অন্যান্য

ফোনের পর্দায় শিশুর জগৎ, বাইরে খেলা ও পরিবারের সময় কতটা থাকছে

মো: দেলোয়ার হোসাইন অক্টোবর ১৪, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ফোনটি হাত থেকে সরিয়ে নিতেই কেঁদে উঠল ছয় বছরের আনাস। কান্না থামাতে আবার তাঁর হাতে ফোনটি ফিরিয়ে দেওয়া হলো। একটু পর একটি বল নিয়ে তাকে বাইরে খেলতে ডাকতেই অবশ্য দৃশ্য বদলে গেল। ফোন রেখে খেলতে চলে গেল সে।

 

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের সরারচর গ্রামের শিশু আনাসের সঙ্গে কথা হচ্ছিল তার ফোন ব্যবহারের অভ্যাস নিয়ে। দুই ভাইয়ের মধ্যে আনাস ও আয়াসকে সামলাতে হয় মা সোনিয়াকে। তাদের বাবা সেতু থাকেন ঢাকায়। মা ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকলে দুই ভাই ফোনে কার্টুন দেখে সময় কাটায়। বিশেষ করে মটু-পাতলুর মতো কার্টুন তাদের পছন্দ।

 

আনাসের কাছ থেকে ফোন নেওয়ার পর তার কান্না দেখে মনে হয়েছিল, ফোন ছাড়া হয়তো তাকে সামলানো কঠিন। কিন্তু খেলার প্রস্তাব পেয়ে ফোন ছেড়ে বাইরে যাওয়া অন্য একটি প্রশ্ন সামনে আনে। শিশুরা কি সত্যিই ফোন ছাড়া থাকতে পারে না, নাকি তাদের মনোযোগ অন্যদিকে নেওয়ার সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ?

 

ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ১০ বছর বয়সী তুবার অভিজ্ঞতা আবার কিছুটা আলাদা। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া তুবাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তার কাছ থেকে ফোন নিয়ে নিলে কেমন লাগবে। পাল্টা প্রশ্ন করে সে জানতে চাইল, ফোন কেন নেওয়া হবে।

 

তুবা জানাল, সে ফোনে কার্টুন, মাছের কার্টুন এবং মায়ের সাথে ভিডিও দেখে। পরে ফোনে কী দেখে, তা দেখাতে গিয়ে দেখা গেল, এবিসিডি, প্রাণী পরিচিতিসহ বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্টুনও দেখে সে। এমনকি বাবা কাজ থেকে ফিরলে বাবার সাথে বিভিন্ন প্রযুক্তি বিষয়ক ভিডিও দেখেও সময় কাটায় তুবা। ফোন সরিয়ে নেওয়ার পর খুব একটা বিরক্ত হয়নি তুবা। বরং ফোন রেখে আমার সঙ্গে খেলতে শুরু করে।

 

আবার ১৫ বছর বয়সী রাতুলের কাছে ফোনের অর্থ অন্য রকম। ফ্রি ফায়ার খেলার পাশাপাশি সে ভিডিও, পডকাস্ট, প্রযুক্তিবিষয়ক ভিডিও, খেলার হাইলাইটস দেখে। অনলাইন ক্লাসও করে।

 

ফোন ছাড়া এক দিন কাটানোর কথা কল্পনা করতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে রাতুল বলে, ‘আমার তো পাগল পাগল লাগবে। মোবাইল ছাড়া আমি এক দিনও চলতে পারব না। মোবাইল ছাড়া আমি কীভাবে ফ্রি ফায়ার খেলব, কীভাবে সময় কাটাব, কীভাবে চ্যাট করব, কীভাবে বন্ধুদের ডাকব?’

 

রাতুলের কাছে ফোন তাই শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগেরও একটি উপায়। তার ভাষায়, মাঠে গিয়ে খেলার সুযোগ না থাকলে তারা ফোনে ই-ফুটবল বা ফ্রি ফায়ার খেলে। গেমের মধ্যে চ্যাট করার সুযোগ থাকে। কখনো বাইরে দেখা হলেও একসঙ্গে বসে অনলাইনে খেলে।

 

তিন শিশুর তিন রকম অভিজ্ঞতা। কেউ ফোন সরালে কেঁদে ওঠে, কেউ সহজেই অন্য কাজে মন দেয়, আবার কারও কাছে ফোন বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগেরও মাধ্যম। তাহলে স্ক্রিনটাইমের সমস্যা কি শুধু কতক্ষণ ফোন ব্যবহার করা হচ্ছে, নাকি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিশুর চারপাশের পরিবেশ, পরিবারের সময় এবং বিকল্প কার্যক্রমের সুযোগ?

 

মোবাইল হাতে, বাবা ও মা এর মনে দুশ্চিন্তা

মানিকদীতে রিকশা চালান আব্দুল মান্নান। তাঁর ১৫ বছর বয়সী ছেলে সাজ্জাদ ভালো ক্রিকেট খেলে। পাড়ার বিভিন্ন টুর্নামেন্টে খেলে কিছু আয়ও করে। সেই টাকা থেকে সংসারে কিছুটা অবদান রাখে সাজ্জাদ।

 

সামনে এসএসসি পরীক্ষা। ছেলেকে নিয়ে বাবার স্বপ্ন ছিল, ভালো ফল করবে, সুযোগ পেলে একদিন ক্রিকেটার হবে। কিন্তু গত মাসে ছেলের জন্য মোবাইল কেনার পর থেকে দুশ্চিন্তা বেড়েছে তাঁর।

 

ফ্রি ফায়ার, পাবজির মতো গেম খেলার জন্য ছেলেকে ফোন কিনে দিয়েছিলেন আব্দুল মান্নান। তাঁর ভাষ্য, ফোন হাতে পাওয়ার পর সাজ্জাদ এখন অনলাইনে গেম নিয়ে পড়ে থাকে। পড়াশোনা, ঘুম, এমনকি শখের ক্রিকেট থেকেও তার মন সরে যাচ্ছে। পরিবারের অন্যদের সঙ্গে আচরণেও আগ্রাসী ভাব দেখা যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

 

আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আসলে আমি চাই সাজ্জাদ আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসুক। ওর মোবাইল ব্যবহারে আমার দুশ্চিন্তা হয়।’

 

মোবাইল কেনার আগে যে বাবা হয়তো ভেবেছিলেন, ছেলের পছন্দের গেম খেলার সুযোগ করে দেবেন, এখন সেই সিদ্ধান্তই তাঁর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফোন ব্যবহারের সীমা কীভাবে ঠিক করবেন, ছেলের পড়াশোনা ও খেলাধুলার আগ্রহ কীভাবে ফিরিয়ে আনবেন, সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তিনি।

 

রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সেলিনা আখতারও সন্তানের ফোন ব্যবহার নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁর ছেলের বয়স ১৩ বছর। নিজের ব্যস্ততার কারণে কিংবা ছেলের জেদের কাছে, তাকে একটি প্রিমিয়াম অ্যান্ড্রয়েড ফোন কিনে দিয়েছিলেন তিনি।

 

কয়েক দিন ধরে তাঁর মনে হচ্ছিল, ছেলে কিছু একটা লুকাতে চাইছে। একদিন ছেলের ফোনের ব্রাউজারে ঢুকে বিভিন্ন আপত্তিকর ওয়েবসাইট দেখার বিষয়টি তাঁর নজরে আসে। সন্তানের জন্য ফোন কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে চিন্তায় পড়েন তিনি।

 

এখানে উদ্বেগটা শুধু ফোনে কত সময় কাটছে, তা নয়। শিশু কী দেখছে, কোন বয়সে দেখছে এবং অভিভাবক তার অনলাইন ব্যবহারের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করতে পারছেন, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

 

মিরপুরে রিকশা চালান আজহার। তাঁর মেয়ে আরাফার বয়স ছয় বছর। মেয়ের ফোন ব্যবহারের কথা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে বিরক্তি ও অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে।

 

আজহার বলেন, ‘মা টিকটক দেখে, মেয়ে এটা শিখছে। আমি রিকশা চালাই, সারাদিন ব্যস্ত থাকি। মা রান্না করা আর বিভিন্ন কাজ করার সময় উপায় না পাইয়া মাইয়ার হাতে ফোনটা দেয়। মাইয়া এখন পুরা নেশায় ডুইবা গেছে। ফোন ছাড়েই না, সারাদিন টিকটক দেখে।’

 

কাজ শেষে বাসায় ফিরে মেয়ের হাত থেকে ফোন সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেন আজহার। তখন আরাফা কান্না করে। মেয়ের ফোন ব্যবহার কমাতে তাকে বই কিনে দেওয়ার কথা ভাবছেন তিনি। বেশি ফোন দেখলে চোখের ক্ষতি হতে পারে, এমন উদ্বেগও রয়েছে তাঁর।

 

এই পরিবারের অভিজ্ঞতায় একটি বিষয় স্পষ্ট। ফোনের সঙ্গে শিশুর সম্পর্ক গড়ে ওঠার পেছনে শুধু শিশুর আগ্রহ কাজ করে না। বাবা বাইরে কাজ করেন, মা ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকেন। শিশুকে সামলানোর একটি উপায় হিসেবে ফোন হাতে দেওয়া হয়। পরে সেই অভ্যাসই হয়ে ওঠে দুশ্চিন্তার কারণ।

 

জরিপে মনোযোগ, বিরক্তি ও জেদের কথা

এই প্রতিবেদনের জন্য অভিভাবক, শিশু ও বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি একটি অনলাইন জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। প্রতিবেদকের সংগ্রহের হিসাবে ৪৬টি ফর্ম পূরণ করা হয়েছে। এর বাইরে গ্রামের তিন অভিভাবকের সঙ্গে আলাদা কথোপকথন হয়েছে। মৌখিক সাক্ষাৎকারের তথ্য জরিপের সংখ্যার সঙ্গে যোগ করা হয়নি।

 

জরিপে উত্তরদাতাদের মধ্যে ছিলেন বাবা, মা, অন্য অভিভাবক, আত্মীয় এবং শিক্ষক। ঢাকা শহর থেকে এসেছে ৩২টি উত্তর, জেলা শহর থেকে নয়টি, গ্রাম থেকে তিনটি এবং উপজেলা থেকে দুটি। ফলে এই জরিপকে বাংলাদেশের সব শিশুর প্রতিনিধিত্বকারী নমুনা হিসেবে দেখা যাবে না। এটি অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলোর অভিজ্ঞতার একটি প্রাথমিক চিত্র।

 

স্ক্রিনটাইমের হিসাব দেওয়ার পদ্ধতিতেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ৪৬টি উত্তরের মধ্যে ২৯ জন বলেছেন, তাঁরা অনুমান করে শিশুর স্ক্রিনে কাটানো সময় জানিয়েছেন। ১২ জন ফোনের Screen Time বা Digital Wellbeing দেখে হিসাব দিয়েছেন। তিনজন শিশুর কাছ থেকে জেনে এবং দুজন অন্যভাবে সময়ের হিসাব করেছেন।

 

কর্মদিবসে বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহারের জন্য দেওয়া মিনিটের সংখ্যাগুলো গড় করলে সময় দাঁড়ায় প্রায় ১৫২ মিনিট, অর্থাৎ প্রায় ২ ঘণ্টা ৩২ মিনিট। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে গড় প্রায় ১৭৭ মিনিট বা প্রায় ২ ঘণ্টা ৫৭ মিনিট। তবে এগুলো উত্তরদাতাদের দেওয়া সময়ের গড়, শিশুদের ডিভাইসে সরাসরি মাপা সময় নয়। কয়েকটি উত্তরে অনেক বেশি সময় থাকায় গড়ও প্রভাবিত হয়েছে।

 

শিশুরা সবচেয়ে বেশি কী কাজে স্ক্রিন ব্যবহার করে, সেই প্রশ্নে ১৯ জন ইউটিউব বা ভিডিও দেখা, ১৩ জন শর্ট ভিডিও দেখা এবং সাতজন গেম খেলার কথা বলেছেন। টেলিভিশন দেখা, অনলাইন ক্লাস বা পড়াশোনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের কথাও এসেছে কয়েকটি উত্তরে।

 

শিশুর আচরণে গত তিন মাসে কী ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে, এমন প্রশ্নে একাধিক উত্তর দেওয়ার সুযোগ ছিল। ৪৬টি রেকর্ডের মধ্যে ২৬টি উত্তরে বিরক্তি বা অস্থিরতা বেড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সংখ্যক উত্তরে স্ক্রিন বন্ধ করতে বললে বেশি রাগ করার কথা এসেছে। ২৩টি উত্তরে দীর্ঘ সময় পড়াশোনা বা কোনো কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে কষ্ট হওয়ার কথা বলা হয়েছে। স্ক্রিন না পেলে জেদ করার কথা এসেছে ২২টি উত্তরে।

 

এ ছাড়া ১৭টি উত্তরে মেজাজ দ্রুত খারাপ হওয়ার, ১৫টিতে এক কাজ থেকে আরেক কাজে দ্রুত চলে যাওয়ার, ১১টিতে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময় কমে যাওয়ার এবং ১০টিতে ঘুমের সময় বা ঘুমের রুটিন বদলে যাওয়ার কথা এসেছে। আটটি উত্তরে আগের তুলনায় খেলাধুলা কমার কথা বলা হয়েছে। আটটি উত্তরে আবার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি বলে জানানো হয়েছে।

 

এসব তথ্য অভিভাবকদের পর্যবেক্ষণ, স্ক্রিন ব্যবহার আর আচরণগত পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক থাকলেই একটিকে অন্যটির সরাসরি কারণ বলা যায় না। তবু উত্তরগুলো পরিবারগুলোর উদ্বেগের ধরন বুঝতে সাহায্য করে।

 

খাওয়ানোর সময় ফোন, ঘুমের আগেও স্ক্রিন

খাওয়ানোর সময় শিশুকে শান্ত রাখতে ফোন দেওয়া নিয়ে জরিপে একটি উল্লেখযোগ্য চিত্র এসেছে। ২১ জন বলেছেন, প্রায় প্রতিদিন তাঁরা খাওয়ানোর সময় শিশুকে মোবাইল বা অন্য স্ক্রিন দেন। আরও আটজন বলেছেন, তাঁরা প্রায়ই দেন। অর্থাৎ এই দুই উত্তরে মোট ২৯ জন নিয়মিত বা প্রায় নিয়মিত স্ক্রিন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

 

শিশু কান্না বা জেদ করলে তাকে শান্ত করতে স্ক্রিন ব্যবহার করেন কি না, এমন প্রশ্নে ১০ জন বলেছেন প্রায় প্রতিবার এবং নয়জন বলেছেন প্রায়ই। বিপরীতে ১৩ জন বলেছেন, তাঁরা কখনো এভাবে স্ক্রিন ব্যবহার করেন না।

 

ঘুমানোর আগের এক ঘণ্টায় শিশুর স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ১২ জন বলেছেন, তাঁদের শিশু প্রতিদিন এবং ১১ জন প্রায়ই এই সময়ে স্ক্রিন ব্যবহার করে। ১১টি উত্তরে মাঝে মাঝে, তিনটিতে খুব কম এবং নয়টিতে কখনো না বলা হয়েছে।

 

শিশুর সামনে অভিভাবকের নিজের স্ক্রিন ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন করা হয়েছিল। ১৭ জন বলেছেন, শিশুর সঙ্গে বা সামনে থাকার সময় তাঁদের নিজেদের স্ক্রিন ব্যবহার মাঝারি। আটজন বেশি এবং দুজন খুব বেশি ব্যবহারের কথা বলেছেন। শিশু কথা বলার সময় বাবা-মা নিজের মোবাইল ব্যবহার করেন কি না, এমন প্রশ্নে ১৯ জন বলেছেন মাঝে মাঝে, আটজন প্রায়ই এবং দুজন খুব বেশি ব্যবহার করেন।

 

এই ফলগুলো একটি প্রশ্ন সামনে আনে। শিশুকে ফোনের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পরিবারের বড়দের অভ্যাসও কি ভূমিকা রাখছে? আবার বড়দের ব্যস্ততা, নিরাপদ খেলার জায়গার অভাব কিংবা শিশুকে কিছুক্ষণ শান্ত রাখার প্রয়োজন কি এই অভ্যাসের পেছনে কাজ করছে?

 

শহর ও গ্রামের অভিজ্ঞতা এক নয়

গণমাধ্যমকর্মী নাজমুলের মেয়ে গ্রামে থাকে। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, তাঁর মেয়ে ফোনে গেম খেললেও কেউ ডাকলে তা রেখে বাইরে খেলতে যায়। বাসায় ফিরে আবার ফোন ব্যবহার করে। তাঁর ধারণা, গ্রামে বাইরে যাওয়ার ও খেলাধুলার সুযোগ থাকায় তাঁর মেয়ের জীবনে ফোনের গুরুত্ব সব সময় একই রকম থাকে না।

 

তবে এটি তাঁর নিজের মেয়েকে নিয়ে অভিজ্ঞতা। সব গ্রামের শিশুর পরিস্থিতিও যে এমন, তা বলা যায় না।

 

টাঙ্গাইলের জেলা সদরে থাকেন নারী উদ্যোক্তা তনয়া জামান। তাঁর বড় মেয়ের বয়স ছয় বছর, ছোট মেয়ের চার। মেয়েদের ফোন ব্যবহারের বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা কিছুটা আলাদা। তনয়া জানান, ফোন না দিলে তাঁর বড় মেয়ে সাধারণত রাগ করে না। এখন ফোন দেখা যাবে না বললে মেনে নেয়।

 

তনয়া বলেন, ‘ফোনের প্রতি আসক্ত তো এখন সব বাচ্চাই। কিন্তু আমি যদি বলি, এখন দেখা যাবে না, মেনে নেয়।’

 

মেয়েরা দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে থাকলে নিজেই তাদের অন্য কাজে মনোযোগ দেওয়ার কথা বলেন তনয়া। তাঁর ভাষ্য, ‘যখন মনে হয় অনেকক্ষণ স্ক্রিনের সঙ্গে আছে, তখন নিজেই বলি, এবার খেলো বা নিচে যাও, কিংবা কোনো কাজে যুক্ত হও। সাধারণত নিজে থেকে ফোন দিই না। তবে কখনো খুব ব্যস্ত থাকলে, ওরা বিরক্ত করলে একটু দেখার জন্য ফোন দিয়ে দিই।’

 

শিশুরা কেন ফোন বা টেলিভিশনের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়ে, সে বিষয়ে তনয়ার নিজের একটি পর্যবেক্ষণ রয়েছে। তাঁর মতে, শিশুরা আসলে খেলতে চায়, মা-বাবার মনোযোগও চায়। কিন্তু মা-বাবা যখন তাদের যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না, তখন তারা ফোন বা টেলিভিশন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

 

তনয়া বলেন, ‘আমার যেটা মনে হয়, বাচ্চারা খেলতেই চায়। ওরা মা-বাবার অ্যাটেনশন চায়। আমরা যখন সেটা দিতে না পারি, তখন তারা ফোন বা টিভি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।’

 

ঢাকা ও জেলা শহরের শিশুদের অভিজ্ঞতার তুলনা করতে গিয়ে তনয়া মনে করেন, রাজধানীর ব্যস্ত ও একঘেয়ে জীবনযাপনে শিশুদের স্ক্রিনের ওপর নির্ভরতা বেশি হতে পারে। জেলা শহরে বাইরে যাওয়া, খোলা জায়গায় থাকা কিংবা মাঠে খেলাধুলার সুযোগ তুলনামূলক বেশি থাকলে শিশুরা স্ক্রিনের বাইরে সময় কাটানোর সুযোগ পায়।

 

তাঁর ভাষায়, মা-বাবা সপ্তাহের ছয় দিন ব্যস্ত থাকলেও এক দিন শিশুদের বাইরে নিয়ে গেলে তারা খুশি হয়। বরং সেই দিনের অপেক্ষায় থাকে। তবে এটি তনয়ার নিজের অভিজ্ঞতা ও ধারণা, শহর ও গ্রামের সব শিশুর ওপর করা কোনো তুলনামূলক গবেষণার ফল নয়।

 

তনয়া মনে করেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার ভবিষ্যতে শিশুর শরীর ও মনে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নিজের মেয়েদের ফোন ব্যবহারের সময়ের দিকে খেয়াল রাখেন এবং বেশি সময় স্ক্রিনে থাকলে অন্য কাজে যুক্ত করার চেষ্টা করেন।

 

আলাদা কথোপকথনে আরও তিন গ্রামীণ অভিভাবক জানান, তাঁদের আট, ১২ ও ১৪ বছর বয়সী সন্তানরা ফোন ব্যবহার করলেও নিয়মিত স্কুলে যায় এবং বাইরে খেলাধুলার সময়ও পায়। তাঁদের পর্যবেক্ষণে, সন্তানদের আচরণে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। তাঁরা ফোনের Screen Time বা Digital Wellbeing দেখে ব্যবহারের সময় হিসাব করেননি। তবে আশপাশে অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়ার ঘটনা সম্পর্কে জানার পর সন্তানদের ফোন ব্যবহার নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে।

 

এই তিনটি অভিজ্ঞতা আনুষ্ঠানিক ফর্মের উত্তর নয়, পৃথক মৌখিক সাক্ষাৎকার। এগুলোও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সব শিশুর অভিজ্ঞতা একই রকম নয়। কোথাও স্ক্রিনের ব্যবহার নিয়ে বড় উদ্বেগ রয়েছে, কোথাও আবার বাইরে খেলাধুলা ও পরিবারের নজরদারির কারণে অভিভাবকেরা তুলনামূলক স্বস্তিতে আছেন।

 

জরিপেও খেলাধুলার সুযোগ নিয়ে উদ্বেগের ইঙ্গিত রয়েছে। ১৪টি উত্তরে বলা হয়েছে, শিশুটি দিনে ৩০ মিনিটের কম বাইরে খেলাধুলা বা শারীরিক কর্মকাণ্ড করে। আরও ১১টি উত্তরে বলা হয়েছে, প্রায় খেলাধুলাই করে না। বিপরীতে ছয়জন এক থেকে দুই ঘণ্টা এবং চারজন দুই ঘণ্টার বেশি খেলাধুলার কথা জানিয়েছেন।

 

একটি উত্তরে খেলার মাঠের অভাব এবং মেয়েশিশুর নিরাপত্তার কারণে বাইরে যেতে না দেওয়ার কথাও এসেছে। ওই অভিভাবকের ভাষ্যে, শিশুটি বাসার ঘরেই খেলে। যে কিন্ডারগার্টেনে পড়ে, সেটিও একটি আবাসিক ভবনে; সেখানে খেলার মাঠ নেই।

 

এখানে স্ক্রিনের বাইরের আরেকটি বাস্তবতা স্পষ্ট হয়। খেলাধুলার নিরাপদ জায়গা না থাকলে বা সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে মেশার সুযোগ কম থাকলে শিশুর অবসর কীভাবে কাটবে, সেটিও ভাবতে হবে।

 

কনটেন্ট, ভাষা ও শিশুর বিকাশ

বিইউপির ডিপার্টমেন্ট অব অডিওলজি অ্যান্ড স্পিচ ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথলজির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ফাতিমা মেঘলা মনে করেন, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে থাকা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর মতে, একমুখী ভিডিও বা কার্টুন দেখার সময় শিশুর অন্য মানুষের সঙ্গে কথোপকথনের সুযোগ সীমিত হতে পারে। এতে ভাষা শেখা, শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করা এবং যোগাযোগের দক্ষতা গড়ে ওঠার সুযোগ কমতে পারে।

 

ফাতিমা মেঘলার মতে, শিশুরা সামনাসামনি যোগাযোগের মধ্য দিয়ে মুখের অভিব্যক্তি, চোখের ভাষা ও অনুভূতির আদান-প্রদান শিখতে থাকে। কেবল স্ক্রিন দেখার মাধ্যমে সেই অভিজ্ঞতার বিকল্প তৈরি হয় না।

 

তিনি আরও বলেন, ছোট শিশুদের খাওয়ানোর সময় বা কান্না থামাতে নিয়মিত মোবাইল দেওয়ার অভ্যাস তাদের পারস্পরিক যোগাযোগের সময় কমিয়ে দিতে পারে। ভাষা শেখার ক্ষেত্রে কথোপকথনের পালাবদল এবং অন্যের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

 

নর্দার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার জাহিদ হোসাইন খান বলেন, শিশু কতক্ষণ স্ক্রিনে থাকছে, শুধু সেই হিসাব দিয়ে তার অভিজ্ঞতা বোঝা যাবে না। সে কী দেখছে এবং স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে পড়াশোনা, খেলাধুলা কিংবা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সময় কতটা কমছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

 

তাঁর মতে, বয়সোপযোগী শিক্ষামূলক কনটেন্ট সীমিত মাত্রায় ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত বা একমুখী বিনোদনমূলক কনটেন্ট শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাপনের জায়গা দখল করলে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

 

জাহিদ হোসাইন খান বলেন, স্ক্রিন বন্ধ করার পর সাময়িক বিরক্তি আর সমস্যাজনক ব্যবহারের লক্ষণ এক নয়। শিশু বিকল্প কোনো কাজে সহজেই মনোযোগ ফেরাতে পারছে কি না, তার পড়াশোনা, ঘুম, খাবার ও সামাজিক মেলামেশা ব্যাহত হচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি।

 

নয়া বাজার মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা মোজাম্মেল হোসেনের পর্যবেক্ষণ, ১২ থেকে ১৩ বছর বয়সী কিছু শিক্ষার্থীকে মোবাইলে অনুপযুক্ত ভিডিও দেখার কারণে ধরা হয়েছে। তাঁর মতে, শিক্ষামূলক কাজে মোবাইলের প্রয়োজন থাকলেও অনেক অভিভাবক প্যারেন্টিং কন্ট্রোল বা কিডস মোডের মতো সুবিধা সম্পর্কে জানেন না। ফলে সন্তান কী দেখছে, তা সব সময় নজরে রাখা সম্ভব হয় না।

 

স্টারলিং কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষিকা বৃষ্টি হোসেন বলেন, তাঁর ক্লাসের অনেক শিশু অনলাইন ক্লাসের জন্য মোবাইল ব্যবহার করে। তবে কিছু শিশু মোবাইলে বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়লে পড়াশোনা ও খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ হারায় বলে তাঁর পর্যবেক্ষণ। তিনি মনে করেন, কিছু ক্ষেত্রে ফোন ব্যবহারের কারণে শিশু বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের থেকেও দূরে সরে যেতে পারে।

 

কখন উদ্বেগের ঘণ্টা বাজে

শিশুর অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার এবং মানসিক বা আচরণগত সমস্যার মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি। সাময়িক বিরক্তি বা জেদ দেখালেই শিশুকে আসক্ত বলা যায় না। সমস্যা গুরুতর হচ্ছে কি না, তা বোঝার ক্ষেত্রে দেখতে হবে স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে তার পড়াশোনা, ঘুম, খেলাধুলা, সামাজিক মেলামেশা কিংবা পারিবারিক সম্পর্ক কতটা ব্যাহত হচ্ছে।

 

অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল (সাবেক পরিচালক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল) ডিভাইসের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এমন নির্ভরতা শিশুদের মধ্যে আক্রমণাত্মক আচরণ ও সাইকোসোমাটিক উপসর্গের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। অপরিকল্পিত ডিভাইস ও ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে অনুপযুক্ত কনটেন্টে প্রবেশ এবং পর্নোগ্রাফির প্রতি নির্ভরতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।(তাঁর বক্তব্যের সূত্র নিউ এজের ‘Device overdependency affects child health in Bangladesh’ শীর্ষক প্রতিবেদন।) 

 

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের শিশু, কিশোর ও পরিবার সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ শিবলী সাদিক একই প্রতিবেদনে ঢাকার শিশুদের নিয়ে আইসিডিডিআর,বির গবেষণার প্রসঙ্গ তুলে শিক্ষার্থীদের স্ক্রিন ব্যবহারে সীমা টানার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্যে দৈনিক এক থেকে দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিনটাইম না রাখার বিষয়টি এসেছে। তবে এই পরামর্শকে সব বয়সী শিশুর জন্য একক বৈজ্ঞানিক সীমা হিসেবে দেখার আগে মূল গবেষণা ও নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন।

 

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এ বিষয়ে সতর্কতা ও গবেষণার সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। জার্মান সেন্টার ফর মেন্টাল হেলথের মুখপাত্র এবং রুর বিশ্ববিদ্যালয় বোখুমের অধ্যাপক ড. সিলভিয়া স্নাইডার বলেন, শিশু-কিশোরদের মিডিয়া ব্যবহার এবং উদ্বেগ-বিষণ্নতার মতো মানসিক সমস্যার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। তবে সম্পর্ক দেখা গেলেই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে স্ক্রিন ব্যবহারই মানসিক সমস্যার কারণ।

 

জার্মান সেন্টার ফর মেন্টাল হেলথের প্রেস রিলিজে তাঁর সতর্কতার সারকথা, তামাকের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে শক্ত প্রমাণ পেতেও দীর্ঘ সময় লেগেছিল। তাই ডিজিটাল মিডিয়ার ক্ষেত্রেও সতর্কতা ও আরও গবেষণা প্রয়োজন।

 

একই প্রতিষ্ঠানের গবেষক ড. ইসাবেল ব্রান্ডহোর্স্ট মনে করেন, স্ক্রিনের সামনে কাটানো সময়ের বিনিময়ে শিশুর বাস্তব অভিজ্ঞতা, সামাজিক সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত বিকাশের সুযোগ কমে যেতে পারে। তাঁর মতে, শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই হবে না; স্ক্রিন বন্ধ করার পর শিশুকে খেলাধুলা, সৃজনশীল কাজ ও অন্য আনন্দদায়ক কার্যক্রমের সুযোগও দিতে হবে।

 

ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জোয়ান লুবির বক্তব্যও এখানে প্রাসঙ্গিক। ‘Early Childhood Mental Health and Media Use’ শীর্ষক Children and Screens প্রতিবেদনে তিনি ব্যাখ্যা করেন, আবেগ চেনা, সহানুভূতি শেখা ও সামাজিক সমস্যা সমাধানের মতো দক্ষতা সরাসরি মানবিক মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। স্ক্রিন সেই অভিজ্ঞতার বিকল্প হতে পারে না।

 

নিউইয়র্ক-প্রেসবিটেরিয়ান ও ওয়েইল কর্নেল মেডিকেল সেন্টারের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. আন্দ্রেয়া বেথ টেমকিন-ইউ চাপ বা অস্বস্তির সময় নিজেকে শান্ত করতে শিশুর স্ক্রিনের ওপর নির্ভর করাকে সতর্কসংকেত হিসেবে দেখেছেন। নিউইয়র্ক-প্রেসবিটেরিয়ানের ‘Screen Addiction: How To Tell If Your Child’s Screen Use Is Harming Their Health’ শীর্ষক প্রতিবেদনে তিনি এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

 

এই বক্তব্যগুলো মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের মূল সতর্কতা হলো, শিশুর স্ক্রিন ব্যবহারের সময়ের পাশাপাশি তার দৈনন্দিন জীবনে কী পরিবর্তন হচ্ছে, সেটিও দেখতে হবে। শিশুকে শুধু বকাঝকা বা ফোন কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে সামলানোর চেষ্টা না করে নিয়মিত রুটিন, বিকল্প কার্যক্রম এবং প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তার দিকে নজর দিতে হবে।

 

শিশুর অধিকার শুধু ফোন কেড়ে নেওয়া নয়

শিশুর স্ক্রিন ব্যবহার নিয়ে আলোচনা অনেক সময় ফোন দেওয়া উচিত কি না, সেই প্রশ্নে এসে থামে। কিন্তু শিশুর অধিকার বিবেচনায় বিষয়টি আরও বিস্তৃত।

 

শিশুর নিরাপদে বেড়ে ওঠা, শিক্ষা, খেলাধুলা, বিশ্রাম, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নিজের মত প্রকাশের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইনে ক্ষতিকর কনটেন্ট বা অনুপযুক্ত যোগাযোগ থেকে সুরক্ষিত থাকাও প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে শেখা, তথ্য পাওয়া ও যোগাযোগের সুযোগও অস্বীকার করা যায় না।

 

আনাসের অভিজ্ঞতা দেখায়, ফোন নেওয়ার পর সে কেঁদেছিল, কিন্তু বল নিয়ে খেলতে ডাকলে বাইরে চলে গেছে। তুবাও ফোন রেখে খেলায় মন দিয়েছে। রাতুলের অভিজ্ঞতায় আবার ফোন বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের একটি মাধ্যম। তাই সব শিশুর জন্য একই ব্যাখ্যা বা একই ব্যবস্থা কার্যকর হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।

 

শিশুকে শুধু ফোন থেকে দূরে রাখলেই হবে না, তার জন্য বিকল্প আনন্দ ও শেখার সুযোগও তৈরি করতে হবে। নিরাপদ খেলার মাঠ, বই, সৃজনশীল কাজ, পরিবারের সঙ্গে সময় এবং বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি মেশার সুযোগ না থাকলে ফোনের বাইরে শিশুর অবসর কীভাবে পূরণ হবে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

 

অভিভাবকের ভূমিকার পাশাপাশি স্কুল, পরিবার এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের নিরাপদ পরিবেশ তৈরির দায়িত্বও আলোচনায় থাকা দরকার। শিশুর অনলাইন গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে, তাকে অপমান বা ভয় দেখিয়ে নয়, বোঝাপড়া ও বয়সোপযোগী নিয়মের মাধ্যমে নিরাপদ অভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে।

 

জরিপে স্ক্রিন ব্যবহারের বিকল্প হিসেবে ১৭টি উত্তরে বাইরে খেলাধুলা, ১০টিতে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং নয়টিতে আঁকা বা গানের মতো সৃজনশীল কাজের কথা এসেছে। বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি খেলাধুলার কথা এসেছে পাঁচটি উত্তরে, বই পড়ার কথা তিনটিতে।

 

এগুলো অভিভাবকদের মতামত। কিন্তু এর ভেতরেই একটা প্রয়োজনের ইঙ্গিত রয়েছে। শিশুর জন্য ফোনের বাইরে সময় কাটানোর সুযোগ যত বেশি থাকবে, তত বেশি বিকল্প তৈরি হতে পারে।

 

স্ক্রিনের সময় নয়, শিশুর দিনটা কেমন কাটছে

শিশুর মোবাইল ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের জায়গা আছে, কিন্তু সেই উদ্বেগের সমাধান একমাত্র ফোন কেড়ে নেওয়া নয়। শিশুটি কী দেখছে, কতক্ষণ দেখছে, কখন দেখছে এবং স্ক্রিনের কারণে তার ঘুম, খেলাধুলা, পড়াশোনা কিংবা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে কী পরিবর্তন হচ্ছে, সেগুলো একসঙ্গে দেখা জরুরি।

 

একই সঙ্গে প্রতিটি শিশুর অভিজ্ঞতা আলাদা হতে পারে। কেউ ফোন সরালে কাঁদে, কেউ সহজেই অন্য কাজে মন দেয়, কেউ আবার অনলাইন গেমের মাধ্যমে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। তাই নির্দিষ্ট আচরণ দেখেই শিশুকে ‘আসক্ত’ বলে চিহ্নিত করা ঠিক নয়। সমস্যার স্থায়িত্ব, দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব এবং বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।

 

এই প্রতিবেদনের জরিপে অংশ নেওয়া অনেক অভিভাবক মনোযোগ, বিরক্তি, জেদ ও আচরণগত পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। আবার কিছু উত্তরদাতা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখেননি। তিন গ্রামীণ অভিভাবকের মৌখিক অভিজ্ঞতাতেও তুলনামূলক স্বাভাবিক রুটিনের কথা এসেছে। এই বৈচিত্র্য মনে করিয়ে দেয়, শুধু স্ক্রিনের সময় দিয়ে শিশুর বিকাশের পুরো চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।

 

শিশুর হাতে ফোন আছে কি না, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি আরও কয়েকটি প্রশ্ন জরুরি। ফোনে সে কী দেখছে? কেন দেখছে? ফোন সরিয়ে দিলে তার প্রতিক্রিয়া কী? সে বাইরে খেলতে পারে কি? পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময় পায় কি? অনলাইনে নিরাপদ আছে কি? এছাড়াও অভিভাবকদের জানতে হবে কিডস মোড, প্যারেন্টাল কন্ট্রোল কীভাবে ব্যবহার করে, এসব আধুনিক বিষয় সম্পর্কে। 

 

শিশুর শৈশবের বড় একটি অংশ যদি স্ক্রিনের সামনে কাটে, তাহলে শুধু ঘণ্টা গুনে তার উত্তর পাওয়া যাবে না। বরং জানতে হবে, সেই সময়ের মধ্যে শিশুটি কী শিখছে, কার সঙ্গে যুক্ত থাকছে এবং স্ক্রিনের বাইরে তার নিজের জগৎটা কতটা বড় হয়ে উঠছে?

Popular post
হাইকোর্টের রুল জারি, কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতি কেন অবৈধ নয়

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে। 

কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতি বিতর্ক : উদ্বেগে দুই শতাধিক কর্মকর্তা

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।   

কৃষি ব্যাংকের ‘ভুয়া সিবিএ সভা’ ঘিরে চাঞ্চল্য

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে।  অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না প্যাথলজি-রেডিওলজি রিপোর্টে সরাসরি চিকিৎসকের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক

প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।

শুল্কমুক্ত সুবিধায় ব্যবসায়ীদের আগ্রহে ভাটা

পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না।   একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।   এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন।   গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে।   জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে।   সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে।   কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে।   প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে।   আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’   সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না।   এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।

অন্যান্য

আরও দেখুন
ছবি: সংগৃহীত
মাতারবন্দর নিয়ে ভারতের আগ্রহের নেপথ্যে কী?

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত মাসের শেষ সপ্তাহে টোকিও সফরে গিয়েছিলেন, সেখানে দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় নতুন করে উঠে এসেছে জাপানের বিগ-বি প্রকল্প।   সফরে জাপান এবং বাংলাদেশের ফ্ল্যাগশিপ এই প্রকল্প নতুন স্তরে উন্নীত হয়েছে। যেটাকে যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে ‘বিগ-বি ফর শেয়ারড প্রসপ্যারিটি’ বা অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিগ-বি উদ্যোগ। কিন্তু এই বিগ-বিকে ঘিরে দুটো বিষয় নিয়ে বিশেষ আলোচনা হচ্ছে।   একটি হচ্ছে, যৌথ ঘোষণায় কানেক্টিভিটির প্রসঙ্গ। আরেকটি হচ্ছে, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের উল্লেখ এবং এর গুরুত্ব স্বীকার করে নেওয়া।   বিশেষত কানেক্টিভিটির নামে ভারতকে কোনো বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। দেশটির প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ঢাকায় এক জনসভায় এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যদিও সরকার জানাচ্ছে, এ ধরনের কোন উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু বিগ-বি উদ্যোগকে ঘিরে বাংলাদেশের মাতারবাড়িতে আসলে কী হচ্ছে?    বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিকল্পনা থেকে যেভাবে গভীর সমুদ্রবন্দর মাতারবাড়ি হচ্ছে বাংলাদেশের সমুদ্রতীরবর্তী কক্সবাজার জেলার একটি ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নে বাংলাদেশ-জাপান প্রথমে একটি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছিল। সেটাও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ আমলে। সেই সময় চুক্তি হওয়ার পর এর কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। সরাসরি সমুদ্রের তীরে না করে সমুদ্র থেকে ১৪ কিলোমিটার ভেতরে মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়িতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কাজ শুরু হয়। যেহেতু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কয়লাভিত্তিক ফলে কেন্দ্রে কয়লা আনা-নেওয়ার জন্য তৈরি করা হয় নৌ-চ্যানেল।   সমুদ্রের তীর থেকে মাটি কেটে সার্বক্ষণিক কয়লা পরিবহনের জন্য ২৫০ মিটার চওড়া এবং ১৪ কিলোমিটার লম্বা চ্যানেল তৈরির কাজ শুরু হয়।   তবে ২০১৭ সালে জাইকা যে প্রাক-সমীক্ষা করে, সেখানে নতুন আরেকটি প্রস্তাব নিয়ে আসে সংস্থাটি। ঐ সমীক্ষার প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চ্যানেলের সামান্য পরিবর্তন ঘটিয়ে চ্যানেলের দক্ষিণ দিকে বাণিজ্যিক বন্দর স্থাপন করা সম্ভব। প্রস্তাব করা হয়, যেই চ্যানেলটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা পরিবহনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে সেই চ্যানেলের ওপরই একটি বাণিজ্যিক বন্দর হতে পারে। একই চ্যানেল ব্যবহার করে দুটি প্রকল্পের কার্যক্রম করা হলে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার যেমন হবে, তেমনই ব্যয় সাশ্রয়ী হবে। পরবতীকালে এই প্রস্তাব গ্রহণ করে বাংলাদেশ। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র শেষপর্যন্ত গিয়ে ঠেকে গভীর সমুদ্র বন্দরে। চ্যানেলের গভীরতা এবং প্রশস্ততাও বাড়ানো হয়। আর এখন সেই গভীর সমুদ্র বন্দরের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে উৎপাদন ও রফতানি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কাজ।   এখন মাতারবাড়িতে বিগ-বি’র আওতায় কী হচ্ছে? ‘বিগ-বি’র পূর্ণ নাম হচ্ছে ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ ইনিশিয়েটিভ।’ এটি বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামকে ঘিরে জাপানের একটি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ পরিকল্পনা। জাপান মাতারবাড়ীতে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে একটি শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এ কারণে গভীর সমুদ্রবন্দর ছাড়াও পণ্য সরবরাহের জন্য সেখানকার সার্বিক পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করার পরিকল্পনা নিয়ে প্রায় এক দশক ধরে কাজ করছে দেশটি। এর আওতায় সেখানে ইতোমধ্যেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হয়েছে। আরেকটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রও স্থাপন হচ্ছে। এরপর হবে এলএনজি টার্মিনাল, হবে গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্পাঞ্চল।  বিগ বি নিয়ে জাপান-বাংলাদেশ যৌথ ঘোষণায় মূলত চারটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঐ অঞ্চলে কানেক্টিভিটি তৈরি করা, যার মূল ভিত্তি হবে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ, যার আওতায় আগামী পাঁচ বছরে ছয় বিলিয়ন ডলারেরও বেশি জাপানি বিনিয়োগ আসবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসা, যার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি পাবে বাংলাদেশ।   জানতে চাইলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, তারা মূলত বাংলাদেশকে একটি রফতানি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চান।   তিনি বলেন, ‘মাতার বাড়িতে আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে গভীর সমুদ্র বন্দর এবং তাকে কেন্দ্র করে জ্বালানি, লজিস্টিকস, তারপরে অর্থনৈতিক এবং শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা। এখানে আমরা কিন্তু পরিকল্পিত নগরও গড়ছি, যাতে করে এটা একটা গ্লোবাল রফতানির কেন্দ্র হতে পারে। আমরা চেষ্টা করব সেটাকে পূর্ব এশিয়ার দেশ হোক, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার হোক, ভারত মহাসাগরকে কেন্দ্র করে কিংবা আফ্রিকা -সব জায়গায় এটাকে নিয়ে যেতে।’ ঋণ শোধ করতে হবে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক রফতানির কেন্দ্র হওয়ার জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, শিল্পকলকারখানা, সমুদ্রবন্দর এবং যোগাযোগব্যবস্থাসহ যা যা অবকাঠামো দরকার, তার সবই করা হচ্ছে মাতারবাড়িতে। এর জন্য যে বিপুল বিনিয়োগ দরকার, সেটাও দেবে মূলত জাপান। কিন্তু এর ঋণ শোধ করতে হবে বাংলাদেশকে।   ফলে প্রশ্ন উঠছে, জাপানের আগ্রহ বিশেষত মাতারবাড়িকে ঘিরে যে বিপুল বিনিয়োগ, তাতে বাংলাদেশ শেষপর্যন্ত কতটা লাভববান হবে?   বাংলাদেশের একজন অর্থনীতিবিদ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এই প্রকল্পে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে বাংলাদেশের।   গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন ‘বলা হচ্ছে যে এখানে প্রায় ষাট থেকে পঁয়ষট্টি বিলিয়ন ডলারের একটা বিনিয়োগ হবে এবং এই বিনিয়োগের মধ্যে আটচল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বিলিয়ন ডলারই বেসরকারি বিনিয়োগ হবে। যেই বিনিয়োগগুলো মূলত জাপানিজ বিনিয়োগকারীরা নিয়ে আসবে’।   তার মতে, জাপানি বিনিয়োগের পথ ধরেই উন্নতি হবে অর্থনীতিতে। তিনি বলেন, ‘জাপানের মত বড় বিনিয়োগকারীরা যদি তাদের বিনিয়োগ নিয়ে আসেন তাহলে একই সাথে তো শুধু তার পণ্য আসবে না। এখানে একই সাথে তাদের একটা প্রযুক্তিও আসবে। তখন সেটা আমাদের লোকাল বিনিনিয়োগকেও আরো বেশি উৎসাহিত করবে জয়েন্ট ভেঞ্চারে যাওয়ার। কারণ এগুলোর সঙ্গে যে সাপ্লাই চেইনগুলো গড়ে উঠবে, সেই সাপ্লাই চেইনগুলো তখন এখানে গড়ে ওঠার সুযোগ পাবে। বলা হচ্ছে, এর ফলে প্রায় আটাশ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে সেই জায়গা জুড়ে। এটা ঘটবে কয়েক দশক ধরে।’   ভারত নিয়ে সংশয় কেন? বাংলাদেশে মাতারবাড়ি প্রকল্পের চুক্তি হয় আওয়ামী লীগ আমলে ২০২৪ সালে। চুক্তিটি হয়েছিলো জাপানের সঙ্গে। তখন প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটানকে মিলিয়ে একটি বৃহৎ বাজারের ধারণাকে মাথায় রেখে এই পরিকল্পনা সামনে নিয়ে এসেছিল জাপান।   ২০১৪ সালের মে মাসে বাংলাদেশের তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের সময় দেশটির তখনকার প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ‘বিগ-বি’ ধারণাটি প্রথমে সামনে নিয়ে এসেছিলেন।   শিনজো আবে বিগ-বি ধারণাটি সামনে আনার পর ২০১৪ সালের জুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে এক অনুষ্ঠানে এই ধারণাটির আনুষ্ঠানিক একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তখনকার জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি বা জাইকা’র প্রেসিডেন্ট আকিহিকো তানাকা।   তিনি বলেছিলেন, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকে কেন্দ্র করে শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়টি এই ধারণার মূল ভিত্তি। আর এর দ্বিতীয় ভিত্তি হবে জ্বালানি এবং তৃতীয়টি হলো পরিবহন ব্যবস্থা।   অর্থাৎ গভীর সমুদ্র বন্দরটির মাধ্যমে ব্যবসা বাণিজ্যের একটি বৈশ্বিক হাব হবে মাতারবাড়ী এবং সেখানকার বিদ্যুৎ দিয়েই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে। আর পরিবহন ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হবে প্রতিবেশী দেশগুলো পর্যন্ত। পরে শেখ হাসিনা ঢাকায় মাতারবাড়ীকে নিয়ে বিস্তৃত পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এটি তখনকার আওয়ামী লীগ সরকারের একটি বিশেষ পরিকল্পনা হিসেবেও গৃহীত হয়েছিল।   এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে জাপানের তখনকার প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার ভারত সফরের সময় বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে এই শিল্পাঞ্চলের প্রস্তাব উঠে আসে। অর্থাৎ বিগ-বি উদ্যোগ এবং একে ঘিরে মাতারবাড়ি প্রকল্পে সবসময়ই প্রাসঙ্গিক ছিলো ভারত।   কিন্তু এখন ২০২৬ সালে যখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপি, তখন বিগ-বি উদ্যোগ নতুন উচ্চতায় নিতে সম্মত হয়েছে জাপান-বাংলাদেশ দুই দেশই। অর্থাৎ প্রকল্পের ধারাবাহিকতা আরো জোরদার হয়েছে।   যদিও তারেক রহমানের জাপান সফরে যে যৌথ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেখানে বিগ-বি নিয়ে সরাসরি ভারত বা অন্য কোন দেশের নাম উল্লেখ নেই। কিন্তু ঘোষণায় কানেক্টিভিটি প্রসঙ্গ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে মাতারবাড়িকে গড়ে তোলার যে কথা বলা হচ্ছে, সেটাতেই স্পষ্ট এই প্রকল্প শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়। এবং এখানে প্রতিবেশি দেশগুলো বিশেষত ভারত প্রাসঙ্গিক।   ফলে এই প্রকল্পে কানেক্টিভিটির মাধ্যমে ভারতকে সুবিধা দেওয়া হবে, এমন সন্দেহ করছেন কেউ কেউ। আর এই সন্দেহ দেখা যাচ্ছে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে, যেখানে ভারত সবসময়ই একটি স্পর্শকারতর ইস্যু।   গত ৩১শে অক্টোবর ঢাকায় এক সমাবেশে ভারতের নাম উল্লেখ না করেই মাতারবাড়ি প্রকল্পে কৌশলে ভারতকে কানেক্টিভিটি দেয়া হচ্ছে কিনা- সেই প্রশ্ন তুলতে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে।   মাতারবাড়ি গভীর বন্দর নিয়ে কোনো লোকচুরি হচ্ছে কিনা, জাতি তা পরিষ্কার জানতে চায়। কানেক্টিভিটির নামে বাংলাদেশকে কারো কাছে ইজারা দেওয়া চলবে না বলে হুশিয়ারি দেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান।   কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মাতারবাড়িতে কানেক্টিভিটি নিয়ে জামায়াতের যে উদ্বেগ, সেটা ঠিক কী কারণে? এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে দলটির পক্ষ থেকে নতুন করে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।   তবে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, জাপানের সঙ্গে যৌথ ঘোষণা বা যেসব অ্যাগ্রিমেন্ট হয়েছে, সেগুলো বিস্তারিত যাচাই-বাছাই করে তারা পরে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করবেন।   তবে বিস্তারিত না জানলেও জামায়াতসহ কোনো কোনো রাজনৈতিক দল যে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে, তাতে এটা স্পষ্ট তাদের উদ্বেগ মূলত এই প্রকল্পে ভারতের সম্পৃক্ততা বিশেষকরে এর মাধ্যমে ভারত করিডোর বা ট্রান্সশিপমেন্টের সুবিধা পাচ্ছে কিনা, সেটা নিয়ে। জানতে চাইলে সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বলেন, বিগ-বি’র অর্থনৈতিক মডেল চমৎকার। তবে এখানে ভারতের মতো দেশকেও যদি সুবিধা দিতে হয়, তাহলে সেটা করার আগে বাংলাদেশের ভেতরে রাজনৈতিক ঐকমত্য লাগবে।   তিনি বলেন, ‘আমাদেরকে বলা হচ্ছে ইন্ডিয়ার সাথে কানেক্টিভিটি করে আমরা একটা একত্রিত বা একিভূত মার্কেট তৈরি করতে পারি কিনা। এই অর্থনৈতিক চিন্তা ভালো চিন্তা। কিন্তু এই চিন্তার আগে যে রাজনৈতিক যে ঐকমত্য লাগে, সেই রাজনৈতিক ঐকমত্য হয় নাই। আমি মনে করি আগে রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি করতে হবে।’   তিনি আরও বলেন, ‘যদি রাজনৈতিক ঐকমত্য হয় তাহলে আমরা অর্থনৈতিক একীভূতকরণের দিকে যেতে পারি। আর যদি আমরা রাজনৈতিক সমঝোতা না করি, তাহলে আমি মনে করি আমরা বিরাট সমস্যার মধ্যে পড়বো এবং এটা তখন বাস্তবায়ন হবে না।’   ভূ-রাজনীতি নিয়েও প্রশ্ন কিন্তু সমস্যা শুধু ভারতকে নিয়ে নয়। একইসঙ্গে চীন এই বিগ-বি প্রকল্পকে কীভাবে দেখবে, সেই প্রসঙ্গও উঠছে। কারণ বিগ-বির দ্বৈত ঘোষণায় জাপান বলেছে মুক্ত, স্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিকের কথা।   এই ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি উদ্যোগ। যেটাকে চীন দেখে থাকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তাকে ঘিরে ফেলার মার্কিন চেষ্টা হিসেবে। জাপান হচ্ছে, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।   অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সম্প্রতি এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, জাপান বিগ-বি ধারণায় ভারতকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং ধাপে ধাপে আঞ্চলিক আরও দেশগুলোর সাথে বিগ-বির বিষয়টি সামনে আসতে পারে।   তিনি বলেন, ‘এখানে ভূ-রাজনৈতিক বিষয় আছে। কারণ জাপান পুরো অঞ্চলকে ঘিরেই কাজ করছে। এর একটি উদ্দেশ্য হলো অঞ্চলটিকে বড় শক্তির প্রভাব বলয়ের বাইরে রেখে জাপানি বিনিয়োগের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করা।’   এছাড়া বাংলাদেশে চীনের প্রভাব কমাতে জাপান দেশটিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে এমন ধারণাও আছে। ফলে এমন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা।   খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, বাংলাদেশকে মূল ফোকাস দিতে হবে অর্থনীতিতে। তিনি বলেন, ‘পার্টিকুলারলি আমাদের জন্য চাইনিজ বিনিয়োগ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, একইসঙ্গে কৌশলগতভাবে চায়নার সম্পর্কটাও আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক একইভাবে আমরা আঞ্চলিক পার্টনার হিসেবে ভারতের সঙ্গে যে একটা বড় বাজার রয়েছে সেটিকেও গুরুত্বের সাথে দেখার দরকার আছে। সুতরাং এই জায়গাটিতে দুটো সম্পর্ককে পাশাপাশি রেখে কোন জোটেই খুব বড়ভাবে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত না হয়ে কীভাবে বাংলাদেশ তার ইকোনমিক মাইলেজ (অর্থনৈতিক সুবিধা) নিতে পারে সেরকম কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন’।   একইরকম মত দেন সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে জাপানের সাথেও থাকতে হবে। আমেরিকার সাথেও থাকতে হবে। একই সঙ্গে চায়নার সঙ্গেও সহযোগিতা বাড়াতে হবে। এটা বলা যতটা সহজ করা ততটা সহজ না। কিন্তু আমার মনে হয় এইটাই হচ্ছে পথ।’   কিন্তু সরকার এক্ষেত্রে কী করবে? জানতে চাইলে সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন ভারসাম্যের কথা। তিনি বলেন, ‘সকল দেশের সাথেই আমরা বিনিয়োগে উৎসাহী এবং সেভাবেই কিন্তু সব হচ্ছে। যেমন ইতিমধ্যেই চীন থেকে চট্টগ্রাম এবং মংলা বন্দরে অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগ হচ্ছে। একই সঙ্গে যদি আমরা চট্টগ্রামের কথা চিন্তা করি তাহলে দেখব সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ আছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ আছে, ঠিক একই সাথে ইউরোপের দেশও আছে।’   মাতারবাড়ি সবার জন্যই উন্মুক্ত থাকবে বলে যোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘এটা সকলের জন্যেই কিন্তু অবারিত যে আমাদের সাথে তারা প্রস্তাব দিতে পারে এবং প্রস্তাবের যৌক্তিক ভিত্তি বিবেচনা করে, বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনা করে তারপর তাদের প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করা হবে।’

মোঃ ইমরান হোসেন নভেম্বর ০৭, ২০২৬

ঢাকার আকাশ আজ পরিষ্কার ও আবহাওয়া শুষ্ক থাকার সম্ভাবনা

ছবি: সংগৃহীত

তিন মাসের শীত মৌসুমে দেশজুড়ে ৪–৬টি শৈত্যপ্রবাহের পূর্বাভাস

ছবি: এআই

দেশের পাঁচ বিভাগে বজ্রসহ বৃষ্টির পূর্বাভাস

তিন মাসে দেশজুড়ে ৪ থেকে ৬টি শৈত্যপ্রবাহের আভাস

দিনের বেলায় রোদের প্রখরতা এখনো সেভাবে কমেনি। তবে মাঝরাতে ফ্যানের গতি কমিয়ে আনা কিংবা শেষরাতে গায়ে জড়িয়ে নেওয়া কাঁথা জানান দিচ্ছে, শীত কড়া নাড়ছে দুয়ারে। কংক্রিটের শহরে শীতের পদধ্বনি কিছুটা ধীর হলেও উত্তরের গ্রামগুলোতে বইতে শুরু করেছে হিমেল হাওয়া। সেখানকার বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর নদীতীর এরই মধ্যে ঢাকতে শুরু করেছে ভোরের স্নিগ্ধ কুয়াশায়।   প্রকৃতির এই শান্ত পালাবদলের মাঝেই শীত নিয়ে বড় বার্তা দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। জানানো হয়েছে, আগামী ৩ মাসে দেশের ওপর দিয়ে ৪ থেকে ৬টি মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।   চলতি নভেম্বর থেকে আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ের এই দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, শীত মৌসুমে দেশে কয়েক দফা শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। সেই সঙ্গে কুয়াশা, লঘুচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনার কথাও জানানো হয়েছে।   অধিদপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ও দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটির চেয়ারম্যান মো. মমিনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত তিন মাসে দেশে ৪ থেকে ৬টি মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে ২ থেকে ৩টি শৈত্যপ্রবাহ তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।    অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে মাঝারি এবং ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে নামলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। আর তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রির নিচে নেমে এলে তাকে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়।   শৈত্যপ্রবাহ কখন ও কোথায় বেশি হতে পারে, জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বাসসকে বলেন, সাধারণত ডিসেম্বর মাসে এক থেকে দুটি মৃদু ধরনের শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে, অর্থাৎ রাজশাহী, রংপুর এবং খুলনা বিভাগের কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে আসতে পারে। সেই সব জায়গায় মৃদু ধরনের শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে।   তবে জানুয়ারিতে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় কখনো কখনো একটি বা দুটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে, যেখানে তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকবে বলে জানান তিনি।   তিন মাসের এই সময়ে শেষরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের কোথাও কোথাও এবং নদ-নদীর অববাহিকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। দেশের অন্যান্য এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।    পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ঘন কুয়াশার কারণে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে আসতে পারে। এতে শীতের অনুভূতি বাড়তে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে এ সময়ে দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে।   এর কারণ ব্যাখ্যা করে ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, যেহেতু এল নিনো সক্রিয় এবং পৃথিবী উষ্ণ হয়ে আছে, ফলে এর ছোঁয়া বাংলাদেশেও লেগেছে। শুধু তাই নয় দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে এর প্রভাব থাকবে। ফলে গড় তাপমাত্রা একটু বেশি থাকবে। এজন্য আমরা বলছি, এবার শীতকালে তাপমাত্রা স্বাভাবিক অপেক্ষা বেশি থাকবে। তবে কখনো কখনো তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নেমে এসে শৈত্যপ্রবাহ থাকবে।   তিনি বলেন, শৈত্যপ্রবাহ থাকবে, কিন্তু অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহের দিনক্ষণ, সংখ্যা ও ব্যাপ্তি অনেকটাই কম থাকবে। এজন্য আমরা বলছি, এবারের শীতকাল কিছুটা ‘উষ্ণ’ থাকতে পারে।   তিনি আরও বলেন, এল নিনো সক্রিয় থাকার কারণে শৈত্যপ্রবাহ কয়দিন থাকবে, কয়বার হবে, এসব বিষয়ে একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সেই কারণে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। তবে এবার সার্বিকভাবে কিছুটা উষ্ণ শীতকাল পাবো বলে আমরা আশা করছি।   শীতের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে পূর্বাভাসে। এতে বলা হয়, আগামী তিন মাসে বঙ্গোপসাগরে ২ থেকে ৪টি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে এক থেকে দুটি লঘুচাপ ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে।   এ বিষয়ে ড. আবুল কালাম মল্লিক বাসস’কে বলেন, আমাদের দেশে অক্টোবর ও নভেম্বর মাস ঘূর্ণিঝড়প্রবণ। প্রতিবছরই এ সময়টাতে লঘুচাপ তৈরি হয়। কখনো কখনো এটি শক্তি অর্জন করে ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নেয়।   তিনি বলেন, এ সময় সূর্যের দক্ষিণায়ন থাকে। ক্রমশ দিনের দৈর্ঘ্য কমতে থাকে, রাতের দৈর্ঘ্য বাড়ে এবং বঙ্গোপসাগর বরাবর সূর্যের আলোর প্রাপ্যতা বেশি থাকে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ে।    তিনি আরও বলেন, এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে সব বছর ঘটে না, মাঝে মাঝে ঘটে। এজন্য একে বলা হয় ট্রানজিয়েন্ট (ক্ষণস্থায়ী) সিস্টেম।    বৃষ্টিপাতের বিষয়ে বলা হয়েছে, এই তিন মাসে দেশে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভাগভিত্তিক পূর্বাভাসে দেখা যায়, নভেম্বরে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হতে পারে চট্টগ্রাম বিভাগে, ৩৫ থেকে ৪০ মিলিমিটার। বরিশাল বিভাগে ৩০ থেকে ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকা, সিলেট ও খুলনা বিভাগে ১৫ থেকে ২৫ মিলিমিটার, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার এবং রংপুর বিভাগে ৪ থেকে ৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে।   ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে বৃষ্টি আরও কমে আসবে। ডিসেম্বরে ঢাকা বিভাগে ৮ থেকে ১০ মিলিমিটার এবং সিলেট বিভাগে ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে। জানুয়ারিতে খুলনা বিভাগে ১০ থেকে ১৪ মিলিমিটার এবং ঢাকাসহ অন্যান্য বিভাগে ৬ থেকে ১০ মিলিমিটারের মধ্যে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।   আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাত্ত, ঊর্ধ্বাকাশের আবহাওয়া বিন্যাস, জলবায়ু মডেল এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা অনুমোদিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের মডেল পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে এই পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে। এল নিনো ও লা নিনা পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।   দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস কীভাবে তৈরি হয়, তা ব্যাখ্যা করে ড. মল্লিক বলেন, ১৯৪৮ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে বঙ্গোপসাগরে কতটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়, তার তথ্য বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি, এ সময় গড়ে এক থেকে তিনটি লঘুচাপ থাকে। এর কোনো কোনোটি কখনো কখনো শক্তি সঞ্চয় করে। দীর্ঘ সময়ের এমন গড় চিত্রের ভিত্তিতেই দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস দেওয়া হয়।   তবে এ ধরনের পূর্বাভাসে অনিশ্চয়তার মাত্রা অনেক বেশি থাকে বলে মনে করিয়ে দেন এই আবহাওয়াবিদ। তাই দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসের পাশাপাশি নিয়মিত দৈনন্দিন পূর্বাভাসকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।   এদিকে, গত অক্টোবর মাসে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৬৮ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। অক্টোবরে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় সিলেটে ৩৭.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ১৭ অক্টোবর। আর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ১৫.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২৭ অক্টোবর। গত মাসে দেশের সর্বোচ্চ, সর্বনিম্ন ও গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে যথাক্রমে ১.৮, ০.৪ ও ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।

জান্নাতুল ফেরদৌস জেমি নভেম্বর ০৬, ২০২৬

চলতি শীত মৌসুমে ৬টি শৈত্যপ্রবাহের শঙ্কা, নামতে পারে তাপমাত্রা

ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার রায় ১৯ নভেম্বর

ফাইল ছবি

তাপমাত্রা নিয়ে নতুন পূর্বাভাস দিল আবহাওয়া অফিস

ছবি: সংগৃহীত
সুদি কারবারির সঙ্গে মেয়ের বিয়ে: শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি ও করণীয়

মেয়ের বিয়ে প্রতিটি মা-বাবার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। প্রত্যেক সচেতন অভিভাবকেরই চাওয়া থাকে, মেয়ের জামাতা যেন দ্বীনদার, সৎ, নৈতিক চরিত্রবান এবং দায়িত্বশীল হন। কারণ বিয়ে কেবল দুজন মানুষের সামাজিক মেলবন্ধন নয়; এটি একটি নতুন পারিবারিক জীবনের সূচনা, যা উভয় পক্ষের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।     কিন্তু বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে অনেক সময় দেখা যায়, প্রস্তাব আসা পাত্রের উপার্জনের সঙ্গে সরাসরি সুদ বা অবৈধ আর্থিক লেনদেন সম্পৃক্ত। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই অভিভাবকদের মনে সংশয় জাগে—সুদ বা হারাম উপার্জনে জড়িত ব্যক্তির কাছে মেয়েকে বিয়ে দেওয়া কি শরিয়তসম্মত? তার এই উপার্জনের প্রভাব কি নতুন সংসারজীবনে পড়বে? পাত্রের অন্যান্য গুণ ভালো হলেও কেবল সুদি পেশায় থাকার কারণে অভিভাবকের কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত? কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনার আলোকে বিষয়টির শরয়ি সমাধান বিশ্লেষণ করা যাক।     ১. ইসলামে সুদের ভয়াবহতা ও অবস্থান ইসলামি শরিয়তে সুদকে সবচেয়ে মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক কবিরা গুনাহগুলোর অন্যতম হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ—যেকোনোভাবে সুদের প্রক্রিয়ায় জড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন— وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا ‘আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৭৫)     মুমিনদের সুদের যাবতীয় অবশিষ্টাংশ বর্জনের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা আরও এরশাদ করেন— يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৭৮)     সুদের পাপের বিস্তৃতি কেবল এর প্রত্যক্ষ গ্রহীতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই সমান অপরাধী। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন— لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং এর দুই সাক্ষীকে অভিশাপ দিয়েছেন। আর বলেছেন, তারা সবাই (গুনাহের ক্ষেত্রে) সমান।’ (সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮)     সুতরাং সুদি কারবারকে কোনোভাবেই হালকা বা সাধারণ পেশা ভাবার অবকাশ নেই; এটি আল্লাহর বিধানে চূড়ান্ত পর্যায়ের অবাধ্যতা।       ২. সুদি কারবারির সঙ্গে মেয়ের বিয়ে কি বৈধ? বিষয়টি পর্যালোচনার ক্ষেত্রে পাত্রের ব্যক্তিগত সুদি কারবারে লিপ্ত থাকা এবং তার সঙ্গে বিবাহবন্ধনের বৈধতার শরয়ি দিকটির সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝা জরুরি।     ইসলামি আইনশাস্ত্র অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি সুদের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে তার সঙ্গে সম্পন্ন হওয়া আকদ বা বিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বা অবৈধ হয়ে যায় না। তবে কোনো ব্যক্তি যদি জেনেবুঝে হারাম সুদি লেনদেনে অবিচল থাকে এবং তা থেকে তওবা না করে, তবে তা তার দ্বীনদারির মারাত্মক ঘাটতি ও নৈতিক স্খলনের স্পষ্ট প্রমাণ।   এমন পাত্রের ব্যাপারে অভিভাবকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। বিশেষ করে সে যদি সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার বিধান জানা সত্ত্বেও তা বর্জন করতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে মেয়ের দ্বীন ও আখিরাতের সুরক্ষায় তাকে পাত্র হিসেবে প্রত্যাখ্যান করাই বিচক্ষণ অভিভাবকের দায়িত্ব।     শাইখ ইবনে বায (রহ.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, একজন পাত্র সুদভিত্তিক ব্যাংকে চাকরি করেন এবং বিকল্প কাজ না পাওয়া পর্যন্ত তা ছাড়তে নারাজ; এমন পাত্রের কাছে মেয়েকে বিয়ে দেওয়া সমীচীন হবে কি না? জবাবে তিনি পরিষ্কারভাবে অভিমত দেন—পাত্রের মানসিকতা ও অবস্থা যদি এমন হয়, তবে সে ওই চাকরিতে বহাল থাকা অবস্থায় তার কাছে মেয়েকে পাত্রস্থ না করাই বাঞ্ছনীয়। সুতরাং অভিভাবকদের উচিত পাত্রের পেশাগত স্বচ্ছতার বিষয়ে আপসহীন থাকা এবং তাকে হালাল উপার্জনে ফিরে আসার জোরালো তাগিদ দেওয়া।     ৩. পাত্র নির্বাচনে দ্বীনদারি ও চরিত্রের অগ্রাধিকার পাত্রের পদমর্যাদা বা সম্পদের চেয়ে তার দ্বীনদারির মূল্যায়নকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। তিনি ইরশাদ করেছেন— إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ ‘তোমাদের কাছে এমন কেউ বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলে, যার দ্বীনদারি ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট, তাহলে তার সঙ্গে বিয়ে দাও।’ (জামে তিরমিজি: ১০৮৪)   এই নির্দেশনায় স্পষ্ট যে, বৈষয়িক প্রাচুর্য, বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ি বা সামাজিক প্রতিপত্তি দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। বরং পাত্রের নিয়মিত সালাত, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা, আমানতদারি, হালাল-হারামের বাছবিচার ও সুন্দর আচরণই হওয়া উচিত প্রধান মাপকাঠি।     ৪. পরিবারে হারাম উপার্জনের প্রভাব হারাম উপার্জন মানুষের জীবনে বরকত ও মানসিক প্রশান্তি কেড়ে নেয় এবং মহান আল্লাহর অসন্তুষ্টি ডেকে আনে। একজন মুমিনের প্রতিটি লোকমা হালাল হওয়া জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।’ (সহিহ মুসলিম: ১০১৫)     তবে ব্যবহারিক মাসআলার ক্ষেত্রে স্বামীর উপার্জনে হারামের মিশ্রণ থাকলেই সংসারের প্রতিটি পাই-পয়সা স্ত্রীর জন্য ঢালাওভাবে হারাম হয়ে যায়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। উপার্জনের প্রকৃত ধরন, অর্থের মূল উৎস এবং স্ত্রীর নিরুপায় অবস্থার ওপর অনেক বিধান নির্ভর করে। তা সত্ত্বেও পারিবারিক জীবনের বরকত নিশ্চিত করতে বিয়ের প্রস্তাবের সময়ই পাত্রের উপার্জনের মাধ্যম শতভাগ হালাল করার ব্যাপারে শর্ত দেওয়া আবশ্যক।     ৫. পাত্র অতীত থেকে তওবা করলে করণীয় কোনো পাত্র অতীতে সুদের কারবারে জড়িত থাকলেও যদি সে আন্তরিক অনুশোচনা নিয়ে তা পুরোপুরি পরিহার করে এবং হালাল বিকল্পের সন্ধানে সচেষ্ট হয়, তবে তার অতীতের কারণে তাকে আজীবনের জন্য অনুপযুক্ত ঘোষণা করা শরিয়তের উদ্দেশ্য নয়। মহান আল্লাহ তাওবাকারীদের জন্য তাঁর ক্ষমার দ্বার উন্মুক্ত রেখে ঘোষণা করেন— قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ‘বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা আয-যুমার: আয়াত ৫৩)     সুতরাং পাত্রের মধ্যে যদি আন্তরিক তাওবার প্রতিফলন দেখা যায় এবং সে বৈধ উপার্জনের প্রতি যত্নবান হয়, তবে তার সার্বিক দ্বীনদারি বিবেচনায় নিয়ে বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করা যেতে পারে।     ৬. কন্যার স্পষ্ট মতামত ও সম্মতি পাত্র নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়ায় কন্যার মতামতকে উপেক্ষা করার সুযোগ ইসলামে নেই। জোরপূর্বক অভিভাবকের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) দ্ব্যর্থহীনভাবে আদেশ করেছেন— لَا تُنْكَحُ الْأَيِّمُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ، وَلَا تُنْكَحُ الْبِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ ‘বিধবা বা পূর্বে বিবাহিত নারীকে তার পরামর্শ ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না এবং কুমারী মেয়েকেও তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না।’ (সহিহ বুখারি: ৫১৩৬, সহিহ মুসলিম: ১৪১৯)     মেয়ের বিয়ে কেবল একজন সচ্ছল ব্যক্তির হাতে কন্যাকে তুলে দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি এমন একজন দ্বীনি অভিভাবক ও জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়ার বিষয়, যার ছায়াতলে একটি মেয়ে নিরাপদে তাঁর ঈমান ও আমল সংরক্ষণ করতে পারবে।     সুদি কারবারে লিপ্ত ব্যক্তির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া আইনগতভাবে বাতিল না হলেও, সচেতনভাবে সুদে যুক্ত থাকা ব্যক্তিকে জামাতা হিসেবে বরণ না করাই সতর্কতামূলক ও কল্যাণকর সিদ্ধান্ত। আর যে ব্যক্তি ভুল বুঝতে পেরে সুদের কারবার ছেড়ে হালাল পথে ফিরে এসেছে, তার প্রস্তাব বিবেচনায় রাখা ইসলামের ক্ষমার নীতির অংশ।

মারিয়া রহমান নভেম্বর ০৩, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

শক্তি বাড়িয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়েছে ‘মুরাসু’, সর্বশেষ পরিস্থিতি যা জানা গেল।

সংগৃহীত ছবি

রমজানের প্রস্তুতি : ১০০ দিন আগ থেকেই যেসব কাজ শুরু করতে হবে

পারটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রয়াত এম এ হাসেমের ছেলে শওকত আজিজ রাসেল। ছবি: সংগৃহীত

দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হাসেমপুত্র রাসেল কারাগারে

0 Comments