বাংলাদেশের প্রধান রফতানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) তৈরি পোশাক রফতানিতে উদ্বেগজনক প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। শুধু রফতানি আয়ই নয়, একইসঙ্গে রফতানির পরিমাণ (ভলিউম) এবং ইউনিট মূল্য—তিনটি সূচকেই ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি সাময়িক বাজার মন্দার প্রভাবের চেয়ে বেশি; বরং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও পণ্যের মূল্যসংযোজন নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে বড় ধাক্কা
মূল্য, পরিমাণ ও ইউনিট দাম—তিন সূচকেই পতন; প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে বাংলাদেশ
দেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউর পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমেছে। শীর্ষ ১০টি পোশাক সরবরাহকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ থেকেই আমদানি কমেছে সবচেয়ে বেশি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশ থেকে ৮৯৭ কোটি ১৩ লাখ ইউরোর পোশাক আমদানি করেছিল ইইউ। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭২৭ কোটি ৬৯ লাখ ইউরোতে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১৬৯ কোটি ৪৪ লাখ ইউরোর রপ্তানি আয় হারিয়েছে বাংলাদেশ।
একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইইউর মোট পোশাক আমদানি ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৭৫৮ কোটি ইউরো থেকে ৩ হাজার ৩৮৪ কোটি ইউরোতে নেমে এসেছে। তবে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় বাংলাদেশের পতনের হার প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় দেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৈশ্বিকভাবে ইইউর পোশাক আমদানি কমার পেছনে চাহিদা হ্রাস এবং কিছুটা মূল্যহ্রাস—দুই কারণই কাজ করেছে। বিশ্ববাজার থেকে আমদানির পরিমাণ কমেছে ৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। কারণ, একই সঙ্গে রফতানির পরিমাণ এবং ইউনিট মূল্য—দুই ক্ষেত্রেই বড় ধরনের পতন হয়েছে। জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউর আমদানির পরিমাণ ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ১৫ দশমিক ৪১ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরোতে নেমেছে, যা ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ হ্রাস।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত কোনো দেশ কম দামে বেশি পণ্য বিক্রি করে বাজার ধরে রাখে, অথবা উচ্চমূল্যের পণ্য বিক্রি করে আয় ধরে রাখে। কিন্তু বাংলাদেশ এখন এমন অবস্থায় রয়েছে, যেখানে একদিকে রফতানির পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে কমছে পণ্যের দামও। ফলে আয় কমার চাপ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
শুধু মে মাসের চিত্রও একই ধরনের নেতিবাচক প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ থেকে ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ ইউরোর পোশাক আমদানি করেছিল ইইউ। চলতি বছরের একই মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১৮ কোটি ২৬ লাখ ইউরোতে, যা ১৭ দশমিক ১২ শতাংশ কম। একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং ইউনিট মূল্য ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ কমেছে।
প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
চীন থেকে ইইউর পোশাক আমদানি কমেছে মাত্র ৪ দশমিক ২০ শতাংশ। বরং দেশটি আমদানির পরিমাণ প্রায় ২ শতাংশ বাড়িয়ে বাজার ধরে রেখেছে, যদিও ইউনিট মূল্য কিছুটা কমেছে।
ভিয়েতনামের রফতানি মূল্য কমেছে মাত্র ১ দশমিক ৫১ শতাংশ। দেশটি উচ্চমূল্যের পণ্য রপ্তানি করে ইউনিট মূল্য ১২ শতাংশের বেশি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, যদিও রফতানির পরিমাণ কিছুটা কমেছে।
তুরস্ক ও কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে রফতানির পরিমাণ কমলেও ইউনিট মূল্য বেড়েছে। পাকিস্তানের রফতানি মূল্য ১৭ শতাংশ কমলেও দেশটির রফতানির পরিমাণ বরং বেড়েছে প্রায় ৩ শতাংশ; সেখানে মূল ধাক্কা এসেছে ইউনিট মূল্য কমে যাওয়ায়। ভারতের ক্ষেত্রেও মূল্য ও পরিমাণ—দুই সূচকেই পতন রয়েছে, তবে বাংলাদেশের তুলনায় তা অনেক কম। অপরদিকে, ইন্দোনেশিয়ার রফতানির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি কমলেও মূল্যহ্রাস বাংলাদেশের মতো তীব্র নয়।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই তুলনামূলক চিত্রে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে একই সঙ্গে রফতানির পরিমাণ এবং ইউনিট মূল্য—উভয় ক্ষেত্রেই এত বড় মাত্রার পতন ঘটেছে। ভিয়েতনাম মূল্য ধরে রাখতে পেরেছে, চীন পণ্যের পরিমাণ ধরে রেখেছে; কিন্তু বাংলাদেশ দুই ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, এপ্রিলে যে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, মে মাসেও তা অব্যাহত রয়েছে। এটি আর এক মাসের সাময়িক ওঠানামা নয়; বরং বাংলাদেশের রফতানি প্রতিযোগিতায় একটি কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাঁর মতে, বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হলে শুধু কম দামে পণ্য বিক্রির কৌশল নয়, বরং উচ্চমূল্যের ও মূল্যসংযোজিত পোশাক উৎপাদন, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন এবং নতুন বাজার কৌশলের দিকে আরও জোর দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার হওয়ায় এই ধারাবাহিক পতন দীর্ঘমেয়াদে দেশের রফতানি আয়, শিল্পের প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রতিযোগী দেশগুলোর পরিবর্তিত কৌশল বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
আয় দিয়ে সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে দেশের প্রায় অর্ধেক পরিবার। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানে স্থবিরতা ও প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ায় দৈনন্দিন ব্যয় সামলাতে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অনেককে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে দেখা গেছে, গত এক বছরে দেশের ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে ঋণ করেছে। শহরের তুলনায় গ্রামীণ পরিবারগুলোতে এ সংকট বেশি। জাতীয় বেতন কমিশনের অনুরোধে বিবিএসের দারিদ্র্য ও জীবিকা পরিসংখ্যান সেল জরিপটি পরিচালনা করে। গত বছরের ১৪ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের গ্রামীণ, শহরাঞ্চল ও সিটি করপোরেশন এলাকার তিন হাজার পরিবারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। জরিপ অনুযায়ী, গত এক বছরে গ্রামের ৫১.৯১ শতাংশ পরিবার নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে ঋণ করেছে। শহরাঞ্চলে এই হার ৪০.১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩২.১১ শতাংশ। অর্থাৎ শহরের তুলনায় গ্রামের পরিবারগুলো বেশি আর্থিক চাপে রয়েছে। জরিপের তথ্য বলছে, জাতীয় পর্যায়ে পরিবারপ্রতি গড় মাসিক আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা। বিপরীতে গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। অর্থাৎ, প্রতি মাসে গড় আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি থাকছে এক হাজার ৭৯৮ টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে অনেক পরিবারকে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে কিংবা ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অঞ্চলভেদে ব্যয়ের চিত্রেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিবারপ্রতি গড় মাসিক ব্যয় ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। শহরাঞ্চলে তা ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা এবং গ্রামীণ এলাকায় ৩২ হাজার ৫৩২ টাকা। জাতীয় পর্যায়ে মাসিক ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক খাদ্য ও অর্ধেক খাদ্যবহির্ভূত খাতে ব্যয় হয়। তবে গ্রামে খাদ্য ব্যয়ের চাপ বেশি। অন্যদিকে সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট ব্যয়ের ৫৬.৭ শতাংশ যায় খাদ্যবহির্ভূত খাতে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মহামারির পর থেকে দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে প্রবৃদ্ধি কমছে, মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং কর্মসংস্থান স্থবির রয়েছে। কমছে মানুষের প্রকৃত মজুরি। ফলে আয় কমলেও ব্যয় বাড়ায় অনেক পরিবার ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। জীবনযাত্রার মান উন্নত নয়, বরং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিই বাড়তি ব্যয়ের কারণ। গ্রামে আয়ের সুযোগ কম থাকায় ঋণের চাপ বেশি। প্রবাস আয়ের সুফলও সীমিতসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে। এদিকে মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতির হার বেশি থাকায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। বিবিএসের মজুরি হার সূচক অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার কমে ৭.৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের মাসে ছিল ৮.০৫ শতাংশ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ৫৬ মাস মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি ছিল। বিশ্বব্যাংকের গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটেও অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রমের চাহিদায় ঘাটতি ও দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এতে দেশে দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে আনুমানিক ২২.৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
সরকারি সেবা পেতে সেবাপ্রার্থীদের ঘুষ দিতে হয় এবং হয়রানির শিকার হতে হয়। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ৭৪ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা বা সেবাপ্রার্থী বলেছেন, টাকা না দিলে কোনো কাজ হয় না। পিপিআরসি আরও বলেছে, সব ধরনের সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। মানুষ এমনিতেই দারিদ্র্য, ঋণ ও মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে, তার ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই হয়রানি। পিপিআরসির গবেষণা প্রতিবেদনটি আজ শনিবার ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। ওই গবেষণায় ২০২৫ সালের ৮–৩১ মে দেশের আটটি বিভাগের ৮ হাজার ৬৭টি পরিবারের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়। ‘বাংলাদেশের প্রকৃত অর্থনীতির অবস্থা: দারিদ্র্যের পুনরাবির্ভাব ও টিকে থাকার সক্ষমতার গতিশীলতা’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান ও সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী নামিরা শামীম। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭৪ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা বা সেবাপ্রার্থী বলেছেন, টাকা না দিলে কোনো কাজ হয় না। গবেষণায় হয়রানিকে শুধু ঘুষ বা অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায় হিসেবে দেখা হয়নি; বরং সেবা পেতে বাধা, নিয়মকানুন নিয়ে বিভ্রান্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দৈনন্দিন লেনদেনে ভোগান্তির চিত্রও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও হয়রানির কাঠামো বদলায়নি। কারণ, হয়রানির কাঠামো অক্ষুণ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, সব জায়গায় বিষয়টি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে হয়রানিকে রাষ্ট্রীয় ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। তিনি বলেন, অন্য দেশের মানুষ দুর্নীতি বোঝে, হয়রানি বুঝে না। হয়রানির এই চিত্র এমন এক সময়ে উঠে এসেছে, যখন অনেক পরিবারের আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান প্রায় শূন্য। এই তথ্য দিয়ে গবেষণায় বলা হয়েছে, পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা এবং ব্যয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা। মাস শেষে গড়ে উদ্বৃত্ত থাকে মাত্র ৭০ টাকা। পরিবারের মোট ব্যয়ের ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ চলে যায় খাবারের পেছনে। গ্রামীণ পরিবারে এ হার ৫৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অন্যদিকে সর্বনিম্ন আয়ের ১০ শতাংশ পরিবারের গড় মাসিক আয় ৮ হাজার ৪৭৭ টাকা হলেও ব্যয় ১২ হাজার ২৯৪ টাকা। এমন পরিস্থিতিতে সেবা পেতে অনানুষ্ঠানিকভাবে অর্থ (ঘুষ) দিতে হলে পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। গবেষণায় হয়রানিকে সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে একধরনের ‘অনানুষ্ঠানিক কর’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি মানুষের আর্থিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাও ক্ষয় করে। গবেষণার পর্যবেক্ষণ হলো, মানুষের দুর্দশা শুধু দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা অনেক পরিবারও অসুস্থতা, ঋণ, অপ্রতুল কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও হয়রানির চাপে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব চাপ একসঙ্গে জমতে থাকলে ওই পরিবারের পক্ষে সংকট সামাল দেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। নির্ধারিত আলোচক বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রপ্তানিকারক অনেকে রপ্তানি করাই ছেড়ে দেন ওই হয়রানির কারণে। আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, ‘সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সরকারের সংস্থাগুলো নিজেরাও হয়রানির শিকার হচ্ছে। যে বৈষম্য দূর করার জন্য জুলাইয়ে আন্দোলন হয়েছিল, নীতিনির্ধারকেরা তা অর্থবহ করতে পারছে না। নির্বাচনী ইশতেহারে অনেক কথাই বলা হয়েছে, কিন্তু এনবিআরের সংস্কার কেন হচ্ছে না, এটা আমার প্রশ্ন।’ একশনএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, ‘দুর্নীতি ও হয়রানির স্বাভাবিকীকরণ দিয়ে কী পরিবর্তন আসবে, আমার সন্দেহ হয়। বাজারে বসলে আরেক পক্ষ উঠিয়ে দিয়ে বলছে, টাকা দাও।’
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট ও উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী চাপে থাকলেও সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি মানুষের দুর্ভোগ লাঘব এবং দারিদ্র্য হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়া মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার পাশাপাশি নতুন করে মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া ঠেকানো সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আজ ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ফাঁকে সাংবাদিকদের এ কথা জানান। এর আগে সকালে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও ব্যাংক অব আমেরিকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। ড. তিতুমীর বলেন, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাবও অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সরকার এসব চাপ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ যতটা সম্ভব সীমিত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মূল্যায়নে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, অতীতের দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে দেশে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মনে করছে। ড. তিতুমীর বলেন, অতীতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বড় দুর্বলতা ছিল উপকারভোগী বাছাইয়ে ত্রুটি। যাদের সহায়তা পাওয়ার কথা, তাদের অনেকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হননি। অন্যদিকে, যাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা নয়, তারাও তালিকায় স্থান পেয়েছেন। এ সমস্যা সমাধানে সরকার ডিজিটাল জনপরিকাঠামো ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, যাতে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো যায়। তিনি বলেন, স্বাধীন গবেষণা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ডের কার্যকর বাস্তবায়নের ফলে দারিদ্র্য প্রায় ৫ শতাংশ কমতে পারে। সরকারের এসব কর্মসূচি কোনো কল্পনাপ্রসূত পরিকল্পনা নয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত কর্মসূচিগুলো পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশলেও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু কঠোর মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে ড. তিতুমীর বলেন, রাজস্ব ও আর্থিক খাতের সংস্কারও জরুরি। সরকারের লক্ষ্য রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং কর ফাঁকি, কর জালিয়াতি ও পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। এ লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপের ফলে রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, গত অর্থবছরে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ থেকে ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে। সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের বিশ্বাসযোগ্যতা কাজের ফলাফলের মাধ্যমেই প্রমাণিত হচ্ছে। আইএমএফের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিভিন্ন পূর্বাভাসের ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শর্ত ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত না হলে কী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, আইএমএফের পূর্বাভাসকে সেই প্রেক্ষাপটেও দেখতে হবে। অতীতে শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সরকার সংস্কারের মাধ্যমে তা দূর করতে চায়। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও আমানতকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করে ড. তিতুমীর বলেন, অতীতে ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের কারণে প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি সামনে এসেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনার কাজ চলছে। তিনি বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতকারীরা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ তুলতে পারছেন। আমানত উত্তোলনের পাশাপাশি অনেকেই অর্থ জমা রাখছেন, যা আস্থা ফেরার ইঙ্গিত দেয়। এ ছাড়া ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার কমে আসাও আর্থিক খাতে পরিবর্তনের একটি ইতিবাচক লক্ষণ। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও সারের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, সংকটের কারণে সৃষ্ট বাড়তি ব্যয়ের হিসাব করলেই অর্থনীতির ওপর এর পূর্ণ প্রভাব বোঝা যাবে না। কৃষকদের ওপর চাপ কমাতে ডিজেলের দাম না বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। সংকট সৃষ্টিতে বাংলাদেশের ভূমিকা না থাকলেও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সরকার এর প্রভাব মোকাবিলায় কাজ করছে। তিনি বলেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্র ও রপ্তানির প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার কৌশল নিয়েছেন। সরকারের লক্ষ্য নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমিয়ে টেকসই উন্নয়নের পথ তৈরি করা। বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কুইন সিরিকিত জাতীয় সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এ সভায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। বৈশ্বিক অর্থনীতি, উন্নয়ন অর্থায়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও আর্থিক খাতের সংস্কার সভার আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এ সভা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংস্কার, উন্নয়ন অর্থায়ন ও নিজস্ব অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।