ইরানের সঙ্গে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির পক্ষে সাফাই গেয়েছেন বারাক ওবামা। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে এই চুক্তির ফলে কোনো আঞ্চলিক সংঘাত ছাড়াই তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল।
মার্কিন গণমাধ্যম সিবিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবেক এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, এই চুক্তি ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের একটি বড় অংশ সরিয়ে নিতে সফল হয়েছিল এবং তৎকালীন মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যেও এর সপক্ষে সমর্থন ছিল।
ওবামা বলেন, ‘আমরা একটি ক্ষেপণাস্ত্র না ছুড়েই এটি সম্পন্ন করেছি। আমরা তাদের ৯৭ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলাম।’ ওবামা আরও যোগ করেন, ‘এটি যে কাজ করেছিল, তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। আর এর জন্য আমাদের একগাদা মানুষ মারতে হয়নি কিংবা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ারও প্রয়োজন পড়েনি।’
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
চলমান সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধে একটি সংশোধিত ১৪ দফার নতুন শান্তি পরিকল্পনা জমা দিয়েছে ইরান। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে এই প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে তেহরান। ইরানের এই নতুন শান্তি প্রস্তাবের পর এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অনুরোধে তেহরানের ওপর নির্ধারিত সামরিক হামলা আপাতত স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার (১৮ মে) ট্রাম্প জানান, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেজন্য তাদের সঙ্গে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর এখন ‘খুব ভালো সম্ভাবনা’ তৈরি হয়েছে। তবে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এর এক পোস্টে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি কোনো গ্রহণযোগ্য চুক্তিতে না আসে, তবে যে কোনো মুহূর্তে তাদের ওপর বড় ধরনের পূর্ণাঙ্গ হামলা চালানো হবে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার ছয় সপ্তাহ পর, গত ৮ এপ্রিল একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। এর পর থেকে সংঘাত অনেকটাই কমেছে, কিন্তু স্থায়ী শান্তি চুক্তি এখনো অধরাই রয়ে গেছে। এর মধ্যেই সোমবার সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা তিনটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এর আগের দিনই সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলা হয়েছিল। শান্তি আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়ার মাঝেই এই ড্রোন হামলার ঘটনাগুলো নতুন করে যুদ্ধের শঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। হামলা নিয়ে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ পোস্টে লিখেছেন, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতাদের অনুরোধে তিনি মঙ্গলবারের নির্ধারিত হামলাটি স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও মার্কিন সামরিক বাহিনীকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, একটি গ্রহণযোগ্য চুক্তি না হলে যে কোনো মুহূর্তে ইরানের ওপর বড় আকারের হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। ইরানের নতুন ১৪ দফা পরিকল্পনা পরিকল্পনার বিস্তারিত ও পারষ্পরিক দাবি ইরানের নতুন ১৪ দফা পরিকল্পনার সব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা না হলেও দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, ইরান মূলত তাদের বিদেশে আটকে থাকা টাকা ফেরত ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। এছাড়া, ইরান তাদের ওপর হওয়া হামলার ক্ষতিপূরণ, মার্কিন নৌ-অবরোধের অবসান ও লেবাননসহ সব জায়গায় যুদ্ধ বন্ধের দাবি তুলেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান যেন তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করে ও হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধের প্রধান কারণ ইউরেনিয়ামের মজুত: যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তাদের কাছে থাকা বিপুল পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করুক, যা দিয়ে পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু ইরান তা সরাসরি দিতে রাজি নয়, তবে রাশিয়ার কাছে এই মজুত জমা রাখার একটি প্রস্তাব তারা বিবেচনা করছে। হরমুজ প্রণালি ও তেলের বাজার: গত মার্চ থেকে ইরান বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান জলপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তারা এই পথ দিয়ে যাওয়া জাহাজের ওপর ট্যাক্স বা টোল বসাতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ দিয়ে রেখেছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাসের দাম বাড়ছে। আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী: মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী (যেমন—ইয়েমেনের হুথি, লেবাননের হিজবুল্লাহ) নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র আপত্তি রয়েছে। তবে এই বিষয়টি আলোচনার পরবর্তী ধাপের জন্য তুলে রাখা হয়েছে। সূত্র : আল জাজিরার।
ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধের জেরে বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা যখন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত, তখন নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক ভাগ্য বদলের বড় সুযোগ দেখছে তুরস্ক। কাস্পিয়ান সাগর, দক্ষিণ ককেশাস এবং তুরস্ক হয়ে চীন ও মধ্য এশিয়াকে ইউরোপের সঙ্গে যুক্তকারী ‘মিডল করিডোর’ বা মধ্যবর্তী বাণিজ্য পথটিকে জনপ্রিয় করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে আঙ্কারা। তবে এই পথটিকে একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর পেছনে বড় ধরনের পরিবহন, আর্থিক ও রাজনৈতিক বাধা রয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর এ খবর জানিয়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর রাশিয়া ও বেলারুশের মধ্য দিয়ে যাওয়া উত্তর দিকের স্থলপথগুলো (নর্দার্ন করিডোর) বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকেই মিডল করিডোরের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হতে শুরু করে। সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধের কারণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় এই রুটের গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। তুরস্কের আগ্রহের নেপথ্যে কী? মিডল করিডোর, যার আনুষ্ঠানিক নাম ট্রান্স-কাস্পিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট রুট (টিআইটিআর) হলো একটি বহুমাত্রিক (রেল, সড়ক ও সমুদ্রপথের মিশ্রণ) চীন-ইউরোপীয় প্রকল্প। এটি চীন থেকে শুরু হয়ে মধ্য এশিয়া, কাস্পিয়ান সাগর, আজারবাইজান ও জর্জিয়া হয়ে তুরস্কের মাধ্যমে ইউরোপে প্রবেশ করেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক কাস্পিয়ান পলিসি সেন্টার-এর তথ্য অনুযায়ী, এই করিডোরে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মাইল রেলপথ এবং ৩১০ মাইলের কাস্পিয়ান সাগর পারাপার ব্যবস্থা রয়েছে। তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরেই এই করিডোর বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখছে। আঙ্কারা এটিকে মধ্য এশিয়ার বিশাল জ্বালানি সম্পদের প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচনা করে। যার মধ্যে রয়েছে কাজাখস্তানের ৩০ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত তেল ও ৮৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস এবং তুর্কমেনিস্তানের ৪০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের গ্যাসের মজুত। একই সঙ্গে এই করিডোরকে মধ্য এশিয়ার তুর্কি প্রজাতন্ত্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন এবং তুর্কি বিশ্বে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের কৌশলগত পথ হিসেবে দেখছে আঙ্কারা। এই রুটটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর সঙ্গেও মিলে যায়। এটি বেইজিংকে রাশিয়া ও ইরান এড়িয়ে ইউরোপীয় বাজারে পৌঁছানোর একটি নির্ভরযোগ্য পথ তৈরি করে দেয়। ফলে তুরস্ক এটিকে নিজেদের নেতৃত্বাধীন কৌশল এবং চীনের বিআরআই-এর পরিপূরক রুট উভয় হিসেবেই উপস্থাপন করছে। গত সপ্তাহে কাজাখস্তানে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরকালে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান বলেছেন, ‘আমাদের রেল সংযোগ, বন্দর অবকাঠামো ও ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটিয়ে আমরা কাস্পিয়ান-ট্রানজিট মিডল করিডোরকে পুনরুজ্জীবিত করার কাজ করছি। ইউরেশীয় অঞ্চলকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও প্রতিযোগিতামূলক করাই আমাদের লক্ষ্য।’ কেন আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে এই রুট? ২০২২ সালের আগে চীন-ইউরোপ স্থল বাণিজ্যের ৮৬ শতাংশেরই বেশি হতো রাশিয়ার নর্দার্ন করিডোর দিয়ে। যুদ্ধ সেই সমীকরণ বদলে দিয়েছে। এর ওপর চলতি বছর যুক্ত হয়েছে হরমুজ প্রণালির সংকট। প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহকারী এই সরু জলপথটি অবরুদ্ধ হওয়ায় বিশ্ব বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইয়িলমাজ গত এপ্রিলে বলেছিলেন, ‘ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধের পর মিডল করিডোর এখন আর কেবল বিকল্প নয়, এটি একটি বাধ্যতামূলক পছন্দ।’ ওয়াশিংটনের আটলান্টিক কাউন্সিলের তুরস্ক প্রোগ্রাম-এর অনাবাসিক ফেলো পিনার দোস্ত মনে করেন, হরমুজের এই অচলাবস্থাকে কাজে লাগিয়ে তুরস্ক পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে প্রধান ট্রানজিট হাব হিসেবে নিজের অবস্থান পাকা করতে চায়। তা ছাড়া, আজারবাইজানের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে তার ছিটমহল নাখচিভানকে আর্মেনিয়ার সিউনিক অঞ্চলের মধ্য দিয়ে সংযুক্ত করার জন্য মার্কিন মধ্যস্থতায় যে ট্রাম্প রুট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস অ্যান্ড প্রসপারিটি (টিআরআইপিপি) বা ট্রিপ প্রকল্পের আলোচনা চলছে, তা সফল হলে মিডল করিডোরের কার্যকারিতা আরও বাড়বে। পাশাপাশি, ২০২৩ সালের জি-২০ সম্মেলনে ঘোষিত ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর, যা ভারত, আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান ও ইসরায়েলকে যুক্ত করার কথা ছিল; তা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীলতার কারণে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ, লোহিত সাগরের সংকট এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আইমেক প্রকল্পের উপযোগিতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রগুলো এড়িয়ে যাওয়া মিডল করিডোর এখন বিশ্ববাজারের কাছে অনেক বেশি নিরাপদ মনে হচ্ছে। সামনে যত চ্যালেঞ্জ ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা থাকলেও মিডল করিডোরকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা বেশ কঠিন। পিনার দোস্ত স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘এই রুটটি হরমুজ প্রণালির বিপুল বাণিজ্য বা তেল পরিবহনের পরিপূরক হতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই তার স্থলাভিষিক্ত বা বিকল্প হতে পারে না।’ এটি মূলত কন্টেইনার পণ্য এবং অ-জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য উপযুক্ত। অন্যতম বড় বাধা হলো এর বিশাল খরচ। আর্মেনিয়ার মতো নতুন রুটগুলো যুক্ত করে অবকাঠামো তৈরি করতে শত শত কোটি ডলারের প্রয়োজন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) অবশ্য তাদের গ্লোবাল গেটওয়ে এজেন্ডার আওতায় রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমাতে এই প্রকল্পে অর্থায়নের আগ্রহ দেখিয়েছে। লজিস্টিক বা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও বড় দুর্বলতা রয়েছে। কাস্পিয়ান সাগরের অংশটি এই রুটের সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ এখানে ট্রেন থেকে পণ্য খালাস করে জাহাজে তুলতে হয় এবং ওপারে গিয়ে আবার ট্রেনে তুলতে হয়। ফলে বন্দর সক্ষমতা, ফেরির প্রাপ্যতা এবং আবহাওয়ার ওপর বাণিজ্য অনেকাংশে নির্ভরশীল। এর ওপর কাস্পিয়ান সাগরের পানির স্তর নেমে যাওয়ায় জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, যার কারণে আজারবাইজান ও কাজাখস্তানকে এখন বন্দর খনন কাজের জন্য বাড়তি বিনিয়োগ করতে হচ্ছে।
চীনের হাইনান দ্বীপের জনপ্রিয় পর্যটন সৈকতের কাছাকাছি এলাকা দিয়ে দেশটির অত্যাধুনিক পারমাণবিক চালিত অ্যাটাক সাবমেরিন ‘টাইপ ০৯৩বি’ চলাচলের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ পর্যটকের ক্যামেরায় ধরা পড়া এই দৃশ্য বিশ্বজুড়ে নতুন করে সামরিক কৌশল ও গোপনীয়তা নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৪ মে হাইনানের ইয়ালং বে এলাকায় এক রুশ পর্যটক ভিডিওটি ধারণ করেন। ভিডিওতে দেখা যায়, সাবমেরিনটি সাঁতারু ও সাধারণ নৌযানের একেবারে কাছ দিয়ে একটি নৌঘাঁটির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ‘টাইপ ০৯৩বি’ চীনের নৌবাহিনীর অন্যতম আধুনিক পারমাণবিক সাবমেরিন, যা আগের সংস্করণের তুলনায় অনেক বেশি নীরব ও উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন। এতে ব্যবহৃত ‘পাম্প-জেট’ প্রযুক্তির কারণে পানির নিচে এর শব্দ অনেক কম, ফলে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি চীনের পরবর্তী প্রজন্মের সাবমেরিন প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যার মাধ্যমে দেশটি সমুদ্রের নিচে সামরিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করছে। প্রায় ১১০ মিটার দীর্ঘ এই সাবমেরিনে ভার্টিক্যাল লঞ্চ সিস্টেম রয়েছে, যার মাধ্যমে দূরপাল্লার ক্রুজ মিসাইল নিক্ষেপ করা সম্ভব। পারমাণবিক শক্তিচালিত হওয়ায় এর কার্যক্ষমতা দীর্ঘ সময় সীমাহীনভাবে বজায় থাকে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি ভিডিও নয়, বরং এটি দেখাচ্ছে কীভাবে আধুনিক যুগে অত্যন্ত গোপন সামরিক প্রযুক্তিও মুহূর্তের মধ্যে বৈশ্বিক আলোচনায় চলে আসতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে। তথ্যসূত্র: ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া