জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের লক্ষ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
আজ বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, জাপান বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক বন্ধন দৃঢ় করা এবং এলডিসি গ্রাজুয়েশনের পর জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সংরক্ষণের লক্ষ্যে (বাংলাদেশ জাপান ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট) চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
এই চুক্তির অন্যান্য উদ্দেশ্য হলো— বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগকারীদের আস্থা সুদৃঢ়করণ ও দীর্ঘমেয়াদি জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ। চুক্তির আওতায় পণ্য, সেবা বাণিজ্য, শুল্ক, বিনিয়োগ, বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং মেধাস্বত্বসহ (ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই প্রথম বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপানের সঙ্গে ইপিএ স্বাক্ষর করবে।
বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ নেগোসিয়েশনের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে গঠিত যৌথ গবেষণা দল তাদের প্রতিবেদন ২৭ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে উভয় দেশ একযোগে প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে ১৭টি সেক্টর অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত পদ্ধতিতে নেগোসিয়েশন পরিচালনার সুপারিশ করা হয়।
বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ নেগোসিয়েশন শুরুর লক্ষ্যে উভয় দেশ একযোগে ১২ মার্চ ২০২৪ তারিখে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এই চুক্তির গুরুত্ব বিবেচনায় অন্তর্বর্তী সরকার নভেম্বর ২০২৪ থেকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে কার্যক্রম শুরু করে এবং এক বছরের মধ্যে চুক্তিটি সম্পন্ন করার একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে।
চুক্তিটি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি হিসেবে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সাথে সেক্টরভিত্তিক এবং সামগ্রিক চুক্তি নিয়ে একাধিক সভা হয়েছে। সম্মত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ৭ (সাত) রাউন্ড নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে উভয় দেশ ইপিএ টেক্সট চূড়ান্ত করে।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকীর সরাসরি সম্পৃক্ততা বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ নেগোসিয়েশনের দ্রুত অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তাদের সক্রিয় উদ্যোগের অংশ হিসেবে তারা একাধিক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং জাপান সফরের মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ে কয়েক দফা আলোচনা অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেখানে তারা নিজ নিজ মন্ত্রী পর্যায়ের সমমর্যাদার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করেন।
এ সকল সফর এবং উদ্যোগসমূহ নেগোসিয়েশন চূড়ান্তকরণে বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকারকে জোরালোভাবে তুলে ধরে, যাতে ইপিএ’র কৌশলগত গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি সম্পাদিত হলে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা পাবে। পক্ষান্তরে, জাপান ১ হাজার ৩৯টি পণ্যে বাংলাদেশের বাজারে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে।
বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ’র উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো : বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য, বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য চুক্তি স্বাক্ষরের দিন থেকেই জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা পাবে। এছাড়াও, তৈরি পোশাক খাতে সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন সুবিধাও পাবে। সেবা বাণিজ্য (ট্রেড ইন সার্ভিসেস) খাতেও উভয় দেশ উল্লেখযোগ্য অঙ্গীকার করেছে। বাংলাদেশ জাপানের জন্য ডব্লিউটিও সেক্টরাল ক্লাসিফিকেশন লিস্ট অনুযায়ী ১২টি সেক্টরের আওতায় ৯৭টি সাব-সেক্টর উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। অন্যদিকে জাপান বাংলাদেশের জন্য ১২০টি সাব-সেক্টর উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর ত্বরান্বিত হবে।
এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য ব্যাপক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এর ফলে, বাংলাদেশে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। জাপান আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি চুক্তিটি স্বাক্ষর করতে ইচ্ছুক।
(বাংলাদেশ জাপান ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট) স্বাক্ষরের প্রস্তাব আজ উপদেষ্টা পরিষদ সানুগ্রহ অনুমোদন প্রদান করেছে। বিজেইপিএ সম্পন্নকরণের জন্য আজকের উপদেষ্টা পরিষদ-বৈঠকে সকল উপস্থিতিবৃন্দ বাণিজ্য উপদেষ্টা, সচিব ও বিজেইপিএ’র সাথে সম্পৃক্ত সকল সদস্যকে অভিনন্দন জানান।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে নতুন একটি সহায়তা কর্মসূচির (ঋণ কর্মসূচি) অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের প্রভাবে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, তা সামলে নিতে ধুঁকতে থাকার মধ্যে ঢাকার পক্ষ থেকে এই অনুরোধ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার আইএমএফের কাছে ঠিক কী ধরনের সহায়তা চেয়েছে, সংস্থাটির সঙ্গে বাংলাদেশের অতীতের ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা কেমন এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী অভিঘাত তৈরি করেছে, তার ওপর আলোকপাত করা হলো। বাংলাদেশের চাওয়া কী বাংলাদেশে আইএমএফের মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনার গত মঙ্গলবার জানান, বাংলাদেশ সরকার আইএমএফের নতুন একটি সহায়তা কর্মসূচির অনুরোধ জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে ক্রজনার বলেন, আইএমএফের কর্মকর্তারা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের সংস্কারের সূচি ও নীতিগত অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করছেন। ক্রজনার বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে নেওয়ার সক্ষমতা জোরদার করা এবং শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে আইএমএফ। নতুন এ সহায়তা (ঋণ সহায়তা) প্যাকেজের আকার বা শর্তগুলো সম্পর্কে কোনো পক্ষই এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি। অবশ্য গত মার্চে বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছিল, ইরান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট জ্বালানিসংকট কাটাতে তারা বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে ২০০ কোটি ডলারের ঋণ খুঁজছে। ইরান যুদ্ধের ধাক্কা কতটা জ্বালানিসংকট: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশে মার্কিন স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায়। বাদ যায়নি জ্বালানি স্থাপনাও। এ যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানিসংকট দেখা দেয়। বিশ্ববাজারে দ্রুত বাড়তে থাকে জ্বালানি তেলের দাম। গত ৮ এপ্রিল সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তবে স্থায়ী শান্তিচুক্তি এখনো অধরা রয়ে গেছে। এর ওপর বড় মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধের শুরুর দিকে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় ইরান। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরানের জাহাজ ও বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করে ওয়াশিংটন। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল আর প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। এসব জ্বালানির বড় অংশের গন্তব্য ছিল এশিয়ার দেশগুলো। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখনো তেহরানের হাতে। এ প্রণালি ঘিরে দীর্ঘদিনের অবরোধ জ্বালানি সরবরাহে বড় বিঘ্ন ঘটিয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। যুদ্ধের আগে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৬৬ ডলারের আশপাশে। পরে সেটা বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) চাহিদার ৯৫ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। বিশেষ করে গরমের মৌসুমে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদার কারণে জ্বালানির প্রয়োজনও অনেকাংশে বেড়ে যায়। এ আমদানির বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। জ্বালানি সাশ্রয়ে এরই মধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। বেশির ভাগ সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৯ এপ্রিল বাংলাদেশে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম। তৈরি পোশাক খাত: বাংলাদেশে ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ নেই। প্রভাব পড়েছে প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকের ওপরও। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি এ খাত থেকে আসে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের কারখানাগুলো চীন থেকে বেশির ভাগ কাঁচামাল আনে। সচরাচর এসব পণ্য লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্য হয়ে আসে। সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় আমদানির খরচ বেড়ে গেছে। এ বিষয়ে পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান স্কয়ার ডেনিমের পরিচালক সাঈদ আহমেদ চৌধুরী ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেন, আগামী মৌসুমে ক্রয়াদেশ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন। যুদ্ধ শুরুর পর গত মার্চে কিছু বিমান পরিবহন সংস্থা ফ্লাইট বাতিল করেছিল। এর ফলে বিশ্বখ্যাত পোশাকের ব্র্যান্ড জারা-এর মালিক প্রতিষ্ঠান ইনডিটেক্স এবং আরও বেশ কিছু বড় ব্র্যান্ডের পোশাকের চালান বাংলাদেশ ও ভারতের বিমানবন্দরে আটকা পড়ে। কাঁচামালের বাড়তি দাম: পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় বাংলাদেশের অন্যান্য শিল্পও ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্লাস্টিক পণ্যের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের কারণে প্লাস্টিকের প্রধানতম কাঁচামাল রেজিনের দাম বেড়েছে। ইংরেজি ভাষার দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে প্রতি টন রেজিনের দাম ছিল ৯০০ থেকে ৯৫০ ডলার। এখন তা দেড় হাজার থেকে ১ হাজার ৬০০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে সরকারকে অনেক ঋণ নিতে হয়েছে। আইএমএফের মতে, এর ফলে বিদেশি ঋণের চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। ঋণ পরিশোধের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। লন্ডনভিত্তিক মার্কেট ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান আইএসআই-এর তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারে। আগের প্রান্তিকেও তা ছিল ১১ হাজার ২২০ কোটি ডলার। ২০২৪ সালেও বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বাংলাদেশকে বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে ‘কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তখন ঋণের পরিমাণ ছিল মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ২২ শতাংশ। তবে ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় এই পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস কী? বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফের ৫৭০ কোটি ডলারের একটি ঋণ কর্মসূচির মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া এ কর্মসূচি চার বছর চলার কথা ছিল। গত সপ্তাহে বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে একটি ভার্চ্যুয়ালি বৈঠকে অংশ নেন আইএমএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্ক। গত সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, বৈঠকে দুই পক্ষ দ্রুত নতুন একটি কর্মসূচি চালুর বিষয়ে একমত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক গত সপ্তাহে বাংলাদেশকে ৩৫ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ার ধকল সামলানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে এ অর্থ ব্যয় করা হবে। যুদ্ধের কারণে ঋণসংকট কি আরও গুরুতর হচ্ছে? ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবীয়, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও মধ্য ইউরোপের অনেক দেশ ব্যাপকভাবে বৈদেশিক ঋণের চাপে ধুঁকছিল। করোনা মহামারি, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ, খাদ্য ও জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং বৈশ্বিক সুদহার বৃদ্ধির কারণে এ সংকটে পড়েছিল দেশগুলো। উদাহরণ হিসেবে শ্রীলঙ্কার কথা বলা যায়। ঋণসংকট ও দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনার জেরে ২০২২ সালে দেশটির অর্থনীতি ধসে পড়ে। ২০২৩ সালে আইএমএফের কাছ থেকে ৩০০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা পায় শ্রীলঙ্কা। চীন, ভারত আর জাপানের মতো পাওনাদার দেশগুলোর সঙ্গেও ঋণ পুনর্গঠন নিয়ে চুক্তি করে দেশটি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ৫৯ শতাংশ। গত এপ্রিলে আইএমএফ সতর্ক করে দিয়ে জানায়, ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে পারে। সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেওয়া ঋণ বেড়ে বিশ্ব জিডিপির প্রায় ৯৪ শতাংশে পৌঁছায় এবং ২০২৯ সালের মধ্যে তা ১০০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ঋণের এমন ভয়াবহ বোঝা আর দেখা যায়নি।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। ২৭ মে পূর্ণ হতে যাচ্ছে সরকারের প্রথম ১০০ দিন। সাধারণত নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও অর্থনৈতিক রোডম্যাপ তৈরির সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এবারের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। নতুন সরকারকে শুরু থেকেই মোকাবিলা করতে হয়েছে— এক ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক অব্যবস্থাপনার উত্তরাধিকার। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা দাবি করে আসছেন—তারা একটি ‘ক্ষতবিক্ষত অর্থনীতি’ উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছেন। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বিগত সরকারগুলো দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত অবস্থায় রেখে গেছে এবং সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, আগের সরকারের দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে বর্তমান সরকারকে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে কাজ শুরু করতে হয়েছে। একই সুর শোনা গেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যেও। জেলা প্রশাসক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “রাষ্ট্র ও জনগণকে ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে বর্তমান সরকারকে কাজ শুরু করতে হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, ‘‘দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্বল অর্থনীতি, বিভক্ত প্রশাসন ও অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যেই সরকার দায়িত্ব নিয়েছে।’’ ১০০ দিনের বাস্তবতা: সংকট সামলানোর লড়াই সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—এই সময়ের বড় অংশজুড়ে ছিল সংকট নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভের চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ডলারের অস্থিরতা, খেলাপি ঋণ, শিল্প খাতে জ্বালানি সংকট এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা—সব মিলিয়ে অর্থনীতি ছিল এক জটিল অবস্থায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার এখনও বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধস এড়াতে সক্ষম হলেও স্থিতিশীলতা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে পারেনি। বরং অর্থনীতির অনেক সূচক এখনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। গত কয়েক বছরে খাদ্যপণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, ডিম, মাছ, মাংস, সবজিসহ প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—উভয় খাতেই মূল্যস্ফীতির চাপ রয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে। সরকার বাজার তদারকি বাড়িয়েছে, কিছু পণ্যে আমদানি শুল্ক কমিয়েছে এবং আমদানি সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। তবে এখনও বাজারে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি ফেরেনি। মধ্যবিত্তের নীরব সংকট অর্থনীতির এই চাপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। বেতন বা আয় না বাড়লেও শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসাভাড়া, পরিবহন ও খাদ্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার সঞ্চয় ভেঙে চলতে বাধ্য হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, নিম্ন আয়ের মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কিছু সুবিধা পেলেও মধ্যবিত্তের জন্য কার্যকর সহায়তা কম। ফলে তাদের জীবনযাত্রার মান দ্রুত নেমে যাচ্ছে। রিজার্ভ ও ডলার সংকট এখনও বড় চাপ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল চাপের মধ্যে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। শিল্পকারখানাগুলো কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যায় পড়ে এবং এলসি খোলার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হয়। রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা বেড়েছে এবং সরকার বাজারভিত্তিক বিনিময় হারের দিকে এগিয়েছে। এতে পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হলেও রিজার্ভ এখনও স্বস্তিদায়ক অবস্থায় পৌঁছায়নি। অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা আনতে হলে রফতানি বহুমুখীকরণ এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স বাড়ানো জরুরি। ব্যাংক খাতে আস্থা সংকট সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ব্যাংকিং খাত। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, খেলাপি ঋণ এবং অর্থপাচারের কারণে ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণের নামে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা চুরি হয়েছে, যার বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। তাঁর ভাষায়, “ব্যাংকিং সিস্টেমের এক-তৃতীয়াংশ টাকাই নেই।” এই বক্তব্য দেশের আর্থিক খাতের প্রকৃত দুরবস্থাকে সামনে নিয়ে এসেছে। কিছু ব্যাংকে আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্কও দেখা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ, নজরদারি জোরদার এবং আর্থিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ফিরবে না। স্থবির বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সংকট উচ্চ সুদহার, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, ডলার সংকট এবং দুর্বল চাহিদার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে গেছে। নতুন শিল্প স্থাপনে উদ্যোক্তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমেছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বাড়ছে। শ্রমবাজারে চাপ তৈরি হওয়ায় সামাজিক অস্থিরতার আশঙ্কাও বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এমসিসিআই তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশের অর্থনীতি এখনও “ভঙ্গুর ও অসম পুনরুদ্ধারের” মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংগঠনটির মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্ন প্রবৃদ্ধি, দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং কঠোর মুদ্রানীতির কারণে বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রফতানি খাতে বাড়ছে চাপ বাংলাদেশের রফতানি খাত এখনও মূলত তৈরি পোশাক শিল্পনির্ভর। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি এবং ইউরোপীয় বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে রফতানি খাত চাপের মুখে পড়েছে। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার কমাচ্ছেন এবং মূল্যছাড়ের চাপ দিচ্ছেন। অপরদিকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। জ্বালানি সংকট: শিল্প উৎপাদনে নতুন চাপ শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি এখন বড় উদ্বেগের কারণ। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রফতানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় বাজারেও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে। রাজস্ব আদায়ে চাপ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মন্থর থাকায় রাজস্ব আদায়েও চাপ তৈরি হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে হিমশিম খাচ্ছে। সরকার রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব প্রশাসন আলাদা করার উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, করের হার না বাড়িয়ে করজাল সম্প্রসারণ এবং স্বচ্ছ প্রশাসন নিশ্চিত করাই এখন জরুরি। অর্থনীতি চাঙা করতে বড় ঋণ প্যাকেজ অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে বন্ধ শিল্পকারখানা চালু, কৃষি, সিএমএসএমই, রফতানি বৈচিত্রকরণ, যুব কর্মসংস্থান এবং স্টার্টআপ খাতে অর্থায়ন করা হবে। গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। ব্যবসায়ীদের হাতে কার্যকর মূলধন নেই। তাই অর্থনীতিকে ‘বুস্ট’ করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ আশঙ্কা করছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে বড় আকারের ঋণ সহায়তা নতুন করে বাজারে চাপ তৈরি করতে পারে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এই অর্থ নতুন টাকা ছাপিয়ে নয়— ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান তারল্য থেকেই আসবে। সামনে কী অপেক্ষা করছে বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের প্রথম ১০০ দিন ছিল মূলত সংকট সামাল দেওয়ার সময়। এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাত সংস্কার, বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক খাত স্থিতিশীল করা—এই পাঁচটি খাতেই দ্রুত অগ্রগতি দেখাতে না পারলে সামনে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, বাংলাদেশ এখন ‘ভঙ্গুর পুনরুদ্ধারের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতি পুরোপুরি ধসে পড়েনি, আবার স্থিতিশীলতাও ফেরেনি। ফলে সরকারের পরবর্তী সময়ের নীতি ও বাস্তবায়ন দক্ষতার ওপরই নির্ভর করবে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা।
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কারসমূহ যাতে বাস্তবসম্মত, পর্যায়ভিত্তিক এবং বাস্তবায়নযোগ্য হয়, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নতুন করে তিন বছর মেয়াদি সংস্কার কর্মসূচির কাজ শুরু করতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। আজ (সোমবার) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ২১ মে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং আইএমএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের মধ্যে অনুষ্ঠিত ভার্চুয়াল বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, চলমান আইএমএফ কর্মসূচির অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হয়। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী সরকারের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং কাঠামোগত সংস্কার অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে বর্তমান আইএমএফ কর্মসূচি ভিন্ন অর্থনৈতিক ও নীতিগত প্রেক্ষাপটে গ্রহণ করা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, ‘পরবর্তীতে উদ্ভূত দেশীয় বাস্তবতা, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে কিছু সংস্কার বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, সরকার সংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকলেও বাস্তবসম্মত ও ধাপে ধাপে এগোনোর পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যা বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপটকে প্রতিফলিত করে। এ প্রসঙ্গে তিনি নবনির্বাচিত সরকারের অধীনে নতুন করে তিন বছরের কর্মসূচি প্রস্তাব করেন, যা ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাস্তবসম্মত সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেবে। বৈঠকে নাইজেল ক্লার্ক বাংলাদেশের সংস্কার উদ্যোগ এবং নতুন কর্মসূচি গ্রহণের প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানান। তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফের গঠনমূলক ও ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা অব্যাহত থাকবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন। উভয় পক্ষ দ্রুত নতুন কর্মসূচি প্রণয়নের কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে একমত হয়। অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক গ্রুপ-আইএমএফ বসন্তকালীন বৈঠকের আলোচনার প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন। তিনি জানান, সরকার ওই বৈঠকের আলোচনার ভিত্তিতে অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা সম্পন্ন করেছে। বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রস্তাবিত সংস্কার কর্মসূচির সফলতা নিশ্চিতে উভয় পক্ষ অঙ্গীকার ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে বৈঠকটি শেষ হয়।