দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে আজ টোকিওতে বাংলাদেশ ও জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি’ (ইপিএ) স্বাক্ষর করেছে।
ঢাকায় প্রাপ্ত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাংলাদেশ এই প্রথমবারের মত কোনো দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করল।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হোরি ইওয়াও সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে নিজ নিজ সরকারের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান, জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী, বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি ও উভয় দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ে ঢাকা ও টোকিওতে অনুষ্ঠিত সাত দফা নেগোসিয়েশনের ফলই এই চুক্তি।
শেখ বশিরউদ্দীন এই চুক্তিকে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এই ইপিএ চুক্তি কেবল একটি বাণিজ্যিক দলিলই নয়, বরং এটি বাংলাদেশের উজ্জ্বল অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং আমাদের দুই দেশের মধ্যে গভীর পারস্পরিক আস্থার বহিঃপ্রকাশ।
এ সময় তিনি আরও বলেন, এই চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন পারস্পরিক সমৃদ্ধির একটি নতুন অধ্যায় শুরু করবে।
চুক্তিটির অধীনে বাংলাদেশ পণ্য ও সেবা উভয় বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাবে। তৈরি পোশাকসহ প্রায় সাত হাজার ৩৭৯টি বাংলাদেশী পণ্য জাপানের বাজারে ১০০ শতাংশ শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করবে। বিনিময়ে বাংলাদেশও জাপানের জন্য তার বাজার সম্প্রসারিত করছে, ফলে এক হাজার ৩৯টি জাপানি পণ্য পর্যায়ক্রমে শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাবে।
উল্লেখ্য, পোশাক খাতে ‘সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন’ সুবিধা যুক্ত হওয়ায় এখন থেকে কাঁচামাল নিয়ে কোনো জটিল শর্ত ছাড়াই বাংলাদেশী পোশাক খুব সহজেই জাপানে রপ্তানি করা যাবে।
এর পাশাপাশি, জাপানের আইটি, ইঞ্জিনিয়ারিং, শিক্ষা, কেয়ারগিভিং ও নার্সিংয়ের মতো প্রায় ১৬টি বিভাগে ১২০টি সেবা খাতে বাংলাদেশী দক্ষ পেশাজীবীদের কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে, যা দেশের মানুষের জন্য জাপানে অধিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জাপানের জন্য ১২টি বিভাগের আওতায় ৯৮টি উপখাত উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে।
বাণিজ্যের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি, এটি উৎপাদন, অবকাঠামো, জ্বালানি ও লজিস্টিকস প্রভৃতি খাতে জাপানি বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাপানি উন্নত প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ হলে আমাদের দেশীয় পণ্যের মান বৃদ্ধি পাবে, যা বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাপী আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
এছাড়াও, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) বিকাশ ও একটি দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে এই চুক্তি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটাবে এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর চার দিনের ব্যবধানে দেশের ছয় বিতরণ কোম্পানির দৈনিক গ্যাস বিতরণ প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট কমেছে। এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান টার্মিনালটি (এফএসআরইউ) মেরামত করে আবার চালু করতে আরও চার থেকে পাঁচ দিন সময় লাগতে পারে। এতে করে রাজধানীসহ দেশজুড়ে গ্যাসের সংকটের ভোগান্তি আরও কয়েকদিন চলবে। যুক্তরাজ্য, রোমানিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে স্থানীয় কারিগরি দল গত ২১ জুলাই বন্ধ হয়ে যাওয়া ওই টার্মিনাল মেরামতে কাজ করছে। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের স্থাপনাপ্রধান ও উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন শনিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিদেশি বিশেষজ্ঞরা টার্মিনালটি পরীক্ষা করে মেরামতের কাজ শুরু করেছেন। প্রাথমিক হিসাবে কাজ শেষ করতে চার থেকে পাঁচ দিন লাগতে পারে। তবে টার্মিনালের কোন অংশে কী সমস্যা হয়েছে, কী কী যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কাজ কোন পর্যায়ে রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলতে চাননি এই কর্মকর্তা। এদিন তেল ও গ্যাস উৎপাদন ও বিতরণকারী সংস্থা বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে। চলমান মেরামতের কাজ দ্রুত শেষ হওয়ার আশা প্রকাশ করলেও টার্মিনালটি থেকে কবে নাগাদ জাতীয় গ্রিডে আবার গ্যাস সরবরাহ করা শুরু করা যাবে সে বিষয়ে কিছু বলেনি সংস্থাটি। সমুদ্রপথে আনা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি ভাসমান টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে গ্রহণ ও সংরক্ষণ করা হয়। পরে সেটি আবার গ্যাসে রূপান্তর করে পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে পাঠানো হয়। মহেশখালীতে এলএনজি গ্রহণ ও পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরের দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে টার্মিনাল দুটি থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৯৫ কোটি থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়। এর একটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ প্রায় অর্ধেক কমেছে। দেশে এলএনজি গ্রহণের বিকল্প অবকাঠামো না থাকায় দুটি এফএসআরইউর একটিতে সমস্যা দেখা দিলেই পুরো গ্যাস সরবরাহব্যবস্থায় বড় চাপ তৈরি হয়। এর আগেও বেশ কয়েকবার এমন ঘটনা ঘটেছিল। চার দিনে সরবরাহ কমেছে ৪৫ কোটি ঘনফুট পেট্রোবাংলার দৈনিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, টার্মিনালে ত্রুটি দেখা দেওয়ার আগে ১৮ থেকে ২০ জুলাই দেশের ছয় বিতরণ কোম্পানির দৈনিক গ্যাস বিতরণ ছিল মোট ২ হাজার ৫৮৭ থেকে ২ হাজার ৬০৪ দশমিক ৯৮ মিলিয়ন (২৬০ কোটি ৪৯ লাখ) ঘনফুটের মধ্যে। ২০ জুলাই বিতরণ হয়েছিল ২ হাজার ৫৮৭ মিলিয়ন (২৫৮ কোটি ৭০ লাখ) ঘনফুট। পরদিন তা নেমে আসে ২ হাজার ৪২৫ মিলিয়ন ঘনফুটে। পরের দুদিন তা আরও কমে ২৪ জুলাই নেমে আসে ২ হাজার ১৩৫ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ঘনফুটে। এ হিসাবে ২০ থেকে ২৪ জুলাইয়ের মধ্যে দৈনিক গ্যাস বিতরণ কমেছে ৪৫১ দশমিক ৮২ মিলিয়ন বা প্রায় ৪৫ কোটি ১৮ লাখ ঘনফুট। চার দিনের ব্যবধানে বিতরণ কমেছে প্রায় সাড়ে ১৭ শতাংশ। এই সময়ে দেশি গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মোট উৎপাদনে বড় পরিবর্তন হয়নি। সাত দিনের প্রতিবেদনে এসব ক্ষেত্র থেকে উৎপাদন দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৬৪৩ থেকে ১ হাজার ৬৫৩ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে ছিল। ফলে মহেশখালীর টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি দেখা গেছে। কারিগরি ত্রুটিতে ২১ জুলাই ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধের পর সেখান থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার তথ্য দিয়েছিল জ্বালানি বিভাগও। ‘রান্নার চুলাও জ্বলছে না’ তিতাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে রাজধানীর বাসাবাড়ির রান্নাঘরেও। অনেক এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলা জ্বলছে না। গভীর রাতে কিছুটা গ্যাস এলেও তা রান্নার জন্য পর্যাপ্ত নয়। গ্রিন রোডের পেছনে নর্থ রোড এলাকার বাসিন্দা সোনিয়া আক্তার বলেন, তাদের বাসায় দুই দিন ধরে দিনের বেলায় গ্যাস প্রায় ছিলই না। রাত ১১টা বা ১২টার পর কিছুটা গ্যাস এলেও চাপ এত কম ছিল যে রান্না করা যায়নি। তিনি বলেন, ইন্ডাকশন চুলায় কোনোভাবে খাবার রান্নার ব্যবস্থা করলেও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের চাপ তৈরি হচ্ছে। কিছুক্ষণ ইন্ডাকশন চালালে বাসার বিদ্যুৎ সংযোগও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সকালের নাস্তার জন্য আগের রাতে খাবার তৈরি করে রাখতে হচ্ছে। সকালে ওভেনে গরম করে সন্তানদের খাওয়াচ্ছেন। সোনিয়া বলেন, বাচ্চাদের জন্য স্কুলের টিফিন তৈরি করে দেওয়া যাচ্ছে না। বাইরের খাবার প্রতিদিন দিয়েতো গ্যাস হয়ে যাচ্ছে বাচ্চাদের। শনিবার কিছু গ্যাস এলেও চাপ কেবল খাবার গরম করার মত ছিল; রান্নার জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। মিরপুরের সেনপাড়া এলাকার বাসিন্দা লিপি আক্তার বলেন, চার-পাঁচ দিন ধরে তাদের বাসাসহ আশপাশের এলাকায় গ্যাস নেই। পিয়ারিমুন এলাকার সব বাসাবাড়িতেও একই সমস্যা চলছে। মিরপুর ১২ নম্বরের বাসিন্দা শরিফা বেগম গ্যাসের চাপ না থাকায় চুলা ব্যবহার বন্ধ রেখেছেন। কখন গ্যাস আসে আর কখন চলে যায়, তার ঠিক না থাকায় তিন বেলার রান্নার জন্য তাকে ইন্ডাকশন চুলার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ইন্ডাকশন চুলায় রান্না চালানো গেলেও মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল কত আসবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি। গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও শিল্পকারখানাতেও। চাপ কম থাকায় অনেক সিএনজি স্টেশন চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস নিতে পারছে না। কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন স্টেশনের সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। তিতাসে কমেছে ২৭ কোটি ঘনফুট টার্মিনালটি বন্ধ হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির আওতাধীন ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে। পেট্রোবাংলার গ্যাস সরবরাহের তথ্য বিশ্লেষনে দেখা গেছে, ২০ জুলাই তিতাসের মাধ্যমে মোট ১ হাজার ৪৮১ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস বিতরণ হয়েছিল। ২৪ জুলাই তা নেমে আসে ১ হাজার ২১০ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন ঘনফুটে। চার দিনের ব্যবধানে তিতাসের দৈনিক বিতরণ কমেছে ২৭১ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন বা প্রায় ২৭ কোটি ১৫ লাখ ঘনফুট। এ সময়ে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস বিতরণ ৯৩৪ দশমিক ২১ মিলিয়ন থেকে নেমে এসেছে ৭০৬ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ এ খাতে দৈনিক প্রায় ২২ কোটি ৭৪ লাখ ঘনফুট কম গ্যাস গেছে। পেট্রোবাংলার প্রতিবেদনে আবাসিক, বাণিজ্যিক, সিএনজি, চা-বাগান, শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ‘নন-বাল্ক’ গ্রাহক হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ শ্রেণিতে বিতরণ ১ হাজার ৫০৬ দশমিক ৮২ মিলিয়ন থেকে কমে ১ হাজার ৩০৯ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ঘনফুট হয়েছে। অর্থাৎ নন-বাল্ক গ্রাহকরা দৈনিক প্রায় ১৯ কোটি ৭৬ লাখ ঘনফুট কম গ্যাস পেয়েছেন। গ্যাসের ঘাটতি ছিল আগে থেকেই বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি হলেও তিতাসের আওতাধীন এলাকায় এর আগেই দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি ছিল। কোম্পানিটির পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান গত রোববার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, তাদের দৈনিক চাহিদা প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে তখনই সরবরাহ ১৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমেছিল। পেট্রোবাংলার হিসাবেও ২০ জুলাই তিতাসের মোট বিতরণ ছিল প্রায় ১৪৮ কোটি ১৯ লাখ ঘনফুট। টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর তা আরও প্রায় ২৭ কোটি ঘনফুট কমে যায়। সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় ঢাকার অবস্থান শেষের দিকে হওয়ায় রাজধানীতে সংকট তুলনামূলক বেশি বলে তিতাস কর্মকর্তাদের ভাষ্য। এর সঙ্গে পুরোনো ও ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনের ছিদ্র দিয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকে কিছু এলাকায় গ্যাস চলাচল বন্ধ করে দিচ্ছে। তিতাসের কর্মকর্তারা বলছেন, লাইনে গ্যাসের চাপ কমে গেলে পাইপের বাইরের পানি ছিদ্র দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে। দৃশ্যমান ছিদ্রগুলো শনাক্ত করে মেরামত করা গেলেও মাটির নিচে থাকা ছিদ্র খুঁজে বের করতে সময় লাগে। সংশ্লি0ষ্ লাইন থেকে পানি বের না করা পর্যন্ত ওই এলাকার সরবরাহ স্বাভাবিক হয় না। ঢাকার পুরোনো নেটওয়ার্কের একটি বড় অংশ বদলে নতুন লাইন বসানো, জিআইএস ম্যাপিং এবং স্বয়ংক্রিয় তদারকির ব্যবস্থা চালুর একটি প্রকল্প নিয়েছিল তিতাস। তবে ব্যয়, অর্থায়ন ও আর্থিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পরিকল্পনা কমিশন প্রস্তাবটি সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠিয়েছে।
প্লট বরাদ্দের নামে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করে পরবর্তীতে প্লট বুঝিয়ে না দেওয়া এবং গ্রহণকৃত অর্থ ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে বেস্টওয়ে ল্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ম্যানেজিং ডিরেক্টর) মিজানুর রহমান, চেয়ারম্যান তানিয়া সুলতানা তানভী ও পরিচালক মো. মোমেনসহ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ১৭টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। বুধবার (২২ জুলাই) সিআইডি মিডিয়া এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে। সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় এবং উক্ত অর্থ বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের তথ্য পাওয়ায় বনানী থানায় মামলা করা হয়। মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন বেস্টওয়ে ল্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মিজানুর রহমান (৬১), তানিয়া সুলতানা তানভী (৪৯) একই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মো. মোমেন (৬৫)। একই সঙ্গে তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ১৭টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বেস্টওয়ে ল্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেড, বেস্টওয়ে ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড, গ্রেট ওয়াল ল্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেড, বেস্টওয়ে পাওয়ারটেক লিমিটেড, বেস্টওয়ে ফাউন্ডেশন লিমিটেড, বেস্টওয়ে কো-অপারেটিভ কমার্শিয়াল ক্রেডিট লিমিটেড, নভেলটা বেস্টওয়ে ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, বেস্টওয়ে মোটরস লিমিটেড, বেস্টওয়ে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনকিউবেশন লিমিটেড, বেস্টওয়ে ন্যাশনওয়াইড হাউজিং লিমিটেড, এনআরবি টাউন লিমিটেড, বেস্টওয়ে অ্যাগ্রো লিমিটেড, বেস্টওয়ে টাইমস সিটি লিমিটেড, বেস্টওয়ে জেমি ল্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেড, গ্লোবাল কানেক্ট বিডি লিমিটেড, হেরিটেজ হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্টস লিমিটেড এবং বেস্টওয়ে মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন লিমিটেড। সিআইডির অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযুক্তরা ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বেস্টওয়ে ল্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেডের নামে রূপগঞ্জ থানাধীন ভোলাব, তরাইল, বিরাব, মোচারতালুকসহ বিভিন্ন মৌজায় জমি প্লট আকারে কিস্তিতে বিক্রির কথা বলে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্লট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কোম্পানি কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যে তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করা হয়। প্লট পাওয়ার আশায় অনেক গ্রাহক বছরের পর বছর কিস্তি ও বিভিন্ন নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায়, অর্থ গ্রহণের পরও অধিকাংশ গ্রাহককে প্রতিশ্রুত প্লট বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও প্লট না পাওয়া এবং জমা দেওয়া অর্থ ফেরত না পাওয়ায় ভুক্তভোগী গ্রাহকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্লট বরাদ্দের নিশ্চয়তা হিসেবে গ্রাহকদের দেওয়া অর্থের বিপরীতে তাদের শুধুমাত্র জিম্মা, গ্যারান্টি বা সিকিউরিটি হিসেবে সাব-কবলা দলিল প্রদান করা হলেও প্রকৃতপক্ষে প্রতিশ্রুত প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে প্লট না পাওয়া এবং অর্থ ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে কয়েকজন গ্রাহক সিআইডিতে অভিযোগ করেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সিআইডি মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা মোতাবেক দীর্ঘ অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে বেস্টওয়ে ল্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেডের মাধ্যমে প্লট বরাদ্দের নামে অন্তত ৩৭ জন গ্রাহকের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে সর্বমোট ৭ কোটি ২ লাখ ৬৭ হাজার ৬০৪ টাকা গ্রহণ করা হলেও তাদের প্রতিশ্রুত প্লট বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি এবং গ্রহণকৃত অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, প্রতারণার মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে গ্রহণ করা অর্থের একটি বড় অংশ অভিযুক্তদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে জমা, উত্তোলন, স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তর করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত মোট ৮২টি ব্যাংক হিসাবের লেনদেন পর্যালোচনা করে ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা ও উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উক্ত সময়কালে এসব ব্যাংক হিসাবে মোট ৩৫৯ কোটি ২ লাখ ৭১ হাজার ৯৪৫ টাকা ৭২ পয়সা জমা এবং ৩৫৮ কোটি ৫৪ লাখ ৩৭ হাজার ১০২ টাকা ৭৯ পয়সা উত্তোলনের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তর করা হয়েছে। এছাড়া অনুসন্ধানে ২০১০ সালে ১ হাজার ১৮৮টি, ২০১১ সালে ৯৫৩টি, ২০১২ সালে ২৭৪টি, ২০১৩ সালে ১৯৬টি এবং ২০১৪ সালে ১০২টিসহ সর্বমোট ২ হাজার ৭১৩টি জিম্মা, গ্যারান্টি বা সিকিউরিটি হিসেবে প্রদত্ত সাব-কবলা রেজিস্ট্রি দলিলের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব নথিপত্র ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণে প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তর ও রূপান্তরের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায়। সিআইডির প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এবং উক্ত অর্থ বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের তথ্য পাওয়ায় ঘটনাটি মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধনী-২০১৫)-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে প্রতীয়মান হওয়ায় বেস্টওয়ে ল্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট ০৩ ব্যক্তি এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ১৭টি প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট। তদন্তের ধারাবাহিকতায় অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততা, প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের প্রকৃত পরিমাণ, অর্থের উৎস ও গন্তব্য, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর ও রূপান্তরের প্রকৃতি এবং এই ঘটনায় আরও কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত রয়েছে কিনা সে ব্যাপারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতারণার শিকার অন্যান্য গ্রাহকদের শনাক্তকরণ এবং তাদের কাছ থেকে গ্রহণ করা অর্থের পরিমাণ নিরূপণেও তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সিআইডি কোনও আবাসন প্রকল্পে প্লট বা ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, জমির মালিকানা, প্রকল্পের অনুমোদন, ভূমির কাগজপত্র এবং অর্থ লেনদেনের বৈধতা যথাযথভাবে যাচাই করে বিনিয়োগের ব্যাপারে জনগণকে সতর্ক থাকার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। এছাড়া কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রলোভনে পড়ে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়া অর্থ প্রদান না করার জন্যও সকলের প্রতি অনুরোধ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতারণা, অবৈধ অর্থ লেনদেন বা মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত কোনো তথ্য জানা থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করার আহ্বান জানিয়েছে সিআইডি।
জ্বালানি সংকট, দুর্বল রপ্তানি চাহিদা ও উচ্চ ব্যাংক ঋণের খরচের চাপে ধুঁকছে দেশের শিল্প খাত। ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে উৎপাদন কমেছে কারখানাগুলোতে। ২০২০ সালের করোনাকালের পর দেশে শিল্প উৎপাদনে এমন বড় পতন এ প্রথম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সোমবার প্রকাশিত সাময়িক উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ কমেছে। অথচ এক বছর আগে একই সময়ে এ খাতে ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। ডেইলি স্টার এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করে, ২০২০ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশব্যাপী কোভিড লকডাউনের সময় উৎপাদন ১৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ কমে গিয়েছিল। এরপর সাম্প্রতিক এ সংকোচনের আগ পর্যন্ত পরবর্তী প্রান্তিকগুলোতে প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ছিল। অর্থনীতিবিদরা সাম্প্রতিক এ পতনের জন্য দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তাকে দায়ী করেছেন, যা ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে নিরুৎসাহিত করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. দ্বীন ইসলাম বলেন, এ সংকোচন কোনো সাময়িক পতন নয়, বরং এটি আমাদের অর্থনীতির গভীরে প্রোথিত কাঠামোগত দুর্বলতাকেই প্রতিফলিত করে। শিল্পের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির হার একটি স্পষ্ট সংকেত যে সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতার কারণে উৎপাদন ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাতের উৎপাদন কমে যাওয়ার বিষয়টি সম্ভবত রপ্তানি কমার সঙ্গে সম্পর্কিত। শিল্প খাতের এ মন্দার প্রভাবে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ২ দশমিক ২২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি আগের বছরের ৪ দশমিক ৬১ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ৭৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে সেবা খাত, যা জিডিপির অর্ধেকেরও বেশি—সেটির প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে দ্রুত কমে ৩ দশমিক ৫২ শতাংশ হয়েছে। এটি মূলত পুরো অর্থনীতির সর্বব্যাপী দুর্বল চিত্রকেই ফুটিয়ে তুলছে। অধ্যাপক দ্বীন ইসলাম মনে করেন, সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ ও বাজেট সুবিধা উদ্যোক্তাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে এসব উদ্যোগের যথাযথ বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় পরিপূরক সংস্কারের ওপর। ভর্তুকিযুক্ত ঋণ দেওয়া জরুরি, তবে তা যথেষ্ট নয়। জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা না থাকলে উৎপাদনকারীরা উৎপাদন বাড়াতে পারবেন না। আসল চ্যালেঞ্জ হলো আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং একটি স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’ পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচন একটি ‘ধীরে চলো’ বা পর্যবেক্ষণমূলক পরিবেশ তৈরি করেছিল, যা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত স্থগিত করতে বাধ্য করে। বিনিয়োগকারীরা যখন নীতিমালার বিষয়ে নিশ্চিত থাকতে পারেন না, তখন স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যায় এবং প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে তার প্রতিফলন ঘটে।’ এর আগে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০২৬ অর্থবছরের জন্য দেশের সাময়িক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল, যা আগের অর্থবছরের ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশের চেয়ে কিছুটা বেশি। বহুজাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে মিশ্র পূর্বাভাস দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক তাদের ২০২৬ সালের জুনের ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস’ প্রতিবেদনে দীর্ঘ সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হওয়ার আভাস দিয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) শিল্প খাতের মন্থর গতি এবং অব্যাহত অনিশ্চয়তার কারণে তাদের পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ করেছে।