যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসলামাবাদে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) কার্যত শেষ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে সতর্ক করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক ঘাঁটি এখন ইরানের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে। খবর শাফাক নিউজের।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকি বলেন, ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ১৪ দফার ইসলামাবাদ সমঝোতা শুরু থেকেই সংকটে পড়ে। তার অভিযোগ, চুক্তি কার্যকর হওয়ার প্রথম দিন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে এর বিভিন্ন ধারা লঙ্ঘন করছে।
হরমুজ প্রণালির সাম্প্রতিক উত্তেজনার জন্যও যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেন বাকি। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারিত নিরাপদ নৌপথ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে। ইরানের যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসের কারণেই সমঝোতাটি এমনভাবে করা হয়েছিল, যাতে একতরফা ব্যাখ্যার কোনো সুযোগ না থাকে।
বাকি বলেন, 'প্রতিশ্রুতির বিপরীতে প্রতিশ্রুতি। যতদিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করবে, ততদিন ইরানও নিজের দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকবে।'
তিনি আরও বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে ব্যবহৃত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, স্থাপনা ও লজিস্টিক অবকাঠামো বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে ইরান অঞ্চলের কোনো দেশের ওপর হামলা চালায়নি এবং ভবিষ্যতেও চালাবে না।
ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত 'অপরাধের' প্রমাণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরা হবে এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে সব ধরনের আন্তর্জাতিক আইনি পথ অনুসরণ করা হবে বলেও জানান বাকি।
এদিকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তিনি নিশ্চিত করেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসিকে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়া হবে না।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় নেপালের তরুণ প্রজন্মের (জেন জি) তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। সম্প্রতি কাঠমান্ডুর বস্তি উচ্ছেদ অভিযান এবং পার্কিং নিয়ে বিরোধের জেরে এক রাইড-শেয়ারিং চালকের আত্মহত্যার ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে দেশটির যুবসমাজ। রোববার (১২ জুলাই) রাজধানী কাঠমান্ডুর সিংহদরবার সচিবালয়ের বাইরে শত শত মানুষ সমবেত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর নীতি ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে গরিবদের ওপর নির্যাতন বন্ধ, মানবাধিকার রক্ষা, অবৈধ গ্রেফতার বন্ধ এবং বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়ের দাবি জানানো হয়। অথচ গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এই ‘জেন জি’ বা তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের জেরেই নেপালের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছিল এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এরপর তরুণদের বিপুল সমর্থনে ভর করে গত ২৭ মার্চ বালেন শাহের রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) প্রতিনিধি সভায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে বালেন শাহকে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছিল তরুণরা। কিন্তু মাত্র ১০০ দিন পার হতেই সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বর্তমান গণঅসন্তোষের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে নদী তীরবর্তী অবৈধ বস্তি উচ্ছেদে বালেন শাহের কঠোর সিদ্ধান্তকে। কাঠমান্ডুর মেয়র থাকাকালীন সময় থেকেই এই উচ্ছেদ অভিযান তার অন্যতম লক্ষ্য ছিল। কাঠমান্ডু উপত্যকার নদী তীরবর্তী এলাকায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভূমিহীন পরিবার বসবাস করে। নেপালের আইন অনুযায়ী ভূমিহীনদের উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা বাধ্যতামূলক হলেও, উচ্ছেদ হওয়া ২৬০০ পরিবারের মধ্যে মাত্র ৩২৫টি পরিবারকে অস্থায়ী আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। তদুপরি, গত ২ জুলাই সরকার বাকিদেরও আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়ার নির্দেশ দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। উচ্ছেদের প্রতিবাদ করায় পুলিশ বেশ কয়েকজন যুব অধিকার কর্মীকে গ্রেফতার করেছে, যা নাগরিক সমাজকে আরও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সরকারের এই পদক্ষেপকে অসাংবিধানিক এবং নাগরিক স্বাধীনতার লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছেন। এই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে পার্কিং নিয়ে বিরোধের জেরে এক যুবকের আত্মাহুতির ঘটনা। কাঠমান্ডুর পাসপোর্ট দপ্তরের সামনে পার্কিং জরিমানা নিয়ে মিউনিসিপ্যাল পুলিশের সাথে তর্কাতর্কির জেরে গণেশ নেপালি নামের ২৫ বছর বয়সি এক ‘পাঠাও’ চালক নিজের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পর গুরুতর দগ্ধ চালককে স্ট্রেচারের পরিবর্তে সাধারণ গাড়িতে করে হাসপাতালে নেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে প্রশাসনের সাথে নিহতের পরিবারের ৯ দফা চুক্তি এবং তদন্ত কমিটি গঠনের আশ্বাস দেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের অসন্তোষ কমেনি। বিরোধী দলগুলোও এই ঘটনায় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছে। নির্বাচনের আগে বালেন শাহের প্রশাসন ১০০ দিনের মধ্যে সুশাসন ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ১০০ দফার এক বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সাধারণ ভোটারদের মতে, ১০০ দিন পার হলেও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি। উল্টো দুর্নীতি ও উচ্ছেদের নামে আইনি প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সরকারের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে, নির্বাচিত হওয়ার পর বালেন শাহ নিজের নির্বাচনী এলাকায় যাননি এবং সংসদকেও এড়িয়ে চলছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যে তরুণ প্রজন্ম বালেন শাহকে নেপালের নতুন আশার প্রতীক হিসেবে দেখছিল, আজ তারাই তার প্রশাসনের একনায়কতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে এসেছে। সূত্র: ফার্স্টপোস্ট।
ইরানে আবারও সামরিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন বাহিনী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে নতুন দফায় হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে অবস্থানরত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর কয়েকটি ছোট নৌযানও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের রাতেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হামলা চালায়। এর জবাবে তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলের পাঁচটি আরব দেশে থাকা মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়। এদিকে হামলার আগে ইরানের দুটি সংবাদ সংস্থা জানায়, বন্দর নগরী বন্দর আব্বাস এবং হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপ এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পরে কেশম দ্বীপের গভর্নর হোসেইন আমির জানান, শত্রুপক্ষের ছোড়া ১০ থেকে ১১টি সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র দ্বীপে আঘাত হেনেছে। তার দাবি, হামলাগুলো কেবল সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করেই চালানো হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই সাম্প্রতিক এ হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইরানবিরোধী ক্রমবর্ধমান বক্তব্য এবং ইরানে হামলার নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতি কি কেবল ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে একটি কূটনৈতিক বৈঠকে অংশগ্রহণ? ট্রাম্পের এই উপস্থিতি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এবং তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত হিসাব-নিকাশে একটি নতুন সমন্বয় বা পুনর্গঠনের ইঙ্গিত বহন করে। এই পুনর্মূল্যায়নের ভিত্তি হলো এমন ধারণা যে প্রত্যক্ষ সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ ইরানের ওপর উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দিলেও দেশটির আচরণ, ক্ষমতার কাঠামো বা কৌশলগত অভিমুখে পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ওয়াশিংটন ধীরে ধীরে সরাসরি চাপ প্রয়োগের নীতি থেকে সরে এসে একটি ‘হাইব্রিড’ ও বহুস্তরবিশিষ্ট কৌশল গ্রহণ করছে। এই কৌশলে অভ্যন্তরীণ চাপ সৃষ্টি, ইরানের চারপাশের ভূরাজনৈতিক পরিবেশকে পুনর্গঠন, আঞ্চলিক সীমানার বাইরের জোট গঠন এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুকে পুনর্বিন্যাস—সবকিছুকে একটি সমন্বিত কৌশলগত কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই কৌশলগত পরিবর্তনের মূল যুক্তি হলো, ইরানকে একটি বড় ও চূড়ান্ত আঘাতের মাধ্যমে নয়; বরং একাধিক স্তরে একই সঙ্গে ধীরে ধীরে ক্ষয়িষ্ণু চাপ সৃষ্টি করে দুর্বল করতে হবে। লক্ষ্য শুধু ইরানের ওপর বাহ্যিক ব্যয় বাড়ানো নয়; বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে দেশটির সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই সময়ে অভ্যন্তরীণ, সীমান্তবর্তী ও আঞ্চলিক নানা ধরনের চাপ মোকাবিলায় তাদের সক্ষমতার বড় অংশ ব্যয় করতে হয়। অন্যভাবে বললে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল হলো—ইরানের ভেতরে, তার ভূরাজনৈতিক প্রান্তসীমায় এবং আঞ্চলিক মিত্রদের নেটওয়ার্কজুড়ে একই সময়ে চাপ সৃষ্টি করা। দেশীয় পর্যায়ে এই কৌশল হলো সামাজিক চাপ বাড়ানো এবং ধীরে ধীরে জনগণের সহনশীলতা ক্ষয় করার ওপর নির্ভরশীল। এর উদ্দেশ্য শুধু সময়–সময় জন–অসন্তোষ বা তীব্র সংকট সৃষ্টি করা নয়; বরং জ্বালানি, পানি, পরিবহন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জনসেবা ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে শাসন পরিচালনার ব্যয় বাড়িয়ে তোলা। নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে এই চাপ যুক্ত হলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি অংশ বৃহত্তর কৌশলগত অগ্রাধিকার থেকে সরে এসে অভ্যন্তরীণ সংকট সামাল দিতেই ব্যয় হবে। তবে এই কৌশলের অংশটি ইরানের চারপাশের পরিবেশে পরিবর্তন না আনলে পুরোপুরি কার্যকর হতে পারে না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এমনভাবে আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে পুনর্বিন্যাস করতে চায়, যাতে তেহরানকে একই সঙ্গে একাধিক প্রান্তিক ফ্রন্টে ব্যস্ত থাকতে হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের গুরুত্ব একটি সাধারণ বৈঠকের চেয়ে অনেক দূর ছাড়িয়ে যায়। এটি শুধু ইউরোপীয় নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার মঞ্চ নয়; বরং ইরান ইস্যুকে পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার একটি প্ল্যাটফর্ম। যুক্তরাষ্ট্র ইরান-সংক্রান্ত বিষয়টিকে একটি দ্বিপক্ষীয় বিরোধের সীমা ছাড়িয়ে সমগ্র পশ্চিমা জোটের যৌথ উদ্বেগে পরিণত করতে চায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ন্যাটো শুধু একটি সামরিক জোট নয়; বরং ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা মিত্রদের রাজনৈতিক, নিরাপত্তাগত ও বয়ানের সমন্বয় সাধনের একটি মাধ্যম। এই শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্পের উপস্থিতিকে চারটি পরস্পর-সম্পর্কিত উদ্দেশ্যের আলোকে বোঝা যায়। প্রথম উদ্দেশ্য হলো ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে জোটকে আরও সুসংহত করা। ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনপথের স্থিতিশীলতার মতো ইস্যুগুলোকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে ইরান প্রশ্নে আরও ঘনিষ্ঠ অবস্থানে আনতে চায়। হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব এবং পশ্চিম এশিয়ার অস্থিতিশীলতার ফলে ইউরোপের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব—এই বিষয়গুলো সামনে এনে ওয়াশিংটন ইউরোপের উদ্বেগকে নিজের ইরানবিরোধী অগ্রাধিকারের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতের পদক্ষেপকে বৈধতা প্রদান করা। তৃতীয় উদ্দেশ্য হলো তুরস্কের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং দেশটির পারিপার্শ্বিক সক্ষমতাকে কাজে লাগানো। আঙ্কারাকে দেওয়া যেকোনো ছাড়কে যুক্তরাষ্ট্রের সেই প্রচেষ্টার কাঠামোর মধ্যে বুঝতে হবে, যার লক্ষ্য তুরস্ককে তার আঞ্চলিক পরিকল্পনার আরও কাছাকাছি নিয়ে আসা। বিশেষ করে ইরানের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলকে ঘিরে থাকা সীমান্ত, জাতিগত ও নিরাপত্তাগত গতিশীলতা এ ধরনের কৌশলে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তুরস্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পরিচালনার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না; বরং এটি ইরানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে চাপ সৃষ্টির উৎসগুলোকে সক্রিয় করার একটি প্রচেষ্টার অংশ। চতুর্থ উদ্দেশ্য হলো সিরিয়ার সক্ষমতাকে ব্যবহার করে লেবাননের ওপর প্রভাব বিস্তার করা এবং হিজবুল্লাহর ওপর চাপ আরও বাড়ানো। যদি ধরে নেওয়া হয় যে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া, লেবানন ও তুরস্ক-সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করছে, তাহলে এই চার উদ্দেশ্যকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যাবে না। এগুলো একই শৃঙ্খলের অংশ, যার উদ্দেশ্য ইরান এবং ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ ওপর রাজনৈতিক, নিরাপত্তাগত ও মাঠপর্যায়ের চাপ আরও বাড়িয়ে তোলা। সবকিছু একত্রে বিবেচনা করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র একটিমাত্র উপায়ের ওপর নির্ভর না করে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে পরস্পর সংযুক্ত নানা ধরনের চাপের একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় করছে। অভ্যন্তরীণ চাপ, ইরানের সীমান্তজুড়ে চাপ, আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর চাপ এবং আন্তর্জাতিক জোট গঠনের মাধ্যমে সৃষ্ট চাপ—সবই এই অভিন্ন কৌশলের অংশ। এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো পশ্চিম এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যকে যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নবাদী শাসনের অনুকূলে পুনর্নির্ধারণ করা এবং ইরানকে এমন পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া, যাতে দেশটি একযোগে একাধিক ফ্রন্টের সংকট মোকাবিলাতেই তার মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে বাধ্য হয়। তবে এই কৌশল নিঃসন্দেহে ব্যর্থ হতে বাধ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলো দেখিয়েছে, সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব, রাজনৈতিক সমর্থন এবং জটিল নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নবাদী শাসনের বহু পরিকল্পনা বাস্তব পরিস্থিতি, স্থানীয় বাস্তবতার সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিরোধ শক্তিগুলোর গভীরভাবে প্রোথিত দৃঢ়তার মুখে ক্ষয়, বিঘ্ন ও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। তদুপরি, শীর্ষ নেতার জানাজায় ইরান ও ইরাকে লাখো মানুষের অংশগ্রহণ আবারও দেখিয়েছে যে পশ্চিম এশিয়ায় একটি প্রকৃত ও টেকসই ব্যবস্থা মার্কিন পরিকল্পনা মাধ্যমে গড়ে ওঠে না; বরং তা গড়ে ওঠে জনগণের সামাজিক ইচ্ছাশক্তি, প্রতিরোধের ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং আধিপত্যবিরোধী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া বন্ধনের ভিত্তিতে।