দেশের ব্যাংকগুলো খেলাপি কমাতে ঋণ পুনঃতফসিল বাড়িয়েছে। গত বছর ব্যাংকগুলো ৯৮ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা দিয়েছে। এতে করে ব্যাংক খাতে গত বছর শেষে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা।
এর আগে, ২০২৪ সাল শেষে ব্যাংক খাতে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালে ১২ হাজার ৭৭১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়।
২০২২ সালে ৪৪ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা, ২০২৩ সালে ৭৫ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা, ২০২৪ সালে ৫৯ হাজার ৯২০ কোটি টাকা এবং ২০২৫ সালে করা হয় ৯৮ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংক খাতের পুনঃতফসিল ঋণের ৫৭ শতাংশ শীর্ষ ১০ ব্যাংকে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রতি বছরই খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করার পরিমাণ বাড়ছে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে খেলাপি ঋণ কম দেখাতে নানা রকম ছাড় দেওয়া হয়। বিশেষ করে ২০২২ সালের জুলাইয়ে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের পুরো ক্ষমতাই ব্যাংকগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর পর খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল অস্বাভাবিক গতিতে বাড়ছে। কারণ, ব্যাংকের পর্ষদই এখন খেলাপি ঋণ নবায়নের সিদ্ধান্ত দিতে পারছে।
আওয়ামী শাসনে গণমাধ্যম ও জুলাইয়ের চেতনাআওয়ামী শাসনে গণমাধ্যম ও জুলাইয়ের চেতনা
আবার রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা আসার কারণেও ঋণ নিয়মিত রাখতে পুনঃতফসিল সুবিধা দিতে বাধ্য হচ্ছে ব্যাংকগুলো। এছাড়া বিগত সরকারের সময়ে এ সংক্রান্ত নীতিমালাও শিথিল করা হয়। মাত্র আড়াই থেকে সাড়ে চার শতাংশ অর্থ জমা দিলেই ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ পেত।
তবে ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছে অথবা মার্কিন ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এমন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ সুযোগ দিতে নীতিমালায় পরিবর্তন আনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মাত্র দুই শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল বা নিয়মিত করার সুযোগ দেয়। এ ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর। ঋণ নিয়মিত হলে প্রথম দুই বছর ঋণ পরিশোধে বিরতি (গ্রেস পিরিয়ড) পাওয়া যায়।
প্রথম দফায় গত বছরের জুন পর্যন্ত যেসব গ্রাহক খেলাপি ছিলেন; তারাই এ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। পরে এ সময়সীমা ওই বছরের নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সর্ব শেষ গত মাসে জারি করা এক সার্কুলারের মাধ্যমে তা চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে।
জানা গেছে, নীতি-সহায়তার আওতায় এক হাজার ৫১৬টি আবেদনের বিপরীতে এক লাখ ৯৬ হাজার ৪৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের আবেদন আসে। এর মধ্যে ৩০০টি গ্রুপের ৯০০টি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো ২৫০টি ঋণ আবেদন বাস্তবায়ন করেছে। এর মাধ্যমে ২৬ হাজার ১১৪ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে।
পুনঃতফসিল ঋণের ৪০% খেলাপি
ব্যাংক খাতে যে পরিমাণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে, তার মধ্যে আবার খেলাপি হয়েছে ৩৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ ঋণ।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছর শেষে ব্যাংক খাতে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। এই ঋণের মধ্যে এক লাখ ৭৮ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা আবার খেলাপির খাতায় উঠেছে।
এর বাইরে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে ২ লাখ ৬৮ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা, যা মোট পুনঃতফসিলকৃত ঋণের ৬০ দশমিক ১৩ শতাংশ।
সবচেয়ে বেশি পুনঃতফসিল ঋণ যে খাতে
আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে দেখা যায়, উৎপাদনশীল খাতের উদ্যোক্তারা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ঋণ পুনঃতফসিল করেছেন।
২০২৫ সাল শেষে পুনঃতফসিলকৃত ঋণ স্থিতির মধ্যে ২৯ দশমিক ৫৬ শতাংশই ছিল শিল্প খাতের। দ্বিতীয় স্থানে ছিল বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাত, ১৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
এছাড়া পুনঃতফসিলকৃত ঋণের ১৩ দশমিক ০৫ শতাংশ চলতি মূলধন, আমদানিতে ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ, বাণিজ্যিক ঋণে ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ, ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ নির্মাণ, ৩ দশমিক ০১ শতাংশ কৃষি খাতে, জাহাজ নির্মাণে ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ অন্যান্য খাতে।
দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ ১০ লাখ কোটি টাকা
পুনঃতফসিলকৃত ঋণকে ‘স্ট্রেসড’ বা ‘দুর্দশাগ্রস্ত’ হিসেবে দেখায় আইএমএফ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
একই সময়ে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। আবার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আদায় অযোগ্য হওয়ায় ব্যাংকগুলো ৮৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করেছে। সব মিলিয়ে দেশের ব্যাংক খাতে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকার ঋণ এখন ঝুঁকিপূর্ণ বা দুর্দশাগ্রস্ত।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পূর্তির বছরে রিটেইল ডিপোজিটে ৫০ হাজার কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ব্যাংকটি জানিয়েছে, ৩০ জুন পর্যন্ত ব্র্যাক ব্যাংকের রিটেইল ডিপোজিটের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। ব্র্যাক কর্তৃপক্ষ বলছে, গত চার বছরে ব্যাংকটির রিটেইল ডিপোজিট প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। ২০২২ সালের জুনে ব্যাংকটির রিটেইল খাতে আমানত ছিল ১৭ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা, যা চার বছরের ব্যবধানে বেড়ে ৫০ হাজার ৩২৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। গত এক বছরে এটি বেড়েছে ৩৮ শতাংশ। দেশব্যাপী ব্র্যাক ব্যাংকের বিস্তৃত ব্রাঞ্চ ও সাব-ব্রাঞ্চ নেটওয়ার্ক এ সাফল্যে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে উল্লেখ করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, এছাড়াও ব্যাংকটির রিটেইল সেলস ও এজেন্ট ব্যাংকিং চ্যানেলও আমানত বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। ব্র্যাক ব্যাংকের এমন লক্ষণীয় মাইলফলক অর্জন সম্পর্কে ব্যাংকটির ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড হেড অব রিটেইল ব্যাংকিং মো. মাহীয়ুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পূর্তির বছরে রিটেইল ডিপোজিটে ৫০ হাজার কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের। আমাদের এ অর্জন ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণ এবং আরও বেশি মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার ধারাবাহিক প্রচেষ্টারই প্রতিফলন। গ্রাহকদের আস্থা এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত আমাদের সহকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টাই এই সাফল্যের মূল ভিত্তি।’ শক্তিশালী ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক, আধুনিক ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা, উদ্ভাবনী প্রোডাক্ট ও সার্ভিস এবং গ্রাহককেন্দ্রিক সেবার মাধ্যমে বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংক দেশের অন্যতম শীর্ষ রিটেইল ব্যাংক। প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পূর্তিতে ব্যাংকটি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণ, গ্রাহকদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে আলোচিত প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন নিয়ে আবারও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। নিজেদের নিয়োগ দেওয়া চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দিলেও প্রায় এক মাসে হতে চললেও নতুন পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠনের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই দীর্ঘসূত্রতায় দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। এদিকে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন, প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া এবং ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠাসহ সাত দফা দাবিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’। দাবি পূরণ না হলে আগামী ১৮ জুলাই রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। বোর্ড গঠনের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছে। তিনি বলেন, এত বড় একটি ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য বোর্ড অপরিহার্য। তবে এমন কোনো ব্যক্তি বা পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হোক, যাদের নিয়ে নতুন করে বিতর্ক বা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়—সেটি বাংলাদেশ ব্যাংক চায় না। তাই একটি যোগ্য, দক্ষ এবং তুলনামূলকভাবে বিতর্কমুক্ত বোর্ড গঠনের লক্ষ্যে কিছুটা সময় নেওয়া হচ্ছে। আরিফ হোসেন খান আরও বলেন, দেশের অন্যান্য ব্যাংকেও সময়ে সময়ে পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আসে। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার বিষয়টি যুক্ত থাকায় বিষয়টি ভিন্নভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গ্রাহক ও বিভিন্ন সংগঠনকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এমন কোনো কর্মসূচি দেওয়া উচিত নয়, যাতে সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। কারণ এতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আমানত উত্তোলন বেড়ে গেলে ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনও বোর্ড গঠনের বিষয়ে নিজের অজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। কালবেলাকে তিনি বলেন, আমাকে আপাতত একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমি শুধু সে দায়িত্বই পালন করছি। বোর্ড গঠন বা এ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। এসব বিষয়ে আমাদের মুখপাত্র কথা বলেছেন। দায়িত্ব থেকে কবে অব্যাহতি পেতে পারেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি নিজেও জানি না এই দায়িত্ব থেকে কবে মুক্তি পাব। আপাতত আমাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটিই পালন করছি। আন্দোলন জোরদারের সিদ্ধান্ত: সোমবার ইসলামী ব্যাংকের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক অধ্যাপক নুরনবী মানিক বলেন, পূর্বে ঘোষিত সাত দফা দাবির বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। তাই আন্দোলন আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ৯ জুলাই ইসলামী ব্যাংক টাওয়ার থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাব পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল হবে। ১৪ জুলাই দেশের প্রতিটি জেলা শহরে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান শাখার সামনে দুই ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচি পালিত হবে। এর পরও যদি পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন না হয়, তাহলে ১৮ জুলাই শাহবাগে সারা দেশের গ্রাহকদের অংশগ্রহণে জাতীয় মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। ওই সমাবেশ থেকেই পরবর্তী কর্মসূচিও ঘোষণা করা হবে। কালবেলাকে অধ্যাপক নুরনবী মানিক বলেন, তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য কোনো ব্যক্তি নয়; বরং একটি স্বচ্ছ, দক্ষ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিচালনা পর্ষদ নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, নতুন পরিচালনা পর্ষদে সৎ, যোগ্য, নিরপেক্ষ এবং ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিগত সরকারের সুবিধাভোগী কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে—এমন কাউকে বোর্ডে রাখা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি আমাদের নেই। বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন সম্পর্কে তাদের কোনো আপত্তি নেই বলেও জানান তিনি। তার ভাষায়, তিনি অস্থায়ী দায়িত্ব পালন করছেন। তার মাধ্যমেই দ্রুত একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য পরিচালনা পর্ষদ গঠন হবে বলে আমরা আশাবাদী। ‘ইসলামী ব্যাংকের সংকট গোটা অর্থনীতিতে পড়তে পারে’: এক মাসেও ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড গঠন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি ব্যাংকের সংকট নয়; এর প্রভাব গোটা অর্থনীতিতে পড়তে পারে। কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারি ব্যাংক। এক সময় বিশ্বের আর্থিকভাবে শক্তিশালী এক হাজার ব্যাংকের তালিকায় বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী ব্যাংক ছিল এটি। দেশে আসা মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৩০ শতাংশও এই ব্যাংকের মাধ্যমে আসে।’ অধ্যাপক শহিদুল ইসলামের মতে, বিগত সরকারের সময় ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের পর অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করেছিল। এরপর ব্যাংকটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। তারল্য, আমানত, রেমিট্যান্সসহ বিভিন্ন সূচকে উন্নতি আসে এবং গ্রাহকদের আস্থাও ফিরতে শুরু করে। কিন্তু নতুন করে পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সেই অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আমানতকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। তারা আমানত তুলে নিতে শুরু করলে তারল্য সংকট দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, পুরো দেশের অর্থনীতির ওপর পড়তে পারে। একই সঙ্গে আন্দোলনরত গ্রাহকদের সংযত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংককে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, একটি পেশাদার আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করাই দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে ভালো হবে।
নাহিদ রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। গত ৩০ জুন তিনি এ পদোন্নতি পান। নাহিদ সর্বশেষ দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লি. এর মহাব্যবস্থাপক (ফাইন্যান্স অ্যান্ড একাউন্টস) হিসেবে প্রেষণে কর্মরত ছিলেন। তিনি ১৯৯৯ সালে সহকারী পরিচালক পদে বাংলাদেশ ব্যাংকের জেনারেল সাইডে যোগদান করেন। তিনি সাউথইস্ট ব্যাংকে প্রবেশনারী অফিসার হিসেবে কর্মজীবন আরম্ভ করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ, ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট, হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট, বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমি, ক্রেডিট গ্যারান্টি ডিপার্টমেন্ট প্রভৃতি বিভাগে বিভিন্ন পদে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ থেকে এমকম (ফিন্যান্স) ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পেশাগত উৎকর্ষতার জন্য তিনি প্রেষণে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) থেকে এমবিএম ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া তিনি প্রেষণে জেডিএস স্কলারশিপ নিয়ে জাপানের রিৎসুমেইকান এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি (Ritsumeikan Asia Pacific University) থেকে ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্স বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি ইন্সটিটিউট অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের একজন ডিপ্লোমেইড অ্যাসোসিয়েট। তিনি ডিএফআই ও দি ফ্লেচার স্কুল এট টাফটস ইউনিভার্সিটি (The Fletcher School at Tufts University) কর্তৃক আয়োজিত সিডিএফপি (CDFP) বিষয়ে উচ্চতর পেশাগত সার্টিফিকেশন কোর্স সম্পন্ন করেন। ব্যাংকিং বিষয়ক পেশাগত জার্নালে তার বিভিন্ন গবেষণাপত্র ও আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছে। তিনি খুলনার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আতিকুর রহমান একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার এবং মাতা সেলিমা রহমান একজন গৃহিনী। তার স্বামী মো. আলমগীর বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) একজন প্রফেসর। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক কন্যা সন্তানের জননী।