ভারতের কৃষিপণ্য রফতানিতে একের পর এক ধাক্কা আসছে। কখনও আম, কখনও চাল, আবার কখনও মসলা- বিভিন্ন দেশের আপত্তি ও নিষেধাজ্ঞায় প্রশ্ন উঠছে ভারতের খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, কীটনাশকের ব্যবহার, পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ এবং রফতানি সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে।
সম্প্রতি জাপান ভারতীয় আম আমদানি স্থগিত করেছে, চীন তিনটি ভারতীয় চাল রফতানিকারকের আমদানি অনুমতি বাতিল করেছে। এছাড়া হংকং কয়েকটি ভারতীয় মসলা পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতীয় জিরার চালান পরীক্ষা আরও বাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনও সমস্যা নয়। বরং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কৃষিপণ্য উৎপাদক ভারত এবং উন্নত দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান খাদ্য নিরাপত্তা, পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ ও মান নিয়ন্ত্রণের চাহিদার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
জাপানে আম রফতানিতে বড় ধাক্কা
ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য উত্তর প্রদেশের রাজধানী লখনৌয়ের রেহমানপুর গ্রামের ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি) কেন্দ্রে তখন ব্যস্ত সময়ের প্রস্তুতি চলছিল। ফল ও সবজিকে জীবাণুমুক্ত ও পোকামাকড়মুক্ত করার জন্য ব্যবহৃত এই কেন্দ্রে জাপানে আম রফতানির মৌসুম শুরু হওয়ার কথা ছিল।
মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের চাষিরা রফতানির জন্য তাদের সেরা আলফানসো ও কেসর আম সংরক্ষণ করেছিলেন। রফতানি নথিপত্রও প্রস্তুত ছিল, পণ্য পাঠানোর সময়সূচিও চূড়ান্ত করা হয়েছিল।
কিন্তু মার্চে জাপানের কোয়ারেন্টাইন পরিদর্শকেরা ওই কেন্দ্রে পরিদর্শনে আসার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ধূমায়ন, জীবাণুমুক্তকরণ এবং সনদ দেওয়ার পদ্ধতি পর্যালোচনা করে তারা পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এর পরই জাপান ভারতীয় আমের আমদানি স্থগিত করে।
৩১ মার্চ জাপানের ইয়োকোহামার উদ্ভিদ সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতকে জানায়, ২৫ মার্চ বা তার পর ইস্যু করা পরিদর্শন সনদযুক্ত কোনও ভারতীয় আমের চালান আপাতত গ্রহণ করা হবে না। কার্যক্রমের মান উন্নত হয়েছে- এ বিষয়ে জাপানি পরিদর্শকেরা নিশ্চিত হওয়ার পরই আমদানি পুনরায় চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
প্রায় দুই দশকের মধ্যে ভারত-জাপান আম বাণিজ্যে এটি ছিল বড় ধরনের বিঘ্ন। এর আগে ১৯৮৬ সালে ফলমাছি বা ফ্রুট ফ্লাইয়ের আশঙ্কায় জাপান ভারতীয় আম আমদানি নিষিদ্ধ করেছিল। ২০০৬ সালে ভারত ভিএইচটি অবকাঠামো তৈরি, কীটপতঙ্গ পর্যবেক্ষণ জোরদার এবং প্রতি বছর জাপানি পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়ার পর সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।
২০২৬ সালের নতুন নিষেধাজ্ঞায় জাপানে অনুমোদিত ভারতের ছয় জাতের আম- আলফানসো, কেসর, ল্যাংড়া, বাঙ্গানাপল্লি, চৌসা ও মালিকা- ওপর প্রভাব পড়েছে। মূলত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত আম রফতানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টিই এর আওতায় পড়ে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাপান ভারত থেকে প্রায় ১৫ লাখ ৪০ হাজার ডলারের তাজা ও প্রক্রিয়াজাত আম আমদানি করেছিল। অর্থের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হলেও ভারতীয় রফতানিকারকদের কাছে জাপানের বাজারের গুরুত্ব অনেক বেশি।
কারণ, জাপান বিশ্বের অন্যতম উচ্চমূল্যের বাজার। দেশটি ভালো মানের আমের জন্য তুলনামূলক বেশি দাম দেয়। একই সঙ্গে জাপানের মতো কঠোর বাজারে প্রবেশের অনুমোদন অন্য আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছেও ভারতীয় পণ্যের মানের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
মুম্বাইভিত্তিক আম রফতানিকারক বিক্রম শাহ ২০২৫ সালে প্রায় আড়াই টন আম জাপানে পাঠিয়েছিলেন। তিনি বলেন, পরিমাণের দিক থেকে জাপান ভারতের সবচেয়ে বড় বাজার না হলেও বিশ্বাসযোগ্যতার দিক থেকে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিক্রম শাহ বলেন, জাপানের ক্রেতাদের সঙ্গে আস্থা তৈরি করতে তাদের ছয় বছর সময় লেগেছে। তিনি দুইবার ওসাকা গিয়ে আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং তাদের কোল্ড স্টোরেজ পরিদর্শন করে পণ্যের মান নিয়ে তাদের প্রত্যাশা সম্পর্কে ধারণা নিয়েছেন।
তার ভাষায়, এমন সম্পর্ক তৈরি করতে বছরের পর বছর লাগে, কিন্তু একটি মৌসুমেই তা নষ্ট হয়ে গেল।
জাপানি বাজার হারিয়ে বিপাকে আমচাষিরা
জাপানের সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ভারতের আমচাষিরা এমনিতেই নানা সমস্যায় রয়েছেন। মহারাষ্ট্রের কোঙ্কন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহে আলফানসো আমের বড় অংশের ফলন নষ্ট হয়েছে।
এর ওপর পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে। জাপানের বাজার গড়ে তুলতে বছরের পর বছর বিনিয়োগ করা রফতানিকারকেরা হঠাৎ চুক্তি বাতিল এবং গুদামে আম নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন।
মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরির আলফানসো আমচাষি রাজেশ পাতিল বলেন, তার পরিবার দুই প্রজন্ম ধরে কোঙ্কন উপকূলের ৩ একর জমিতে আম চাষ করছে।
তার মতে, জাপানের বাজারে দেশীয় নিলামের তুলনায় অনেক বেশি দাম পাওয়া যেত। তাই জাপানের কঠোর আমদানি মান পূরণ করতে তিনি বাগানে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেন।
রাজেশ পাতিল জানান, গ্রেডিং ও প্যাকেজিং সরঞ্জাম কিনতে প্রায় ৮০ হাজার রুপি খরচ করেছেন। একই সঙ্গে কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং আম সংগ্রহ ও প্যাকেজিংয়ের পদ্ধতিও পরিবর্তন করেছেন।
তিনি বলেন, স্থানীয় বাজারের তুলনায় জাপানের বাজার থেকে প্রায় দ্বিগুণ আয় করা সম্ভব হতো। তাই রফতানি ব্যবস্থাও ফল উৎপাদনের মতোই নির্ভরযোগ্য হবে- এটাই তার প্রত্যাশা ছিল।
চীনের আপত্তি ভারতীয় চালে
শুধু আম নয়, ভারতীয় চালও এবার বড় আন্তর্জাতিক বাজারে সমস্যার মুখে পড়েছে।
১৭ এপ্রিল চীন তিনটি ভারতীয় চাল রফতানিকারকের আমদানি অনুমতি বাতিল করে। চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস তাদের চালানে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড অরগানিজম বা জিএমও’র উপস্থিতির দাবি করে চালান প্রত্যাখ্যান করে।
তবে সংশ্লিষ্ট রফতানিকারকেরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাদের দাবি, চালান পাঠানোর আগেই পণ্যগুলো জিএমওমুক্ত হিসেবে সনদ পেয়েছিল। ভারত সরকারও জানিয়েছে, দেশটির ধান ও চাল উৎপাদনব্যবস্থা জেনেটিক পরিবর্তনমুক্ত।
ভারতের কৃষিপণ্য রফতানিতে চালের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেকর্ড ১২৫০ কোটি ডলারের চাল রফতানি করেছে ভারত। দেশটির মোট কৃষিপণ্য রফতানির ২০ শতাংশেরও বেশি আসে চাল থেকে।
তিনটি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের সামনে এখন চীনের বাজারে ফিরে যাওয়ার অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রফতানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এপেডা) সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিষয়টি জানায়। পরে ৮ জুন চীনে রফতানির জন্য জিএমও পরীক্ষা করতে অনুমোদিত পরীক্ষাগারগুলোর একটি তালিকাও প্রকাশ করা হয়।
পরীক্ষাগারের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন
নয়াদিল্লির কৃষিবিজ্ঞানী এস কে সিংয়ের মতে, চীনের সঙ্গে এই বিরোধ ভারতের পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো সামনে এনেছে।
তিনি বলেন, ভারতের পরীক্ষাগারগুলো মূলত কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ ও অ্যাফ্লাটক্সিন পরীক্ষায় দক্ষতা অর্জন করেছে, কারণ এত দিন অধিকাংশ আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পরীক্ষার চাহিদাই বেশি ছিল। কিন্তু চীনের জিএমও যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা ভিন্ন ধরনের সক্ষমতা ও অবকাঠামো দাবি করে।
রফতানিকারকদের সনদ স্বীকৃত পরীক্ষাগার থেকেই দেওয়া হয়েছিল। তবে ভারতের সনদ দেওয়ার পুরো নেটওয়ার্ক এখনও সমানভাবে উন্নত হয়নি।
জিএমও পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন বিশ্লেষণ করতে পারে- এমন পরীক্ষাগারের সংখ্যা খুবই কম। এগুলোর বেশির ভাগই নয়াদিল্লি ও তেলেঙ্গানা রাজ্যের হায়দরাবাদে অবস্থিত। ফলে পাঞ্জাব ও হরিয়ানার মতো উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যের রফতানিকারকদের নমুনা পরীক্ষার জন্য শত শত কিলোমিটার দূরে পাঠাতে হয়।
মসলা রফতানিতেও সতর্কবার্তা
আম ও চালের আগে ভারতীয় মসলার রফতানিতেও বেশ কিছু সতর্কবার্তা এসেছে।
হংকং কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের কারণে ভারতের কয়েকটি মসলা পণ্যের আমদানি স্থগিত করেছে। পরীক্ষায় প্রায় ১২ শতাংশ নমুনায় মানগত বিচ্যুতি পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের র্যাপিড অ্যালার্ট সিস্টেমে ভারতীয় মসলার বিষয়ে ৩১২টি সতর্কতা পাওয়া যায়। এরপর ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ভারতীয় জিরার চালানে পরীক্ষা করার হার বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করেছে ইইউ।
খাদ্য নিরাপত্তা বিজ্ঞানী অনন্যা বোসের মতে, এসব সমস্যার বড় কারণ ভারতের কৃষিপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থার বিচ্ছিন্নতা।
তিনি বলেন, একজন কৃষক তার পণ্য একজন সংগ্রহকারীর কাছে বিক্রি করেন, সেই সংগ্রহকারী বিক্রি করেন ব্যবসায়ীর কাছে, পরে ব্যবসায়ী তা প্রক্রিয়াজাতকারীর কাছে পাঠান। এই পুরো প্রক্রিয়ায় কৃষক কী কীটনাশক ব্যবহার করেছেন- সেই তথ্য অনেক সময় হারিয়ে যায়।
অনন্যা বোস বাধ্যতামূলক ডিজিটাল কীটনাশক ব্যবহারের রেকর্ড চালুর পক্ষে মত দিয়েছেন। কারণ আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রকেরা এখন মাঠ থেকে রফতানি চালান পর্যন্ত পণ্যের পূর্ণাঙ্গ উৎস-অনুসরণ বা ট্রেসেবিলিটি চান। ভারতের অনেক রাজ্যে এখনও এটিকে বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
কৃষি উৎপাদনে শক্তিশালী, কিন্তু মান নিশ্চিতে পিছিয়ে
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সমস্যা ভারতের কৃষি উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত প্রত্যাশার ব্যবধানকে স্পষ্ট করেছে।
জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো বড় বাজারগুলো এখন খাদ্যপণ্যের উৎস, নিরাপত্তা, কীটনাশকের ব্যবহার এবং মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর।
ভোক্তাদের স্বচ্ছতার দাবি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নতুন ধরনের কীটপতঙ্গের বিস্তার, খাদ্য নিরাপত্তা এবং কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা- সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য নিরাপত্তার মান আরও কঠোর হয়েছে।
অন্যদিকে, ভারতের প্রতিযোগী দেশগুলো দ্রুত নিজেদের ব্যবস্থার উন্নতি করছে। থাইল্যান্ড দেশব্যাপী ট্রেসেবিলিটি বা পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ভিয়েতনাম কৃষকদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করছে। ব্রাজিল ও চিলি কোল্ড-চেইন অবকাঠামোতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছে।
কোল্ড স্টোরেজ ও প্যাকহাউসের ঘাটতি
ভারতের অগ্রগতি তুলনামূলক ধীর। দেশটিতে নিবন্ধিত প্যাকহাউসের সংখ্যা মাত্র ২০৭টি, যার প্রায় ৭২ শতাংশই মহারাষ্ট্রে কেন্দ্রীভূত।
এর পাশাপাশি কোল্ড স্টোরেজের ঘাটতি ও পরিবহন ব্যয়ও রফতানিকারকদের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। এসব খাতে রফতানি পণ্যের মূল্যের প্রায় ১৫ শতাংশ ব্যয় হয়, যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো কৃষকদের জমির আকার। ভারতের ৮৬ শতাংশের বেশি কৃষকের মালিকানায় ২ হেক্টরের কম জমি রয়েছে। ফলে পুরো দেশে একই ধরনের উৎপাদন, কীটনাশক ব্যবস্থাপনা, সংগ্রহ ও প্যাকেজিং মান চালু করা কঠিন।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অনিল গুপ্ত বলেন, ভারত এত দিন বেশি উৎপাদনের ওপর জোর দিয়ে কৌশল তৈরি করেছে। কিন্তু উন্নত বাজারগুলো এখন শুধু বেশি উৎপাদন নয়, উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়ায় মান বজায় রাখার প্রমাণ চায়।
কিছু অগ্রগতি হলেও চ্যালেঞ্জ বড়
তবে ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও রফতানি ব্যবস্থায় কিছু অগ্রগতিও হয়েছে।
গত এক দশকে স্বীকৃত পরীক্ষাগারের সংখ্যা ২২ থেকে বেড়ে ৮৯ হয়েছে। একই সময়ে অনুমোদিত রফতানি সনদের সংখ্যা প্রায় ৬১ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, অগ্রগতি হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা এখনও যথেষ্ট নয়।
ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য বিভাগে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা উজ্জ্বল কুমার ঘোষ মসলা, চা, ফল ও সবজিতে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ, কীটনাশক ও অ্যাফ্লাটক্সিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি জানান, পরীক্ষাগার আধুনিকায়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি পরীক্ষা, পরিদর্শন ও পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হচ্ছে। ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শন, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং দ্রুত স্ক্রিনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ব কৃষিপণ্য রফতানিতে ভারতের অংশ মাত্র ২.৪ শতাংশ
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষিপণ্য উৎপাদক হওয়া সত্ত্বেও বৈশ্বিক কৃষিপণ্য রফতানিতে ভারতের অংশ মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ।
দেশটির কৃষিপণ্য রফতানির বড় অংশ এখনও কাঁচা বা কম প্রক্রিয়াজাত পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রফতানির হার প্রায় ১৭ শতাংশ। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ২৫ শতাংশ এবং চীনে প্রায় ৫০ শতাংশ। এর প্রভাব সরাসরি কৃষকদের ওপরও পড়ছে।
গুজরাটের কেসর আমচাষিরা জাপানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা হারিয়েছেন। হরিয়ানার কারনালের এক বাসমতি চালচাষি জানিয়েছেন, স্থানীয় বাজারে এরই মধ্যে চালের দাম প্রায় ৮ শতাংশ কমে গেছে।
কেরালার এরোডের এক হলুদ প্রক্রিয়াজাতকারী বলেছেন, গত প্রান্তিকে শুধু অবশিষ্টাংশ পরীক্ষার পেছনেই তার ১৫ হাজার রুপি খরচ হয়েছে, যা তার মোট মুনাফার প্রায় ১০ শতাংশ।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
ভারতের কর্মসংস্থানে কৃষির ভূমিকা এখনও বিশাল। দেশটির মোট কর্মশক্তির প্রায় ৪২ শতাংশ কৃষির সঙ্গে যুক্ত। অথচ জাতীয় উৎপাদনে কৃষির অবদান এক-পঞ্চমাংশেরও কম।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অনিল গুপ্তের মতে, বিষয়টি কেবল কয়েকটি চালান প্রত্যাখ্যাত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে শেষ পর্যন্ত তারাই সফল হবে, যারা নিয়মিতভাবে বৈশ্বিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী মান বজায় রাখতে পারবে। সূত্র: আল-জাজিরা
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
দিল্লি থেকে থাইল্যান্ডের ফুকেট গিয়ে আবার ফিরতি ফ্লাইট নিয়ে ফুকেট থেকে দিল্লি ফেরার মাঝে বিরতি ছিল মাত্র ২৪ ঘণ্টার। এরইমধ্যে এয়ার ইন্ডিয়ার পাইলট বিমানের ক্রুদের নিয়ে পার্টিতে গিয়েছিলেন। গত ৪ আগস্ট মাঝ আকাশে হঠাৎ তীব্র ঝাঁকুনিতে পড়া এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটের পাইলটের বিরুদ্ধে পার্টি করা ছাড়াও আরো সব গুরুতর অভিযোগ আনছেন যাত্রী ও ফ্লাইটের ক্রু মেম্বাররা। এর আগে পরপর দুটি ড্রাগ টেস্টে পজিটিভ হন অভিযুক্ত পাইলট। তার রক্তে মারিজুয়ানা সেবনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযুক্ত পাইলট দিল্লি থেকে ফুকেট যাওয়ার সময় একবার ওয়াশরুমে গিয়েছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী তখন একজন ক্রু মেম্বারকে ককপিটের জাম্প সিটে বসিয়ে রেখে যান তিনি। কিন্তু সেই নারী ক্রু ককপিটের কাজে অভ্যস্ত ছিলেন না। তাই পাইলট ফিরে এসে তাকে তিরস্কার করেন। তবে ফুকেটে নামার পর তার মনে হয়, বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। বিষয়টি মিটমাট করতে তিনি সবাইকে পার্টিতে নিয়ে যান। তবে পার্টিতেও মন গলেনি সেই ক্রু মেম্বারের। ফেরার সময় তিনি ইনচার্জের কাছে চেয়ে বিমানের পেছনের দিকে দায়িত্ব নেন। বকার ভয়ে তিনি ককপিটের আশপাশে থাকতে চাননি। ফ্লাইটের আগে, ফ্লাইটের ভেতরে এবং নামার পরও পাইলটের আচরণ নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। দিল্লিতে অবতরণের পর পাইলট সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিলেন না। এয়ারক্রাফট অ্যাকসিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো-এর একজন তদন্তকারী তাকে সতর্ক করে দিয়ে মনে করিয়ে দেন, সিসিটিভি-র মাধ্যমে তার ওপর নজর রাখা হচ্ছে। তারপরও তাকে বসানোর জন্য সাহায্য করতে হয়েছিল। এমনকি প্রস্রাবের নমুনা জমা দেওয়ার সময়ও পাইলটকে শারীরিকভাবে সাহায্য করতে হয়েছিল। একটি সূত্র জানিয়েছে, অন্তত একজন কেবিন ক্রু পাইলটের বিরুদ্ধে মারিজুয়ানা সেবনের অভিযোগ এনে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছেন। গত ৪ আগস্ট এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইট ১৩৭ জন যাত্রী ও ৮ জন ক্রু নিয়ে ফুকেট থেকে দিল্লি ফিরছিল। ওড়িশার আকাশসীমায় মাঝ-আকাশে হঠাৎ বিমানটি তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে ৩০০ ফুট নিচে নেমে যায়। ঘটনার সময় বিমানের প্রধান পাইলট তার আসনে ছিলেন না, দায়িত্বে ছিলেন কো-পাইলট। বিমানটি তীব্র গতিতে নিচে নামার সময় ভেতরে সাময়িকভাবে 'নেগেটিভ গ্র্যাভিটি' বা ঋণাত্মক মাধ্যাকর্ষণ তৈরি হয়। ফলে ককপিটের জিনিসপত্র এবং সিটবেল্ট না বাঁধা যাত্রীরা শূন্যে ভেসে উঠে ছিটকে পড়েন। এআই২৩৭৯ ফ্লাইটের সেই দুর্ঘটনায় বিমানে থাকা ২০ জন যাত্রী এবং ৪ জন ক্রু আহত হন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফ্লাইটের একজন যাত্রী পাইলটের কথা বলতে গিয়ে জানান, ‘আমার ভাই এবং আমিই ছিলাম ফ্লাইটে ওঠা শেষ যাত্রী। পাইলটও আমাদের সাথেই ফ্লাইটে উঠেছিলেন। আমি তার সাথে কথা বলেছিলাম এবং জিজ্ঞেস করেছিলাম যে ফ্লাইটটি সঠিক সময়ে আছে কি না এবং আমাদের দেরি হয়ে গেছে কি না। তিনি উত্তর দিতে অনেক সময় নিচ্ছিলেন এবং তার চোখগুলো ছিল লাল। আমি তখন আমার ভাইকে বলেছিলাম যে, তাঁকে নেশাগ্রস্ত মনে হচ্ছে, আর তারপর কী ঘটেছিল তা তো আপনারা সবাই জানেনই।’ ফ্লাইটটি যখন হঠাৎ উচ্চতা হারাচ্ছিল, সেই মুহূর্তগুলোর বর্ণনা দিয়ে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘ফ্লাইট শুরু হওয়ার দুই ঘণ্টা পর, যখন সকালের নাশতা দেওয়া শেষ এবং সবাই বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তখন আমার ভাই আর আমি একসাথে বসেছিলাম এবং আমাদের চোখ বন্ধ ছিল। হঠাৎ আমরা খুব জোরালো একটা শব্দ শুনলাম, ঠিক যেন একটা ফাইটার জেটের মতো। পরের মুহূর্তেই আমি দেখলাম আমার ভাই তিন থেকে চারবার ছাদে গিয়ে বাড়ি খাচ্ছে, আর চারপাশের সবকিছু উড়ে বেড়াচ্ছে। মানুষ রক্তাক্ত হচ্ছিল, চিৎকার করছিল, কান্নাকাটি করে সাহায্যের জন্য আকুতি জানাচ্ছিল এবং পাইলটকে এটি থামাতে বলছিল।’ পাইলটের আচরণের ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে এই প্রথমবার আমি দেখলাম কোনো পাইলট ককপিট থেকে বের হয়ে যাত্রীদের নির্দেশ দিচ্ছেন যাতে কেউ ভিডিও রেকর্ড না করে বা এটা-সেটা না করে। তার স্পষ্ট বক্তব্য ছিল- তিলকে তাল করবেন না। আমরা তখন জীবন-মরণের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম; এই পরিস্থিতিতে কার এত ভিডিও রেকর্ড করা নিয়ে মাথাব্যথা থাকে? যাত্রীদের নিরাপত্তা বা চিকিৎসা তার মাথায় ছিল না। তার উদ্দেশ্য ছিল যেকোনোভাবে দিল্লিতে ল্যান্ড করা, যাতে তাকে কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে না হয় বা এই জাতীয় কিছু এড়ানো যায়। এই কারণেই তিনি অন্য কোথাও কোনো ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং করেননি।’ তবে অভিযুক্ত পাইলট মাদক সেবনের অভিযোগ অস্বীকার করলেও ঘুমের সমস্যার জন্য ঔষধ সেবনের কথা জানিয়েছেন। একটি ফ্লাইট সেফটি বিবৃতিতে পাইলট বলেন, ‘ব্যক্তিগত পরিস্থিতির কারণে আমি আগের কিছু সময় ধরে আলাদাভাবে ঘুমের সমস্যায় ভুগছিলাম, যার জন্য আমার পারিবারিক ডাক্তার আমাকে ওষুধ প্রেসক্রাইব করেছিলেন।’ তিনি আরও বলেন, ’যাত্রাবিরতির সময় আমি নিজে ঘুমানোর চেষ্টা করেছিলাম; কিন্তু সহজে ঘুম আসছিল না।’ তিনি জানান, ’ডিউটি রোস্টারটি আইনিভাবে নির্ধারিত বিশ্রামের সীমার মধ্যে থাকলেও, এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যা দিনের বেলার প্রাপ্য বিশ্রামের সময় কমিয়ে দিয়েছিল।’ ভারতের এয়ারক্র্যাফ্ট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো এবং ফ্রান্সের বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত সংস্থা যৌথভাবে এয়ারবাসের বিশেষজ্ঞদের সাথে নিয়ে ঘটনাটির তদন্ত করছে। তদন্ত চলার সময়ে পাইলট ও কো পাইলটকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
আফগানিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার হাতে জাতিসংঘের আফগানিস্তান মিশনের (ইউএনএএমএ) দুই কর্মী আটক হয়েছেন। আটকের পর দুই দিন ধরে তাদের সঙ্গে জাতিসংঘের কোনো যোগাযোগ বা সাক্ষাতের সুযোগ হয়নি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, গত রোববার পশ্চিমাঞ্চলীয় হেরাত প্রদেশে আফগান গোয়েন্দা সংস্থা ‘জেনারেল ডিরেক্টরেট অব ইন্টেলিজেন্স’-এর কর্মকর্তারা জাতিসংঘের দুই আফগান পুরুষ কর্মীকে আটক করেন। তাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে, তা জাতিসংঘকে জানানো হয়নি। আফগান সরকারও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র ফারহান হক বলেন, আটক দুই কর্মীর সঙ্গে দেখা করার অনুমতিও জাতিসংঘকে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, জাতিসংঘের কর্মকর্তা ও কর্মীদের বিশেষ মর্যাদা এবং আইনি সুরক্ষার বিষয়গুলো মেনে চলতে আফগান কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পঞ্চম বার্ষিকীর কয়েক দিন আগে এই আটকের ঘটনা ঘটল। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট কাবুল দখলের মাধ্যমে তালেবান আবার দেশটির ক্ষমতায় আসে। স্বাস্থ্যসেবা ও মানবিক সহায়তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আফগানিস্তানে জাতিসংঘের একাধিক সংস্থা কাজ করছে। চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ইউএনএএমএ আফগান কর্তৃপক্ষকে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর গ্রেফতার ও আটকের বিষয়গুলো স্পষ্ট করার এবং এসব কার্যক্রমে জবাবদিহি বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। তালেবান প্রায় পাঁচ বছর ধরে কঠোর ইসলামি আইনের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে আফগানিস্তান শাসন করছে। দেশটিতে নারী অধিকার নিয়েও কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। আফগান নারীদের জাতিসংঘের বিভিন্ন স্থাপনায় প্রবেশের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, যার আওতায় জাতিসংঘের নারী কর্মীরাও পড়েন। এর আগে গত জুনে হেরাত প্রদেশে ইরান সীমান্তের কাছে প্রায় ২০ জন ত্রাণকর্মীকে আফগানিস্তানের নৈতিকতা-বিষয়ক পুলিশ আটক করেছিল। তাদের বিরুদ্ধে দাড়ি যথেষ্ট লম্বা না রাখার অভিযোগ আনা হয়। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া জুনের শুরুতে সরকারি পোশাকবিধি না মানার অভিযোগে কয়েক ডজন নারীকে আটক করেছিল তালেবানের নৈতিকতা-বিষয়ক পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা মেডিসিনস সঁ ফ্রঁতিয়েরের (এমএসএফ) একজন হাসপাতালকর্মীও ছিলেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এসব বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে একটি বিক্ষোভ সহিংসভাবে দমন করা হলে অন্তত দুজন নিহত হন। এদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় আফগানিস্তানের মানবিক পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। এর পাশাপাশি ইরান ও পাকিস্তান থেকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লাখ লাখ আফগান নাগরিকের দেশে ফিরে আসাও দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার একটি অবৈধ খনিতে প্রাচীর ধসে অন্তত ১৪ জন খনি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে এবং আটজন আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) এবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে পুলিশের বরাতে এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। জোহানেসবার্গ থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে প্লাটিনাম উত্তোলনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রুস্টেনবার্গ শহরের কাছে এই দুর্ঘটনা ঘটে। নর্থ ওয়েস্ট প্রদেশের পুলিশ কমিশনার জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে আর কেউ আটকে আছে কি না তা শনাক্ত করতে উদ্ধারকারী কুকুর ও বিশেষ সরঞ্জাম নিয়ে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। আঘাত পাওয়া আটজনের মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়া তিনজনকে অবৈধ খননের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্য পাঁচজন পুলিশি পাহারায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় পরিত্যক্ত স্বর্ণ ও প্লাটিনাম খনিতে কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই বেআইনিভাবে কাজ করা এসব ক্ষুদ্র খননকারীদের স্থানীয়ভাবে ‘জামা জামাস’ বলা হয়। অপরাধ চক্রের সঙ্গে জড়িত এই অবৈধ খনি শ্রমিকরা প্রায়ই নিজেদের মধ্যে সহিংসতায় জড়ায় এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে বলে কর্তৃপক্ষের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিনিয়ত নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে চলা এই অপরাধ দমন এবং সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলার লক্ষ্যে দেশটির প্রেসিডেন্ট সিয়েরিল রামাপোসা এ বছর রাস্তায় সেনা মোতায়েন করে বছরব্যাপী বিশেষ অভিযান শুরু করেছেন। এর আগে ২০২৪ সালের শেষের দিকে পুলিশ বেষ্টিত একটি স্বর্ণখনিতে আটকে পড়ে ৮০ জনেরও বেশি অবৈধ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল। সূত্র: এবিসি নিউজ