রাশিয়া ও ইউক্রেনের পাল্টাপাল্টি হামলায় গতকাল সোমবার দুই দেশে নিহত হয়েছেন ২২ জন। নিহতদের মধ্যে ১৫ জন রাশিয়া এবং বাকি ১১ জন ইউক্রেনের নাগরিক।
রুশ প্রশাসনসূত্রে জানা গেছে, সোমবার ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় নিহতরা রাশিয়ার ক্রাসনোদার, বেলগোরোদ, ও ক্রিমিয়ার বাসিন্দা ছিলেন।
রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ ক্রাসনোদার গভর্নর ভেনিয়ামিন কন্দ্রাতিয়েভ এক বিবৃতিতে বলেছেন, ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় প্রদেশের গেলেন্দঝিক জেলার পর্যটনপল্লী আরখিপো-ওসিপোভকায় ৩ জন শিশুসহ ৭ জন নিহত হয়েছেন, এবং আহত হয়েছেন আরও প্রায় ৪০ জন।
ক্রাসনোদার পাশাপাাশি একই দিন কৃষ্ণ সাগরের উপদ্বীপ ক্রিমিয়া এবং ইউক্রেনের সীমান্তবর্তী রুশ প্রদেশ বেলগোরোদেও ড্রোন হামলা করেছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। এতে ক্রিমিয়া উপদ্বীপে ৪ জন এবং নিহত এবং ২ জন আহত এবং বেলেগোরোদ প্রদেশে ৪ জন নিহত এবং ১৭ জন আহত হয়েছেন।
এদিকে একই দিন সোমবার কিয়েভের দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক প্রদেশের কৃভি রিহ জেলার একটি পেট্রোল স্টেশনে বিস্ফোরকবাহী রুশ ড্রোনের আঘাতে ৩ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন জরুরি পরিষেবাকর্মী এবং তার আট বছর বয়সী ছেলে আছে। দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক প্রদেশের গভর্নর ওলেক্সান্দর হানঝা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে পোস্ট করা এক বার্তায় এ তথ্য জানিয়ে বলেছেন, রুশ বাহিনীর ড্রোন হামলয় পেট্রোল স্টেশনটিতে আগুন ধরে গিয়েছিল। এতে ওই পেট্রোল স্টেশন ও আশপাশের এলাকায় বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সোমবার রাতে ইউক্রেনের জাপোরিজ্জিয়া প্রদেশে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে রুশ বাহিনী। এতে নিহত হয়েছে ২ জন শিশুসহ ৮ জন।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বেসামরিকদের মৃত্যুহার প্রায় শূন্যের কোঠায় থাকলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই হার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। যদিও উভয়পক্ষই বেসামরিক নাগরিকদের হামলার লক্ষ্যবস্তু করার কথা অস্বীকার করে আসছে।
এদিকে সোমবার পৃথক এক বিবৃতিতে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পূর্ব ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ খারকিভের বিলিই কোলোদিয়াজ এবং উস্পেনিভকা বসতি দখল করেছে রুশ বাহিনী।
উল্লেখ্য, ক্রিমিয়াকে রুশ ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া এবং ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত মিনস্ক চুক্তির শর্ত ভেঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটের সদস্যপদের জন্য কিয়েভের তদবিরকে ঘিরে কয়েক বছর ধরে টানাপোড়েন চলার পর ২০২২ সালে প্রেসিডেন্ট পুতিনের নির্দেশে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করে রুশ বাহিনী। সেই অভিযান এখনও চলছে।
সূত্র : আলজাজিরা
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একের পর এক বোমা হামলার হুমকির ঘটনায় সাতটি উড়োজাহাজে তল্লাশি চালিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। বিভিন্ন বিমানবন্দরে অবতরণের পর উড়োজাহাজগুলোতে তল্লাশি চালানো হয়। এর মধ্যে কয়েকটি উড়োজাহাজকে নিরাপত্তার কারণে অন্য বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনও উড়োজাহাজেই বিস্ফোরক বা বোমার সন্ধান পাওয়া যায়নি। ঘটনাগুলোর মধ্যে ইতালির রাজধানী রোমে অবতরণের পর রায়ানএয়ারের দুটি উড়োজাহাজে তল্লাশি চালানো হয়। এর মধ্যে ডাবলিন থেকে আসা একটি উড়োজাহাজকে ইতালির বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান পাহারা দিয়ে বিমানবন্দরে নিয়ে আসে। পোল্যান্ডের ওয়ারশতে অবতরণ করা আরও দুটি উড়োজাহাজে তল্লাশি চালানো হয়েছে। এর মধ্যে একটি উড়োজাহাজ লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। বোমার হুমকির পর সেটির গতিপথ পরিবর্তন করে ওয়ারশতে অবতরণ করানো হয়। এছাড়া বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়ায় অবতরণ করা দুটি উড়োজাহাজেও নিরাপত্তা তল্লাশি চালানো হয়েছে। একই ধরনের ঘটনার মুখে পড়ে স্পেনের মুরসিয়া বিমানবন্দর। যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি উড়োজাহাজ সেখানে অবতরণের পর বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের সদস্যরা তল্লাশি চালান। স্থানীয় এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই উড়োজাহাজে কোনও বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। মুরসিয়ায় অবতরণ করা উড়োজাহাজের এক যাত্রী জানিয়েছেন, বিমানটি অবতরণের পরপরই বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের সদস্যরা সেখানে উপস্থিত হন। এতে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে সোমবার লন্ডনের লুটন বিমানবন্দর থেকে বুলগেরিয়ার সোফিয়াগামী একটি উড়োজাহাজ বোমা হামলার হুমকি পাওয়ার পর জরুরি অবতরণ করে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে। ইউরোপের একাধিক দেশে একই সময়ে এ ধরনের হুমকির ঘটনায় বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে এসব হুমকির উৎস বা এর পেছনে কারা রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জানা যায়নি। সূত্র: বিবিসি
আগামী বছর থেকে ইসরায়েলকে আর বার্ষিক সামরিক অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। ইসরায়েলের আর এই সহায়তার প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ফক্স নিউজকে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এ কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, ইসরায়েলকে প্রতিবছর চার বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে আগে একটি চুক্তি হয়েছিল। তবে কয়েক মাস আগে নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলোচনার পর সহায়তা বন্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই সহায়তা বন্ধ হবে বলে জানান তিনি। কেন ইসরায়েলকে দেওয়া সহায়তা বন্ধ করা হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েলের এখন আর এ অর্থের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন থাকলে তিনি সহায়তা অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিতেন। দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের পাশাপাশি দেশটিকে আর্থিক সহায়তাও দিয়ে থাকে ওয়াশিংটন। ট্রাম্পের এই বক্তব্যের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত ইসরায়েল সরকার বা নেতানিয়াহুর দপ্তর থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সূত্র: ফক্স নিউজ
কাতারের রাজধানী দোহায় রবিবার ইরানের প্রতিনিধিদল ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে টানা তৃতীয় দিনের মতো আলোচনা হয়েছে। আলোচনা শেষে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময়সীমা সাত দিন থেকে কমিয়ে দুই দিন করা হয়েছে। তবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কয়েকটি শর্ত দিয়েছে তেহরান। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, দেশটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানো এবং ইরান ও ওমানের নির্ধারণ করা নতুন নৌপথের স্বীকৃতি। কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধ এবং ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এসব শর্ত দিয়েছে তেহরান। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরায় চালু না হলে বিকল্প পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে প্রণালিটি খুলে দেওয়ার উদ্যোগের মধ্যেও জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। এর মাত্র দুই দিন আগে চলাচলের অনুমতি পাওয়া একটি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। ফলে ইরানের অনুমতি মিললেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচল এখনো নিশ্চিত নয়। জাহাজটি পাকিস্তানের জন্য তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহন করছিল। এর নিরাপদ চলাচলের অনুমতিও আদায় করেছিল পাকিস্তান। ব্লুমবার্গকে এ চালান সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গত ৩০ অক্টোবর হরমুজ প্রণালির কাছে জাহাজটিতে হামলার আগেই কাতারের এলএনজিবাহী জাহাজ ‘আল মায়েদা’র নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করেছিল ইসলামাবাদ। এর আগে পাকিস্তানের কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল বলেই মনে হচ্ছিল। কারণ, একই প্রক্রিয়ায় ইরানের কাছ থেকে চলাচলের অনুমতি পাওয়া বেশ কয়েকটি জাহাজ নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পার হয়েছিল। তবে ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছে। তেহরানও কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জাহাজটিতে হামলার ঘটনা পাকিস্তানের কূটনৈতিক উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে। এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়েছে, পাকিস্তান জাহাজ চলাচলের অনুমতি আদায়ে মধ্যস্থতা করতে পারলেও সেই অনুমতির পরও কোনো জাহাজ আক্রান্ত হলে তা ঠেকানোর ক্ষমতা দেশটির সীমিত চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা বেশ উল্লেখযোগ্য। জুনে দুই দেশের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক সইয়ের লক্ষ্যে আলোচনার আয়োজন করেছিল ইসলামাবাদ। এরপর অক্টোবরে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির দুইবার তেহরান সফর করেন। এসব উদ্যোগের পর পাকিস্তানের এক সামরিক মুখপাত্র দেশটির মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা নিয়ে ‘সতর্কভাবে আশাবাদী’ বলে মন্তব্য করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি এ প্রচেষ্টার পথে বড় বাধা ও বিরোধীদের নিয়েও সতর্ক করেন। চলমান আলোচনার আয়োজক দেশ কাতারও পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং কাউকে হুমকি না দেওয়ার কারণেই পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখতে পেরেছে। তবে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান সংকট এখন শুধু মধ্যস্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পরিস্থিতি সামাল দিতে এমন একজন পক্ষের প্রয়োজন, যে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারবে। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা পাকিস্তানের নেই। কাতারের এলএনজিবাহী জাহাজ ‘আল মায়েদা’তে হামলার ঘটনা বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় জাহাজটিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হলেও পরে সেটিতে হামলা হয়। এ ঘটনায় ইরানের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি এবং পাকিস্তানও তা ঠেকাতে পারেনি। জাহাজটিতে হামলার জন্য এখনো কাউকে দায়ী করা হয়নি। কোনো পক্ষও হামলার দায় স্বীকার করেনি। কাতার কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি তদন্ত করছে। এদিকে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ছে। গত অক্টোবরে সেখানে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে রেকর্ডসংখ্যক হামলার ঘটনা ঘটেছে। তেহরানও তাদের বন্দর ও জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কথিত হামলার প্রমাণ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার কাছে জমা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলাচলের অনুমতি পাওয়া জাহাজটিতে হামলার ঘটনা দুই দেশের আলোচনা ব্যাহত করতে চাওয়া পক্ষগুলোর কাজ হতে পারে। তবে হামলার দায় যারই হোক, এতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাকিস্তানের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন, কারণ দেশটির গ্যাসের চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পূরণ হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে আমদানি করা এলএনজির মাধ্যমে। কিন্তু গত অক্টোবরে কাতার থেকে মাত্র দুটি এলএনজিবাহী জাহাজ পেয়েছে পাকিস্তান। গত বছরের একই সময়ে পেয়েছিল আটটি। কাতারএনার্জি আগামী ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ‘ফোর্স মেজার’ বা অনিবার্য পরিস্থিতির ঘোষণা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি, তাৎক্ষণিকভাবে কেনা এলএনজির দাম চুক্তিমূল্যের প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালি অনিরাপদ থাকলে পাকিস্তানের জ্বালানি আমদানির খরচ আরো বাড়বে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেশটির ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়বে। বলপ্রয়োগের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে পাকিস্তানের অবস্থান ধরে রাখতে হলে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও ভাগ করে নিতে হবে। সৌদি আরব, তুরস্ক, কাতার ও মিশরকে নিয়ে যৌথ নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে অনুমতি পাওয়া কোনো জাহাজে হামলা হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়বে। পাশাপাশি পাকিস্তানকে জ্বালানি আমদানির উৎস বাড়াতে হবে। দেশটি এক বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয়ে ১০টি এলএনজি কার্গো কেনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও আজারবাইজান থেকে জ্বালানি আমদানির কথা ভাবছে। এতে খরচ বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পাকিস্তানের অর্থনীতি ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতা, দুইয়ের জন্যই জরুরি। পাকিস্তানের উচিত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সব পক্ষকে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, আলোচনা চলছে, তবে কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, এ বিষয়ে তাঁর কোনো তাড়া নেই। ইসলামাবাদ দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ, আলোচনা আয়োজন ও প্রস্তাব বিনিময়ে সহায়তা করতে পারে। তবে সমুদ্রে কোনো পক্ষের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ বা যাচাই করার ক্ষমতা তাদের নেই। তাই নিজেদের ভূমিকা নিয়ে অতিরিক্ত দাবি করলে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার দায় পাকিস্তানের ওপর পড়তে পারে। চলতি বছর কাতার, তুরস্ক, ওমান ও পাকিস্তানের মতো মধ্যম শক্তির দেশগুলো আন্তর্জাতিক সংকট সমাধানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এসব দেশের ভূমিকার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে। তারা আলোচনা এগিয়ে নিতে পারলেও চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। দোহায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা চললেও কাতারের এলএনজিবাহী জাহাজ ‘আল মায়েদা’তে হামলার ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে সমুদ্রে জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।