ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধের জেরে বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা যখন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত, তখন নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক ভাগ্য বদলের বড় সুযোগ দেখছে তুরস্ক। কাস্পিয়ান সাগর, দক্ষিণ ককেশাস এবং তুরস্ক হয়ে চীন ও মধ্য এশিয়াকে ইউরোপের সঙ্গে যুক্তকারী ‘মিডল করিডোর’ বা মধ্যবর্তী বাণিজ্য পথটিকে জনপ্রিয় করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে আঙ্কারা। তবে এই পথটিকে একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর পেছনে বড় ধরনের পরিবহন, আর্থিক ও রাজনৈতিক বাধা রয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর এ খবর জানিয়েছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর রাশিয়া ও বেলারুশের মধ্য দিয়ে যাওয়া উত্তর দিকের স্থলপথগুলো (নর্দার্ন করিডোর) বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকেই মিডল করিডোরের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হতে শুরু করে। সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধের কারণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় এই রুটের গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে।
তুরস্কের আগ্রহের নেপথ্যে কী?
মিডল করিডোর, যার আনুষ্ঠানিক নাম ট্রান্স-কাস্পিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট রুট (টিআইটিআর) হলো একটি বহুমাত্রিক (রেল, সড়ক ও সমুদ্রপথের মিশ্রণ) চীন-ইউরোপীয় প্রকল্প। এটি চীন থেকে শুরু হয়ে মধ্য এশিয়া, কাস্পিয়ান সাগর, আজারবাইজান ও জর্জিয়া হয়ে তুরস্কের মাধ্যমে ইউরোপে প্রবেশ করেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক কাস্পিয়ান পলিসি সেন্টার-এর তথ্য অনুযায়ী, এই করিডোরে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মাইল রেলপথ এবং ৩১০ মাইলের কাস্পিয়ান সাগর পারাপার ব্যবস্থা রয়েছে।
তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরেই এই করিডোর বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখছে। আঙ্কারা এটিকে মধ্য এশিয়ার বিশাল জ্বালানি সম্পদের প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচনা করে। যার মধ্যে রয়েছে কাজাখস্তানের ৩০ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত তেল ও ৮৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস এবং তুর্কমেনিস্তানের ৪০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের গ্যাসের মজুত। একই সঙ্গে এই করিডোরকে মধ্য এশিয়ার তুর্কি প্রজাতন্ত্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন এবং তুর্কি বিশ্বে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের কৌশলগত পথ হিসেবে দেখছে আঙ্কারা।
এই রুটটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর সঙ্গেও মিলে যায়। এটি বেইজিংকে রাশিয়া ও ইরান এড়িয়ে ইউরোপীয় বাজারে পৌঁছানোর একটি নির্ভরযোগ্য পথ তৈরি করে দেয়। ফলে তুরস্ক এটিকে নিজেদের নেতৃত্বাধীন কৌশল এবং চীনের বিআরআই-এর পরিপূরক রুট উভয় হিসেবেই উপস্থাপন করছে।
গত সপ্তাহে কাজাখস্তানে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরকালে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান বলেছেন, ‘আমাদের রেল সংযোগ, বন্দর অবকাঠামো ও ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটিয়ে আমরা কাস্পিয়ান-ট্রানজিট মিডল করিডোরকে পুনরুজ্জীবিত করার কাজ করছি। ইউরেশীয় অঞ্চলকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও প্রতিযোগিতামূলক করাই আমাদের লক্ষ্য।’
কেন আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে এই রুট?
২০২২ সালের আগে চীন-ইউরোপ স্থল বাণিজ্যের ৮৬ শতাংশেরই বেশি হতো রাশিয়ার নর্দার্ন করিডোর দিয়ে। যুদ্ধ সেই সমীকরণ বদলে দিয়েছে। এর ওপর চলতি বছর যুক্ত হয়েছে হরমুজ প্রণালির সংকট। প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহকারী এই সরু জলপথটি অবরুদ্ধ হওয়ায় বিশ্ব বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে।
তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইয়িলমাজ গত এপ্রিলে বলেছিলেন, ‘ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধের পর মিডল করিডোর এখন আর কেবল বিকল্প নয়, এটি একটি বাধ্যতামূলক পছন্দ।’
ওয়াশিংটনের আটলান্টিক কাউন্সিলের তুরস্ক প্রোগ্রাম-এর অনাবাসিক ফেলো পিনার দোস্ত মনে করেন, হরমুজের এই অচলাবস্থাকে কাজে লাগিয়ে তুরস্ক পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে প্রধান ট্রানজিট হাব হিসেবে নিজের অবস্থান পাকা করতে চায়।
তা ছাড়া, আজারবাইজানের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে তার ছিটমহল নাখচিভানকে আর্মেনিয়ার সিউনিক অঞ্চলের মধ্য দিয়ে সংযুক্ত করার জন্য মার্কিন মধ্যস্থতায় যে ট্রাম্প রুট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস অ্যান্ড প্রসপারিটি (টিআরআইপিপি) বা ট্রিপ প্রকল্পের আলোচনা চলছে, তা সফল হলে মিডল করিডোরের কার্যকারিতা আরও বাড়বে।
পাশাপাশি, ২০২৩ সালের জি-২০ সম্মেলনে ঘোষিত ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর, যা ভারত, আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান ও ইসরায়েলকে যুক্ত করার কথা ছিল; তা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীলতার কারণে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ, লোহিত সাগরের সংকট এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আইমেক প্রকল্পের উপযোগিতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রগুলো এড়িয়ে যাওয়া মিডল করিডোর এখন বিশ্ববাজারের কাছে অনেক বেশি নিরাপদ মনে হচ্ছে।
সামনে যত চ্যালেঞ্জ
ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা থাকলেও মিডল করিডোরকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা বেশ কঠিন। পিনার দোস্ত স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘এই রুটটি হরমুজ প্রণালির বিপুল বাণিজ্য বা তেল পরিবহনের পরিপূরক হতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই তার স্থলাভিষিক্ত বা বিকল্প হতে পারে না।’ এটি মূলত কন্টেইনার পণ্য এবং অ-জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য উপযুক্ত।
অন্যতম বড় বাধা হলো এর বিশাল খরচ। আর্মেনিয়ার মতো নতুন রুটগুলো যুক্ত করে অবকাঠামো তৈরি করতে শত শত কোটি ডলারের প্রয়োজন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) অবশ্য তাদের গ্লোবাল গেটওয়ে এজেন্ডার আওতায় রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমাতে এই প্রকল্পে অর্থায়নের আগ্রহ দেখিয়েছে।
লজিস্টিক বা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও বড় দুর্বলতা রয়েছে। কাস্পিয়ান সাগরের অংশটি এই রুটের সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ এখানে ট্রেন থেকে পণ্য খালাস করে জাহাজে তুলতে হয় এবং ওপারে গিয়ে আবার ট্রেনে তুলতে হয়। ফলে বন্দর সক্ষমতা, ফেরির প্রাপ্যতা এবং আবহাওয়ার ওপর বাণিজ্য অনেকাংশে নির্ভরশীল। এর ওপর কাস্পিয়ান সাগরের পানির স্তর নেমে যাওয়ায় জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, যার কারণে আজারবাইজান ও কাজাখস্তানকে এখন বন্দর খনন কাজের জন্য বাড়তি বিনিয়োগ করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্স থেকে রেকর্ড ৬৩০ কোটি ডলারের ভার্চ্যুয়াল সম্পদ চুরির ঘটনায় উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। সংস্থাটির দাবি, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা চুরি করা সম্পদের বেশির ভাগই ইথেরিয়াম ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে অর্থ পাচার করছে। এদিকে চুরি হওয়া অর্থের ৯০ শতাংশ কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে পুনরায় কিনে গ্রাহকদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে বাইন্যান্স। শনিবার (৩১ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে এফবিআই জানায়, উত্তর কোরিয়ার সাইবার অপরাধীরা চুরি করা সম্পদ বিভিন্ন মাধ্যমে পাচার করছে। এ ঘটনায় ‘ট্রেডারট্রেইটর’ নামে একটি গোষ্ঠীকে দায়ী করেছে সংস্থাটি। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম বাইবিট থেকে ১৫০ কোটি ডলারের সম্পদ চুরির অভিযোগও ছিল একই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। এফবিআইয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চুরি করা সম্পদ ধাপে ধাপে আরও পাচার করা হতে পারে। এ কারণে সাম্প্রতিক অর্থ পাচার কার্যক্রমে ব্যবহৃত লেনদেনগুলো বন্ধ করতে ভার্চ্যুয়াল সম্পদসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি সন্দেহভাজন ডিজিটাল ঠিকানাগুলোও প্রকাশ করেছে, যাতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সেগুলো শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। অন্যদিকে শনিবার দেওয়া পৃথক এক বিবৃতিতে বাইন্যান্স জানিয়েছে, চুরি হওয়া সম্পদের ৯০ শতাংশের সমপরিমাণ নতুন টোকেন কোম্পানির নিজস্ব অর্থ দিয়ে কিনে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। বাকি ১০ শতাংশ তুলনামূলক কম তারল্যসম্পন্ন টোকেনের। ফলে সেগুলো কিনতে আরও সময় লাগতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে বাইন্যান্স বলেছে, ‘সব টোকেনের ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপিত সম্পদের পরিমাণ ১০০ শতাংশে না পৌঁছানো পর্যন্ত আমরা অবশিষ্ট টোকেন সম্পদ কেনা অব্যাহত রাখব। চুরি হওয়া এসব তহবিলের আর্থিক ক্ষতি বিন্যান্স বহন করবে, গ্রাহকেরা নয়।’ চুরি হওয়া টোকেন পুনরায় কেনার অর্থ এসেছে গ্রাহকদের সুরক্ষায় বাইন্যান্সের রাখা এক বিলিয়ন ডলারের ‘সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজারস’ (সাফু) থেকে। নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় গ্রাহকদের সুরক্ষা দিতে এ তহবিল গঠন করা হয়েছে। এতে থাকা বিটকয়েন রিজার্ভের পাশাপাশি কোম্পানির ফিউচার্স ইনস্যুরেন্স ফান্ড এবং করপোরেট কোষাগার থেকেও অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ পরিচালনাকারী বাইন্যান্স গ্রাহকদের অর্থ নিরাপদ থাকার আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করার মধ্যেই শুক্রবার ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে দরপতন ঘটে। বিন্যান্সের সহপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিচার্ড টেং শুক্রবার জানান, এটি ছিল একটি ‘জটিল সাইবার হামলা’। এতে একটি ল্যাপটপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং হামলার কার্যক্রমের প্রমাণ মুছে ফেলার জন্য ক্ষতিকর সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়। ফলে হামলার উৎস শনাক্ত করা ও তদন্ত পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। হামলার পর গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলনের সুযোগ বন্ধ করে দেয় বাইন্যান্স। তবে শনিবার পরে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, রোববার (১ নভেম্বর) থেকে আবার অর্থ উত্তোলনের কার্যক্রম চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এ ছাড়া গ্রাহকদের সম্পদের বিপরীতে পর্যাপ্ত রিজার্ভ রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের সুযোগ দিতে নতুন ‘প্রুফ অব রিজার্ভস’ প্রতিবেদন প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছে বাইন্যান্স। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা নিজেরাই যাচাই করতে পারবেন, তাদের জমা রাখা সম্পদের বিপরীতে কোম্পানির কাছে অন্তত সমপরিমাণ সম্পদ রয়েছে কি না। সূত্র: আল জাজিরা
ইরানের দেওয়া কয়েকটি শর্ত মেনে নিলে দুই দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। রোববার (১ নভেম্বর) আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাগচি এসব কথা বলেন। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানো এবং ইরানের নির্ধারিত নতুন নৌপথের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরানের প্রাথমিক সাত দিনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছিল। তবে কাতারের পক্ষ থেকে সময়সীমা কমিয়ে পাঁচ দিন বা তার নিচে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। শনিবার কাতারের প্রতিনিধিদলের সফরের সময় এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত দুই দিনে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের একটি রূপরেখা তৈরি হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম দিনে যুক্তরাষ্ট্রকে নির্ধারিত কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্বিতীয় দিনেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং জাহাজ চলাচল আগের অবস্থায় ফিরবে। আরাগচি বলেন, ইরানের অন্যান্য শর্তের মধ্যে রয়েছে জুলাইয়ে ইসলামাবাদ সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর আরোপ করা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জুনে দেওয়া তেল রপ্তানির ছাড় পুনর্বহাল এবং কাতারসহ বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ইরানের অর্থ ছাড়। এ ছাড়া ইরান ও ওমানের নির্ধারিত নতুন নৌপথের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, অন্য সব নৌপথ বন্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানিয়েছে তেহরান। বিশেষ করে লেবাননে ইসরাইলের হামলা বন্ধের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তবে ইরানের এই প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতির বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জেনসেন হুয়াংকে লক্ষ্য করে চীনের গুপ্তচরবৃত্তির ষড়যন্ত্রের অভিযোগের বিষয়ে গভীরভাবে নজর রাখছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ঘটনায় হুয়াংয়ের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র। গতকাল শনিবার ফ্লোরিডায় নিজের বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র সরকার ‘খুব সতর্কতার সঙ্গে’ খতিয়ে দেখছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের বৃহস্পতিবারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চীনা এক নির্বাহী কর্মকর্তা জেনসেন হুয়াংয়ের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন তথ্য বেইজিংয়ের কাছে পাচার করছিলেন। তবে চীন এ প্রতিবেদনকে ‘ভিত্তিহীন জল্পনা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। এ বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘জেনসেনের প্রতি আমার অনেক শ্রদ্ধা রয়েছে। নির্দিষ্ট ঘটনাটি সম্পর্কে আমি আগে জানতাম না। তবে আশা করি, তিনি ভালো থাকবেন। তিনি একজন অসাধারণ ও মেধাবী মানুষ। আমরা আমাদের মেধাবী মানুষদের সুরক্ষা দিতে চাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিষয়টি খুব সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখব।’ এ ঘটনায় জেনসেন হুয়াংকে উপদেষ্টা হিসেবে বহাল রাখা হবে কি না— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি অবশ্যই তাকে বহাল রাখতে চাই। তবে এ বিষয়ে বিপরীত কোনো তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত। এখন পর্যন্ত জেনসেন হুয়াংকে আমি সব সময়ই স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে পেয়েছি।’ তবে বিষয়টি বেশ জটিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নীতিনির্ধারণের বিষয়ে জেনসেন হুয়াং ট্রাম্পের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। গত মে মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করতে ট্রাম্পের বেইজিং সফরসঙ্গী প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের মধ্যেও তিনি ছিলেন। তাইওয়ানে জন্ম নেওয়া এই ব্যবসায়ী চীনে এনভিডিয়ার তৈরি চিপ ব্যবহারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন। এদিকে চীন নিজস্ব সেমিকন্ডাক্টর বা অর্ধপরিবাহী চিপ প্রযুক্তির উন্নয়নে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।