সড়কের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আকাশছোঁয়া শতবর্ষী সাদা গর্জনগাছ। তাকে এড়িয়ে দুই পাশে বেঁকে গেছে পাকা রাস্তা। গাড়ি চলছে, মানুষও চলাচল করছে, কিন্তু কাটা পড়েনি সেই গাছ। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শিলখালী গর্জন বনের এই দৃশ্য এখন প্রকৃতি সংরক্ষণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের সহাবস্থানের এক বিরল উদাহরণ।
উন্নয়ন প্রকল্পের নামে দেশে বনভূমি উজাড়ের বহু নজির আছে। কিন্তু দেশের প্রাচীন গর্জন বন ও বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য টেকনাফের শিলখালী গর্জন বনের গল্প ভিন্ন। ২০১৩ সালের দিকে এই অভয়ারণ্যের ভেতর দিয়ে এক কিলোমিটারের একটু বেশি দৈর্ঘ্যের একটি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি)। এ কারণে বনের এসব গাছ কেটে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। বন বিভাগ ও স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত চাপে সড়কের জন্য গাছ নয়, গাছের জন্য সড়কের নকশা বদলাতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। ফলে টিকে যায় প্রাচীন বনটির গুরুত্বপূর্ণ এই গাছগুলো।
১৭ জুন সরেজমিনে দেখা যায়, কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়ক হয়ে ৫০ কিলোমিটার পথ গেলে বাহারছড়া ইউনিয়নের মিয়াপাড়া। এখান থেকে জাহাজপুরা পর্যন্ত সড়কের কয়েকটি অংশে এখনো রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশালাকৃতির গর্জন। গাছের ডালে ডালে পাখির কোলাহল, নিচে বহুস্তরবিশিষ্ট বনজ উদ্ভিদের সমাবেশ। বনবিদদের মতে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় চিরসবুজ বনের দীর্ঘকায় এসব গাছের বয়স ১০০ থেকে ২০০ বছরের মধ্যে।
যেভাবে রক্ষা পেল শতবর্ষী গাছ
২০১৩ সালে টেকনাফের বাহারছড়া মেরিন ড্রাইভের অংশ থেকে বাহারছড়া ফরেস্ট অফিস পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ মিটার (১ দশমিক ২ কিলোমিটার) সড়ক নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয় এলজিইডি। এ জন্য সংরক্ষিত বনের কয়েকটি গর্জনগাছ কেটে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এসব গাছ রক্ষায় স্থানীয় জনগণ জোট বাঁধেন, এগিয়ে আসে বন বিভাগও।
সে সময় টেকনাফ অঞ্চলে সহকারী বন সংরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন রেজাউল করিম চৌধুরী। বর্তমানে তিনি সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা।
সে সময়ের স্মৃতিচারণা করে রেজাউল করিম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সড়ক নির্মাণের সময় কিছু গর্জনগাছ কেটে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছিল এলজিইডি। যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, সড়কের মাঝখানে গাছ থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
রেজাউল করিম বলেন, ‘আমাদের অবস্থান ছিল—শতবর্ষী গর্জনগাছ কোনোভাবেই কাটা যাবে না। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও দাবি ছিল সড়ক হোক, কিন্তু গাছ কাটা যাবে না। শেষ পর্যন্ত গাছগুলো রেখেই সড়কটি নির্মাণ করা হয়। এখন এসব প্রাচীন গর্জনগাছ দেখতে নানা জায়গা থেকে মানুষ আসেন। এগুলো আমাদের অনন্য সম্পদ।’
বন কর্মকর্তা রেজাউল করিমের ভাষ্য, এখানে হাজারো গর্জনআছে। এর মধ্যে মা গাছের সংখ্যাও অনেক। বহু পাখি ও প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে এসব গাছ। অনেক গাছ থেকেই বীজ সংগ্রহ করে নতুন চারাও উৎপাদন করা হয়েছে।
এলজিইডির টেকনাফ উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মো. তৌহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সড়কটি হওয়ার কথা ছিল ১ দশমিক ২ কিলোমিটার। কিন্তু বন বিভাগের বাধার কারণে ৯০০ মিটার পর্যন্ত সড়ক করতে পেরেছি, বাকিটা করতে পারিনি। যতটুকু করেছি, গাছ বাঁচিয়ে করেছি।’
সড়ক চাই, গাছও চাই
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুরু থেকেই গাছ রক্ষার আন্দোলনে তাঁরাই ছিলেন প্রধান শক্তি। তাঁরা চেয়েছিলেন সড়ক হোক, কিন্তু গাছ কাটা যাবে না। সবগুলো গাছই রাখতে হবে।
বাহারছড়ার মিয়াপাড়া থেকে জাহাজপুরা এলাকায় এসব গাছ নিয়ে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে। তাঁরা বলেন, গাছগুলো টিকে আছে তিন প্রজন্ম বা তারও আগে থেকে। এসব গাছের কথা তাঁরা বাবা ও দাদার কাছে শুনেছেন। গাছ রক্ষার দায়িত্ব পরবর্তী প্রজন্মের হাতে দিয়ে যেতে চান তাঁরা।
মিয়াপাড়ার ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা মো. জালাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০১৩ সালের দিকে এসব গাছ কেটে ফেলতে চেয়েছিল এলজিইডি। বন বিভাগ ও আমরা মিলে বাধা দিয়েছি। এ সম্পদ কেউ তো তৈরি করতে পারব না, তাহলে কাটতে দেব কেন? এসব গাছের কথা আমি বাবা ও দাদার কাছ থেকে শুনেছি। তাই চাই, আমার পরের প্রজন্মও যেন এসব গাছ দেখে রাখে।’
জালালের দাবি, এলাকাটিতে ২৫০ বছর বয়সী গর্জনগাছও থাকতে পারে। এখনো মাঝেমধ্যে গভীর রাতে কাঠচোরেরা বনে প্রবেশের চেষ্টা করেন। খবর পেলে গ্রামবাসী একসঙ্গে প্রতিরোধ করেন।
জাহাজপুরা এলাকার মাহমুদুর রহমান বুলু প্রথম আলোকে বলেন, পাশের ইউনিয়নের লোকজন আর্থিকভাবে দুর্বল হওয়ায় অনেকে এসব গাছ কাটার চেষ্টা করেন। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের বাধার কারণে তাঁরা গাছ কাটতে পারেন না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. কামাল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, শিলখালীর গর্জনগাছগুলোর গড় বয়স ১৫০ বছরের বেশি। এর চেয়ে বেশি বয়সী গাছও থাকতে পারে। এগুলো ঐতিহ্যবাহী গাছ, যা স্থানীয় ইতিহাসকে ধারণ করে আছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
কামাল হোসাইন বলেন, গাছ বাঁচিয়ে সড়কটি হয়েছে, তবে সবচেয়ে ভালো হতো যদি বনের মধ্য দিয়ে সড়কটি না হয়ে বিকল্প কোনো পথে হতো। সদিচ্ছা আর জনসচেতনতা থাকলে গাছ রেখে যে সড়ক করা যায়, এটি তার উদাহরণ।
গাছের শত্রু কাঠচোর
বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, মাছ ধরার ট্রলার তৈরিতে গর্জন কাঠের চাহিদা বেশি। তাঁর সময়ে কাঠচোরেরা গভীর রাতে গাছের গোড়ায় ধীরে ধীরে কুঠার চালাতেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে তাঁরা এভাবে শতবর্ষী গাছ কেটে ফেলতেন। বন বিভাগ পড়ে যাওয়া এ ধরনের গাছ নিলামে তুললে কৌশলে তাঁরা নিলামে অংশ নিয়ে গাছগুলো কিনে নিতেন।
এ ছাড়া এসব গাছের বিশালত্বের কারণে কাটলেও গাছ চুরি করে বন থেকে সরানো কঠিন। তাই নিলামে অংশ নিয়ে তাঁরা গাছগুলো বন থেকে নিয়ে যেতেন বলে জানিয়েছেন এই বন কর্মকর্তা।
রেজাউল করিমের ভাষ্য, গর্জনগাছকে ৯ ফুট করে ৩ খণ্ডে কেটে ২৭ ফুটের পাটাতন তৈরি করে ট্রলার বানানো যায়। ট্রলার নির্মাণকারীদের কাছে তাই এ গাছের চাহিদা বেশি। এ কারণে ২০১৩ সালের পর বন বিভাগ পড়ে যাওয়া গর্জনগাছের নিলাম বন্ধ করে দেয়। এতে চোরদের উৎপাত কিছুটা কমে আসে।
সাদা গর্জনের আশ্রয়স্থল শিলখালী
শিলখালী গর্জন বন কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের অধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল। বন বিভাগের সাম্প্রতিক জরিপে কক্সবাজার জেলায় ৫ হাজার ৫২০টি মা গর্জনগাছ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৩০৬টি রয়েছে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগ এলাকায়, যার বড় অংশের অবস্থান শিলখালী গর্জন বনে। আর এসব গর্জনগাছের মধ্যে সাদা গর্জনের আধিক্য বেশি দেখা গেছে।
অধ্যাপক মো. কামাল হোসাইন বলেন, শিলখালীর গর্জন বনটি প্রাকৃতিক ও প্ল্যান্টেশন (চারা রোপণ) দুটোই হতে পারে। সাদা গর্জন অনেক উঁচু হয়, এর শরীর মসৃণ এবং গায়ের রং হয় ছাই রঙের। মূলত কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে এ ধরনের গাছ বেশি হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম ডিপটেরোকার্পাস।
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের শিলখালী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. তহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বন রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে সহব্যবস্থাপনা কমিটি (সিএমসি) গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটির মাধ্যমে বন পাহারা ও সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
‘আমার বাবা কৃষক ছিলেন। এই সমাজে ডাক্তারের ছেলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারের ছেলে ইঞ্জিনিয়ার, কৃষকের ছেলে কৃষক হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কৃষকের ছেলে এমপি (সংসদ সদস্য) হবে, এটা স্বপ্নেও ভাবিনি।’ ময়মনসিংহে আয়োজিত ‘পার্টনার কংগ্রেস ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে আবেগজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলেন ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ। নিজের পারিবারিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আবু ওয়াহাব বলেন, ‘আমার বাবা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। কিন্তু তিনি তাঁর সন্তানদের অনেক দূর পর্যন্ত পড়ালেখা করিয়েছেন। এই জীবনে আমার আর পাওয়ার কিছু নেই।’ স্বচ্ছতার ওপর জোর দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমি কোনো কাজে পার্সেন্টেজ নিই না, কাউকে নিতেও দেব না। আমি কাজের কোয়ালিটি নিশ্চিত করতে চাই। প্রধানমন্ত্রী আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন সবার কল্যাণে কাজ করার জন্য।’ আজ শনিবার দুপুরে সদর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আয়োজনে ‘পার্টনার কংগ্রেস ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জুবায়রা বেগম সাথী বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো সাধারণ কৃষকদের দোরগোড়ায় আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া। নিরাপদ কৃষিপণ্য উৎপাদন এবং সবজি চাষে প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে আমরা কেবল স্থানীয় চাহিদাই পূরণ করছি না, বরং কৃষকদের বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনে দক্ষ করে তুলছি।’ কংগ্রেসের অংশ হিসেবে ‘পার্টনার অ্যাক্টিভিটি ও ভিশন ডিসপ্লে’ এবং ‘প্ল্যান্ট ডক্টরস ক্লিনিক’ প্রদর্শনীতে নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা, গ্যাপ (উত্তম কৃষিচর্চা), এবং রপ্তানিমুখী কৃষি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এ ছাড়া স্মার্ট কৃষির অংশ হিসেবে ড্রোনপ্রযুক্তির ব্যবহার, এআই মডেলের মাধ্যমে ফলন পূর্বাভাসের বিষয়ে আলোচনা হয়। রোবোটিক হার্ভেস্টিংয়ের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রদর্শনী উপস্থিত কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিক আহমদ খান এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামারবাড়ির উপপরিচালক মো. এনামুল হক। সভায় সভাপতিত্ব করেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে শতাধিক কৃষক ও স্টেকহোল্ডার উপস্থিত ছিলেন। পরে কৃষকদের মাঝে কৃষি উপকরণ বিতরণ করেন সংসদ সদস্য।
চলতি বছরের আগস্টে ঢাকা–পাবনা সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু হবে বলে জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি জানান, একই সময়ে আরও একটি রুটে নতুন ট্রেন সেবা চালুর প্রস্তুতি চলছে। শনিবার (২০ জুন) দুপুরে পাবনা সার্কিট হাউজে জেলা প্রশাসন ও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব তথ্য জানান। রেলমন্ত্রী বলেন, প্রথম ধাপে ঢাকা–পাবনা সরাসরি ট্রেন চালু করা হবে, এরপর ঢাকা–খুলনা রুটে সরাসরি ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি জানান, ইতোমধ্যে লোকোমোটিভ প্রস্তুত রয়েছে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে নতুন কোচ যুক্ত হবে। তিনি আরও বলেন, দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে সরকার কাজ করছে এবং ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক মানের মাল্টি-মোডাল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। কাজিরহাট ফেরিঘাট স্থানান্তর ও উন্নয়ন পরিকল্পনা কাজিরহাট ফেরিঘাট স্থানান্তর প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রাথমিক কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) প্রণয়ন সম্পন্ন হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আশ্বাসও দেন তিনি। পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে মালিক–শ্রমিকদের সমন্বয়ে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন রেলমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণিকে প্রাধান্য না দিয়ে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পাবনার বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
ঢাকার সাভারের জামসিং জয়পাড়া এলাকায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান একটি উন্নয়ন প্রকল্পের নামে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে চাঁদা তোলার অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, পৌরসভার প্রকৌশলীদের টাকা দেওয়ার কথা বলে শতাধিক পরিবারের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা এবং টাকা ফেরতের দাবি তুলেছেন। সাভার পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, কোভিড-১৯ প্রতিক্রিয়া ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের (এলজিসিআরআরপি) আওতায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে জয়পাড়া মহল্লায় দুটি উন্নয়নকাজ চলছে। এর মধ্যে ১ কোটি ৪৮ লাখ ৬০ হাজার ৭০০ টাকা ব্যয়ে ৮০০ মিটার ইউনিব্লক সড়ক এবং ৬৮ লাখ ৯৭ হাজার ৫৪০ টাকা ব্যয়ে ৩৫০ মিটার আরসিসি ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও এলাকার কিছু ব্যক্তি প্রচার করেন, পৌরসভার প্রকৌশলীদের অতিরিক্ত টাকা না দিলে ড্রেন নির্মাণকাজ হবে না। এজন্য জয়পাড়া মহল্লার বাইতুল মামুর কেরামাতীয়া জামে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে এলাকাবাসীর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। তবে প্রকল্পটি শতভাগ বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং এজন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের কোনও অর্থ দেওয়ার প্রয়োজন নেই—এ তথ্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এরপর টাকা দেওয়া ব্যক্তিরা তাদের অর্থ ফেরত দাবি করতে শুরু করেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, মসজিদের সেক্রেটারি খন্দকার ফরহাদ হোসেন, কোষাধ্যক্ষ হাজি মো. শামসুদ্দিন, তার ছেলে মোহাম্মদ হাসান প্রিন্স এবং স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিন ও মাসুমসহ কয়েকজন মিলে অর্থ সংগ্রহ করেন। তাদের দাবি, বাড়ির অবস্থান ও সামর্থ্য অনুযায়ী ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। এভাবে কয়েক লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। মসজিদের ইমাম নাজির আহমেদ বলেন, ‘হাজি মো. শামসুদ্দিন ও খন্দকার ফরহাদ হোসেন আমাকে মাইকিং করতে বলেছিলেন। পরে আমি মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়েছি।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল, টাকা না দিলে বাড়ির সামনে ড্রেন হবে না। সরল বিশ্বাসে ধারদেনা করে টাকা দিয়েছি। এখন জানতে পারছি, প্রকল্পটি পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে হচ্ছে। আল্লাহর ঘর মসজিদের মাইক ব্যবহার করে এভাবে আমাদের সাথে প্রতারণা করা হবে তা ভাবতেও পারিনি। আমরা এর বিচার ও টাকা ফেরত চাই।’ আরেক বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘রাস্তাঘাট ও ড্রেনের জন্য খরচ লাগবে বলে আমাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। আমি নিজেও ১০ হাজার টাকা দিয়েছি। বাড়ির সামনে দিয়ে ড্রেন নিতে হলে টাকা লাগবে—এই বলে এলাকার হাজী শামসুদ্দিনসহ অনেকেই টাকা তুলেছেন।’ স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য, গৃহবধূ মুন্নি আক্তার ২০ হাজার টাকা, আকলিমা আক্তার ৩০ হাজার টাকা, স্কুলশিক্ষিকা নাসিমা আক্তার ২৫ হাজার টাকা এবং আব্দুল আলী ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, বাড়ির সামনে ড্রেন নির্মাণের কথা বলে এসব টাকা নেওয়া হয়েছে। তারা বলছেন, তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে সরকারিভাবে রাস্তা হবে কিন্তু ড্রেন হবে না—ড্রেন করতে হলে পৌরসভার ইঞ্জিনিয়ারদের টাকা দিতে হবে বলে জানানো হয়েছিল। এখন জানা যাচ্ছে, প্রকল্পটি পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, তাদের কাছ থেকে নেওয়া টাকা কোথায় গেছে। রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণের তদারকির দায়িত্বে থাকা সাভার পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) তৌফিক ইমাম রূপক বলেন, ‘জয়পাড়া মহল্লার সালাউদ্দিনের বাড়ির কাছ থেকে মানিক মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত ৮০০ মিটার সড়ক নির্মাণ করছে সোয়েব কনস্ট্রাকশন নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। আর হানিফ মিয়ার বাড়ি থেকে রাসেলের বাড়ি পর্যন্ত ৩৫০ মিটার আরসিসি ড্রেন নির্মাণের কাজ করছে ইমরান বিল্ডার্স।’ তিনি জানান, পুরো প্রকল্প বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে হচ্ছে। ড্রেন নির্মাণের কথা বলে এলাকার কিছু লোকজন বাড়িওয়ালাদের কাছ থেকে টাকা তুলেছে—এ বিষয়টি তিনি শুনেছেন। তবে এলাকাবাসী থেকে টাকা তুলে কাজ করার কোনও সুযোগ নেই, যারা টাকা তুলেছে তারা অপরাধ করেছে। সাভার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) মোহাম্মদ আলম মিয়া বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এলজিসিআরআরপি প্রকল্পের কাজে কোনও নাগরিক বা স্থানীয়দের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। প্রকৌশলীদের নাম ভাঙিয়ে যারা টাকা তুলেছে, তারা অপরাধ করেছে। পৌরসভা এই অনিয়মের দায় নেবে না।’ অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত খন্দকার ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে কথা বললে তিনি কোনও জবাব দেননি। আর হাজি মো. শামসুদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে শামসুদ্দীনের ছেলে মোহাম্মদ হাসান প্রিন্স ও জসিম উদ্দিন টাকা তোলার কথা স্বীকার করে বলেন, ড্রেন করার জন্য টাকা তুলেছেন তারা। তাদের দাবি, টাকা পৌরসভার ইঞ্জিনিয়ার অফিসে দেওয়ার পরই ড্রেনের কাজ হচ্ছে। তবে কার কাছে টাকা দেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে তারা কিছু বলতে পারেননি। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তারা কোনো উত্তর না দিয়ে দ্রুত সরে যান। স্থানীয় বাসিন্দা মো. আজাদ বলেন, ‘এলাকার মানুষ সরল-সোজা। তাদের ভুল তথ্য দিয়ে টাকা নেওয়া হয়েছে। অনেকেই জানতেন না যে রাস্তা ও ড্রেনের কাজ সরকারি অর্থায়নে হচ্ছে।’ এ বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এলাকাবাসীর কাছ থেকে টাকা তুলে রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণের কথা বলে একটি প্রতারক চক্র কার্যক্রম চালিয়েছে। তারা বলেছে রাস্তা হবে আরসিসি, কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে ইউনিব্লক সড়ক। ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’