ভোরের আলো ফোটার আগেই রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন আয়নাল হক। দিনের পর দিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্যাডেল ঘুরিয়েছেন। রাতে ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে ফিরেছেন বাড়িতে। রিকশার আয়েই চলেছে সংসার, তবুও শত কষ্টের মাঝে পড়াশোনা করিয়েছেন দুই ছেলেকে। সামর্থ্য সীমিত হলেও সন্তানদের স্বপ্নের সীমা কখনো বেঁধে দেননি তিনি।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার খামারকান্দি গ্রামের সেই রিকশাচালক আয়নাল হকের বড় ছেলে মো. নাজমুল হাসান এখন পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সুদূর সুইডেনে। ইউনিভার্সিটি অব স্কোভডেতে ‘মাস্টার্স ইন বায়োসায়েন্স’ পড়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। পেয়েছেন শতভাগ টিউশন ফি মওকুফসহ পূর্ণ বৃত্তি। তবে বৃত্তি পাওয়ার পরও বিদেশযাত্রার খরচ হয়ে দাঁড়িয়েছিল বড় বাধা। সে-ই সংকটের সময় পাশে দাঁড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গত বুধবার (১২ আগস্ট) বাবাকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন নাজমুল। তার সংগ্রাম, পড়াশোনা ও সুইডেনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি শুনে প্রধানমন্ত্রী তাকে আর্থিক অনুদান দেন। একইসঙ্গে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে নিজেকে দক্ষ বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যতে দেশের মানুষের জন্য কাজ করার পরামর্শ দেন।
নাজমুলের গল্পটা অবশ্য সুইডেনের বৃত্তি পাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়নি। এর পেছনে আছে দীর্ঘ সংগ্রাম, বাবার ঘাম আর নিজের অদম্য পরিশ্রম। খামারকান্দি গ্রামের সাধারণ পরিবারে নাজমুলের বেড়ে ওঠা। বাবা আয়নাল হক রিকশাচালক, মা নারজিনা খাতুন গৃহিণী। সংসারে সচ্ছলতা ছিল না। প্রতিদিনের আয় দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি দুই ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগানোই ছিল বাবার বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু অর্থকষ্ট সন্তানদের পড়াশোনার পথে বাধা হোক, এটি মানতে চাননি বাবা আয়নাল হক। রিকশা চালিয়ে যে আয় করেছেন, তা দিয়ে কোনোভাবে সংসার সামলেছেন, সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন।
বাবার সেই সংগ্রাম নাজমুলও কাছ থেকে দেখেছেন। ফলে নিজের পড়াশোনার খরচ মেটাতে তাকেও কাজ করতে হয়েছে। কখনো রাজমিস্ত্রির সহযোগী, কখনো হোটেল কিংবা দোকানের কর্মচারী হিসেবে কাজ করেছেন। দিনের বেলায় শ্রম দিয়েছেন, আর সুযোগ পেলেই বই হাতে নিয়েছেন। অনেক রাত কেটেছে পড়ার টেবিলে। দারিদ্র্য তাকে থামাতে পারেনি। বরং প্রতিকূলতাই তাকে আরও দৃঢ় করেছে।
গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শুরু করে একসময় জায়গা করে নেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান (Biochemistry and Molecular Biology) বিভাগে। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থী বর্তমানে মাস্টার্সের থিসিস করছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন তিনি।
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার প্রতি আগ্রহ থেকেই বিদেশে পড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন নাজমুল। দীর্ঘ চেষ্টা শেষে সেই স্বপ্নের দুয়ার খুলে যায় সুইডেনে। ইউনিভার্সিটি অব স্কোভডেতে ‘মাস্টার্স ইন বায়োসায়েন্স’ পড়ার জন্য শতভাগ টিউশন ফি মওকুফসহ পূর্ণ বৃত্তি পান তিনি। জীবনের বড় অর্জন হলেও আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন দুশ্চিন্তা।
বৃত্তির আওতায় টিউশন ফি ও স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা থাকলেও বিমানভাড়া, আবাসন এবং শুরুতে জীবনযাপনের খরচ বহন করার মতো সামর্থ্য ছিল না পরিবারের। রিকশা চালিয়ে যে আয় করেন আয়নাল হক, তা দিয়ে সংসার চালানো এবং দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ বহন করাই কঠিন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পরও নাজমুলের সুইডেনযাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। একদিকে বহু বছরের পরিশ্রমে অর্জিত বৃত্তি, অন্যদিকে বিদেশযাত্রার প্রয়োজনীয় অর্থের সংকট, এই দুইয়ের টানাপোড়েনে থমকে যাওয়ার উপক্রম হয় তার স্বপ্ন।
এই পরিস্থিতিতে নাজমুলের উচ্চশিক্ষার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। শেরপুরের ডা. মনজুর রশিদের সহযোগিতায় প্রধানমন্ত্রীর সহকারী চিকিৎসক ডা. এএনএম মনোয়ারুল কাদির বিটুর মাধ্যমে তার আবেদনপত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছায়। এরপর বাবাকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন নাজমুল। সেখানে নিজের শৈশব, পরিবারের আর্থিক সংকট, পড়াশোনার সংগ্রাম এবং সুইডেনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি।
নাজমুলের কথা শুনে তার উচ্চশিক্ষার জন্য আর্থিক সহযোগিতা করেন প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে একজন দক্ষ বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা এবং দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার পরামর্শ দেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের অনুভূতি জানিয়ে নাজমুল কালবেলাকে বলেন, ছোটবেলা থেকেই তারেক রহমান তার অনুপ্রেরণার একজন মানুষ। সরাসরি সাক্ষাৎ করে নিজের সংগ্রামের কথা বলা এবং তার কাছ থেকে পরামর্শ পাওয়া তার জীবনের স্মরণীয় একটি ঘটনা।
নাজমুল জানান, তার বাবা একজন রিকশাচালক। বাবার উপার্জনের ওপর নির্ভর করেই তাদের পড়াশোনা এগিয়েছে। সুইডেনে শতভাগ বৃত্তি পাওয়ার পরও বিমানভাড়া ও সেখানে থাকা-খাওয়ার প্রাথমিক খরচ পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব হচ্ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতায় সেই অনিশ্চয়তা কেটে গেছে।
তিনি আরো জানান, প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকভাবে তার কথা শুনেছেন এবং মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে দক্ষ বিশেষজ্ঞ হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে দেশের মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। এই সহযোগিতা তাকে আরও দায়িত্বশীলভাবে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
নাজমুলের বাবা আয়নাল হক বলেন, সন্তানদের পড়াশোনা করানোর জন্য তিনি সবসময় কষ্ট করেছেন। রিকশা চালিয়ে সংসার চালানো সহজ ছিল না, তবু ছেলেদের পড়াশোনা বন্ধ করেননি। বড় ছেলে এতদূর যেতে পারায় তার দীর্ঘদিনের কষ্ট সার্থক হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। ছেলে বিদেশে গিয়ে ভালোভাবে পড়াশোনা করে দেশের জন্য কিছু করার প্রত্যাশাও রয়েছে তার।
নাজমুলের ছোট ভাই মো. আতিক হাসানও পড়াশোনা করছেন। এবার তিনি শেরপুর সরকারি কলেজে এইচএসসি শিক্ষার্থী। দুই ছেলেকে ঘিরেই আয়নাল হক ও নারজিনা খাতুনের স্বপ্ন।
নাজমুল তার এই পথচলায় পরিবারের পাশাপাশি যারা বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতা করেছেন, তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। বিশেষভাবে ডা. এএনএম মনোয়ারুল কাদির বিটু, ডা. মনজুর রশিদ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আরিফ ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক সর্দার জহুরুলসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি।
খামারকান্দির মেঠোপথ থেকে সুইডেনের বিশ্ববিদ্যালয়, নাজমুলের এই যাত্রা কেবল একটি শিক্ষার্থীর বিদেশে উচ্চশিক্ষার গল্প নয়। এর ভেতরে আছে একজন রিকশাচালক বাবার ঘাম, একজন মায়ের ত্যাগ, সন্তানের অদম্য চেষ্টা এবং সংকটের সময়ে পাওয়া সহযোগিতার গল্প। যে রিকশার প্যাডেল ঘুরিয়ে আয়নাল হক বছরের পর বছর সংসারের চাকা সচল রেখেছেন, সেই রিকশার আয়ের একটি অংশেই গড়ে উঠেছে ছেলের ভবিষ্যৎ। আজ সেই ছেলে নতুন স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি দিতে যাচ্ছেন সুদূর সুইডেনে।
নাজমুলের সামনে এখন নতুন লড়াই, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা এবং নিজেকে একজন দক্ষ বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তোলা। তার পেছনে থাকবে খামারকান্দির সেই ছোট ঘর, রিকশার প্যাডেলে জমে থাকা বাবার ঘাম আর একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। এই গল্প যেন আবারও মনে করিয়ে দেয়, অভাব মানুষের পথ কঠিন করে দিতে পারে, কিন্তু স্বপ্নের পথ বন্ধ করে দিতে পারে না। শ্রম, মেধা, অধ্যবসায় আর একটু সহযোগিতা পেলে রিকশাচালকের ঘর থেকেও তৈরি হতে পারে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের স্বপ্নবাজ তরুণ।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
গ্যাস পাইপলাইনের জরুরি মেরামত কাজের জন্য বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুর, আগারগাঁও, শ্যামলীসহ বেশ কিছু এলাকায় ১০ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে। বুধবার এক বিজ্ঞপ্তিতে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এসব এলাকার আবাসিক, বাণিজ্যিক ও সিএনজি গ্রাহকরা গ্যাস পাবেন না। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে আগারগাঁও, তালতলার পশ্চিমাংশ, শেওড়াপাড়ার পশ্চিমাংশ, কাজীপাড়ার পশ্চিমাংশ, মিরপুর-১০ এর পশ্চিমাংশ, মিরপুর-১, পাইকপাড়া, শ্যামলী, মিরপুর ৬০ ফিট ও পীরের বাগ এলাকায়। এ ছাড়া কল্যাণপুর থেকে মিরপুর-১ অভিমুখী সড়কের ডান পাশের এলাকায় গ্যাস থাকবে না। তিতাস বলছে, নির্ধারিত এলাকার আশপাশেও এ সময় গ্যাসের চাপ কম থাকতে পারে। এই সময়ে গ্রাহকদের সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিটি। এর আগেও পাইপলাইন মেরামত ও ক্ষতিগ্রস্ত লাইন সংস্কারের কারণে মিরপুর, শ্যামলী ও কল্যাণপুর এলাকায় গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। গত ৯ এপ্রিল মিরপুর রোডের দারুস সালাম এলাকায় মাটির নিচের পাইপলাইনে ছিদ্র শনাক্ত হওয়ার পর মেরামতের সময় মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, কল্যাণপুর, মিরপুর ও তেজগাঁওসহ রাজধানীর একাংশে গ্যাস সংকট দেখা দেয়। তিতাসের তথ্য অনুযায়ী, সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি পুরনো ও ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনের ছিদ্র দিয়ে পানি ঢোকার কারণেও ঢাকার কিছু এলাকায় গ্যাসের সংকট তীব্র হওয়ার নজির রয়েছে। পাইপলাইনে চাপ কমে গেলে ছিদ্র দিয়ে পানি ঢোকার সুযোগ তৈরি হয় বলে কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। জুলাইয়ে তিতাসের আওতাধীন এলাকায় দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ছিল প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট। সে সময় সরবরাহ ১৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে যাওয়ায় দৈনিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট। তখন মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডিসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দিনের বড় সময় গ্যাস না থাকা বা চুলা জ্বালানোর মত চাপ না পাওয়ার অভিযোগ ছিল গ্রাহকদের।
ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় সংরক্ষিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের অর্ধনির্মিত ভাস্কর্যে জুতার মালা পরানোর ঘটনা ঘটেছে। আজ মঙ্গলবার সকালে ভাস্কর্যের মাথার অংশে জুতার মালা ঝোলানো অবস্থার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। পরে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে লোক পাঠিয়ে ভাস্কর্য থেকে জুতার মালাটি অপসারণ করা হয়। তবে কে বা কারা এটি করেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা যায়, সাদা রং করা ভাস্কর্যের মাথার অংশে রশি দিয়ে জুতার মালা ঝোলানো হয়েছে। এতে ডান পাশে দুটি এবং বাম পাশে তিনটি জুতা বা স্যান্ডেল দেখা যায়। জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বর্তমান কমিটির আহ্বায়ক কামালুজ্জামান কামাল জানান, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এক ব্যক্তি বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে তাঁকে ফোন করে ভাস্কর্যে জুতার মালা ঝোলানোর বিষয়টি জানান। পরে ওই ব্যক্তি আবার ফোন করে নিজেকে পুলিশ সদস্য বলে পরিচয় দেন। খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয় থেকে লোক পাঠিয়ে জুতার মালাটি সরিয়ে ফেলা হয়। কামালুজ্জামান কামাল বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত নিন্দনীয়। এটি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের চরম অবমাননা। কোনোভাবেই এটি গ্রহণযোগ্য নয়। ঘটনার তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে।’ ঘটনাটি নিয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা, ভাস্কর্যস্থলে সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং ভালো স্থপতির মাধ্যমে হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যটি সঠিক অবয়বে নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয় বলে জানান কামালুজ্জামান। ঝিনাইদহ সদর থানার ওসি আসাদউজ্জামান বলেন, ‘সাংবাদিকদের কাছ থেকেই বিষয়টি শুনেছি। এ ছাড়া বিস্তারিত জানি না। এ বিষয়ে কোনো আপডেটও নেই।’ জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন বলেন, ‘ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। পুলিশ প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে তদন্ত করে দ্রুত জড়িতদের আইনের আওতায় আনা যায়। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানা যাবে। এ বিষয়ে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি।’ বাস টার্মিনাল এলাকার চা দোকানি জাবেদ মিয়া বলেন, সকালে দোকান খোলার সময় তিনি হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যের মাথায় জুতার মালা দেখতে পান। পরে এক ব্যক্তি এসে সেটি সরিয়ে নেন। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাতিজা হাফিজুর রহমান বলেন, ‘হামিদুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্মৃতি হয়তো ওখান থেকে মুছে ফেলার জন্য কেউ পরিকল্পনা নিয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হোক।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটি শেয়ার করা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের জেলা শাখার সভাপতি শারমিন সুলতানা বলেন, বিষয়টি জানার পর লোক পাঠিয়ে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ছবি সংগ্রহের পর তিনি তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন। তিনি বলেন, ‘এটি খুবই ন্যক্কারজনক ঘটনা। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানকে অবমাননার সঙ্গে জড়িতদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে।’
ঢাকার বংশালে প্রিজনভ্যান থেকে এক শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীকে নামিয়ে তার বোনের প্রাইভেটকারে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের এক এসআই ও তার দলের বিরুদ্ধে। একই ঘটনায় প্রিজনভ্যান থেকে আরেক আসামিকে নামিয়ে কিছু সময়ের জন্য একা ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ঘটনাটি ঘটে গত ২৭ সেপ্টেম্বর রোববার বিকেল ৫টা ৫৮ মিনিটের দিকে। নিম্ন আদালত এলাকা থেকে ২৯ আসামিকে নিয়ে একটি প্রিজনভ্যান গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারের দিকে যাচ্ছিল। বংশালের প্রধান সড়কে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে যানজটে পড়লে সেখানে ঘটে এ ঘটনা। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, প্রিজনভ্যানের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এসআই প্রবীর কুমার নিজ হাতে ভ্যানটির গেট খুলে দেন। এরপর তিনি ‘পিচ্চি রাজা’ নামে পরিচিত ওই আসামিকে ভ্যান থেকে নামিয়ে আনেন। তার সঙ্গে ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের মালিক খায়রুল বাসারও নেমে আসেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভ্যান থেকে নামার পর পিচ্চি রাজা সামনে হাঁটতে থাকেন এবং তার পেছনে ছিলেন এসআই প্রবীর কুমার। অন্যদিকে খায়রুল বাসার তাদের সঙ্গে না গিয়ে প্রিজনভ্যানের চালকের পাশের আসনে গিয়ে বসেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অন্য আসামিদের সঙ্গে ভ্যানের ভেতরে না রেখে খায়রুল বাসারকে চালকের পাশের আসনে বসে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। সেখানে তিনি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে যাতায়াত করছিলেন বলেও সূত্রটির দাবি। এদিকে প্রিজনভ্যান থেকে নামার পর পিচ্চি রাজা ও এসআই প্রবীর প্রায় দুই মিনিট বংশালের মোড়ের দিকে হাঁটেন। সেখানে আগে থেকেই একটি প্রাইভেটকার নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমা। পরে এসআই প্রবীর নিজে ওই আসামিকে গাড়িটিতে তুলে দেন বলে তদন্ত সূত্রে জানা গেছে। ঘটনাটি নিয়ে জিএমপি কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার বলেন, কী কারণে এমন একজন দুর্ধর্ষ আসামিকে ছেড়ে দেওয়া হলো, তা আরও গভীরভাবে তদন্তের চেষ্টা চলছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ঘটনায় এসআই প্রবীর কুমার ও তার দলের বিরুদ্ধে আরও দুটি গুরুতর দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রথমত, ব্যস্ত সড়কে প্রিজনভ্যানের দরজা খুলে আসামিকে বাইরে নিয়ে আসা হয়। এতে ভ্যানের ভেতরে থাকা অন্য আসামিরাও সুযোগ নিয়ে পুলিশকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারতেন। দ্বিতীয়ত, খায়রুল বাসারকে হাতকড়া ছাড়া কিছু সময়ের জন্য একা ছেড়ে দেওয়া হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তিনি ওই সময় পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও তাকে আটকানোর মতো পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।