মোহাম্মদপুরের আঁখিরা ইসলামের এখনও দুই দশক আগের কথা মনে পড়ে, যখন দেশলাইয়ের কাঠি বাঁচাতে কিংবা কাপড় শুকাতে ঢাকার অনেক বাসায় দিনের পর দিন গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখা হতো।
স্বামীর সরকারি চাকরির কারণে দীর্ঘদিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় থাকতে হয়েছে আঁখিরাকে। পরে সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় স্থায়ী হওয়ার সময় তিনি ভেবেছিলেন, রান্নার ঝক্কি বুঝি এবার অনেকটাই কমবে। পাইপলাইনে গ্যাস থাকবে; চুলা জ্বালালেই রান্না করা যাবে।
রান্নাঘরের সেই নিশ্চয়তা এখন তার কাছে অনেকটাই অতীত। গ্যাসের চাপ কখন বাড়বে, কখন চুলা জ্বলবে, তার ঠিক নেই। ফলে চুলা জ্বললেই রান্নার কাজ যতটা সম্ভব সেরে ফেলার চেষ্টা করেন আঁখিরা।
এর মধ্যে আরেকটি বিষয়ও তাকে ভাবায়। তার চুলায় যে গ্যাস জ্বলে, তার একটি অংশ কাতারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে জাহাজে করে আনা হয়। একসময় এত সহজে পাওয়া গ্যাসের জন্য এখন বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, বিষয়টি এখনও তার কাছে বিস্ময়ের।
“আমাদের দেশের এত গ্যাস গেল কোথায়,” প্রশ্ন করেন আঁখিরা।
তার বাসা থেকে হাঁটা পথের দূরত্বে মোহাম্মদিয়া হাউজিং লিমিটেডে থাকেন সুরাইয়া জান্নাত। তার অভিজ্ঞতা কিছুটা আলাদা। তবে বদলে যাওয়া জ্বালানি পরিস্থিতি তার রান্নাঘরও পাল্টে দিয়েছে।
উচ্চশিক্ষার জন্য গ্রাম থেকে ঢাকায় এসে প্রথমে হোস্টেলে থাকতেন সুরাইয়া। মাঝেমধ্যে নিজেরাই রান্না করতেন। সেই সময় তিনিও অনেককে গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে কাপড় শুকাতে দেখেছেন।
সংসার শুরুর পর ধীরে ধীরে গ্যাসের সেই প্রাচুর্য হারিয়ে যেতে দেখেন তিনি। নানা সংকটের মধ্যেও কয়েক বছর পাইপলাইনের গ্যাসে রান্না করেছেন।
ছয় মাস আগে বাসা বদলের পর বদলে গেছে রান্নার জ্বালানিও। নতুন বাসায় পাইপলাইনের গ্যাস নেই। এখন এলপিজি সিলিন্ডারই তার ভরসা। কিন্তু সেখানেও নিশ্চয়তা নেই।
সুরাইয়ার অভিযোগ, সরকার যে দাম ঠিক করে দেয়, সেই দামে তিনি সিলিন্ডার কিনতে পারেন না। বাজারে বাড়তি টাকা দিতে হয়। আবার দাম বাড়ার খবর ছড়ালে কখনও সিলিন্ডার পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে।
একসময় যে গ্যাসের আগুনে মানুষ কাপড় শুকাত, সেই গ্যাসই এখন তার সংসারের বড় খরচগুলোর একটি, বলছিলেন সুরাইয়া।
আঁখিরা অপেক্ষা করেন পাইপলাইনে চাপ বাড়ার; আর সুরাইয়া অপেক্ষা, সহনীয় দামে সিলিন্ডার পাওয়া।
ঢাকার এই দুই রান্নাঘরকে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার বদলে যাওয়া চেহারার প্রতিচ্ছবি বলা যায়।
একসময় দেশীয় গ্যাস ছিল সহজলভ্য জ্বালানি। এখন সেই সরবরাহে বড় জায়গা করে নিয়েছে আমদানি করা এলএনজি ও এলপিজি।
এমন বাস্তবতায় ৯ অগাস্ট পালিত হচ্ছে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস।
১৯৭৫ সালের এই দিনে পাকিস্তান শেল অয়েল কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে থাকা তিতাস, হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ, রশিদপুর ও কৈলাসটিলা গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ নেয় বাংলাদেশ।
যুক্তরাজ্যের শেল অয়েলের হাতে থাকা পরিচালনাকারী কোম্পানির ৭৫ শতাংশ শেয়ার প্রায় ৪৫ লাখ পাউন্ড স্টার্লিংয়ে কিনে নেয় সরকার। তখনকার হিসাবে এর মূল্য ছিল প্রায় ১৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
এর মধ্য দিয়ে পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র, কূপ ও উৎপাদন স্থাপনার পরিচালনা রাষ্ট্রের হাতে আসে। পরে কোম্পানিটির নাম হয় বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড।
গ্যাসকূপের মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে পাওয়ার সেই সিদ্ধান্ত স্মরণে ২০১০ সাল থেকে ৯ অগাস্ট জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস পালিত হচ্ছে।
পাঁচ দশকের বেশি সময় পরও সেই পাঁচ ক্ষেত্র দেশীয় গ্যাসের বড় উৎস হয়ে আছে এখনও। কিন্তু এর মধ্যে বদলে গেছে দেশের জ্বালানি ব্যবহারের মানচিত্র। জ্বালানি চাহিদার স্থানীয় উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে যুক্ত হয়েছে আমদানি করা এলএনজি।
২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হলেও সেই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে তোলার ব্যবস্থা এখনও মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল।
জাহাজে এলএনজি এলেও এফএসআরইউ সচল না থাকলে সেটি গ্যাসে রূপান্তর করে পাইপলাইনে দেওয়া যায় না। ফলে এই দুটি টার্মিনালের কোনো একটিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খারাপ আবহাওয়া বা কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলেই তার প্রভাব সরাসরি জাতীয় সরবরাহে পড়ে।
গত কয়েক বছরেই এমন ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। ২০২৪ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় রেমালের সময় একটি ভাসমান পন্টুন সামিটের এফএসআরইউতে আঘাত করলে টার্মিনালের ব্যালাস্ট ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন দৈনিক প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে কমে যায়।
স্বাভাবিক সময়ে দুই টার্মিনাল থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি পাওয়া গেলেও সেই সময় সরবরাহ ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমেছিল। টার্মিনালটি পুরোদমে চালু করতে লেগে যায় তিন মাসের বেশি।
চলতি বছরের ২১ এপ্রিল এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে মাত্র ছয় ঘণ্টার কারিগরি ত্রুটিতেই জাতীয় গ্রিড থেকে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যায়। তাতে গ্যাসের চাপ কমে যায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সোনারগাঁ ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে।
এরপর ৭ জুলাই বঙ্গোপসাগরে খারাপ আবহাওয়ার কারণে সামিটের টার্মিনালে একটি এলএনজি জাহাজ ভিড়তে না পারায় সরবরাহ আবার দৈনিক প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যায়।
এর দুই সপ্তাহ পর ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউতে আগুন ও কারিগরি ত্রুটির পর দৈনিক আরও প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। টার্মিনালটি সাধারণত দৈনিক ৫০০ থেকে ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দেয়।
অর্থাৎ জুলাইয়ের সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরের ঘটনা প্রবাহে উঠে এসেছে, আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও সেই গ্যাস গ্রহণের অবকাঠামোতে এখনো যথেষ্ট বিকল্প তৈরি হয়নি।
মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনালের একটিতে সমস্যা হলেই কয়েকশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। আগে থেকেই ঘাটতিতে থাকা জাতীয় গ্রিডে তখন তার ধাক্কা লাগে, যার রেশ দ্রুতই পৌঁছে যায় রান্নাঘর, সিএনজি স্টেশন, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানায়।
গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হওয়ার আগে দুই টার্মিনাল মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হচ্ছিল।
২০ জুলাই সকাল থেকে পরের ২৪ ঘণ্টায় সরবরাহ ছিল ৯৯৩ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট। পরের দিন তা নেমে আসে ৬২১ দশমিক ৫৮ মিলিয়ন ঘনফুটে। কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ২৬ জুলাই সকাল থেকে পরের ২৪ ঘণ্টায় এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে ৫০০ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ টার্মিনাল বিকলের আগের তুলনায় আমদানি করা গ্যাসের প্রায় অর্ধেক সরবরাহ কমে যায়।
কুমিল্লার হেলালউদ্দিন ঢাকায় সিএনজি অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালান। গত মঙ্গলবার বিকাল ৪টার দিকে মহাখালীর রয়েল ফিলিং স্টেশনের সামনে তার সঙ্গে যখন কথা হয়, ততক্ষণে সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে লাইনে ছিলেন তিনি। সামনে তখনও গাড়ির সারি। কখন গ্যাস পাবেন, সেটি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছিল না।
কোথায় কী হয়েছে, কেন হঠাৎ গ্যাস মিলছে না, সেই হিসাবও হেলালউদ্দিনের জানা নেই। তার হিসাব আরও সহজ। গাড়ি যতক্ষণ লাইনে, ততক্ষণ আয় নেই। গ্যাস পেলেও আগের মতো নিশ্চিন্ত হওয়া যাচ্ছে না। চাপ কম থাকায় অনেক সময় পুরো ট্যাংক ভরছে না। অল্প গ্যাস নিয়ে কয়েকটি ট্রিপ দেওয়ার পর আবার ফিরতে হচ্ছে কোনো ফিলিং স্টেশনের লাইনে।
মগবাজারে সিএনজি নিতে আসা চালক সেলিম মিয়ার অভিজ্ঞতাও একই।
তার ভাষ্য, আগে একবারে প্রায় ৩০০ টাকার গ্যাস নেওয়া যেত। এখন অনেক সময় ১০০ থেকে ১২০ টাকার বেশি পাওয়া যায় না। সেই গ্যাসে দু-একবার যাত্রী বহন করলেই আবার লাইনে দাঁড়াতে হয়। দিনে দুই দফায় তিন ঘণ্টা করে অপেক্ষা হলে ছয় ঘণ্টা চলে যায় শুধু জ্বালানির পেছনে।
টার্মিনাল বিকল হওয়ায় ৪ অগাস্ট সকাল থেকে পরের ২৪ ঘণ্টায় দেশীয় ক্ষেত্র ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ১৪০ দশমিক ৩ মিলিয়ন ঘনফুট।
ওই দিন গ্যাসের চাহিদা ছিল ৩ হাজার ৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ ওই দিন চাহিদার প্রায় ৫৬ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছিল। এলএনজি থেকে এসেছিল ৪৯০ দশমিক ৭ মিলিয়ন ঘনফুট।
এই ঘাটতির প্রভাব শুধু সিএনজি স্টেশনে ছিল না। অনেক বাসায় দিনের বেলায় চুলা জ্বলেনি। কোথাও ইন্ডাকশন চুলায় রান্না হয়েছে, কোথাও রান্নার সময় সরিয়ে নিতে হয়েছে গভীর রাতে। শিল্পকারখানাতেও গ্যাসের চাপ কমেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র ধুঁকেছে জ্বালানির সংকটে, বেড়েছে লোডশেডিং।
দুই সপ্তাহের বেশি সময় পর ৬ অগাস্ট ভোরে বিকল টার্মিনালের একটি অংশ আবার চালু হয়। শুরুতে সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হচ্ছিল।
বাড়ছে না দেশীয় উৎস
জুলাইয়ের সংকটের মধ্যেই আরেকটি হিসাবও সামনে আসে। পাঁচ দশকের বেশি সময় আগে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র এখনও দেশীয় উৎপাদনের বড় উৎস।
গত ৪ থেকে ৫ অগাস্টের পেট্রোবাংলার হিসাবে, তিতাস থেকে দৈনিক ৩৩৩ দশমিক ৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এসেছে। হবিগঞ্জ থেকে ১০২ দশমিক ৩ মিলিয়ন, বাখরাবাদ থেকে ১৮ দশমিক ২ মিলিয়ন এবং রশিদপুর থেকে ৭০ দশমিক ১ মিলিয়ন ঘনফুট।
কৈলাসটিলার দুটি স্থাপনা থেকে পাওয়া গেছে আরও ৪৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট। সব মিলিয়ে ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পাঁচটি ক্ষেত্র থেকে ওই দিন এসেছে ৫৬৯ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
দেশীয় ক্ষেত্রগুলোর মোট উৎপাদন ছিল প্রায় ১ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ পাঁচটি ক্ষেত্র এখনও দেশীয় গ্যাসের প্রায় সাড়ে ৩৪ শতাংশ দিচ্ছে।
এই হিসাব পঞ্চাশ বছর আগের ওই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব পরিস্কার করে। একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলে, এত বছরেও নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার ও উৎপাদন বাড়িয়ে পুরোনো ক্ষেত্রগুলোর ওপর নির্ভরতা কেন কমানো গেল না।
আবার ঝুঁকিটা শুধু পুরোনো পাঁচ ক্ষেত্রের ওপর নির্ভরতায় নয়। গত ৪ থেকে ৫ অগাস্ট বিবিয়ানা ক্ষেত্র একাই ৭৪৭ দশমিক ১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিয়েছে। অর্থাৎ দেশীয় উৎপাদনের প্রায় ৪৫ শতাংশ এসেছে একটি ক্ষেত্র থেকে। তিতাস যোগ করলে এই দুই ক্ষেত্র থেকেই এসেছে দেশীয় গ্যাসের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। অর্থাৎ, দেশীয় উৎপাদন অল্প কয়েকটি বড় ক্ষেত্রের ওপর কেন্দ্রীভূত।
অন্যদিকে আমদানি করা এলএনজি গ্রহণের দুটি ভাসমান টার্মিনালও মহেশখালীর একই এলাকায়। অর্থাৎ, আমদানির অবকাঠামোও একই এলাকায় কেন্দ্রীভূত। ফলে এসব সরবরাহ ব্যবস্থার যেকোনো ত্রুটিতে তার চাপ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায়।
দেশীয় উৎসে জোর, ফল পেতে সময়
এই নির্ভরতা কমাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার কথা বলছে পেট্রোবাংলা।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত অনুসন্ধান কোম্পানি বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে দুটি নতুন খনন রিগ কেনা হচ্ছে। একটির ক্ষমতা ২ হাজার অশ্বশক্তি, অন্যটির দেড় হাজার অশ্বশক্তি।
তবে নতুন কূপ থেকে গ্যাস পেতে সময় লাগে বলে মনে করিয়ে দেন তিনি।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেন, ভূতাত্ত্বিক জরিপ, সম্ভাব্যতা যাচাই, সরকারি সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক দরপত্র ও খননসহ পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় এক বছর লেগে যেতে পারে।
“সরকার দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৎপর, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।”
পুরনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমবে এবং নতুন কূপ থেকে গ্যাস পেতে যে সময় লাগবে, তা আগে থেকেই জানা ছিল। কিন্তু নতুন উৎস থেকে যে গ্যাস যোগ হয়েছে, তা পুরনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমার ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তার আলোচনায় এখন শুধু কতটি কূপ খনন হবে, সেই লক্ষ্য নয়, কবে সেখান থেকে কত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে, সেই হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গ্যাসের সংকট রপ্তানি কারখানাতেও
রান্নাঘর ও সিএনজি স্টেশনের বাইরে গ্যাসের সংকটের ছাপ পড়েছে শিল্পাঞ্চলে।
ইভেন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরীর হিসাবে, নারায়ণগঞ্জ, আশুলিয়া ও গাজীপুরের অনেক কারখানায় উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোর সমস্যাটা শুধু উৎপাদন কমে যাওয়ায় থেমে নেই। গ্যাসের অভাবে সময়মতো পণ্য তৈরি ও পাঠানো যাচ্ছে না। এতে বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
সময়মতো পণ্য দিতে না পারলে ক্রেতারা মূল্যছাড় চাইছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উড়োজাহাজে পণ্য পাঠানোর বাড়তি খরচও কারখানার ওপর চাপানোর চেষ্টা হচ্ছে। সংকট দীর্ঘ হলে ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশেও প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
আনোয়ার-উল আলম বলেন, “কাস্টমাররা যখন দেখে যে এই গ্যাসের জন্য ডেলিভারি মানে এনার্জির জন্য ডেলিভারি ডিলে হচ্ছে এবং এটা একটা আনসার্টেন তখন তাদের মধ্যে একটা পেনিক কাজ করে।”
তার মতে, তাৎক্ষণিক সংকটে কোন খাতে কত গ্যাস দেওয়া হবে, সেই ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে হবে।
শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা ও অন্য জ্বালানি বেশি ব্যবহারের কথা বলেন তিনি। সার কারখানায় গ্যাসের ব্যবহার কিছুটা কমিয়ে প্রয়োজনীয় সার আমদানি এবং সিএনজি খাতে গ্যাস সরবরাহ ধীরে কমানোর পরামর্শও দেন।
পাশাপাশি পাইপলাইন ও ব্যবহারে অপচয় কমানোর ওপর জোর দেন তিনি। মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে নতুন এলএনজি টার্মিনাল, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং কূপ খনন বাড়ানোর কথাও বলেন এই ব্যবসায়ী নেতা।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়লে কমবে আমদানি ঝুঁকি
দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। সুলভে আমদানির সুযোগ পাওয়া গেলে তা অনেক সময় অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়, যার ধকলে টান পড়ে দেশের রিজার্ভে। আবার টার্মিনালে সমস্যা হলে সরবরাহ কমে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঝুঁকি কমানোর একটি পথ হতে পারে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো।
সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আনার লক্ষ্য রয়েছে। তবে সেই লক্ষ্য থেকে এখনও অনেক দূরে বাংলাদেশ।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ছিল মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সময়ে বিশ্বে এই হার ছিল প্রায় ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ। আর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের স্থাপিত সক্ষমতা ছিল ১ হাজার ৬৯০ দশমিক ৭ মেগাওয়াট। ২০৩০ সালের লক্ষ্য পূরণে সক্ষমতা প্রায় ৫ হাজার ৮৫১ মেগাওয়াটে নিতে হবে বলে হিসাব করেছে আইইইএফএ। এজন্য ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে প্রায় ৭৬০ মেগাওয়াট নতুন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা যোগ করতে হবে।
আইইইএফএর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম মনে করেন, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ বাড়লে দিনের বেলায় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। সেই গ্যাস শিল্পসহ অন্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে শুধু সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে জ্বালানি সংকটের সমাধান হবে না বলে মনে করেন তিনি। রাতের বিদ্যুৎ চাহিদা, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি এবং গ্রিডের স্থিতিশীলতার জন্য গ্যাসের প্রয়োজন থাকবে। তাই নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনও বাড়াতে হবে।
তার মতে, দেশীয় গ্যাস, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ব্যাটারি স্টোরেজকে একই পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে। কোন সময়ে কোন উৎসের বিদ্যুৎ ব্যবহার হবে, সেটিও আগেই ঠিক করতে হবে।
আইইইএফএর আরেক হিসাব বলছে, এক মেগাওয়াটের একটি রুফটপ সোলার প্রকল্প বছরে প্রায় ২ কোটি ২৪ লাখ টাকার জ্বালানি আমদানি ব্যয় সাশ্রয় করতে পারে। ফলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ বাড়ানো শুধু পরিবেশের প্রশ্ন নয়, আমদানি করা জ্বালানির দাম ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা কমানোরও একটি উপায় হতে পারে বাংলাদেশের জন্য।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানি দ্রুত বেড়ে চলেছে। সম্প্রতি অতিবৃষ্টিতে উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নেমে হ্রদে পানির উচ্চতা বেড়ে যায়, যা বিপৎসীমায় পৌঁছেছে। এতে রাঙামাটি সদর, বাঘাইছড়ি, লংগদু, বরকল ও জুরাছড়িসহ জেলার হ্রদবেষ্টিত বিভিন্ন এলাকায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। ডুবে গেছে রাঙামাটি পর্যটন মোটেলের আকর্ষণীয় ঝুলন্ত সেতুটি। পরিস্থিতি সামাল দিতে বর্তমানে প্রতি সেকেন্ডে ৫৮ হাজার কিউসেক পানি ছাড়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কাপ্তাই পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কর্ণফুলী পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) মাহমুদ হাসান জানান, কাপ্তাই হ্রদের অতিরিক্ত পানির চাপ কমাতে বাঁধের স্পিলওয়ের ১৬টি জলকপাট ৩ ফুট করে খুলে দিয়ে পানি ছাড়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। হ্রদ থেকে পানি ছাড়ার কারণে ভাটির অঞ্চলের লোকজনকে সতর্ক থাকতে অনুরোধ করা হয়েছে। তিনি জানান, শনিবার (২৯ আগস্ট) রাত ৮টার দিকে পানি ছাড়া শুরু হয়। এ সময় প্রতিটি গেট ৬ ইঞ্চি করে খুলে প্রায় ৯ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদীতে নিষ্কাশিত হয়েছে। পরে এদিন রাত সাড়ে ১০টার পর আবার পানি ছাড়ার পরিমাণ বাড়িয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৮ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশন করা হয়েছিল। এরপরও পরিস্থিতি অনুকূলে না আসায় রোববার (৩০ আগস্ট) সকাল ১০টায় প্রতিটি গেট ৩ ফুট করে খুলে দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ৫৮ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশন করা হচ্ছে। রোববার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত হ্রদে পানির স্তর ছিল ১০৬ দশমিক ০২ ফুট বা এমএসএল (মিন সি লেভেল)। কাপ্তাই হ্রদের সর্বোচ্চ পানির ধারণক্ষমতা ১০৯ ফুট। এর ১০৫ ফুট পার করলে বিপৎসীমা ধরা হয়। তিনি আরও জানান, বর্তমানে কাপ্তাই পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিট চালু রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। এর মাধ্যমে আরও প্রায় ৩২ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনে পানি ছাড়ার পরিমাণ বাড়ানো বা কমানো হতে পারে। এ কারণে কাপ্তাই, রাঙামাটি ও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। এদিকে কাপ্তাই হ্রদে দ্রুত পানি বেড়ে যাওয়ায় রাঙামাটি সদরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বহু ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, স্থাপনা ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। বাঘাইছড়িতে রাস্তাঘাট তলিয়ে যোগাযোগ বিঘ্নিত হচ্ছে। তবে রোববার দুপুর থেকে পানি সরে যেতে শুরু করেছে বলে জানান বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা মারজান। রাঙামাটি পর্যটন মোটেলের আকর্ষণীয় ঝুলন্ত সেতুটি আধা ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে বলে জানান মোটেলের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা।
রাজধানীর পুরান ঢাকার লালবাগ ট্রাফিক বিভাগের আওতাধীন ছয়টি থানা এলাকায় যানজট, সড়ক ও ফুটপাত দখল, অবৈধ পার্কিং, অটোরিকশার দৌরাত্ম্যসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক লালবাগ বিভাগ। সভায় যানজটের চারটি বড় ‘হটস্পট’ চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়। শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে পুরান ঢাকার আজিমপুর নিউ পল্টনে ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-লালবাগ) কার্যালয়ে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে লালবাগ ট্রাফিক বিভাগের ডিসি মো. মফিজুল ইসলাম, এডিসি এহসানুল কামরান তানভীর, লালবাগ জোনের এসি মাহাতাব হোসেন, কোতোয়ালি জোনের এসি একেএম মনজুরুল আলমসহ বিভিন্ন এলাকার টিআই ও সার্জেন্টরা উপস্থিত ছিলেন। ডিসি মফিজুল ইসলাম বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয়টি থানা এলাকায় সড়ক দখলমুক্ত ও যানজট নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত কার্যক্রম চলছে। এতে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে পুরোপুরি সমাধানে পুলিশের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ঢাকায় অটোরিকশা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকার আইন প্রণয়নসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও জীবিকা বা ছোট ব্যবসা হিসেবে অটোরিকশা নামিয়েছেন। তাদের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হয়। তবে নিয়মবহির্ভূত ও আইনভঙ্গকারী অটোরিকশার বিরুদ্ধে মামলা, ডাম্পিংসহ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পর্যাপ্ত ডাম্পিং ব্যবস্থা না থাকায় জব্দ করা গাড়ি দীর্ঘদিন আটকে রাখা সম্ভব হয় না। তাই অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন। চার ‘হটস্পট’ ট্রাফিক বিভাগ ফুলবাড়িয়া, বাদামতলী, ধোলাইখাল ও ভিক্টোরিয়া পার্কসংলগ্ন বাসস্টপ এলাকাকে যানজট ও সড়ক প্রতিবন্ধকতার বড় চারটি স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ফুটপাত ও সড়ক দখল, অবৈধ পার্কিং এবং অতিরিক্ত যানবাহনের কারণে এসব এলাকায় নিয়মিত যানজট হয়। ডিসি বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে এসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। ফুলবাড়িয়ায় বিআরটিসি বাসস্টপ নিয়ে আগেও সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ঢাকার বাইরে বাসস্টপ করার কথা থাকলেও জায়গার সংকটে সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য বর্তমানে সেখানে বাস রাখা হচ্ছে। বিআরটিসির প্রায় ৩৫০টি বাসের তুলনায় পর্যাপ্ত জায়গা নেই। তাই বাস রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জায়গা দেওয়ার বিষয়টি প্রশাসন ও সরকারকে জানানো হয়েছে। তিনি জানান, বিআরটিএ থেকে রুট পারমিটের তালিকা নেওয়া হয়েছে। নিয়মিত অভিযানে গাড়ির হেডলাইটসহ ফিটনেস পরীক্ষা করা হচ্ছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা ও ডাম্পিং করা হচ্ছে। ছয় মাসে ৩০ হাজার মামলা ডিসি জানান, গত ছয় মাসে বিভিন্ন যানবাহনের বিরুদ্ধে ৩০ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। জরিমানা আদায় হয়েছে ৫৫ লাখ ২৬ হাজার টাকার বেশি। বাসসহ বিভিন্ন পরিবহনের বিরুদ্ধে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, ৩ থেকে ৫ শতাংশ মানুষ আইন না মানলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ আইন অমান্য করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন। তাই মামলা-জরিমানার পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা জরুরি। যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক ও কমিউনিটি পুলিশ কাজ করছে। তবে ট্রাফিক বিভাগে পর্যাপ্ত জনবল সংকট রয়েছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নে আজিমপুরের রেন্ট-এ-কার স্ট্যান্ড সাংবাদিকরা আজিমপুর গোরা শহীদ মাজারসংলগ্ন সড়কে রেন্ট-এ-কার স্ট্যান্ড থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিসি মফিজুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি নিয়ে আগেও গণমাধ্যমে সংবাদ হয়েছে। সংবাদ প্রকাশের পর এবং রাস্তা-ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে কয়েকবার স্ট্যান্ডটি সরানো হয়েছে। কিন্তু উচ্ছেদের পর আবার গাড়ি রাখা হচ্ছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে, যাতে সেখানে ফের স্ট্যান্ড বসতে না পারে। বাবুবাজারে সিএনজি নিয়ে প্রশ্ন বাবুবাজার ব্রিজ এলাকায় দীর্ঘদিনের সিএনজি সমস্যা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিসি বলেন, আগে সেখানে ব্যাপক যানজট থাকলেও গত এক বছর ধরে পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি সিএনজি চলাচল করে, যার অনেকগুলোরই ঢাকার বাইরের নম্বর। তিনি বলেন, স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন এলাকার মানুষ সেখানে সিএনজি রাখার অনুরোধ করেছেন। বিশেষ করে মিটফোর্ড হাসপাতালে রোগীদের যাতায়াতে পরিবহন সংকট বিবেচনায় সিএনজি রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যদিও আইনগতভাবে সেখানে সিএনজি রাখা নিষিদ্ধ। ডিসি বলেন, যাত্রী নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি বা অর্থনৈতিক কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। বর্তমানে নির্বাচিত সরকার রয়েছে। তিনি দায়িত্বে থাকা পর্যন্ত জনভোগান্তি মেনে নেওয়া হবে না এবং সরকারও এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেবে না। নবাবগঞ্জ সেকশনে লেগুনা নিয়ে প্রশ্ন সাংবাদিকরা নবাবগঞ্জ সেকশন ঢাল এলাকায় প্রায় দুই শতাধিক অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন লেগুনা এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বেপরোয়া চলাচল নিয়ে প্রশ্ন করেন। লালবাগ জোনের এসি মাহাতাব হোসেন বলেন, এসব লেগুনার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, মামলা ও ডাম্পিং করা হচ্ছে। তিনি স্বীকার করেন, অধিকাংশ গাড়িরই ফিটনেস নেই। তিনি বলেন, এলাকায় সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষ বেশি চলাচল করায় ট্রাফিক পুলিশ মানবিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে। অনেক চালককে অপ্রাপ্তবয়স্ক মনে হলেও তাদের ভোটার আইডি ও ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে। ফলে আইনগতভাবে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকসহ অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সভায় কর্মকর্তারা বলেন, পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ ও বাণিজ্যিক এলাকায় সড়কের তুলনায় যানবাহনের চাপ বেশি। এর সঙ্গে ফুটপাত দখল, অবৈধ পার্কিং, নির্ধারিত স্থান ছাড়া যাত্রী ওঠানামা ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন যুক্ত হয়ে যানজট বাড়াচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও সাধারণ নাগরিকদের সচেতনতা এবং সহযোগিতা প্রয়োজন।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) জোরপূর্বক পুশইন করা দুই নারীসহ ৩ জনকে আটক করেছে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে স্থানীয়দের সহায়তায় তাদের আটক করে কমলগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করেন বাহিনীর সদস্যরা। আটকরা হলেন নড়াইল সদর উপজেলার সিঙ্গা শোলপুর গ্রামের রানা মোল্লা (২৪), তার স্ত্রী মাহমুদা আক্তার লিমা (২২) এবং খুলনা জেলার বেজেরডাঙ্গা গ্রামের ময়না খাতুন (২০)। স্থানীয় ও আনসার সূত্রে জানা যায়, শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়ন (৪৬ বিজিবি)-এর দেবলছড়া বিওপির বকসিটিলা সীমান্ত এলাকা দিয়ে শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বিএসএফ ওই ৩ জনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দেয়। বিষয়টি দেখতে পেয়ে স্থানীয় জনতা তাদের ঘিরে রাখে। খবর পেয়ে উপজেলা আনসার সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে নিরাপদ হেফাজতে নেন। পরে পরিচয় শনাক্তকরণ ও আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সকাল সোয়া ৯টায় তাদের কমলগঞ্জ থানায় সোপর্দ করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃতরা জানান, জীবিকার সন্ধানে প্রায় দুই মাস আগে সিলেট সীমান্ত দিয়ে তারা ভারতে গিয়েছিলেন। শনিবার ভোরে বিএসএফ সদস্যরা তাদের চোখ বেঁধে বকসিটিলা সীমান্ত দিয়ে জোরপূর্বক বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দেয়। পরে সকাল সোয়া ৯টার দিকে তাদের কমলগঞ্জ থানা পুলিশের নিকট সোপর্দ করা হয়। কমলগঞ্জ থানার ওসি কমর উদ্দিন বলেন, আটকদের প্রাথমিক পরিচয় শনাক্ত করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে তারা বাংলাদেশি। কাজের তাগিদে কয়েক মাস আগে অবৈধভাবে ভারতে গিয়েছিলেন। ইতোমধ্যেই তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। স্বজনরা এলে আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।