শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, দেশের চামড়া শিল্পখাতের সার্বিক উন্নয়নে স্বল্প ও দীর্ঘ-উভয় মেয়াদে কার্যকর করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিকের পক্ষ থেকে নীতিগত সহযোগিতাসহ এসব কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।
আজ রোববার রাজধানীর মতিঝিলে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘চামড়া শিল্পখাতের উন্নয়নে সুপারিশ প্রদান ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্যে গঠিত টাস্কফোর্স’-এর নবম সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) মোঃ আবদুর রহিম খানসহ টাস্কফোর্সের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার চামড়া শিল্পখাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং একটি চামড়াও যেন নষ্ট না হয় সে বিষয়ে সরকার আন্তরিক। তিনি বলেন, পশু জবাই থেকে শুরু করে চামড়া বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হবে। এর মাধ্যমে চামড়া খাতকে দেশের অন্যতম বড় আয়ের উৎসে পরিণত করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, চামড়া সংরক্ষণের সুবিধা বাড়াতে হবে, যাতে কোরবানির মৌসুমে কোনো চামড়া নষ্ট না হয়। চামড়া শিল্পকে লাভজনক খাতে রূপান্তর করতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানসম্মত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মন্ত্রী জানান, কোরবানির ঈদে সংগৃহীত পশুর চামড়া এতিমখানাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়। এজন্য চামড়া সঠিকভাবে ছাড়ানো, সংরক্ষণ এবং মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সভায় বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) প্রতিনিধিদের অনুরোধে চামড়া ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ প্রদানের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। এ খাতের ব্যবসায়ীদের দ্রুত আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করার জন্যও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতি অনুরোধ জানান মন্ত্রী।
এছাড়া, সাভারের ট্যানারি শিল্প এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং চামড়া শিল্পনগরীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
চার বছর ধরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা মূল্যস্ফীতির চাপকে সঙ্গী করে নতুন অর্থবছর শুরু করতে যাচ্ছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। এ যাত্রায় মূল্যস্ফীতিকে কীভাবে সামলানো হবে, সেই পরিকল্পনা এখনো নীতি নির্ধারকদের পক্ষ থেকে খোলাসা করা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণের ওপর থেকে এই বোঝা কমানোই সবচেয়ে বড় মাথাব্যাথা হবে সরকারের। করণীয় নিয়ে পরামর্শও বাতলে দিয়েছেন তারা। বলছেন, শুধু এক ওষুধে কাজ হবে না। সরকার যে পদক্ষেপই নিক, ‘সমন্বিত নীতি’ ছাড়া মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা সম্ভব নয়। তাদের এ বক্তব্যের যুক্তি হল, সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা থেকে শুরু করে বাজারে অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা করার মত নানা পদক্ষেপ সরকার নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মূল্যস্ফীতি কমেনি। কোনো মাসে একটু কমলেও পরের মাসেই ফের চড়ে যাচ্ছে। যার উদাহরণ সবশেষ চার মাসের মূল্যস্ফীতির চিত্র। মূল্যস্ফীতি তখন ঘটে, যখন সময়ের সঙ্গে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। অর্থাৎ, টাকার মান কমে যায়। এই মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে বাংলাদেশে সরকার সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করে চলেছে। পণ্যের আমদানি শুল্ক কমানো হয়েছে; কোনো কোনো পণ্যের আমদানি শুল্ক শূন্যও করা হয়েছে। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে নীতি সুদহার (পলিসি রেট বা রেপো রেট) ১০ শতাংশ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখতেই রেপো রেট বার বার বাড়ানো হয়েছে। ২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দুই মাসে তিন দফায় ১৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। কিন্তু মূল্যস্ফীতি বাগে আসছে না। এমন প্রেক্ষাপটে ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট দিতে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। সেই বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে দেশের মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার নানা প্রতিশ্রুতি আসছে সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার আরও বেড়ে ১৬ মাসের সর্বোচ্চ হয়েছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে। গত এপ্রিলে এ হার ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এ নিয়ে টানা দুই ঊর্ধ্বমুখী হল মূল্যস্ফীতি। এর আগে টানা চার মাস বেড়ে ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে উঠেছিল। মার্চ মাসে তা কমে ৯ শতাংশের নিচে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নামে। এপ্রিলে ফের তা ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। পয়েন্ট টু পয়েন্টে ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি মে মাসে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ দিয়ে বোঝায়, গত বছর মে মাসে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় মিলেছে, তা চলতি বছরে মে মাসে পেতে খরচ করতে হয়েছে ১০৯ টাকা ৪২ পয়সা। দেশে বর্তমানে মূল্যস্ফীতির যে পারদ, তা বাড়তে থাকে মূলত কোভিড মহামারীর ধাক্কায়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে মহামারীর পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধকেও সামনে আনে। কিন্তু কোনো কোনো বিশ্লেষক এবং সরকারবিরোধী অনেক রাজনীতিক উচ্চ মূল্যস্ফীতির পেছনে আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি ও অর্থপাচারের হাত থাকার কথাও বলেন। চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর প্রায় দেড় বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তী সরকার। এ সময়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ও গভর্নর আহসান এইচ মনসুর একাধিকবার আশ্বাস দিয়েছিলেন মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসার কারণ হিসেবে অবশ্য সরকারের সঙ্গে ‘সমন্বয়হীনতার’ কথা বলেন তৎকালীন গভর্নর। গেল ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে তিনি বলেন, “মুদ্রানীতির শুধু মূল্যস্ফীতি ছাড়া বাকিগুলো কিন্তু অর্জন হয়েছে। আমলাতান্ত্রিকতার কারণে অনেক কিছু ‘ধীরে হয়’ মন্তব্য করে গভর্নর বলেন, এখানে মার্কেট পলিসির সঙ্গে রাজস্ব নীতির একটা সমন্বয় হতে হয়। সরকারের সঙ্গে সমন্বয় না হওয়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জন হচ্ছে না সেভাবে।’ দেশে কেন মূল্যস্ফীতি কমছে না, সেই প্রশ্নে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সাধারণ মানুষ গত চার বছর ধরে টানা মূল্যস্ফীতির চাপে ভুগছে। উচ্চ সুদের হার চালু রেখে কিছুটা মূল্যস্ফীতি কমানোর ইঙ্গিত মিলেছিল, তা আবারে বেড়ে গিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি করছে। বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এ পর্যন্ত সরকারের নেওয়া কোনো পদক্ষেপই যে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে পারেনি, তা আবার প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বাজার পরিস্থিতি উন্নত না হওয়ার পেছনে কিছু বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তহীনতা কাজ করেছে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। সম্প্রতি পশ্চিম এশিয়াসহ বিশ্ব-রাজনীতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠার কারণে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার শঙ্কা আছে। শঙ্কার কারণ তুলে ধরতে গিয়ে এই বিশ্লেষক বলেন, সরকার ১১ জুন নতুন বাজেট দেবে। এই বাজেটের বড় মাথাব্যথার কারণ হতে যাচ্ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি সমন্বয়। আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লা, গ্যাস ও জীবাশ্ম জ্বালানির দাম ‘অস্বাভাবিক’ বেড়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ইতোমধ্যে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় বিদ্যুৎমূল্য ১ টাকা ২৫ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে। বিদ্যুতের আগেই অবশ্য দেড় মাসের মধ্যে দুই দফায় চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। সরকারের দাবি, জ্বালানিপণ্যের দাম বাড়লেও তা মূল্যস্ফীতিতে খুব একটা প্রভাব ফেলবে না। গত ১৯ এপ্রিল সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, তেলের দাম একা তো মূল্যস্ফীতি বাড়ায় না। এটা একটা মূল কথা। খালি তেলের দামের জন্য কি মূল্যস্ফীতি বাড়বে? তবে জ্বালানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সবার ঘাড়ে একটা বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে মনে করেন জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, বিদ্যুতের ক্ষেত্রে এখন যেটা করা হচ্ছে, সেটা ১ টাকা ২৫ পয়সা প্রতি কিলোওয়াট আওয়ারে বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এটা যদি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি আমার অনুমান, এখন যা আছে তার থেকে শুধু এই কারণে ১ শতাংশের কাছাকাছি বাড়তে পারে আগামী এক বছরের মধ্যে। এইটা তো একটা অতিরিক্ত চাপ সবার উপরেই তৈরি করছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে। দীর্ঘদিন মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কে থাকায় তা নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দুই মাসে তিন দফায় ১৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। ওই বছরের নভেম্বরে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি বা মাসভিত্তিক) মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। পরের মাস থেকে কমতে কমতে গত বছরের অক্টোবরে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নামে। সেখান থেকে আবার বেড়ে নভেম্বরে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে আরও বেড়ে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে ওঠে। ৩০ জুন ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষ হবে। এই আর্থিক বছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয় গত ৯ ফেব্রুয়ারি। তাতে নীতি সুদহার বা রেপো হার ১০ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়। রেপোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো এক দিনের জন্য টাকা ধার নেয়। একে বলা হয় ব্যাংকিং খাতের নীতি উপাদান (পলিসি টুলস)। এর সুদ হারকে বলা হয় নীতি সুদহার বা রেপো রেট। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে তারল্য ও বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করে। রেপোর সুদ বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর তহবিল পাওয়ার খরচ আরও বাড়ে। তাতে ব্যাংক থেকে ব্যবসায়ীদের ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও সুদহার বেড়ে যায়। এই হার অপারিবর্তিত রাখার মানে হল, বাজারে মুদ্রাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপাতত সুদহারের লাগাম শিথিল করছে না। দেড় বছর রেপো সুদহার ১০ শতাংশ থাকায় ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়ে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। দেশে বিনিয়োগে যে খরা চলছে, এই উচ্চ সুদহার তার একটি কারণ বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। করোনা মহামাররীর প্রথম ধাক্কার পর ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই মূল্যস্ফীতির হার সারা বিশ্বে বাড়তে শুরু করে। এরপর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি হয়। ইউরোপ ও আমেরিকায় মূল্যস্ফীতির হার ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে যায়। তখন থেকে বাংলাদেশেও মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে। কিন্তু উপমহাদেশের অন্যান্য দেশ বা ইউরোপ–আমেরিকা মূল্যস্ফীতির হার কমিয়ে আনতে পারলেও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার এখনো কমছে না। শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে দেওয়া প্রতিবেদন বলছে, গত মে মাসে দেশটিতে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। আগের মাস এপ্রিলে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত শ্রীলঙ্কার মূল্যস্ফীতি উঠেছিল প্রায় ৭০ শতাংশে। ওই সময় বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১০ শতাংশ। ২০২৪ সালের শেষের চার মাস শ্রীলঙ্কায় কোনও মূল্যস্ফীতি হয়নি; বরং মূল্য সংকোচন হয়। অর্থাৎ নেগেটিভ (-) মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ওই চার মাসে। পাশের দেশ ভারতের মূল্যস্ফীতিও কম। সবশেষ গত এপ্রিলে ৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে দেশটিতে। তবে বাংলাদেশের মতো পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি এখন বেশি। এপ্রিলে ১০ দশমিক ৯০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে দেশটিতে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে ২০২৩ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি ৫০ শতাংশে উঠেছিল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছিল। ওই বাজেটের এক মাস যেতেই পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের; বাজেট বাস্তবায়ন করে অন্তবর্তী সরকার। ১০ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ গড় মূল্যস্ফীতি নিয়ে শেষ হয়েছিল ২০২৪-২৫ অর্থবছর। পাঁচ বছর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে ৯ দশমিক শূন্য দুই শতাংশে ওঠে। ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষ হয় ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ নিয়ে। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে রাখার লক্ষ্য ধরে অন্তবর্তী সরকার। এপ্রিল পর্যন্ত (২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালে এপ্রিল) হিসাবে ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ গড় মূল্যস্ফীতির তথ্য দিয়েছে পরিসংখ্যান ব্যুরো। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ধরা হচ্ছে বলে অর্থমন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে নতুন বাজেটে কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে তারেক রহমানের সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১৩টি কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এরমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচিও রয়েছে। এ খাতে মোট ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার মতো বরাদ্দ দেওয়া হতে পারে নতুন বাজেটে, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন কর্মসূচির উপকারভোগীর সংখ্যাও বাড়ানো হতে পারে। এ প্রসঙ্গে জাহিদ হোসেন বলেন, মূল্যস্ফীতি ও সামষ্টিক অর্থনীতির চাপের মধ্যে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও বিভিন্ন সামাজিক ভাতা বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা অত্যন্ত সময়োপযোগী। তবে এর প্রাপ্তি ও বণ্টন নিয়ে সংশয় আছে। বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর জন্য শতাধিক সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প সচল আছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এসব প্রকল্পের পারফরম্যান্স একেবারেই সন্তোষজনক নয় এবং ১ টাকা দিতে গিয়ে দেড় টাকা খরচ হওয়ার মতো সমস্যা রয়েছে। তেমনটা যেন না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে, তাহলেই কেবল এর সুফল পাওয়া যাবে। অন্য অনেক দেশ পারলেও বাংলাদেশ কেন মূল্যস্ফীতি কমাতে পারছে না, সেই প্রশ্নে জাহিদ হোসেন বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে যাওয়া থেকে হয়ত ঠেকিয়ে রেখেছে। তবে এটিই মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য যথেষ্ট নয়, কারণ বর্তমান সংকটটি মূলত সরবরাহভিত্তিক। প্রশ্নটা হলো, যেখানে আপনার সরবরাহ সংকট, সেখানে সেইটাকে যদি আমরা এড্রেস করতে না পারি, এখন ধরেন গ্যাসের অভাবে উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার হচ্ছে না, যার কারণে সরবরাহ যেটা দেয়া সম্ভব, সেটা আমরা দিতে পারছি না। ওইটা যদি আমরা সমাধান করতে পারতাম, তাহলে সেটা মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়ক হতো। মূল্যস্ফীতি কমাতে চাইলে চাঁদাবাজি কমানো এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি প্রয়োজন বলে মনে করেন জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, যে দামে উৎপাদকরা বিক্রি করছেন, আর যে দামে ভোক্তারা কিনছেন, চাঁদাবাজির কারণে তার মধ্যে একটা বড় পার্থক্য তৈরি হয়। তো সেখানে যদি আমরা আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতিকে উন্নত করতে পারতাম, যার ফলে চাঁদাবাজিটা বন্ধ হতো, তাহলে ওই অতিরিক্ত মূল্যটা ভোক্তাদের দিতে হতো না। সেটাও মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়ক হতো। এদিক বিবেচনায় সরবরাহের সংকট সমাধান না করে ওই শুধু সুদের হার উচ্চ পর্যায়ে রেখে মূল্যস্ফীতি কমবে, এটা আশা করা যায় না। প্রায় একই কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের (সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আমাদের জন্য এটা খুবই দুঃখজনক যে, আমরা মূল্যস্ফীতি কমাতে পারছি না। আমার মনে হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কমাতে আমরা সঠিক ওষুধ প্রয়োগ করতে পারছি না। বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতিকে শুধু মুদ্রানীতির বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় অংশ সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার, জ্বালানি খরচ, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত। তাই সমন্বিত নীতি দরকার। খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলা শক্তিশালী করতে হবে। বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে। মজুতদারি ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে কার্যকর তদারকি দরকার। আমদানি সিদ্ধান্তও সময়মতো নিতে হবে, যেন বাজারে ঘাটতি তৈরি না হয়। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও পাইকারি বাজার ব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়াতে হবে। নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “গ্রামীণ ও শহুরে দরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত, স্থির আয়ের মানুষ এবং অনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবীরা মূল্যস্ফীতির প্রধান ভুক্তভোগী। তাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে। খাদ্যসহায়তা, স্বল্প মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, নগদ সহায়তা এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক সহায়তার মতো কর্মসূচি বাস্তব চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে সম্প্রসারণ করা দরকার।
দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে প্রথম বাজেট দিতে যাচ্ছে, যেখানে পাঁচটি খাতকে অগ্রাধিকারে রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। তবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের অর্থমন্ত্রীর যেমন প্রশ্ন আছে, তেমনি অর্থনীতির গবেষকও সংশয় প্রকাশ করেছেন। গেল ১৮ মে তারেক রহমানের সরকার আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করেছে, যা বাস্তবায়নের সক্ষমতা বিবেচনায় ‘উচ্চাভিলাষী’ মনে করছেন বিশ্লেষকরা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির ৫০ শতাংশ বরাদ্দ বাড়িয়ে যে উন্নয়ন ছক আঁকা হয়েছে, সরকার সেখানে পরিবহন ও যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি এবং গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিষেক হওয়া তারেক রহমানের সরকার বাজেট দিতে যাচ্ছে আগামী ১১ জুন, যার আকার ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে আলোচনা আছে। এবার বাজেট প্রণয়ন ও পরিকল্পনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, তার ওপরই সংসদে বাজেট উপস্থাপনের ভার পড়েছে। তিনি এক সময় বিএনপি সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সামলেছেন। খোদ অর্থমন্ত্রী উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমলাতন্ত্রের ভূমিকা নিয়ে খেদ প্রকাশ করে বলেছেন, ব্যুরোক্রেসির’ যে অবস্থা, আমাদের মানুষের যে মন মানসিকতা, দুঃখের বিষয় বলতে হয়। কেমনে বাস্তবায়ন করব (উন্নয়ন প্রকল্প)? অবকাঠামো ঘিরে আওয়ামী লীগ আমলে যে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলছিল তা থেকে বেরিয়ে মানবসম্পদ তৈরির দিকে ঝোঁকার বার্তা দিচ্ছে বিএনপি সরকার। তবে এক অর্থবছরের ব্যবধানে ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে যে উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নে অর্থায়ন হবে কীভাবে? অর্থের অপচয় রোধ সম্ভব হবে কিনা, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পারবে কিনা, এসব প্রশ্ন সামনে আছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে উন্নয়ন কর্মসূচিতে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, এর মধ্যে ৩২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা এসেছে ঋণ থেকে। সরকারি তহবিল থেকে খরচ হয়েছে ৪৮ হাজার ৯০১ কোটি টাকা আর সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ৫ হাজার ৩৫ কোটি টাকা। এডিপির বরাদ্দ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংশোধিত এডিপি বরাদ্দের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বরাদ্দ পরিকল্পনা করা হয় ঋণ থেকে। ফলে নতুন করে ঋণের বোঝা বাড়িয়ে অর্থনীতিকে আরো চাপে ফেলার পরিস্থিতি তৈরি হবে কিনা, সেই আলোচনাও আছে। বরাদ্দ বাড়িয়ে কেবল প্রতিশ্রুতির বাজেট দিলেও তা বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা গেলে অপচয় ও দুর্নীতি বাড়বে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, একটা জবাবদিহিতার সিস্টেম যদি না করা যায়, তাহলে ওই বরাদ্দ দিয়ে খুব একটা লাভ হবে না। তখন বেশি বরাদ্দ হয়তো হবে, কিন্তু সেখানে শুধুমাত্র অপচয় হবে, দুর্নীতি হবে। অপরদিকে উন্নয়ন বাজেট ঘিরে যে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে সরকার, তা বাস্তবায়নে অর্থ মিলবে কিনা সেই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, প্রশ্নটা হল যে এত বড় আকারের বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য হবে কিনা? এইটার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন, সেই অর্থটা পাওয়া যাবে কিনা? আর সেইটা যদি না করতে পারেন, তাহলে প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন বাজেটে থাকলেও বাস্তবে কিন্তু সেইটা দেখা যাবে না। ইশতেহারের পাঁচ স্তম্ভের ছকে এডিপি ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশের হাল ধরে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঠিকাদার ও প্রকল্প পরিচালকদের অনুপস্থিতি এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ‘ধীরে চলা’ নীতির কারণে গেল দুই অর্থবছর দেশে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা বিরাজ করছিল। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতা পেয়ে সরকার গঠনের পর এখন তাদেরকেই সামলাতে হবে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার এই কঠিন ‘চ্যালেঞ্জ’। বিএনপি তার নির্বাচনি ইশতেহারে যে পাঁচ স্তম্ভের কথা বলেছিল, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনার ছক আঁকছে তারেক রহমানের সরকার। পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, রাষ্ট্র সংস্কার, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংহতিকে ‘সমন্বিতভাবে’ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এরজন্য বিচার ও আইনগত সেবা সম্প্রসারণ, আদালত ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম প্রযুক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার কথা বলছেন তারা। এছাড়াও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে ‘অগ্রাধিকারমূলক’ বরাদ্দ পরিকল্পনা করা হয়েছে। বরাদ্দ বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জোর দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি হাতে নিয়েছে সরকার। বৃহৎ অবকাঠামোর চেয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে সাজানো এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া পাঁচ খাতের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সর্বাধিক বরাদ্দ পাচ্ছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এই খাতে ৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে শিক্ষা খাত বরাদ্দ পেয়েছে ১৫.৮৬ শতাংশ বা ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা। তৃতীয় সর্বোচ্চ ১১.৮৪ শতাংশ বা ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে আলোচিত স্বাস্থ্য খাতে। চলতি অর্থবছরের ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকার তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বরাবরের মতো জ্বালানি ও বিদ্যুতে ভর্তুকি বাড়তে থাকায়, বিশ্ব বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা ও সংকট থাকায় এ খাতে চতুর্থ সর্বোচ্চ বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা বাড়াতে এ খাতে রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা, যা এডিপির পঞ্চম সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সরকার বৃহৎ (মেগা) প্রকল্পের দিকে হাত না বাড়ালেও অবকাঠামোতে বরাদ্দ কম রাখা হয়নি। মোট বরাদ্দের ১৬.৭০ শতাংশ যে পরিবহন ও যোগাযোগ এবং ১০.৯০ শতাংশ জ্বালানি খাতে, তার বড় অংশের অর্থ যাবে অবকাঠামো উন্নয়নে। পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জাতীয় ও আঞ্চলিক অবকাঠামো উন্নয়ন, রেল ও নৌ যোগাযোগ সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, গ্যাস অনুসন্ধান এবং শিল্পপার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রেক্ষিতেই পরিবহন ও যোগাযোগ খাত এবং জ্বালানি খাতে মোট বরাদ্দের সাড়ে ২৭ শতাংশের মতো বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সাড়ে ৮২ হাজার কোটি টাকার মতো অর্থ খরচা হবে অবকাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রকল্পে। এছাড়া বিশেষ প্রয়োজনে সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা বাবদ থোক ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, ‘কৃষক কার্ড’ বাস্তবায়নে ১ হাজার ৪০০ কোটি এবং মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ের কর্মরতদের সম্মানীতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দ না দেওয়া, অর্থ খচরের সক্ষমতার ঘাটতি ও দুর্নীতি নিয়ে বরাবরই সমালোচনা হয়ে আসছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ-এনইসির সভায় নতুন অর্থবছরের জন্য এডিপি অনুমোদনের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থনীতির নানামুখী সংকটের মধ্যেও এডিপির আকার বাড়ানো ‘উচ্চাভিলাষী’ সিদ্ধান্ত কিনা, সেই প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, “অবশ্যই। এইখানে আমরা কিন্তু সব কথাগুলো স্পষ্টভাবে বলেছি। স্বাস্থ্য, শিক্ষাক্ষাত, ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ (তরুণ জনসংখ্যার আধিক্যের সুবিধা) এবং এই যুব সমাজের উন্নয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, এগুলো কিন্তু সবকিছু এক জায়গায়। \ এবং এই জায়গায় বাজেট না দিলে আমরা ‘ইউনিভার্সেল হেলথ কেয়ারের’ যে কথাটা বলছি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, এটার সাথে আরও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা, এগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলেতো আপনাকে বাজেট দিতে হবে, তাই না? তিনি বলেন, শিক্ষার বেলাতেও তাই। শিক্ষার কিন্তু আমরা বিস্তৃতিটা বাড়াচ্ছি, এখানে কিন্তু প্রচুর ‘স্কিল ডেভেলপমেন্ট’ হবে, আপনার দক্ষতা বাড়ানো। এখানে প্রচুর ইনস্টিটিউশন হবে। ‘উন্নয়নহীন’ দুই অর্থবছর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর উন্নয়ন প্রকল্পের গতি প্রায় থমকে যায়। বহু প্রকল্পের ঠিকাদার ও প্রকল্প পরিচালকদের খুঁজে না পাওয়ায় মাঠপর্যায়ের কাজ স্থবির হয়ে পড়ে। সে সংকটময় পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিগত অর্থবছরের বাজেট সংস্কার ও প্রকল্প কাটছাঁটের নীতি বেছে নেয়, ফলে উন্নয়ন খাতে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের মন্থর গতি ও রাজস্ব আদায়ে লক্ষাধিক কোটি টাকার ঘাটতির শঙ্কায় অর্থবছরের মাঝপথে এসে অন্তর্বর্তী সরকার আরও প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আঁটসাঁট নীতি গ্রহণ করে। এতে করে চলতি অর্থবছরের ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এডিপিতে কোপ পড়ে। জানুয়ারিতে এসে কাটছাঁটের পর সংশোধিত এডিপির আকার দাঁড়ায় ২ লাখ কোটি টাকা। সবচেয়ে বড় কোপ পড়ে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বরাদ্দে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ কমেছে ৭৩ শতাংশ; আর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় কমেছে ৫৫ শতাংশ। বিএনপি সরকার বাজেট ঘোষণার আগে চলতি অর্থবছরের প্রায় চার মাস পেলেও তাতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পালে হাওয়া লাগাতে পারেনি। এর মধ্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অনেক প্রকল্প বাদ দেওয়ারও পরিকল্পনার কথা বলছে সরকার। গেল ২ জুন বাজেট বিষয়ক এক সেমিনারে অর্থমন্ত্রী এদিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “বিগত দিনের ১ হাজার ৩০০ প্রজেক্ট নিয়ে আমরা দায়িত্ব নিয়েছি, এর মধ্যে অনেক প্রজেক্ট এই মানদণ্ড মিট করছে না। এরমধ্যে আমরা অনেক বাতিল করে দেব। আর যেগুলো অনেক খরচ করে ফেলেছে, ওইগুলো আমরা ‘রিপারপাসিং’ করে আরও ‘বেস্ট রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’ করা যায়, আমরা চেষ্টা করছি। প্রকল্প বাছাইয়ের মানদণ্ড বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা প্রজেক্টের চারটা মানদণ্ড দিয়েছি। প্রত্যেকটা প্রজেক্টের চারটা মানদণ্ড। একটা হচ্ছে ‘ভ্যালু ফর মানি’- আমি যে টাকাটা খরচ করলাম, এটার মূল্যমান থাকতে হবে। আরেকটা হচ্ছে ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’- যে ‘প্রজেক্টটা’ করছি এটার ‘রিটার্নটা’ আমার কী হবে-এটার হিসাব করতে হবে। তৃতীয় হচ্ছে ‘জব ক্রিয়েশন’ হচ্ছে কিনা। চতুর্থ হচ্ছে আমাদের ‘এনভাইরনমেন্টাল কনসিডারশনটা’ ঠিক হচ্ছে কিনা। আমরা ছোট দেশ, এতগুলো লোক আমরা বাস করি, পরিবেশ ধ্বংস করে দিয়ে আমরা অর্থনীতি গঠন করলে আমাদের জন্য ক্ষতিকর হবে। আমাদের প্রত্যেকটা প্রকল্প বাছাইয়ে এই চারটা মানদণ্ড যেটা পূরণ করবে না, ওই সমস্ত প্রকল্প আমরা বাতিল করে দিচ্ছি। আওয়ামী লীগ সরকারের অনেক প্রকল্প কাটছাঁটের দিকে গেলেও এডিপিতে মেট্রোরেলের তিন প্রকল্পেই বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৩ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে এমআরটি-৫ লাইনের জন্য রাখা হয়েছে ৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা, এমআরটি-১ এর জন্য ৩ হাজার ৯০৯ কোটি এবং চালু থাকা এমআরটি-৬ এর জন্য ১ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এডিপির সবশেষ হালচাল জুলাই অভ্যুত্থানের পর এডিপি বাস্তবায়নে যে ধাক্কা লেগেছিল, তা অব্যাহত আছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৪১ দশমিক ৪১ শতাংশ। তাতে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৮৬ হাজার ৫১৬ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতেও অর্থবছরের বাকি দুই মাসে (মে ও জুন) ১ লাখ ২২ হাজার ৪২০ কোটি টাকা খরচ করতে হবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) ৯৩ হাজার ৪২৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। বাস্তবায়নের হার ছিল ৪১ দশমিক ৩১ শতাংশ। সে হিসাবে গত অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ের চেয়ে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ৬ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা কম ব্যয় হয়েছে। আইএমইডির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং প্রশাসনে রদবদলের ধাক্কায় এডিপি বাস্তবায়নে যে ধীরগতি দেখা দিয়েছিল, তা এখনও চলছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের গড় বাস্তবায়নের হার ৫০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এই অর্থবছরের ২ লাখ ৮ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা এডিপির ৭০.৯৭ শতাংশই বরাদ্দ ছিল এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে। ‘সরকারে সক্ষমতা বাড়ার ইঙ্গিত’ এডিপির এই বিশাল আকারকে ‘উচ্চাভিলাষী’ বলা হলেও সরকারের পক্ষ থেকে একে সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। গেল ১৮ মে নতুন অর্থবছরের এডিপি অনুমোদনের পর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু বলেন, “চলমান অর্থবছরের তুলনায় এটি বড় আকারের উন্নয়ন কর্মসূচি, যা সরকারের বিনিয়োগ ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত। বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার যে প্রস্তাবটি দেওয়া হয়েছে, এটিতে আমরা ধরে নিয়েছি একটি নির্বাচিত সরকারের সক্ষমতা অনেক বেশি। এফিসিয়েন্সি অনেক বেশি থাকবে এবং এটার বাস্তবায়ন ক্ষমতাও বেশি হবে। বাস্তবায়ন নিয়ে মন্ত্রী বলেছিলেন, এখন বাস্তবায়ন হবে কি না, এটা তো অপেক্ষা করতে হবে। বাস্তবায়ন তো করতেই হবে, না হলে আমরা আমাদের প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, রপ্তানি আর শিল্পের উৎপাদন কীভাবে অর্জন করব? এগুলো সব একটার সাথে একটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গেল ২ জুন বাজেট বিষয়ক সেমিনারেও বাস্তবায়নে বাধাগুলো কী কী তা তুলে ধরেন আমির খসরু। এরমধ্যে আমলাতন্ত্রের প্রসঙ্গও টানেন। তিনি বলেন, বড় বাজেট বাস্তবায়িত হয় না। একদম সঠিক কথা। বাস্তবায়িত হয় না, বাস্তবায়িত করতে পারে না। কার কারণে পারে না, কেন পারে না, কোথায় পারে না, কোথায় বাধাগ্রস্ত, আমরা তো ‘আইডেন্টিফাই’ করতেছি। জবাবদিহিতা ও সক্ষমতায় জোর বরাদ্দ বাড়ালেই যে ফল মিলবে, তা মনে করেন না অর্থনীতির গবেষকরা। তারা ব্যবস্থাপনার দিকেও নজর দিতে বলেছেন। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, এখানে দুটো বিষয়—একটা হচ্ছে যে অর্থ খরচ, দ্বিতীয় হচ্ছে গুণগত মান বজায় রেখে খরচ করা, যাতে প্রকল্প থেকে লক্ষণীয় ফল আসে। সরকারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতে বরাদ্দের উদ্যোগ নিয়ে তিনি বলেন, “আমরা বাজেটে বরাদ্দ নিয়ে অনেক সময় বলি যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক খাতগুলোতে বরাদ্দ এত কম। তুলনীয় দেশগুলোর চাইতে কম। এটা একটা আমাদের আক্ষেপ কিংবা ‘কমপ্লেইন’ বলতে পারেন। কিন্তু অন্যদিকে এটাও মাথায় রাখা যে বরাদ্দ বাড়ালেই কী সবাই শিক্ষিত হয়ে যাবে বা শিক্ষার গুণগত মান বেড়ে যাবে? এটা হয়ে যাবে, তা তো না। আবার স্বাস্থ্যসেবা খুব মান বেড়ে যাবে, এটাও না। পৃথিবীর বহু দেশেই, এটা আমাদের দেশেও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে দুটো বিষয় এক না। এই গবেষকের মতে, বরাদ্দ বাড়িয়ে সরকার দেখাতে চায় যে তার একটা দায়বদ্ধতা আছে, এই খাতটাকে সে গুরুত্ব দিচ্ছে। শুধুমাত্র রাস্তাঘাট ও ভৌত অবকাঠামো না, সামাজিক অবকাঠামোতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তী যে কাজ, সেটা কিন্তু আর করা হয় না। প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার গুরুত্ব তুলে ধরে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ওই রকম একটা জবাবদিহিতার সিস্টেম যদি না করা যায়, তাহলে ওই বরাদ্দ দিয়ে খুব একটা লাভ হবে না। তখন বেশি বরাদ্দ হয়তো শুধুমাত্র অপচয় হবে, দুর্নীতি হবে। বড় বাজেট ও এডিপি হাতে নেওয়ার মাধ্যমে নির্বাচনি ‘প্রতিশ্রুতি’ পূরণের পথে হাঁটা শুরু করেছে সরকার, সেরকম একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন। তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবস্থাপনার দিকেও নজর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। দরিদ্র, দুঃস্থ ও সচ্ছলদের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আওতায় শতাধিক কর্মসূচি থাকার কথা তুলে ধরে জাহিদ হোসেন বলেন, এগুলোর ‘পারফরম্যান্স’ দেখি, যাদের জন্য কর্মসূচিগুলো দেওয়া হয়েছিল, তাদের কাছে পৌঁছাতে পারে না। এর কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ব্যবস্থাপনার সমস্যা আছে, যার কারণে ১ টাকা দিতে গিয়ে আপনার দেড় টাকা খরচ হয়। এই সমস্যাগুলো, এই যে নতুন কর্মসূচিতে এগুলো থাকবে না, সেটা তো আমরা ধরে নিতে পারি না।
দেশের বাজারে ভরিতে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৫৫ টাকা। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে। মঙ্গলবার (৬ জুন) সকাল ১০টা থেকেই সোনার নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। আজ শনিবারও একই দামে বিক্রি হচ্ছে সোনা। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার দাম কমায় নতুন এই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম অনুযায়ী, দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের সোনার দাম পড়বে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৫৫ টাকা। এ ছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ২৪ হাজার ১৮২ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৯২ হাজার ১৬৪ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম ১ লাখ ৫৬ হাজার ৪৭৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে, সবশেষ গত ২৫ মে সকালে দেশের বাজারে সোনার দাম সমন্বয় করেছিল বাজুস। সে সময় ভরিতে ২ হাজার ১৫৮ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম ২ লাখ ৩৮ হাজার ১২১ টাকা নির্ধারণ করেছিল সংগঠনটি। এ ছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ২৭ হাজার ৩৩১ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৪৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৮৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়। যা কার্যকর হয়েছিল সেদিন সকাল ১০টা থেকেই। এদিকে সোনার দাম কমানোর সঙ্গে দেশের বাজারে কমানো হয়েছে রুপার দামও। ভরিতে ১১৭ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ৬৫৭ টাকা। এ ছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৫ হাজার ৩৬৫ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৪ হাজার ৬০৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার দাম ৩ হাজার ৪৪১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।