বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে আবারও আবেদন করেছেন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম। নিজের, স্ত্রী ফারজানা পারভীন এবং দুই ছেলে আশরাফুল আলম ও আসাদুল আলম মাহিরের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদন করেছেন তিনি। বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ আবেদন করা হয়।
তবে চলমান আইনি ও আর্থিক জটিলতার কারণে সরকার আপাতত সাইফুল আলম (এস আলম) পরিবারের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদন মঞ্জুর করতে চাইছে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন মঞ্জুর করা হলে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা, দেশে থাকা সম্পদ ও সম্পত্তির ওপর ব্যবস্থা নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সালিসি মামলায় বাংলাদেশের আইনি অবস্থান—সব ক্ষেত্রেই জটিলতা তৈরি হতে পারে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এস আলমের আবেদন পর্যালোচনা করে সরকার প্রাথমিকভাবে দুটি বড় ঝুঁকি দেখছে। প্রথমত, তাঁর বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, সাইফুল আলম নিজের সম্পদ সুরক্ষার দাবি তুলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে মামলা করেছেন। নাগরিকত্বের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান শক্তিশালী হলে ওই মামলায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হতে পারে বলে সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
এর আগে ২০২০ সালেও বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদন করেছিলেন এস আলম গ্রুপের কর্ণধার। ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ইসলামী ব্যাংক গত বছরের নভেম্বরে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে। ফলে তাঁর নাগরিকত্বের প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে এস আলমের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। সেই সূত্রে ব্যাংক দখল, ঋণ অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে। তিনি ও তাঁর পরিবার বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন।
এস আলমের সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, তাঁর আবেদন নিয়ে সাতটি সংস্থার মতামত চাওয়া হয়েছে এবং প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
এদিকে গত অক্টোবরে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মামলা করেন সাইফুল আলম। সরকার ওই মামলায় দেশের পক্ষে লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আইনজীবীদের মতে, নাগরিকত্ব ত্যাগের এই আবেদন চলমান মামলাগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে—এ কারণেই সরকার এখন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
বর্তমানে তাঁর নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরকালে তাঁর সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় শ্রম অভিবাসন প্রসঙ্গটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আলোচনায় আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ, দ্রুত শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ, অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং আটক বাংলাদেশিদের সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের বিষয় উঠে এসেছে। উভয় পক্ষই একমত হয়েছে যে শ্রমিক নিয়োগপ্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও কম ব্যয়বহুল, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমে এবং শ্রমিকেরা প্রকৃত সুবিধা পান। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে শ্রমিক নিয়োগব্যবস্থাকে ঘিরে শোষণ, অস্বচ্ছতা ও মানবিক উদ্বেগের বিষয়গুলো বাস্তব এবং এগুলো মোকাবিলায় দুই দেশকেই সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। বৈঠকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল হলো বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত করতে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক আয়োজন এবং একটি নতুন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) প্রণয়নের সিদ্ধান্ত। তবে এ অগ্রগতি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ঘোষণাগুলো বাস্তবে শ্রমিকবান্ধব সংস্কারে রূপ নেয় কি না, তার ওপর। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু নতুন শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ নিয়ে উচ্ছ্বসিত হব, নাকি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি ন্যায়সংগত ও টেকসই শ্রম অভিবাসনকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করব? কারণ, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস কেবল সাফল্যের নয়; এটি অনিয়ম, শোষণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের প্রভাবের ইতিহাসও। অতিরঞ্জিত প্রত্যাশার আড়ালে অস্বস্তিকর বাস্তবতা প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের আগে দেশের গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ (কিছু সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল ও অনলাইন পোর্টাল) ধারণা তৈরি করেছিল যে এ সফরের মূল অর্জন হবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত আবার উন্মুক্ত হওয়া। একাধিক প্রতিবেদনে বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। একই সময়ে কিছু দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার বক্তব্যও সেই প্রত্যাশাকে আরও বাড়িয়ে দেয়, যেখানে ইঙ্গিত ছিল যে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে এবং শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি। ফলে শ্রমিক, পরিবার ও সংশ্লিষ্ট মহলে অতিরিক্ত আশাবাদ তৈরি হয়। কিন্তু বাস্তবে সফরের প্রধান ফল ছিল তাৎক্ষণিক বাজার উন্মুক্তকরণ নয়; বরং শ্রম অভিবাসনব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও টেকসই করার বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্য। এখানেই গণমাধ্যম ও সরকারি যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। উচ্ছ্বাসের কেন্দ্রে বাজার খোলার সম্ভাবনা থাকলেও শ্রম অভিবাসনের কাঠামোগত সমস্যা, অর্থাৎ সিন্ডিকেট, অস্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা ও উচ্চ ব্যয় প্রায় অনুপস্থিত ছিল। খুব কমই আলোচিত হয়েছে অতীতে কেন মালয়েশিয়া বারবার নিয়োগ স্থগিত করেছে বা কেন বহু শ্রমিক উচ্চ ব্যয় সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত কাজ ও সুরক্ষা পাননি। জনপরিসরে প্রশ্ন ছিল ‘বাজার খুলছে কি না’, অথচ গুরুত্বপূর্ণ ছিল—কী ধরনের বাজার, কোন শর্তে, কত ব্যয়ে এবং কতটা স্বচ্ছতায় তা খুলছে। এসব প্রশ্ন উপেক্ষা করে কেবল বাজার উন্মুক্তকরণকে সাফল্য হিসেবে দেখানো নীতিগতভাবে বিভ্রান্তিকর। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রম অভিবাসনের ইতিহাস এক সফরে সমাধানযোগ্য নয়। গত এক দশকে এই বাজার বারবার বন্ধ বা স্থগিত হয়েছে, আবার সীমিত এজেন্সি নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেট অভিযোগও উঠেছে। অনেক শ্রমিক কয়েক লাখ টাকা খরচ করে গিয়ে প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি, কম মজুরিতে কাজ করেছেন, অনিয়মিত হয়েছেন বা অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। দুঃখজনকভাবে গণমাধ্যমের একটি অংশ বাস্তবতাকে আড়াল করে শিরোনামনির্ভর উচ্ছ্বাসকে গুরুত্ব দিয়েছে। একইভাবে কিছু সরকারি বক্তব্যও প্রত্যাশাকে বাস্তবতার চেয়ে বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ দায়িত্বশীল যোগাযোগের কাজ হলো সম্ভাবনার পাশাপাশি শর্ত ও ঝুঁকি স্পষ্ট করা। শ্রমবাজার খোলা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা যদি সংস্কার ও শ্রমিক সুরক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে তা ‘প্রত্যাশার রাজনীতি’কেই শক্তিশালী করে। এ কারণেই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী যখন শ্রমিক শোষণ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তা কেবল কূটনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং কাঠামোগত সমস্যার স্বীকৃতি। প্রকৃতপক্ষে এ সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বাজার খোলা নয়; বরং শ্রম অভিবাসনব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও শ্রমিককেন্দ্রিক করার প্রয়োজনীয়তা। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—কী ধরনের শ্রমবাজার খোলা হচ্ছে এবং সেখানে শ্রমিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে। দালাল চক্রের লাভের হিসাব: শ্রমিকের ভাগ কোথায় মালয়েশিয়ার শ্রম অভিবাসনে সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন হলো—এ ব্যবস্থার প্রকৃত সুবিধাভোগী কে, শ্রমিক নাকি মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠী? গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া নিয়োগব্যবস্থাকে ঘিরে ‘সিন্ডিকেট’–বিতর্ক স্পষ্ট করেছে যে শ্রম অভিবাসন কেবল শ্রমবাজার নয়; বরং একটি উচ্চ মূল্যের নিয়ন্ত্রিত ব্যবসা। নিয়োগ সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হলে প্রতিযোগিতা কমে, ব্যয় বেড়ে যায় এবং স্বচ্ছতার জায়গা সংকুচিত হয়। তখন বাজার পরিচালিত হয় নীতি বা স্বচ্ছতার বদলে প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে, যেখানে শ্রমিকের স্বার্থ নয়, বাণিজ্যিক লাভই মুখ্য হয়ে ওঠে। এর ফলে শ্রমিক ক্রমে পণ্যসদৃশ হয়ে পড়েন, বিদেশে যেতে একজন শ্রমিককে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়, অনেক সময় ঋণ নিতে হয়। সেই ঋণের চাপেই তাঁর প্রথম কয়েক বছর কেটে যায় কেবল ঋণ পরিশোধে; সঞ্চয় বা উন্নয়নের সুযোগ কমে যায় এবং অভিবাসনের প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফলও হ্রাস পায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে নতুন এমওইউ বা সমঝোতা স্মারকের মূল পরীক্ষা হবে নিয়োগব্যবস্থাকে কতটা উন্মুক্ত, প্রতিযোগিতামূলক ও ডিজিটাল করা যায়, তার ওপর। স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে শ্রমবাজার খুললেও পুরোনো কাঠামোই ফিরে আসবে—সুফল শ্রমিকের কাছে না গিয়ে আবারও সীমিত কিছু মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হবে আর শোষণের চক্র অপরিবর্তিত থাকবে। শুধু শ্রমিক পাঠানো নয়, শ্রমিক সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি শ্রমিকদের শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখেননি; বরং তাঁদের মানবিক মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। বাংলাদেশে অভিবাসননীতির আলোচনায় শ্রমিকদের প্রায়ই ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলা হয়। কিন্তু তাঁদের অধিকারের প্রশ্নটি যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। অথচ আধুনিক শ্রম অভিবাসনের মূলনীতি হওয়া উচিত ‘রাইটস-বেজড মাইগ্রেশন’, অর্থাৎ অধিকারভিত্তিক অভিবাসন। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রবণতা দেখা যায়—কতজন শ্রমিক বিদেশে গেলেন, কত রেমিট্যান্স এল, এসব সূচককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, আইনি সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়। যেকোনো নতুন শ্রমচুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত শ্রমিকের অধিকার। চুক্তিতে ন্যূনতম মজুরি, কর্মঘণ্টা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, পাসপোর্ট জব্দ নিষিদ্ধকরণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের জন্য আইনি সহায়তা ও কনস্যুলার সেবা জোরদার করা জরুরি। মালয়েশিয়ার সঙ্গে নতুন চুক্তিতে ন্যূনতম মজুরি, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, নিরাপদ আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য রোধ এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি দূতাবাস ও শ্রম উইংয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে শ্রমিকেরা বাস্তব সহায়তা পান। অনিয়মিত শ্রমিক: সমস্যা নয়, নীতিগত ব্যর্থতার লক্ষণ বৈঠকে অনিয়মিত বাংলাদেশি শ্রমিকদের বৈধকরণের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিষয়টিকে শুধু মানবিক ইস্যু হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি আসলে বিদ্যমান শ্রম অভিবাসনব্যবস্থার দুর্বলতার একটি প্রতিফলন। যখন একজন শ্রমিক বৈধ পথে বিদেশে গিয়ে পরবর্তী সময়ে অনিয়মিত হয়ে পড়েন, তখন এর পেছনে প্রায়ই নিয়োগব্যবস্থার ত্রুটি, তথ্যের ঘাটতি, চুক্তি লঙ্ঘন বা কর্মসংস্থানের সংকট কাজ করে। ফলে অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ প্রয়োজনীয় হলেও এটি সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। মালয়েশিয়ায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী বিভিন্ন কারণে অনিয়মিত অবস্থানে চলে গেছেন। কেউ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও থেকে গেছেন, কেউ নিয়োগকর্তার প্রতারণার শিকার হয়েছেন, আবার কেউ চাকরি হারিয়ে অনিশ্চিত অবস্থায় পড়েছেন। এই শ্রমিকদের একটি বড় অংশ দেশটির অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। তাই বৈধকরণ কর্মসূচি শুধু মানবিক উদ্যোগ নয়; এটি অর্থনৈতিকভাবেও যুক্তিসংগত। বৈধ মর্যাদা পেলে শ্রমিকেরা আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ হতে পারবেন, কর দিতে পারবেন এবং শোষণের ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশও নিয়মিত রেমিট্যান্সপ্রবাহের সুবিধা পাবে। তবে বৈধকরণকে এককালীন সমাধান হিসেবে দেখলে চলবে না। ভবিষ্যতে নতুন অনিয়মিত শ্রমিক তৈরি হওয়া ঠেকাতে নিয়োগব্যবস্থার ত্রুটি দূর করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। প্রকৃত সমাধান হলো এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে শ্রমিকের কর্মপরিস্থিতি, চুক্তির বাস্তবায়ন এবং নিয়োগকর্তার জবাবদিহি নিশ্চিত থাকবে। অন্যথায় বৈধকরণ কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর আবারও একই সমস্যা তৈরি হবে। দক্ষতা উন্নয়ন ছাড়া শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ নেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের শ্রমিকদের বড় অংশ এখনো অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ খাতে নিয়োজিত। এর ফলে তাঁদের আয় সীমিত থাকে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অবস্থানও দুর্বল হয়। অন্যদিকে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, নির্মাণ, সেবা ও আধুনিক উৎপাদন খাতে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছে। মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশ এখন প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, আধুনিক উৎপাদন ও বিশেষায়িত সেবা খাতে দক্ষ জনশক্তি খুঁজছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকে শ্রম অভিবাসনের কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হবে। শুধু বেশি শ্রমিক পাঠানো নয়; বরং বেশি দক্ষ শ্রমিক পাঠানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সুতরাং নতুন শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার সুযোগকে শুধু সংখ্যাগত বৃদ্ধির মাধ্যমে মূল্যায়ন করা উচিত নয়। বাংলাদেশকে কারিগরি প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একজন দক্ষ কর্মী শুধু বেশি আয় করেন না; তিনি কম ঝুঁকিতে থাকেন এবং দেশের জন্যও বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে সক্ষম হন। তাই দক্ষতা উন্নয়নকে অভিবাসননীতির কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে দেখতে হবে। নতুন এমওইউ: কাগজের চুক্তি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সুযোগ বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে নতুন এমওইউর আলোচনা ইতিবাচক হলেও অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, কাগজে চুক্তি থাকলেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না, বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ। তাই মালয়েশিয়ার সঙ্গে নতুন চুক্তিতে নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা, নিয়োগ ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ, যৌথ মনিটরিং ব্যবস্থা এবং স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি কাঠামো বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ, শ্রম অধিকার সংগঠন ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে পুরো ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এমওইউকে কেবল প্রশাসনিক দলিল নয়; বরং শ্রম অভিবাসনব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের সুযোগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। এর সাফল্য শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যায় নয়; বরং শ্রমিকের নিরাপত্তা, ব্যয় হ্রাস ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সক্ষমতায় নির্ধারিত হবে। সবশেষে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যাভিত্তিক সাফল্যের ধারণা থেকে সরে শ্রমিক সুরক্ষাকেন্দ্রিক নীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরের আলোচনায় স্বচ্ছতা, বৈধকরণ ও শ্রমিক সুরক্ষার বিষয় উঠে আসা ইতিবাচক সংকেত হলেও এগুলো বাস্তব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপ না নিলে অগ্রগতি টেকসই হবে না। নতুন এমওইউ যদি নিয়োগব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করে, দালালতন্ত্র কমায়, শ্রমিকের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে এবং অধিকার ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করে, তবে তা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে; অন্যথায় অতীতের ব্যর্থতাই নতুন রূপে ফিরে আসবে।
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় রেললাইন পার হওয়ার সময় ট্রেনের ধাক্কায় এক নারী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও এক নারী গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। শনিবার (২৭ জুন) দুপুর ১টার দিকে পৌর সদরের বাহুলী শ্রীমাই ব্রিজসংলগ্ন রেলপথে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত নুর নাহার (৫৫) কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার বাসিন্দা। আহত রাশেদা বেগমের (৬৫) বাড়িও একই উপজেলায়। চিকিৎসকদের মতে, তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বাহুলী এলাকার একটি কৃষিজমিতে দিনমজুর হিসেবে কাজ শেষে দুপুরের খাবারের জন্য রেললাইন পার হচ্ছিলেন দুই নারী। এ সময় কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামগামী দ্রুতগতির প্রবাল এক্সপ্রেস ট্রেন তাদের ধাক্কা দেয়। দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা দ্রুত দুজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই নুর নাহারের মৃত্যু হয়। আহত রাশেদাকে প্রথমে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পটিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) যুযুৎসু যশ চাকমা জানান, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি দুর্ঘটনা বলেই ধারণা করা হচ্ছে। মরদেহ উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশের সাথে চার হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্তে ভারত তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। কাঁটাতারের বেড়া বসানোসহ নানা ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন রয়েছে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে। ভারতের সাথে বাংলাদেশের এই সীমান্তের বিভিন্ন জায়গায় বছরের পর বছর ধরে চোরাচালান, মানবপাচারের মতো অপরাধের নানা ইস্যু নিয়ে আলোচনায় আছে। সীমান্তে বিভিন্ন সময় মানুষ হত্যাও বাংলাদেশের দিক থেকে বড় উদ্বেগের বিষয়। এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের পক্ষ থেকে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে 'পুশইন' করা বা লোক ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে সীমান্তে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। ভারত তাদের সীমান্তের বড় অংশেই কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে। সেইসাথে, তারা সেখানে ফ্লাডলাইট, আধুনিক নজরদারি ক্যামেরা, এমনকি সীমান্ত ঘেঁষা সড়কও নির্মাণ করেছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশের নজরদারি ব্যবস্থা খুবই এখনো অপ্রতুল। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি'র বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সাথে এ প্রসঙ্গে কথা বলে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা মূলত আজও বিজিবির টহল ও স্থানীয় জনগণের সতর্কতার ওপর নির্ভরশীল। তবে পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন কি না এবং এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না, তা নিয়ে কৌতুহল রয়েছে। সীমান্ত পাহারায় বাংলাদেশের ভরসা কী? বাংলাদেশের সীমান্ত পাহারার দায়িত্ব পালন করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), যা আগে বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) নামে পরিচিত ছিল। বিজিবি'র বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশের সীমান্তজুড়ে বর্ডার আউটপোস্ট (বিওপি), পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও নিয়মিত টহলের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। সীমান্তের নদীবেষ্টিত এলাকাগুলোয় জলপথেও টহল পরিচালনা করা হয়। এদিকে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের উল্লেখযোগ্য অংশ নদী, চর, পাহাড় ও বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে গেছে। ফলে সব এলাকায় একই ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি এখনো। জাতীয় নিরাপত্তা ও অপারেশনাল কারণে নজরদারি সরঞ্জামের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ না করলেও বিজিবি সদর দপ্তর জানিয়েছে, সীমান্তে সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য ওয়াচ টাওয়ার, পর্যবেক্ষণ পোস্ট, সিসিটিভি ক্যামেরাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে, যশোর, সাতক্ষীরা, জয়পুরহাট ও টেকনাফ সীমান্তে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য আধুনিক বর্ডার সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম (বিএসএস) স্থাপন করা হয়েছে। বিএসএস হলো সীমান্তে সন্দেহজনক চলাচল বা কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের জন্য ক্যামেরা, সেন্সর ও অন্যান্য নজরদারি প্রযুক্তির সমন্বয়ে গঠিত একটি আধুনিক ব্যবস্থা। এছাড়া, কক্সবাজার অঞ্চলের টেকনাফ, রামু, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় থার্মাল ইমেজিং সিস্টেম ব্যবহারের মাধ্যমে দিন-রাত নজরদারির ব্যবস্থা রয়েছে। থার্মাল ইমেজিং সিস্টেম এমন একটি প্রযুক্তি, যা মানুষ, প্রাণী বা বস্তুর শরীর থেকে নির্গত তাপ শনাক্ত করে অন্ধকার, কুয়াশা বা কম আলোতেও তাদের উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে। সীমান্ত নিরাপত্তায় ঘাটতি কোথায় সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার নানা ধরনের ঘাটতির কথাও জানিয়েছেন বিজিবি কর্মকর্তারা। বিশেষ করে, সীমান্ত লাগোয়া সড়কের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন তারা। বিজিবির এক কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, এখনো তারা অনেক পুরোনো কায়দায় পায়ে হেঁটে বর্ডার পাহারা দেন, কারণ সীমান্ত এলাকায় বলতে গেলে কোনো সড়কই নেই। যদি বর্ডার রোড থাকতো, তাহলে হয়তো মোটরসাইকেল বা গাড়ি করে ডিউটি করতে পারতাম আমরা। এমনকি, বিএসএফও কিন্তু পায়ে হেঁটে ডিউটি করে না," বলছিলেন তিনি। তবে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের অংশ হিসেবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সীমান্ত সড়ক নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটি রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান এই তিন পার্বত্য জেলায় চলমান রয়েছে, যার দৈর্ঘ্য এক হাজার ৩৬ কিলোমিটার। এর বাইরে ফ্লাডলাইট, সিসি ক্যামেরা ইত্যাদিরও অপ্রতুলতা রয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা। ওপাড়ে কাঁটাতার, ফ্লাডলাইট আছে। ওরাই দেখে, আমরা কিছু দেখতে পারি না। যেসব এলাকা চোরাচালান প্রবণ, সেগুলোতে অল্প কিছু ক্যামেরা আছে। ওদের (ভারতের বিএসএফ) তুলনায় কিছু নাই। ওদের ১০টা ক্যামেরা থাকলে বিজিবির আছে দুইটা," বিজিবির এক কর্মকর্তা জানান বিবিসি বাংলাকে। আরেক বিজিবি কর্মকর্তা জানান, "বিজিবির যে পোস্টগুলো আছে, সেখানে ফ্লাডলাইট আছে। এর বাইরে যেগুলো স্পর্শকাতর জায়গা, সেসব জায়গায় আছে। অন্য জায়গায় নাই।" প্রযুক্তির ঘাটতি যেসব চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে এক সময়ের বিডিআর এবং বর্তমানের বিজিবি, দু'টো সংস্থাতেই কর্মরত ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান। তিনি ২০১৮ সালে অবসরে যান। সাবেক এই বিজিবি কর্মকর্তা তার অভিজ্ঞতা থেকে বলছিলেন, "আমি ভারতের সঙ্গে সীমান্তের উত্তর অংশের প্রায় পুরোটা হয় পায়ে হেঁটে গিয়েছি বা নৌকায় গিয়েছি বা গাড়িতে গিয়েছি।" আমাদের সময়ে মানুষনির্ভর প্যাট্রলিং ছিল, আর সরঞ্জাম বলতে ছিল বাইনোকুলার। মুভমেন্ট ডিটেকশনের জন্য এখন অনেক আধুনিক ইলেকট্রনিক প্রযুক্তি বের হয়েছে। উন্নত দেশগুলো সেগুলো তাদের বর্ডারে রাখে, তবে আমরা করতে পারিনি। অথচ এগুলো জরুরি।" কারণ, সীমান্ত সড়ক থাকলে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সহজে যাওয়া যায় এবং তখন চোরাচালান, মাদকপাচার বা মানবপাচার, সবকিছু সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এছাড়া, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করাটা এখন সময়ের দাবি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সীমান্ত সড়ক প্রসঙ্গে বিজিবি'র অবসরপ্রাপ্ত আরেক কর্মকর্তা ডেল এইচ খানও বলছিলেন যে, সীমান্তের কয়েকশো কিলোমিটার বাদে বাকি অংশজুড়েই কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে ভারত। নিজেদের সুবিধার জন্য সেই বেড়ার পাশ দিয়ে তারা রাস্তা নির্মাণ করেছে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের লাইটিং, ক্যামেরা বসিয়েছে। কাঁটাতারের বেড়ায় গেটও তৈরি করেছে। কিন্তু বিজিবির সম্পদ ও অবকাঠামো সীমিত, এখনো তাদের প্রচলিত পদ্ধতিতে সীমান্ত পাহারা দিতে হয়। বর্ডার আউটপোস্ট (বিওপি) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি থেকে আরেকটি বিওপি প্রায় পাঁচ থেকে সাত কিলোমিটারের দূরে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেও দুই বিওপির মাঝে সড়কসংযোগ নেই। ফলে বিজিবি সদস্যদের পায়ে হেঁটে টহল দিতে হয়। "পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় যতটুকু সে দেখতে পাচ্ছে, ততটুকুই তার ইনফরমেশন। এখানে সমস্যা হলো, পায়ে হেঁটে টহল দেওয়ার সময় এই পাঁচ থেকে সাত কিলোমিটারের সব পয়েন্টে একই সময় উপস্থিত থাকা সম্ভব হয় না। অনেক সময় টহল দল একটি নির্দিষ্ট অংশ অতিক্রম করার পরই গরু পাচার বা মানুষকে সীমান্ত পেরিয়ে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটে," বলেন মি. খান। দরকার স্মার্ট পরিকল্পনা সীমান্তে মাদক, অস্ত্র, স্বর্ণ, মানবপাচারসহ বিভিন্ন আন্তঃসীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে মতো ঘটনা প্রতিরোধে শুধু জনবল নয়, প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি ও কৌশলগত পরিকল্পনাও। মি. রহমান বলছিলেন, "এই ধরনের ঘটনা প্রতিহত করতে "মুভমেন্ট ট্র্যাক করতে হবে, সেটা হোক ব্যক্তির বা বস্তুর। "মুভমেন্ট না থাকলে আপনার বর্ডার সিকিউরড। আর মুভমেন্ট শনাক্ত করার জন্য ড্রোন, লং ডিসট্যান্স ক্যামেরা, ইনফ্রারেড ক্যামেরা, গ্রাউন্ড সার্ভেইল্যান্স রাডারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি রয়েছে। তবে কোন প্রযুক্তি কোন জায়গায় লাগবে, তা গ্রাউন্ড রিয়েলিটি বলে দেবে"। অর্থাৎ, যেখানে দৃষ্টিসীমা খোলা ও পরিষ্কার, সেখানে এক ধরনের নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকর হবে। যেমন, নদী। অন্যদিকে বনাঞ্চল, পাহাড় বা দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হয়, এমন এলাকায় ড্রোন, সেন্সর বা অন্যান্য বিশেষায়িত প্রযুক্তি ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে। একই বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত বিজিবি কর্মকর্তা ডেল এইচ খান বলেন, বান্দরবানের এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ের দূরত্ব দেখে কম মনে হলেও একটি থেকে আরেকটিতে যেতে চার ঘণ্টা বা তারও বেশি লেগে যায়। ফলে সব এলাকায় একই ধরনের নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকর নয়। পুশইনের মতো ঘটনা প্রতিহত করতে ধারাবাহিক নজরদারি (কন্টিনিউয়াস সার্ভেইল্যান্স) প্রয়োজন এবং এটি করার জন্য বিজিবির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ভারত যদি তাদের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করে কাউকে সীমান্ত দিয়ে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করে, তাহলে "পুরো প্রক্রিয়ার প্রমাণ সংরক্ষণ করাটা তো জরুরি। সেক্ষেত্রে বিজিবির কাছে তো পর্যাপ্ত ভিডিও ফুটেজ ধারনের ব্যবস্থা থাকা উচিত এবং কাদের সীমান্ত দিয়ে পাঠানো হচ্ছে, তাদের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে নথিভুক্ত করার সক্ষমতা থাকা উচিত," বলেন ডেল এইচ খান। তবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি কৌশলগতভাবেও বিজিবিকে এগোতে হবে। প্রয়োজনে জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে স্যাটেলাইট চিত্র সংগ্রহ করে ঘটনাগুলোর তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে বলে মত তার। এছাড়া, ভারতের সম্ভাব্য হোল্ডিং ক্যাম্প বা লোকজনকে জড়ো করার স্থানগুলোর সম্পর্কে আগাম তথ্য থাকলে সীমান্তমুখী চলাচল আগে থেকেই নজরদারিতে আনা সহজ হবে। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু সীমান্তরক্ষী বাহিনী নয়, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, আইন ও তথ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও জানান তিনি। সরকারের পরিকল্পনা কী? বাংলাদেশের দিক থেকে এখন পর্যন্ত সীমান্তে কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেছেন, আন্তঃসীমান্ত বিভিন্ন অপরাধ দমনের লক্ষ্যে মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হবে। ভারতের সাথে সীমান্তের বিভিন্ন স্থানেও কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম বিবেচনাধীন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন জানান, সীমান্ত এলাকায় সব ধরনের অপরাধ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ (আইস), ফেনসিডিলসহ সব ধরনের মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রবেশ বন্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি অনুসরণ করছে বিজিবি। সেইসাথে, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির মাধ্যমে সীমান্ত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। এছাড়া, দুর্গম ও স্পর্শকাতর সীমান্ত এলাকাগুলোতে নতুন বিওপি ও টিওবি নির্মাণ করা হয়েছে এবং আরো নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে করে বিজিবির বিওপিসমূহের মধ্যবর্তী দূরত্ব কমিয়ে আনা এবং টহলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে বলেও জানান তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন। সেগুলো হলো: দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের অতি সংবেদনশীল এলাকায় ইতোমধ্যে 'স্মার্ট বর্ডার সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম' স্থাপন করা হয়েছে। দুর্গম পার্বত্য সীমান্তে সীমান্ত সড়ক নির্মাণের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে, যার ফলে বিজিবির টহল দল অত্যন্ত দ্রুততার সাথে যেকোনো সীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে সক্ষম হচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় বসবাসরতদের চোরাচালান ও অপরাধের কুফল সম্পর্কে সচেতন করতে এবং অপরাধীদের তথ্য দিয়ে বিজিবিকে সহায়তার জন্য নিয়মিত 'জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম' পরিচালনা করা হচ্ছে। গত ২৬শে এপ্রিল বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে দ্বিতীয় পর্যায়ের সীমান্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি - একনেক, যার মোট অনুমোদিত প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে তিন হাজার ৬৬৬ কোটি ৩৬ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। সীমান্ত সড়ক নির্মাণের কাজ শেষ হয়ে এলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বাংলাদেশ অংশে কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন প্রসঙ্গে সাবেক বিজিবি কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "কাঁটাতারের বেড়া একটা থাকলেই হয়। আর এখানে অনেক অর্থ বিনিয়োগের বিষয় আছে"। সেইসাথে, কাঁটাতারের বেড়া দিলে সীমান্ত রেখা থেকে ১৫০ গজ ভেতরে দিতে হবে। কিন্তু ওই যে ১৫০ গজ জায়গা মাঝখানে থেকে গেল, ওটা ম্যানেজ করার জন্য নতুন সিস্টেম দাঁড় করাতে হবে। কারণ কৃষক তো সেখানে যাবেই চাষাবাদ করার জন্য। তাকে সেই অ্যাক্সেস দিতে হবে।