আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা শেষ হয়েছে নানা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের মন্দা এড়াতে পারলেও ঋণ পরিশোধের বাড়তি ব্যয়, উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়া, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং কর্মসংস্থানের সংকট নিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উদ্বেগ কাটেনি। সপ্তাহব্যাপী আলোচনায় এসব সমস্যার কিছু দিক উঠে এলেও কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট সমাধানের বিষয়ে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত এ সভায় বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, নীতিনির্ধারক ও উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন। বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি, সরকারি ঋণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং তরুণদের কর্মসংস্থান ছিল আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সভায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে রাজস্ব আহরণ, বাজেট ব্যবস্থাপনা, কাঠামোগত সংস্কার ও বেসরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে ঋণের উচ্চ ব্যয়, আন্তর্জাতিক সহায়তার অনিশ্চয়তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে শ্রমবাজারে সম্ভাব্য পরিবর্তন মোকাবিলায় আরও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা রয়ে গেছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ঋণ পরিশোধের ব্যয় ক্রমেই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ডের মুনাফার হার বেড়ে যাওয়ায় অনেক দেশের নতুন ঋণ নেওয়ার খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ঋণের মোট পরিমাণ কমলেও সুদ ও অন্যান্য ব্যয়ের কারণে সরকারি অর্থের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, বাজেটের ভারসাম্যহীনতার ক্ষেত্রে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোও বড় সমস্যার উৎস। অন্যদিকে, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের ব্যয় এক দশক আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে সরকারি রাজস্বের প্রায় ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে বলে সভায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয়ের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। ঋণের চাপ সামলাতে গিয়ে উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো নিজেদের বাজেটসংক্রান্ত সমস্যা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামলাতে ব্যস্ত থাকায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে মনে করছেন কয়েকজন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক।
আটলান্টিক কাউন্সিলের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট জশ লিপস্কির মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংকট মোকাবিলায় কার্যকর দিকনির্দেশনা তৈরির সুযোগ থাকলেও এবারের সভা সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।
কলম্বিয়ার সাবেক অর্থমন্ত্রী ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাউরিসিও কার্দেনাসও ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সুস্পষ্ট পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতায় কী ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে, সে বিষয়ে বাস্তবসম্মত প্রস্তুতি জরুরি।
বিশ্ব অর্থনীতির ওপর ভূরাজনৈতিক সংঘাতের প্রভাবও সভার আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ইউক্রেন সংঘাত জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের পরিবেশে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্যদেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্যও সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ব্যাংককে আইএমএফের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে রাশিয়ার অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের সময় প্রায় অর্ধেক প্রতিনিধি কক্ষ ছেড়ে চলে যান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এ ধরনের বিভাজন অব্যাহত থাকলে ঋণসংকট, দারিদ্র্য ও উন্নয়ন অর্থায়নের মতো বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে যৌথ উদ্যোগ দুর্বল হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বড় ধরনের জ্বালানি ধাক্কা সত্ত্বেও বিশ্ব অর্থনীতি প্রত্যাশার তুলনায় ভালোভাবে পরিস্থিতি সামলেছে। তবে মন্দা এড়ানো গেলেও উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় ধরনের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দুর্বল হয়েছে।
প্রতিবেদনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসার কথা বলা হয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
কোসে সতর্ক করেছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দেয় না। কয়েক মাস পরপর নতুন অর্থনৈতিক ধাক্কার আশঙ্কা থাকায় দেশগুলোকে আগাম প্রস্তুতি ও ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগ সরকারি উন্নয়ন সহায়তা বা ওডিএ কমে যাওয়া। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে এ ধরনের সহায়তা ২৩ শতাংশ কমেছে।
সহায়তা কমে গেলে দরিদ্র দেশগুলোকে নিজেদের রাজস্ব, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং বহুপক্ষীয় ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগ সাধারণত তুলনামূলক লাভজনক ও কম ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বেশি যায়। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং কম লাভজনক অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা উন্নয়ন অর্থায়নে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ, দাতব্য সংস্থার অর্থ এবং প্রযুক্তিকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি দরিদ্র দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন ও ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারেন। বিপরীতে, তাদের জন্য সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সংখ্যা প্রায় ৪০ কোটি। অর্থাৎ সম্ভাব্য নতুন শ্রমশক্তি ও কর্মসংস্থানের মধ্যে ব্যবধান প্রায় ৮০ কোটি।
এটি কোনো এক বছরের চাকরির ঘাটতি নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি শ্রমবাজার পরিস্থিতির একটি পূর্বাভাস। তবু এই হিসাব কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা তৈরির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা জরুরি।
ঋণের ব্যয়, উন্নয়ন সহায়তার অনিশ্চয়তা এবং কর্মসংস্থানের চাপ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এ পরিস্থিতিতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা উন্নত করা এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়াতে শিল্প, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবাখাতে বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও কারিগরি প্রশিক্ষণ জোরদার করা প্রয়োজন।
তবে ব্যাংককের সভায় বাংলাদেশকে নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট ঋণ বা সহায়তা অনুমোদনের তথ্য এই প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। তাই সাধারণ নীতিগত আলোচনা এবং বাংলাদেশের জন্য অনুমোদিত কোনো আর্থিক সিদ্ধান্তকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি, ঋণের চাপ, উন্নয়ন সহায়তার ঘাটতি এবং কর্মসংস্থানের সংকট নিয়ে আলোচনা হলেও এসব সমস্যার সমন্বিত সমাধান এখনো স্পষ্ট নয়।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য শুধু বাজেট ঘাটতি কমানো বা কাঠামোগত সংস্কার যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থানে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বজায় রাখাও জরুরি।
সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি আপাতত বড় ধরনের মন্দা এড়ালেও এর সুফল সব দেশ সমানভাবে পাচ্ছে না। ঋণের বোঝা কমানো, উন্নয়ন অর্থায়নের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করাই এখন আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
শেয়ারবাজারে মূল মার্কেটের বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ারে যখন দুর্বলতার চিত্র দেখা গেছে, তখন বিপরীত পথে হেঁটেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মূলধনি কোম্পানির প্ল্যাটফর্ম এসএমই বোর্ড। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান তিন সূচক কমলেও সপ্তাহজুড়ে এসএমই বোর্ডের সূচকে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ডিএসইর সাপ্তাহিক বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, আলোচ্য সপ্তাহ শেষে ডিএসইএক্স ৫ হাজার ৪১৭ দশমিক ৪৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আগের সপ্তাহের তুলনায় সূচকটি কমেছে ৩৩ দশমিক ১৯ পয়েন্ট বা ০.৬১ শতাংশ। ডিএস৩০ সূচক ০.৭৯ শতাংশ এবং ডিএসইএস সূচক ১.৮৪ শতাংশ কমেছে। তবে এর বিপরীতে এসএমই বোর্ডের সূচক ডিএসএমইএক্স ৯৭০ দশমিক ৮১ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ০.৬৩ শতাংশ বেশি। বাজারের এই ভিন্ন চিত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, মূল বাজারের বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ারে চাপ থাকলেও এসএমই প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। যদিও সূচকের এই বৃদ্ধি দিয়ে সামগ্রিক এসএমই বাজারে শক্তিশালী প্রবণতা তৈরি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বিশ্লেষকদের মতে, মূল বাজার ও এসএমই বোর্ডের সূচকের বিপরীতমুখী অবস্থান বিনিয়োগকারীদের বাজারে অংশগ্রহণের ধরন ও ঝুঁকি গ্রহণের প্রবণতা নিয়ে নতুন করে বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি করেছে।
আগামী ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে দেশের সব পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংগঠনটি এ সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছে। এর আগে গত ২১ অক্টোবর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে প্রতিবছর ৭ নভেম্বর সাধারণ ছুটি ঘোষণার সিদ্ধান্ত জানিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের বিধি-৬ শাখা থেকে জারি করা ওই প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন উপসচিব ওয়ালীউল দামান। এর ফলে ৭ নভেম্বর দিনটি আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের সাধারণ ছুটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভার বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিবছর ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে সাধারণ ছুটি পালন করা হবে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দিবসটি প্রতিবছর সরকারি ছুটির আওতায় পালনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
নগদ বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ ও পরিবহনের ঝুঁকি কমাতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত মানি চেঞ্জারদের জন্য বিশেষ ব্যাংক হিসাব খোলার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোতে কাস্টডিয়াল হিসাব খুলে বৈদেশিক মুদ্রার নোট জমা ও সংরক্ষণ করতে পারবেন তাঁরা। বুধবার (৪ নভেম্বর) এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সার্কুলারে বলা হয়েছে, কাস্টডিয়াল হিসাব কেবল বৈদেশিক মুদ্রার নোট জমা, উত্তোলন এবং নিরাপদে সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করা যাবে। এসব হিসাবে জমা অর্থের বিপরীতে কোনো ধরনের সুদ দেওয়া হবে না। নির্ধারিত সীমার বাইরে মুদ্রা জমা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক লেনদেনের পরিমাণ ও ধরন যথাযথভাবে নথিভুক্ত রাখতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, নগদ বৈদেশিক মুদ্রা পরিবহনের ক্ষেত্রে মানি চেঞ্জারদের বৈধ ক্যাশ-ইন-ট্রানজিট (সিআইটি) বিমা থাকতে হবে। এ ছাড়া অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকের নির্ধারিত সীমার বেশি অর্থ পরিবহনের সময় লাইসেন্সপ্রাপ্ত সিআইটি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান অথবা নিরাপত্তা প্রহরীসহ উপযুক্ত নিরাপদ পরিবহনব্যবস্থা ব্যবহার করতে হবে। দিনের শেষ সময়ে বৈদেশিক মুদ্রা জমা দেওয়ার সুবিধা নিশ্চিত করতে এডি ব্যাংকগুলোকে নিরাপদ কাউন্টার ও অস্থায়ী ভল্টের ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দেশনা অনুযায়ী, মানি চেঞ্জাররা তাঁদের অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে চেক অথবা উত্তোলন স্লিপ ব্যবহার করে এসব হিসাব থেকে অর্থ তুলতে পারবেন। তবে কোনো অবস্থাতেই জমা স্থিতির চেয়ে বেশি অর্থ উত্তোলন করা যাবে না। এসব হিসাবে ওভারড্রাফট বা ঋণসুবিধাও দেওয়া যাবে না। এ ছাড়া কাস্টডিয়াল হিসাব ব্যবহার করে অর্থ স্থানান্তর, রেমিট্যান্স পাঠানো কিংবা তৃতীয় পক্ষের অনুকূলে কোনো ধরনের লেনদেন করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হিসাবের সব কার্যক্রম বৈদেশিক মুদ্রার নোটের মাধ্যমেই সম্পন্ন করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তের ফলে লাইসেন্সপ্রাপ্ত মানি চেঞ্জারদের হাতে থাকা নগদ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যাংকে নিরাপদে রাখার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে নগদ অর্থ বহন ও সংরক্ষণের ঝুঁকি কমার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনে স্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা প্রতিপালন আরও জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।