বাংলাদেশের প্রধান রফতানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) তৈরি পোশাক রফতানিতে উদ্বেগজনক প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। শুধু রফতানি আয়ই নয়, একইসঙ্গে রফতানির পরিমাণ (ভলিউম) এবং ইউনিট মূল্য—তিনটি সূচকেই ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি সাময়িক বাজার মন্দার প্রভাবের চেয়ে বেশি; বরং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও পণ্যের মূল্যসংযোজন নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে বড় ধাক্কা
মূল্য, পরিমাণ ও ইউনিট দাম—তিন সূচকেই পতন; প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে বাংলাদেশ
দেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউর পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমেছে। শীর্ষ ১০টি পোশাক সরবরাহকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ থেকেই আমদানি কমেছে সবচেয়ে বেশি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশ থেকে ৮৯৭ কোটি ১৩ লাখ ইউরোর পোশাক আমদানি করেছিল ইইউ। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭২৭ কোটি ৬৯ লাখ ইউরোতে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১৬৯ কোটি ৪৪ লাখ ইউরোর রপ্তানি আয় হারিয়েছে বাংলাদেশ।
একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইইউর মোট পোশাক আমদানি ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৭৫৮ কোটি ইউরো থেকে ৩ হাজার ৩৮৪ কোটি ইউরোতে নেমে এসেছে। তবে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় বাংলাদেশের পতনের হার প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় দেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৈশ্বিকভাবে ইইউর পোশাক আমদানি কমার পেছনে চাহিদা হ্রাস এবং কিছুটা মূল্যহ্রাস—দুই কারণই কাজ করেছে। বিশ্ববাজার থেকে আমদানির পরিমাণ কমেছে ৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। কারণ, একই সঙ্গে রফতানির পরিমাণ এবং ইউনিট মূল্য—দুই ক্ষেত্রেই বড় ধরনের পতন হয়েছে। জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউর আমদানির পরিমাণ ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ১৫ দশমিক ৪১ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরোতে নেমেছে, যা ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ হ্রাস।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত কোনো দেশ কম দামে বেশি পণ্য বিক্রি করে বাজার ধরে রাখে, অথবা উচ্চমূল্যের পণ্য বিক্রি করে আয় ধরে রাখে। কিন্তু বাংলাদেশ এখন এমন অবস্থায় রয়েছে, যেখানে একদিকে রফতানির পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে কমছে পণ্যের দামও। ফলে আয় কমার চাপ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
শুধু মে মাসের চিত্রও একই ধরনের নেতিবাচক প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ থেকে ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ ইউরোর পোশাক আমদানি করেছিল ইইউ। চলতি বছরের একই মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১৮ কোটি ২৬ লাখ ইউরোতে, যা ১৭ দশমিক ১২ শতাংশ কম। একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং ইউনিট মূল্য ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ কমেছে।
প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
চীন থেকে ইইউর পোশাক আমদানি কমেছে মাত্র ৪ দশমিক ২০ শতাংশ। বরং দেশটি আমদানির পরিমাণ প্রায় ২ শতাংশ বাড়িয়ে বাজার ধরে রেখেছে, যদিও ইউনিট মূল্য কিছুটা কমেছে।
ভিয়েতনামের রফতানি মূল্য কমেছে মাত্র ১ দশমিক ৫১ শতাংশ। দেশটি উচ্চমূল্যের পণ্য রপ্তানি করে ইউনিট মূল্য ১২ শতাংশের বেশি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, যদিও রফতানির পরিমাণ কিছুটা কমেছে।
তুরস্ক ও কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে রফতানির পরিমাণ কমলেও ইউনিট মূল্য বেড়েছে। পাকিস্তানের রফতানি মূল্য ১৭ শতাংশ কমলেও দেশটির রফতানির পরিমাণ বরং বেড়েছে প্রায় ৩ শতাংশ; সেখানে মূল ধাক্কা এসেছে ইউনিট মূল্য কমে যাওয়ায়। ভারতের ক্ষেত্রেও মূল্য ও পরিমাণ—দুই সূচকেই পতন রয়েছে, তবে বাংলাদেশের তুলনায় তা অনেক কম। অপরদিকে, ইন্দোনেশিয়ার রফতানির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি কমলেও মূল্যহ্রাস বাংলাদেশের মতো তীব্র নয়।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই তুলনামূলক চিত্রে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে একই সঙ্গে রফতানির পরিমাণ এবং ইউনিট মূল্য—উভয় ক্ষেত্রেই এত বড় মাত্রার পতন ঘটেছে। ভিয়েতনাম মূল্য ধরে রাখতে পেরেছে, চীন পণ্যের পরিমাণ ধরে রেখেছে; কিন্তু বাংলাদেশ দুই ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, এপ্রিলে যে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, মে মাসেও তা অব্যাহত রয়েছে। এটি আর এক মাসের সাময়িক ওঠানামা নয়; বরং বাংলাদেশের রফতানি প্রতিযোগিতায় একটি কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাঁর মতে, বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হলে শুধু কম দামে পণ্য বিক্রির কৌশল নয়, বরং উচ্চমূল্যের ও মূল্যসংযোজিত পোশাক উৎপাদন, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন এবং নতুন বাজার কৌশলের দিকে আরও জোর দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার হওয়ায় এই ধারাবাহিক পতন দীর্ঘমেয়াদে দেশের রফতানি আয়, শিল্পের প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রতিযোগী দেশগুলোর পরিবর্তিত কৌশল বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর পাইকারি ও খুচরায় সবজির দাম বেড়েছে। আরেক দফা বাড়ল আটা, ময়দা ও চালের দাম। তেল, ডাল, ডিম ও দুধের দামও বাড়তি। জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পর শুক্রবার ঢাকার মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ও টাউন হল বাজার, কারওয়ান বাজার ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। ব্যবসায়ীরা পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কথা বলছেন। তবে ভোক্তাদের অভিযোগ, তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে অনেক পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের নতুন কাঁচাবাজারের সুজন গুড ভাণ্ডার থেকে শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে গুঁড়ো চাল কিনছিলেন জান্নাতুল ফেরদৌস। ৯০০ গ্রামের এক প্যাকেট গুঁড়ো চালের দাম ৭০ টাকা। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এ ক্রেতা বলেন, “কিছুদিন আগেই প্যাকেট কিনেছিলাম ৬৬ টাকায়। আজকে নিল ৭০ টাকা।” দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে দোকানটির স্বত্বাধিকারী সেলিম মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যে মালগুলো আগে আনা ছিল ওগুলোর দাম বাড়াইনি। আজকে-কালকে যে মালগুলো কেনা লাগছে, ওগুলোতে দুই-তিন টাকা বেশি নেওয়া লাগছে। বেশি নেওয়ার কারণ হিসেবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কথা বলেছেন তিনি। সেলিম বলেন, চিড়া ও মুড়ির দামও বাড়তে পারে। রোববার চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। নতুন দর অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকায় বিক্রি হবে। এর পর থেকেই পণ্য পরিবহনে ভাড়া বেড়ে গেছে। নির্দিষ্ট করে ভাড়া কত শতাংশ বাড়বে, সেটি ঠিক না হওয়ায় যে যার মত ভাড়া নিচ্ছেন ট্রাক, লরি, পিকআপ ও কভার্ড ভ্যান মালিকরা। যার প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের বাজারে। গত মাসে মোড়কের প্রতিকেজি ময়দা ৭০ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। এক সপ্তাহ আগে থেকে দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৮০ টাকা। তেলের দাম বাড়ার পর আরও ৫ টাকা বেড়ে হয়েছে ৮৫ টাকা। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে এক প্যাকেট ময়দা কিনতে ৬ শতাংশের বেশি খরচ করতে হচ্ছে ভোক্তাকে। গত মাসে দাম বাড়ার পর খুচরায় মোড়কের আটা বিক্রি হয়েছিল কোম্পানিভেদে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি দরে। সেই এখন আটা কিনতে হচ্ছে ৭০ টাকায়। মোড়কের আটা ও ময়দার দাম বাড়লেও খোলাটা কিছু কম ছিল। কিন্তু বুধবার থেকে সেটার দামও বাড়তে শুরু করেছে। খোলা ময়দার দাম বেড়েছে প্রায় ৪ শতাংশ। সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিকেজি ৬৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৮ থেকে ৭০ টাকা। আর খোলা আটা প্রতিকেজি ৪৮ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৫০ টাকা। নতুন করে দুই কেজির যে মোড়কের আটা ও ময়দা খুচরা দোকানে দিয়েছে কোম্পানিগুলো, তার গায়ে খুচরা মূল্য লেখা রয়েছে যথাক্রমে ১৪০ ও ১৬০ টাকা। কারওয়ান বাজারের মেসার্স বিসমিল্লাহ ট্রেডিংয়ের ব্যবস্থাপক জহিরুল ইসলাম বলেন, “ময়দা (দাম) কই উঠবে বলা যায় না। দুই মাস দাম বাড়ে। দুই দিন আগে আরেক দফা বাড়ে। কোম্পানি যে দাম লিখে দেয়, ওই দামেই বিক্রি করি।” কেন ফের দাম বাড়ানো হল, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ওই আর কি, তেলের কথাই বলল, প্রোডাকশন কস্ট বাড়ছে, গাড়ি ভাড়া ভাড়ছে, তাই দাম বেশি।” দীর্ঘদিন ধরে ডজন ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল খামারের লাল ডিম। এখন সেই ডিমের দাম ছুঁয়েছে ১৬০ টাকা ডজন। এক হালি নিলে দাম দিতে হচ্ছে ৫৫ টাকায়। মোটা দানার মসুর ডাল প্রতিকেজি ৯০ থেকে ৯৫ টাকায় পাওয়া যেত, শুক্রবার বিক্রি হয়েছে ১০০ টাকা। যদিও রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-টিসিবির দৈনিক বাজার দর বলছে, সপ্তাহের ব্যবধানে এ মানের মসুর দামের দাম প্রতিকেজি ৯০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে প্রায় ৯২ টাকা। চলতি মাসের শুরুতে বাজারে বোতলের এক ও দুই লিটারের সয়াবিন তেলের সংকট দেখা দেয়। লিটারে ৫ টাকা বাড়ানোর পর সরবরাহ স্বাভাবিক হয়। তবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বুধবার থেকে আবার সয়াবিন তেলের এক ও দুই লিটারের বোতলের সংকট দেওয়ার কথা বলেছেন খুচরা বিক্রেতারা। বছিলার সিটি হাউজিং এলাকার ডেইলি নিডসের স্বত্বাধিকারী তানভীর জয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দুই-এক সপ্তাহ তেল নিয়ে সমস্যা ছিল না। বুধবারে কারওয়ান বাজার থেকে মাল নিতে গেলাম, ছোট বোতল নাই। আধা লিটার, এক লিটারের তেল পাইকারি থেকে অনুরোধ করেই আনলাম। এই এলাকায় বড় বোতলের চেয়ে ছোট বোতলের চাহিদা বেশি।” সরবরাহ সংকটের মধ্যেই সয়াবিনের দাম বেড়েছে। দুই লিটারের বোতলের সরকার নির্ধারিত দাম ৩৯৮ টাকা। কিন্তু সেই তেল বিক্রি হচ্ছে ৪০৪ টাকা। পাঁচ লিটার বোতল সয়াবিনের সরকার নির্ধারিত দাম ৯৭৫ টাকা, তা বেড়ে হয়েছে ৯৮৮ টাকা। মিরপুরের পাইকপাড়ার এক গৃহিণী বলেন, তিনি রূপচাঁদার পাঁচ লিটারের বোতল কিনেছেন ১ হাজার টাকায়। আটা ও ময়দার পাশাপাশি মাঝারি মানের পাইজাম ও আটাশ চালের দামও বেড়েছে। গত সপ্তাহে এ চাল বিক্রি হয় প্রতিকেজি ৫৬ থেকে ৫৮ টাকা দরে। শুক্রবার বিক্রি হয়েছে ৬০ থেকে ৬২ টাকা। চালের দাম বাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের নতুন কাঁচাবাজারের ‘আল্লাহর দান চাউল ভাণ্ডারের’ অংশীদার লোকমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমককে বলেন, “কুষ্টিয়া থেকে চাউল আনতে গাড়ি ভাড়া ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বেড়েছে। এগুলো তো পাইকারিতে মেলাতে হবে। পাইকারিতে বস্তা প্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বেশি পড়ছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা ২ থেকে ৩ টাকা বাড়তি নিবেই।” তিনি বলেন, “কিছুদিন পরেই ধান উঠবে এখন মৌসুম, চাল উঠছে। চলের দাম বাড়বো না।” জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আঁচ লেগেছে সবজির বাজারে। গোল বেগুনের দাম প্রতিকেজি ৪০ থেকে ১৬০ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ১২০ টাকা। লম্বা বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা কেজি দরে, যা ছিল ৮০ টাকা। চিচিঙ্গা প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা দরে, যা এক সপ্তাহ আগে ৬০ টাকা ছিল। আর ঝিঙা প্রতিকেজি ৮০ টাকা। পটল, করলা ও ধুন্দল প্রতিকেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঢেঁড়স প্রতি কেজি ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও এসব সবজির ৫০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছিল। মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজারের পাইকারি সবজি বিক্রেতা ইদ্রিস ফল ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী মো. ইদ্রিস ফকির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বর্তমানে প্রতি কেজিতে এক টাকা ভাড়া বেশি পড়ে যাচ্ছে। পঞ্চগড় থেকে এক ট্রাক মাল আনতাম ২৬ হাজার টাকা ভাড়ায়। ওই ভাড়া এখন ৩১ হাজার টাকা। এক গাড়ি ৫ হাজার টাকা বাড়তি দিতে হচ্ছে।” তিনি বলেন, যে লাউ আগে ১৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছেন, শুক্রবার সেটির দাম পড়েছে ১৬ টাকা। আর প্রতিটির দাম ১৮ টাকা। আকার ও মান ভেদে দামের পার্থক্য হয়। ইদ্রিস ফকির বলেন, এদিন করলা বিক্রি করেছেন প্রতি কেজি ৪৫ টাকা দরে। তবে ময়মনসিংহের ভালো মানের করলার পাইকারি দাম পড়ছে ৫০ থেকে ৫২ টাকা দরে। চিচিঙ্গা বিক্রি হয়েছে ২৬ টাকা দরে। ঝিঙ্গা বিক্রি করেছেন ৩০ টাকা কেজি। খুচরায় প্রতিটি সবজির দাম দ্বিগুণ কেন? জবাবে মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের বাইরে বসা খুচরা বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পাইকারি ব্যবসায়ীর দেওয়া হিসাবটা সঠিক নয়।” তার দাবি, করলা কেনা পড়েছে ৫৫ টাকা কেজি দরে। ঢেঁড়শ আড়ত থেকেই কেজি ৫০ টাকা পড়েছে। “এছাড়া আমরা লটে বা বস্তায় মাল কিনি। সব মাল ভালো পড়ে না। কেনার পর আলাদা করি। ধরেন করলা আমার এখানে দুই রকমের করলা আছে; কেজি ৫০ টাকাও আছে ৭০ টাকাও আছে। কিন্তু সব মিলায়ে এ সপ্তাহে দাম বাড়ছেই।” কমতে থাকা কাঁচামরিচের দামও ফের বাড়ছে। এক সপ্তাহ আগে প্রতিকেজি কাঁচামরিচের মানভেদে দাম ছিল ৮০ থেকে ১০০ টাকা। এখন তা ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা গিয়ে ঠেকেছে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকুরীজীবী চল্লিশোর্ধ্ব ইমরুল হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দেশে এমনিতেই নানা সংকট। বহির্বিশ্বে যখন সংকট হয় তেলের দাম বাড়তেই পারে। বাড়াইল কখন, যখন বহির্বিশ্বে কমতেছে। তেলের দামের অজুহাতে সব জিনিসের দাম বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশে যেটা বাড়ে সেটা কি কমে?” তবে তেলের দাম বাড়ার প্রভাব এখনো দেখা যায়নি মুরগির বাজারে। এক মাস ধরে ব্রয়লার মুরগি কেজি প্রতি ১৯০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সোনালি মুরগি প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৩১০ থেকে ৩৪০ টাকায়। দুধের দাম লিটারে বাড়ল ১০ টাকা সব কোম্পানির মোড়কের তরল দুধ লিটারে ১০ টাকা বেড়েছে। মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের বিক্রেতারা বলছেন, খুচরা দোকানে মিল্কভিটা, ফার্ম ফ্রেশ, আড়ং ও প্রাণ ডেইরির আধা লিটারের দাম ৫৫ টাকা ও এক লিটার ১১০ থেকে ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়নের (মিল্কভিটা) সভাপতি এস এম আমীর হামজা শাতিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মিল্কভিটা একটি সমবায় সমিতি। আরও অনেকগুলো সমবায়ের কেন্দ্রীয় সমিতি এটি। ছোট সমবায় সমিতির সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে দুধের দাম বাড়ানোর জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন। “গ্যাসের সংকট চলছে ও বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। দুধ প্রক্রিয়াজাত করার খরচ বেড়ে গেল। পরিবহন খরচ বাড়ল। প্রান্তিক পর্যায়ে গো-খাদ্যের দাম বাড়ল। ফলে আমাদের অংশীজনরা চাপ দিলেন দাম বাড়াতে হবে।”
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইসরায়েলের সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও জাহাজ ভাড়া (ফ্রেইট চার্জ) বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আমদানি-নির্ভর বাংলাদেশের ওপর। ফলে গত ছয় মাসে (মার্চ-আগস্ট) জ্বালানি তেল আমদানিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিপিসি’র চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ও আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আমদানি ব্যয় বাড়লেও সরকার জনগণের কথা বিবেচনা করে এতদিন জ্বালানি তেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করেছে। এতে গত প্রায় ছয় মাসে বিপিসিকে অতিরিক্ত ২৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।’ জ্বালানি বিভাগ জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এবং ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ পরিস্থিতি এখনো অব্যাহত রয়েছে। ফলে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসি’র অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। ছয় মাসের এই অতিরিক্ত ব্যয় হিসাবে মাসে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা করে বিপিসির ওপর বাড়তি চাপ পড়েছে। বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দামের পাশাপাশি পরিবহন ও হ্যান্ডলিং ব্যয়ও বিপুল হারে বেড়েছে। আগে যেখানে জাহাজ ভাড়া ছিল ৩ থেকে ৪ ডলার, বর্তমানে তা বেড়ে ১৫ থেকে ১৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ জাহাজ ভাড়ার ক্ষেত্রেই ব্যয় আগের তুলনায় প্রায় চার থেকে ৫ গুণ বেড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় না করা হলে বিপিসিকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়।’ বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। পাশাপাশি আমদানি কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে। সূত্র জানায়, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী ডিজেলে বিপিসি’র লিটারপ্রতি লোকসান প্রায় ৭০ টাকা। এ হিসাবে প্রতিদিন লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে। বিপিসি চেয়ারম্যান জানান, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা সমন্বয় করা হলে বিপিসির বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসান কমানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন শিক্ষিত তরুণের মধ্যে ৩৬ জন বেকার। শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। আইএমএফের ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ম্যাগাজিনের সেপ্টেম্বর সংস্করণে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়াজুড়ে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশ বেশি। বেশি শিক্ষিত তরুণদের মধ্যেই এই হার সর্বোচ্চ। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। আইএমএফ বলছে, এআই প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, তবে দক্ষতা বৃদ্ধির তুলনায় এআই গ্রহণের গতি বেশি হলে এই প্রযুক্তি তরুণ কর্মীদের শ্রমবাজারের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। শুধু বাংলাদেশ নয়; ভারত, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার কত, তা–ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকার বেশি কেন দেশের শিক্ষিত তরুণদের চাকরি খোঁজার অন্যতম অনলাইন প্ল্যাটফর্ম হলো বিডিজবস ডটকম। কেন বাংলাদেশে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকার বেশি—এ বিষয়ে বিডিজবস ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাহিম মাশরুর প্রথম আলোকে বলেন, গত ২০ বছরে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেশ বেড়েছে। ২০১০ সালে শ্রমশক্তির মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশ স্নাতক ডিগ্রিধারী ছিল। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ শতাংশ। এক যুগে এমন স্নাতক ডিগ্রিধারী আড়াই গুণ বেড়েছে। কিন্তু চাকরির বাজার খুব একটা বদলায়নি। অর্থনৈতিক কাঠামোও পরিবর্তন হয়নি। নতুন স্নাতক ডিগ্রিধারী নেওয়ার মতো নতুন শিল্পকারখানা তৈরি হয়নি। ফাহিম মাশরুরের মতে, প্রতিবছর ২২ থেকে ২৩ লাখ তরুণ-তরুণী শ্রমবাজারে আসেন। তাঁদের মধ্যে সাড়ে সাত লাখ তরুণ স্নাতক ডিগ্রিধারী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, দেশে ২৬ লাখ ২৪ হাজার বেকার আছেন। তাঁদের মধ্যে ২০ লাখ ৩২ হাজার তরুণ-তরুণী। যাঁদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছর। এই বেকারদের মধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত বা স্নাতক ডিগ্রিধারী। বিবিএসের তথ্য-উপাত্ত বলছে, চাকরিপ্রত্যাশী ১৭ শতাংশের বেশি উচ্চ শিক্ষিত (স্নাতক ডিগ্রিধারী) তরুণ-তরুণী দুই বছরের বেশি সময় ধরে বেকার থাকেন। ১ থেকে ২ বছর বেকার থাকেন ১৫ শতাংশের বেশি উচ্চশিক্ষিত তরুণ। এর মানে, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রতি তিনজনে একজনকে এক বছরের বেশি সময় বেকার থাকেন। অন্য দেশের কী অবস্থা আইএমএফের প্রতিবেদন অনুসারে, শ্রীলঙ্কায় শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ বেকার থাকেন। আর ভারতে তা ৪০ শতাংশের বেশি। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনে এমন বেকারত্বের হার ২০ শতাংশের বেশি। আইএমএফ বলছে, উচ্চশিক্ষিত তরুণেরা তাঁদের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শ্রমবাজারে এআইয়ের ব্যবহার বাড়তে থাকায় আগামী বছরগুলোতে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের চাকরির সুযোগ কমে যেতে পারে, এমন আশঙ্কা অনেকের। আইএমএফ বলছে, সমস্যাটি শুধু বেকারত্বের সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চাকরির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও স্নাতকদের দক্ষতার মধ্যে একটি স্থায়ী অসামঞ্জস্য রয়েছে। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মডেল ব্যবহার করে জটিল অনেক কাজ বিনা মূল্যে করিয়ে নেওয়া যায়। ফলে প্রতিষ্ঠানের বেতনভুক্ত অনেক প্রাথমিক পর্যায়ের কারিগরি পদের প্রয়োজন কমে যাচ্ছে। আইএমএফের প্রতিবেদন অনুসারে, আগামী এক দশকে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোতে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে। অর্ধশতাব্দীর বেশি আগে বিশ্বের উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোতে কর্মজীবনে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা তরুণ-তরুণীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ কোটি। এর আগে গত জুনে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের দ্য গ্লোবাল জবস চ্যালেঞ্জ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই তরুণ-তরুণীরা সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যুবগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করবে। আগের যেকোনো দশকের তুলনায় এই সংখ্যা বেশি হবে এবং এই শতাব্দীর বাকি সময়ের যেকোনো দশকের পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি হবে।