচ্ছে ‘অদৃশ্য মহামারি’, কখনো তুলে ধরা হচ্ছে একটি ‘প্রচ্ছন্ন অসুখ বলে’। যারা এই ব‍্যাধির শিকার, তারা চিহ্নিত হচ্ছে ‘যন্ত্র-পর্দা আসক্ত’ বা ‘যন্ত্রে বন্দী প্রজন্ম’ হিসেবে। মা–বাবা, অভিভাবক, শিক্ষক, বয়োজ্যেষ্ঠ‍সহ গোটা সমাজই চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন।   ঢাকার বিভিন্ন স্কুলে একটি সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে যে বিভিন্ন যন্ত্র-পর্দা শিশু-কিশোর-কিশোরীদের গ্রাস করেছে—সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে যন্ত্রগুলো। এমনটাই আন্দাজ করা গিয়েছিল। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইসিডিডিআরবি) ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল সময়কালে ঢাকার তিনটি বাংলা মাধ্যম এবং তিনটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ৬ থেকে ১৪ বছরের ৪২০ জন ছেলেমেয়ের ওপর এই সমীক্ষা চালিয়েছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ঢাকা শহরের ৬ থেকে ১৪ বছরের শিশু-কিশোর-কিশোরীরা প্রতিদিন প্রায় ৫ ঘণ্টা সময় কাটায় যন্ত্র-পর্দা দেখে। প্রায় ৮৩ শতাংশ শিশু-কিশোর-কিশোরীরা নির্দেশিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় চোখ আটকে রাখে পর্দায়। অন‍্য কথায়, প্রতি পাঁচজনের মধ্যে চারজনই সময়সীমা লঙ্ঘন করে। এর প্রতিক্রিয়াও সহজেই অনুমেয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে প্রতি ৩ জন শিশু-কিশোর-কিশোরীর ১ জন চোখের সমস্যায় ভুগছে; প্রতি ৫ জনের ৪ জনেরই নিয়মিত মাথাব‍্যথা হচ্ছে; ওজন বেড়ে যাচ্ছে ১৪ শতাংশ শিশু-কিশোর-কিশোরীর, প্রায় ২০ শতাংশের মানসিক স্বাস্থ্য বিঘ্নিত হচ্ছে এবং ঘুমের ব‍্যাঘাত ঘটছে। ফলে দেখা যাচ্ছে ছেলেমেয়েদের দেরিতে ঘুমানো, বারবার মাথাব্যথা কিংবা চোখের অস্বস্তি, খিটখিটে মেজাজ, নিজেকে গুটিয়ে ফেলা, পড়ায় কম মনোযোগ, খেলাধুলার প্রতি অনীহা ইত্যাদি। নানান সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যবহির্ভূত যেসব প্রতিক্রিয়া আছে, যা বর্তমান সমীক্ষায় আসেনি। প্রথমত, যন্ত্রের সঙ্গে বেশির ভাগ সময় কাটালে তা মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক এবং অন্তর্মুখী করে ফেলে, যা সামাজিক প্রক্রিয়ায় মানুষকে সীমিত করে ফেলে। সর্বদা পর্দায় দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখলে কথা বলার স্বাভাবিক প্রবণতা এবং সেই সঙ্গে আলাপচারিতার দক্ষতাও বিঘ্নিত হয়। সামাজিক মেলামেশা, অন‍্যদের সঙ্গে গল্প করা, সামাজিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণও তখন বোঝা বলে মনে হয়। সামাজিক মিথস্ক্রিয়া সেখানে বিঘ্নিত হয়। শিশু-কিশোর-কিশোরীদের সুস্থ মানসিক বিকাশে তা কাম‍্য হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, যন্ত্র-পর্দায় চোখ রাখা বেশির ভাগ শিশু-কিশোর-কিশোরীরা খেলাধুলা কিংবা বইপড়ায় খুব একটা আগ্রহী হয় না। মানি, খেলার মাঠের অপ্রতুলতা আছে। কিন্তু তার পরে যেটুকু আছে, তার তো ব‍্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু সমস‍্যা হচ্ছে যে যন্ত্র-পর্দায় আসক্ত ছেলেমেয়েরা মানসিকতার দিক থেকেই শারীরিক খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী হয় না। একই রকম অনীহা তাদের গড় ওঠে বই পড়াতেও। ফলে বইয়ের আনন্দময় জগৎ থেকেও তারা বঞ্চিত হয়। তৃতীয়ত, যন্ত্র-পর্দায় বিশাল সময়ে কাটালে ছেলেমেয়েদের শুধু যে সে পর্দায় আসক্তি কিংবা নির্ভরতা বাড়ে তা–ই নয়, অনেক সময় সে নির্ভরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে পর্দার যন্ত্রটি ছেলেমেয়েদের প্রাণভোমরা হয়ে দাঁড়ায় এবং সেটা থেকে কোনো রকমের বিযুক্তি তারা সহ‍্য করতে পারে না। নানান সময়ে দেখা গেছে যে এমন অবস্থা থেকে বহু মানসিক সমস্যার জন্ম হয়, যার ফলে অনেক অপঘাত ঘটে গেছে। ব‍্যক্তির জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য এটা অনভিপ্রেত। কেন ছেলেমেয়েরা ডিভাইসের প্রতি চরমভাবে আসক্ত? তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব তো সেখানে আছেই, যা অপ্রতিরোধ্য হলেও নিয়ন্ত্রিত করা যায় সুষ্ঠু ব‍্যবস্থাপনার মাধ্যমে। অল্প বয়সীরা বন্ধুবান্ধবের মাধ‍্যমেও যন্ত্র-পর্দায় উদ্বুদ্ধ হয়। অন‍্যান‍্যভাবে ব্যস্ত রাখার বিকল্প পন্থার অনুপস্থিতির ফলেও যন্ত্র-পর্দার দিকে তারা ঝোঁকে। মা–বাবার ব‍্যস্ততা এবং সময়ের অভাবও এখানে প্রভাব ফেলে। একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙন এবং পাড়া কিংবা মহল্লার মতো সামাজিক কাঠামোর বিলুপ্তি বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। শিশুদের খাওয়ানোর সমস‍্যা মোকাবিলায় যন্ত্র-পর্দার ব্যবহার আজ ঘরে ঘরে। প্রশ্ন হচ্ছে, কী করা যেতে পারে? অনেকেই বলেছেন যে ছেলেমেয়েদের যন্ত্র-পর্দা সময় দিনে দুই ঘণ্টার মধ‍্যেই বেঁধে দিতে। গবেষকেরা ছেলেমেয়েদের চোখের যত্নে ২০-২০-২০ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট যন্ত্র-পর্দা ব্যবহারের পরে ২০ ফুট কোনো একটি বস্তুর দিকে ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতে হবে। সেই সঙ্গে যন্ত্র-পর্দানির্ভর শিক্ষার কার্যকারিতার ব‍্যাপারেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে যন্ত্র-পর্দানির্ভর শিক্ষা সামনাসামনি শিক্ষার মতো কার্যকর নয়। মায়াবী নীল আলোর ক্ষতিকর প্রভাব এড়াতে বাচ্চাদের গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ছেলেমেয়েদের দলবদ্ধভাবে পড়াশোনা করা, পাঠাগারে যাওয়া, বাগান করাও যন্ত্র-পর্দা সময় কমিয়ে আনতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। ছেলেমেয়েদের যন্ত্র-পর্দা বেঁধে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কিছু নির্দেশিকা আছে। তাদের মতে, স্কুলগামী ছেলেমেয়েদের জন্য বিনোদনমূলক যন্ত্র-পর্দা সময় দুই ঘণ্টার মধ্যে থাকাই উচিত। দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের কোনো যন্ত্র-পর্দা সময় না রাখা এবং ৪ বছরের কম শিশুর জন্য যন্ত্র-পর্দা সময় প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা। নানান দেশ, যেমন অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এ নির্দেশিকাগুলো বাস্তবায়নের জন্য সচেষ্ট। যুক্তরাজ্য সরকার এ বছরের মার্চ মাসে একটি যন্ত্র-পর্দা সময় নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে যে দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুর জন্য প্রতিদিন সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা যন্ত্র-পর্দা সময় থাকা বাঞ্ছনীয়। তা ছাড়া শিশুদের একা যন্ত্র-পর্দা দেখার চেয়ে পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে দেখা ভালো বলে বলা হয়েছে। অস্ট্রেলীয় সরকার দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের কোনো যন্ত্র-পর্দা সময় না রাখার সুপারিশ করেছে। সেই সঙ্গে তারা বলেছে যে ৫ থেকে ১৭ বছরের ছেলেমেয়েদের জন্য বিনোদনমূলক যন্ত্র-পর্দা সময় দুই ঘণ্টার মধ্যে থাকাই উচিত। শিশু-কিশোর-কিশোরীদের জন্য সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারও সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এমন কোনো নির্দেশিকা নয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এমনটা থাকা দরকার এ বিষয়ে পারিবারিক কিংবা সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য। সবচেয়ে বড় কথা, প্রযুক্তির বিস্তার বন্ধ করা যাবে না। তবে সুষ্ঠু ব‍্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি সুষম ভারসাম্য সম্ভব।

মো: দেলোয়ার হোসাইন মে ২৯, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন খুলনার দর্শনীয় স্থানগুলো

নদী, বন, ঐতিহ্য, ইতিহাস আর আধুনিক বিনোদনের মিশেলে গড়ে ওঠা এই শহরে ঈদের ছুটিতে তৈরি হয় ভিন্ন এক উৎসবমুখর আবহ। কোথাও নদীর ঘাটে মানুষের ভিড়, কোথাও পার্কে শিশুদের উচ্ছ্বাস, আবার কোথাও সুন্দরবনের পথে পর্যটকদের ব্যস্ততা, সব মিলিয়ে খুলনা যেন হয়ে ওঠে জীবন্ত এক আনন্দ নগরী।   কম খরচে কাছাকাছি দূরত্বে একাধিক দর্শনীয় স্থান থাকায় পরিবার, বন্ধু কিংবা শিশুদের নিয়ে ঘুরতে খুলনাকে বেছে নিচ্ছেন অনেকেই। প্রকৃতির স্নিগ্ধতা আর ঐতিহ্যের ছোঁয়ায় ঈদের ছুটিতে খুলনার প্রতিটি গন্তব্যই এনে দেয় আলাদা অভিজ্ঞতা।   করমজল: একদিনেই সুন্দরবনের স্বাদ   দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে সুন্দরবন। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের প্রবেশদ্বার করমজল ঈদের সময় পর্যটকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ হয়ে ওঠে। নদীপথে বন ভ্রমণের সময় দুই পাশের সবুজ বন, পাখির ডাক আর নদীর শান্ত সৌন্দর্য ভ্রমণকে করে তোলে অন্যরকম। করমজলে রয়েছে কুমির প্রজনন কেন্দ্র, হরিণের অবাধ বিচরণ আর প্রাকৃতিক পরিবেশ কাছ থেকে দেখার সুযোগ। শিশুদের জন্য এটি যেমন আনন্দদায়ক, তেমনি শিক্ষামূলকও।   খুলনা শহর থেকে করমজলের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার। খুলনা থেকে মংলা হয়ে অথবা সরাসরি ট্রলার ও ইঞ্জিনচালিত নৌকায় সেখানে যাওয়া যায়। যাতায়াত খরচ সাধারণত ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে। প্রবেশ ফি প্রায় ২০ থেকে ৪০ টাকা।   ষাট গম্বুজ মসজিদ: ইতিহাসের সাক্ষী   ঐতিহাসিক ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ ঈদের ছুটিতে অন্যতম আকর্ষণ। ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের এই স্থাপনাটি মধ্যযুগীয় মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন। বিশাল গম্বুজ, প্রাচীন ইটের নির্মাণশৈলী আর চারপাশের শান্ত পরিবেশ ভ্রমণকারীদের ফিরিয়ে নেয় কয়েকশ বছর আগের ইতিহাসে। পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা এখানে ইতিহাসের সঙ্গে কাটান অন্যরকম সময়।   লনা শহর থেকে বাগেরহাটের দূরত্ব প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কিলোমিটার। বাস বা মাইক্রোবাসে যেতে সময় লাগে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। যাতায়াত খরচ সাধারণত ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা। প্রবেশ ফি বাংলাদেশিদের জন্য ৩০ টাকা।   শহীদ হাদীস পার্ক: নগরের ভেতরে সবুজের স্বস্তি   শহরের ভেতরে যারা থাকতে চান, তাদের জন্য রয়েছে শহীদ হাদিস পার্ক কিংবা স্থানীয় শিশু পার্কগুলো। খুলনা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত শহীদ হাদীস পার্ক ঈদের সময় পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা মানুষের ভিড়ে জমে ওঠে। সবুজ গাছপালা, খোলা মাঠ আর জলাধার মিলিয়ে এটি নগরের ভেতরে এক স্বস্তির জায়গা।   শিশুরা খেলাধুলায় মেতে ওঠে, আর বড়রা খোলা পরিবেশে কাটান নির্ভার কিছু সময়। বিকেলের দিকে পুরো পার্কজুড়ে তৈরি হয় প্রাণবন্ত পরিবেশ। শহরের যেকোনো স্থান থেকে রিকশা বা সিএনজিতে সহজেই এখানে পৌঁছানো যায়। যাতায়াত খরচ পড়ে প্রায় ২০ থেকে ৬০ টাকা। প্রবেশ ফি নেই।   রূপসা নদী ও খান জাহান আলী সেতু: সূর্যাস্তের রঙিন বিকেল   নদীমাতৃক খুলনার সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে রূপসা নদীর তীরে। বিশেষ করে বিকেলের সূর্যাস্তের সময় নদীর পানিতে লাল-কমলা আভা ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে মনোমুগ্ধকর।   খান জাহান আলী সেতু ঘিরে তরুণদের আড্ডা, ফটোগ্রাফি আর হাঁটাহাঁটিতে ঈদের সন্ধ্যাগুলো হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত। অনেকে শুধু সূর্যাস্ত দেখতেই ভিড় করেন নদীর ধারে। খুলনা শহর থেকেই রিকশা বা সিএনজিতে সহজে যাওয়া যায় এই এলাকায়। যাতায়াত খরচ সাধারণত ২০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে।     শিশুদের আনন্দে জমজমাট বিনোদন পার্কগুলো   ঈদের ছুটিতে শিশুদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে ওঠে খুলনার বিভিন্ন বিনোদন পার্ক। মুজগুন্নির উৎসব পার্ক, খালিশপুরের ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক ও জাহানাবাদ সেনানিবাস এলাকার বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে এ সময় উপচে পড়ে ভিড়। বিভিন্ন রাইড, খেলাধুলা আর খাবারের দোকান ঘিরে জমে ওঠে উৎসবের আমেজ।   পরিবার নিয়ে নিরাপদ ও আনন্দময় সময় কাটানোর জন্য এসব পার্ক বেশ জনপ্রিয়। রিকশা বা সিএনজিতে যেতে খরচ পড়ে সাধারণত ৩০ থেকে ১০০ টাকা। রাইড ও অন্যান্য বিনোদনের জন্য আলাদা খরচ হতে পারে ৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত।

মোঃ ইমরান হোসেন মে ২৮, ২০২৬
সি চিন পিং এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প।ফাইল ছবি: এএফপি
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইরানি তেল বাণিজ্যে চীনের কঠোর অবস্থান

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২ মে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ জারি করে। ২০২১ সালে তৈরি এক আইনের আওতায় এই নির্দেশ দেওয়া হয়। এর লক্ষ্য বিদেশি আইনের অন্যায্য চাপ ঠেকানো। সহজ করে বললে, এই নির্দেশে বলা হয়েছে—চীনের কিছু তেল শোধনাগারের ওপর আমেরিকা যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তা চীনের ভেতরে মানা যাবে না, কার্যকর করা যাবে না। যে পাঁচটি চীনা রিফাইনারিকে নিশানা করে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো—হেংলি পেট্রোকেমিক্যাল (দালিয়ান), শানডং জিনচেং পেট্রোকেমিক্যাল গ্রুপ, হেবেই শিনহাই কেমিক্যাল গ্রুপ, শৌগুয়াং লুকিং পেট্রোকেমিক্যাল এবং শানডং শেংসিং কেমিক্যাল। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, তারা ইরান থেকে তেল কিনছে। চীনের এই পদক্ষেপ শুধু কূটনৈতিক প্রতিবাদ নয়। এর আগে চীন অনেক সময় মুখে আপত্তি জানিয়েছে, কিন্তু এবার তারা সরাসরি আইন করে সে আপত্তির বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ তারা জানিয়ে দিল—ইরানের সঙ্গে তেল–বাণিজ্য রক্ষায় তারা আইনি শক্তিও প্রয়োগ করবে। এদিকে আমেরিকা অনেক দিন ধরেই ইরানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে তাদের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিদেশি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। লক্ষ্য ছিল—ইরানের তেল বিক্রি কমিয়ে দেওয়া। গত এপ্রিলের ২৪ তারিখে হেংলি পেট্রোকেমিক্যালকে আমেরিকার কালোতালিকায় তোলা হয়। বলা হয়, তারা বিপুল পরিমাণ ইরানি তেল কিনেছে, এমনকি গোপন জাহাজ ব্যবস্থার মাধ্যমেও লেনদেন করেছে। তবে তাদের কিছু সময় দেওয়া হয় ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার জন্য। আমেরিকার উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার। তা হলো—চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য ইরানের তেল কেনা কঠিন করে তোলা এবং অন্য দেশগুলোকেও ভয় দেখানো, যাতে তারা এই ধরনের লেনদেন না করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরানের তেল তুলনামূলক সস্তা। তাই চীনের স্বাধীন রিফাইনারিগুলোর কাছে এটি খুব আকর্ষণীয়। অন্যদিকে, ইরানের অর্থনীতির জন্য এই তেল বিক্রি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই সম্পর্ক শুধু ব্যবসা নয়, বরং তা রাজনীতি, জ্বালানিনিরাপত্তা এবং বড় শক্তির লড়াইয়ের অংশ। এই অবস্থায় চীনের নতুন নির্দেশটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। এতে বলা হয়েছে—আমেরিকার এই নিষেধাজ্ঞা তারা মানে না। এমনকি দেশের ভেতরে কেউ যদি তা মানতে চায়, সেটাও আইনত বাধা দেওয়া হবে। চীন এর জন্য আরেকটি আইনও ব্যবহার করছে, যার মাধ্যমে তারা বিদেশি নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে নিজেদের কোম্পানিকে রক্ষা করতে পারে। এর ফলে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো নিশ্চিন্তে ব্যবসা চালাতে পারবে, আর অযথা ভয় পেয়ে কাজ বন্ধ করে দেবে না। এই পদক্ষেপের বড় লক্ষ্য আমেরিকার ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ দুর্বল করা। এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা সরাসরি আমেরিকার নাগরিকদের জন্য নয়, বরং অন্য দেশের কোম্পানিগুলোকেও চাপ দেয়, যাতে তারা নিষিদ্ধ দেশের সঙ্গে ব্যবসা না করে। চীন ঠিক এই চাপটাই ভাঙতে চাইছে। চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য এটি একধরনের সুরক্ষা। এতে বলা হচ্ছে—আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা বৈধ নয়, তাই তা মানার দরকার নেই। এমনকি বিদেশি কোম্পানিগুলোকেও সতর্ক করা হচ্ছে—যদি তারা এই নিষেধাজ্ঞা মেনে চীনা কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাহলে চীনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। এর ফলে চীন ধীরে ধীরে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর দিকেও এগোতে পারে। ইরানের সঙ্গে তেল–বাণিজ্যে তারা নিজেদের মুদ্রা ব্যবহার করতে পারে, বা অন্য বিকল্প পদ্ধতিতে লেনদেন করতে পারে। তবে বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো এখনো সতর্ক থাকবে। তারা হয়তো ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা এড়িয়ে চলবে বা নিজেদের কাজ ভাগ করে নেবে। একদিকে থাকবে আমেরিকা, অন্যদিকে চীন। ফলে পুরোপুরি বিচ্ছিন্নতা না হলেও ব্যবসার পরিবেশ আরও জটিল হয়ে উঠবে। চীনের এই সিদ্ধান্তের পেছনে জ্বালানিনিরাপত্তার বড় ভূমিকা আছে। তাদের অনেক তেল আসে এমন দেশ থেকে, যেগুলো নিষেধাজ্ঞার আওতায় আছে। তাই এই সরবরাহ চালু রাখা তাদের জন্য জরুরি। ইরানের তেল চীনকে সুবিধা দেয়—খরচ কমায়, বিকল্প বাড়ায় এবং অন্য দেশগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষির শক্তি বাড়ায়। আবার চীনের বাজার ইরানের জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই সম্পর্ক চট করে ভাঙা কঠিন। এই নির্দেশ তাই শুধু আইনি সিদ্ধান্ত নয়, একটি কৌশলগত বার্তাও। এতে বলা হচ্ছে—চীন তার অর্থনৈতিক স্বার্থে আঘাত এলে চুপ করে থাকবে না। অনেক দিন ধরে চীন আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা থেকে কিছুটা লাভও করেছে। যেমন—তারা কম দামে তেল কিনতে পেরেছে। কিন্তু এবার তারা সরাসরি মোকাবিলার পথে হাঁটছে। এতে বোঝা যায়, দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। ইরানের জন্য এটি ভালো খবর। এতে বোঝা যাচ্ছে, সব দেশ আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা মানে না। আর আমেরিকার জন্য এটি নতুন চ্যালেঞ্জ, কারণ এতে তাদের চাপ প্রয়োগ কঠিন হয়ে যায়। সব মিলিয়ে, চীনের এই পদক্ষেপ একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বোঝা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞার লড়াই শুধু অর্থনৈতিক থাকবে না, আইনি লড়াইও বাড়বে। এখন দেখার বিষয়—চীন কতটা কঠোরভাবে এই আইন বাস্তবায়ন করে। যদি তারা শক্তভাবে আইনটি প্রয়োগ করে, তাহলে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য বড় সমস্যা তৈরি হবে। আর যদি শুধু কথার মধ্যে থাকে, তাহলে এটি মূলত রাজনৈতিক বার্তাই হয়ে থাকবে। বিশ্ব তেল বাজারের জন্যও এটি নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তেলের ব্যবসা এখন আরও বেশি রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে, আর আর্থিক ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। এই ঘটনাটি দেখাচ্ছে—একটি বড় অর্থনীতির বিরুদ্ধে একতরফা চাপ সব সময় কাজ করে না। আর চীন দেখিয়ে দিচ্ছে—আইন ব্যবহার করেও কীভাবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা যায়। দীর্ঘ মেয়াদে এটি হয়তো শুধু কয়েকটি কোম্পানিকে ঘিরে ঘটনা হিসেবে থাকবে না। বরং এটি এমন এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত, যেখানে এক দেশের চাপের জবাব অন্য দেশ আইনের মাধ্যমে দেবে। উমুদ শোকরি জ্বালানি কৌশলবিদ ও গালফ স্টেট অ্যানালিটিকস-এর উপদেষ্টা। মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

মারিয়া রহমান মে ১০, ২০২৬
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক। ছবি : সংগৃহীত
সদিচ্ছা থাকলে সংসদ থেকেও ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব : শাহদীন মালিক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারি। এর ৫ দিন পর মঙ্গলবার শপথ নিয়েছেন নবনির্বাচিত সদস্যরা। গঠিত হয়েছে নতুন সরকার ও নতুন সংসদ। তবে বিরোধী দলের সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও নেননি ক্ষমতাসীন দল বিএনপির এমপিরা। আর সে কারণে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই গেল। এ নিয়ে একটি গণমাধ্যমে বলেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক। উত্তর দিয়েছেন বেশ কিছু প্রশ্নের। প্রশ্ন : সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সংসদ সদস্যরা।এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়েছেন। এ অবস্থায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কী হবে? শাহদীন মালিক : এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। এটা একটা নতুন পরিস্থিতি, নতুন অভিজ্ঞতা। দুই পক্ষের কথা শুনে মনে হচ্ছে, এই পরিষদকে শপথ পড়াবেন কে? পরিষদে সভাপতিত্ব করবেন কে? জাতীয় সংসদের স্পিকারই কি এখানে সভাপতিত্ব করবেন? নাকি এখানকার জন্য আলাদা স্পিকার নির্বাচিত হবেন? এই বিষয়গুলোর সমাধান হয়নি।তাই দুই পক্ষের অবস্থান দুই রকম। প্রশ্ন : এর সমাধান কী? শাহদীন মালিক : সমাধান খুঁজতে হলে দেখতে হবে, সাধারণ মানুষ কী চায়। সাধারণ মানুষ কিন্তু জেদাজেদি চায় না। তারা চায় স্থিতিশীলতা। গত দেড় বছরের অস্থিরতার পর মানুষ এখন চায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক হবে ইত্যাদি।তাই সেদিকেই মনোযোগ দেওয়া উচিত। সাংবিধানিক কোনো ব্যাপার থাকলে বা আইনে কোনো পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হলে এখন তো সংসদ গঠিত হয়েছে। সংসদ আছে, সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে, যা কিছু হওয়া উচিত সংসদ থেকেই। প্রশ্ন : নতুন সরকার কেমন হয়েছে? শাহদীন মালিক : পত্রিকায় দেখলাম ৭০ শতাংশ এমপিই নতুন, মানে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েছেন। এখান থেকেই তো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রী হয়ে সরকারে গেছেন ওনারা। তার মানে এমপিদের মতো নতুন সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরাও অনেকে নতুন। তাই নতুন মন্ত্রিপরিষদ স্বাভাবিক হতে একটু তো সময় লাগবেই। প্রশ্ন : নতুন সংসদ কেমন হয়েছে? শাহদীন মালিক : একই উত্তর প্রায়। তবে সংসদ অধিবেশন শুরুর আগেই একটা ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ওনারা। খবরে দেখলাম বিরোধী দল ও সরকারি দল থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, সরকারি সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট নেবেন না সংসদ সদস্যরা। তার মানে সদিচ্ছা থাকলে সংসদ থেকেও ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। সূত্র : খবরের কাগজ

মারিয়া রহমান ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
ইসলামের দৃষ্টিতে জ্ঞানার্জন

মানবজাতির জন্য আল্লাহ প্রদত্ত গাইডলাইন পবিত্র কোরআন। হেরা পর্বতে আল্লাহর ধ্যানে থাকা অবস্থায় ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) হাজির হন রসুল (সা.)-এর কাছে। আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি রসুল (সা.)-কে কোরআনের যে আয়াতটি প্রথমে পৌঁছে দেন সেটি হলো ‘পড়, তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। মানবজাতিকে তিনি সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্ত থেকে। পড়, আর তোমার প্রতিপালক সম্মানিত, যিনি কলম দিয়ে শিক্ষা দিয়েছেন, যা তারা জানত না।’ সুরা আলাক-১-৫। কোরআনের এ আয়াতটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। যারা আল্লাহকে সব ক্ষমতার মালিক এবং জগৎ-মহাজগতের সবকিছুর স্রষ্টা হিসেবে বিশ্বাস করেন, যারা মুহাম্মদ (সা.)-কে তাঁর রসুল বলে স্বীকার করেন, যারা জিবরাইল (আ.)-কে ফেরেশতা হিসেবে বিশ্বাস করেন তাদের জন্য ওই আয়াতটি দিকনির্দেশনামূলক। পবিত্র কোরআনের সূচনা ‘পড়’ এই হুকুমসংবলিত শব্দের মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য জ্ঞান অর্জনকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছেন তা এ আয়াতটিতে স্পষ্ট। অথচ রসুল (সা.) নিজেই ছিলেন অক্ষরজ্ঞানহীন। তিনি অক্ষরজ্ঞানের অধিকারী না হলেও আল্লাহর ইচ্ছা এবং জাগতিক ও পারলৌকিক জ্ঞানের ভান্ডার কোরআনের বদৌলতে উম্মতদের আলোকবর্তিকা হিসেবে ভূমিকা পালন করছেন। আল্লাহ ও রসুল (সা.)-এর প্রতি বিশ্বাসের কারণেই মোমিনদের অবশ্য কর্তব্য হলো- জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী হওয়া। কারণ আমাদের যিনি স্রষ্টা তিনি মানবজাতির চলার পথের গাইডলাইন হিসেবে যে পবিত্র কোরআন নাজিল করেছেন তাতে প্রথমেই পড়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ পড়া অর্থাৎ জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে কোনোরকম হেলাফেলার অবকাশ নেই। আমাদের উচিত হবে নিজেদের যেমন জ্ঞানার্জনে মনোযোগী হওয়া, তেমন আমাদের শিশুসন্তানকেও সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা। সে যাতে কোরআন-হাদিস সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে তা নিশ্চিত করা। বড় হয়ে কর্মজীবনের উপযোগী শিক্ষাও সন্তানের জন্য নিশ্চিত করতে হবে। যাতে সন্তান বড় হওয়ার পর জীবিকার জন্য কারও মুখাপেক্ষী না হয়। রসুল (সা.) অপরের কাছে হাত পাতাকে অপছন্দ করতেন। তিনি তাঁর উম্মতদের স্বাবলম্বী হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। যে জাতি যত শিক্ষিত সেই জাতি তত উন্নত। শিক্ষা ব্যতিরেকে কোনো জাতির উন্নতি কল্পনা করা যায় না। জাগতিক ও পারলৌকিক উভয় জগতের সফলতা অর্জনে শিক্ষার বিকল্প নেই। এজন্য নৈতিক ও আদর্শভিত্তিক ঐশী শিক্ষার সমন্বিত শিক্ষা প্রয়োজন। শিক্ষা, অজ্ঞতা ও অন্ধকার দূর করে মানুষকে কল্যাণ ও সমৃদ্ধির পথ দেখায়। মানবতার মুক্তির মহাগ্রন্থ আল কোরআনের প্রথম অবতীর্ণ শব্দটি যেহেতু ‘পড়’ সেহেতু মানুষের কল্যাণ সাধনে শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। পবিত্র কোরআনে রসুল প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্য মানুষকে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দেওয়ার কথা বর্ণনা করে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই ওই সত্তা যিনি নিরক্ষরদের মাঝে স্বয়ং তাদেরই মধ্য থেকে একজন রসুল পাঠিয়েছেন যিনি তাদের তাঁর (আল্লাহর) আয়াত পাঠ করে শোনান, তাদের আত্মিক পরিশুদ্ধ এবং তাদের কিতাব (আল্লাহর বাণী) ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেন। অথচ এর আগে তারা স্পষ্ট অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল।’ সুরা জুমু’আ-২। ইসলাম জ্ঞানবিজ্ঞানে পান্ডিত্য অর্জন করা ও শিক্ষাদীক্ষায় দক্ষ ও সুশিক্ষা লাভ করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে। এজন্য ইসলামের প্রথম যুগের মনীষীগণ শিশুদের একত্র করে শিক্ষাদীক্ষা ও জ্ঞানবিজ্ঞানের শীর্ষে পৌঁছার প্রতি উৎসাহ প্রদান করতেন। হজরত হিশাম ইবনি উরওয়াহ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তাঁর সন্তানদের একত্র করে বলেন, হে আমার সন্তানেরা! তোমরা ইলম শিক্ষা কর। যদিও তোমরা আজ জাতির ছোট শিশু। আশা করা যায় অচিরেই তোমরা পরবর্তীদের বয়োজ্যেষ্ঠতে পরিণত হবে।   আর কোনো বয়োবৃদ্ধের জন্য এর চেয়ে খারাপ কোনো অবস্থা নেই যে, কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করা হলে তার কাছে কোনো ইলম (তথ্য) পাওয়া যাবে না। -সুনানে দারিমি। এ ব্যাপারে রসুল (সা.) এর দৌহিত্র হজরত হাসান (রা.)-এর একটি উৎসাহব্যঞ্জক ঘটনাও বর্ণিত আছে হজরত শুরাহবিল বিন সাঈদ (রহ.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, হজরত হাসান (রা.) তাঁর ছেলে এবং ভাতিজাকে ডেকে বললেন, হে আমার বৎস এবং ভাতিজা, তোমরা আজ জাতির ছোট শিশু-অচিরেই তোমরা পরবর্তীদের বয়োজ্যেষ্ঠতে পরিণত হবে। অতএব তোমরা ইলম শিক্ষা কর। তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি তা বর্ণনা করতে অথবা মুখস্থ করে সংরক্ষণ করতে সক্ষম না হয় সে যেন তা লিখে রাখে এবং তা নিজ ঘরে রেখে দেয় (সংরক্ষণ করে)।-সুনানে দারিমি। উল্লিখিত দুটি ঘটনা শিশুদের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে উৎসাহ প্রদানের দলিল ও প্রমাণের নির্দেশনা।

মো: দেলোয়ার হোসাইন ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
রোজা রেখে ইনজেকশন-ইনসুলিন নেওয়া যাবে কি?

রমজান মাসে রোজা রাখা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মুসলমানের ওপর ফরজ। শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ত্যাগ করা গুরুতর গুনাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন   يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৮৩)   তবে রোজা অবস্থায় অনেক সময় রোগীর ওষুধ গ্রহণ, ইনজেকশন নেওয়া বা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয় দেখা দেয়—এসব চিকিৎসা গ্রহণ করলে রোজা নষ্ট হবে কি না। সমসাময়িক ইসলামী চিন্তাবিদ ও ফকিহরা কুরআন-সুন্নাহর আলোকে এ বিষয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। নিচে ইনজেকশন, ইনসুলিন ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা সংক্রান্ত বিধান উপস্থাপন করা হলো।   রোজা রেখে ইনজেকশন ও ইনসুলিন নেওয়া যাবে কি? আধুনিক মাসায়েলার আলোকে বিশ্লেষণ   ইনজেকশন নেওয়ার বিধান রোজা অবস্থায় শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি ছাড়া অন্য যেকোনো চিকিৎসাগত কারণে ইনজেকশন নিলে রোজা নষ্ট হবে না—চাই তা মাংসে (ইন্ট্রামাসকুলার) দেওয়া হোক বা রগে/শিরায় (ইন্ট্রাভেনাস)।   কারণ ইনজেকশনের মাধ্যমে ওষুধ শরীরে প্রবেশ করে একটি অস্বাভাবিক পথ দিয়ে (অর্থাৎ মুখ, নাক বা স্বাভাবিক খাদ্যগ্রহণের পথ নয়)। ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, রোজা ভঙ্গ হওয়ার জন্য খাদ্য বা পানীয় জাতীয় কিছু স্বাভাবিক প্রবেশপথ দিয়ে পাকস্থলীতে পৌঁছানো শর্ত। ইনজেকশনের ক্ষেত্রে তা ঘটে না। (আল্লামা ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ৩৯৫; ইবনু নুজাইম, আল-বাহরুর রায়েক, খণ্ড ২, পৃ. ২৭৮; আপকে মাসায়েল আওর উনকা হল, খণ্ড ৩, পৃ. ২১৪)   ইনসুলিন গ্রহণের বিধান ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ইনসুলিন নেওয়া একটি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা। শরিয়তের দৃষ্টিতে ইনসুলিন নিলে রোজা ভঙ্গ হবে না। কারণ, ইনসুলিনও ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে এবং তা খাদ্য বা পানীয় হিসেবে গণ্য হয় না। এটি স্বাভাবিক খাদ্যগ্রহণের পথ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে না এবং পাকস্থলীতে পৌঁছায় না। ফলে রোজা নষ্ট হওয়ার কোনো কারণ সৃষ্টি হয় না। (ইবনে আবিদিন, খণ্ড ৩, পৃ. ৩৬৭; ইসলাম ও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান, পৃ. ৩২৭)   ডায়াবেটিস পরীক্ষা ও রক্ত নেওয়া ডায়াবেটিস রোগীরা নিয়মিত সুগার পরীক্ষা করেন। এ ক্ষেত্রে আঙুলে সূচ ফুটিয়ে একফোঁটা রক্ত নেওয়া হয়। ফকিহদের মতে, এতটুকু রক্ত নেওয়ার ফলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। কারণ, এতে শরীরে কোনো খাদ্য বা পানীয় প্রবেশ করে না; বরং অল্প পরিমাণ রক্ত বের হয়, যা রোজা ভঙ্গের কারণ নয়।   রোজা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তবে ইসলাম একটি সহজ ও বাস্তবসম্মত জীবনব্যবস্থা। অসুস্থ ব্যক্তির প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণে শরিয়ত বাধা দেয় না। ইনজেকশন (শক্তিবর্ধক না হলে), ইনসুলিন গ্রহণ এবং সুগার পরীক্ষা—এসবের মাধ্যমে রোজা নষ্ট হয় না বলে প্রখ্যাত ফকিহ ও সমসাময়িক আলেমরা মত দিয়েছেন।   অতএব, যারা দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন, বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীরা, তারা অযথা দুশ্চিন্তা না করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারেন। তবে জটিল বা বিশেষ পরিস্থিতিতে নিজ নিজ বিশ্বস্ত আলেম ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।   আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহিহভাবে রোজা পালনের তৌফিক দান করুন। আমিন।

মো: দেলোয়ার হোসাইন ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
ইসলামের দৃষ্টিতে সুশাসন

সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে দেশের মানুষ সুশাসনের প্রত্যাশায় ভোট দিয়েছে। ইসলাম সুশাসনের তাগিদ দেয়। ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.) ছিলেন বিশ্বের সেরা জ্ঞানীদের একজন। তিনি ছিলেন বিশ্বনবী (সা.)-এর  জামাতা। পুরুষদের মধ্যে আলী (রা.) প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলামের এই চতুর্থ খলিফা শাসক হিসেবে ন্যায়পরায়ণতার যে নজির রেখেছেন তা আজও প্রাসঙ্গিক। হজরত আলী (রা.)-এর খুতবাহ, বক্তৃতা, চিঠিপত্রের সংকলন ‘নাহজুল বালাগাহ’। এতে মিসরের গভর্নর হজরত মালিক আশতারকে লেখা খলিফা আলী (রা.)-এর চিঠিতে শাসন ক্ষেত্রে ন্যায় ও সুবিচার নিশ্চিত করার যে তাগিদ দেওয়া হয়েছে তা সর্বযুগে অনুকরণীয়।   হজরত আলী (রা.) মালিক আশতারকে লেখা চিঠিতে বলেন, অন্তরে ভাবাবেগ জাগ্রত হলে, কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ আল্লাহর অনুগ্রহ না হলে মানুষের অন্তঃকরণ তাকে পাপের দিকে নিয়ে যায়।...অতএব তুমি তোমার ভাবাবেগকে নিয়ন্ত্রণ কর এবং যা তোমার জন্য বৈধ নয়, সে কাজ থেকে তোমার অন্তরকে বিরত রাখ। নাহজুল বালাগার বক্তব্যে আমরা ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে পার্থিব সমস্যাবলির বাস্তব সমাধান লাভ করি। তেমনি এতে সমাজে সুবিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঐক্য ও নিরাপত্তা অর্জনের পথ খুঁজে পাই। যে লক্ষ্যে হজরত আলী (রা.) তাঁর গভর্নরকে লোকদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে সুবিচার অবলম্বনের নির্দেশ দেন। তিনি তাঁর চিঠিতে বলেন, ‘তোমার অন্তরকে তোমার অধীন জনগণের প্রতি ক্ষমা এবং তাদের প্রতি স্নেহ ও দয়া প্রদর্শনে অভ্যস্ত করে তোল। তুমি তাদের ওপর হিংস্র পশুদের ন্যায় চড়াও হইও না। তারা ভুল কাজ করতে পারে, তা ইচ্ছা করেই হোক বা উদাসীনতার কারণেই হোক। অতএব তুমি ঠিক সেভাবেই তাদের দিকে ক্ষমার হাত প্রসারিত করে দাও, যেভাবে তুমি পছন্দ কর যে আল্লাহ তোমার প্রতি ক্ষমা বিস্তার করে দিন। কারণ তুমি তাদের ওপরে স্থান লাভ করেছ এবং তোমার অধিনায়ক (আলী) তোমার ওপরে। আর যে তোমাকে নিয়োগ করেছে তার ওপরে আছেন আল্লাহ। তিনি (আল্লাহ) চেয়েছেন যে তুমি তাদের বিষয়াদি পরিচালনা করবে এবং তিনি তাদের মাধ্যমে তোমাকে পরীক্ষা করছেন।   হজরত আলী (রা.) সমাজে সুবিচারের বাস্তব রূপায়ণে বলেন : ‘ক্ষমা করার কারণে অনুতপ্ত হইও না এবং শাস্তি দিতে পেরে গর্বিত হইও না। ক্রোধের সময় দ্রুত পদক্ষেপ নিও না। এ কথা বলো না যে ‘আমাকে কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে। অতএব আমি যখন আদেশ দেব তখন অবশ্যই তা পালিত হতে হবে।’ কারণ তা অন্তরে বিভ্রান্তি ও দীনে দুর্বলতা সৃষ্টি করে এবং তা ব্যক্তিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। হজরত আলী (রা.) তাঁর গভর্নরকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন : ‘তোমার জন্য সর্বাধিক বাঞ্ছনীয় হওয়া উচিত তাই যা সর্বাধিক ন্যায়ানুগ, যা সর্বাধিক মাত্রায় সর্বজনীন সুবিচারপূর্ণ এবং তোমার অধীনদের পছন্দের দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বাধিক বোধগম্য। হজরত আলী (রা.)-এর ওই বক্তব্যে সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে সুবিচার বিস্তারের মর্মবাণী ও মানবিক আবেদন নিহিত রয়েছে, তা অনুধাবন করা যে কারও পক্ষেই সম্ভব। সম্ভবত সব পার্থিব শাসনব্যবস্থা পক্ষপাতিত্বের দোষে আক্রান্ত। আলী (রা.) এ ধরনের শাসনব্যবস্থার শাসকদের জালেম এবং এ কারণে নৈতিকতার মূল্যবোধ পদদলিতকারী ও মানবিকতার উদ্দেশ্য নস্যাৎকারী শোষক হিসেবে অভিহিত করেন। অবৈধ ও বেআইনি কার্যকলাপ এবং গোষ্ঠী বিশেষের প্রতি পক্ষপাতিত্বের মাধ্যমে যেভাবে জুলুম করা হয় তিনি তার বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কারণ এ ধরনের পরিস্থিতিতে সুবিচার বিস্তারের ধারণা হারিয়ে যায়। কেবল সেসব লোকই এ ধরনের জুলুমমূলক পদ্ধতি পরিহার করে চলেন, যারা আল্লাহকে ভয় করেন এবং তারা সমাজকে সেই দিকে পরিচালিত করেন। হজরত আলী (রা.) যেজন্য মালিক আশতারকে নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেন সমাজকে সবার, বিশেষ করে দরিদ্র ও বঞ্চিত লোকদের কল্যাণসাধনের লক্ষ্যাভিসারী করে গড়ে তোলেন। হজরত আলী (রা.) বলেন : যারা মুসলমানদের ধর্মীয় শক্তির স্তম্ভ এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষাস্বরূপ, তারা হচ্ছে সাধারণ জনগণ। অতএব তোমার উচিত তাদের দিকে বেশি মনোযোগী হওয়া ও তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা। হজরত আলী (রা.) এখানে গভর্নর মালিক আশতারকে যে পথনির্দেশ দিয়েছেন, এটাই হলো আজকের দিনে প্রকৃত গণমুখী শাসনব্যবস্থা। অত্যন্ত চমৎকারভাবে ইসলামের চতুর্থ খলিফা জনগণের স্বার্থরক্ষার্থে চেষ্টা-সাধনা চালানো ও তাদের দিকে মনোযোগী থাকার ওপরে গুরুত্বারোপ করেছেন। শাসক বা প্রশাসকদের পরামর্শদাতা বা উপদেষ্টাদের জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলি তুলে ধরেছেন। যা জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ তিনি সাধারণ জনগণকে ধর্মের স্তম্ভ, রাষ্ট্রের শক্তি ও শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা প্রাচীর বলে গণ্য করেছেন।

মো: দেলোয়ার হোসাইন ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬
প্রতীকী ছবি
ইসলামে রাজনীতি : ইবাদত, জবাবদিহি ও মানবকল্যাণ

রাজনীতি মানব সমাজ পরিচালনার একটি অপরিহার্য মাধ্যম। ইসলাম—রাজনীতিকে ধর্মের বাইরে কোনো বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে নয়, বরং এটিকে নৈতিকতা, জবাবদিহি ও জনকল্যাণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত করে। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে ইসলামী রাষ্ট্র ও নেতৃত্বের মৌলিক দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে সুরা হজের ৪১ নম্বর আয়াত ইসলামী রাজনীতির একটি সংক্ষিপ্ত অথচ পূর্ণাঙ্গ ইশতেহার হিসেবে বিবেচিত। এই আয়াতে ক্ষমতা লাভের পর ইসলামী নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র কী ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করবে তার সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। আয়াতে বলা হয়েছে—‘তাদের যদি আমরা জমিনে ক্ষমতা দান করি, তবে তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত আদায় করবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহরই হাতে।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৪১) আয়াতের আলোকে ইসলামী রাজনীতির চারটি মৌলিক ভিত্তি ও একটি নৈতিক পরিণতি সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়। ১. নামাজ কায়েম করা : ইসলামের মৌলিক স্তম্ভগুলোর মধ্যে নামাজ অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। যে পাঁচটি ভিত্তির ওপর ইসলাম দাঁড়িয়ে আছে এর মধ্যে নামাজ দ্বিতীয়। নামাজ ছাড়া ইসলামের মৌলিকত্ব অসম্ভব। ঈমানের পর ইসলামে নামাজের চেয়ে অধিক গুরুত্ব অন্য কোনো ইবাদত প্রদান করা হয়নি। ইসলামী রাজনীতির প্রথম অঙ্গীকার হলো নামাজ কায়েম করা। সব মানুষ আসলে নামাজি হয়ে গেলে দেশে কোনো বিশৃঙ্খলাই থাকবে না। কারণ নামাজ মানুষকে অবশ্যই অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখবে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ (মানুষকে) অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে।’(সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৫) কাজেই নামাজ শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও আল্লাহভীতির প্রতীক। যে রাষ্ট্র নামাজকে গুরুত্ব দেয়, সে রাষ্ট্র নৈতিক অবক্ষয় থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সচেষ্ট থাকে। ২. জাকাত আদায় : জাকাত ইসলামী অর্থনীতির মৌলিক স্তম্ভ। জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা সমাজে ধনী-গরিবের ব্যবধান কমায় এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। অতএব, ইসলামী রাজনীতির ইশতেহারে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতিশ্রুতি থাকা আবশ্যক। জাকাত ধনীদের সম্পদে গরিবদের অধিকার। জাকাত দানকারীদের নিজ দায়িত্বে জাকাতের সম্পদ জাকাত গ্রহিতাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘এবং তাদের (ধনীদের) ধন-সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের অধিকার।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ১৯) ৩. সৎ কাজের আদেশ : ‘সৎ কাজের আদেশ’ ইসলামী রাজনীতির গঠনমূলক দিক। ইসলামী রাষ্ট্র শুধু নিষেধের মাধ্যমে নয়, বরং শিক্ষা, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সমাজকল্যাণের মাধ্যমে একটি আদর্শ সমাজ গড়ে তুলতে চায়। সৎ কাজের প্রসার মানে হলো—নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা। এটি ইসলামী রাজনীতিকে ইতিবাচক ও জনমুখী করে তোলে। ৪. অসৎ কাজ থেকে নিষেধ : ইসলামী রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা। এর অর্থ হলো— দুর্নীতি, জুলুম, শোষণ ও নৈতিক অনাচারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। ইসলামী রাষ্ট্রে আইন হবে ন্যায়ভিত্তিক এবং প্রয়োগ হবে পক্ষপাতহীন। এ দিকটি ইসলামী রাজনীতিকে দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক করে তোলে। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা আবশ্যক, যারা কল্যাণের দিকে আহবান করবে, মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বারণ করবে। আর তারাই হবে সফল।’ (সুরা : আল-ইমরান, আয়াত :  ১০৪) ৫. আল্লাহর কাছে জবাবদিহির চেতনা : আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহর হাতে’—এটি ইসলামী রাজনীতির নৈতিক উপসংহার। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়; এর চূড়ান্ত পরিণাম আল্লাহর হাতে। এই বিশ্বাস শাসকদের অহংকার ও স্বেচ্ছাচারিতা থেকে বিরত রাখে এবং রাজনীতিকে ইবাদত ও আমানতের মর্যাদায় উন্নীত করে। পরিশেষে বলা যায়, সুরা হজের ৪১ নম্বর আয়াতের আলোকে ইসলামী রাজনীতির ইশতেহার হবে এমন একটি নীতিপত্র, যা নৈতিকতায় পরিশুদ্ধ, অর্থনৈতিকভাবে ন্যায়ভিত্তিক, সামাজিকভাবে কল্যাণমুখী এবং সর্বোপরি আল্লাহভীতিতে পরিচালিত। এই ইশতেহারে ক্ষমতা লাভের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে ক্ষমতা প্রয়োগের দায়বদ্ধতা বেশি গুরুত্ব পায়। তাই ইসলামী রাজনীতি মূলত ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বরং এটি মানবকল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের রাজনীতি। লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মারিয়া রহমান ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০২৬
Popular post
হাইকোর্টের রুল জারি, কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতি কেন অবৈধ নয়

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে। 

কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতি বিতর্ক : উদ্বেগে দুই শতাধিক কর্মকর্তা

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।   

কৃষি ব্যাংকের ‘ভুয়া সিবিএ সভা’ ঘিরে চাঞ্চল্য

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে।  অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না প্যাথলজি-রেডিওলজি রিপোর্টে সরাসরি চিকিৎসকের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক

প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।

শুল্কমুক্ত সুবিধায় ব্যবসায়ীদের আগ্রহে ভাটা

পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না।   একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।   এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন।   গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে।   জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে।   সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে।   কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে।   প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে।   আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’   সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না।   এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।

সপ্তাহের সেরা

ছবি: সংগৃহীত
রাজনীতি

সরকারের কারণে জনগণের রান্নাঘরেও ভোগান্তি: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

মো: দেলোয়ার হোসাইন নভেম্বর ০৩, ২০২৬