মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত দিক থেকে জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়েছে পাকিস্তান। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর সৌদি আরবে সাম্প্রতিক হামলার পর ইসলামাবাদে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বিরোধের প্রভাবের মধ্যে সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতি পাকিস্তানের জন্য দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের ভূমিকা ধরে রাখার চেষ্টা করছে ইসলামাবাদ, অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কারণে প্রয়োজন হলে রিয়াদের পাশে দাঁড়ানোর চাপও রয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তান ভূমিকা রেখেছিল। একই সময়ে দেশটির সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার হয়েছে। গত বছর স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় বর্তমানে সৌদি আরবে পাকিস্তানের হাজারো সেনাসদস্য এবং যুদ্ধবিমান ইউনিট মোতায়েন রয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে ইরানের হামলার ঘটনাতেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল ইসলামাবাদ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার পর ইরানকে ঘিরে পাকিস্তানের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কারণ, নতুন করে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
গত সোমবার হুথিদের নিয়ন্ত্রিত একটি বিমানবন্দরে সৌদি আরব হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ তুলে সৌদি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে হুতিরা। এতে দীর্ঘদিনের কার্যকর যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলেও এখন পর্যন্ত সংঘর্ষ সীমিত পর্যায়েই রয়েছে।
পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব ইরানকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, সৌদি আরবের ওপর হামলাকে তারা পাকিস্তানের নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পৃক্ত হিসেবে বিবেচনা করছে। এটি ইসলামাবাদের জন্য একটি ‘রেড লাইন’।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানা বলেন, উত্তেজনা এত দ্রুত বাড়বে, তা পাকিস্তান আগে থেকে অনুমান করতে পারেনি।
পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন সৌদি অঞ্চলে পাকিস্তানের সেনাসদস্য মোতায়েন থাকায় পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। সংঘাত বাড়লে এসব সেনার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
ইসলামাবাদের আরেকটি বড় দুশ্চিন্তা হলো লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ। এই রুটে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে পাকিস্তানসহ বহু দেশের বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের কৌশলগত স্থাপনায় হামলা হলে প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পাকিস্তানকে সামরিক পদক্ষেপ নিতে হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জেনারেল গুলাম মোস্তফা বলেন, বর্তমানে ইসলামাবাদ সব পক্ষকে সংযত রাখার চেষ্টা করছে। তবে হুতিদের হামলা আরও বিস্তৃত হলে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে পাকিস্তান। দেশটির কর্মকর্তাদের মতে, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের অবস্থানের সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আলির মতে, ইরানে নীতিনির্ধারণে সামরিক বাহিনীর প্রভাব আগের তুলনায় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পাকিস্তানও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে ইরানের একটি প্রতিনিধিদলের নির্ধারিত ইসলামাবাদ সফরও পিছিয়ে যায়। পরে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল দুদিন বিলম্বে পাকিস্তান সফর করে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসার কথা ছিল।
এদিকে বৃহস্পতিবার নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দরাবি সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বর্তমান সংকট নিরসনে সংলাপ ও কূটনীতির বিকল্প নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক কূটনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে চাইলে পাকিস্তানকে একই সঙ্গে একাধিক স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। কারণ, সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপরও পাকিস্তানের অর্থনীতি অনেকাংশে নির্ভরশীল।
সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হলে পাকিস্তান সরকারকে জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন জরুরি ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল।
কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার মাধ্যমে শুধু কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানো নয়; বরং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাও ইসলামাবাদের অন্যতম লক্ষ্য।
একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা বলেন, নানা হতাশা থাকলেও মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা থেকে সরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। কারণ, এই উদ্যোগে পাকিস্তান উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক বিনিয়োগ করেছে এবং এটি সফল হওয়াও তাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান এমন এক অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রয়োজন হলে তাকে স্পষ্টভাবে কোনো এক পক্ষের পাশে অবস্থান নিতে হতে পারে। মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের ভাষ্য, যুদ্ধ বন্ধ হওয়াই সবার জন্য সবচেয়ে ভালো সমাধান। কিন্তু সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে সহায়তা চাইলে পাকিস্তান তাদের সমর্থন দেবে, এ বিষয়ে ইসলামাবাদের অবস্থান স্পষ্ট।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত দিক থেকে জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়েছে পাকিস্তান। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর সৌদি আরবে সাম্প্রতিক হামলার পর ইসলামাবাদে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বিরোধের প্রভাবের মধ্যে সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতি পাকিস্তানের জন্য দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের ভূমিকা ধরে রাখার চেষ্টা করছে ইসলামাবাদ, অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কারণে প্রয়োজন হলে রিয়াদের পাশে দাঁড়ানোর চাপও রয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তান ভূমিকা রেখেছিল। একই সময়ে দেশটির সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার হয়েছে। গত বছর স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় বর্তমানে সৌদি আরবে পাকিস্তানের হাজারো সেনাসদস্য এবং যুদ্ধবিমান ইউনিট মোতায়েন রয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে ইরানের হামলার ঘটনাতেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল ইসলামাবাদ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার পর ইরানকে ঘিরে পাকিস্তানের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কারণ, নতুন করে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গত সোমবার হুথিদের নিয়ন্ত্রিত একটি বিমানবন্দরে সৌদি আরব হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ তুলে সৌদি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে হুতিরা। এতে দীর্ঘদিনের কার্যকর যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলেও এখন পর্যন্ত সংঘর্ষ সীমিত পর্যায়েই রয়েছে। পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব ইরানকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, সৌদি আরবের ওপর হামলাকে তারা পাকিস্তানের নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পৃক্ত হিসেবে বিবেচনা করছে। এটি ইসলামাবাদের জন্য একটি ‘রেড লাইন’। নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানা বলেন, উত্তেজনা এত দ্রুত বাড়বে, তা পাকিস্তান আগে থেকে অনুমান করতে পারেনি। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন সৌদি অঞ্চলে পাকিস্তানের সেনাসদস্য মোতায়েন থাকায় পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। সংঘাত বাড়লে এসব সেনার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ইসলামাবাদের আরেকটি বড় দুশ্চিন্তা হলো লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ। এই রুটে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে পাকিস্তানসহ বহু দেশের বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের কৌশলগত স্থাপনায় হামলা হলে প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পাকিস্তানকে সামরিক পদক্ষেপ নিতে হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জেনারেল গুলাম মোস্তফা বলেন, বর্তমানে ইসলামাবাদ সব পক্ষকে সংযত রাখার চেষ্টা করছে। তবে হুতিদের হামলা আরও বিস্তৃত হলে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে পাকিস্তান। দেশটির কর্মকর্তাদের মতে, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের অবস্থানের সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আলির মতে, ইরানে নীতিনির্ধারণে সামরিক বাহিনীর প্রভাব আগের তুলনায় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পাকিস্তানও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে ইরানের একটি প্রতিনিধিদলের নির্ধারিত ইসলামাবাদ সফরও পিছিয়ে যায়। পরে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল দুদিন বিলম্বে পাকিস্তান সফর করে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসার কথা ছিল। এদিকে বৃহস্পতিবার নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দরাবি সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বর্তমান সংকট নিরসনে সংলাপ ও কূটনীতির বিকল্প নেই। বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক কূটনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে চাইলে পাকিস্তানকে একই সঙ্গে একাধিক স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। কারণ, সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপরও পাকিস্তানের অর্থনীতি অনেকাংশে নির্ভরশীল। সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হলে পাকিস্তান সরকারকে জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন জরুরি ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল। কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার মাধ্যমে শুধু কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানো নয়; বরং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাও ইসলামাবাদের অন্যতম লক্ষ্য। একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা বলেন, নানা হতাশা থাকলেও মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা থেকে সরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। কারণ, এই উদ্যোগে পাকিস্তান উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক বিনিয়োগ করেছে এবং এটি সফল হওয়াও তাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান এমন এক অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রয়োজন হলে তাকে স্পষ্টভাবে কোনো এক পক্ষের পাশে অবস্থান নিতে হতে পারে। মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের ভাষ্য, যুদ্ধ বন্ধ হওয়াই সবার জন্য সবচেয়ে ভালো সমাধান। কিন্তু সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে সহায়তা চাইলে পাকিস্তান তাদের সমর্থন দেবে, এ বিষয়ে ইসলামাবাদের অবস্থান স্পষ্ট।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর অপারেশনাল সেন্ট্রাল কমান্ড খাতাম আল-আম্বিয়ার মুখপাত্র ইব্রাহিম জুলফাগারি সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্পের হুমকি বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চলের অবশিষ্ট সমস্ত অবকাঠামো নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইব্রাহিম জুলফাগারি বলেন, “অপরাধী আমেরিকা এই অঞ্চলে তার আইনশৃঙ্খলাহীনতা ও অস্থিতিশীলতা অব্যাহত রেখেছে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, “কোনও অবস্থাতেই ইরান একটি বিদেশি ও বহিঃআঞ্চলিক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে হরমুজ প্রণালীতে হস্তক্ষেপ করতে দেবে না। এটি ইরানের অলঙ্ঘনীয় রেড লাইন।” তিনি বলেন, “যদি ফাঁপা ও অন্তঃসারশূন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের ইরানের অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার সাম্প্রতিক হুমকি কার্যকর করা হয়, তাহলে ইরানের সংযমের কারণে যা কিছু অবশিষ্ট আছে- অর্থাৎ এই অঞ্চলের সমস্ত অবকাঠামো- তা ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীর ইস্পাতের আঘাতে এমনভাবে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে যে, তার কোনও চিহ্নই অবশিষ্ট থাকবে না। এমনকি মনে হবে, যেন এগুলোর কোনও অস্তিত্বই ছিল না।” জুলফাগারি আরও সতর্ক করে বলেন, “নির্বোধ শত্রুর জেনে রাখা উচিত, আমাদের জন্য এই মহাকাব্যিক মুহূর্তটি এড়িয়ে যাওয়ার মুহূর্ত নয়। ইরানের বিরুদ্ধে কোনও হামলার জবাব সমান মাত্রায় হবে না, বরং আরও শক্তিশালী, বিস্তৃত ও ধ্বংসাত্মক হবে।” সূত্র: আল-জাজিরা
ইরানের সামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন দফার হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা বেড়েছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে টানা চতুর্থ দিনের মতো তেলের দাম বেড়েছে। স্থানীয় সময় বুধবার (১৫ জুলাই) গ্রিনিচ মান সময় রাত ১২টা ২৬ মিনিটে ব্রেন্ট ক্রুডতেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩৩ সেন্ট বা ০.৪ শতাংশ বেড়ে ৮৫.২৮ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ৪২ সেন্ট বা ০.৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮০.০২ ডলারে উঠেছে। নিসান সিকিউরিটিজ ইনভেস্টমেন্টের প্রধান কৌশলবিদ হিরোইউকি কিকুকাওয়া বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা বাড়ায় বাজারে তেল কেনার প্রবণতা জোরালো হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশগুলো এখনো মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং সাধারণভাবে মনে করা হচ্ছে, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সম্ভাবনা কম। তবে সংঘাত কীভাবে এগোয়, তার ওপর নির্ভর করে ডব্লিউটিআই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৫ থেকে ৮৭ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।’ তথ্যসূত্র: দ্য ডন