বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করে দেশকে এগিয়ে নিতে বিএনপি কাজ করছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যখন দেশকে ধ্বংস করেছে, তখন সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব বিএনপির ওপর পড়েছে। বিএনপি যখন দেশকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে, তখন একটি মহল ও একটি দল দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) জাতীয় সংসদের এলডি হল প্রাঙ্গণে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত চিকিৎসকদের সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ফখরুল বলেন, দেশকে আবারও অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক ও সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি। আমরা অতীতে দেখেছি, যখনই দেশ এগিয়ে যেতে শুরু করে, তখনই একটি মহল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশকে আবার পেছনে টেনে নেওয়ার অপচেষ্টা করে।
চিকিৎসকদের উদ্দেশে বিএনপির মহাসচিব বলেন, চিকিৎসকরা সমাজের সবচেয়ে উচ্চশিক্ষিত শ্রেণির অন্যতম এবং দেশের জন্য তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তিনি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান জানান।
মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে নতুন উন্নয়ন, মানুষের মর্যাদা এবং সমতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশ গড়ার শপথ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ফখরুল বলেন, ‘আমাদের স্লোগান হচ্ছে সবার আগে বাংলাদেশ।’
সমাবেশের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এলডি হল প্রাঙ্গণে দুটি গাছের চারা রোপণ করেন। পরে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। এরপর কবুতর ও বেলুন উড়িয়ে তারা চিকিৎসকদের সমাবেশের উদ্বোধন করেন।
ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক হারুন আল রশীদ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন— ডা. জুবাইদা রহমান, সমাজ কল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার এবং ড্যাব মহাসচিব জহিরুল ইসলাম শাকিল।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
বাংলাদেশের মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়া উচিত কি না, বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের পাশে দাঁড়াবে কি না—এমন একটি প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়। বাংলাদেশ একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। কিছু প্রশ্ন এ কারণেই সামনে আসে। বাংলাদেশ কি এমন একটি সামরিক জোটে প্রবেশ করবে, যার কৌশলগত অঙ্গীকার অন্য রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংঘাত দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর ধর্মীয় আবেগের ভিত্তিতে নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে দেওয়া উচিত। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র তার কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চয়ই অন্যের হাতে তুলে দিতে পারে না। বাংলাদেশ সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং অন্যান্য মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের সঙ্গে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বন্ধন ভাগ করে নিতে পারে। কিন্তু এসব দেশের প্রতিটি নিজস্ব জাতীয় অগ্রাধিকার, নিরাপত্তা-হিসাব এবং ভূরাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। এমন পরিস্থিতি অবশ্যই আসতে পারে, যখন তাদের স্বার্থ বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে এক হবে না। বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের অংশ—এমন ভাবনা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নীতির ভিত্তি হতে পারে না। বাংলাদেশ তার জনগণ ও দেশের নিরাপত্তার জন্য দায়বদ্ধ। একটি অস্পষ্ট, রাষ্ট্রসীমা অতিক্রমকারী বৃহত্তর সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব বাংলাদেশ নিজের ওপর নিতে পারে কি না, সে ভাবনা থাকা উচিত বিষয়টি চূড়ান্ত করার আগে। বাংলাদেশ অন্য দেশের শত্রুকে নিজের শত্রু বানাবে? সম্মিলিত প্রতিরক্ষা শুনতে আশ্বস্ত করার মতো মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এর অর্থ কী, সেটি প্রশ্ন করা জরুরি। যদি কোনো সদস্য রাষ্ট্রের ওপর হামলা হলে অন্য সদস্যদের প্রতিক্রিয়া জানানোর বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়, অথবা রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এমন একটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা বাংলাদেশ শুরু করেনি এবং নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলেও মনে করে না। কিছু সম্ভাবনা বিবেচনা করা যাক। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভবিষ্যতে কোনো সংঘাত হলে বাংলাদেশ কঠিন অবস্থায় পড়তে পারে। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সংঘাত হলেও একই ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। তুরস্ককে ঘিরে কোনো আঞ্চলিক সংঘাত সৃষ্টি হলেও বাংলাদেশের ওপর ভিন্ন ধরনের চাপ আসতে পারে। তাহলে কেন বাংলাদেশ এমন দায়িত্ব গ্রহণ করবে, যা তাকে তার তাৎক্ষণিক জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কহীন সংঘাতে পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করতে পারে? বন্ধুর শত্রু স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের শত্রু হওয়া স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। আর এ কথা নিশ্চয়ই বলা বাহুল্য হবে না যে, পাকিস্তানের কৌশলগত অগ্রাধিকার বাংলাদেশের অগ্রাধিকার নয়। পাকিস্তানের নিরাপত্তা নীতি ভারতের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। কিন্তু ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভিন্ন। পানির বণ্টন, বাণিজ্য, সীমান্ত ও আঞ্চলিক স্বার্থসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের নয়াদিল্লির সঙ্গে বৈধ মতপার্থক্য রয়েছে। এসব বিরোধ বাংলাদেশের নিজস্ব কূটনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব অনুযায়ী পরিচালিত হওয়া উচিত। শুধু পাকিস্তান একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মিত্র হওয়ার কারণে সেসব বিরোধকে বৃহত্তর সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ বানানো উচিত নয়। ১৯৭১ সালের ইতিহাস এ পার্থক্য বজায় রাখার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশের উচিত ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্ক বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ অনুযায়ী নির্ধারণ করা, ইসলামাবাদের কৌশলগত হিসাব অনুযায়ী নয়। বাংলাদেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এ বাস্তবতা যে কোনো বিমূর্ত ভূরাজনৈতিক সংহতির ধারণার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সীমান্ত, নদী, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং ব্যাপক জনগোষ্ঠীভিত্তিক যোগাযোগ ভাগ করে নেয়। তাই পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে—এমন একটি সামরিক জোটে যোগ দেওয়া বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি অপ্রয়োজনীয় কৌশলগত জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, যে সম্পর্কটি মূলত বাংলাদেশের ভূগোলই নির্ধারণ করেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, বাংলাদেশ ভারতের সব অবস্থান মেনে নেবে। এর অর্থ হলো, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বজায় রাখতে হবে। একটি সার্বভৌম বাংলাদেশকে তার একটি প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক অন্য একটি দেশের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার দ্বারা নির্ধারিত হতে দেওয়া উচিত নয়। সৌদি আরব ও তুরস্কের নিরাপত্তা-হিসাব তাদের নিজ নিজ অঞ্চল ও ইতিহাস দ্বারা প্রভাবিত। সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চল ও ইরানের বিষয় রয়েছে। তুরস্কের কৌশলগত স্বার্থ মধ্যপ্রাচ্য, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং এর বাইরেও বিস্তৃত। পাকিস্তানের রয়েছে নিজস্ব দক্ষিণ এশীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ। বাংলাদেশ এগুলো কোনোটারই অংশীদার নয়। তাই ঢাকার নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে দূরবর্তী ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্বেচ্ছায় নিয়ে আসার যৌক্তিকতা খুবই সীমিত। ইরানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি বা উপসাগরীয় কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়া জাহাজ চলাচল, জ্বালানি মূল্য, বাণিজ্যপথ এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল একটি দেশের জন্য তাই পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত শুধু সামরিক পরিণতি দিয়ে নয়, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতির দিক থেকেও মূল্যায়ন করতে হবে। একটা কথা মনে রাখা দরকার, ‘মুসলিম বিশ্ব’ কোনো একক কৌশলগত পক্ষ নয়। উম্মাহর ধারণার গভীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু এটিকে একটি ঐক্যবদ্ধ ভূরাজনৈতিক সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর কোনো অভিন্ন পররাষ্ট্রনীতি নেই। সৌদি আরব ও ইরানের আঞ্চলিক স্বার্থের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। তুরস্কের নিজস্ব কৌশলগত অগ্রাধিকার রয়েছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা উদ্বেগ ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার উদ্বেগের মতো নয়। এমনকি উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যেও আঞ্চলিক বিভিন্ন প্রশ্নে সবসময় ঐকমত্য থাকে না। অতএব, কয়েকটি দেশ একই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত—এ বাস্তবতা একাই বাংলাদেশকে তাদের সম্মিলিত নিরাপত্তা কাঠামোর অধীনে নেওয়ার যথেষ্ট কারণ হতে পারে না। ক্রমবর্ধমান বিভক্ত বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ রয়েছে—এমন দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার সক্ষমতা, যারা একে অন্যের সঙ্গে সবসময় সুসম্পর্কে থাকে না। ঢাকার দিল্লির গঠনমূলক সম্পর্ক প্রয়োজন। বেইজিংয়ের সঙ্গেও সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার প্রয়োজন। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজারভিত্তিক সম্পর্ক প্রয়োজন। তুরস্ক, জাপান এবং অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গেও সহযোগিতা বাংলাদেশের প্রয়োজন। পাশাপাশি পাকিস্তান ও ইরানের সঙ্গেও কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থ বাংলাদেশের রয়েছে। এ কূটনৈতিক নমনীয়তা দুর্বলতা নয়। এটি বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পদ। একটি আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে যোগ দিলে এ নমনীয়তা কমে যেতে পারে এবং বাংলাদেশকে জোটের ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে দেখা শুরু হতে পারে। নিরাপত্তাগত সুবিধা যদি অত্যন্ত শক্তিশালী না হয়, তাহলে এর বিনিময়ে এ কৌশলগত স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া অপ্রয়োজনীয় মূল্য হতে পারে। চুক্তির সমর্থকরা সামরিক প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, যৌথ মহড়া এবং কৌশলগত সহযোগিতার কথা বলতে পারেন। এসব অবশ্যই বৈধ ও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। কিন্তু এসব অর্জনের জন্য বাংলাদেশের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যোগ দেওয়া অপরিহার্য নয়। বাংলাদেশ নিশ্চয়ই তুরস্ক, সৌদি আরব এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর করতে পারে। প্রযুক্তি সংগ্রহ, সামরিক মহড়া, দক্ষতা বিনিময় এবং গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব—তবু কোনো সংঘাতে বাংলাদেশ কখন অংশ নেবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সার্বভৌম অধিকার বাংলাদেশের হাতে থাকবে। সহযোগিতা মানেই সামরিক জোট নয়। এ পার্থক্য বাংলাদেশকে জোটে যোগদানের পূর্ণ কৌশলগত ঝুঁকি গ্রহণ না করেই সম্ভাব্য অনেক সুবিধা অর্জনের সুযোগ দিতে পারে। সমর্থকরা যুক্তি দিতে পারেন যে, এ চুক্তি বাংলাদেশকে আরও বেশি কৌশলগত গভীরতা দেবে। কিন্তু কৌশলগত গভীরতা তখনই কার্যকর, যখন তা প্রকৃতপক্ষে নিরাপত্তা বাড়ায়। যদি একটি জোট একই সঙ্গে নতুন দায়িত্ব, নতুন ভূরাজনৈতিক নির্ভরতা এবং সম্ভাব্য নতুন প্রতিপক্ষ তৈরি করে, তাহলে যা বাইরে থেকে কৌশলগত গভীরতা বলে মনে হচ্ছে, তা বাস্তবে কৌশলগত দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে। তাই বাংলাদেশের উচিত চুক্তিটিকে সদস্য হওয়ার মর্যাদা দিয়ে নয়, বরং একটি সরল হিসাবের মাধ্যমে বিচার করা। বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক নিরাপত্তার অগ্রাধিকার সামরিক নিরাপত্তার চেয়েও বিস্তৃত। জাতীয় নিরাপত্তা শুধু অস্ত্র ও সামরিক জোটের বিষয় নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার অর্থ কর্মসংস্থান, খাদ্য, জ্বালানি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জলবায়ু সহনশীলতা, জনস্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষাও। প্রতিটি অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা অঙ্গীকারের আর্থিক ও রাজনৈতিক মূল্য রয়েছে। তাই একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এমন সামরিক দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা উচিত, যার সুফল অনিশ্চিত; কিন্তু পরিণতি যথেষ্ট বড় হতে পারে। মনে হচ্ছে বাংলাদেশি বিশ্লেষকরা, বিশেষ করে যারা এ জোটে যোগ দেওয়ার পক্ষে, তারা বিষয়টিকে ভারতের চশমা দিয়ে দেখছেন। এ জোটের ফল যদি হয় সৌদি বনাম ইরান, কিংবা তুরস্ক বনাম ইসরায়েল সংঘাত, বাংলাদেশ তখন কী ভূমিকা নেবে, সেই আলোচনা এখানে করা দরকার। কিন্তু তার বদলে বেশিরভাগ আলোচনা আবর্তিত হচ্ছে এরকম একটি জোটে যোগ দিলে কীভাবে ভারতকে ‘প্রতিরোধ’ করা যাবে, তা নিয়ে। ইসলামপন্থি শিবিরের কারও কারও কাছে মুসলিম বিশ্বের দুই বড় সামরিক শক্তি তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে হাত মেলানোর এ সুযোগ হাতছাড়া করার মতো নয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্যে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রগুলোর সমতা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবদানও এমন একটি আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার প্রতিফলন, যা কোনো সামরিক জোটের সদস্য হওয়ার চেয়ে ভিন্ন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়াও সবসময় এ নীতিতে দেশ চালিয়েছেন। আর এ কারণেই শান্তি ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতায় অবদান রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছে। তাই এমন কোনো জোট কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়ার আগে বাংলাদেশকে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে, যা ভবিষ্যতে তাকে তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের বাইরের সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে। একটি ধারণা স্পষ্ট যে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি আমেরিকার মস্তক থেকে এসেছে। এ চুক্তি আমেরিকা করিয়েছে ইরানকে আগামী দিনের হিসাবে রেখে, ইসরায়েলকে সুরক্ষা দিতে। সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরানের বিরুদ্ধে নিজে সুবিধা করতে পারেনি। এবার কাজে লাগাবে ইরানের চির শত্রু সৌদি আরবকে। সরাসরি সৌদি আরব যুদ্ধে যাবে না। তাই সঙ্গে নিয়েছে তুরস্ক আর পাকিস্তানকে। আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরও কড়াকড়ি করবে আর সৌদিদের দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী যুদ্ধের ময়দান খুলতে যাচ্ছে আমেরিকা। পয়সা ঢালবে সৌদি আরব, অস্ত্র বেচবে তুরস্ক ও আমেরিকা আর কিছু ডলার পাবে পাকিস্তান। আমাদের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন কীভাবে এ চুক্তিকে দেখছে, তা কি আমরা বিবেচনায় নিয়েছি? এসব প্রশ্নের জবাবই আসলে দিন শেষে ঠিক করবে বাংলাদেশের করণীয়।
কওমি মাদরাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জ্ঞাপন করে তাদের দেশপ্রেম এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সাহসী ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। দেশমাতৃকার যে কোনো প্রয়োজনে এভাবেই সজাগ থাকার জন্য তাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। শনিবার (২৯ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এক পোস্টে এসব কথা লেখেন। পোস্টে লেখা হয়, ‘কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা আমার কাছে সবসময় প্রিয়। দেশ ও জনগণের স্বার্থে তারা কখনো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে না।’ সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানে কওমি মাদ্রাসা কেন্দ্রিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগ ও সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়টি উল্লেখ করে পোস্টে আরও বলা হয়, ‘গণঅভ্যুত্থানে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভূমিকা অপরিসীম। আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই। দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষায় কওমি তরুণদের অগ্রণী ভূমিকা প্রত্যাশা করে পরিশেষে বলা হয়, ‘দেশমাতৃকার প্রয়োজনে সজাগ থাকো হে বীর দেশপ্রেমিক শিক্ষার্থীরা।’ ফেসবুকে এই বার্তাটি ছড়িয়ে পড়ার পর কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের নেটিজেনদের মাঝে ইতিবাচক সাড়া দেখা গেছে। অনেকে মন্তব্যের ঘরে কওমি শিক্ষার্থীদের অতীত ও বর্তমানের বিভিন্ন জাতীয় সংকটে পালন করা ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করছেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উদাহরণ টেনে দেওয়া বক্তব্যে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। শনিবার (২৯ আগস্ট) বেলা পৌনে ২টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ দুঃখ প্রকাশ করেন। হাসনাত আবদুল্লাহ লিখেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহি চেয়ে সংসদে দেওয়া বক্তব্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ায় তিনি দুঃখিত। পোস্টে তিনি দাবি করেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের কনসার্ট বন্ধের ঘটনাটি গণমাধ্যমে যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়ে ভিন্ন ছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে উচ্চ শব্দের কারণে মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছিল। এ কারণে শিক্ষার্থীরা শব্দ কমানোর অনুরোধ করেন। পরে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশের লাঠিপেটায় আহত হন। হাসনাত বলেন, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কনসার্ট বন্ধ করেনি; তারা শুধু শব্দ কমানোর অনুরোধ করেছিল। তাই এ ঘটনাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে নৌকাবাইচের বিষয়ে নিজের তথ্যগত ভুলের কথা স্বীকার করেছেন হাসনাত। তিনি জানান, সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় সিলেটের পরিবর্তে ভুল করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাম উল্লেখ করেছিলেন। এ ভুলের কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ায় তিনি বিব্রত এবং দুঃখিত। হাসনাত আরও বলেন, সংসদে মূল ঘটনা এবং গণমাধ্যমে বিষয়টির উপস্থাপন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন ছিল। তবে সম্পূরক প্রশ্নের জন্য নির্ধারিত সময় সীমিত থাকায় তিনি বিস্তারিত বলার সুযোগ পাননি। ‘এই বাংলাদেশ সবার’ নিজের পোস্টে বাংলাদেশের বহুত্ববাদী চরিত্রের ওপরও গুরুত্ব দেন এনসিপির এই নেতা। তিনি বলেন, দেশে মসজিদ, মন্দির, সংগীত, ওয়াজ, মাজার, কনসার্ট, মাহফিল, রথযাত্রা ও সিনেমা উৎসব—সবই থাকবে। যে যার পছন্দের কর্মকাণ্ডে অংশ নেবেন এবং অন্যের পছন্দের প্রতি সম্মান দেখাবেন। তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্ব হলো প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যাতে কেউ অন্যের ওপর নিজের মতামত বা বিশ্বাস চাপিয়ে দিতে না পারে। হাসনাতের ভাষায়, ‘জুলাই’ একটি সর্বজনীন সমাজের স্বপ্ন দেখায়, যেখানে সবার অধিকার নিশ্চিত হবে এবং মতপার্থক্য থাকলেও কেউ অন্যের ওপর নিজের মত চাপিয়ে দিতে পারবে না। এই আদর্শের প্রতি তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন বলেও উল্লেখ করেন। যে বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে সম্পূরক প্রশ্ন করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। সেখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ওই এলাকায় গান-বাজনা ও নৌকাবাইচ বন্ধ হয়ে গেছে। গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যাপ্ত ভূমিকা রাখতে পেরেছেন কি না, সে প্রশ্নও করেন তিনি। এর প্রতিবাদে শুক্রবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ। তারা হাসনাতের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। এ ছাড়া, তাঁর বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমালোচনা শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই শনিবার নিজের ফেসবুক পোস্টে বক্তব্যের কারণে সৃষ্ট ভুল-বোঝাবুঝির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। এনসিপির পক্ষ থেকেও হাসনাতের দুঃখপ্রকাশের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে তা ফটোকার্ড আকারে প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।