দেশে হাম আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ৬০ শিশুর যে তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া গেছে, সেখানে নয় মাসের কম বয়সি রয়েছে ২৯ জন।
বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি-ইপিআই যে সময়সূচি ধরে শিশুদের টিকা দেয়, সে অনুযায়ী নয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগে এই শিশুদের হাম-রুবেলা বা এমআর টিকা পাওয়ার কথা নয়।
তাহলে নয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগে শিশুরা হাম থেকে কীভাবে সুরক্ষিত থাকে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শিশুদের ছয় মাস পর্যন্ত সুরক্ষা দেওয়ার কথা।
তাহলে কেন চলতি বছর নয় মাসের কম বয়সি এত শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে? এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা আলোচনা চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা পাওয়ার আগে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম একটি কারণ তাদের শরীরে হামের অ্যান্টিবডি তৈরি না হওয়া। এর পেছনে অপুষ্টিসহ আরো কারণ থাকতে পারে, তা নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।
সরকারি হিসাবে সারাদেশে ১৫ মার্চ থেকে বুধবার পর্যন্ত ৪৮১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাম আক্রান্ত হয়ে এবং এ রোগের উপসর্গ নিয়ে। এর মধ্যে হাম আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৮০ শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য কী বলছে?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৬০ শিশু মৃত্যুর বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ছেলে ৩১ ও মেয়ে ২৯টি; ঢাকায় মারা গেছে ৪৮টি শিশু, বাকি ১২টি শিশু ঢাকার বাইরে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিন মাস বয়সি চারজন, চারমাস বয়সি পাঁচজন, পাঁচ মাস বয়সি দুইজন, ছয়মাস বয়সি চারজন, সাত মাসের সাতজন, আট মাসের সাতজন রয়েছে মৃতদের এ তালিকায়।
নয় মাস বয়সী তিনজন, ১০ মাস বয়সী আটজন এবং ১১ মাস বয়সী চারজন শিশু মারা গেছে।
১২ মাস বয়সী দুইজন, ১৩ মাস বয়সী দুইজন, ১৫ মাস বয়সী দুইজন এবং ১৬ মাস বয়সী একজন শিশু মারা গেছে।
দুই বছর বা ২৪ মাস বয়সী একজন, ২৭ মাস বয়সী দুইজন, ৩০ মাস বয়সী একজন, তিন বছর বা ৩৬ মাস বয়সী দুইজন, ৪২ মাস বয়সী একজন, ৫১ মাস বয়সী একজন এবং নয় বছর বা ১০৮ মাস বয়সী একজন শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এই বিশ্লেষণ বলছে, নয় মাস থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশু মারা গেছে ২১ জন। আর নয় মাসের কম বয়সী ২৯ শিশু মারা গেছে।
ইপিআইয়ের টিকাদানের সময়সূচি অনুযায়ী ছয় মাস থেকে আট মাস বয়সী ১৮ শিশু হামের টিকার প্রথম ডোজ পাওয়ার কথা। আর নয় থেকে ১৫ মাস বয়সী ২১ শিশুই দুই ডোজ টিকাই পাওয়ার কথা।
তাহলে কী এই শিশুরা টিকার কোনো ডোজ পায়নি অথবা পূর্ণ ডোজ টিকা পায়নি?
বিগত সরকারগুলোর সময়ে কয়েক বছর ধরে টিকাদান কার্যক্রমে ছেদ পড়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ২০২০ সালে কভিড মহামারী ও ২০২৪ সালে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কথা আলোচনায় আসছে।
টিকা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, টিকার কার্যকারিতা নির্ভর করে মূলত বয়স এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর। হামের টিকা ছয় থেকে নয় মাস বয়সীদের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ কাজ করে। নয় থেকে ১২ মাস বয়সীদের ক্ষেত্রে ৮৫ শতাংশ কাজ করে। আর ১২ থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশুদের ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত কাজ করে।
তবে দুই ডোজ নেওয়ার পরও কারো হাম হতে পারে। সেটি নির্ভর করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর,” বলেন এই বিশেষজ্ঞ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মৃত্যুর যে তথ্য দিয়েছে, সেখানে তারিখ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভর্তির দিনই পাঁচটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ভর্তির এক দিনের মধ্যে মারা গেছে নয় শিশু। ভর্তির দুই দিনের মধ্যে মারা গেছে নয় শিশু। দেখা যাচ্ছে, ভর্তির পর প্রথম ৪৮ ঘণ্টায় ২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
তবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কত দিন পর শিশুরা মারা যাচ্ছে, তা সব শিশুর মৃত্যুর ক্ষেত্রে বলেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
মৃত শিশুদের তালিকায়, বরিশালে শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে মারা যাওয়া পাঁচজনের মৃত্যু তারিখ রয়েছে। তবে তারা কবে ওই হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছিল, সেই তারিখ নেই।
এ ছাড়া শিশুদের টিকার তথ্য, হাসপাতালের আইসিইউ তথ্য বা অন্য কোনো জটিলতা ছিল কিনা, এ ধরনের তথ্যও নেই সেখানে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রোগীদের মৃত্যু যাচাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটির জন্য রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি, শারীরিক অবস্থাসহ অনেক বিষয়ে তথ্য সংরক্ষণে রাখতে হয়। কারণ এর আলোকে জটিল রোগীদের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “মৃত্যু পর্যালোচনা করা খুব সহজ বিষয় নয়। তবে আমরা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করে রাখছি। এ বিষয়ে আমাদের পরামর্শক সংস্থা নাইট্যাগ বা অন্যরা কোনো কিছু জানায়নি।
তাই এ বিষয়ে অধিদপ্তর বিশেষভাবে কোনো কাজ করছে না। তবে আইসিডিডিআর,বি হাম নিয়ে কাজ করছে।
এবার কেন হামে এত শিশুর মৃত্যু হল, মিউটেশনের মাধ্যমে ভাইরাসের কোনো নতুন ধরন তৈরি হল কিনা, সেসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ-আইসিডিডিআর,বি বিস্তারিত কাজ করছে।
আলোচনায় ‘অ্যান্টিবডি’
অ্যান্টিবডি হলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মূল উপাদান। গর্ভাবস্থায় মায়ের কাছে থেকে অ্যান্টিবডি পায় শিশুরা। আর জন্মের পর পর তাদের শরীরে নিজস্ব অ্যান্টিবডি তৈরি হতে থাকে।
রাজধানীর মহাখালী ডিএনসিসি হাম ডেডিকেটেড হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার আসিফ হায়দার বলেন, মায়ের শরীর থেকে মূলত বাচ্চারা অ্যান্টিবডি পায়। কিন্তু বর্তমানে অনেক মায়েরাই অপুষ্টিতে ভুগছেন, আবার নানা কারণে শিশুরাও অপুষ্ট হচ্ছে। এতে করে হামের প্রকোপ বাড়ছে। তাই মা ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা সবার আগে জরুরি।
ডা. আসিফ বলেন, আগে আমরা এক ধরনের শক্তিশালী, ৯৫ শতাংশ মানুষের ‘হার্ড ইমিউনিটির’ বলয়ে ছিলাম। সেটি ভেঙে যাওয়ার ফলে এবার বড় প্রকোপ দেখা দিয়েছে।
ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি ফর মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা এলিমিনেশন-এনভিসি চেয়ারপারসন অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, “মায়ের শরীরে যদি হামের অ্যান্টিবডি না থাকে বা টিকা নেওয়া না থাকে তাহলে শিশুরা অ্যান্টিবডি পাবে না। এ ছাড়া আরো কিছু কারণে অ্যান্টিবডি তৈরি নাও হতে পারে। এসব বিষয়ে নিয়ে আমাদের দেশের সেভাবে ‘স্টাডি’ নেই।
তাই এসব বিষয়ে জানা-শোনা এবং গবেষণা হওয়া প্রয়োজন তারপর বোঝা যাবে আসলে কোন ‘ফ্যাক্টরের’ জন্য হামের এই পরিস্থিতি।
হাম ভাইরাসের কোনো মিউটেশন হয়েছে কিনা জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এখন পর্যন্ত হামের কোনো মিউটেশনের খবর পাওয়া যায়নি।
তিনি বলছেন, শিশুরা মায়ের কাছ থেকে সঠিক ‘অ্যান্টিবডি’ পাচ্ছে কি না সেটা দেখা প্রয়োজন।
ডা. বেনজিরের মতে, বর্তমানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দেওয়া মায়ের যে শাল দুধ বাচ্চাকে খাওয়াতে হয়, এটি আর সম্ভব হয় না। এমন কিছু কারণে বাচ্চাদের ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হচ্ছে।
টিকা ও পুষ্টি ঘাটতি
ইপিআইয়ের মাধ্যমে দেশের নয় মাস বয়সী শিশুদের হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাকে কার্যকর করতে হলে ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা দরকার।
কিন্তু করোনার কারণে ২০২০ সালে টিকাদান কর্মসূচি সেভাবে হয়নি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে আরেকবার এ কর্মসূচি হয়নি।
সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেছে, গেল বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও হামের টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ ছিল। হয়নি ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচি।
গেল ১১ মে ইউনিসেফ ও প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক রিয়াদ মাহমুদ তার উপস্থাপনায় বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হল, আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশ কোনো টিকাই পায়নি, আর ২১ শতাংশ আংশিক টিকাপ্রাপ্ত।
এভাবে টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুর সংখ্যা কয়েক বছর ধরে বেড়েছে। যার ফলে এবারের হামে এত মৃত্যু হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ২০২৫ সালে একাধিকবার বার ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও সেটি হয়নি। তাই শিশুদের পুষ্টির ঘাটতিও হয়েছে।

টিকাদানের সময়সূচি
ইপিআই অনুযায়ী, রোগ প্রতিরোধের জন্য জন্মের পর থেকে ১৫ মাস বয়সের মধ্যে শিশুকে মোট ১০টি টিকা দেওয়া হয়। এসব টিকা হল-
• জন্মের পরপরই যক্ষ্মা প্রতিরোধে বিসিজি টিকা দেওয়া হয়।
• ৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহ বয়সে পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা (ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টঙ্কার, হুপিং কাশি, হেপাটাইটিস বি, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জি) এবং ওপিভি (পোলিও) ও পিসিভি (নিউমোনিয়া) টিাকা দেওয়া হয়।
• ৬ ও ১৪ সপ্তাহ বয়সে ‘ইনজেকটেবল’ পোলিও (এফআইপিভি) দেওয়া হয়।
• ৯ ও ১৫ মাস বয়সে হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে দুই ডোজ এমআর টিকা দেওয়া হয়।
• টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধের জন্য ১৫ মাস বয়সে এক ডোজ টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (টিসিভি) দেওয়া হয়।
এছাড়া জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে কিশোরীদের হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) টিকা দেওয়া হয়। মূলত পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণির ছাত্রী বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা ১০–১৪ বছর বয়সীদের দেওয়া হয় এ টিকা।
আর প্রজননযোগ্য বয়সী নারীদের (১৫–৪৯ বছর) ধনুষ্টঙ্কার বা টিটেনাস থেকে সুরক্ষার জন্য ৫ ডোজ টিকা দেওয়া হয়। এটি মা ও ভবিষ্যৎ সন্তানের দু’জনকেই প্রাণঘাতী ধনুষ্টঙ্কার থেকে রক্ষা করে।
ইপিআইয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসারে নাইট্যাগ শিশুদের টিকাদানের বয়স নির্ধারণ করে দেয়।
হামের টিকা ছয় মাস বয়সে
দেশে শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয় নয় মাস ও ১৫ মাস বয়সে। এবার প্রাদুর্ভাব বিবেচনায় বাংলাদেশের টিকাবিষয়ক সর্বোচ্চ কারিগরি কমিটি ন্যাশনাল ইমুনাইজেশন অ্যান্ড টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি গ্রুপ (নাইট্যাগ) ছয় মাস বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
গেল ২০ এপ্রিল শুরু হয়ে বুধবার শেষ হওয়া মাসব্যাপী টিকাদান কর্মসূচিতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় আনা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে নয় মাসের আগেই শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এবার পরিস্থিতি বিবেচনায় নয় মাসের পরিবর্তে ছয় মাস বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনভিসি চেয়ারপারসন অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, গত কয়েক বছর ধরে আমরা দেখেছি দেশের শিশুরা টিকা নেওয়ার বয়সের আগে হামে আক্রান্ত হচ্ছে। পরে এটি নিয়ে ‘স্টাডি’ হয়েছে, সেটির ভিত্তিতে ইউনিসেফ, গ্যাভি ও আমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে ক্যাম্পেইনের জন্য বয়স ছয় মাস নির্ধারণ করা হয়েছে।
এখনো নিয়মিত টিকার ক্ষেত্রে বয়স নয় মাসই রাখা হয়েছে। এ ছাড়া নয় মাস বয়সী শিশুদের শরীরেও সেভাবে অ্যান্টিবডি পাওয়া যাচ্ছে না। তাই টিকা দেওয়ার সময় কমিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে।
টিকা দেওয়ার বয়স কমিয়ে আনা এবং টিকার কার্যকারিতার বিষয়ে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বলেন, “আসলে এবারের প্রকোপ থেকে বাঁচাতেই বয়স কমিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। এই কম বয়সে টিকা খুব বেশি কাজ করে না। তবে যে ৫০ শতাংশ বা তার বেশি কাজ করে সেটার মাধ্যমেও অনেক শিশুকে প্রকোপ থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে।
ইউনিসেফ বলছে টিকা পায়নি অনেকে
হামের সংক্রমণ ঠেকাতে প্রথম ৫ এপ্রিল দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। ১২ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদান শুরু হয়। ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে টিকা দেওয়া শুরু হয়, চলে ২০ মে পর্যন্ত। টিকাদানের এই কর্মসূচির আওতায় ১ কোটি ৮০ লাখ ১৬ হাজার ৯১৪ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
টিকাদান কর্মসূচির শেষ দিন বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তরফে বলা হয়েছে, ১ কোটি ৮৩ লাখ ৫৯ হাজার ৮৭০ জন শিশু টিকা পেয়েছে। টিকার আওতায় ১০২ শতাংশ শিশুকে আনা হয়েছে বলেও দাবি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
অন্যদিকে গেল ১১ মে টিকাদান পরিস্থিতি দ্রুত যাচাই পদ্ধতি-আরসিএমের ভিত্তিতে ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক রিয়াদ মাহমুদ বলেছিলেন, তখন পর্যন্ত শহর এলাকায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং গ্রাম এলাকায় ১৫ শতাংশ শিশু টিকা পায়নি।
নাম প্রকাশ না করে ইপিআইয়ের একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আসলে টার্গেট শিশুদের গণনার সময়ও কিছু শিশু বাদ পড়তে পারে। এই বাদ পড়া শিশুদের পরবর্তীতে টিকা দেওয়ার কার্যক্রমও চালু আছে আমাদের।
টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বলেন, আরসিএম পদ্ধতিতে যাচাই করে যেসব শিশু টিকা পায়নি তাদের খুঁজে বের করে টিকা দিতে হবে। এটির জন্য মাঠকর্মীদের ভালোভাবে কাজে লাগাতে হবে।
আর টিকার কভারেজ শুধু পাঁচ বছরের বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে নয়, বরং আরো কিছু বেশি বয়সী শিশুদেরও টিকায় আওতায় নিয়ে আসা জরুরি।
বাদ পড়া শিশুদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, আমাদের টিকা কার্যক্রম চালু আছে। যেসব শিশুরা এখনো টিকা পায়নি তারা যেকোনো সেন্টার থেকে টিকা নিতে পারবে। এটির জন্য আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছি।
মৃত্যু থামবে কবে?
বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার ৮৫৬। তাদের মধ্যে ৮ হাজার ৬৭ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এদিন সকাল ৮টার পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম শনাক্ত হয়েছে ১৩৮ জনের।
অর্থাৎ প্রতিদিনই হামের রোগী শনাক্ত হচ্ছে, মৃত্যুও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কভিড-১৯ মহামারী মোকাবিলায় যেভাবে ‘কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি)’ তৈরি করা হয়েছিল, তেমন একটি জরুরি টিম করা প্রয়োজন। এতে মৃত্যু কমানো যাবে।
আর চলতি মাসের শেষের দিক থেকে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যু কমতে পারে, এমন আশার কথা বলেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, হামে মৃত্যু কবে কমবে, এটি বলা খুবই কঠিন। তবে হাম মোকাবিলার জন্য সর্বতোভাবে কাজ করলে দ্রুত সময়েই কমতে পারে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. মাহবুবুল হক বলেন, “হামের চিকিৎসায় কোনো ‘অ্যান্টিভাইরাল’ ওষুধ নেই। হামের কারণে নিউমোনিয়া হলে তা জটিল হয়। হাম হলে আরও অনেক জটিলতা দেখা দেয়।
হাসপাতালে শিশুদের আনা হচ্ছে অনেক জটিলতা হওয়ার পর। লাইফ সাপোর্ট দিয়েও তাদের বাঁচানো যাচ্ছে না। তবে আমরা সব শিশুর ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
একটি জরুরি টিম থাকলে কাজ করা আরো সহজ হতো বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন।
তিনি বলেন, করোনার সময় যেমন আদালত কোথায় বেড, আইসিইউ ফাঁকা রয়েছে সেগুলোর তথ্য প্রকাশ করার আদেশ দিয়েছিল, এটি করতে পারলে সাধারণ মানুষরা দ্রুত চিকিৎসা নিতে পারবে। রোগীরাও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবে।
এখন প্রতিদিন গণমাধ্যমে খবর আসে রোগীরা হাসপাতালে-হাসপাতালে ঘুরছে।
ডা. মুশতাক বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের চিকিৎসার ব্যয়সহ যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এটি না করলে অনেক মানুষই মনে করে হাসপাতালে নিয়ে আসা অনেক খরচের ব্যাপার। কিন্তু পরে যখন অবস্থা খুব খারাপ হয়, তারা হাসপাতালে শিশুদের নিয়ে আসে। এতে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে। এসব ব্যবস্থা নিলে শিশুদের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হবে মনে করেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “আসলে হাম মোকাবিলার প্রধান একটি বিষয় হলো টিকা প্রদান। আমরা সেটি সফলভাবে সম্পন্ন করেছি। সরকার খুব আন্তরিকতার সঙ্গে হাম মোকাবিলায় চেষ্টা করছে।
আসলে আমাদের ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে গত মাসের ২০ তারিখ থেকে। আর টিকা গ্রহণের পর অন্তত তিন সপ্তাহ লাগে শিশুদের শরীরে ইমিউনিটি বৃদ্ধি পেতে, তাই চলতি মাসের ২০ তারিখের পর থেকে হামের প্রকোপ কমবে।
এখনো যারা টিকা পায়নি তাদের টিকা দেওয়ার কার্যক্রম চলছে তুলে ধরে তিনি আগামী জুন মাসের মাঝামাঝি থেকে হামের প্রকোপ একেবারে কমে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
আমরা শুরুতে উচ্চঝুঁকি বিবেচনায় ৫ এপ্রিল থেকে যেসব এলাকায় টিকা দিয়েছিলাম সেখানে বর্তমানে হামের সংক্রমণ খুবই কম। সেদিক বিবেচনায় জুন মাসের শেষে হামের প্রকোপ দৃশ্যমানভাবে কমবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
প্রাচীনকাল থেকে ‘তেল’ ধীরে ধীরে আমাদের রূপকাহনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। দৈনন্দিন ত্বকের যত্ন থেকে শুরু করে গোসল শেষে শরীর ও চুলের যত্নের প্রসাধন; যেমন- ময়েশ্চারাইজার, ক্লিনজার, মাস্ক, কন্ডিশনার, লোশন এবং ক্রিমের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এগুলো কি সত্যিই ত্বকের জন্য নিরাপদ? উত্তর হলো- হ্যাঁ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভালো। তবে সব তেল কিন্তু সমানভাবে কার্যকর নয়। তাহলে ক্যানোলা তেলের ক্ষেত্রেও কি একই কথা বলা যায়? ক্যানোলা তেল কী? এটি একটি উদ্ভিদভিত্তিক লিপিড, যা ক্যানোলা বীজ থেকে তৈরি করা হয়। ডার্মাটোলজিস্ট ডা. কুং বলেন, ‘কিছু দেশে ‘রেপসিড তেল’ শব্দটি শৈল্পিক (রং-তুলি) কাজে ব্যবহৃত তেলের ক্ষেত্রে বলা হয়, তবে ‘ক্যানোলা তেল’ মূলত ভোজ্য তেল। এর পুষ্টি ও শক্তিশালী ফর্মুলা চুল এবং ত্বকের জন্য বেশ ভালো। তাই প্রসাধনীতে এটি ব্যবহৃত হয়। অন্যান্য তেলের তুলনায় ক্যানোলা তেল তুলনামূলক নতুন। ডার্মাটোলজিস্ট ডা. কুং বলেন, ১৯৭৯ সালে কানাডায় রেপসিড গাছের জেনেটিক্যালি মডিফায়েড সংস্করণ, ক্যানোলা তেল নামে পরিচিত। এটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম উদ্ভিজ্জ তেলের উৎস। এমনকি ক্যানোলা তেল ভোজ্য তেল হিসেবে দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রোটিনের উৎস। ক্যানোলা তেলের উপকারিতা ডার্মাটোলজিস্ট ডা. কুং বলেন, ‘বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, এটি ট্রান্সএপিডার্মাল ওয়াটার লস হ্রাস করে ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। এ ছাড়াও ক্যানোলা তেলে ওলেইক অ্যাসিড ও লিনোলেইক অ্যাসিডের অনুপাত ২:১, যা প্রায় স্বাস্থ্যকর ত্বকের প্রাকৃতিক অনুপাতে মেলে। এ ছাড়া রেপসিড তেল প্রোটিন, ফিনলিক যৌগ, লিপিড এবং ভিটামিন ই সমৃদ্ধ, যা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি এবং অ্যান্টি-রিঙ্কলে কার্যকরী। ডার্মাটোলজিস্ট ডা. লো জারফো বলেন, ‘এই তেল প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন কে, সি, ই এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ হওয়ায় ত্বকের জন্য অনেক উপকারী। ১। ক্যানোলা তেল ত্বককে ময়েশ্চারাইজ করে এবং এর শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। ২। ভিটামিন ‘ই’ এবং ‘কে’ ব্রণ ও বার্ধক্যজনিত সমস্যা (যেমন- লাইন এবং রিঙ্কল) কমাতে সাহায্য করে। ৩। ক্যানোলা তেলে থাকা ভিটামিন ‘সি’ ত্বকের হাইপারপিগমেন্টেশন ও দাগ কমাতে সাহায্য করে এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়। এছাড়াও ভিটামিন ‘ই’ ত্বককে ফ্রি র্যাডিক্যাল ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দিতে পারে, যা ত্বককে সুস্থ, উজ্জ্বল এবং তারুণ্যদীপ্ত রাখতে সাহায্য করে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দুই ডার্মাটোলজিস্টই একমত পোষণ করে বলেন, ব্রণপ্রবণ ত্বকে ক্যানোলা তেলযুক্ত পণ্য ব্যবহারে সতর্ক হওয়া উচিত। ডা. লো জারফো বলেন, ‘ক্যানোলা তেলের কোমেডোজেনিক রেটিং ৪।’ এই রেটিংয়ের অর্থ- কোনো তেল কতটা ছিদ্র বন্ধ করতে পারে তার পরিমাপ। যদিও ক্যানোলা তেলে ত্বকের জন্য উপকারী উপাদানও রয়েছে। তবে এটি ছিদ্র বন্ধ করে দিতে পারে, যা ব্রণ আরও খারাপ করতে পারে। তাই ব্রণপ্রবণ ব্যক্তিদের এটি এড়িয়ে চলা ভালো। ক্যানোলা তেলের ব্যবহার যেহেতু ক্যানোলা তেল ত্বক ও চুলের জন্য উপকারী, তাই এটি রূপ রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। যদিও এটি রোমকূপের ছিদ্র বন্ধ করতে পারে! তাই ক্যানোলা তেল সরাসরি ত্বকে লাগানোর পরিবর্তে প্রসাধনী হিসেবে ব্যবহার করুন। যেসব প্রসাধনীর ফর্মুলায় ‘ক্যানোলা তেল’ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত জুলাই মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, সংখ্যার হিসাবে যা ৩৬। শুধু তাই নয়, একই সময়ে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীও শনাক্ত হয়েছে গেল মাসে। শুক্রবার (৩১ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে বরিশাল বিভাগে একজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হন ১১ জন। ১৫ জন ভর্তি হন দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ভর্তি হন আরও ৫০ জন। বিভাগের মধ্যে বরিশালে ৪ জন, চট্টগ্রামে ৬৯ জন, খুলনায় ৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত ১ জানুয়ারি থেকে শুক্রবার পর্যন্ত দেশে মোট ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৫ হাজার ৩১০ জন, প্রাণ গেছে মোট ৫৪ জনের। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসে শনাক্ত হয়েছে ৯ হাজার ২০৬ জন রোগী ও মারা গেছে ৩৬ জন রোগী। চলতি সপ্তাহে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ২৬৭০ জন ও প্রাণ গেছে ১৪ জনের। সর্বশেষ গত এক দিনে অর্থাৎ বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ১ জনের মৃত্যু ও ১৫৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। অধিদপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়, গত জানুয়ারি মাসে দেশে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয় ১ হাজার ৮১ জন, ফেব্রুয়ারি মাসে ৪০৯, মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০, মে মাসে ৭১৪, জুনে ২ হাজার ৯০৭ জন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে মারা যায় ২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২ জন, মার্চে ১ জন, জুনে ১৩ জন। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৫৪ জন ডেঙ্গু রোগী সুস্থ্য হয়ে হাসপাতাল ছেড়ে গেছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৫ হাজার ৩১০ জন রোগীর মধ্যে সুস্থ্য হয়ে ফিরেছেন ১৪ হাজার ৮৯ জন। ২০২৫ সালে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় চার শতাধিক মানুষের, শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজারের মত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু আক্রান্তদের হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য রাখে ২০০০ সাল থেকে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে এ রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। একই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুও হয়।
মেথি বীজের নাম শুনলেই অনেকে ভাবেন, এটি যেন এক জাদুকরী উপাদান! হজম ভালো রাখা, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, প্রদাহ কমানো থেকে শুরু করে ত্বক ও চুলের যত্ন—সব কিছুতেই মেথির কদর রয়েছে। তাই অনেকেই প্রতিদিন সকালে ভেজানো মেথির পানি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলেছেন। কিন্তু জানেন কী, এই মেথির পানি সবার জন্য মোটেও নিরাপদ নয়? কিছু ক্ষেত্রে এটি উপকারের চেয়ে ক্ষতিই ডেকে আনতে পারে! রক্তে শর্করা কমে গেলে বিপদ মেথি ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায় এবং কার্বোহাইড্রেট শোষণ কমিয়ে রক্তে শর্করা হ্রাস করে। তাই যাদের রক্তে শর্করা স্বাভাবিকের নিচে বা যারা ডায়াবেটিসের ওষুধ সেবন করছেন, তাদের জন্য মেথির জল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এতে হঠাৎ রক্তে শর্করা অতিরিক্ত কমে গিয়ে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা বা অজ্ঞান হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। গর্ভাবস্থায় নয় একেবারেই গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে মেথির পানি একেবারেই পরিহার করা উচিত। কারণ মেথিতে থাকা কিছু যৌগ জরায়ুতে সংকোচন সৃষ্টি করতে পারে। গর্ভাবস্থার শেষ দিকে এটি প্রসব ত্বরান্বিত করলেও, শুরুর দিকের মাসগুলোতে এটি অকাল প্রসব বা গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ায়। থাইরয়েড রোগীদের জন্যও সতর্কতা গবেষণা বলছে, মেথি থাইরয়েড হরমোনের উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। এতে থাকা কিছু যৌগ আয়োডিন শোষণে বাধা দেয়, যা থাইরয়েডের জন্য অপরিহার্য। তাই থাইরয়েডজনিত সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের এই পানি খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। পেটের সমস্যা হলে উল্টো ফল যদিও মেথি হজমে সাহায্য করে, তবু অনেকের ক্ষেত্রে এটি গ্যাস, পেট ফাঁপা, ডায়রিয়া বা পেটে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে খালি পেটে ভেজানো মেথির পানি খেলে এই সমস্যাগুলো আরও বেড়ে যায়। অ্যালার্জি থাকলে সাবধান থাকুন মেথি শিমজাতীয় পরিবারের অন্তর্ভুক্ত—যার মধ্যে রয়েছে ছোলা, মসুর ডাল ও চিনাবাদাম। তাই যাদের এসব খাবারে অ্যালার্জি আছে, তাদের মেথিতেও একই রকম প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। শেষ কথা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাকৃতিক বলেই সব উপাদান সবার জন্য ভালো হয় না। মেথির জল খাওয়ার আগে নিজের শারীরিক অবস্থা, ওষুধের ইতিহাস ও অ্যালার্জির বিষয়টি ভেবে নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, তবেই উপকার পাবেন নিরাপদে। তথ্যসূত্র : টাইমস অব ইন্ডিয়া