গত ৭ জুন স্বাস্থ্য অধিদফতরের জারি করা দুটি পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১২ জন চিকিৎসককে রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালে পদায়ন করা হয়েছিলো। দীর্ঘদিনের চিকিৎসক সংকট কাটাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের নির্দেশে মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগে জেলার মানুষের মনে আশা জেগেছিলো—এবার হয়তো হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায় কিছুটা হলেও গতি ফিরবে।
তবে সেই আশা টিকে ছিলো মাত্র এক মাস। যোগদানের অল্প সময়ের মধ্যেই সুপারিশের মাধ্যমে বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন পাঁচজন চিকিৎসক। ফলে আবারও চিকিৎসক সংকটে পড়েছে ২৫০ শয্যার রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতাল। গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় প্রতিদিনই ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা, যার সরাসরি ভুক্তভোগী সাধারণ রোগীরা।
অধিদফতরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে যে ১২ জন চিকিৎসককে পদায়ন করা হয়েছিলো, তাদের মধ্যে ছিলেন মেডিকেল অফিসার, সহকারী সার্জন ও বিভিন্ন বিশেষায়িত বিভাগের চিকিৎসক।
তবে যোগদানের এক মাসের মধ্যেই বদলি হয়ে চলে গেছেন—ডা. মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন, ডা. জাহাঙ্গীর হোসেন, ডা. মো. মেহেদী হাসান, ডা. মো. এনামুল হক এবং ডা. অতীশ দীপংকর। অর্থাৎ নতুন পদায়ন পাওয়া চিকিৎসকদের প্রায় ৪২ শতাংশই অল্প সময়ের মধ্যে হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেছেন।
চিকিৎসক মহলের একাধিক সূত্রের দাবি, অল্প সময়ের মধ্যে যারা রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল ছেড়ে গেছেন, তাদের অনেকেই নানাভাবে ওপরের মহলে তদবির ও সুপারিশের মাধ্যমে নিজেদের সুবিধাজনক কর্মস্থলে বদলি বাগিয়ে নিয়েছেন।
চিকিৎসকের সংকট থাকায় সেবা পেতে রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে পরবর্তীতে আরও একজন মেডিসিন ও একজন কার্ডিওলজির জুনিয়র কনসালটেন্ট পদায়ন করা হয়। তবে কার্ডিওলজি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. সফিকুল ইসলাম এখনও রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে যোগদান করেননি। ফলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগটি কার্যত শূন্যই থেকে গেছে।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, সার্জারি, মেডিসিন, শিশু, কার্ডিওলজি, গাইনি, চর্ম ও যৌনরোগ, ফরেনসিক মেডিসিন, অর্থোপেডিক সার্জারি, ইএনটি (নাক-কান-গলা) এবং অ্যানেস্থেসিয়া বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া চক্ষু, কার্ডিওলজি ও প্যাথলজি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্টের পদগুলো খালি থাকায় চিকিৎসাসেবা ভেঙে পড়েছে।
সরেজমিনে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই বহির্বিভাগে রোগীদের দীর্ঘ সারি। চক্ষু বিভাগের চিকিৎসক ডা. অপূর্ব রায়ের কক্ষের সামনে অপেক্ষমাণ রোগীর ভিড় ক্রমেই বাড়ছিলো। তবে তিনি ইনডোরে ভর্তি রোগীদের রাউন্ডে থাকায় বহির্বিভাগে সময়মতো রোগী দেখা শুরু করতে পারেননি। ফলে সকাল থেকে অপেক্ষা করেও সেবা না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েন অনেকে।
সত্তরোর্ধ্ব মজিবর প্রামাণিক চোখের চিকিৎসার জন্য দূর থেকে হাসপাতালে এলেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক না থাকায় চিকিৎসা না নিয়েই ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। শুধু মজিবর প্রামাণিক নন, জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের আশায় এসে ফিরে যাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে অনেকেই দরিদ্রতা সত্ত্বেও বেশি খরচে ফরিদপুর বা ঢাকায় চিকিৎসা নিতে ছুটছেন।
একাধিক চিকিৎসক বলেন, রোগীর তুলনায় আমাদের চিকিৎসকদের সংখ্যা খুবই কম। প্রচণ্ড চাপের মুখে একেকজন চিকিৎসককে একাধারে বহির্বিভাগ, ভর্তি রোগী ও জরুরি বিভাগের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। অতিরিক্ত ডিউটি করেও একজন রোগীকে দুই-তিন মিনিটের বেশি সময় দেওয়া সম্ভব হয় না।
সার্বিক বিষয়ে রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শেখ মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান বলেন, মন্ত্রীর নির্দেশে আমরা ১২ জন চিকিৎসক পেয়েছিলাম। কিন্তু যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই পাঁচজন বদলি হয়ে চলে যান। পরে অধিদফতর থেকে আরও দুজন চিকিৎসক পদায়ন করা হলেও এখন পর্যন্ত একজন যোগদান করেননি। বিষয়টি লিখিতভাবে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে জানানো হয়েছে।
কর্মকর্তাদের বদলির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোন কারণে তারা হঠাৎ বদলি নিয়ে চলে গেছেন, তা আমার জানা নেই। নিশ্চয়ই তারা বদলির আবেদনে নিজ নিজ কারণ উল্লেখ করেছেন।’
স্বাস্থ্যাকর্মীদের মতে, শুধু কাগজে-কলমে চিকিৎসক পদায়ন করলেই রাজবাড়ীর মতো জেলাগুলোর সংকট মিটবে না। স্থায়ীভাবে চিকিৎসক ধরে রাখার কঠোর ও কার্যকর নীতিমালা না থাকলে এ চক্র থেকে মুক্তি মিলবে না, আর দিন শেষে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাও হারিয়ে যাবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসলেই দেখা যায় ‘ডাক্তার নেই, কখন আসবে কউ জানে না’, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগীদের কাছে এ যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা। গত ৭ জুন স্বাস্থ্য অধিদফতরের জারি করা দুটি পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১২ জন চিকিৎসককে রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালে পদায়ন করা হয়েছিলো। দীর্ঘদিনের চিকিৎসক সংকট কাটাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের নির্দেশে মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগে জেলার মানুষের মনে আশা জেগেছিলো—এবার হয়তো হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায় কিছুটা হলেও গতি ফিরবে। তবে সেই আশা টিকে ছিলো মাত্র এক মাস। যোগদানের অল্প সময়ের মধ্যেই সুপারিশের মাধ্যমে বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন পাঁচজন চিকিৎসক। ফলে আবারও চিকিৎসক সংকটে পড়েছে ২৫০ শয্যার রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতাল। গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় প্রতিদিনই ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা, যার সরাসরি ভুক্তভোগী সাধারণ রোগীরা। অধিদফতরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে যে ১২ জন চিকিৎসককে পদায়ন করা হয়েছিলো, তাদের মধ্যে ছিলেন মেডিকেল অফিসার, সহকারী সার্জন ও বিভিন্ন বিশেষায়িত বিভাগের চিকিৎসক। তবে যোগদানের এক মাসের মধ্যেই বদলি হয়ে চলে গেছেন—ডা. মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন, ডা. জাহাঙ্গীর হোসেন, ডা. মো. মেহেদী হাসান, ডা. মো. এনামুল হক এবং ডা. অতীশ দীপংকর। অর্থাৎ নতুন পদায়ন পাওয়া চিকিৎসকদের প্রায় ৪২ শতাংশই অল্প সময়ের মধ্যে হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেছেন। চিকিৎসক মহলের একাধিক সূত্রের দাবি, অল্প সময়ের মধ্যে যারা রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল ছেড়ে গেছেন, তাদের অনেকেই নানাভাবে ওপরের মহলে তদবির ও সুপারিশের মাধ্যমে নিজেদের সুবিধাজনক কর্মস্থলে বদলি বাগিয়ে নিয়েছেন। চিকিৎসকের সংকট থাকায় সেবা পেতে রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে পরবর্তীতে আরও একজন মেডিসিন ও একজন কার্ডিওলজির জুনিয়র কনসালটেন্ট পদায়ন করা হয়। তবে কার্ডিওলজি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. সফিকুল ইসলাম এখনও রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে যোগদান করেননি। ফলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগটি কার্যত শূন্যই থেকে গেছে। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, সার্জারি, মেডিসিন, শিশু, কার্ডিওলজি, গাইনি, চর্ম ও যৌনরোগ, ফরেনসিক মেডিসিন, অর্থোপেডিক সার্জারি, ইএনটি (নাক-কান-গলা) এবং অ্যানেস্থেসিয়া বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া চক্ষু, কার্ডিওলজি ও প্যাথলজি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্টের পদগুলো খালি থাকায় চিকিৎসাসেবা ভেঙে পড়েছে। সরেজমিনে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই বহির্বিভাগে রোগীদের দীর্ঘ সারি। চক্ষু বিভাগের চিকিৎসক ডা. অপূর্ব রায়ের কক্ষের সামনে অপেক্ষমাণ রোগীর ভিড় ক্রমেই বাড়ছিলো। তবে তিনি ইনডোরে ভর্তি রোগীদের রাউন্ডে থাকায় বহির্বিভাগে সময়মতো রোগী দেখা শুরু করতে পারেননি। ফলে সকাল থেকে অপেক্ষা করেও সেবা না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েন অনেকে। সত্তরোর্ধ্ব মজিবর প্রামাণিক চোখের চিকিৎসার জন্য দূর থেকে হাসপাতালে এলেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক না থাকায় চিকিৎসা না নিয়েই ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। শুধু মজিবর প্রামাণিক নন, জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের আশায় এসে ফিরে যাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে অনেকেই দরিদ্রতা সত্ত্বেও বেশি খরচে ফরিদপুর বা ঢাকায় চিকিৎসা নিতে ছুটছেন। একাধিক চিকিৎসক বলেন, রোগীর তুলনায় আমাদের চিকিৎসকদের সংখ্যা খুবই কম। প্রচণ্ড চাপের মুখে একেকজন চিকিৎসককে একাধারে বহির্বিভাগ, ভর্তি রোগী ও জরুরি বিভাগের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। অতিরিক্ত ডিউটি করেও একজন রোগীকে দুই-তিন মিনিটের বেশি সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। সার্বিক বিষয়ে রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শেখ মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান বলেন, মন্ত্রীর নির্দেশে আমরা ১২ জন চিকিৎসক পেয়েছিলাম। কিন্তু যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই পাঁচজন বদলি হয়ে চলে যান। পরে অধিদফতর থেকে আরও দুজন চিকিৎসক পদায়ন করা হলেও এখন পর্যন্ত একজন যোগদান করেননি। বিষয়টি লিখিতভাবে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে জানানো হয়েছে। কর্মকর্তাদের বদলির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোন কারণে তারা হঠাৎ বদলি নিয়ে চলে গেছেন, তা আমার জানা নেই। নিশ্চয়ই তারা বদলির আবেদনে নিজ নিজ কারণ উল্লেখ করেছেন।’ স্বাস্থ্যাকর্মীদের মতে, শুধু কাগজে-কলমে চিকিৎসক পদায়ন করলেই রাজবাড়ীর মতো জেলাগুলোর সংকট মিটবে না। স্থায়ীভাবে চিকিৎসক ধরে রাখার কঠোর ও কার্যকর নীতিমালা না থাকলে এ চক্র থেকে মুক্তি মিলবে না, আর দিন শেষে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাও হারিয়ে যাবে।
সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ২১৮ জন শিশু। শুক্রবার (৭ আগস্ট) বিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে ৩ শিশুর মৃত্যু হলেও নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। গত ১৫ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও উপসর্গে মোট ৮৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গে ৭৬৪ জন ও হামে আক্রান্ত হয়ে ৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৮৫ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি একই সময়ে আরও ৭৩৩ জনের মধ্যে রোগটির উপসর্গ দেখা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৩৩ হাজার ৬৩৮ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে এই সময়ে মোট ১৬ হাজার ৭৪০ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
ক্যানসার নামটির সাথেই মিশে আছে এক অজানা আতঙ্ক। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি আমাদের জানাচ্ছে যে, অধিকাংশ ক্যানসারই প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে তা নিরাময় সম্ভব। বিশেষ করে মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারের ক্ষেত্রে শুরুতেই কিছু দৃশ্যমান লক্ষণ দেখা দেয়, যা আমরা অনেক সময় অবহেলা করি। সম্প্রতি হিন্দুস্তান টাইমস-এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে প্রখ্যাত সার্জিক্যাল অনকোলজিস্ট ডা. মনদীপ সিং মালহোত্রা মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারের এমন কিছু প্রাথমিক সতর্কবার্তা নিয়ে আলোচনা করেছেন যা আমাদের জীবন বাঁচাতে পারে। তিনি জানান, অনেক ক্ষেত্রে এই ক্যানসারের লক্ষণগুলো এতই মৃদু হয় যে সাধারণ মানুষ সেগুলোকে গুরুত্বহীন মনে করে চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন। অথচ শুরুতেই রোগ নির্ণয় করা গেলে এই ধরনের ক্যানসার সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। নিচে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী সেই ৩টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো: ১. দীর্ঘস্থায়ী মুখের ঘা মুখের ঘা বা আলসার খুব সাধারণ একটি সমস্যা। পুষ্টির অভাব, অ্যাসিডিটি বা দাঁতের সমস্যার কারণে এটি হতে পারে এবং সাধারণত সঠিক চিকিৎসায় সেরে যায়। তবে ডা. মালহোত্রার মতে, যদি কোনো ঘা উপযুক্ত চিকিৎসার পরও ২ থেকে ৩ সপ্তাহের মধ্যে না সারে, তবে তা চিন্তার বিষয়। এই ধরনের স্থায়ী আলসার ক্যানসার-পূর্ব অবস্থা বা প্রাথমিক পর্যায়ের ওরাল ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে, তাই দ্রুত টিস্যু বায়োপসি করানো প্রয়োজন। ২. গলার স্বরের পরিবর্তন বা খসখসে ভাব ঠাণ্ডা লাগলে বা সংক্রমণের কারণে সাময়িকভাবে গলার স্বর বদলে যেতে পারে। কিন্তু যদি গলার স্বরের এই কর্কশ বা খসখসে ভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে সতর্ক হতে হবে। বিশেষ করে যারা ধূমপান বা তামাক সেবন করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই লক্ষণটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত। ল্যারিঙ্গোস্কোপিক পরীক্ষার মাধ্যমে কণ্ঠনালি বা গলার ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে চিকিৎসার ফলাফল খুব ভালো হয়। ৩. ঘাড়ের কাছে ফোলা ভাব বা চাকা ঘাড়ে কোনো পিণ্ড বা চাকা অনুভব করা এই ক্যানসারের অন্যতম বড় লক্ষণ। তবে ডা. মালহোত্রা সতর্ক করেছেন যে, ঘাড়ে চাকা হওয়া সাধারণত ক্যানসারের প্রাথমিক নয়, বরং কিছুটা পরের দিকের লক্ষণ। অনেক ক্ষেত্রে এটি নির্দেশ করে যে ক্যানসার ইতোমধ্যে লিম্ফ নোড বা লসিকা গ্রন্থিতে ছড়িয়ে পড়েছে, যা সাধারণত রোগের তৃতীয় পর্যায় (Stage 3) বা তার পরবর্তী অবস্থা। তাই কেবল ঘাড়ে ফোলা ভাব হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে ওপরের অন্য লক্ষণগুলো দেখা দিলেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। আধুনিক চিকিৎসা ও আশার আলো বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতির ফলে মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। ডা. মালহোত্রা জানান, রোবোটিক এবং লেজার-অ্যাসিস্টড সার্জারির মতো উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে এখন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে টিউমার অপসারণ করা সম্ভব। এতে রোগীর কথা বলা বা খাবার গিলে ফেলার মতো জরুরি শারীরিক কাজগুলো ব্যাহত হয় না এবং সুস্থ হওয়ার হারও অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞের শেষ কথা: ঘাড়ের পিণ্ড বা চাকা হওয়ার জন্য অপেক্ষা করবেন না। মুখের দীর্ঘস্থায়ী ঘা বা কণ্ঠস্বরের পরিবর্তনই হতে পারে আপনার জন্য প্রথম সতর্কবার্তা। সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে জীবন বাঁচানো অনেক সহজ হয়ে যায়। তথ্যসূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস