দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। কমিটি বলেছে, পাসের হারের কৃত্রিম প্রতিযোগিতার বাইরে গিয়ে শিক্ষার প্রকৃত গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে মিল রেখে ‘বছরভিত্তিক’ সুনির্দিষ্ট মান পরিমাপ পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন।
একই সাথে শিক্ষা খাতের বরাদ্দকৃত অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, শিক্ষার বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের কৌশল গ্রহণ, অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়া, মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বাড়ানো, মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসারে ‘একগুচ্ছ’ প্রস্তাব ও সুপারিশ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ১ম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভার কার্যবিবরণীতে দেশের শিক্ষা খাতের জন্য নতুন এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।
কমিটির কার্যবিবরণীর তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার মেধা বিকাশ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে ২০২৬ সালে গোল্ডেন জিপিএ অর্জনকারী প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে ল্যাপটপ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। একই সাথে ৭০ লাখ মেয়ে শিক্ষার্থীকে ৪ হাজার কোটি টাকার বৃত্তির আওতায় আনা হচ্ছে। পাশাপাশি ইএফটি ও আইবাস++ পদ্ধতিতে প্রায় ৭০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর বকেয়া পাওনা সরাসরি ব্যাংকে পাঠানোর ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে ধন্যবাদ জানানো হয়।
কার্যবিবরণীর সারসংক্ষেপে আরও জানানো হয়, শর্তপূরণকারী প্রতিষ্ঠান ও প্রবীণ শিক্ষকদের দ্রুত এমপিওভুক্তি, ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করা, মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার কারণ জানতে গবেষণা, সংসদ সদস্যদের সরাসরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন এবং পরবর্তী বৈঠকগুলোতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাবোর্ডের প্রধানদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক কার্যক্রম বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার শিক্ষা খাতে শুধু সংখ্যার দিক বা পাসের হারের কৃত্রিম প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার এই কৃত্রিম প্রতিযোগিতায় বিশ্বাসী নয়। আমরা চাই দেশে শিক্ষার আসল গুণগত মান নিশ্চিত হোক।
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে কমিটির প্রথম সভায় একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে আমাদের শিক্ষার্থীদের মেলাতে হলে বছরভিত্তিক মূল্যায়ন ও আধুনিক শিক্ষাক্রমের বিকল্প নেই। তাই আমরা চাই শুধু বছরব্যাপী নয়, তিন মাস অথবা ছয় মাস অন্তর শিক্ষা ব্যবস্থায় শিখনফল মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু হওয়া প্রয়োজন। কমিটির আগামীর সভায় শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতে আরও দফাওয়ারী সুপারিশ করবে। পাশাপাশি শিক্ষার রোডম্যাপ নিয়ে একটি সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হবে। সেখানে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।’
শিক্ষার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বছরভিত্তিক মূল্যায়ন
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলিত মূল্যায়ন ব্যবস্থার ওপর পর্যালোচনা করা হয়। কেবল পাসের হার বৃদ্ধি শিক্ষার প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না বলেও উল্লেখ করা হয়। প্রচলিত ত্রুটিপূর্ণ ধারা থেকে বেরিয়ে এসে বছরভিত্তিক শিখনফল মূল্যায়ন এবং বিশ্বমানের শিক্ষাক্রম প্রবর্তনের ওপর জোর দেন সংসদীয় কমিটির সদস্যরা। একই সাথে মালয়েশিয়ার মডেলের ন্যায় দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা-ভাবনা প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়, যাতে সরকার বা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তি পরিবর্তন হলেও শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তকের মৌলিক কাঠামো বারবার পরিবর্তন না হয়।
সভায় কমিটির সদস্য রেজা কিবরিয়া বলেন, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়ে আন্তর্জাতিক সূচকে দেশের শিক্ষার্থীরা যেন পিছিয়ে না পড়ে, সেজন্য সুনির্দিষ্ট বছরভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রবর্তন জরুরি।
বৈঠকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুল খালেক জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ধরা হয়েছে, যা বিগত সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৪২.৭ শতাংশ বেশি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড স্পর্শের অংশ হিসেবে মেধা বিকাশ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে ২০২৬ সালে গোল্ডেন জিপিএ অর্জনকারী প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে একটি করে ল্যাপটপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নারী শিক্ষার প্রসার ও ঝরে পড়া রোধে ৭০ লাখ ছাত্রীকে ৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল বৃত্তির আওতায় আনা হচ্ছে।
কমিটির কার্যবিবরণীতে বলা হয়, শিক্ষকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘদিনের বকেয়া নিরসনে ইতিহাস সৃষ্টি করে বর্তমান সরকার এবারই প্রথম ইএফটি (ইলেক্ট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার) ও আইবাস++ পদ্ধতিতে দেশের প্রায় ৭০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীর বকেয়া পাওনা সরাসরি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানোর কাজ শুরু হয়েছে। প্রাথমিক ধাপে গড়ে প্রত্যেক শিক্ষককে ৫ লাখ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধার সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ আর্থিক সহায়তা দেওয়ায় সংসদীয় কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
সেখানে আরও বলা হয়, অতীতে রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা সমাধানে জোর দেওয়া হয়েছে। কমিটির সদস্য মোছা. তাহসিনা রুশদী ও মো. মুজিবুর রহমান এমপিওভুক্তির সকল শর্ত পূরণকারী নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান ও দীর্ঘদিন ধরে বিনাবেতনে সেবা দেওয়া প্রবীণ শিক্ষকদের বিষয়টি মাথায় রেখে অগ্রধিকারভিত্তিতে দ্রুত এমপিওভুক্তির জোর সুপারিশ করেন। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ফাইলের দীর্ঘসূত্রতা দূর করে শিক্ষক ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়।
কার্যবিবরণী অনুযায়ী, বিগত সময়ে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এ সকল শিক্ষার্থীরা কোথায় যাচ্ছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমার কারণ এবং বর্তমানে তারা কি করছে- তা চিহ্নিত করতে একটি সময়োপযোগী গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার ওপর বৈঠকে জোর দেওয়া হয়।
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) সামসুর রহমান খান জানান, ২০২৫ সাল পর্যন্ত কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ১৯ দশমিক ১৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে তা ৩০ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
শিক্ষার সার্বিক মান ও নীতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে সংসদ সদস্যরা সরেজমিনে স্কুল-কলেজ পরিদর্শন করবেন এবং পরবর্তী বৈঠকগুলোতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাবোর্ড ও বিভাগীয় দপ্তর প্রধানদের সশরীরে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সুপারিশমালা
সংসদীয় কমিটি শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে ৭ দফা সুপারিশ করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- শিক্ষার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জনে বছরভিত্তিক পরিমাপ পদ্ধতি তৈরি করা। শিক্ষা খাতের বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ গড়তে সংসদীয় কমিটির সদস্যগণ কর্তৃক স্কুল-কলেজ পরিদর্শন। পরবর্তী বৈঠকগুলোতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাবোর্ড ও অধীনস্থ দপ্তর প্রধানদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ। হজ্জযাত্রী ও দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত শিক্ষকদের বকেয়া দ্রুত মেটাতে আলাদা তালিকা তৈরি। বাজেট সাপেক্ষে বকেয়া ভাতা প্রদান প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা।
সংসদীয় কমিটির এই উদ্যোগ ও সুপারিশকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী হিসেবে দেখছেন দেশের শিক্ষাবিদরা। তারা বলছেন, পাসের হারের কৃত্রিম সূচক বাদ দিয়ে বছরভিত্তিক শিখনফল মূল্যায়ন এবং বিশ্বমানের শিক্ষাক্রম প্রবর্তনের যে তাগিদ সংসদীয় কমিটি দিয়েছে, তা শিক্ষার গুণগত রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। কমিটি বলেছে, পাসের হারের কৃত্রিম প্রতিযোগিতার বাইরে গিয়ে শিক্ষার প্রকৃত গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে মিল রেখে ‘বছরভিত্তিক’ সুনির্দিষ্ট মান পরিমাপ পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন। একই সাথে শিক্ষা খাতের বরাদ্দকৃত অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, শিক্ষার বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের কৌশল গ্রহণ, অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়া, মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বাড়ানো, মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসারে ‘একগুচ্ছ’ প্রস্তাব ও সুপারিশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ১ম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভার কার্যবিবরণীতে দেশের শিক্ষা খাতের জন্য নতুন এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। কমিটির কার্যবিবরণীর তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার মেধা বিকাশ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে ২০২৬ সালে গোল্ডেন জিপিএ অর্জনকারী প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে ল্যাপটপ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। একই সাথে ৭০ লাখ মেয়ে শিক্ষার্থীকে ৪ হাজার কোটি টাকার বৃত্তির আওতায় আনা হচ্ছে। পাশাপাশি ইএফটি ও আইবাস++ পদ্ধতিতে প্রায় ৭০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর বকেয়া পাওনা সরাসরি ব্যাংকে পাঠানোর ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে ধন্যবাদ জানানো হয়। কার্যবিবরণীর সারসংক্ষেপে আরও জানানো হয়, শর্তপূরণকারী প্রতিষ্ঠান ও প্রবীণ শিক্ষকদের দ্রুত এমপিওভুক্তি, ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করা, মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার কারণ জানতে গবেষণা, সংসদ সদস্যদের সরাসরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন এবং পরবর্তী বৈঠকগুলোতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাবোর্ডের প্রধানদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক কার্যক্রম বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার শিক্ষা খাতে শুধু সংখ্যার দিক বা পাসের হারের কৃত্রিম প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার এই কৃত্রিম প্রতিযোগিতায় বিশ্বাসী নয়। আমরা চাই দেশে শিক্ষার আসল গুণগত মান নিশ্চিত হোক। তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে কমিটির প্রথম সভায় একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে আমাদের শিক্ষার্থীদের মেলাতে হলে বছরভিত্তিক মূল্যায়ন ও আধুনিক শিক্ষাক্রমের বিকল্প নেই। তাই আমরা চাই শুধু বছরব্যাপী নয়, তিন মাস অথবা ছয় মাস অন্তর শিক্ষা ব্যবস্থায় শিখনফল মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু হওয়া প্রয়োজন। কমিটির আগামীর সভায় শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতে আরও দফাওয়ারী সুপারিশ করবে। পাশাপাশি শিক্ষার রোডম্যাপ নিয়ে একটি সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হবে। সেখানে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।’ শিক্ষার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বছরভিত্তিক মূল্যায়ন সংসদীয় কমিটির বৈঠকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলিত মূল্যায়ন ব্যবস্থার ওপর পর্যালোচনা করা হয়। কেবল পাসের হার বৃদ্ধি শিক্ষার প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না বলেও উল্লেখ করা হয়। প্রচলিত ত্রুটিপূর্ণ ধারা থেকে বেরিয়ে এসে বছরভিত্তিক শিখনফল মূল্যায়ন এবং বিশ্বমানের শিক্ষাক্রম প্রবর্তনের ওপর জোর দেন সংসদীয় কমিটির সদস্যরা। একই সাথে মালয়েশিয়ার মডেলের ন্যায় দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা-ভাবনা প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়, যাতে সরকার বা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তি পরিবর্তন হলেও শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তকের মৌলিক কাঠামো বারবার পরিবর্তন না হয়। সভায় কমিটির সদস্য রেজা কিবরিয়া বলেন, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়ে আন্তর্জাতিক সূচকে দেশের শিক্ষার্থীরা যেন পিছিয়ে না পড়ে, সেজন্য সুনির্দিষ্ট বছরভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রবর্তন জরুরি। বৈঠকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুল খালেক জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ধরা হয়েছে, যা বিগত সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৪২.৭ শতাংশ বেশি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড স্পর্শের অংশ হিসেবে মেধা বিকাশ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে ২০২৬ সালে গোল্ডেন জিপিএ অর্জনকারী প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে একটি করে ল্যাপটপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নারী শিক্ষার প্রসার ও ঝরে পড়া রোধে ৭০ লাখ ছাত্রীকে ৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল বৃত্তির আওতায় আনা হচ্ছে। কমিটির কার্যবিবরণীতে বলা হয়, শিক্ষকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘদিনের বকেয়া নিরসনে ইতিহাস সৃষ্টি করে বর্তমান সরকার এবারই প্রথম ইএফটি (ইলেক্ট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার) ও আইবাস++ পদ্ধতিতে দেশের প্রায় ৭০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীর বকেয়া পাওনা সরাসরি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানোর কাজ শুরু হয়েছে। প্রাথমিক ধাপে গড়ে প্রত্যেক শিক্ষককে ৫ লাখ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধার সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ আর্থিক সহায়তা দেওয়ায় সংসদীয় কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। সেখানে আরও বলা হয়, অতীতে রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা সমাধানে জোর দেওয়া হয়েছে। কমিটির সদস্য মোছা. তাহসিনা রুশদী ও মো. মুজিবুর রহমান এমপিওভুক্তির সকল শর্ত পূরণকারী নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান ও দীর্ঘদিন ধরে বিনাবেতনে সেবা দেওয়া প্রবীণ শিক্ষকদের বিষয়টি মাথায় রেখে অগ্রধিকারভিত্তিতে দ্রুত এমপিওভুক্তির জোর সুপারিশ করেন। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ফাইলের দীর্ঘসূত্রতা দূর করে শিক্ষক ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়। কার্যবিবরণী অনুযায়ী, বিগত সময়ে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এ সকল শিক্ষার্থীরা কোথায় যাচ্ছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমার কারণ এবং বর্তমানে তারা কি করছে- তা চিহ্নিত করতে একটি সময়োপযোগী গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার ওপর বৈঠকে জোর দেওয়া হয়। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) সামসুর রহমান খান জানান, ২০২৫ সাল পর্যন্ত কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ১৯ দশমিক ১৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে তা ৩০ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। শিক্ষার সার্বিক মান ও নীতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে সংসদ সদস্যরা সরেজমিনে স্কুল-কলেজ পরিদর্শন করবেন এবং পরবর্তী বৈঠকগুলোতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাবোর্ড ও বিভাগীয় দপ্তর প্রধানদের সশরীরে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সুপারিশমালা সংসদীয় কমিটি শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে ৭ দফা সুপারিশ করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- শিক্ষার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জনে বছরভিত্তিক পরিমাপ পদ্ধতি তৈরি করা। শিক্ষা খাতের বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ গড়তে সংসদীয় কমিটির সদস্যগণ কর্তৃক স্কুল-কলেজ পরিদর্শন। পরবর্তী বৈঠকগুলোতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাবোর্ড ও অধীনস্থ দপ্তর প্রধানদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ। হজ্জযাত্রী ও দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত শিক্ষকদের বকেয়া দ্রুত মেটাতে আলাদা তালিকা তৈরি। বাজেট সাপেক্ষে বকেয়া ভাতা প্রদান প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা। সংসদীয় কমিটির এই উদ্যোগ ও সুপারিশকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী হিসেবে দেখছেন দেশের শিক্ষাবিদরা। তারা বলছেন, পাসের হারের কৃত্রিম সূচক বাদ দিয়ে বছরভিত্তিক শিখনফল মূল্যায়ন এবং বিশ্বমানের শিক্ষাক্রম প্রবর্তনের যে তাগিদ সংসদীয় কমিটি দিয়েছে, তা শিক্ষার গুণগত রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পাওয়া ও অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতার মূল্যায়নে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি নতুন কর্মপদ্ধতি তৈরি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি জানান, এসব শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। তাদের দক্ষতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক প্রাথমিক তহবিল এবং প্রয়োজনে তিন মাসের মধ্যে অকৃতকার্য বিষয়ে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগসহ একটি স্থায়ী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করছে সরকার। শনিবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওস্থ বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘চ্যালেঞ্জড স্টুডেন্টস কনভেনশন ২০২৬’-এ বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গণস্বাক্ষরতা অভিযান এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় শিক্ষামন্ত্রী এবং সকল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সচিবদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। এবার এসএসসিতে প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত ফলাফল পায়নি। এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ভাগ্যের পরিবর্তন নিশ্চিত না করতে পারলে কোনো উন্নয়নই অর্থবহ হতে পারে না। তিনি জানান, যাদের কারিগরি ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণে আগ্রহ রয়েছে তাদের নিজ এলাকায় টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের (টিটিসি) সাথে যুক্ত করা হবে। কারো ভালো ব্যবসায়িক উদ্ভাবনী ধারণা থাকলে তাদের জন্য ছোট পরিসরে প্রাথমিক তহবিলের ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া জাপানি, কোরিয়ান, চীনা ও ইউরোপীয় ভাষা শিক্ষার মতো ৩ থেকে ৬ মাসের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে সরাসরি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। এক বছর অপেক্ষা না করে অকৃতকার্য বিষয়ে ৩ মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, ‘ইতোমধ্যে শিক্ষক ও অভিভাবকদের পক্ষ থেকে এক বছরের বদলে তিন মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং আমরা সামনে এ বিষয়ে পরিবর্তন আনার ব্যাপারে আশাবাদী। শিক্ষা সংস্কারের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে পূর্ণাঙ্গ খাতা পুনঃনিরীক্ষণ চালু করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেবল মেধার ঘাটতি নয়; আর্থিক অসঙ্গতি, শিক্ষক বা ক্লাসরুমের সংকট কিংবা পরীক্ষার আগে পারিবারিক সমস্যার কারণেও ফল খারাপ হতে পারে। সমন্বিত উদ্যোগে এসব সংকট কাটাতে সরকার সচেষ্ট রয়েছে। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে মাহদী আমিন বলেন, এসএসসিতে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া মানেই জীবনের ব্যর্থতা নয়। সার্টিফিকেটের ওপর ভিত্তি করে জীবন বিচার করা যায় না। একটি বিষয়ে খারাপ করার কারণে কারো মেধা ও সৃজনশীলতা নষ্ট হয় না। গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরীর সভাপতিত্বে সম্মেলনে গণস্বাক্ষরতা অভিযান কাউন্সিলের চেয়ারপারসন ড. ইরাম মরিয়ম, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস ও ডা. আরিফুর রহমান বক্তব্য রাখেন।
৫০তম বিসিএস পরীক্ষার্থীদের জন্য নতুন নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত গুগল ফর্মটি যারা এখনও পূরণ করেননি, তাদের ১২ অক্টোবরের মধ্যে তা জমা দিতে হবে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) পিএসসি সচিবালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৫০তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রার্থীকে একটি গুগল ফর্ম পূরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে যাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে কেউ কেউ এখনও ফর্মটি দাখিল করেননি। যেসব প্রার্থী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গুগল ফর্মটি পূরণ করতে পারেননি, তাদের কারণ দর্শানোসহ ২ অক্টোবরের মধ্যে আবশ্যিকভাবে এই লিংকে গিয়ে ফর্মটি জমা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। এ–সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিজ্ঞপ্তির অনুলিপি পিএসসি সচিবালয়ের সিস্টেম অ্যানালিস্ট ও জনসংযোগ কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে।