বিশ্বের প্রায় সব দেশেই নারীদের গড় আয়ু পুরুষদের তুলনায় বেশি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী নারীরা সাধারণত পুরুষদের চেয়ে প্রায় ৪ থেকে ৫ বছর বেশি বাঁচেন। কিন্তু কেন এই পার্থক্য? পুরুষদের শরীর কি তুলনামূলক দুর্বল, নাকি জীবনযাপনের ধরন ও সামাজিক আচরণ তাদের আয়ু কমিয়ে দেয়?
গবেষকদের মতে, এর পেছনে কোনো একক কারণ দায়ী নয়। বরং জিনগত বৈশিষ্ট্য, হরমোনের প্রভাব, ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন, পেশাগত পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের অভ্যাস— সবকিছু মিলেই নারী-পুরুষের গড় আয়ুর ব্যবধান তৈরি করে। বিষয়গুলোকে মূলত তিনটি ভাগে ব্যাখ্যা করা যায়—
১. জৈবিক ও জিনগত কারণ: প্রকৃতিগত কিছু সুবিধা
নারী ও পুরুষের শারীরিক গঠন, ক্রোমোজোম এবং হরমোনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এসব পার্থক্য রোগ প্রতিরোধ, হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য এবং বার্ধক্যজনিত পরিবর্তনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এক্স ক্রোমোজোমের ভূমিকা
নারীদের সাধারণত দুটি এক্স ক্রোমোজোম (XX) থাকে। অন্যদিকে, পুরুষদের সাধারণত একটি এক্স ও একটি ওয়াই ক্রোমোজোম (XY) থাকে।
এক্স ক্রোমোজোমে থাকা কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনের একাধিক অনুলিপি নারীদের নির্দিষ্ট কিছু জিনগত সমস্যার বিরুদ্ধে বাড়তি সুরক্ষা দিতে পারে। নারীদের একটি এক্স ক্রোমোজোমে কোনো জিনগত ত্রুটি থাকলে অন্যটির সংশ্লিষ্ট জিন কিছু ক্ষেত্রে সেই ঘাটতির প্রভাব কমাতে পারে। পুরুষদের একটি মাত্র এক্স ক্রোমোজোম থাকায় এক্স-লিঙ্কড কিছু বংশগত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে নারীরা সব ধরনের রোগের বিরুদ্ধে বেশি সুরক্ষিত। রোগভেদে নারী-পুরুষের ঝুঁকি আলাদা হতে পারে।
হরমোনের প্রভাব: ইস্ট্রোজেন ও টেস্টোস্টেরন
নারীদের প্রধান যৌন হরমোনগুলোর একটি হলো ইস্ট্রোজেন (Estrogen)। এটি প্রজননস্বাস্থ্যের পাশাপাশি হাড়, রক্তনালি ও শরীরের বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। প্রজননক্ষম বয়সে ইস্ট্রোজেনের কিছু প্রভাব নারীদের হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে।
অন্যদিকে, পুরুষদের প্রধান যৌন হরমোন টেস্টোস্টেরন (Testosterone), যা পেশি, হাড়, যৌনস্বাস্থ্য এবং বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। হরমোনের প্রভাব নারী-পুরুষের শরীরে কিছু পার্থক্য তৈরি করলেও টেস্টোস্টেরন সরাসরি আগ্রাসী আচরণ বা হৃদরোগের কারণ—এমন সরল সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
নারীদের মেনোপজ বা ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার পর ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যায়। এর ফলে হৃদ্রোগসহ কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে নারী-পুরুষের আয়ুর পার্থক্য শুধু হরমোন দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
২. জীবনযাপন ও আচরণগত কারণ: ঝুঁকি বেশি, বিপদও বেশি
জৈবিক পার্থক্যের পাশাপাশি দৈনন্দিন অভ্যাস এবং সামাজিক পরিবেশও পুরুষদের গড় আয়ু কম হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা
অনেক সমাজে পুরুষদের সাহসী, শক্তিশালী ও ঝুঁকি নিতে সক্ষম হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার চাপ থাকে। এর ফলে কিছু পুরুষ বিপজ্জনক আচরণে জড়িয়ে পড়তে পারেন।
সড়ক দুর্ঘটনা, দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো, মারামারি, সহিংসতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডে পুরুষদের মৃত্যুঝুঁকি অনেক ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। এর পেছনে জৈবিক বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি সামাজিক প্রত্যাশা ও ব্যক্তিগত আচরণও ভূমিকা রাখে।
এসব কারণে অনেক পুরুষ কর্মজীবনের শুরুতেই দুর্ঘটনা বা সহিংসতার শিকার হন, যা সামগ্রিকভাবে পুরুষদের গড় আয়ু কমিয়ে দিতে পারে।
পেশাগত ঝুঁকি
বিশ্বের অনেক দেশে খনি, নির্মাণকাজ, ভারী শিল্পকারখানা, যুদ্ধক্ষেত্র ও অগ্নিনির্বাপণের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় পুরুষদের অংশগ্রহণ বেশি।
এসব কাজে ভারী যন্ত্রপাতি, বিষাক্ত পদার্থ, অতিরিক্ত তাপ, ধুলাবালি, উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়া এবং প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার ঘাটতি থাকলে এসব ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করার কারণে কিছু পেশায় শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ক্যানসার কিংবা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যাও দেখা দিতে পারে। ফলে পেশাগত ঝুঁকি পুরুষদের অকালমৃত্যুর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে উঠতে পারে।
অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস
অনেক দেশে নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান এবং কিছু অন্যান্য ক্ষতিকর অভ্যাসের প্রবণতা বেশি। তবে দেশ, বয়স ও সামাজিক পরিবেশভেদে এই চিত্রে পার্থক্য রয়েছে।
ধূমপান ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। অতিরিক্ত মদ্যপান লিভারের ক্ষতি, লিভার সিরোসিস, কিছু ধরনের ক্যানসার এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অন্যান্য মাদক গ্রহণও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে এবং অকালমৃত্যুর আশঙ্কা বাড়ায়।
দীর্ঘদিন এসব অভ্যাস বজায় থাকলে তা ব্যক্তির সুস্থ জীবনযাপনের সময় কমিয়ে দিতে পারে। তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং তামাক ও ক্ষতিকর মাদক থেকে দূরে থাকা দীর্ঘায়ুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
৩. স্বাস্থ্যসচেতনতা ও মানসিক চাপ: নীরবে বাড়ে বিপদ
শরীরের যত্ন নেওয়া, অসুস্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণ করা এবং মানসিক সমস্যার কথা প্রকাশ করার অভ্যাসও দীর্ঘায়ুর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রেও অনেক সমাজে নারী-পুরুষের আচরণগত পার্থক্য দেখা যায়।
চিকিৎসকের কাছে যেতে অনীহা
কিছু পুরুষ অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলেও তা সহজে স্বীকার করতে চান না। কেউ কাজের ব্যস্ততায় চিকিৎসা পিছিয়ে দেন, আবার কেউ মনে করেন সামান্য সমস্যা নিজে থেকেই সেরে যাবে।
ফলে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ কিংবা ক্যানসারের মতো রোগ সময়মতো শনাক্ত না হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু না করলে অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়ে এবং চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ে।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
মানসিক চাপ চেপে রাখা
অনেক সমাজে পুরুষদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়, কাঁদা বা দুর্বলতা প্রকাশ করা উচিত নয়। নিজের কষ্ট গোপন রাখা কিংবা সব পরিস্থিতিতে শক্ত থাকার এই সামাজিক প্রত্যাশা কিছু পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতা শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া অনেক দেশে পুরুষদের আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুহার নারীদের তুলনায় বেশি দেখা যায়।
তবে মানসিক চাপ সরাসরি হার্ট অ্যাটাক বা আত্মহত্যার একমাত্র কারণ নয়। ব্যক্তির পরিস্থিতি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ, সামাজিক সহায়তা এবং অন্যান্য ঝুঁকিও গুরুত্বপূর্ণ।
মানসিক কষ্ট হলে বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলা, প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া এবং নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে শেখা অত্যন্ত জরুরি।
তাহলে কি পুরুষদের আয়ু কম হওয়া অনিবার্য?
না। নারীদের তুলনায় পুরুষদের গড় আয়ু কম হলেও এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক পুরুষ নারীদের আগে মারা যাবেন। গড় আয়ু হলো একটি জনসংখ্যাভিত্তিক পরিসংখ্যান; ব্যক্তির আয়ু নির্ভর করে তার স্বাস্থ্য, জীবনযাপন, পরিবেশ, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং চিকিৎসাসেবার সুযোগসহ নানা বিষয়ের ওপর।
পুরুষদের অকালমৃত্যুর অনেক ঝুঁকিই কমানো সম্ভব। ধূমপান ও ক্ষতিকর মাদক পরিহার, নিরাপদে গাড়ি চালানো, কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা নিশ্চিত করা, নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার মতো পদক্ষেপ দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনযাপনে সহায়তা করতে পারে।
একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় সাহায্য চাওয়াও জরুরি। নিজের সমস্যার কথা বলা দুর্বলতা নয়; বরং নিজের সুস্থতার দায়িত্ব নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পুরুষদের তুলনায় নারীদের গড় আয়ু বেশি হওয়ার পেছনে জৈবিক ও জিনগত বৈশিষ্ট্য, হরমোনের প্রভাব, জীবনযাপনের ধরন, পেশাগত ঝুঁকি এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের অভ্যাস— সবকিছুরই ভূমিকা রয়েছে। কোনো একটি কারণ দিয়ে এই ব্যবধানের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না।
প্রকৃতিগত কিছু সুবিধা নারীদের দীর্ঘায়ুতে সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ, অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস, চিকিৎসা নিতে দেরি করা এবং মানসিক কষ্ট চেপে রাখার প্রবণতা কিছু পুরুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সহজ কথায়, দীর্ঘায়ু শুধু প্রকৃতির দেওয়া উপহারের ওপর নির্ভর করে না; নিজের শরীর ও মনের যত্ন নেওয়ার অভ্যাসও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নারী-পুরুষ সবার জন্যই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের অন্যতম চাবিকাঠি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
বিশ্বের প্রায় সব দেশেই নারীদের গড় আয়ু পুরুষদের তুলনায় বেশি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী নারীরা সাধারণত পুরুষদের চেয়ে প্রায় ৪ থেকে ৫ বছর বেশি বাঁচেন। কিন্তু কেন এই পার্থক্য? পুরুষদের শরীর কি তুলনামূলক দুর্বল, নাকি জীবনযাপনের ধরন ও সামাজিক আচরণ তাদের আয়ু কমিয়ে দেয়? গবেষকদের মতে, এর পেছনে কোনো একক কারণ দায়ী নয়। বরং জিনগত বৈশিষ্ট্য, হরমোনের প্রভাব, ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন, পেশাগত পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের অভ্যাস— সবকিছু মিলেই নারী-পুরুষের গড় আয়ুর ব্যবধান তৈরি করে। বিষয়গুলোকে মূলত তিনটি ভাগে ব্যাখ্যা করা যায়— ১. জৈবিক ও জিনগত কারণ: প্রকৃতিগত কিছু সুবিধা নারী ও পুরুষের শারীরিক গঠন, ক্রোমোজোম এবং হরমোনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এসব পার্থক্য রোগ প্রতিরোধ, হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য এবং বার্ধক্যজনিত পরিবর্তনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এক্স ক্রোমোজোমের ভূমিকা নারীদের সাধারণত দুটি এক্স ক্রোমোজোম (XX) থাকে। অন্যদিকে, পুরুষদের সাধারণত একটি এক্স ও একটি ওয়াই ক্রোমোজোম (XY) থাকে। এক্স ক্রোমোজোমে থাকা কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনের একাধিক অনুলিপি নারীদের নির্দিষ্ট কিছু জিনগত সমস্যার বিরুদ্ধে বাড়তি সুরক্ষা দিতে পারে। নারীদের একটি এক্স ক্রোমোজোমে কোনো জিনগত ত্রুটি থাকলে অন্যটির সংশ্লিষ্ট জিন কিছু ক্ষেত্রে সেই ঘাটতির প্রভাব কমাতে পারে। পুরুষদের একটি মাত্র এক্স ক্রোমোজোম থাকায় এক্স-লিঙ্কড কিছু বংশগত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে নারীরা সব ধরনের রোগের বিরুদ্ধে বেশি সুরক্ষিত। রোগভেদে নারী-পুরুষের ঝুঁকি আলাদা হতে পারে। হরমোনের প্রভাব: ইস্ট্রোজেন ও টেস্টোস্টেরন নারীদের প্রধান যৌন হরমোনগুলোর একটি হলো ইস্ট্রোজেন (Estrogen)। এটি প্রজননস্বাস্থ্যের পাশাপাশি হাড়, রক্তনালি ও শরীরের বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। প্রজননক্ষম বয়সে ইস্ট্রোজেনের কিছু প্রভাব নারীদের হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে, পুরুষদের প্রধান যৌন হরমোন টেস্টোস্টেরন (Testosterone), যা পেশি, হাড়, যৌনস্বাস্থ্য এবং বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। হরমোনের প্রভাব নারী-পুরুষের শরীরে কিছু পার্থক্য তৈরি করলেও টেস্টোস্টেরন সরাসরি আগ্রাসী আচরণ বা হৃদরোগের কারণ—এমন সরল সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। নারীদের মেনোপজ বা ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার পর ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যায়। এর ফলে হৃদ্রোগসহ কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে নারী-পুরুষের আয়ুর পার্থক্য শুধু হরমোন দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। ২. জীবনযাপন ও আচরণগত কারণ: ঝুঁকি বেশি, বিপদও বেশি জৈবিক পার্থক্যের পাশাপাশি দৈনন্দিন অভ্যাস এবং সামাজিক পরিবেশও পুরুষদের গড় আয়ু কম হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা অনেক সমাজে পুরুষদের সাহসী, শক্তিশালী ও ঝুঁকি নিতে সক্ষম হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার চাপ থাকে। এর ফলে কিছু পুরুষ বিপজ্জনক আচরণে জড়িয়ে পড়তে পারেন। সড়ক দুর্ঘটনা, দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো, মারামারি, সহিংসতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডে পুরুষদের মৃত্যুঝুঁকি অনেক ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। এর পেছনে জৈবিক বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি সামাজিক প্রত্যাশা ও ব্যক্তিগত আচরণও ভূমিকা রাখে। এসব কারণে অনেক পুরুষ কর্মজীবনের শুরুতেই দুর্ঘটনা বা সহিংসতার শিকার হন, যা সামগ্রিকভাবে পুরুষদের গড় আয়ু কমিয়ে দিতে পারে। পেশাগত ঝুঁকি বিশ্বের অনেক দেশে খনি, নির্মাণকাজ, ভারী শিল্পকারখানা, যুদ্ধক্ষেত্র ও অগ্নিনির্বাপণের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় পুরুষদের অংশগ্রহণ বেশি। এসব কাজে ভারী যন্ত্রপাতি, বিষাক্ত পদার্থ, অতিরিক্ত তাপ, ধুলাবালি, উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়া এবং প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার ঘাটতি থাকলে এসব ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। এ ছাড়া দীর্ঘদিন বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করার কারণে কিছু পেশায় শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ক্যানসার কিংবা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যাও দেখা দিতে পারে। ফলে পেশাগত ঝুঁকি পুরুষদের অকালমৃত্যুর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে উঠতে পারে। অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস অনেক দেশে নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান এবং কিছু অন্যান্য ক্ষতিকর অভ্যাসের প্রবণতা বেশি। তবে দেশ, বয়স ও সামাজিক পরিবেশভেদে এই চিত্রে পার্থক্য রয়েছে। ধূমপান ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। অতিরিক্ত মদ্যপান লিভারের ক্ষতি, লিভার সিরোসিস, কিছু ধরনের ক্যানসার এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অন্যান্য মাদক গ্রহণও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে এবং অকালমৃত্যুর আশঙ্কা বাড়ায়। দীর্ঘদিন এসব অভ্যাস বজায় থাকলে তা ব্যক্তির সুস্থ জীবনযাপনের সময় কমিয়ে দিতে পারে। তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং তামাক ও ক্ষতিকর মাদক থেকে দূরে থাকা দীর্ঘায়ুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ৩. স্বাস্থ্যসচেতনতা ও মানসিক চাপ: নীরবে বাড়ে বিপদ শরীরের যত্ন নেওয়া, অসুস্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণ করা এবং মানসিক সমস্যার কথা প্রকাশ করার অভ্যাসও দীর্ঘায়ুর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রেও অনেক সমাজে নারী-পুরুষের আচরণগত পার্থক্য দেখা যায়। চিকিৎসকের কাছে যেতে অনীহা কিছু পুরুষ অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলেও তা সহজে স্বীকার করতে চান না। কেউ কাজের ব্যস্ততায় চিকিৎসা পিছিয়ে দেন, আবার কেউ মনে করেন সামান্য সমস্যা নিজে থেকেই সেরে যাবে। ফলে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ কিংবা ক্যানসারের মতো রোগ সময়মতো শনাক্ত না হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু না করলে অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়ে এবং চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। মানসিক চাপ চেপে রাখা অনেক সমাজে পুরুষদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়, কাঁদা বা দুর্বলতা প্রকাশ করা উচিত নয়। নিজের কষ্ট গোপন রাখা কিংবা সব পরিস্থিতিতে শক্ত থাকার এই সামাজিক প্রত্যাশা কিছু পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতা শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া অনেক দেশে পুরুষদের আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুহার নারীদের তুলনায় বেশি দেখা যায়। তবে মানসিক চাপ সরাসরি হার্ট অ্যাটাক বা আত্মহত্যার একমাত্র কারণ নয়। ব্যক্তির পরিস্থিতি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ, সামাজিক সহায়তা এবং অন্যান্য ঝুঁকিও গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক কষ্ট হলে বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলা, প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া এবং নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে শেখা অত্যন্ত জরুরি। তাহলে কি পুরুষদের আয়ু কম হওয়া অনিবার্য? না। নারীদের তুলনায় পুরুষদের গড় আয়ু কম হলেও এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক পুরুষ নারীদের আগে মারা যাবেন। গড় আয়ু হলো একটি জনসংখ্যাভিত্তিক পরিসংখ্যান; ব্যক্তির আয়ু নির্ভর করে তার স্বাস্থ্য, জীবনযাপন, পরিবেশ, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং চিকিৎসাসেবার সুযোগসহ নানা বিষয়ের ওপর। পুরুষদের অকালমৃত্যুর অনেক ঝুঁকিই কমানো সম্ভব। ধূমপান ও ক্ষতিকর মাদক পরিহার, নিরাপদে গাড়ি চালানো, কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা নিশ্চিত করা, নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার মতো পদক্ষেপ দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনযাপনে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় সাহায্য চাওয়াও জরুরি। নিজের সমস্যার কথা বলা দুর্বলতা নয়; বরং নিজের সুস্থতার দায়িত্ব নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পুরুষদের তুলনায় নারীদের গড় আয়ু বেশি হওয়ার পেছনে জৈবিক ও জিনগত বৈশিষ্ট্য, হরমোনের প্রভাব, জীবনযাপনের ধরন, পেশাগত ঝুঁকি এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের অভ্যাস— সবকিছুরই ভূমিকা রয়েছে। কোনো একটি কারণ দিয়ে এই ব্যবধানের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। প্রকৃতিগত কিছু সুবিধা নারীদের দীর্ঘায়ুতে সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ, অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস, চিকিৎসা নিতে দেরি করা এবং মানসিক কষ্ট চেপে রাখার প্রবণতা কিছু পুরুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। সহজ কথায়, দীর্ঘায়ু শুধু প্রকৃতির দেওয়া উপহারের ওপর নির্ভর করে না; নিজের শরীর ও মনের যত্ন নেওয়ার অভ্যাসও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নারী-পুরুষ সবার জন্যই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের অন্যতম চাবিকাঠি।
শহুরে জীবনে গ্রিন লাইফস্টাইল: চাইলেই কি সম্ভব? শহর মানেই ব্যস্ততা, কংক্রিটের জঙ্গল, দূষিত বাতাস, এবং অনিয়ন্ত্রিত শব্দ। এই যান্ত্রিক পরিবেশে বসবাস করা মানুষ প্রতিদিন একটু সবুজ, একটু প্রশান্তি খোঁজে। তাই ‘গ্রিন লাইফস্টাইল’ বা পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের ধারণা শহরের মানুষদের মাঝেও ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই শহুরে বাস্তবতায় আমরা কি সত্যিই গ্রিন লাইফস্টাইল মেনে চলতে পারি? গ্রিন লাইফস্টাইল মানে শুধু গাছ লাগানো নয়। এটি একটি সামগ্রিক জীবনধারা, যেখানে প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে সহাবস্থানের চেষ্টা থাকে। যেমন—প্লাস্টিক ব্যবহার না করা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিনিস ব্যবহার করা, গাছ লাগানো, অর্গানিক খাবার খাওয়া, কম দূষণ হয় এমন বাহনে চলাচল করা, বিদ্যুৎ ও পানি সাশ্রয় করা, এমনকি নিজস্ব ছাদে সবজি চাষ করাও এর অংশ হতে পারে। কিন্তু শহরে এই সবকিছু কি সহজে করা যায়? উত্তরটা একদম সরল নয়। শহরের বাসিন্দাদের জন্য অনেক সময় জায়গার অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফ্ল্যাটে থাকলে ছাদে বাগান করা যায় না, রান্নার সময় প্লাস্টিক প্যাকেট এড়ানোও কঠিন হয়ে পড়ে কারণ বাজারে সহজলভ্য জিনিসপত্রের বেশিরভাগই প্লাস্টিক মোড়ানো। তাছাড়া, ব্যস্ত জীবনযাপনের কারণে সময় বের করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তবে আশার কথা হলো, ইচ্ছা থাকলে উপায় বের করা যায়। শহুরে জীবনে কিছু ছোট ছোট অভ্যাস বদলেই শুরু করা যায় সবুজ যাত্রা। যেমন ধরুন, কেউ যদি বাজারের ব্যাগ হিসেবে কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার করেন, বা পানির বোতল বারবার রিফিল করেন, তবুও তিনি পরিবেশ রক্ষায় অবদান রাখছেন। অফিসে যাওয়ার সময় যদি বাস বা সাইকেল ব্যবহার করা যায়, তাহলেও কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমে। অনেক শহরেই এখন কমিউনিটি গার্ডেন, ছাদ কৃষি, সোলার প্যানেল স্থাপন, কিংবা জিরো ওয়েস্ট মুভমেন্ট জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। মানুষ নিজেরাই উদ্যোগ নিচ্ছে। ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরেও অনেকে নিজেদের ব্যালকনিতে টব বসিয়ে ছোট পরিসরে সবজি ফলাচ্ছেন, কেউ আবার সোলার লাইট ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করছেন। তবে এই চর্চা টেকসই করতে হলে প্রয়োজন নীতিনির্ধারকদের সহায়তা। শহরের পরিকল্পনায় আরও বেশি সবুজ এলাকা, হাঁটার রাস্তা, বাইসাইকেল লেন, এবং রিসাইক্লিং ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তি জরুরি। সরকার যদি পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে ভর্তুকি দেয় বা সচেতনতা বাড়ায়, তাহলে মানুষ আরও সহজে গ্রিন লাইফস্টাইল গ্রহণ করতে পারবে। শহুরে জীবন যতই ব্যস্ত হোক না কেন, যদি সচেতনতা থাকে এবং ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে ‘গ্রিন লাইফস্টাইল’ একেবারেই অসম্ভব নয়। বরং, এটি হতে পারে একটি শান্ত, স্বাস্থ্যকর এবং টেকসই জীবনের সূচনা। আমাদের সবারই উচিত নিজ নিজ জায়গা থেকে যতটুকু সম্ভব, পরিবেশবান্ধব পন্থায় জীবনযাপন করার চেষ্টা করা। কারণ প্রকৃতি বাঁচলেই আমরা বাঁচব—এই সত্যটা আজ আরও বাস্তব হয়ে উঠেছে।