গাইবান্ধায় লাম্পি রোগের প্রাদুর্ভাবে একের পর এক গবাদিপশুর মৃত্যুতে উদ্বেগ বাড়ছে খামারি ও কৃষকদের মধ্যে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে সরকারি প্রাণিসম্পদ বিভাগের পর্যাপ্ত সেবা না পাওয়ায় অনেকেই স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বা অদক্ষ পশু চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হচ্ছেন। এতে ভুল চিকিৎসা, অতিরিক্ত ব্যয় এবং পশুর মৃত্যুর মতো ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লাম্পি রোগ ছাড়াও অন্যান্য পশুরোগ নিয়ে উদ্বিগ্ন খামারিরা। তবে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত পশু চিকিৎসকের অভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা স্থানীয় গ্রাম্য চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, অনেকেই স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ বা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পশু চিকিৎসক পরিচয়ে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন, যা জটিল রোগের ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না।
সম্প্রতি সদর উপজেলার কুপতলা ইউনিয়নের পূর্ব চাপাদহ গ্রামের খামারি মোশাররফ হোসেন লাম্পি রোগে আক্রান্ত হয়ে একটি উচ্চমূল্যের ষাঁড় গরু হারিয়েছেন। একই সময়ে তার আরও বেশ কয়েকটি গরু আক্রান্ত হয়। তিনি দাবি করেন, সরকারি প্রাণিসম্পদ বিভাগের কোনো সরাসরি সহযোগিতা পাননি।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন জেলার বিভিন্ন এলাকার খামারি ও কৃষকরা। তাদের ভাষ্য, উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতাল থাকলেও মাঠপর্যায়ে নিয়মিত চিকিৎসা ও পরামর্শ সেবা পৌঁছায় না। ফলে বাধ্য হয়েই তারা স্থানীয় চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করেন।
এদিকে, কিছু ব্যক্তি পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা স্বীকৃত প্রশিক্ষণ ছাড়াই পশু চিকিৎসা করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক খামারি দাবি করেছেন, এসব চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা করিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি, বরং অতিরিক্ত খরচের মুখোমুখি হয়েছেন।
তবে প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জনবল সংকটের কারণে প্রত্যন্ত এলাকায় প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার সাত উপজেলায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার প্রায় অর্ধেক পদ শূন্য রয়েছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা খামারিদের লাম্পি রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদান, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত সরকারি পশু হাসপাতালে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
খামারি ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, গ্রামপর্যায়ে নিবন্ধিত ও দক্ষ পশু চিকিৎসকের মাধ্যমে সেবা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অদক্ষ ও ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে নজরদারি বৃদ্ধি, সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার এবং টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের গ্রামীণ পশুপালনভিত্তিক অর্থনীতি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
দেশের প্রচলিত জুলাই-জুন অর্থবছরের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর ভিত্তিক অর্থবছর চালুর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বর্ষাকালে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে পরিকল্পিত ব্যয়ের পরিবর্তে অপচয় ও অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। মঙ্গলবার রাজধানীর মগবাজারে আল-ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘জনমুখী বাজেট প্রস্তাবনা ২০২৬-২৭’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এ প্রস্তাব তুলে ধরেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমান অর্থবছর জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত হওয়ায় শেষ দিকে বর্ষা, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের চাপ তৈরি হয়। ফলে অর্থবছরের শেষ মাসগুলোতে দ্রুত ব্যয় দেখানোর প্রবণতা দেখা যায়, যার সুফল জনগণ পায় না। তিনি জানান, সংসদে অর্থবছরকে ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। পাশাপাশি বাজেট ঘোষণার অন্তত তিন মাস আগে সম্পূরক বাজেট উপস্থাপনের বিধান কার্যকর করার দাবিও জানান তিনি। গণভোট প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, সাম্প্রতিক নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা উচিত। তার দাবি, গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার প্রস্তাবের পক্ষে মত দিলেও তা বাস্তবায়নে সরকার উদ্যোগ নেয়নি। অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার বিকল্প জাতীয় বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করে। বাজেট প্রস্তাবনা তুলে ধরেন দলটির সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন)। এ সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমাদ আলী কাসেমী, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এবং জাগপার সভাপতি তাসমিয়া প্রধান। এছাড়া জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম, নায়েবে আমির মজিবুর রহমানসহ কেন্দ্রীয় নেতারা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
সরকার এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর সঙ্গে ১.৪ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন চুক্তি করেছে। এ অর্থায়নের আওতায় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে চারটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, আগামী ১১ জুন জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হবে। বাজেটকে সামনে রেখে অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়ন খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতে তিনি জানান, বিদ্যমান সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা আরও আধুনিক, স্মার্ট ও নিরাপদ করতে কাজ চলছে। লোডশেডিংয়ের পেছনে শুধু উৎপাদন ঘাটতি নয়, বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতাও দায়ী বলে তিনি উল্লেখ করেন। জ্বালানি খাতে ১২ কেজি এলপিজির দাম ৫৫ টাকা কমিয়ে ১,৮৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব না পড়ে। শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা আনতে নতুন কমিশন গঠন করা হয়েছে বলে জানানো হয়, যা বাজারে আস্থা ফেরাবে বলে সরকার আশা করছে। শিক্ষা খাতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে প্রায় ২২ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নেয়—যা দেশের ইতিহাসে বড় আয়োজনগুলোর একটি। স্বাস্থ্য খাতে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে ধাপে ধাপে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে রাজধানীমুখী রোগীর চাপ কমে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জাতীয় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যাতে দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার মাধ্যমে মৃত্যু কমানো যায়। সড়ক ও অবকাঠামো খাতে দ্বিতীয় যমুনা সেতু ও পটুয়াখালী–দৌলতদিয়া দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এগিয়ে চলছে। টিস্তা মহাপরিকল্পনায় নতুন ব্যারেজ নির্মাণ ও পানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। কৃষি খাতে খাল-নালা খনন, গাছ রোপণসহ একাধিক উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে, যা উৎপাদন ও পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখবে। স্থানীয় সরকার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঢাকায় দ্রুত বর্জ্য অপসারণ, নতুন রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট এবং চট্টগ্রামে পানি সরবরাহ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তায় ওএমএস কর্মসূচির মাধ্যমে সারা দেশে ভর্তুকি মূল্যে চাল-আটা বিক্রি অব্যাহত রয়েছে এবং খাদ্য মজুদ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ খাতে প্রতারণামূলক নিয়োগকারী এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতে আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি সংযোজনের কার্যক্রম চলমান।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে তুরস্কের তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত সাভাসগলু ঢাকা সফর করেছিলেন। করোনাভাইরাস সংক্রমণের আগে ওই সফরের তাৎপর্য বোঝাতে গিয়ে তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের ওয়েবসাইটে মেভলুত সাভাসগলুকে উদ্ধৃত করে লিখেছিল, ‘বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উদীয়মান তারকা এবং আমাদের “এশিয়া এনিউ” উদ্যোগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের মধ্যে অন্যতম।’ ছয় বছরের মাথায় তুরস্কের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বাংলাদেশে এলেন। তিন দিনের সফর শেষে ফিরে গেছেন তিনি। তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ওই বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ককে পরের ধাপে নিতে তিনটি কাঠামো প্রতিষ্ঠার ঘোষণা আসে। তা হলো দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের অংশগ্রহণে প্রতিবছর ‘২+২ বৈঠক’, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক বৈঠক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে উন্নীত করা এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা আরও জোরদার করার লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি পরামর্শক কমিটি গঠন। তুরস্কের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্বের বিষয়ে মেভলুত সাভাসগলু ছয় বছর আগে যেটা বলে গিয়েছিলেন, প্রথমবারের মতো ঢাকায় এসে হাকান ফিদান ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে পরের ধাপে নিতে আঙ্কারা কী কী করতে চায়, তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে গেলেন। এ মুহূর্তে বিশ্বের বড় ও উদীয়মান শক্তিগুলো তাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের অংশগ্রহণে প্রতিবছর ‘২+২ বৈঠক’ করে থাকে। যে বৈঠকে দুই পক্ষের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, নেদারল্যান্ডস আর ভারত—বিশ্বের চারটি দেশের সঙ্গে এই কাঠামোর আওতায় নিয়মিত বৈঠক করে থাকে তুরস্ক। তালিকায় পঞ্চম দেশ হিসেবে যুক্ত হলো বাংলাদেশ। অবশ্য অনিয়মিতভাবে ইউক্রেন আর ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে তুরস্ক ‘২+২ বৈঠক’ করে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, হাকান ফিদানের সফরে ঘোষিত নতুন তিনটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে আর কেবল বাণিজ্য বা উন্নয়ন সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না আঙ্কারা। বরং নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতাকে অন্তর্ভুক্ত করে সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। এটি বাংলাদেশের প্রতি তুরস্কের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত আগ্রহেরও প্রকাশ ঘটায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তুরস্কের অগ্রাধিকার আর ‘এশিয়া এনিউ’ নীতি বা উদ্যোগের গুরুত্বটা কোথায়। আর বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কটা তুরস্ক কীভাবে এগিয়ে নিতে চায়? তুরস্কের এশিয়া নীতি কী তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালের আগস্টে ‘এশিয়া এনিউ’ শিরোনামে পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সরকার। এ উদ্যোগ মূলত নেওয়া হয় এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও কৌশলগত পরিসরে সম্পর্ক জোরদারের জন্য। বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির ভরকেন্দ্র যে ক্রমশ এশিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে, তুরস্ক এটা বুঝতে পেরেই এশিয়া এনিউ উদ্যোগটি গ্রহণ করেছে। আঞ্চলিক, উপ–আঞ্চলিক ও দেশভিত্তিক কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ককে আরও সুসংগঠিত, ধারাবাহিক ও টেকসই করাই এর উদ্দেশ্য। এই উদ্যোগের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগপ্রবাহ বৃদ্ধি করা। কাঠামোর মূল অগ্রাধিকার তুরস্কের এশিয়া নীতির প্রধান অঙ্গ চারটি। এগুলো হচ্ছে সরকারি পরিসরে সহযোগিতা জোরদার; বাণিজ্য, বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি সহযোগিতা বাড়ানো; শিক্ষা, বিজ্ঞান ও কারিগরি খাতে সহযোগিতার সম্প্রসারণ; সাংস্কৃতিক বিনিময় ও জনপরিসরে সহযোগিতা বাড়ানো। বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১৩০ কোটি ডলার থেকে ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার সম্ভাব্য উপায়গুলো খুঁজে দেখার কথা ভাবছে আঙ্কারা। হাকান ফিদান ঢাকায় বলে গেছেন, ‘বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষাশিল্পে আমাদের সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য আমরা পদক্ষেপ নিতে পারি।’ ‘এশিয়া এনিউ’ উদ্যোগে উচ্চ মূল্যসংযোজন ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, পর্যটন, অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা শিল্প, অবকাঠামো, পরিবহন, লজিস্টিকস, সবুজ জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এশিয়ার দেশগুলোকে ঘিরে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি–বিষয়ক উদ্যোগে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপসহ দক্ষিণ এশিয়া, আসিয়ানভুক্ত সব দেশ, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো, মধ্য এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো অন্তর্ভুক্ত আছে। বাংলাদেশের গুরুত্ব কোথায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এশিয়া এনিউ উদ্যোগ ক্রমেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ, এ উদ্যোগই এমন একটি নীতিগত কাঠামো তৈরি করেছে, যার আওতায় তুরস্ক ঢাকা-আঙ্কারা সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় সম্প্রসারণ করছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে জোর দেওয়া হচ্ছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অবকাঠামো উন্নয়ন, উচ্চশিক্ষা বিনিময়, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন, সুনীল অর্থনীতি ও সমুদ্রবিষয়ক সহযোগিতায়। ঢাকায় দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে হাকান ফিদান বলেছিলেন, ‘আমরা বিস্তৃত পরিসরে আমাদের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বকে আরও গভীর করার এবং দৃঢ় ভিত্তির ওপর এটিকে আরও শক্তিশালী ও দূরদর্শী পর্যায়ে উন্নীত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছি।’ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা থেকে কৌশলগত অংশীদার বাংলাদেশকে আর শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় অংশীদার নয়, বরং একটি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখতে শুরু করেছে তুরস্ক। কারণ, ‘২+২ বৈঠক’ সাধারণত যেসব দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছায়, তাদের ক্ষেত্রেই চালু করা হয়। পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের একই কাঠামোয় আনা সম্পর্ককে বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার বাইরে নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক মাত্রায়ও উন্নীত করার ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় তুরস্ক। অনেক সময় ব্যক্তিনির্ভর বা সরকারনির্ভর সম্পর্ক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু বার্ষিক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক ও পরামর্শক কমিটি গঠনের মাধ্যমে তুরস্ক বোঝাতে চাইছে যে তারা সম্পর্ককে নিয়মিত, কাঠামোবদ্ধ ও স্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে আগ্রহী। বাংলাদেশের প্রতি তুরস্কের কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশ এখন দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক অবস্থান এবং মুসলিম বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফলে এশিয়া এনিউ উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশকে আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে তুরস্ক। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান মনে করেন, দুই দেশের সম্পর্ককে পরের ধাপে নিতে যে তিনটি কাঠামোর বিষয়ে দুই দেশ রাজি হয়েছে, তা অংশীদারত্বে যোগ করবে নতুন মাত্রা। আ ন ম মুনীরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা-আঙ্কারা সম্পর্ককে কৌশলগত মাত্রায় উন্নীত করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে নজর থাকবে। সার্বিকভাবে ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা যে গভীর হবে, সেটা বোঝাই যাচ্ছে।