রাত তখন প্রায় ১১টা। সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের মালঞ্চ নদীর ‘বাচা কলাগাছিয়া’ এলাকায় কাঁকড়া শিকার করছিলেন দুই ভাই। হঠাৎ তিনটি নৌকায় এসে হাজির ১১-১২ জন সশস্ত্র দস্যু। নিজেদের ‘নানা ভাই বাহিনী’ পরিচয় দিয়ে তারা একজনকে জিম্মি করার চেষ্টা করে। প্রাণভয়ে অন্য ভাই জানান, বনে ঢোকার আগেই বিকাশে ২০ হাজার টাকা দিয়ে ‘অনুমতি’ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দস্যুদের কাছে নম্বরের সঙ্গে সেই নম্বরের মিল না পাওয়ায় শেষ রক্ষা হয়নি। গভীর রাতে বাড়ি থেকে আরও ২০ হাজার টাকা পাঠানোর পর ভোরে মুক্তি মেলে দুই ভাইয়ের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী দুই ভাই বলেন, ‘টাকা দিয়েও এখন বনে যেতে ভয় লাগে। দস্যুরা কীভাবে সব খবর আগেই পেয়ে যায়, সেটাই বুঝি না।’
গত ১১ মে খুলনার বটিয়াঘাটার মো. হাসান ও তার তিন সহযোগী শরীফ বাহিনীর হাতে জিম্মি হন। দস্যুরা মাথাপিছু ৫০ হাজার টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করে। পরে ২০ মে শরণখোলা রেঞ্জে বন বিভাগের স্মার্ট প্যাট্রল টিমের অভিযানের পর তারা মুক্ত হন।
সুন্দরবনের বনজীবীদের কাছে এমন ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। মাছ, কাঁকড়া, মধু কিংবা গোলপাতা সংগ্রহে বনে ঢুকতে হলেই দিতে হচ্ছে চাঁদা। অনেক ক্ষেত্রে টাকা দিয়েও মিলছে না নিরাপত্তা। অপহরণ, নির্যাতন আর মুক্তিপণের আতঙ্কে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে উপকূলের হাজারো পরিবার।
দস্যুমুক্ত’ ঘোষণার পর ফের পুরোনো আতঙ্ক
২০১৮ সালে সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন ছোট-বড় প্রায় ৩৫টি বাহিনীর কয়েকশ সদস্য আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু বনজীবীদের দাবি, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি আবার বদলে যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কারাগার ভাঙার ঘটনায় খোকা বাবু বাহিনীর প্রধান খোকা বাবুসহ কয়েকজন দস্যু সহযোগী পালিয়ে যায়– এ তথ্য নিশ্চিত করেন সাতক্ষীরা কারাগারের জেলার দুলাল কর্মকার।
বর্তমানে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে আলিম ওরফে আলিফ বাহিনী, জোনাব বাহিনী, নানা ভাই বাহিনী ও ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি বনজীবীদের। একইভাবে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জেও কয়েকটি নতুন উপদল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তাদের মধ্যে করিম শরীফ বাহিনী, ছোট সুমন বাহিনী, বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী, ছোট জাহাঙ্গীর, শরীফ বাহিনী, আছাফুর বাহিনী, গাজী বাহিনী, মুক্তার বাহিনী ও দুলাভাই বাহিনী অন্যতম।
হরিনগর গ্রামের সবুর গাইন বলেন, ‘আগে বাঘ-কুমিরের ভয় ছিল, এখন তার চেয়েও বড় ভয় জলদস্যু।’ বাগেরহাটের শরণখোলার এক মৌয়াল বলেন, ‘এখন মধু কাটার চেয়ে ডাকাতদের চোখ ফাঁকি দেওয়া বেশি কঠিন।’
পশ্চিম বন বিভাগের ডিএফও এজেডএম হাসানুর রহমান জানান, সুন্দরবনের দস্যু দমনের মূল দায়িত্ব এখন কোস্টগার্ডের ওপর রয়েছে। খবর পাওয়া মাত্রই কোস্টগার্ডকে তথ্য দেওয়া ছাড়াও দস্যু দমনে যৌথ অভিযান জোরদার করা হয়েছে। নতুন কয়েকটি তালিকাভুক্ত বাহিনীর বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। তবে সীমিত জনবল ও অস্ত্র নিয়ে বিস্তীর্ণ জলসীমায় সংঘবদ্ধ দস্যুদের নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে।
‘ছয় মাসের কার্ড’, দেড় মাসেই নতুন দাবি
শ্যামনগরের দক্ষিণ কদমতলা গ্রামের বনজীবী জবেদ আলীর কণ্ঠে ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব স্পষ্ট। প্রায় তিন দশক ধরে সুন্দরবনে যাতায়াত করা এই বনজীবী বলেন, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে দুই সহযোগীসহ বনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। বিভিন্ন বাহিনীকে প্রায় ৭০ হাজার টাকা দিয়ে ‘কার্ড’ও সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু দেড় মাস পার হতেই আবার নতুন করে টাকা দাবি করা হচ্ছে। ‘সমিতির ঋণ শোধ করতে পারিনি। আবার ডাকাতরা টাকা চাইছে। এখন না পারছি বনে যেতে, না পারছি সংসার চালাতে’– বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
একই ধরনের অভিজ্ঞতা পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জের জেলে-বাওয়ালিদেরও। মোংলার রামপাল থানার ভাগা বাজার এলাকার হাসান জানান, দস্যুদের দেওয়া টোকেন বা কার্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বনের গহিন খালে নতুন কোনো উপদলের মুখে পড়তে হচ্ছে। সেখানে আগের কার্ডের কোনো স্বীকৃতি মিলছে না, দিতে হচ্ছে নতুন করে মোটা অঙ্কের চাঁদা।
স্থানীয় বনজীবীদের দাবি, আগে দস্যুরা বনের ভেতরে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করলেও এখন ‘কার্ড সংস্কৃতি’ চালু করেছে। ৫, ১০ ও ২০ এবং ৫০ টাকার নোটকে ‘কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করে আগেভাগেই টাকা আদায় করা হচ্ছে। পাঁচ টাকার নোটের ভিত্তিতে এক গোন আর ১০ ও ২০ টাকার নোটে এক মৌসুম এবং ৫০ টাকার নোটের মাধ্যমে ফিশিং ট্রলারের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। নির্দিষ্ট নম্বরের সেই নোট দেখিয়েই বনজীবীদের বনে চলাচল করতে হচ্ছে।
প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায়’ দস্যু তৎপরতা
সুন্দরবনের মাছ ধরার লাভজনক এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু প্রভাবশালী নৌকার মালিক, মাছ ব্যবসায়ী, আড়তদার ও মহাজন চক্র জলদস্যুদের পেছন থেকে সহায়তা দেয়। সাধারণ জেলেরা যাতে সব এলাকায় স্বাধীনভাবে মাছ ধরতে না পারে, সেজন্য দস্যুদের মাধ্যমে ভয়ভীতি ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বুড়িগোয়ালিনী গ্রামের জেলে আব্দুল হাকিম গাজী বলেন, ‘বড় কোম্পানির সঙ্গে বিরোধ করে বনে টেকা যায় না। তাদের বিরাগভাজন হলে দস্যুদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়।’ তবে অভিযুক্ত ব্যবসায়ী অয়ন কোম্পানির মালিক মোজাহিদুল ইসলাম অয়ন এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, দস্যুদের সঙ্গে কোনো আর্থিক সম্পর্ক নেই, বিপদে পড়া জেলেদের মানবিক সহায়তা করা হয় মাত্র।’
খুলনা রেঞ্জের কয়রা উপজেলার গোবরা এলাকার বনজীবী সফি ও বিল্লাল হোসেন জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের মাছ, কাঁকড়া শিকার ও মধু সংগ্রহে জড়িত। বর্তমানে সুন্দরবনে যেতে হলে মহিদুল ও মিন্টুর মালিকানাধীন ‘খাটো মিন্টু কোম্পানি’ থেকে কার্ড সংগ্রহ করতে হয়।
কোটি টাকার ‘কার্ড বাণিজ্য’
২০২৫-২৬ অর্থবছরের সরকারি ও স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জ– সাতক্ষীরা, খুলনা, চাঁদপাই ও শরণখোলায় প্রায় ১১ হাজার অনুমোদিত নৌকার বিপরীতে প্রায় ২৬ হাজার বনজীবী ও জেলে লক্ষাধিকবার বনে প্রবেশ করেছেন। তবে এর মধ্যে সাতক্ষীরা রেঞ্জ ও চাঁদপাই রেঞ্জের চিত্র সবচেয়ে ভয়াবহ। সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে বনজীবীদের কাছ থেকে চলতি মৌসুমে দস্যুরা মোট দুই কোটি ৭৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এই রেঞ্জে ১৫০০টি নৌকা থেকে ১০-২৫ হাজার টাকা দরে ‘অগ্রিম কার্ড’ বিক্রি করে এক কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং দুই শতাধিক জেলেকে জিম্মি করে আরও ৪০ লাখ টাকা মুক্তিপণ নেওয়া হয়েছে। একইভাবে মধু সংগ্রহ করতে যাওয়া মৌয়ালদের কাছ থেকে মৌসুমি চাঁদা বাবদ ৪৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং জিম্মি হওয়া ৩০ জন মৌয়ালের কাছ থেকে আরও ৯ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়েছে।
একইভাবে খুলনা ও শরণখোলা রেঞ্জ থেকে প্রায় সমপরিমাণ মুক্তিপণ ও চাঁদাবাজি বাবদ অর্থ আদায় করা হয়েছে। তবে চাঁদপাই রেঞ্জের আওতাধীন এলাকা থেকে সবচেয়ে বেশি চাঁদা আদায়ের তথ্য রয়েছে। চলতি মৌসুমে সেখানকার জেলেপ্রতি ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা আদায় করছে দস্যুরা। এভাবে অন্তত ২৫ কোটি টাকার ওপরে আদায় হয়েছে এ রেঞ্জ থেকে। সহজ কথায়, বৈধ পারমিট নিয়ে বনে গেলেও সুন্দরবনের নিরীহ জেলে ও মৌয়ালদের দস্যুদের হাত থেকে বাঁচতে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দিতে হচ্ছে।
অভিযান চলছে, আতঙ্ক কাটছে না
কোস্টগার্ড জানায়, ‘রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ অভিযানে গত ১৯ মাসে ৬৯ দস্যু ও সহযোগী আটক হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে ৬৭টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৩০০ রাউন্ড গুলি। জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হয়েছেন ১০৪ জেলে ও দুই পর্যটক।
শ্যামনগর থানার ওসি খালেদুর রহমান জানান, মুক্তিপণের টাকা লেনদেনে ব্যবহৃত মোবাইল ট্র্যাক করে কয়েকজন বিকাশ ব্যবসায়ী ও দস্যুদের সহযোগীকে আটক করা হয়েছে। তবে বনজীবীরা বলছেন, সমন্বিত অভিযান ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। ‘দস্যুমুক্ত’ সুন্দরবন আবারও জলদস্যুদের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
নীলফামারীর জলঢাকায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা একটি মামলায় জলঢাকা পৌরসভার সাবেক মেয়র নাসিব সাদিক হোসেন নোভাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় জলঢাকা পৌর এলাকার নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। জলঢাকা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল আলম ঢাকা পোস্টকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বুধবার সন্ধ্যায় নাসিব সাদিক হোসেন নোভার বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। এ সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি জলঢাকা থানায় দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলার এজাহারভুক্ত ৬ নম্বর আসামি। ওসি নাজমুল আলম আরও জানান, আইনি প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) তাকে আদালতে সোপর্দ করা হবে।
পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনার (টিএমপি) সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) প্রস্তুত করা হবে। তিনি বলেন, পাশাপাশি চীন, নেদারল্যান্ডস ও মালয়েশিয়ার পরামর্শকদের কাছ থেকে বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়া হবে। যারা দীর্ঘকাল ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন, তারা যাতে আগামী একশ বছর এর সুফল ভোগ করতে পারে, তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে সেভাবে বাস্তবায়ন করাই আমাদের লক্ষ্য। বুধবার বিকেলে রংপুর মহানগরীর ডিসি মোড় এলাকায় শ্যামাসুন্দরী খাল পরিদর্শনের সময় স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ফারাক্কা চুক্তি নবায়নের মাধ্যমে ভারত কেবল বাংলাদেশ সরকারেরই নয়, এ দেশের ২০ কোটি মানুষের প্রকৃত বন্ধু হিসেবেও নিজেদের প্রমাণ করতে পারে। গত ১৭ বছরে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিবেশী দেশটির নেওয়া নানা পদক্ষেপ এক ধরনের অস্পষ্টতা বা বিভ্রান্তি তৈরি করেছে বলেও অভিযোগ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ১৯৭৭ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে ফারাক্কা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ডিসেম্বরে সময়সীমা শেষ হলে তা নবায়ন করা হবে বলে আশা রাখি। তিনি আরও জানান, গত জুনে কলকাতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ভারতীয় প্রতিনিধিদের ফারাক্কা চুক্তি নিয়ে বৈঠক হয়। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের দল গঠন করেছি এবং বিভিন্ন মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।’ রংপুর মহানগরীর ঐতিহাসিক শ্যামাসুন্দরী খালের উন্নয়নের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভাগীয় শহরগুলোর খাল, নদী ও জলাশয়গুলোর উন্নয়নে নির্দেশনা দিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় খাল, নদী ও জলাশয়গুলোতে ড্রেজিং (খনন) ও পুনঃখননের কাজ চলছে। তিনি জানান, শ্যামাসুন্দরী খাল উন্নয়নের লক্ষ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও রংপুর সিটি কর্পোরেশন যৌথভাবে কাজ করছে এবং ১৪ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রকল্পের প্রায় ১৮ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৮২ শতাংশ আগামী জুনের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফরহাদ বলেন, এলাকার কিছু মানুষ রাতের বেলা শ্যামাসুন্দরী খালে ময়লা ফেলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এটি বন্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। যারা খালে ময়লা-আর্বজনা ফেলবে, তাদের জরিমানাও করা হবে। এছাড়া, খালের উভয় পাশে হাঁটার পথ (ওয়াকওয়ে) নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের বার্তা স্পষ্ট- খালের উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করলে রাজনৈতিক গোষ্ঠী, মতাদর্শ বা ধর্মীয় পরিচয়ধারী কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। আশা রাখি নগরবাসী এই প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করবেন। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন রংপুরের ডেপুটি কমিশনার ইসরাত জাহান, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাফিজুল ইসলাম এবং জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি নাজমুল আলম নাজু।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবিএল) থেকে ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের মামলায় সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তার স্ত্রী রুকমীলা জামানসহ ৩৬ আসামির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সাক্ষী দুদকের উপপরিচালক মশিউর রহমানকে জেরা শেষের মধ্যে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। এই মামলার মোট ৫৫ জনের সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মিজানুর রহমানের আদালতে এ সাক্ষ্য অনুষ্ঠিত হয়। দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর মোকাররম হোসাইন বিষয়টি কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করে বলেন, ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের মামলায় জাবেদসহ ৩৬ আসামির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। বুধবার আসামীপক্ষের আইনজীবীরা তদন্তকারী কর্মকর্তাকে জেরা করেন। জেরা শেষে আদালত সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত ঘোষনা করেন। আগামী ৪ নভেম্বর মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য্য করা হয়েছে। ওই দিন রাখা হয়েছে ৩৪২ ধারা পরীক্ষার জন্য। এর আগে, চলতি বছরের ১১ মার্চ এ মামলায় ৩৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। তারও আগে গত ৫ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মশিউর রহমান চট্টগ্রাম মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, ইউসিবি ব্যাংক থেকে ভুয়া ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ২৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, জাবেদ তার মালিকানাধীন আরামিট গ্রুপের প্রটোকল অফিসার মোহাম্মদ ফরমান উল্লাহকে মালিক দেখিয়ে দুটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। পরে জাল নথিপত্র তৈরি করে ইউসিবি ব্যাংকের চট্টগ্রাম পোর্ট শাখা থেকে ২৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। অভিযোগে আরো বলা হয়, ব্যাংকের ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগ ১৭টি নেতিবাচক পর্যবেক্ষণ দিলেও তা উপেক্ষা করা হয়। দুদকের দাবি, পরে ওই অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়। ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, আসামিরা দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই জাবেদ ও তার স্ত্রীসহ ৩১ জনের বিরুদ্ধে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মশিউর রহমান চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-১-এ মামলাটি দায়ের করেন। অভিযোগপত্রে ৯২ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তাঁর স্ত্রী ও ইউসিবিএলের সাবেক চেয়ারম্যান রুকমীলা জামান, সাবেক পরিচালক আসিফুজ্জামান চৌধুরী ও রোকসানা জামান চৌধুরী। এ ছাড়া সাবেক পরিচালক বশির আহমেদ, আফরোজা জামান, সৈয়দ কামরুজ্জামান, মো. শাহ আলম, মো. জোনাইদ শফিক, অপরূপ চৌধুরী, তৌহিদ সিপার রফিকুজ্জামান, ইউনুছ আহমদ, হাজী আবু কালাম, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, সাবেক চেয়ারম্যান এম এ সবুর এবং সাবেক ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ কাদরীসহ মোট ৩৬ জন আসামি রয়েছেন।