মিয়ানমারের পূর্ব শান রাজ্যে প্রথমবারের মতো টাংস্টেন খনি প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে রাশিয়া। একই এলাকায় আগে থেকেই একটি বড় চীনা খনি কার্যক্রম চলমান থাকায় নতুন এই উদ্যোগকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে শান হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন (এসএইচআরএফ)।
মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতী জানিয়েছে, সামরিক সরকার রুশ খনি প্রকল্পটিকে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দিয়েছে। খনিটির অবস্থান পূর্ব শান রাজ্যের মংটন টাউনশিপে, লই খি লেক পর্বতের উত্তরাংশে। এলাকাটি থাইল্যান্ড সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
অন্যদিকে একই পর্বতের দক্ষিণাংশের মং জাউদ এলাকায় একটি বৃহৎ চীনা টাংস্টেন খনি ইতোমধ্যে উৎপাদন শুরু করেছে। এসএইচআরএফের তথ্যমতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওই প্রকল্পে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। সেখানে উৎপাদিত খনিজ ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মির (ইউডব্লিউএসএ) সহযোগিতায় চীনে পাঠানো হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথম রুশ প্রকল্পটির বিষয়ে জানতে পারেন ২০২৫ সালের মে মাসে। সে সময় রাশিয়ার একটি খনিজ জরিপকারী দল সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও স্থানীয় মিলিশিয়া সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে এলাকায় পরিদর্শন চালায়। পরে চলতি বছরের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় দফায় এসে জমি পরিমাপের কাজ সম্পন্ন করে তারা।
স্থানীয়দের দাবি, তাদের জানানো হয়েছিল যে নেপিডো কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে খনিজ উত্তোলনের অনুমোদন দিয়েছে। তবে প্রকল্পটি নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ ও বিরোধিতা রয়েছে।
এসএইচআরএফ জানিয়েছে, পূর্ব শান রাজ্যে এটি রাশিয়ার প্রথম খনি প্রকল্প হলেও দক্ষিণ শান অঞ্চলের লৌহ আকরিক খাতে দেশটির সম্পৃক্ততা আগে থেকেই রয়েছে। রুশ খনি কোম্পানিগুলো মিয়ানমারের সামরিক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মিয়ানমার ইকোনমিক কো-অপারেশনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে এবং হোপং এলাকায় একটি ইস্পাত কারখানাও স্থাপন করেছে।
এদিকে চীনা পরিচালিত টাংস্টেন খনির বিরুদ্ধেও পরিবেশগত ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, খনির বর্জ্যে দূষিত ঝরনার পানির সংস্পর্শে এসে আশপাশের গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে চর্মরোগ দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি খনি থেকে আসা পলি জমে কৃষিজমির ক্ষতি হচ্ছে এবং পানি সরবরাহের জন্য ঝরনার প্রবাহ পরিবর্তন করায় স্থানীয়দের পানির সংকটও তৈরি হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনটির মতে, পূর্ব শান রাজ্যের খনিজ খাত দীর্ঘদিন ধরে চীনা কোম্পানিগুলোর প্রভাবাধীন। বিশেষ করে রেয়ার আর্থ ও স্বর্ণখনি কার্যক্রমে চীনঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সহযোগিতায় ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। এর ফলে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পরিবেশগত ও সামাজিক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একই এলাকায় চীন ও রাশিয়ার খনিজ বিনিয়োগ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
প্রতি রাতে ঘরের আলো নিভিয়ে দিলেও জানালার পর্দা গলে ঘরের ভেতরে এসে পড়ে বাইরের গলিপথ বা পার্কিং লটের কৃত্রিম আলোর তীব্র ঝলকানি। যুক্তরাষ্ট্রের পোর্টল্যান্ড শহরের মতো আধুনিক নগরে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ আজ ভুলেই গেছেন সত্যি সত্যি অন্ধকারে ঘুমানোর অভিজ্ঞতা কেমন হতে পারে। রাস্তার বাতি, বারান্দার আলো কিংবা পার্কিং লটের তীব্র আলো প্রতিনিয়ত চারপাশকে এমনভাবে আলোকিত করে রাখছে যে, অন্ধকার রাতের স্বাভাবিক অনুভূতিটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। সম্প্রতি আমেরিকার সাউথ-ইস্ট ওরেগনের ইন্টারন্যাশনাল ডার্ক স্কাই প্লেস নেটওয়ার্কের অন্তর্ভূক্ত একটি আবাসন অঞ্চলে যাওয়া এক লেখকের অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এই চরম বাস্তবতার ছবি। প্রায় আড়াই মিলিয়ন একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত দূষণমুক্ত এই অন্ধকার চত্বরে গিয়ে যেন কয়েক দশক পর মানুষ আবার সত্যিকারের রাতের আকাশের দেখা পাচ্ছে। সেখানে সূর্যাস্তের মাত্র আধা ঘণ্টা পর শুকনো হ্রদের অববাহিকায় খোলা আকাশের নিচে লাল আলো জালিয়ে মানুষ যখন রাতের সৌন্দর্য দেখতে সমবেত হয়, তখন একে একে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে শুক্র গ্রহ, ভেগা নক্ষত্র থেকে শুরু করে মহাকাশে ঘুরতে থাকা একের পর এক কৃত্রিম উপগ্রহ। রাতের আঁধার যত গভীর হয়, আকাশে একে একে ফুটে ওঠে আর্সা মেজর, আর্সা মাইনর, সিগনাস ও ক্যাসিওপিয়ার মতো নক্ষত্রমণ্ডল। আর যখন ছায়াপথের বা মিল্কিওয়ের উজ্জ্বল আলোর রেখা ভেসে ওঠে, তখন পরম নীরবতায় আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে মানুষ তার নিজের অস্তিত্বের ক্ষুদ্রতা উপলব্ধি করে। কিন্তু এই অপরূপ দৃশ্য আজ ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর বিশ্বের রাতের আকাশ প্রায় ১০ শতাংশ হারে বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষই এখন আলো-দূষিত আকাশের নিচে বসবাস করছেন। জাতিসংঘ যদিও পরিচ্ছন্ন বাতাস ও নিরাপদ পানিকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, তবে সুস্থ জীবনের জন্য মানুষের অন্ধকার পাওয়ার অধিকার (রাইট টু ডার্কনেস) রক্ষা করাও এখন সমান জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্ধকার রক্ষা করার এই আহ্বানের অর্থ এই নয় যে শহরের সব রাস্তার আলো পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, প্রতিটি গ্যারেজের সামনে এত তীব্র সাদা ফ্ল্যাডলাইটের কি সত্যিই কোনো প্রয়োজন আছে? নিরাপত্তার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকু আলো ব্যবহার করা গেলে আর শুধুমাত্র রাতের আকাশ দেখার জন্য শত শত মাইল গাড়ি চালিয়ে নির্জন প্রান্তরে যেতে হতো না। অন্ধকারের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন আলোর উত্তাপ, দিক এবং পরিমাণের সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও আইনি প্রয়োগ। অপ্রয়োজনীয়ভাবে একাধিক আলো ব্যবহারের জায়গায় পরিমিত আলোর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে মানুষ আবার অন্ধকারের গুরুত্ব অনুধাবন করতে শিখবে। কিছু শহর ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার ফ্ল্যাগস্টাফ শহর ১৯৫৮ সালেই সর্বপ্রথম বহিরঙ্গণ আলোকসজ্জার ওপর নিয়ম আরোপ করেছিল এবং ২০০১ সালে এটি বিশ্বের প্রথম স্বীকৃত 'ডার্ক স্কাই সিটি' হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সেখানে আলোর পরিমাণ, ধরন এবং তা কোন দিকে প্রতিফলিত হবে তা নির্দিষ্ট নিয়মে সুনিয়ন্ত্রিত। ফ্ল্যাগস্টাফের ধারাবাহিকতায় এখন বিশ্বের বহু শহর ও অঞ্চল নতুন করে ভাবছে। নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য বর্তমানে ডার্ক স্কাইস প্রটেকশন অ্যাক্ট প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনা করছে, যা কার্যকর হলে কখনো না ঘুমানো বিখ্যাত নিউ ইয়র্ক শহরের বহিরঙ্গণ আলোকসজ্জাতেও বেশ কিছু বিধিনিষেধ যুক্ত হবে। আলো দূষণ কমানোর জন্য কেবল স্থানভিত্তিক নতুন জোন আইন প্রণয়ন কিংবা গাড়ির হেডলাইটের উজ্জ্বলতা নির্ধারণের মতো সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়মই যথেষ্ট হতে পারে। রাতের অন্ধকারের গুরুত্ব কেবল নক্ষত্র দেখার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; অন্ধকার নিজেই প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাসস্থান। কৃত্রিম আলোর অতিপ্রয়োগের ফলে চাঁদের আলো দেখে পথ চলা প্রাণী ও পতঙ্গ চরম বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছে। ডিম ফুটে বের হওয়া ক্ষুদ্র সামুদ্রিক কচ্ছপ সাগরের দিকে না গিয়ে পার্কিং লটের আলোর দিকে ছুটছে, কিংবা আলোর চারপাশে অনবরত ঘুরতে ঘুরতে প্রদীপপোকার জীবন শেষ হচ্ছে। শুধু তাই নয়, জোনাকি ও ব্যাঙের মতো প্রাণীর প্রজনন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অন্ধকারের প্রয়োজন হলেও তারা সেই পরিবেশ পাচ্ছে না, আবার বড় বড় শহরের তীব্র আলোর কারণে পথ হারিয়ে ফেলছে পরিযায়ী পাখির দল। দিনের আলো ফোটার পরও আলো দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব প্রকৃতির মাঝে দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম আলো উদ্ভিদ ও পরাগায়নকারীদের মধ্যকার স্বাভাবিক সম্পর্ক ভেঙে দিচ্ছে, গাছের অসময়ে ফুল ফোটার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং পৃথিবীর সকল জীবকুলের দৈনন্দিন অভ্যন্তরীণ শারীরিক ঘড়ি বা সার্কেডিয়ান রিদম মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। মানুষের ক্ষেত্রেও এই প্রভাব বেশ প্রকট। ঘরের ভেতরের আলো হোক কিংবা জানালার বাইরে থেকে আসা কৃত্রিম আলো, গবেষণায় দেখা গেছে যে সুস্থ থাকা, শারীরিক নিরাময় এবং পূর্ণাঙ্গ বিশ্রামের জন্য মানুষের পর্যাপ্ত অন্ধকার পরিবেশ অত্যন্ত প্রয়োজন। সাধারণত রাস্তার বাতি, বাণিজ্যিক ভবন, পার্কিং লট এবং রাতভর জ্বালিয়ে রাখা খেলার মাঠ থেকে অধিকাংশ আলো দূষণ ছড়ায়। কিন্তু ইদানীং শুধু মাটি থেকেই নয়, আলো দূষণের বড় এক হুমকি তৈরি হচ্ছে সরাসরি মহাকাশ বা আকাশ থেকেও। এমনকি সংরক্ষিত ডার্ক স্কাই অঞ্চলে দাঁড়িয়ে যখন খোলা চোখে ছায়াপথ দেখা যায়, তখনও কৃত্রিম উপগ্রহের অবিরাম যাতায়াত রাতের আকাশের প্রাকৃতির রূপ নষ্ট করে দেয়। লক্ষ্যভিত্তিক বা সুরক্ষিত আলোর ব্যবহার মাটির আলো দূষণ কিছুটা কমাতে পারলেও মহাকাশে ঘুরতে থাকা স্পেসএক্সের ১১ হাজারের বেশি স্টারলিঙ্ক স্যাটেলাইটের উজ্জ্বলতা কমাতে কোনো কাজে আসছে না। তদুপরি, কিছু প্রতিষ্ঠান মহাকাশে স্যাটেলাইটের সাহায্যে কৃত্রিম সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে পৃথিবীর প্রায় তিন মাইল এলাকা আলোকিত করার মতো প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, মহাকাশে পাঠানো এসব বস্তু বা কৃত্রিম উপগ্রহের কারণে পৃথিবীতে জীবনের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়লেও সেগুলোর কোনো পরিবেশগত প্রভাব পর্যালোচনা করা বাধ্যতামূলক করা হয়নি। ইতিহাসের শুরু থেকেই নক্ষত্রভরা আকাশ মানুষের ইতিহাস ও সভ্যতার ধারক হয়ে আছে। তারার আলো মানুষকে পথ দেখিয়েছে, মানচিত্র, ক্যালেন্ডার এবং দিকনির্ণয়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। অথচ আধুনিক নগরায়নের যুগে রাতের আকাশ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, আর রাতের অন্ধকার দেখার সুযোগটি একটি বিশেষ বিলাসিতায় পরিণত হচ্ছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় ফ্রন্টে হুতিদের অগ্রযাত্রা শুধু তাদের সংখ্যাগত শক্তির কারণে হয়নি; বরং রাশিয়া ও ইরানের সমন্বিত গোয়েন্দা ও কমান্ড কাঠামো এতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। ওই কাঠামোয় রাশিয়ার মহাকাশভিত্তিক ভূ-স্থানিক গোয়েন্দা তথ্য ও সংকেত গোয়েন্দা সক্ষমতা ইরান-নেতৃত্বাধীন কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এর সঙ্গে তারিক সালেহর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেসের (এনআরএফ) ভেতরে মানব গোয়েন্দা তৎপরতা যুক্ত হয়ে হুতিদের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা তৈরি করেছিল বলে আলজাজিরার এক বিশ্লেষণধর্মী মতামতে বলা হয়েছে। ‘প্রজেক্ট অরোরাহ’ নামে একটি ভূ-স্থানিক ও সংকেত গোয়েন্দা তথ্য একীভূতকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সময় সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ইরাক, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানের ওপর রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা নজরদারির ধরণ শনাক্ত করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় একটি বিশেষভাবে সীমিত প্রবেশাধিকারযুক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে রাশিয়ার কক্ষপথভিত্তিক গোয়েন্দা তৎপরতাকে একটি সমন্বিত বহুসেন্সর ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পুনর্গঠন করা হয় বলেও দাবি করা হয়েছে। ইরানের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার আগে রুশ গোয়েন্দা স্যাটেলাইটের তৎপরতার ধারাবাহিকতাও এতে শনাক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় রুশ সামরিক ভূ-স্থানিক স্যাটেলাইট সহায়তা নিয়ে সিএনএনের একটি বড় অনুসন্ধানেও তা উঠে আসে। ইরান যুদ্ধের সময়ই এর মূল কৌশলটি স্পষ্ট হয়। সেখানে কক্ষপথভিত্তিক গোয়েন্দা, নজরদারি ও অনুসন্ধান ব্যবস্থা শুধু সামরিক অভিযানকে সহায়তা করেনি; বরং হামলার আগেই যুদ্ধক্ষেত্রের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখে। রাশিয়ার ভূ-স্থানিক গোয়েন্দা সক্ষমতা বিভিন্ন বাহিনীর অবস্থান, চলাচলের পথ, সদর দপ্তর ও রসদ ব্যবস্থার পরিবর্তন শনাক্ত করে। একই সঙ্গে সংকেত গোয়েন্দা ব্যবস্থা ইলেকট্রনিক সংকেতের উৎস, যোগাযোগের ধরন এবং কমান্ড কাঠামোর সম্পর্ক চিহ্নিত করে থাকে। স্যাটেলাইট গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বিত ব্যবহার এই ব্যবস্থার মূল সুবিধা কোনো একটি স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। বরং বিভিন্ন ধরনের গোয়েন্দা স্যাটেলাইটের তথ্য সময়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবহার করা হয়েছিল। বিভিন্ন রিকনেসান্স স্যাটেলাইটের পরিপূরক ভৌগোলিক ও তড়িৎচৌম্বকীয় কাভারেজের মাধ্যমে বাহিনীগুলোর চলাচল ও কার্যক্রমের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। ইরান যুদ্ধের সময় এই সমন্বিত স্যাটেলাইট গোয়েন্দা ব্যবস্থাই দেখিয়েছিল, রাশিয়ার মহাকাশভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য কীভাবে ইরানের সুনির্দিষ্ট সামরিক অভিযানকে আরও কার্যকর করতে পারে। ইয়েমেনে এই গোয়েন্দা তথ্যের কার্যকর সমন্বয় করেছিল ইরান। রাশিয়া থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে হুতিদের যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য এবং গোয়েন্দা তৎপরতা যুক্ত করে তারিক সালেহর কমান্ড কাঠামোর বিস্তারিত চিত্র তৈরি করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে কোন সদর দপ্তর কার্যকর ছিল, কোথায় অবগত অবস্থান বাস্তব অবস্থানের সঙ্গে মিলছিল না, কোন ইউনিটগুলোর মধ্যে সমন্বয় দুর্বল ছিল এবং ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস ও সৌদি নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের মধ্যে কোথায় কমান্ড, তথ্য ও যোগাযোগের ঘাটতি রয়েছে; এসব শনাক্ত করা সম্ভব হয়। পশ্চিম উপকূলে কীভাবে ভেঙে পড়ে প্রতিরোধ এই পরিস্থিতিতেই ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলীয় ফ্রন্টে প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের সদর দপ্তরের সঙ্গে এনআরএফের কিছু ইউনিটের একটি কমান্ড চ্যানেল ছিল। অন্য একটি চ্যানেলের মাধ্যমে এসব বাহিনী নিজেদের মধ্যে এবং নিজ নিজ ঊর্ধ্বতন কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করত। দুটি ব্যবস্থাই যখন অবিশ্বস্ত হয়ে পড়ে, তখন ভুল তথ্য ওপরের দিকে যেতে থাকে এবং বিভ্রান্তিকর বা নিয়ন্ত্রিত নির্দেশ নিচের দিকে পৌঁছাতে থাকে। এর প্রভাব ছিল সরাসরি। এনআরএফের এক কমান্ডার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ অবস্থান ধরে রাখার নির্দেশ পাওয়ার কথা স্বীকার করেও পরে সেখান থেকে সরে যান। আরেকজন জানান, এনআরএফের বাইরের একটি ইয়েমেনি বাহিনী সামরিক বিমানঘাঁটি ছেড়ে গেছে, যদিও সেখানে তখনো ওই বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। ফলে মিত্র বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে কমান্ডারদের কাছে ভুল তথ্য পৌঁছায় এবং বিমান হামলার পর হতাহতের ঘটনা ঘটে। মোখায় অবস্থানরত সৌদি বিশেষ বাহিনীর একটি টাস্কফোর্সই প্রথম বুঝতে পারে যে মাঠপর্যায়ে বাহিনীগুলোর যে অবস্থান জানানো হচ্ছে, বাস্তবে তার সঙ্গে তা মিলছে না। সৌদি বাহিনীর বিমান হামলার প্রস্তুতি থাকলেও মিত্র বাহিনীর অবস্থান নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত করা না গেলে বিমানশক্তি অবাধে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছিল না। এর সঙ্গে আরও সমস্যা তৈরি হয় যখন এনআরএফের কয়েকটি ব্রিগেড সক্রিয় করার সময় দেখতে পায়, নিবন্ধিত সদস্যদের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ দায়িত্বে যোগ দেননি। জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ড কয়েক মাস ধরে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন, বেতন পুনর্বহাল ও বাহিনী পুনর্গঠনের মাধ্যমে এসব সদস্যকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি জাবাল আল-নারকে ঘিরে সমন্বয় ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এনআরএফের বিভিন্ন ইউনিট মূল হুতি বাহিনী পৌঁছানোর আগেই অবস্থান ছেড়ে যেতে শুরু করে। মোখার ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা এই ব্যর্থতাকে এখন সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যৌথ সৌদি-ইয়েমেনি এবং সৌদি-পাকিস্তানি জয়েন্ট টার্মিনাল অ্যাটাক কন্ট্রোলার বা জেটিএসি দলগুলোকে এখন গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাঞ্চলীয় বাহিনীগুলোর সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা বাহিনী এবং জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের হামলা ব্যবস্থার মধ্যে একটি যাচাইকৃত যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। পাশাপাশি সৌদি অপারেশনাল মেন্টরিং অ্যান্ড লিয়াজোঁ টিমগুলো জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং ইয়েমেনি বাহিনীর জনবল, অবস্থান ও প্রস্তুতির স্বাধীন যাচাই করছে। একই সঙ্গে নির্দেশের পরিচয় যাচাই, সীমিত পরিসরে তথ্য আদান-প্রদান এবং বিকল্প এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে মোখায় প্রকাশ পাওয়া দুর্বলতাগুলো বন্ধ করার চেষ্টা চলছে। সৌদি আরব এর আগেও ভিন্ন এক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের সামরিক কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স দক্ষিণ ইয়েমেনে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) অভিযানকে সহায়তা করা আবুধাবির কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শনাক্ত ও দুর্বল করে দিয়েছিল। তখনও মাঠপর্যায়ের অভিযান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত রাখতে যোগাযোগ ও লক্ষ্য নির্ধারণ ব্যবস্থা সক্রিয় ছিল। বাইরের ওই সহায়তা কাঠামো দুর্বল হওয়ার পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের টাস্কফোর্স ও তাদের মিত্র বাহিনীগুলো দ্রুত কার্যকর স্বাধীনতা হারিয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানের চাপে পিছু হটে। হুতিদের কমান্ড কাঠামোতে আঘাত তবে বর্তমানে হুতিদের সহায়তা করা ব্যবস্থা আরও জটিল। রাশিয়া স্যাটেলাইট ও সংকেত গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে এবং ইরান সেই তথ্য হুতিদের কমান্ড ও সামরিক অভিযানের সঙ্গে একীভূত করছে। কিন্তু এই জটিলতাই ব্যবস্থাটিকে কিছু দুর্বলতার ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। নিরাপদ যোগাযোগ, বিশেষজ্ঞ জনবল, গোয়েন্দা তথ্য একীভূত করার কেন্দ্র, কারিগরি পরামর্শক এবং সানা ও যুদ্ধক্ষেত্রের সদর দপ্তরগুলোর মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ; সবই এই ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখন এসব দুর্বলতাকেই লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। ১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সানায় ইরান-নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোতে বড় ধরনের আঘাত হানে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী। হুতিদের নিহত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্তত দুই মেজর জেনারেল, সাত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং ৩২ কর্নেল রয়েছেন। তাদের অনেকের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত সহকারী, স্টাফ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সদস্যরাও নিহত হন। মেজর জেনারেলের চেয়েও উচ্চপদমর্যাদার কিছু কর্মকর্তা হুতিদের সর্বোচ্চ কমান্ড কাঠামোয় নিহত হয়েছেন এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদেশি কর্মকর্তারাও নিহত হয়েছেন। তবে এসব তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আনা হয়নি। তবে নিহতের সংখ্যা নয়, এর প্রভাবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সামনের সারির কমান্ড কাঠামো যখন ধারাবাহিকভাবে দুর্বল করা হচ্ছে, একই সময়ে সানার উচ্চপর্যায়ের কমান্ড কেন্দ্রগুলো সুনির্দিষ্ট বিমান হামলার মুখে পড়ছে। এতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং হামলা পরিচালনা; পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে। সদর দপ্তরগুলো বাধ্য হয়ে স্থান পরিবর্তন করলে, বেঁচে থাকা কমান্ডাররা অধীনস্থ ইউনিটগুলোর সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করলে এবং অবশিষ্ট জুনিয়র ইরানি পরামর্শকরা বিকল্প যোগাযোগপথ তৈরির চেষ্টা করলে নতুন নতুন সংকেত তৈরি হয়। এসব সংকেত শনাক্ত, সমন্বয় ও অবস্থান নির্ধারণ করা সম্ভব । এ কারণেই পশ্চিম উপকূলে হুতিরা যে গতিতে অগ্রসর হয়েছিল, এখন সেই গতি ধরে রাখতে পারছে না বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে। হুতিরা যে কমান্ড যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করে সুবিধা পেয়েছিল, তা এখন শক্ত করা হচ্ছে। অন্যদিকে তাদের নিজস্ব বাহ্যিক সহায়তাপ্রাপ্ত কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে অন্ধ ও উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে পশ্চিম উপকূলের ব্যর্থতা এখন সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর জন্য স্থায়ী দুর্বলতা নয়, বরং সেই অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া একটি শিক্ষা হয়ে উঠেছে। বদলে যাচ্ছে সামরিক সমীকরণ ২০১৫ সাল থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের কমান্ড, যোগাযোগ, গোয়েন্দা ও যুদ্ধ সক্ষমতার সমন্বিত ব্যবস্থা সিক্সসিআইএসআর ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হচ্ছে। একই সঙ্গে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের সক্ষমতা এবং সেন্সর থেকে দ্রুত অস্ত্র ব্যবহারের ব্যবস্থাও উন্নত হয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে চলা হুতি উত্তেজনা সৌদি নীতির ওপর থাকা সংযমও অনেকটা ক্ষয় করেছে। ফলে সৌদি নেতৃত্বাধীন বড় ধরনের যে সামরিক অভিযান এখন গড়ে উঠছে, তা এমন এক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শুরু হতে পারে যার বাহ্যিক কমান্ড সহায়তা ইতোমধ্যে ধারাবাহিক আক্রমণের মুখে রয়েছে। এটাই পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। হুতিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়া রাশিয়া-ইরান সমর্থিত ব্যবস্থা বড় ধরনের সৌদি নেতৃত্বাধীন বিমান, স্থল ও নৌ অভিযান পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই দুর্বল করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মোখায় প্রকাশ পাওয়া কৌশলগত ও কমান্ডগত ব্যর্থতাগুলোও সৌদি নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের ভেতরে সংশোধন করা হচ্ছে। অর্থাৎ হুতিরা একবার একটি দুর্বল কমান্ড ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে সুবিধা নিয়েছিল। এখন তাদের এমন এক পরিস্থিতিতে লড়তে হচ্ছে, যেখানে তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়া বাহ্যিক কমান্ড ও গোয়েন্দা ব্যবস্থাটিকেই পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। সূত্র : আলজাজিরা
গত সপ্তাহে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে তার কাছে অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। চীনে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডিউ রোববার এই তথ্য প্রকাশ করেন। তবে মার্কিন আইনেই চীনের কাছে অস্ত্র বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাষ্ট্রদূত পারডিউয়ের মন্তব্যে জল্পনা তৈরি হতেই বিষয়টি স্পষ্ট করে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। দপ্তরটি জানায়, আইন অনুযায়ী চীনের কাছে অস্ত্র বিক্রির কোনও সুযোগ নেই এবং এমন কোনও প্রস্তাব বা পরিকল্পনাও যুক্তরাষ্ট্রের নেই। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রদূত পারডিউ বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রায়ই বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বের নানা দেশের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে। তিনি মূলত সেই প্রসঙ্গ ধরেই একপর্যায়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, চীনও কিছু অস্ত্র কিনতে চায় কি না। তবে ট্রাম্পের এই প্রশ্নের জবাবে শি কী বলেছিলেন, সে বিষয়ে পারডিউ বিস্তারিত কিছু জানাননি। তাইওয়ানে ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের মার্কিন অস্ত্র বিক্রির প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন ধরে ডনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় আটকে রয়েছে। এ নিয়ে আলোচনা চলার মাঝেই চীনা প্রেসিডেন্টের কাছে অস্ত্র বেচার এই অপ্রত্যাশিত প্রস্তাবের খবর সামনে এল। তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই কণ্টকাকীর্ণ বিষয় হয়ে আছে। চীন তাইওয়ানকে তাদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির বিরোধী। তবে যুক্তরাষ্ট্র আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র সরবরাহ করতে বাধ্য। তবে ডনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি নিয়ে কৌশলগতভাবে একটি অস্পষ্ট অবস্থান ধরে রেখেছেন। গত মে মাসে বেইজিংয়ে প্রেসিডেন্ট শি-র সঙ্গে বৈঠকের পর তাইওয়ানের ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের অস্ত্র চুক্তি আটকে রাখা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেছিলেন, এটি চীনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য একটি “চমৎকার দরকষাকষির হাতিয়ার”। তবে মার্কিন সিনেটের চার রিপাবলিকান সদস্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারকো রুবিও ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে চিঠি দিয়ে দ্রুত তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির চুক্তিটি সম্পন্ন করার তাগিদ দিয়েছেন। তাদের মতে, মিত্রদের আত্মরক্ষার সুযোগ না দিলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও প্রতিরোধ ক্ষমতা ব্যাহত হবে। শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফরের আগেই যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত শিয়ে ফেং কতগুলো স্পর্শকাতর বিষয়কে ‘রেড লাইন’ হিসেবে চিহ্নিত করে দেন, যার শীর্ষে ছিল ‘তাইওয়ান প্রসঙ্গ’। সফর শেষে ট্রাম্প জানান, সম্মেলনে তাইওয়ান নিয়ে তাদের খুব একটা কথা হয়নি। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, তার ক্ষমতায় থাকাকালীন চীন তাইওয়ানে আক্রমণ চালাবে না বলে শি তাকে আশ্বাস দিয়েছেন। অবশ্য চীনের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে জানানো হয়, তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করতে ওয়াশিংটনকে জোর তাগিদ দিয়েছেন শি জিনপিং। ওদিকে, চীনের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি নিষিদ্ধ থাকলেও তাদের হাতে আছে মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের স্পর্শকাতর যন্ত্রাংশ। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া থেকে ওয়াশিংটনগামী এক চালানের পথ পরিবর্তন হয়ে হংকংয়ে চলে যাওয়ার পর সেটি চীনের হাতে যায়। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সদরদপ্তর পেন্টাগন নিশ্চিত করে জানিয়েছে যে, চালানটির বিষয়ে তারা অবগত এবং যন্ত্রাংশগুলো উদ্ধারে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরই আরও দুবার বৈঠকে বসছেন ট্রাম্প ও শি জিনপিং, নভেম্বরে চীনের শেনঝেনে অ্যাপেক সম্মেলনে এবং ডিসেম্বরে মিয়ামিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে।