মাত্র তিনদিনের ব্যবধানে স্পেনে আবারও ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বার্সেলোনায় একটি কমিউটার ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে। এতে চালক প্রাণ হারান। এছাড়া আহত হন ৩৭ জন। যারমধ্যে পাঁচজনের অবস্থা বেশ গুরুতর।
এরআগে গত রোববার দক্ষিণ স্পেনে আরেক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় অন্তত ৪০ জন নিহত হন।
স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ট্রেনটি রেললাইনের পাশের দেয়ালে ধাক্কা খায়।
কাতালুনিয়া আঞ্চলিক ফায়ার ইন্সপেক্টর ক্লাউডি গালার্দো জানিয়েছেন, ট্রেন থেকে সব যাত্রীকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
স্পেনের বিভিন্ন জায়গায় গত কয়েকদিন ধরে বিরূপ আবহাওয়া বিরাজ করছে। দেশটির উপকূলীয় এলাকা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে উচ্চসতর্কতা জারি করা হয়েছে। এরমধ্যেই পরপর দুটি বড় ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটল।
দুর্ঘটনার পর ট্রেনের ভেতর এক যাত্রী আটকা পড়েছিলেন। পরবর্তীতে তাকে বের করে নিয়ে আসতে সমর্থ হন উদ্ধারকারীরা। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
আহতদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা বেশ গুরুতর। ছয়জন তাদের চেয়ে কম আহত হয়েছেন। আর ২৬ জন মাঝারি মাত্রার আঘাত পেয়েছেন।
এ দুর্ঘটনার সময় বার্সেলোনায় আরেকটি কমিউটার ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। তবে সেখানে কেউ হতাহত হননি। দেশটির এক রেল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঝড়ের কারণে লাইনে পাথর পড়ে ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়।
সূত্র: বিবিসি
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
পবিত্র মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক কাজ করার অভিযোগে নজরুল ইসলাম ও সিঁথি আক্তার নামে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরব। গত ১৪ অক্টোবর এ দণ্ড কার্যকরের পর সামাজিকমাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে পবিত্র কাবার হাজরে আসওয়াত বা কালো পাথরের কাছে এক ব্যক্তি এক নারীকে মাথায় ধাক্কা দিচ্ছেন। সামাজিকমাধ্যমে বলা হচ্ছে, এ দুজন হলেন সেই বাংলাদেশি যাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে এই তথ্য বিভ্রান্তিকর জানিয়ে সৌদির দুই পবিত্র মসজিদ কর্তৃপক্ষের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে আজ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) একটি পোস্ট করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, “ভিডিওটি যে তথ্য দিয়ে ছড়ানো হচ্ছে এটি মিথ্যা এবং তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কোনো প্রমাণও নয় এটি।” গত ১৪ অক্টোবর দুই বাংলাদেশের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, নজরুল ইসলাম ও সিঁথি আক্তার নামে দুজনের দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে মসজিদের ভেতর ‘অনৈতিক’ কাজ করার জন্য। তবে এর বেশি কোনো তথ্য আর তারা জানায়নি। এমনকি কবে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়, তারা কোন জায়গায় অপরাধ সংঘটিত করেছিলেন সেটিও জানানো হয়নি। যদিও এখন ওই দুই বাংলাদেশি সম্পর্কে তথ্য আসা শুরু হয়েছে। জানা গেছে, নজরুল ইসলাম তিন বছরের বেশি সময় ধরে জেলে বন্দি ছিলেন। এ সময় সপ্তাহে একদিন তিনি ফোনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতেন। তবে পরিবারকে কোনো তথ্য না জানিয়ে গত ১৪ অক্টোবর তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সূত্র: খালিজ টাইমস
দক্ষিণ আফ্রিকার ৪ নভেম্বরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মুসলিম ভোটারদের সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাপোসা। ভোটের মাধ্যমে এলাকার নেতৃত্ব নির্বাচন, উন্নয়ন ও জনসেবার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখার জন্য তিনি মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান। দ্য সিটিজেন-এর ১৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর কেপটাউনের রাইল্যান্ডস এলাকায় ইন্টারন্যাশনাল পিস কলেজ সাউথ আফ্রিকা আয়োজিত ‘মুসলিম ভোটার ও ব্যালট’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন রামাপোসা। মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি এ আহ্বান জানান। রামাপোসা বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার সমাজ ও গণতন্ত্রে মুসলিম সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ভোটাধিকার প্রয়োগ নাগরিক অধিকার ও দায়িত্বের অংশ; এর মাধ্যমে নাগরিকেরা নিজেদের এলাকার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অংশ নিতে পারেন। তিনি বেকারত্ব, অপরাধ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও স্থানীয় জনসেবার মতো বিষয় বিবেচনা করে যোগ্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় মুসলিম নেতাদের অবদানের কথাও স্মরণ করেন। ৪ নভেম্বরের নির্বাচনে ভোটাররা পৌরসভা ও স্থানীয় সরকার পরিচালনার জন্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন।
শিক্ষাসংকট, আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভে নেমেছেন তরুণেরা। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও আলবেনিয়াসহ অন্তত নয়টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবাদ। কোথাও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল ও ধর্মঘটের ঘটনা ঘটছে। এসব আন্দোলনের বিস্তার নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—ইউরোপ কি আরেকটি ‘আরব বসন্তের’ দিকে এগোচ্ছে? বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে ইউরোপেও বাড়ছে জনঅসন্তোষ। প্যারিস, মিলান, মাদ্রিদ ও তিরানার মতো শহরে সরকারের নীতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম। তবে সব দেশের আন্দোলনের কারণ এক নয়। কোথাও শিক্ষাব্যবস্থায় বিনিয়োগের ঘাটতি ও বাজেট কমানোর প্রতিবাদ, কোথাও আবাসনসংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবার কোথাও বেকারত্ব ও দুর্নীতির অভিযোগ আন্দোলনকে উসকে দিয়েছে। ফ্রান্স, ইতালি, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়ায় বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। জার্মানি, অস্ট্রিয়া, স্পেন, পর্তুগাল ও গ্রিসেও শিক্ষার্থী ও অধিকারকর্মীরা বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করছেন। ইউরোপের অন্তত নয়টি দেশে বিক্ষোভের এই বিস্তার অনেককে মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০১০ সালের শেষ দিকে তিউনিসিয়া থেকে শুরু হওয়া ‘আরব বসন্তের’ কথা। সেই আন্দোলন মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা একাধিক শাসকের পতন ঘটে। তবে ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি আরব বসন্তের সঙ্গে তুলনা করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দুই অঞ্চলের আন্দোলনের মধ্যে কিছু মিল থাকলেও লক্ষ্য ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় পার্থক্য রয়েছে। আরব বসন্তে বহু দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ছিল অন্যতম দাবি। বিপরীতে ইউরোপের বর্তমান বিক্ষোভের বড় অংশের লক্ষ্য প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে ফেলা নয়; বরং সেই ব্যবস্থার মধ্যেই সংস্কার, জবাবদিহি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ফ্রান্সকে ঘিরে প্রতিবাদের বিস্তার ইউরোপের চলমান অস্থিরতার অন্যতম কেন্দ্র ফ্রান্স। গত ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবরের সপ্তাহান্তে দেশটির বিভিন্ন শহরে কয়েক লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। অনেক জায়গায় কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও প্যারিস, মার্সেই ও লিমোজসহ বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের খবর পাওয়া যায়। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর দেশজুড়ে ১১০টি বিক্ষোভে প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে আন্দোলনের আয়োজকদের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল আট লাখ। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিন প্রায় ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই আন্দোলনের সূচনা আরও আগে। গত ২১ সেপ্টেম্বর ক্রেতেই শহরের লিসে সাঁ-একজুপেরি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ ভবন এবং অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপে শ্রেণিকক্ষে গাদাগাদি করে পাঠ নেওয়ার প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করেন। পরে তা অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত হয় ট্রেড ইউনিয়ন এবং মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের অসন্তোষ। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে ঘটনাগুলোকে ‘বেপরোয়া’ বলে অভিহিত করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ফরাসিরা কীভাবে ফ্রান্সের সঙ্গে এমন করতে পারে?’ বিক্ষোভ ঘিরে দেশটিতে অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও জোরালো হয়েছে। গত ৬ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত করে মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, ‘এটি স্কুল নিয়ে নয়, বরং ইসলাম একটি একসময় মহান দেশকে দখল করতে চাইছে।’ ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থি নেত্রী মেরিন লে পেনও কয়েক দশকের অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনকে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন ও নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং প্যারিসের এইচইসি বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নো আল জাজিরাকে বলেন, ‘ফ্রান্স এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। এখন এর প্রভাব ফ্রান্সের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।’ তবে তার মতে, বিভিন্ন দেশের বিক্ষোভকে একটিমাত্র আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কারণ, দেশভেদে অসন্তোষের কারণ ও দাবিতে পার্থক্য রয়েছে। তারপরও শিক্ষায় অপর্যাপ্ত অর্থায়ন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলোতে আন্দোলনকারীদের মধ্যে মিল দেখা যায়। ইতালি ও বেলজিয়ামে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ফ্রান্সের পাশাপাশি ইতালিতেও গত ১৬ অক্টোবর শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবিতে রাজপথে নামেন। শিক্ষা খাতে অর্থায়ন, সামরিক ব্যয় এবং সরকারের নীতির প্রতিবাদে তুরিন ও রোমে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল করেন তাঁরা। ফরাসি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কৌশল অনুসরণ করে ইতালির শিক্ষার্থীরাও বিদ্যালয় দখলের পথ বেছে নেন। ইতালিতে ১৬ অক্টোবরের ‘নো মেলোনি ডে’ বা ‘মেলোনি নয় দিবস’-এর বিক্ষোভে বিদেশি শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ভর্তির ওপর প্রস্তাবিত সীমার বিরোধিতা করা হয়। বিক্ষোভকারীদের স্লোগান ছিল, ‘আ স্কুলা নেসুনো এ স্ত্রানিয়েরো’—অর্থাৎ, ‘স্কুলে কেউ বিদেশি নয়’। পাশাপাশি শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিও জানান তারা। ইতালির সংবাদ সংস্থা আনসা এ তথ্য জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকারের নতুন একটি জাতীয় ডিক্রিতে কিছু শ্রেণিকক্ষে অ-ইতালীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০ শতাংশে সীমিত রাখার বিধান রয়েছে। এ ছাড়া স্কুলে বোরকা ও নিকাব পরা নিষিদ্ধ করতে একটি ব্যবস্থা চালুর কথাও জানিয়েছেন মেলোনি। গত ১৭ অক্টোবর মিলানে বিক্ষোভ চলাকালে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। মুখোশধারী কয়েকজন বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে পাথর ও পাথরের চাঁই ছুড়ে মারেন। বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেডে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। বেলজিয়ামেও শিক্ষা খাতে ব্যয় সংকোচন, ফি বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাপের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। লিয়েজ শহরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কুইন্টিন কয়েকটি ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সেগুলোকে ‘নিছক সহিংসতা’ বলে অভিহিত করেন। ইউরোনিউজের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। আবাসনসংকট: তরুণদের নাগালের বাইরে নিজের ঘর ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আন্দোলনে আবাসনসংকট বড় একটি ইস্যু হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তরুণদের জন্য সাশ্রয়ী বাসা খুঁজে পাওয়া কঠিন হচ্ছে। স্পেন, পর্তুগাল ও গ্রিসে বাড়িভাড়া, বাসস্থানের অভাব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। স্পেনে আবাসনসংকট গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ৮৭ বছর বয়সি মারিকারমেন আবাসকালকে তার বাসা থেকে উচ্ছেদের ঘটনার পর সেপ্টেম্বরে প্রতিবাদ জোরালো হয়। প্রকাশিত খবরে বলা হয়, তার বাড়িভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়েছিল। পরে তার মৃত্যুর ঘটনা উচ্ছেদ ও আবাসনসংকট নিয়ে মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়। মাদ্রিদে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা নিয়েও বিক্ষোভ করেন। একই সময়ে আবাসনের অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্দোলনকারীরা আবাসিক সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ তহবিলগুলোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপের দাবি জানান। প্রতিবেশী পর্তুগালের রাজধানী লিসবনেও গত ১৭ অক্টোবর বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়। সেখানে বাড়িভাড়া, মজুরি, পেনশন ও অবনতিশীল জনসেবার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিক্ষোভকারীরা। এর আগে ১৫ অক্টোবর ভোরে পোর্তোতে আবাসনের দাবিতে গড়ে তোলা একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদী শিবির উচ্ছেদের সময় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের মারধর করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় প্রতিবন্ধী একজন ব্যক্তিসহ ৩৭ জন আহত হন। অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাটি। আবাসনসংকট তরুণদের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্যে। গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ—অর্থাৎ প্রতি চারজনের একজনের বেশি—অতিরিক্ত মানুষের সঙ্গে গাদাগাদি করে বসবাস করতেন। এই পরিসংখ্যান আবাসনসংকটের পাশাপাশি তরুণদের স্বাবলম্বী হওয়ার প্রতিবন্ধকতাও তুলে ধরে। চাকরি পাওয়ার পরও বাড়িভাড়া, দৈনন্দিন খরচ ও অন্যান্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেকের পক্ষে স্বাধীনভাবে বসবাস করা সম্ভব হচ্ছে না। আলবেনিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় আলবেনিয়ায় বিক্ষোভকারীদের রাজনৈতিক দাবি আরও স্পষ্ট। দুর্নীতির অভিযোগ, বেকারত্ব এবং সরকারের প্রতি দীর্ঘদিনের অসন্তোষ সেখানে আন্দোলনের প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। গত ১৭ অক্টোবর রাজধানী তিরানায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরে হাজারো তরুণ বিক্ষোভকারী জড়ো হন। প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগের দাবিতে এটি ছিল টানা পঞ্চম দিনের ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা দাঙ্গা পুলিশের দিকে পাথর ছোড়েন। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, স্টান গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে। কয়েক মাস ধরে জমে থাকা ক্ষোভও এই অস্থিরতার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ও বেকারত্বের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিতর্কিত উপকূলীয় উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। তবে পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এদি রামা। তার অভিযোগ, বিরোধীরা অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও গ্রিসেও প্রতিবাদ ইউরোপে তরুণদের বিক্ষোভের বিস্তার কেবল সংঘর্ষের খবর পাওয়া দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও গ্রিসেও শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। তবে এসব দেশে আন্দোলনের মাত্রা ও তীব্রতা তুলনামূলকভাবে কম। গত ১৬ অক্টোবর জার্মানির বার্লিনে আন্দ্রেয়াস-গিমনাজিয়ামের প্রবেশপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার প্রস্তুতি এবং শিক্ষা খাতে আরও বিনিয়োগের দাবিতে তারা এই কর্মসূচি পালন করেন। একই সঙ্গে ফ্রান্সের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতিও জানান তারা। অস্ট্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট কমানো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত দুরবস্থার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হচ্ছেন। গ্রিসে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষের কেন্দ্রে রয়েছে আবাসন ব্যয়, বাসস্থানের সংকট, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসনসংকট ও শিক্ষানীতি নিয়ে আন্দোলনের পাশাপাশি ক্লাস বর্জনের ডাকও দেওয়া হয়েছে। অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নো আল জাজিরাকে বলেন, গ্রিসে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জনের আহ্বান জানাচ্ছেন, জার্মানিতেও তারা সংগঠিত হচ্ছেন। অস্ট্রিয়ায়ও আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে এবং পরবর্তী সপ্তাহে আরও সংগঠিত কর্মসূচি হতে পারে। আরব বসন্তের সঙ্গে কতটা মিল? ইউরোপের বর্তমান অস্থিরতাকে আরব বসন্তের সঙ্গে তুলনা করার পেছনে রয়েছে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত হওয়ার প্রবণতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অসন্তোষের মতো কয়েকটি বিষয়। কুয়েতি বংশোদ্ভূত মার্কিন সাংবাদিক আহমেদ এলদিন তার সাবস্ট্যাক প্রবন্ধ ‘ইউরোপস আরব স্প্রিং’-এ ইউরোপের বিক্ষোভের সঙ্গে ২০১১ সালের আরব বসন্তের তুলনা করেছেন। তার মতে, অর্থনৈতিক দুর্দশা, বৈষম্য এবং রাজনৈতিক অভিজাতদের প্রতি তরুণদের ক্ষোভ দুই আন্দোলনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য তৈরি করেছে। তিনি সতর্ক করে লিখেছেন, ‘ইউরোপের সরকারগুলোর কাছে বিদ্রোহ দমন করার জন্য ট্যাংকের চেয়ে নীরব পদ্ধতি রয়েছে।’ আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী করার প্রসঙ্গে তিনি আরও লিখেছেন, ‘শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যে পুলিশের চেয়ে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার কৌশল শিখেছে। কিন্তু রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি সময় ধরে টিকে থাকতে হলে তাদের আরও অনেক কিছু করতে হবে।’ মার্কিন বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তা হ্যারি হ্যালপিনও ইউরোপের পরিস্থিতিকে বিশ্বজুড়ে তরুণদের ক্ষোভের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, নেপাল থেকে ইউরোপ পর্যন্ত জেন-জির ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেওয়া দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাতদের বিরুদ্ধে একের পর এক বিক্ষোভ অনিবার্য। ব্রিটিশ পডকাস্টার পিটার ম্যাককরম্যাকও মন্তব্য করেছেন, ‘ইউরোপ নিজেদের আরব বসন্তের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।’ তার মতে, কয়েক দশকের মূল্যস্ফীতি, সম্পদ কুক্ষিগত করা এবং আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়েছে। তবে এসব বক্তব্য পর্যবেক্ষক ও ভাষ্যকারদের নিজস্ব মূল্যায়ন। এগুলো থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই যে ইউরোপের সব দেশের আন্দোলন একই লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন তরুণ প্রজন্ম বর্তমান আন্দোলনের পেছনে তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও বড় ভূমিকা রাখছে। শিক্ষা শেষ করে ভালো চাকরি পাওয়া, নিজের সামর্থ্যে বাসা ভাড়া করা কিংবা আগের প্রজন্মের তুলনায় উন্নত জীবন গড়ার প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন অনেকে। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক টিইউআই ফাউন্ডেশনের ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত এক গবেষণায় ইউরোপের সাতটি দেশের ৮ হাজার ২৪ জন তরুণের মতামত নেওয়া হয়। এতে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের ৫২ শতাংশ আশঙ্কা করছেন, তাদের প্রজন্মের জীবনযাত্রার মান বাবা-মায়ের প্রজন্মের চেয়ে খারাপ হবে। বিপরীতে, মাত্র ২৫ শতাংশ মনে করেন, তারা বাবা-মায়ের চেয়ে ভালো জীবন পাবেন। এই ফলাফল তরুণদের মধ্যে জমে থাকা হতাশার একটি চিত্র তুলে ধরে। তাদের অনেকের কাছে ভবিষ্যৎ আর নিশ্চিত উন্নতির প্রতিশ্রুতি নয়; বরং ব্যয়বহুল জীবন, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান ও সীমিত সুযোগের বাস্তবতা। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষা ও আবাসনের মতো মৌলিক বিষয়ে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নিচ্ছে। তরুণদের একটি অংশের ধারণা, প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারছে না। আরব বসন্তের পুনরাবৃত্তি, নাকি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি? ইউরোপের বর্তমান বিক্ষোভের সঙ্গে আরব বসন্তের কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। তরুণদের ক্ষোভ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা—দুই ক্ষেত্রেই এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত সংগঠিত হওয়া এবং এক দেশের আন্দোলন থেকে অন্য দেশের তরুণদের অনুপ্রাণিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে পার্থক্যও কম নয়। ২০১১ সালের আরব বসন্তে তিউনিসিয়া, মিসরসহ বিভিন্ন দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল। কয়েকটি দেশে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শাসকদের পতন ঘটে। অন্যদিকে ইউরোপের অধিকাংশ দেশে নির্বাচনী রাজনীতি, বিরোধী দল, আদালত ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার সুযোগ রয়েছে। এ কারণে ইউরোপের বিক্ষোভকারীদের বড় অংশের দাবি পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা নয়; বরং সরকারি নীতির পরিবর্তন, দুর্নীতির জবাবদিহি, শিক্ষা ও আবাসনে বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান থাকলেই মানুষের অসন্তোষ দূর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তরুণেরা যদি দেখেন জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, কর্মসংস্থান অনিশ্চিত থাকছে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না, তাহলে ক্ষোভ আরও তীব্র হতে পারে। এ অবস্থায় ইউরোপের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে আন্দোলনের পেছনে থাকা বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান করা। এসব সংকট মোকাবিলায় সরকারগুলো কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে বর্তমান বিক্ষোভের ভবিষ্যৎ গতিপথ। তথ্যসূত্র : ইন্ডিয়া টুডে