দীর্ঘদিন ধরে আস্থাহীনতা, কারসাজি, দুর্বল সুশাসন এবং ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির সংকটে ভুগছে দেশের পুঁজিবাজার। এ অবস্থায় লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার সরকারি উদ্যোগকে বাজার-সংশ্লিষ্টরা সম্ভাবনাময় একটি নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, পরিকল্পনাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাজারে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে, বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি পাবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হবে।
সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুঁজিবাজার উন্নয়নে ১৭ দফা অগ্রাধিকার কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। এর অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হলো— লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বহুজাতিক কোম্পানিকে সরাসরি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা। একইসঙ্গে বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, কর-সুবিধা এবং বাজার সংস্কারের মতো পদক্ষেপও নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কোম্পানির তালিকাভুক্তি
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হলো উচ্চমানের ও বড় মূলধনের কোম্পানির স্বল্পতা। বর্তমানে তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের বাজার মূলধন তুলনামূলক ছোট এবং অনেক কোম্পানির আর্থিক ভিত্তিও দুর্বল। ফলে দেশীয় ও বিদেশি বড় বিনিয়োগকারীরা পর্যাপ্ত বিনিয়োগের সুযোগ পান না।
অপরদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত অনেক প্রতিষ্ঠান— বিশেষ করে জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, সার, টেলিযোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতের কয়েকটি কোম্পানি নিয়মিত মুনাফা করে, শক্তিশালী সম্পদভিত্তি রয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল আয় করে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ পুঁজিবাজারে এলে বাজারের মানগত পরিবর্তন ঘটতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ভালো কোম্পানি শুধু নতুন শেয়ারই যোগ করে না; বরং পুরো বাজারের মান ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দেয়।
এ প্রসঙ্গে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবু আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও অনেক আগেই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা উচিত ছিল। তবে বিলম্ব হলেও সরকারের এই উদ্যোগ দেশের পুঁজিবাজারকে গতিশীল করতে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’’
তিনি বলেন, ‘‘অতীতেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সময় লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে আনার পরিকল্পনা করা হলেও বিভিন্ন কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীকালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগ নেয়। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও লাভজনক সরকারি কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনার বিষয়ে আগ্রহী।’’
আবু আহমেদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ারবাজারে এলে বাজারের গভীরতা ও স্থিতিশীলতা বাড়বে, নতুন ও মানসম্মত শেয়ার যুক্ত হবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত হবে। তালিকাভুক্তির ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ পাবে— যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর সুযোগ
গত এক যুগে একাধিক শেয়ার কেলেঙ্কারি, মূল্য কারসাজি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নীতিগত অসামঞ্জস্যের কারণে লাখো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
লাভজনক সরকারি কোম্পানি বাজারে এলে বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলনামূলক কম ঝুঁকির নতুন বিকল্প তৈরি হবে। নিয়মিত লভ্যাংশ প্রদানকারী এবং আর্থিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়লে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, ভালো কোম্পানির সরবরাহ বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাজারের গভীরতা বাড়বে
বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে কয়েকটি খাতের আধিপত্য থাকলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতের প্রতিনিধিত্ব নেই। যদি কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি, নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কিংবা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশনের মতো বড় সরকারি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হয়, তাহলে বাজারে নতুন খাত যুক্ত হবে।
এর ফলে বাজার মূলধন বৃদ্ধি পাবে। প্রতিদিনের লেনদেন বাড়তে পারে। বড় দেশীয় ও বিদেশি তহবিল বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। সূচকের ওপর কয়েকটি কোম্পানির নির্ভরতা কমবে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ শক্তিশালী হবে।
সরকারেরও লাভ হবে
সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার আংশিক বিক্রি মানেই রাষ্ট্রীয় মালিকানা হারানো নয়। বরং সরকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেই সাধারণ জনগণকে অংশীদার হওয়ার সুযোগ দিতে পারে।
এতে সরকারের কয়েকটি সুবিধা হবে— রাষ্ট্রীয় সম্পদের মূল্যায়ন বাজারভিত্তিক হবে, বাজেটে অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান হবে, উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের নতুন উৎস তৈরি হবে এবং তালিকাভুক্তির কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বাড়বে।
পাশাপাশি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশ, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং শেয়ারহোল্ডারদের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়ায় করপোরেট সুশাসনও শক্তিশালী হবে।
বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে পারে
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত বড়, লাভজনক এবং স্বচ্ছ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন।
বাংলাদেশের বাজারে যদি রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস কিংবা অবকাঠামো খাতের বড় প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়, তাহলে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। একইসঙ্গে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্যও এটি ইতিবাচক বার্তা হতে পারে।
সরকার ইতোমধ্যে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার অফলোডের মাধ্যমে সরাসরি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে। এতে বাজারে আন্তর্জাতিক মানের কোম্পানির সংখ্যা বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।
শুধু তালিকাভুক্ত করলেই হবে না
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কোম্পানি বাজারে আনাই শেষ কথা নয়। এর সঙ্গে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রথমত, কোম্পানিগুলোর প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত করপোরেট পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ছোট শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর আইন প্রয়োগ করতে হবে। চতুর্থত, বাজার কারসাজি, অভ্যন্তরীণ তথ্যের অপব্যবহার এবং কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি কঠোরভাবে দমন করতে হবে। অন্যথায়, ভালো কোম্পানিও বাজারে এসে প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারবে না।
বর্তমান বাস্তবতা
বর্তমানে দেশের শেয়ারবাজারে সরকারি মালিকানাধীন প্রায় ২২টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। তবে এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানের লেনদেন সীমিত, কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থাও দুর্বল। অন্যদিকে তিতাস গ্যাস, পদ্মা অয়েল, যমুনা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরেই বিনিয়োগকারীদের কাছে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি হিসেবে পরিচিত।
সরকার এখন আরও কয়েকটি লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে বাজারে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি বাজার সংস্কার, কর-সুবিধা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি, ব্লকচেইন প্রযুক্তি, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এবং পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন গঠনের মতো উদ্যোগও বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে টেকসই ও আধুনিক করতে শুধু কারসাজি দমন করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ভালো মানের কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধি। লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে আনার উদ্যোগ সেই লক্ষ্য পূরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
তবে এই উদ্যোগের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। যদি স্বচ্ছতা, সুশাসন, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করপোরেট পরিচালনা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সরকারি লাভজনক কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা কাটিয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। অন্যথায় এটি কেবল আরেকটি ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে এখন ৩৭ হাজার ৩৪৮ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন বা ৩৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) এ তথ্য জানিয়েছেন তিনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০ আগস্ট পর্যন্ত দেশের গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৩৪৮ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন ডলার। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৫৩২ দশমিক ৮৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। গত ১৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশের গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩৭ হাজার ২৪৫ দশমিক ০৬ মিলিয়ন ডলার। আর বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল ৩২ হাজার ৪৩৮ দশমিক ৯০ মিলিয়ন ডলার। নিট রিজার্ভ গণনা করা হয় আইএমএফের বিপিএম-৬ পরিমাপ অনুসারে। মোট রিজার্ভ থেকে স্বল্পমেয়াদি দায় বিয়োগ করলে নিট বা প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ পাওয়া যায়।
চলতি আগস্টের প্রথম ১৭ দিনে দেশে ১৮৮ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২৩ হাজার ২১০ কোটি ১০ লাখ টাকা (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা)। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ১৭ আগস্ট একদিনেই দেশে ১ হাজার ২০৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার প্রবাসী আয় এসেছে। গত বছরের আগস্টের প্রথম ১৭ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৪২ কোটি ৪০ লাখ ডলার। সে হিসাবে চলতি বছরের একই সময়ে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৩২ দশমিক ৬০ শতাংশ। এদিকে, চলতি অর্থবছরের (১ জুলাই থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত) হিসাবেও রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এ সময়ে দেশে মোট ৪৭৪ কোটি ৬০ লাখ ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩৯০ কোটি ২০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে প্রবাসী আয় বেড়েছে ২১ দশমিক ৬০ শতাংশ।
সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার না করলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো নীতি সহায়তা বা প্রণোদনা পাওয়া যাবে না। এ বিষয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সোমবার (১৭ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্স কোম্পানি প্রবিধি ও নীতি বিভাগ এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার লেটার জারি করে দেশের সব ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়েছে। নির্দেশনাটি জারির সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়েছে। কেন এ সিদ্ধান্ত সার্কুলারে বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় পুনর্গঠন, আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে বিভিন্ন নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা কর্মসূচি চালু করেছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কিছু গ্রাহক একদিকে এসব নীতি সহায়তা গ্রহণ করছেন, অন্যদিকে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট ফাইন্যান্স কোম্পানির বিরুদ্ধে রিট পিটিশনসহ বিভিন্ন মামলা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে আর্থিক খাতে মামলাজট তৈরি হচ্ছে এবং নীতি সহায়তা বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। মামলা প্রত্যাহার করলেই আবেদন বিবেচনা নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো গ্রাহকের বিরুদ্ধে বা তার করা মামলা বিচারাধীন থাকলে সংশ্লিষ্ট নীতি সহায়তা বা প্রণোদনার আবেদন বিবেচনা করা হবে না। এ ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রথমে গ্রাহকের আবেদন পর্যালোচনা করবে। নীতিগতভাবে আবেদন গ্রহণযোগ্য হলে গ্রাহককে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট ফাইন্যান্স কোম্পানির বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা নিতে হবে। হলফনামা জমা বাধ্যতামূলক মামলা প্রত্যাহারের পর গ্রাহককে প্রত্যাহার করা মামলার তালিকাসহ একটি হলফনামা জমা দিতে হবে। ওই হলফনামায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে যে—“সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ফাইন্যান্স কোম্পানির বিরুদ্ধে দায়েরকৃত কোনো মামলা অনিষ্পন্ন নেই।” বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, হলফনামা পাওয়ার পর আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের জন্য আগে দেওয়া নীতিগত সম্মতির শর্ত পরিবর্তন করতে পারবে না। অর্থাৎ মামলা প্রত্যাহারের পর অনুমোদিত নীতি সহায়তা বা প্রণোদনা আগের শর্তেই কার্যকর করতে হবে। আইনি ভিত্তি বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২৩-এর ৪১ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে এবং এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের ফলে ভবিষ্যতে এনবিএফআই খাতের নীতি সহায়তা বা প্রণোদনা নিতে আগ্রহী গ্রাহকদের জন্য চলমান আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি করা একটি বাধ্যতামূলক পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।