সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আবদিরহমান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ‘সিরো’র ইসরায়েল সফরকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইসরায়েল প্রথমবারের মতো সোমালিল্যান্ডের কোনও নেতাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বাগত জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগের পেছনে শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্বও বড় ভূমিকা রাখছে।
গত রবিবার জেরুজালেমে পৌঁছান সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ। এটি ছিল কোনও সোমালিল্যান্ড নেতার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর, যা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে আবদুল্লাহ বলেন, আমি সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে এসেছি। ৩৫ বছর ধরে আমরা বিশ্বকে আমাদের স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছি। ইসরায়েল এবং আপনি নিজে প্রথম আমাদের দেখেছেন ও স্বীকৃতি দিয়েছেন।
নেতানিয়াহু এই স্বীকৃতিকে ইহুদি ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, আমরাও একটি ছোট জনগোষ্ঠী হিসেবে বিশ্বের কাছে নিজেদের অধিকারের স্বীকৃতি চেয়েছিলাম। তাই আপনাদের প্রতি আমাদের স্বাভাবিক সহানুভূতি রয়েছে।
কূটনৈতিক সম্পর্ক থেকে কৌশলগত অংশীদারত্ব
সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে একটি কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ইসরায়েল ও সোমালিল্যান্ড জানিয়েছে, এই সম্পর্ক নিরাপত্তা, বাণিজ্য, কৃষি, স্বাস্থ্য ও আঞ্চলিক কৌশলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হতে পারে।
আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে অবস্থিত সোমালিল্যান্ড ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি ইয়েমেনের বিপরীতে এডেন উপসাগরের তীরে অবস্থিত এবং লোহিত সাগর হয়ে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথের কাছে অবস্থান করছে।
নেতানিয়াহুও বৈঠকে উল্লেখ করেন, সোমালিল্যান্ডের অবস্থান বাব আল-মান্দাব প্রণালীর কাছে, যা লোহিত সাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য এই জলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইসরায়েলের জন্য এই অঞ্চল আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ গত দুই বছর ধরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘাত এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বাধার ঘটনা দেশটির নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে জল্পনা
সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের সবচেয়ে আলোচিত দিক হচ্ছে নিরাপত্তা সহযোগিতা। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার গত জানুয়ারিতে সোমালিল্যান্ড সফরের সময় বলেছিলেন, দুই দেশ একটি ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দিকে এগোচ্ছে।
সোমালিয়ার কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েল ইয়েমেনের হুথিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অভিযানের জন্য সোমালিল্যান্ডে সামরিক স্থাপনা তৈরি করতে আগ্রহী। তবে সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনও অবস্থান জানাননি।
সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আবদুররহমান আবদুল্লাহ ইসরায়েলি গণমাধ্যম আই২৪-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বর্তমানে কোনও সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা নেই। তবে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমি তা পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারছি না।
এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সোমালিল্যান্ডের বৃহত্তম উপকূলীয় শহর বারবেরা। এডেন উপসাগরের তীরে অবস্থিত এই শহরের বিমানবন্দর আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন নির্মাণ করেছিল এবং পরে নাসা ব্যবহার করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এটি সামরিক ব্যবহারের উপযোগী করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেন, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ‘গোপনে বিভিন্ন কার্যক্রমে’ সহযোগিতা রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক আরও উচ্চ পর্যায়ে যাবে।
সোমালিয়ার উদ্বেগ
সোমালিয়া ইসরায়েল-সোমালিল্যান্ড সম্পর্ক নিয়ে তীব্র উদ্বেগ জানিয়েছে। সোমালিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী ওমর বলেন, তাদের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো- সোমালিল্যান্ড যেন ইসরায়েলের আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ে।
তিনি বলেন, এই ধরনের হস্তক্ষেপ এমন একটি অঞ্চলে নতুন সংঘাত নিয়ে আসতে পারে, যা ইতোমধ্যেই অনেক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
সোমালিয়া জানিয়েছে, তারা সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে সংলাপের জন্য সবসময় প্রস্তুত, তবে দেশের অখণ্ডতার প্রশ্নে কোনও আপস করবে না।
১৯৯১ সালে সোমালিয়ায় গৃহযুদ্ধের পর সোমালিল্যান্ড নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। তবে এখন পর্যন্ত অধিকাংশ দেশ এটিকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ইসরায়েলের স্বীকৃতির ফলে দীর্ঘদিনের এই বিরোধ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।
জেরুজালেমে দূতাবাস খোলা নিয়ে বিতর্ক
সফরের সময় সোমালিল্যান্ড জেরুজালেমে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের দূতাবাস চালু করে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার।
বেশিরভাগ দেশ জেরুজালেমের মর্যাদা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিরোধের কারণে তাদের দূতাবাস তেল আবিবে রাখে। ইসরায়েলের পুরো জেরুজালেমের ওপর সার্বভৌমত্বের দাবিও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক স্বীকৃতি পায়নি।
সোমালিল্যান্ডের এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিন, আরব লীগ, ইসলামি সহযোগিতা সংস্থাসহ (ওআইসি) কয়েকটি দেশ ও সংগঠন।
ইসরায়েলের লক্ষ্য লোহিত সাগর?
দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষক মোসেস ক্রিসপাস ওকেলো বলেন, ইসরায়েলের আসল লক্ষ্য শুধু সোমালিল্যান্ড নয়, বরং লোহিত সাগর।
তার মতে, ইসরায়েল বর্তমানে আঞ্চলিকভাবে আরও বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়েছে। তাই সোমালিল্যান্ডের মতো একটি কৌশলগত অবস্থানের অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
সোমালিল্যান্ডেও শুরু হয়েছে বিতর্ক
ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সিদ্ধান্ত সোমালিল্যান্ডে ব্যাপক সমর্থন পেলেও বিরোধিতাও তৈরি হয়েছে।
সোমালিল্যান্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট মুসে বিহি আবদি সরকারকে ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, সোমালিল্যান্ডকে কোনও আঞ্চলিক সামরিক সংঘাতে ব্যবহার করা হতে পারে।
তিনি বলেন, আমাদের সংবিধান এমন কোনও পদক্ষেপ অনুমোদন করে না, যা মুসলিম জনগণের ক্ষতি করে বা ধর্মীয় মূল্যবোধের বিরুদ্ধে যায়।
দেশটির ইসলামি আলেমদের মধ্যেও এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছেন, আবার কেউ কঠোর সমালোচনা করছেন।
আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া
সোমালিল্যান্ড আশা করেছিল, ইসরায়েলের পর আরও কয়েকটি দেশ তাদের স্বীকৃতি দেবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য কোনও দেশ এখনও সে পথে হাঁটেনি।
সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর, আফ্রিকান ইউনিয়ন, ওআইসি ও আরব লীগ ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ইয়েমেনের হুথিরা সবচেয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলিরা উপস্থিতি হলে সেটিকে তারা ‘সামরিক লক্ষ্য’ হিসেবে বিবেচনা করবে।
তবে সোমালিল্যান্ডের নেতারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের লক্ষ্যে তারা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেন, “এই সম্পর্ক দুই পক্ষকেই কিছু সুবিধা দেবে, তবে এটি তাদের মূল সমস্যার সমাধান করবে না। ইসরায়েল ফিলিস্তিন ইস্যু এড়িয়ে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে, আর সোমালিল্যান্ডও এই সম্পর্ক থেকে অনেক বেশি প্রত্যাশা করছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার আবহে বিশ্ব যখন নতুন সংকট সমাধানের অপেক্ষায়, তখন নেপথ্যে থেকে সবচেয়ে বড় কৌশলগত জয় তুলে নিল চীন। কোনো ধরনের সামরিক সংঘাতে না জড়িয়ে কিংবা সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেই বেইজিং যেভাবে এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নিজেদের আধিপত্য সুসংহত করেছে, তা এখন বিশ্বমঞ্চে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোরকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগগুলো চীনের এই অঘোষিত বিজয়েরই প্রতিফলন। মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি কেবল যুদ্ধের অবসান নয় বরং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করার একটি বড় পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) তথ্যমতে, বিশ্ব বাণিজ্যের বিশাল এক অংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা এশীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত। গত কয়েক বছরের সংঘাতে এই পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতির যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা চীনসহ বড় আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ ছিল। বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মূল ভিত্তি ছিল এই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যেখানে তারা সামরিক শক্তি প্রদর্শনের চেয়ে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং কৌশলগত বিনিয়োগকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। গত এক দশকে বেইজিং মধ্যপ্রাচ্যে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও লজিস্টিক করিডোরে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। সৌদি আরব ও ইরানের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখা এবং আঞ্চলিক শান্তি ফেরাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখা চীনের সেই দূরদর্শী কৌশলেরই অংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন সামরিক লক্ষ্য নিয়ে ব্যস্ত ছিল, চীন তখন বিনিয়োগ ও কূটনীতির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে এমন এক অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করেছে, যা এখন তাদের জন্য বড় ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা বয়ে আনছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বর্তমান সমঝোতার পেছনে থাকা বিশাল পুনর্গঠন তহবিল এবং বাণিজ্য পুনর্স্থাপনের সুযোগটি চীনকেই দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা দেবে। হরমোজ প্রণালীতে স্থিতিশীলতা ফিরে এলে জাহাজ ভাড়া ও বীমার খরচ কমবে, যা এশিয়ার সাপ্লাই চেইনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক সংঘাতের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি যে ঝুঁকির মুখে পড়েছিল, তা থেকে উত্তরণের পথ তৈরির মাধ্যমে চীন কার্যত প্রমাণিত করেছে যে, আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে কেবল যুদ্ধ নয়, বরং অর্থনৈতিক সংযোগ এবং কৌশলগত দূরদর্শিতাই চূড়ান্ত বিজয়ের চাবিকাঠি। এই সমঝোতা স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা না দিলেও, এটি স্পষ্ট যে হরমোজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লড়াইয়ে বেইজিং নিজের অবস্থানকে আরও শক্ত করেছে। ওয়াশিংটন হয়তো যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে রাজনৈতিক সাফল্য দেখানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পর্দার আড়ালে থেকে চীন যেভাবে তাদের জ্বালানি সরবরাহ ও আঞ্চলিক প্রভাব সুনিশ্চিত করেছে, তা ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের আরও শক্তিশালী অবস্থানের জানান দিচ্ছে। যুদ্ধের গোলাবারুদ খরচ না করেও কেবল কূটনীতি ও অর্থনীতির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে চীন আজ এক অঘোষিত বিশ্বজয়ী হিসেবে নিজেদের আবির্ভূত করেছে। সূত্র: এশিয়া টাইমস
ইসরাইলের সঙ্গে তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণার পর থেকে গত আট মাসেরও বেশি সময় ধরে গাজায় প্রতিদিন গড়ে একটি করে ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। অবরুদ্ধ এই উপত্যকায় ইসরাইলি বাহিনীর ক্রমাগত হামলার মুখে এই যুদ্ধবিরতিকে একটি ‘নিষ্ঠুর এবং মারাত্মক বিভ্রম’ হিসেবে বর্ণনা করেছে সংস্থাটি। ইউনিসেফ শুক্রবার (১৯ জুন) এক বিবৃতিতে জানায়, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে বৈরিতা অবসানের (যুদ্ধবিরতি) ঘোষণার পর থেকে ইসরাইলি বাহিনী অন্তত ২৬৫ জন ফিলিস্তিনি শিশুকে হত্যা করেছে। জেনেভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার বলেন, ‘যে সময়টি সংযম এবং সুরক্ষার জন্য নির্ধারিত ছিল, সেই সময়েও আট মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রতিদিন গড়ে একটি করে শিশু নিহত হয়েছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, এই ক্রমাগত শিশু মৃত্যু প্রমাণ করে যে, এই যুদ্ধবিরতি কতটা ফাঁপা এবং এটি ফিলিস্তিনি শিশুদের ইসরাইলি হামলা থেকে রক্ষা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এল্ডার বলেন, ‘বিশ্ব যখন যুদ্ধবিরতির ভাষা নিয়ে কথা বলছে, তখন গাজার পরিবারগুলো তাদের ছেলে-মেয়েদের দাফন করতে বাধ্য হচ্ছে।’ ইউনিসেফের মুখপাত্র জানান, শিশুরা তাদের বাড়ি, স্কুল এবং খেলার মাঠের মতো পাবলিক স্পেসেও নিরাপদ নয়। ফুটবল খেলার সময় কিংবা মাছ ধরার সময়ও তারা হামলার শিকার হচ্ছে। চলতি সপ্তাহের কয়েকটি মর্মান্তিক ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে এক ২ বছর বয়সি শিশু নিহত হয়েছে। নিজের তাঁবুর ভেতরে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে এক ১৩ বছর বয়সি কিশোর। ইসরাইলি বিমান হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন এক ৫ বছরের শিশু এবং তার বাবা। এল্ডার জানান, শুধু মৃত্যুই নয়, অক্টোবরের পর থেকে ৪০০-রও বেশি শিশু গুরুতরভাবে আহত হয়েছে, যাদের অনেকের আঘাতই অত্যন্ত মারাত্মক ও চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো। ইসরাইলের দখলদারিত্বের তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ (হলুদ রেখা) এবং ‘অরেঞ্জ লাইন’ (কমলা রেখা) সীমানার ক্রমাগত সম্প্রসারণের দিকে ইঙ্গিত করে এল্ডার বলেন, ‘অরেঞ্জ লাইনের কাছাকাছি একটু জোরে হাঁচি দিলেও আপনাকে গুলিবিদ্ধ হওয়া লাগতে পারে।’ তিনি সাম্প্রতিক আরও দুটি ঘটনার উদাহরণ টেনে বলেন, তাঁবুর ভেতরে থাকা অবস্থায় এক ১২ বছর বয়সি শিশুর বুকে গুলি করেছে ইসরাইলি বাহিনী। এমনকি ঘরের ভেতরে থাকা অবস্থায় একটি কোয়াডকপ্টার ড্রোন থেকে তাদের ছোঁড়া গুলিতে ৩ বছর বয়সি এক শিশুর মুখমণ্ডল ঝাঁঝরা হয়ে যায়। এল্ডার সতর্ক করে বলেন, শত শত শিশুর জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে স্থানান্তর করা প্রয়োজন। কিন্তু ইসরাইল কর্তৃক প্রয়োজনীয় ওষুধের ওপর কঠোর বিধিনিষেধের কারণে আহত শিশুদের ক্ষতস্থানে সংক্রমণ এবং অঙ্গচ্ছেদের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। মানবাধিকার কর্মীরা জানিয়েছেন, ইসরাইলি অবরোধ এবং সামরিক বিধিনিষেধের কারণে গাজার শিশুরা একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মধ্যে আটকা পড়েছে। কয়েক মাসের বোমাবর্ষণ এবং অবরোধের পর হাসপাতালগুলো ওষুধ, জ্বালানি, কর্মী এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকটে ভুগছে। গাজার শিশুদের ওপর মানসিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে এল্ডারের ভাষ্য, ‘গাজার শিশুদের জন্য ভয়, ক্ষতি এবং সহিংসতা এতটাই নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, ট্রমা বা মানসিক আঘাত এখন আর তাদের জীবনের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি তাদের শৈশবের পরতে পরতে মিশে গেছে।’ তিনি আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি দায়বদ্ধ সমস্ত সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো যুদ্ধবিরতিকেই অর্থপূর্ণ বলা যায় না যদি সেখানে প্রতিনিয়ত শিশু হত্যা চলতে থাকে। এল্ডার লেবাননের পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে গত ২ মার্চ থেকে সহিংসতা বৃদ্ধির পর ইউনিসেফের তথ্যমতে ২৪৭ জন শিশু নিহত এবং ৯৯২ জন শিশু আহত হয়েছে। এদিকে, গাজার ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৭৩,০১৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১৭৩,২৭৩ জন আহত হয়েছেন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ১১ অক্টোবর ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পর থেকেই ইসরাইলি হামলায় ১,০০৭ জন নিহত এবং ৩,১৬৫ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া উদ্ধারকারী দলগুলো ইতোপূর্বে দুর্গম এলাকাগুলো থেকে আরও ৭৮৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে। সূত্র: আলজাজিরা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে শান্তি আলোচনার প্রথম ধাপ শুরু হচ্ছে সুইজারল্যান্ডে। এ আলোচনায় অংশ নিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ দেশটিতে সফর করছেন। প্রথমে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তাঁর সফর স্থগিত করা হয়। ফলে আলোচনার নেতৃত্বে থাকছেন উইটকফ। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, উইটকফ ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে প্রথম দফার আলোচনায় অংশ নিতে সুইজারল্যান্ডে গেছেন। এই আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এদিকে লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার খবর আলোচনার পরিবেশ কিছুটা সহজ করেছে। এর আগে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং পাল্টা সহিংসতার কারণে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ইরানের পক্ষ থেকে সমঝোতার অন্যতম শর্ত ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সব ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধ রাখা। বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনায় প্রাথমিক বাধা কিছুটা দূর হয়েছে। এর আগে লেবাননে সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় আলোচনায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। সেই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়। পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা করে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে চাপ দিয়েছেন। স্থানীয় সময় গতকাল বিকেল থেকে লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে বলে জানা গেছে। রয়টার্সের বরাতে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতায় এবং ইরানের সহায়তায় এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও কিছু এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত বুধবার একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর হয়, যার ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক চুক্তির আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক অবকাশকেন্দ্রে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপ এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা এই কূটনৈতিক উদ্যোগকে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।