বাংলাদেশের প্রধান রফতানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) তৈরি পোশাক রফতানিতে উদ্বেগজনক প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। শুধু রফতানি আয়ই নয়, একইসঙ্গে রফতানির পরিমাণ (ভলিউম) এবং ইউনিট মূল্য—তিনটি সূচকেই ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি সাময়িক বাজার মন্দার প্রভাবের চেয়ে বেশি; বরং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও পণ্যের মূল্যসংযোজন নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে বড় ধাক্কা
মূল্য, পরিমাণ ও ইউনিট দাম—তিন সূচকেই পতন; প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে বাংলাদেশ
দেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউর পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমেছে। শীর্ষ ১০টি পোশাক সরবরাহকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ থেকেই আমদানি কমেছে সবচেয়ে বেশি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশ থেকে ৮৯৭ কোটি ১৩ লাখ ইউরোর পোশাক আমদানি করেছিল ইইউ। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭২৭ কোটি ৬৯ লাখ ইউরোতে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১৬৯ কোটি ৪৪ লাখ ইউরোর রপ্তানি আয় হারিয়েছে বাংলাদেশ।
একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইইউর মোট পোশাক আমদানি ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৭৫৮ কোটি ইউরো থেকে ৩ হাজার ৩৮৪ কোটি ইউরোতে নেমে এসেছে। তবে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় বাংলাদেশের পতনের হার প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় দেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৈশ্বিকভাবে ইইউর পোশাক আমদানি কমার পেছনে চাহিদা হ্রাস এবং কিছুটা মূল্যহ্রাস—দুই কারণই কাজ করেছে। বিশ্ববাজার থেকে আমদানির পরিমাণ কমেছে ৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। কারণ, একই সঙ্গে রফতানির পরিমাণ এবং ইউনিট মূল্য—দুই ক্ষেত্রেই বড় ধরনের পতন হয়েছে। জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউর আমদানির পরিমাণ ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ১৫ দশমিক ৪১ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরোতে নেমেছে, যা ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ হ্রাস।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত কোনো দেশ কম দামে বেশি পণ্য বিক্রি করে বাজার ধরে রাখে, অথবা উচ্চমূল্যের পণ্য বিক্রি করে আয় ধরে রাখে। কিন্তু বাংলাদেশ এখন এমন অবস্থায় রয়েছে, যেখানে একদিকে রফতানির পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে কমছে পণ্যের দামও। ফলে আয় কমার চাপ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
শুধু মে মাসের চিত্রও একই ধরনের নেতিবাচক প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ থেকে ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ ইউরোর পোশাক আমদানি করেছিল ইইউ। চলতি বছরের একই মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১৮ কোটি ২৬ লাখ ইউরোতে, যা ১৭ দশমিক ১২ শতাংশ কম। একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং ইউনিট মূল্য ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ কমেছে।
প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
চীন থেকে ইইউর পোশাক আমদানি কমেছে মাত্র ৪ দশমিক ২০ শতাংশ। বরং দেশটি আমদানির পরিমাণ প্রায় ২ শতাংশ বাড়িয়ে বাজার ধরে রেখেছে, যদিও ইউনিট মূল্য কিছুটা কমেছে।
ভিয়েতনামের রফতানি মূল্য কমেছে মাত্র ১ দশমিক ৫১ শতাংশ। দেশটি উচ্চমূল্যের পণ্য রপ্তানি করে ইউনিট মূল্য ১২ শতাংশের বেশি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, যদিও রফতানির পরিমাণ কিছুটা কমেছে।
তুরস্ক ও কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে রফতানির পরিমাণ কমলেও ইউনিট মূল্য বেড়েছে। পাকিস্তানের রফতানি মূল্য ১৭ শতাংশ কমলেও দেশটির রফতানির পরিমাণ বরং বেড়েছে প্রায় ৩ শতাংশ; সেখানে মূল ধাক্কা এসেছে ইউনিট মূল্য কমে যাওয়ায়। ভারতের ক্ষেত্রেও মূল্য ও পরিমাণ—দুই সূচকেই পতন রয়েছে, তবে বাংলাদেশের তুলনায় তা অনেক কম। অপরদিকে, ইন্দোনেশিয়ার রফতানির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি কমলেও মূল্যহ্রাস বাংলাদেশের মতো তীব্র নয়।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই তুলনামূলক চিত্রে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে একই সঙ্গে রফতানির পরিমাণ এবং ইউনিট মূল্য—উভয় ক্ষেত্রেই এত বড় মাত্রার পতন ঘটেছে। ভিয়েতনাম মূল্য ধরে রাখতে পেরেছে, চীন পণ্যের পরিমাণ ধরে রেখেছে; কিন্তু বাংলাদেশ দুই ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, এপ্রিলে যে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, মে মাসেও তা অব্যাহত রয়েছে। এটি আর এক মাসের সাময়িক ওঠানামা নয়; বরং বাংলাদেশের রফতানি প্রতিযোগিতায় একটি কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাঁর মতে, বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হলে শুধু কম দামে পণ্য বিক্রির কৌশল নয়, বরং উচ্চমূল্যের ও মূল্যসংযোজিত পোশাক উৎপাদন, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন এবং নতুন বাজার কৌশলের দিকে আরও জোর দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার হওয়ায় এই ধারাবাহিক পতন দীর্ঘমেয়াদে দেশের রফতানি আয়, শিল্পের প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রতিযোগী দেশগুলোর পরিবর্তিত কৌশল বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের প্রধান রফতানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) তৈরি পোশাক রফতানিতে উদ্বেগজনক প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। শুধু রফতানি আয়ই নয়, একইসঙ্গে রফতানির পরিমাণ (ভলিউম) এবং ইউনিট মূল্য—তিনটি সূচকেই ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি সাময়িক বাজার মন্দার প্রভাবের চেয়ে বেশি; বরং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও পণ্যের মূল্যসংযোজন নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে বড় ধাক্কা মূল্য, পরিমাণ ও ইউনিট দাম—তিন সূচকেই পতন; প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে বাংলাদেশ দেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউর পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমেছে। শীর্ষ ১০টি পোশাক সরবরাহকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ থেকেই আমদানি কমেছে সবচেয়ে বেশি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশ থেকে ৮৯৭ কোটি ১৩ লাখ ইউরোর পোশাক আমদানি করেছিল ইইউ। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭২৭ কোটি ৬৯ লাখ ইউরোতে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১৬৯ কোটি ৪৪ লাখ ইউরোর রপ্তানি আয় হারিয়েছে বাংলাদেশ। একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইইউর মোট পোশাক আমদানি ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৭৫৮ কোটি ইউরো থেকে ৩ হাজার ৩৮৪ কোটি ইউরোতে নেমে এসেছে। তবে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় বাংলাদেশের পতনের হার প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় দেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৈশ্বিকভাবে ইইউর পোশাক আমদানি কমার পেছনে চাহিদা হ্রাস এবং কিছুটা মূল্যহ্রাস—দুই কারণই কাজ করেছে। বিশ্ববাজার থেকে আমদানির পরিমাণ কমেছে ৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। কারণ, একই সঙ্গে রফতানির পরিমাণ এবং ইউনিট মূল্য—দুই ক্ষেত্রেই বড় ধরনের পতন হয়েছে। জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউর আমদানির পরিমাণ ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ১৫ দশমিক ৪১ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরোতে নেমেছে, যা ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ হ্রাস। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত কোনো দেশ কম দামে বেশি পণ্য বিক্রি করে বাজার ধরে রাখে, অথবা উচ্চমূল্যের পণ্য বিক্রি করে আয় ধরে রাখে। কিন্তু বাংলাদেশ এখন এমন অবস্থায় রয়েছে, যেখানে একদিকে রফতানির পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে কমছে পণ্যের দামও। ফলে আয় কমার চাপ আরও বেড়ে যাচ্ছে। শুধু মে মাসের চিত্রও একই ধরনের নেতিবাচক প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ থেকে ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ ইউরোর পোশাক আমদানি করেছিল ইইউ। চলতি বছরের একই মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১৮ কোটি ২৬ লাখ ইউরোতে, যা ১৭ দশমিক ১২ শতাংশ কম। একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং ইউনিট মূল্য ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ কমেছে। প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চীন থেকে ইইউর পোশাক আমদানি কমেছে মাত্র ৪ দশমিক ২০ শতাংশ। বরং দেশটি আমদানির পরিমাণ প্রায় ২ শতাংশ বাড়িয়ে বাজার ধরে রেখেছে, যদিও ইউনিট মূল্য কিছুটা কমেছে। ভিয়েতনামের রফতানি মূল্য কমেছে মাত্র ১ দশমিক ৫১ শতাংশ। দেশটি উচ্চমূল্যের পণ্য রপ্তানি করে ইউনিট মূল্য ১২ শতাংশের বেশি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, যদিও রফতানির পরিমাণ কিছুটা কমেছে। তুরস্ক ও কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে রফতানির পরিমাণ কমলেও ইউনিট মূল্য বেড়েছে। পাকিস্তানের রফতানি মূল্য ১৭ শতাংশ কমলেও দেশটির রফতানির পরিমাণ বরং বেড়েছে প্রায় ৩ শতাংশ; সেখানে মূল ধাক্কা এসেছে ইউনিট মূল্য কমে যাওয়ায়। ভারতের ক্ষেত্রেও মূল্য ও পরিমাণ—দুই সূচকেই পতন রয়েছে, তবে বাংলাদেশের তুলনায় তা অনেক কম। অপরদিকে, ইন্দোনেশিয়ার রফতানির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি কমলেও মূল্যহ্রাস বাংলাদেশের মতো তীব্র নয়। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই তুলনামূলক চিত্রে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে একই সঙ্গে রফতানির পরিমাণ এবং ইউনিট মূল্য—উভয় ক্ষেত্রেই এত বড় মাত্রার পতন ঘটেছে। ভিয়েতনাম মূল্য ধরে রাখতে পেরেছে, চীন পণ্যের পরিমাণ ধরে রেখেছে; কিন্তু বাংলাদেশ দুই ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, এপ্রিলে যে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, মে মাসেও তা অব্যাহত রয়েছে। এটি আর এক মাসের সাময়িক ওঠানামা নয়; বরং বাংলাদেশের রফতানি প্রতিযোগিতায় একটি কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাঁর মতে, বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হলে শুধু কম দামে পণ্য বিক্রির কৌশল নয়, বরং উচ্চমূল্যের ও মূল্যসংযোজিত পোশাক উৎপাদন, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন এবং নতুন বাজার কৌশলের দিকে আরও জোর দিতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার হওয়ায় এই ধারাবাহিক পতন দীর্ঘমেয়াদে দেশের রফতানি আয়, শিল্পের প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রতিযোগী দেশগুলোর পরিবর্তিত কৌশল বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
স্থানীয় উৎস থেকে কাঁচামাল, বিশেষ করে সুতা ও কাপড় সংগ্রহ করে প্রস্তুত করা তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নগদ সহায়তার হার তিন গুণের বেশি বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করল সরকার। রপ্তানিমুখী দেশীয় বস্ত্র খাতে শুল্ক বন্ড ও ডিউটি ড্র-ব্যাকের পরিবর্তে এতদিন বিকল্প নগদ সহায়তা ছিল দেড় শতাংশ। রপ্তানিকারকদের দাবির মুখে এই হার বাড়ানো হয়েছে। এতে স্পিনিং মিল ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান উভয়ে উপকৃত হবে। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের মাধ্যমে গত ১ জুলাই থেকে জাহাজীকৃত পণ্যে নতুন হারে নগদ সহায়তা দিতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের বস্ত্র খাতের সুতার উল্লেখযোগ্য আমদানি হয় ভারত থেকে। রপ্তানিমুখী দেশীয় বস্ত্রে উৎসাহিত করতে ২০২৪ সালের আগে এ ক্ষেত্রে ৪ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হতো। তবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণে প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তিন ধাপে কমিয়ে দেড় শতাংশে নামানো হয়। এরপর দেশীয় সুতা ব্যবহার ব্যাপক কমে স্পিনিং মিলগুলো সংকটে পড়ে। সর্বশেষ অর্থবছর রপ্তানি আয়ও কমে গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। আগের অর্থবছর যা ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার ছিল। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে সমকালকে বলেন, এক থেকে দুই সেন্ট দরের পার্থক্যের কারণে রপ্তানি আদেশ অন্য দেশে চলে যায়। সরকারের সাড়ে ৩ শতাংশ প্রণোদনা বৃদ্ধির এ সিদ্ধান্তের ফলে রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অনেক বাড়বে। আবার দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো উপকৃত হবে। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি হিসেবে নগদ সহায়তা কমানোর পরিকল্পনা ছিল। তবে সরকার থেকে বের হতে আরও তিন বছর সময় চেয়ে জাতিসংঘকে চিঠি দিয়েছে। আগের সূচি অনুযায়ী চলতি বছরের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ হওয়ার কথা ছিল। এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলে রপ্তানিতে নগদ সহায়তা দেওয়া যাবে না। এ কারণে চলতি অর্থবছরে নগদ সহায়তার হার কোনো ক্ষেত্রে কমানো হয়নি; বরং তৈরি পোশাকের একটি ক্ষেত্রে বাড়ানো হলো। গতকালের সার্কুলারে বলা হয়েছে, রপ্তানিমুখী দেশীয় বস্ত্র খাতে শুল্ক বন্ড ও ডিউটি ড্র-ব্যাক সুবিধার পরিবর্তে বিকল্প নগদ সহায়তা বিদ্যমান ১ দশমিক ৫০ শতাংশের পরিবর্তে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে রপ্তানিকারককে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ বা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হতে হবে। আর প্রণোদনার জন্য দেশীয় উৎস থেকে কাঁচামাল, বিশেষ করে সুতা ও কাপড় সংগ্রহের প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে। গত ১ জুলাই থেকে জাহাজীকৃত পণ্যে এ হারে নগদ সহায়তা দিতে পারবে ব্যাংকগুলো। তৈরি পোশাকসহ বর্তমানে ৪৩ ধরনের পণ্য রপ্তানির বিপরীতে নগদ সহায়তা দেয় সরকার। গত ৫ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের প্রণোদনার হার অপরিবর্তিত থাকবে জানিয়ে একটি সার্কুলার জারি করে। এখন কেবল দেশীয় বস্ত্র ব্যবহার করে রপ্তানিতে প্রণোদনা বাড়ানো হয়েছে। দেশীয় বস্ত্রে বিকল্প নগদ সহায়তার বাইরে ইউরো অঞ্চলে বস্ত্র রপ্তানিতে অতিরিক্ত বিশেষ সহায়তা শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ এবং নিট, ওভেন, সোয়েটারসহ তৈরি পোশাকের সব ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে অতিরিক্ত ৩ শতাংশ বহাল থাকছে। বস্ত্র খাতে নতুন পণ্য বা নতুন বাজার সম্প্রসারণ সুবিধা ২ শতাংশ এবং তৈরি পোশাকের বিশেষ নগদ সহায়তা শূন্য ৩ শতাংশ অপরিবর্তিত থাকছে। এ ছাড়া অন্যান্য খাতে প্রণোদনার হার আপাতত একই থাকছে।
সিটি ব্যাংকের ডিজিটাল ন্যানো লোন বা ক্ষুদ্রঋণ দ্রুতই সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হচ্ছে। যেকোনো প্রয়োজনে নিজের স্মার্টফোনে বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে মাত্র কয়েক মিনিটেই কোনো ধরনের জামানত ছাড়া এই ঋণ নেওয়া যাচ্ছে। বিকাশ থেকে গত সাড়ে চার বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার ডিজিটাল ক্ষুদ্র ঋণ নিয়েছেন ৩৫ লাখ মানুষ। সিটি ব্যাংক-বিকাশের উদ্যোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ডিজিটাল ক্ষুদ্রঋণের যাত্রা শুরু হয়। এই সেবা চালুর প্রথম বছরে ১০১ কোটি টাকার ঋণ নেন গ্রাহকেরা। দ্বিতীয় বছরে এসে ঋণ বিতরণ প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯৪ কোটি টাকায়। ২০২৪ সালে ৮৫৫ কোটি টাকার ডিজিটাল ক্ষুদ্রঋণ নিয়েছেন গ্রাহকেরা। গত বছর সেই ঋণ প্রায় সাড়ে ৪ গুণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকায়। আর চলতি বছরের ৯ জুলাই পর্যন্ত ৪ হাজার ৫৯১ কোটি টাকার ডিজিটাল ঋণ নিয়েছেন গ্রাহকেরা। সব মিলিয়ে গত সাড়ে চার বছরে সিটি ব্যাংক ও বিকাশের বিতরণ করা ন্যানো ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকার মাইলফলক ছাড়িয়েছে। এ বিষয়ে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘দেশের ব্যাংকিং খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ যখন বড় উদ্বেগের বিষয়, তখন দেখা যাচ্ছে ছোট অঙ্কের ডিজিটাল ঋণে পোর্টফোলিওর মান ঈর্ষণীয় পর্যায়ের। এই ঘটনা থেকে পুরো ব্যাংক খাতের শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা নেওয়ার মতো অনেক কিছু আছে।’ নতুন এই ঋণসেবা চালুর সাড়ে চার বছরে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছাড়িয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। সিটি ব্যাংক এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে ৩৫ লাখ গ্রাহক গত সাড়ে চার বছরে ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। মোট ৩ কোটি ১৯ লাখ ঋণ হিসাবে এসব ঋণ বিতরণ করা হয়। প্রত্যেক গ্রাহক গড়ে এই স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিয়েছেন ৯ বারের বেশি। বর্তমানে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি বিকাশ গ্রাহকের জন্য এই ঋণ সুবিধা উন্মুক্ত রয়েছে। সিটি ব্যাংক জানিয়েছে, প্রতিদিন প্রায় এক লাখ গ্রাহক বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে সিটি ব্যাংকের এই ক্ষুদ্রঋণ নিচ্ছেন। প্রতিটি ঋণের গড় পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার টাকা, আর মাসিক ঋণ বিতরণ পৌঁছেছে ৯০০ কোটি টাকায়। বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহকেরা সিটি ব্যাংক থেকে তিন ধরনের ঋণ নিয়ে থাকেন। সেগুলো হচ্ছে নগদ ঋণ, পণ্য কিনতে ‘বাই নাও পে লেটার’ এবং মোবাইল রিচার্জে পে লেটার। তার মধ্যে নগদ ঋণই ৯৯ শতাংশ। সিটি ব্যাংক জানিয়েছে, ডিজিটাল ক্ষুদ্রঋণ নেওয়া গ্রাহকের মধ্যে ৬৩ শতাংশ শহরাঞ্চলের। বাকি ৩৩ শতাংশ গ্রামে বসবাস করেন। আবার ঋণগ্রহীতাদের ৭৮ শতাংশ পুরুষ ও ২২ শতাংশ নারী। ডিজিটাল ক্ষুদ্রঋণ খেলাপি হওয়ার হারও খুবই নগণ্য। মোট বিতরণ করা ১০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ মাত্র ৫৩ কোটি টাকা বা দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ বিতরণ করা ঋণের ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ নিয়মিতভাবে ব্যাংকে ফেরত এসেছে। জানতে চাইলে বিকাশের চিফ কমার্শিয়াল অফিসার আলী আহম্মেদ বলেন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, বিকল্প তথ্যের ভিত্তিতে ঋণ মূল্যায়ন এবং দূরদর্শী ব্যাংকিং ও সুশাসনের সমন্বয়ে বিকাশ, সিটি ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে একটি কার্যকর ডিজিটাল ঋণ বিতরণ মডেল তৈরি করেছে। ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণের এই মাইলফলক লাখো গ্রাহকের কাছে স্বচ্ছতার সঙ্গে ডিজিটাল ঋণ পরিষেবা পৌঁছানোর এক সফলতার প্রমাণ।