গত ৭ জুন স্বাস্থ্য অধিদফতরের জারি করা দুটি পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১২ জন চিকিৎসককে রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালে পদায়ন করা হয়েছিলো। দীর্ঘদিনের চিকিৎসক সংকট কাটাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের নির্দেশে মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগে জেলার মানুষের মনে আশা জেগেছিলো—এবার হয়তো হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায় কিছুটা হলেও গতি ফিরবে।
তবে সেই আশা টিকে ছিলো মাত্র এক মাস। যোগদানের অল্প সময়ের মধ্যেই সুপারিশের মাধ্যমে বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন পাঁচজন চিকিৎসক। ফলে আবারও চিকিৎসক সংকটে পড়েছে ২৫০ শয্যার রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতাল। গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় প্রতিদিনই ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা, যার সরাসরি ভুক্তভোগী সাধারণ রোগীরা।
অধিদফতরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে যে ১২ জন চিকিৎসককে পদায়ন করা হয়েছিলো, তাদের মধ্যে ছিলেন মেডিকেল অফিসার, সহকারী সার্জন ও বিভিন্ন বিশেষায়িত বিভাগের চিকিৎসক।
তবে যোগদানের এক মাসের মধ্যেই বদলি হয়ে চলে গেছেন—ডা. মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন, ডা. জাহাঙ্গীর হোসেন, ডা. মো. মেহেদী হাসান, ডা. মো. এনামুল হক এবং ডা. অতীশ দীপংকর। অর্থাৎ নতুন পদায়ন পাওয়া চিকিৎসকদের প্রায় ৪২ শতাংশই অল্প সময়ের মধ্যে হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেছেন।
চিকিৎসক মহলের একাধিক সূত্রের দাবি, অল্প সময়ের মধ্যে যারা রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল ছেড়ে গেছেন, তাদের অনেকেই নানাভাবে ওপরের মহলে তদবির ও সুপারিশের মাধ্যমে নিজেদের সুবিধাজনক কর্মস্থলে বদলি বাগিয়ে নিয়েছেন।
চিকিৎসকের সংকট থাকায় সেবা পেতে রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে পরবর্তীতে আরও একজন মেডিসিন ও একজন কার্ডিওলজির জুনিয়র কনসালটেন্ট পদায়ন করা হয়। তবে কার্ডিওলজি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. সফিকুল ইসলাম এখনও রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে যোগদান করেননি। ফলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগটি কার্যত শূন্যই থেকে গেছে।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, সার্জারি, মেডিসিন, শিশু, কার্ডিওলজি, গাইনি, চর্ম ও যৌনরোগ, ফরেনসিক মেডিসিন, অর্থোপেডিক সার্জারি, ইএনটি (নাক-কান-গলা) এবং অ্যানেস্থেসিয়া বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া চক্ষু, কার্ডিওলজি ও প্যাথলজি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্টের পদগুলো খালি থাকায় চিকিৎসাসেবা ভেঙে পড়েছে।
সরেজমিনে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই বহির্বিভাগে রোগীদের দীর্ঘ সারি। চক্ষু বিভাগের চিকিৎসক ডা. অপূর্ব রায়ের কক্ষের সামনে অপেক্ষমাণ রোগীর ভিড় ক্রমেই বাড়ছিলো। তবে তিনি ইনডোরে ভর্তি রোগীদের রাউন্ডে থাকায় বহির্বিভাগে সময়মতো রোগী দেখা শুরু করতে পারেননি। ফলে সকাল থেকে অপেক্ষা করেও সেবা না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েন অনেকে।
সত্তরোর্ধ্ব মজিবর প্রামাণিক চোখের চিকিৎসার জন্য দূর থেকে হাসপাতালে এলেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক না থাকায় চিকিৎসা না নিয়েই ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। শুধু মজিবর প্রামাণিক নন, জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের আশায় এসে ফিরে যাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে অনেকেই দরিদ্রতা সত্ত্বেও বেশি খরচে ফরিদপুর বা ঢাকায় চিকিৎসা নিতে ছুটছেন।
একাধিক চিকিৎসক বলেন, রোগীর তুলনায় আমাদের চিকিৎসকদের সংখ্যা খুবই কম। প্রচণ্ড চাপের মুখে একেকজন চিকিৎসককে একাধারে বহির্বিভাগ, ভর্তি রোগী ও জরুরি বিভাগের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। অতিরিক্ত ডিউটি করেও একজন রোগীকে দুই-তিন মিনিটের বেশি সময় দেওয়া সম্ভব হয় না।
সার্বিক বিষয়ে রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শেখ মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান বলেন, মন্ত্রীর নির্দেশে আমরা ১২ জন চিকিৎসক পেয়েছিলাম। কিন্তু যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই পাঁচজন বদলি হয়ে চলে যান। পরে অধিদফতর থেকে আরও দুজন চিকিৎসক পদায়ন করা হলেও এখন পর্যন্ত একজন যোগদান করেননি। বিষয়টি লিখিতভাবে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে জানানো হয়েছে।
কর্মকর্তাদের বদলির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোন কারণে তারা হঠাৎ বদলি নিয়ে চলে গেছেন, তা আমার জানা নেই। নিশ্চয়ই তারা বদলির আবেদনে নিজ নিজ কারণ উল্লেখ করেছেন।’
স্বাস্থ্যাকর্মীদের মতে, শুধু কাগজে-কলমে চিকিৎসক পদায়ন করলেই রাজবাড়ীর মতো জেলাগুলোর সংকট মিটবে না। স্থায়ীভাবে চিকিৎসক ধরে রাখার কঠোর ও কার্যকর নীতিমালা না থাকলে এ চক্র থেকে মুক্তি মিলবে না, আর দিন শেষে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাও হারিয়ে যাবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
রাজধানীর চারটি রুগ্ণ বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি পূরণে রোগী দিয়ে সহায়তা করবে সরকার। এসব রোগীর চিকিৎসা, ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ সরকারই দেবে। তবে রোগীপ্রতি কত টাকা দেওয়া হবে এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে কীভাবে বিল পরিশোধ করা হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। হাসপাতাল চারটি হলো– শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ইমপাল্স হাসপাতাল, শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। পাইলট প্রকল্পের জন্য প্রাথমিকভাবে হাসপাতালগুলো নির্বাচন করা হয়েছে। পরে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এসব কলেজের নিজস্ব হাসপাতালে পর্যাপ্ত রোগী না থাকায় হাতে-কলমে চিকিৎসা শিক্ষার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। এতে শিক্ষার ঘাটতি নিয়ে চিকিৎসক হয়ে বের হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ কমানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি হাসপাতালের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি নতুন হাসপাতাল নির্মাণের চেয়ে বিদ্যমান বেসরকারি হাসপাতালের অব্যবহৃত শয্যা ব্যবহার করলে সরকারের অর্থ ও সময় সাশ্রয় হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতাল নির্বাচন, রোগী পাঠানো, চিকিৎসার মান নিশ্চিত করা এবং বিল পরিশোধে স্বচ্ছতা না থাকলে এ উদ্যোগে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কেন চার হাসপাতাল স্বাস্থ্য বিভাগ-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীর বড় সরকারি হাসপাতালগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। অন্যদিকে, নির্বাচিত চারটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তুলনামূলক অনেক শয্যা খালি থাকে। তেজগাঁওয়ের শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ৫০০, ইমপাল্স হাসপাতালের ৪০০, গুলশানের শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৫০০ এবং ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০০ শয্যা রয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাসপাতাল নির্বাচনের ক্ষেত্রে চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো এবং চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সক্ষমতা বিবেচনা করা হয়েছে। স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের একটি দল হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করে সক্ষমতা যাচাই করেছে। শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সিরাজুল ইসলাম বলেন, সরকারি হাসপাতালের রোগীর চাপ সামলাতে আমাদের হাসপাতালে রোগী পাঠানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা আমরা দেব; সরকার বিল পরিশোধ করবে। তাঁর মতে, মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনিবিষয়ক রোগীদের একটি অংশ বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হলে সরকারি হাসপাতালের মেঝে বা বারান্দায় চিকিৎসা নেওয়ার মতো পরিস্থিতি কমবে। মেডিকেল শিক্ষার ঘাটতি কমানোর দিকে নজর স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল হোসেন বলেন, কিছু বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবকাঠামো ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও রোগী কম। ফলে শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত রোগী দেখে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পান না। তিনি বলেন, মেডিকেল শিক্ষানীতির হিসাবে ১০০ শিক্ষার্থীর জন্য ৫০০ শয্যার হাসপাতাল থাকা প্রয়োজন। হাসপাতালে পর্যাপ্ত রোগী থাকাও জরুরি। রোগী না থাকলে শুধু অবকাঠামো দিয়ে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নাজমুল হোসেন বলেন, এসব হাসপাতালে রোগী বাড়ানোর জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হয়েছে। তাতে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। সরকারি ব্যবস্থাপনায় রোগী পাঠানো হলে একদিকে সরকারি হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ বাড়বে। দুই বেসরকারি হাসপাতালের চিত্র সাধারণত বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের যে উপস্থিতি ও ব্যস্ততা দেখা যায়, গতকাল ইমপালস ও শমরিতা হাসপাতালে গিয়ে ব্যতিক্রম চোখে পড়ল। রোগীদের উপস্থিতি একেবারে কম। ইমপাল্স হাসপাতালে বর্তমানে কতজন রোগী ভর্তি রয়েছেন, তা জানতে চাইলে এ বিষয়ে তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষ। ইমপাল্স হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সংযুক্তা সাহা বলেন, আমি হাসপাতালটির পরিচালক হলেও বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখানে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকারের একাধিক কর্মকর্তা এই কমিটিতে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের সঙ্গে কথা বললে বিস্তারিত জানতে পারবেন। হাসপাতালটির চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে। শমরিতা হাসপাতালেও একই চিত্র। রোগীর উপস্থিতি কম। স্বাভাবিক ভিড় ও কর্মচাঞ্চল্যও তেমন নেই। গতকাল পুরো হাসপাতালে ৬৭ জন রোগী ভর্তি পাওয়া যায়। সরকারি হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগী স্বাস্থ্য বিভাগ-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ঢাকার বড় সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নির্ধারিত শয্যা দুই হাজার ৬০০। এর বিপরীতে প্রতিদিন প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যক রোগী ভর্তি থাকেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১ হাজার ৩৫০ শয্যার বিপরীতে রোগীর চাপ অনেক বেশি। স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, নতুন করে ১০০ শয্যার একটি হাসপাতাল নির্মাণ করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। ব্যয় হতে পারে ৫০ কোটি টাকার বেশি। এর বদলে বিদ্যমান বেসরকারি হাসপাতালের অব্যবহৃত শয্যা ব্যবহার করা গেলে তুলনামূলক কম সময়ে চিকিৎসাসেবা বাড়ানো সম্ভব। কীভাবে রোগী যাবে খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালের সমন্বয় থাকবে। কোন রোগীকে কখন এবং কী প্রক্রিয়ায় বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হবে, সে বিষয়ে নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে। ভাড়া, কনসালট্যান্ট ফি, সরকার নির্ধারিত ওষুধ এবং সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ সরকার বহন করবে। মাস শেষে চিকিৎসাসেবার হিসাব অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট হাসপাতালকে বিল পরিশোধ করা হবে। তবে রোগী কীভাবে সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি হাসপাতালে যাবেন, পরিবহন কে করবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দায়িত্ব কার– এসব বিষয় এখনও চূড়ান্ত হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, কোন কোন হাসপাতাল থেকে সেবা নেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন রোগী পাঠানোর প্রক্রিয়া, চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের সুযোগ কতটুকু থাকবে– এসব বিষয়ে নীতিমালা তৈরি হচ্ছে। সফটওয়্যারে নজরদারির পরিকল্পনা সরকারি অর্থে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম ঠেকাতে পুরো প্রক্রিয়াকে সফটওয়্যারনির্ভর করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী, রোগী রেফারাল, হাসপাতালে ভর্তি, চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ছাড়পত্র– প্রতিটি ধাপ সফটওয়্যারে নথিভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি প্রতিটি হাসপাতালের কার্যক্রম তদারকির জন্য সাত সদস্যের পর্যবেক্ষণ কমিটি রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভুয়া রোগী দেখানো, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা অতিরিক্ত বিল করার মতো অনিয়ম কমানো সম্ভব হবে। হাসপাতাল বাছাই নিয়ে প্রশ্ন নির্দিষ্ট চারটি হাসপাতাল নির্বাচন করার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা। অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর খান বলেন, নির্দিষ্ট কয়েকটি হাসপাতাল বেছে নেওয়ার বদলে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে হাসপাতাল নির্বাচন করা উচিত। কোন হাসপাতালের চিকিৎসার মান, জনবল ও অবকাঠামো কেমন, তা মূল্যায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকা দরকার। তিনি বলেন, কোন হাসপাতাল কী ধরনের রোগী নিতে পারবে, চিকিৎসার মান কীভাবে নিশ্চিত হবে, কোন সেবার জন্য সরকার কত টাকা পরিশোধ করবে– এসব বিষয় আগে থেকেই স্পষ্ট করা প্রয়োজন। ভুয়া বিল ঠেকানো বড় চ্যালেঞ্জ সরকারি অর্থে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে বিল নিয়ে অনিয়ম। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, কার্যকর তদারকি না থাকলে প্রকৃত রোগীর চেয়ে বেশি রোগী দেখানো, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো কিংবা চিকিৎসার ব্যয় বাড়িয়ে বিল দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। করোনা মহামারির সময় বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা খরচের বিল নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছিল। সে অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার রোগী রেফারাল থেকে ছাড়পত্র পর্যন্ত প্রতিটি তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারি অবকাঠামো আগে ব্যবহার করা উচিত? বেসরকারি হাসপাতালের শয্যা ভাড়া নেওয়ার আগে সরকারি অব্যবহৃত অবকাঠামো পুরোপুরি কাজে লাগানোর বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ রাজধানীর ডিএনসিসি কভিড-১৯ হাসপাতালের উদাহরণ দিয়েছেন। করোনাকালে তৈরি করা এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে ২১২টি আইসিইউ সুবিধা রয়েছে। হাসপাতালটির বিপুলসংখ্যক শয্যা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নতুন করে বেসরকারি হাসপাতালে সরকারি অর্থ ব্যয় করার আগে বিদ্যমান সরকারি অবকাঠামোকে পূর্ণাঙ্গ সাধারণ হাসপাতালে রূপান্তরের সম্ভাবনা যাচাই করা দরকার। ঢাকার বাইরে বিনিয়োগের তাগিদ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন ও অধ্যাপক বেনজির আহমেদের মতে, শুধু ঢাকার হাসপাতালগুলোর চাপ কমানোর উদ্যোগ নিলে সমস্যার মূল কারণ দূর হবে না। তারা বলছেন, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে রোগীদের ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা কমবে। এতে ঢাকা মেডিকেলসহ রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোর ওপরেও চাপ কমবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রাজধানীর বাইরে চিকিৎসা অবকাঠামো, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আর্থিক কাঠামো এখনও চূড়ান্ত নয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সমকালকে বলেন, সরকারি হাসপাতালের রোগীর চাপ কমাতে প্রাথমিকভাবে চারটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগী পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শয্যা খালি থাকার বিষয়টি বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, রোগীদের সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে খরচ ভাগাভাগির একটি ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা চলছে। আর্থিক কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার পর পাইলট প্রকল্পটি শুরু হবে। রোগীরা এতে সন্তুষ্ট হলে পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের পরিসর বাড়ানো হতে পারে।
দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৩০০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯৯ জনে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৬৩১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক হালনাগাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া চারজন বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনা ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডেঙ্গুতে দুজন, ফেব্রুয়ারিতে দুজন, মে মাসে একজন, জুনে ১৩, জুলাইয়ে ৩৬, আগস্টে ৪৩ এবং সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। অক্টোবরের প্রথম ১০ দিনে মারা গেছেন ৫৪ জন। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা ২৯৯ জনে দাঁড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১ হাজার ৬৩১ জনের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ৯২ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ৪০৬ জন ভর্তি হয়েছেন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০৫ জন। ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগে, ২৩৪ জন। এ ছাড়া বরিশাল বিভাগে ২১৯, খুলনায় ১৮৪, রাজশাহীতে ১৪১, রংপুরে ৭৫, ময়মনসিংহে ৬১ এবং সিলেট বিভাগে ১৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৭ হাজার ৮২ জন। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৯১ হাজার ৭ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫ হাজার ৭৭৪ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে থাকলে ঘাড়ে ব্যথা, পেশিতে টান ও অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে মাথা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে স্ক্রিন দেখার অভ্যাস ঘাড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। তবে সঠিক ভঙ্গিতে বসা, নিয়মিত বিরতি নেওয়া এবং কয়েকটি সহজ ব্যায়াম করার মাধ্যমে এ ধরনের সমস্যা কমাতে সাহায্য পাওয়া যেতে পারে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে লন্ডনের কুইন্স হাসপাতালের নিউরোসার্জন অ্যান্থনি ঘোষের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, মাথা স্বাভাবিক অবস্থায় সোজা রাখলে ঘাড়ের ওপর প্রায় ৫ দশমিক ৪ কেজি ওজনের সমপরিমাণ যান্ত্রিক চাপ পড়ে। কিন্তু মোবাইল বা ল্যাপটপের দিকে তাকাতে মাথা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে রাখলে সেই চাপ বেড়ে প্রায় ২৭ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। বর্তমানে ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় ভুল ভঙ্গিতে বসে থাকা অনেকের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এর ফলে ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, ব্যথা এবং ঘাড়ের স্বাভাবিক নড়াচড়ায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। কেন স্ক্রিন ব্যবহারে ঘাড়ে চাপ পড়ে? কম্পিউটার বা মোবাইলের দিকে দীর্ঘ সময় ঝুঁকে থাকলে পিঠের ওপরের অংশ কিছুটা গোল হয়ে যায়। একই সঙ্গে মাথা ও থুতনি কাঁধের স্বাভাবিক অবস্থান থেকে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। এতে ঘাড় ও মেরুদণ্ডের ওপরের অংশের পেশি এবং অস্থিসন্ধিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। বয়স বাড়ার সঙ্গেও ঘাড়ের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সময়ের সঙ্গে ঘাড়ের টিস্যুর নমনীয়তা কমে যায়, মেরুদণ্ডের কশেরুকার মধ্যবর্তী ডিস্ক ক্ষয় হতে পারে এবং ঘাড়ের অস্থিসন্ধি শক্ত হয়ে যেতে পারে। অ্যান্থনি ঘোষের মতে, ৪০ বছরের বেশি বয়সি প্রায় প্রত্যেক ব্যক্তির এমআরআই পরীক্ষায় মেরুদণ্ডে বয়সজনিত কিছু পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। তবে এসব পরিবর্তন থাকলেই যে ঘাড়ে ব্যথা হবে, এমন নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনের কোনো না কোনো সময়ে প্রায় ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ ঘাড়ের ব্যথায় ভোগেন। কারও ক্ষেত্রে এ সমস্যা বারবার দেখা দিতে পারে, আবার কারও ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ঘাড়ের অস্বস্তি কমাতে ৫টি ব্যায়াম বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘাড়ের যত্নে দামি চেয়ার বা বিভিন্ন সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করার চেয়ে নিয়মিত নড়াচড়া করা এবং স্ক্রিন ব্যবহারের মাঝে বিরতি নেওয়া বেশি কার্যকর হতে পারে। শরীর সচল রাখলে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং পেশির শক্তি বজায় রাখতে সহায়তা পাওয়া যায়। ঘাড়ের স্বাভাবিক নড়াচড়া ও পেশির শক্তি ধরে রাখতে নিচের ব্যায়ামগুলো করা যেতে পারে। ১. ডানে-বাঁয়ে ঘাড় ঘোরানো চেয়ারে সোজা হয়ে বসুন অথবা চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ুন। এরপর ধীরে ধীরে মাথা একদিকে ঘোরান। যতটুকু ঘোরালে স্বস্তি বোধ করেন, ততটুকু ঘুরিয়ে প্রায় দুই সেকেন্ড ধরে রাখুন। এরপর মাথা মাঝখানে ফিরিয়ে অন্যদিকে একইভাবে ঘোরান। প্রতিটি দিকে দুই থেকে তিনবার ব্যায়ামটি করা যেতে পারে। তবে ঘাড়ে ব্যথা বাড়লে বা অস্বস্তি হলে জোর করে মাথা ঘোরানো যাবে না। ২. ঘাড় সোজা রেখে বসার অভ্যাস ঘাড় ও মেরুদণ্ডের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমাতে বসার ভঙ্গি ঠিক রাখা জরুরি। চেয়ারে বসার সময় পিঠ ও কাঁধ শিথিল রাখুন এবং ঘাড় সোজা রাখার চেষ্টা করুন। থুতনি সামনের দিকে এগিয়ে দেওয়া কিংবা কাঁধ সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে রাখা এড়িয়ে চলুন। কম্পিউটারে কাজ করা, টেলিভিশন দেখা বা গাড়ি চালানোর সময় দীর্ঘক্ষণ মাথা একদিকে কাত করে কিংবা ঘুরিয়ে রাখবেন না। একই ভঙ্গিতে অনেকক্ষণ না থেকে নিয়মিত অবস্থান পরিবর্তন করুন। পাশাপাশি অল্প সময়ের জন্য বিরতি নিয়ে হাঁটাচলা বা হালকা নড়াচড়া করুন। ৩. সামনের দিকে ঝুঁকে থাকা মাথার ভঙ্গি ঠিক করা দীর্ঘ সময় কম্পিউটার ব্যবহারের কারণে মাথা ও থুতনি সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এ অভ্যাস সংশোধনে একটি সহজ ব্যায়াম করা যায়। প্রথমে ঘাড় লম্বা রেখে থুতনি ধীরে ধীরে পেছনের দিকে টেনে নিন। বিষয়টি বোঝার জন্য কল্পনা করতে পারেন, থুতনির নিচে একটি নরম পিচ ফল রাখা আছে। ফলটি চেপে না ধরে থুতনি আলতোভাবে পেছনে সরাতে হবে। একই সঙ্গে বুক সামান্য প্রসারিত করুন এবং দুই কাঁধের পেছনের অংশ নিচের দিকে ও পেছনে আলতোভাবে টেনে রাখুন। এতে মাথা ও ঘাড়কে কাঁধের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে সঠিক অবস্থানে রাখতে সাহায্য হতে পারে। ৪. ঘাড়ের সামনের পেশি শক্তিশালী করা মাথাকে স্থিতিশীল রাখা এবং এর ভার বহনে ঘাড়ের সামনের পেশিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব পেশির শক্তি বাড়াতে চিৎ হয়ে শুয়ে হাঁটু ভাঁজ করুন এবং পায়ের পাতা বিছানা বা মেঝেতে রাখুন। এরপর থুতনি আলতোভাবে বুকের দিকে টেনে নিন। মাথার পেছনে একটি হাত রেখে মাথা মেঝে বা বিছানার ওপর থেকে প্রায় এক ইঞ্চি ওপরে তুলুন। এরপর হাত সরিয়ে কয়েক সেকেন্ড অবস্থানটি ধরে রাখুন। স্বস্তি অনুযায়ী ধীরে ধীরে ধরে রাখার সময় বাড়ানো যেতে পারে। তবে ৩০ সেকেন্ড পর্যন্ত ধরে রাখার চেষ্টা কেবল তখনই করা উচিত, যখন তা ব্যথামুক্ত ও আরামদায়ক থাকে। ঘাড়ে সমস্যা থাকলে এ ধরনের ব্যায়াম শুরুর আগে চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া ভালো। ৫. ঘাড়ের গভীর পেশির শক্তি বাড়ানো এ ব্যায়ামটি মাথার পেছনে ঠেস দেওয়ার মতো ব্যবস্থা রয়েছে, এমন চেয়ারে বসে করা যায়। সোজা হয়ে বসে সামনের দিকে তাকান। এরপর থুতনি বুকের দিকে আলতোভাবে টেনে মাথার পেছনের অংশ চেয়ারের ঠেসের সঙ্গে হালকাভাবে চাপ দিন। কিছুক্ষণ এ অবস্থায় থেকে আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসুন। স্বস্তি অনুযায়ী ব্যায়ামটি কয়েকবার করা যেতে পারে। ঘাড়ের পেশি শক্তিশালী করতে রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ডও ব্যবহার করা যায়। তবে সঠিক কৌশল জানা না থাকলে বা ঘাড়ে আগে থেকেই সমস্যা থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করা উচিত নয়। একসময় ঢালু ডেস্কে পড়াশোনা ও লেখালেখি করা হতো কেন? ঘাড়ের ওপর চাপ কমানোর প্রসঙ্গে অ্যান্থনি ঘোষ অতীতের পড়াশোনা ও লেখালেখির অভ্যাসের কথাও উল্লেখ করেছেন। তার মতে, প্রায় ৪৫ ডিগ্রি কোণে ঢালু ডেস্ক বা লেখার পাটাতনে বই পড়া ও লেখার সুবিধা ছিল। এ ধরনের অবস্থানে ঘাড় খুব বেশি বাঁকানো ছাড়াই নিচের দিকে তাকানো সম্ভব হতো। শিল্পবিপ্লবের আগেও লেখালেখির সুবিধার জন্য ঢালু লেখার পাটাতন ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। পরে টাইপরাইটার ও কম্পিউটারের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমতল ডেস্কের প্রচলনও বেড়ে যায়। তবে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে ঘাড়ের ওপর চাপ পড়ার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। ঘাড়ের যত্নে ছোট অভ্যাসই গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক জীবনে দীর্ঘ সময় মোবাইল ও কম্পিউটার ব্যবহার এড়িয়ে চলা অনেকের পক্ষেই কঠিন। তবে সঠিক ভঙ্গিতে বসা, নিয়মিত বিরতি নেওয়া এবং শরীর সচল রাখার মাধ্যমে দীর্ঘক্ষণ একই অবস্থানে থাকার কারণে সৃষ্ট চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে ঘাড়ে দীর্ঘস্থায়ী, তীব্র বা ক্রমশ বাড়তে থাকা ব্যথা হলে শুধু ব্যায়ামের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। ঘাড়ের ব্যথার সঙ্গে অসাড়তা, পেশির দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা অন্য কোনো উদ্বেগজনক উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ব্যায়াম করার সময় ব্যথা বাড়লে তা বন্ধ করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ। সূত্র: সামা টিভি