ডিজিটাল বিজনেস আইডেনটিটি (ডিবিআইডি) নিবন্ধন ছাড়া ফেসবুক, ইউটিউব ও গুগলের মতো কোনো বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে অনলাইনে নতুন কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারবে না। একই সঙ্গে বিদেশি কোনো ডিজিটাল বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে পণ্য বা সেবা বিক্রি করতে চাইলে তাদের বাধ্যতামূলকভাবে ডিবিআইডি নিবন্ধন নিতে হবে এবং দেশের প্রচলিত ভ্যাট, আয়কর ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইন কঠোরভাবে মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে।
এমন বেশ কিছু বিধান রেখে ‘ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা, ২০২৬’-এর পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খসড়ার ওপর আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও সাধারণ মানুষের সুনির্দিষ্ট মতামত আহ্বান করা হয়েছে। মতামত পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত খসড়া আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন দাপ্তরিক কর্মকর্তারা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, দেশে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজার দিন দিন অত্যন্ত দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও এ খাতে একটি নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনামূলক ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় সরকার নিয়মিত বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সে কারণেই একটি সমন্বিত ও যুগোপযোগী নীতিমালার খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। অংশীজনদের গঠনমূলক মতামত পর্যালোচনা করেই এটি চূড়ান্ত করা হবে।
উল্লেখ্য, কয়েক বছর আগে মেটা, গুগল, অ্যামাজন ও নেটফ্লিক্সের মতো আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পরাশক্তিগুলো বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ভ্যাট নিবন্ধন গ্রহণ করে প্রতিনিধি বা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের ভ্যাট রিটার্ন দাখিল ও কর পরিশোধের প্রক্রিয়া শুরু করে।
প্রকাশিত খসড়া নীতিমালায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে যেকোনো প্রকার বাণিজ্য পরিচালনা করার আগে বিদেশি ডিজিটাল বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল বিজনেস আইডেনটিটি (ডিবিআইডি) নিবন্ধন নিতে হবে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনলাইনে খুচরা বিক্রি বা কোনো ধরনের ডিজিটাল বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে এ প্রাতিষ্ঠানিক নিবন্ধন সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক। নিবন্ধনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দেশের প্রচলিত ভ্যাট, আয়কর ও অন্যান্য কর-সংক্রান্ত আইনি বিধানও অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করতে হবে।
নীতিমালাটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হলে মেটা, গুগল, ইউটিউবসহ অন্যান্য বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ব্যতিরেকে বাংলাদেশে নতুন করে কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারবে না। তবে সঠিক প্রক্রিয়ায় নিবন্ধন নেওয়ার পর বাংলাদেশে বৈধভাবে আমদানি করা পণ্য বা সেবার সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞাপন দেশের প্রচলিত আইন মেনে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সহজভাবে প্রচার করা যাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান সরকারি নীতিমালা ও বিধিবিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
এই নতুন নীতিমালার মূল লক্ষ্য হলো—বাংলাদেশের উদীয়মান ডিজিটাল বাণিজ্যকে আন্তর্জাতিক বা বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে আরও কার্যকর ও নিরবচ্ছিন্নভাবে যুক্ত করা, আন্তসীমান্ত ডিজিটাল বাণিজ্যে পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি সুনিশ্চিত করা এবং দেশের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এমএসএমই) জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পথ সহজ করা। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বাজার অনুসন্ধান, তরুণদের ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী উচ্চমানের পণ্য ও সেবা সরবরাহের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে আন্তবিভাগীয় সমন্বয় জোরদারের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
খসড়ায় দেশের এমএসএমই উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে রপ্তানি বাড়াতে বিশেষ নীতিসহায়তা, পার্সেলভিত্তিক আধুনিক রপ্তানির পূর্ণ সুবিধা এবং উপযুক্ত বিমা ব্যবস্থা চালুর সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় অর্জিত আন্তর্জাতিক রপ্তানি আয়কে প্রচলিত সাধারণ রপ্তানির মতোই পূর্ণ স্বীকৃতি দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার বিষয় বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশে ও বিদেশে দ্রুত প্রসেসিং সেন্টার এবং বিশ্বমানের গুদামজাতকরণে অবকাঠামোগত নীতিসহায়তা দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
নীতিমালায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নকল, ভেজাল ও যেকোনো প্রতারণামূলক পণ্য বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে অনলাইনভিত্তিক সব ধরনের অনৈতিক জুয়া, লটারি, বেটিং এবং দেশের আমদানি-রপ্তানি নীতিতে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত যেকোনো পণ্য বা সেবার ডিজিটাল বাণিজ্য করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এমন কোনো চটকদার বা বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনও প্রচার করা যাবে না, যা আমাদের অভ্যন্তরীণ ডিজিটাল বাজারের স্থিতিশীল শৃঙ্খলা নষ্ট করতে পারে অথবা সাধারণ ভোক্তাকে প্রতারিত বা বিভ্রান্ত করতে পারে।
এ ছাড়া ব্যবসা-টু-ব্যবসা (বি-টু-বি), ব্যবসা-টু-ভোক্তা (বি-টু-সি) ও বি-টু-বি-টু-সি ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ডিজিটাল আমদানির সুযোগ আরও প্রসারণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। অনলাইনে সরাসরি আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান মূল্যসীমা একটি যৌক্তিক পর্যায়ে পুনঃনির্ধারণ বা পুনর্বিবেচনার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে দ্রুত সমন্বয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্য ত্রুটিপূর্ণ হলে তা ফেরত দেওয়া বা পুনরায় রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সঠিক নিয়ম অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা লেনদেন প্রক্রিয়া সহজ ও নিরাপদ করতে বৈশ্বিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কের সঙ্গে দেশের বিদ্যমান ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামোর প্রযুক্তিগত সংযোগ স্থাপন এবং অনলাইন লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ‘ক্রস-বর্ডার এসক্রো’ সেবা চালুর সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি আয় দ্রুত দেশে আনা এবং আমদানি ব্যয় পরিশোধ প্রক্রিয়া সহজ করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যকরী ব্যবস্থা নেবে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক।
ভোক্তা অধিকার সুরক্ষার বিষয়েও নীতিমালায় একাধিক কঠোর বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। বিক্রয়োত্তর সেবা, পরিশোধিত মূল্য ফেরত, পণ্য ফেরত প্রদান, পণ্যের ওয়ারেন্টি ও গ্যারান্টি সম্পর্কে ক্রেতাকে কেনাকাটার পূর্বেই স্পষ্ট ও সঠিক তথ্য দিতে হবে। সরবরাহ করা পণ্য প্রদর্শিত বর্ণনার সঙ্গে না মিললে কিংবা কোনো কারণে ত্রুটিপূর্ণ বা নকল প্রমাণিত হলে বিক্রেতাকে অবিলম্বে তা ফেরত নিয়ে ক্রেতার সম্পূর্ণ অর্থ দ্রুত ফেরত প্রদান করতে হবে।
এ ছাড়া যেকোনো ডিজিটাল বাণিজ্যসংক্রান্ত বিরোধ অতি দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে ‘জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর’-এর ডিজিটাল অভিযোগ ও সেবা প্রদান ব্যবস্থাকে আরও বেশি আধুনিকায়নের করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক লেনদেনসংক্রান্ত সার্বিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি স্বাধীন ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ (এডিআর) ব্যবস্থা চালুর কথাও এই খসড়া নীতিমালায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
দেশের পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতে প্রাথমিকভাবে ১ দশমিক দুই বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন জাপানি বিনিয়োগকারীরা। এ বিনিয়োগ প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে সরকার। আজ রবিবার বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে জাপানি বিনিয়োগকারী প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এক সভায় এ ঘোষণা দেওয়া হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। সভায় মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে পর্যটনের বহুমুখী সম্ভাবনা রয়েছে। সুন্দরবন, কক্সবাজারের দীর্ঘ প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত এবং সিলেটের চা-বাগানসহ দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি পর্যটন বিকাশের বড় সম্পদ। এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকার পর্যটন খাতে বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানাবে। জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নে জাপান দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা করে আসছে। পর্যটন খাতের উন্নয়নেও জাপানি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কাজ করতে সরকার আগ্রহী। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) মাধ্যমে উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক বিনিয়োগ পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। জাপানি প্রতিনিধিরা জানান, বাংলাদেশের পর্যটন খাতে বিনিয়োগের বিষয়ে তারা আন্তরিক এবং এ খাতের উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। এ সময় তাদের পক্ষ থেকে পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতে প্রাথমিকভাবে এক দশমিক দুই বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়। বিনিয়োগের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, জাপানি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে সরকার ইতিবাচকভাবে দেখছে। আনুষ্ঠানিক বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা পড়লে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলো পরিদর্শনের জন্য বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রতিনিধিদল পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকারের আশা, বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের পর্যটন অবকাঠামো ও আতিথেয়তা সেবার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে নতুন অংশীদারত্ব কাঠামো চুক্তি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের প্রতিনিধিদল বৈঠক করে চুক্তির বিষয়গুলো চূড়ান্ত করবে। মূল নীতিগত বিষয়গুলোতে কোনো সমস্যা না থাকলেও, আলোচনার মাধ্যমে বিষয়গুলো কীভাবে চূড়ান্ত রূপ পাবে, তা যৌথ কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। শুক্রবার দুপুরে ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ফাঁকে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দিনের শুরুতে সিরিকিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ব্যাংক অব আমেরিকা, গুগল, আইএমএফ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও মুডিসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি, ঋণসংক্রান্ত বিষয়, আর্থিক খাতের সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি বছরটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও বিষয়টি অনুধাবন করতে পারছে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা পুনর্ব্যক্ত করে অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন কাঠামো চুক্তি তৈরি করা হচ্ছে। সকালে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের বক্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের প্রেক্ষাপটে স্বল্প আয়ের দেশগুলোর জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বই সবচেয়ে বড় শক্তি। সরকার হিসেবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং দেশের টেকসই উন্নয়নে সব উন্নয়ন সহযোগীর আন্তরিক সমর্থন ও যৌথ প্রয়াস অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংস্থা দুটির প্রধানরা।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ঘোষিত ক্যাশ ডিভিডেন্ড বিতরণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নির্দেশনা যথাযথভাবে পরিপালন না করায় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে প্রযোজ্য সিকিউরিটিজ আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। একই সঙ্গে বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) ডিভিডেন্ড সংক্রান্ত প্রস্তাব উপস্থাপনের আগে ঘোষিত ডিভিডেন্ডের সম্পূর্ণ অর্থ পৃথক ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা এবং ব্যাংকের প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ ও সভায় উপস্থাপন বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্যে বিদ্যমান নির্দেশনা সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিশনের ১ হাজার ৩৩তম সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিশনের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এ সভায় ডিভিডেন্ড বিতরণসংক্রান্ত নির্দেশনা পরিপালনের পাশাপাশি তালিকাভুক্ত কোম্পানির স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়েও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. আবুল কালামের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। ডিভিডেন্ড বিতরণে নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কমিশনের বিদ্যমান নির্দেশনা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি বার্ষিক বা চূড়ান্ত ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলে সেই ডিভিডেন্ডের সম্পূর্ণ অর্থ বিতরণের উদ্দেশ্যে বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠানের অন্তত এক দিন আগে একটি পৃথক ব্যাংক হিসাবে জমা রাখতে হয়। এ অর্থ স্থানান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করাও বাধ্যতামূলক। নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকের ওই প্রত্যয়নপত্র কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা এবং কোম্পানি সচিবের মাধ্যমে সত্যায়িত করতে হবে। পরে প্রত্যয়নপত্রটি বার্ষিক সাধারণ সভায় উপস্থাপনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জগুলোতে জমা দিতে হয়। তবে সম্প্রতি কিছু ক্ষেত্রে এসব নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে কমিশনের নজরে এসেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১০৩৩তম কমিশন সভায় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে প্রযোজ্য সিকিউরিটিজ আইন ও বিধিবিধান অনুসারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া লভ্যাংশসংক্রান্ত প্রস্তাব বার্ষিক সাধারণ সভায় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আরও কঠোর শর্ত আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। এ জন্য বিদ্যমান নির্দেশনায় প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে। সংশোধিত নির্দেশনা অনুযায়ী, ঘোষিত ডিভিডেন্ডের সম্পূর্ণ অর্থ পৃথক ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ এবং তা বার্ষিক সাধারণ সভায় উপস্থাপন করার বিষয়গুলো নিশ্চিত না করে কোনো কোম্পানি সভায় ডিভিডেন্ড সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারবে না। অর্থাৎ, ডিভিডেন্ডের অর্থ সংরক্ষণ ও ব্যাংকের প্রত্যয়নপত্র উপস্থাপনের শর্ত পূরণ না হলে এজিএমে ডিভিডেন্ডের প্রস্তাব উপস্থাপনের সুযোগ থাকবে না। স্বতন্ত্র পরিচালক পুনর্নিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ হচ্ছে এদিকে, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং এ-সংক্রান্ত প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড, ২০১৮ এবং পরবর্তী সময়ে এ কোডে আনা সংশোধনীগুলোর আওতায় কোনো স্বতন্ত্র পরিচালককে পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে হালনাগাদ ক্লিন ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) প্রতিবেদন পাওয়ার শর্তে কমিশনের সম্মতি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে স্বতন্ত্র পরিচালকদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসংক্রান্ত শর্তে পূর্বে দেওয়া অব্যাহতির প্রয়োগ নিয়েও সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড, ২০১৮-এর শর্ত ১(৩)(ঘ) অনুযায়ী, কোনো কোম্পানির স্বতন্ত্র পরিচালককে কোডের শর্ত ১(৩)(খ) ও ১(৩)(গ)-তে উল্লেখিত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসংক্রান্ত কোনো বিধান থেকে আগে অব্যাহতি বা শিথিলতা দেওয়া হয়ে থাকলে, সেই অব্যাহতি পরবর্তী নিয়োগের ক্ষেত্রেও কার্যকর থাকবে। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ ধরনের কোনো স্বতন্ত্র পরিচালককে অন্য কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে নতুন করে নিয়োগ অথবা একই কোম্পানিতে পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে আগে দেওয়া অব্যাহতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে। ফলে একই বিষয়ে নতুন করে অব্যাহতি নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। বিএসইসির মতে, এ সিদ্ধান্তের ফলে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ হবে এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম আরও দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। কমিশনের ১০৩৩তম সভায় গৃহীত এসব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একদিকে লভ্যাংশ বিতরণসংক্রান্ত নির্দেশনা পরিপালন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে তালিকাভুক্ত কোম্পানির স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগের প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।