রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্স বিমানের জন্য যখন একযোগে বোয়িং ও এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ সংগ্রহের কথা চলছে, একই সময়ে নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছে বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলাও।
বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোকে টেক্কা দিয়ে দেশীয় বাজার ধরতে মরিয়া ইউএস-বাংলা প্রতিষ্ঠার ১২ বছরের মাথায় নতুন করে ১৪ হাজার কোটি টাকা (১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগে ২১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার খবর দিয়েছে।
দেশীয় বেসরকারি এয়ারলাইন্সের ইতিহাসে এটা রেকর্ড। সবচেয়ে কম টাকায় হজ ফ্লাইট পরিচালনার জন্যও সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছে এয়ারলাইন্সটি।
একটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পর বন্ধ হয়ে যাওয়া কাঠমান্ডু রুটও নতুন করে শুরু করার কথা বলা হয়েছে ইউএস-বাংলার পক্ষ থেকে।
দেশের এভিয়েশন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে ঢাকা থেকে যাত্রী বহন করা ৪১টি এয়ারলাইন্সের মধ্যে মাত্র চারটি দেশি। দেশের ৮০ শতাংশের বেশি যাত্রী নিয়ে যাচ্ছে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো।
এখানে যাত্রী চাহিদা এত বেশি যে বাজে সার্ভিস দিয়েও দিনের পর দিন টিকে যাচ্ছে একেকটি এয়ারলাইন্স। এ পরিস্থিতিতে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো বাজার ধরতে পারলে বিদেশি মুদ্রা বাঁচবে।
দেশের চারটি এয়ারলাইন্সের মধ্যে ইউএস-বাংলার বহরে সবচেয়ে বেশি ২৫টি উড়োজাহাজ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্স বিমানের বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ।
বিমান সম্প্রতি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ সংগ্রহের জন্য চুক্তি করেছে। পাশাপাশি এয়ারবাস থেকেও বিমানের জন্য উড়োজাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার। এছাড়া গত বৃহস্পতিবার ‘ড্রাই লিজে’ তিনটি সিঙ্গেল আইল বোয়িং সংগ্রহের জন্য দরপত্র প্রকাশ করেছে বিমান।
ইউএস-বাংলাও গত সপ্তাহে ২১টি নতুন বোয়িং সংগ্রহের ঘোষণা দেয়। গত ১২ জুলাই বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনকে পাঠানো একটি চিঠিতে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার বা ১৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ২১টি নতুন বোয়িং ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ সংগ্রহের বিষয়টি জানায় এয়ারলাইন্সটি।
চিঠিটি মূলত দেওয়া হয়েছিল বোয়িং ও এয়ারক্রাফট লিজিং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আগামী ২৯ জুলাই অনুষ্ঠেয় আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বিডার চেয়ারম্যানকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য।
নতুন উড়োজাহাজে বিনিয়োগের অর্থ পাঁচটি আন্তর্জাতিক লিজিং কোম্পানির মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে জানিয়ে ইউএস-বাংলার চিঠিতে বলা হয়, ২০২৭ সালে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে উড়োজাহাজগুলো বহরে যুক্ত হবে।
অন্যদিকে বিমানের অর্ডার করা উড়োজাহাজগুলো আসতে আসতে ১০ বছর গড়িয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে বহর সম্প্রসারণে ইউএস-বাংলা এগিয়ে থাকবে।
প্রচুর যাত্রী, টানছে বিদেশিরাই
বর্তমানে দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ প্রবাসী। মূলত তাদের যাতায়াতের কারণেই ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দিন-রাত ব্যস্ততা।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে প্রধান এ বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করেছেন অন্তত ১ কোটি ২৭ লাখ ২০ হাজার যাত্রী। আগের বছর যাত্রী সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৫ লাখ।
এই বিমানবন্দরে বর্তমানে যাত্রীসেবা দিচ্ছে ৪১টি দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্স। যার মধ্যে মাত্র চারটি দেশি। এবং এই চারটির মধ্যে কেবল বিমান ও ইউএস-বাংলা আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করেছে।
মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা বোয়িং বিমান চলাচল ও যাত্রীসংখ্যার বিষয়ে পূর্বাভাস দেয় তাদের কমার্শিয়াল মার্কেট আউটলুক (সিএমও) ম্যাাগাজিন।
‘কমার্শিয়াল মার্কেট আউটলুক ২০২৫- ২০৪৪’ এ বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল এভিয়েশন (বিমান পরিবহন) বাজার। আগামী বিশ বছরে, গড় বার্ষিক এয়ার ট্রাফিক (বিমান চলাচল) প্রবৃদ্ধি জিডিপিকে প্রায় তিন শতাংশ পয়েন্টে ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
“এছাড়া সাম্প্রতিক সরকারি সংস্কার এবং উদার প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ নীতি দেশীয় বিমান সংস্থাগুলোর মূলধন পাওয়ার সুযোগ উন্নত করতে সহায়তা করছে এবং এ অঞ্চলে বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর বিনিয়োগের দ্বার উন্মুক্ত করছে।”
বোয়িং কমার্শিয়ালের এশিয়া প্যাসিফিক ও ভারতের মার্কেটিং ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডেভ শাল্টে ২০২৩ সালে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে সিএমওর বরাত দিয়ে বলেছিলেন, “পশ্চিম এশিয়া ও ভারতে আঞ্চলিক ট্র্যাফিক বিবেচনায় আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের বিমান ভ্রমণ দ্বিগুণ হবে বলে আমরা মনে করি।”
সিএমওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, যাত্রী ভ্রমণ এবং এয়ার কার্গোর জোরালো চাহিদা মেটাতে, দক্ষিণ এশিয়ার ক্যারিয়ারগুলোকে আগামী ২০ বছরে ২ হাজার ৩০০টির বেশি নতুন বাণিজ্যিক বিমান বহরে যুক্ত করতে হবে, যা এখনকার তিনগুণ।
এর মধ্যে সিঙ্গেল-আইল বা ৭৩৭ এর মত ন্যারোবডি উড়োজাহাজ থাকবে ক্যারিয়ারগুলোর বহরের ৯০ শতাংশ। বোয়িং ৭৮৭ এর মত ওয়াইডবডি থাকবে ১০ শতাংশ।
এই দৌড়ে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে বিমান ও ইউএস-বাংলা ছাড়া আর কেউ অংশ নিতে পারছে না। যাত্রী প্রবাহ বৃদ্ধির পূর্বাভাসের কারণেই বিদেশি লিজিং কোম্পানিগুলো ইউএস-বাংলার সঙ্গে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।
বেসরকারি এয়ারলাইন্সের আসা-যাওয়া
গত তিন দশকে দেশে ১০টির মত বেসরকারি এয়ারলাইন্স ব্যবসা শুরু করেছে; এর মধ্যে ছয়টিই বন্ধ হয়ে গেছে প্রতিষ্ঠার এক দশকের মধ্যে।
দেশের বিমানবন্দরের অতিরিক্ত চার্জ, নানা সুবিধায় থাকা ফ্ল্যাগ ক্যারিয়ার বিমানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কুলিয়ে না উঠতে পারাসহ নানা কারণে এ এয়ারলাইন্সগুলো বিপুল দেনা রেখে অকালেই ঝরে গেছে।
১৯৯৫ সালে বাংলাদেশে প্রথম বেসরকারি এয়ারলাইন্স হিসেবে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট শুরু করে ‘অ্যারো বেঙ্গল এয়ারলাইন্স’। চার বছরের মাথায় ব্যবসা গুটিয়ে নেয় তারা।
১৯৯৭ সালে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছিল ‘এয়ার পারাবত’। তারাও চার বছরের মধ্যে ২০০১ সালে বন্ধ হয়ে যায়।
২০০৫ সালে চালু হয় ‘এয়ার বাংলাদেশ’ এবং ২০০৭ সালে চালু হয় ‘রয়েল বেঙ্গল এয়ারলাইন্স’। অব্যাহত লোকসানের কারণে এ দুটি এয়ারলাইন্সও বন্ধ হয়ে যায়।
২০০৭ সালে আত্মপ্রকাশ করা ‘বেস্ট এয়ার’ ফ্লাইট অপারেশন শুরু করে ২০০৮ সালে। এক বছরের মধ্যেই এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
২০০৫ সালের জুন মাসে প্রতিষ্ঠিত ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি অপারেশন বন্ধ করে দেয়।
২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করা জিএমজি এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়ে যায় ২০১২ সালে।
২০১০ সালে যাত্রা শুরু করা রিজেন্ট এয়ার ২০২০ সালে কোভিডে মহামারীর সময় বন্ধ হয়ে যায়। বিপুল পরিমাণ দেনার দায়ে তখন তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দের কথাও সংসদে জানান তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
এখন যেসব বেসরকারি কোম্পানি চালু আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে পুরনো এয়ারলাইন্স নভোএয়ার ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করে। গত বছর একবার কার্যক্রম স্থগিত করে তারা আবার ফিরে এসেছে। তবে তাদের আন্তর্জাতিক রুটে কোনো ফ্লাইট নেই।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে বেসরকারি খাতে রীতিমত রেকর্ড গড়ে ২৫টি এয়ারক্রাফটের বহর চালাচ্ছে ইউএস-বাংলা। আরও ২১টি তাদের বহরে যোগ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
ইউএস-বাংলার মুখপাত্র কামরুল ইসলাম বলেন, নতুন এয়ারক্রাফট দিয়ে ইউএস-বাংলা পশ্চিম এশিয়ার কুয়েত, বাহরাইন, মদিনার মত গন্তব্যের পাশাপাশি হংকং, মালয়েশিয়ার পেনাং, জহরবারুর মত পর্যটক আকর্ষণকারী গন্তব্যে ফ্লাইট চালানোর পরিকল্পনা করছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্স বিমানের জন্য যখন একযোগে বোয়িং ও এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ সংগ্রহের কথা চলছে, একই সময়ে নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছে বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলাও। বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোকে টেক্কা দিয়ে দেশীয় বাজার ধরতে মরিয়া ইউএস-বাংলা প্রতিষ্ঠার ১২ বছরের মাথায় নতুন করে ১৪ হাজার কোটি টাকা (১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগে ২১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার খবর দিয়েছে। দেশীয় বেসরকারি এয়ারলাইন্সের ইতিহাসে এটা রেকর্ড। সবচেয়ে কম টাকায় হজ ফ্লাইট পরিচালনার জন্যও সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছে এয়ারলাইন্সটি। একটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পর বন্ধ হয়ে যাওয়া কাঠমান্ডু রুটও নতুন করে শুরু করার কথা বলা হয়েছে ইউএস-বাংলার পক্ষ থেকে। দেশের এভিয়েশন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে ঢাকা থেকে যাত্রী বহন করা ৪১টি এয়ারলাইন্সের মধ্যে মাত্র চারটি দেশি। দেশের ৮০ শতাংশের বেশি যাত্রী নিয়ে যাচ্ছে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো। এখানে যাত্রী চাহিদা এত বেশি যে বাজে সার্ভিস দিয়েও দিনের পর দিন টিকে যাচ্ছে একেকটি এয়ারলাইন্স। এ পরিস্থিতিতে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো বাজার ধরতে পারলে বিদেশি মুদ্রা বাঁচবে। দেশের চারটি এয়ারলাইন্সের মধ্যে ইউএস-বাংলার বহরে সবচেয়ে বেশি ২৫টি উড়োজাহাজ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্স বিমানের বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ। বিমান সম্প্রতি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ সংগ্রহের জন্য চুক্তি করেছে। পাশাপাশি এয়ারবাস থেকেও বিমানের জন্য উড়োজাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার। এছাড়া গত বৃহস্পতিবার ‘ড্রাই লিজে’ তিনটি সিঙ্গেল আইল বোয়িং সংগ্রহের জন্য দরপত্র প্রকাশ করেছে বিমান। ইউএস-বাংলাও গত সপ্তাহে ২১টি নতুন বোয়িং সংগ্রহের ঘোষণা দেয়। গত ১২ জুলাই বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনকে পাঠানো একটি চিঠিতে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার বা ১৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ২১টি নতুন বোয়িং ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ সংগ্রহের বিষয়টি জানায় এয়ারলাইন্সটি। চিঠিটি মূলত দেওয়া হয়েছিল বোয়িং ও এয়ারক্রাফট লিজিং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আগামী ২৯ জুলাই অনুষ্ঠেয় আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বিডার চেয়ারম্যানকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। নতুন উড়োজাহাজে বিনিয়োগের অর্থ পাঁচটি আন্তর্জাতিক লিজিং কোম্পানির মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে জানিয়ে ইউএস-বাংলার চিঠিতে বলা হয়, ২০২৭ সালে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে উড়োজাহাজগুলো বহরে যুক্ত হবে। অন্যদিকে বিমানের অর্ডার করা উড়োজাহাজগুলো আসতে আসতে ১০ বছর গড়িয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে বহর সম্প্রসারণে ইউএস-বাংলা এগিয়ে থাকবে। প্রচুর যাত্রী, টানছে বিদেশিরাই বর্তমানে দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ প্রবাসী। মূলত তাদের যাতায়াতের কারণেই ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দিন-রাত ব্যস্ততা। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে প্রধান এ বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করেছেন অন্তত ১ কোটি ২৭ লাখ ২০ হাজার যাত্রী। আগের বছর যাত্রী সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৫ লাখ। এই বিমানবন্দরে বর্তমানে যাত্রীসেবা দিচ্ছে ৪১টি দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্স। যার মধ্যে মাত্র চারটি দেশি। এবং এই চারটির মধ্যে কেবল বিমান ও ইউএস-বাংলা আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করেছে। মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা বোয়িং বিমান চলাচল ও যাত্রীসংখ্যার বিষয়ে পূর্বাভাস দেয় তাদের কমার্শিয়াল মার্কেট আউটলুক (সিএমও) ম্যাাগাজিন। ‘কমার্শিয়াল মার্কেট আউটলুক ২০২৫- ২০৪৪’ এ বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল এভিয়েশন (বিমান পরিবহন) বাজার। আগামী বিশ বছরে, গড় বার্ষিক এয়ার ট্রাফিক (বিমান চলাচল) প্রবৃদ্ধি জিডিপিকে প্রায় তিন শতাংশ পয়েন্টে ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। “এছাড়া সাম্প্রতিক সরকারি সংস্কার এবং উদার প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ নীতি দেশীয় বিমান সংস্থাগুলোর মূলধন পাওয়ার সুযোগ উন্নত করতে সহায়তা করছে এবং এ অঞ্চলে বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর বিনিয়োগের দ্বার উন্মুক্ত করছে।” বোয়িং কমার্শিয়ালের এশিয়া প্যাসিফিক ও ভারতের মার্কেটিং ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডেভ শাল্টে ২০২৩ সালে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে সিএমওর বরাত দিয়ে বলেছিলেন, “পশ্চিম এশিয়া ও ভারতে আঞ্চলিক ট্র্যাফিক বিবেচনায় আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের বিমান ভ্রমণ দ্বিগুণ হবে বলে আমরা মনে করি।” সিএমওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, যাত্রী ভ্রমণ এবং এয়ার কার্গোর জোরালো চাহিদা মেটাতে, দক্ষিণ এশিয়ার ক্যারিয়ারগুলোকে আগামী ২০ বছরে ২ হাজার ৩০০টির বেশি নতুন বাণিজ্যিক বিমান বহরে যুক্ত করতে হবে, যা এখনকার তিনগুণ। এর মধ্যে সিঙ্গেল-আইল বা ৭৩৭ এর মত ন্যারোবডি উড়োজাহাজ থাকবে ক্যারিয়ারগুলোর বহরের ৯০ শতাংশ। বোয়িং ৭৮৭ এর মত ওয়াইডবডি থাকবে ১০ শতাংশ। এই দৌড়ে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে বিমান ও ইউএস-বাংলা ছাড়া আর কেউ অংশ নিতে পারছে না। যাত্রী প্রবাহ বৃদ্ধির পূর্বাভাসের কারণেই বিদেশি লিজিং কোম্পানিগুলো ইউএস-বাংলার সঙ্গে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য। বেসরকারি এয়ারলাইন্সের আসা-যাওয়া গত তিন দশকে দেশে ১০টির মত বেসরকারি এয়ারলাইন্স ব্যবসা শুরু করেছে; এর মধ্যে ছয়টিই বন্ধ হয়ে গেছে প্রতিষ্ঠার এক দশকের মধ্যে। দেশের বিমানবন্দরের অতিরিক্ত চার্জ, নানা সুবিধায় থাকা ফ্ল্যাগ ক্যারিয়ার বিমানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কুলিয়ে না উঠতে পারাসহ নানা কারণে এ এয়ারলাইন্সগুলো বিপুল দেনা রেখে অকালেই ঝরে গেছে। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশে প্রথম বেসরকারি এয়ারলাইন্স হিসেবে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট শুরু করে ‘অ্যারো বেঙ্গল এয়ারলাইন্স’। চার বছরের মাথায় ব্যবসা গুটিয়ে নেয় তারা। ১৯৯৭ সালে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছিল ‘এয়ার পারাবত’। তারাও চার বছরের মধ্যে ২০০১ সালে বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৫ সালে চালু হয় ‘এয়ার বাংলাদেশ’ এবং ২০০৭ সালে চালু হয় ‘রয়েল বেঙ্গল এয়ারলাইন্স’। অব্যাহত লোকসানের কারণে এ দুটি এয়ারলাইন্সও বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৭ সালে আত্মপ্রকাশ করা ‘বেস্ট এয়ার’ ফ্লাইট অপারেশন শুরু করে ২০০৮ সালে। এক বছরের মধ্যেই এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৫ সালের জুন মাসে প্রতিষ্ঠিত ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি অপারেশন বন্ধ করে দেয়। ২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করা জিএমজি এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়ে যায় ২০১২ সালে। ২০১০ সালে যাত্রা শুরু করা রিজেন্ট এয়ার ২০২০ সালে কোভিডে মহামারীর সময় বন্ধ হয়ে যায়। বিপুল পরিমাণ দেনার দায়ে তখন তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দের কথাও সংসদে জানান তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এখন যেসব বেসরকারি কোম্পানি চালু আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে পুরনো এয়ারলাইন্স নভোএয়ার ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করে। গত বছর একবার কার্যক্রম স্থগিত করে তারা আবার ফিরে এসেছে। তবে তাদের আন্তর্জাতিক রুটে কোনো ফ্লাইট নেই। এমন পরিস্থিতির মধ্যে বেসরকারি খাতে রীতিমত রেকর্ড গড়ে ২৫টি এয়ারক্রাফটের বহর চালাচ্ছে ইউএস-বাংলা। আরও ২১টি তাদের বহরে যোগ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ইউএস-বাংলার মুখপাত্র কামরুল ইসলাম বলেন, নতুন এয়ারক্রাফট দিয়ে ইউএস-বাংলা পশ্চিম এশিয়ার কুয়েত, বাহরাইন, মদিনার মত গন্তব্যের পাশাপাশি হংকং, মালয়েশিয়ার পেনাং, জহরবারুর মত পর্যটক আকর্ষণকারী গন্তব্যে ফ্লাইট চালানোর পরিকল্পনা করছে।
দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও বেড়েছে। বর্তমানে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৬৬৪ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন বা ৩৬ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম মুনসি গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ তথ্যানুযায়ী, ১৩ জুলাই পর্যন্ত দেশের গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৬৬৪ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন ডলার। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার ৯৬৬ দশমিক ২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এর আগে গত ১৩ জুলাই পর্যন্ত দেশের গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩৬ হাজার ৫৪৬ দশমিক ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল ৩১ হাজার ৯০৭ দশমিক ০৩ মিলিয়ন ডলার। নিট রিজার্ভ গণনা করা হয় আইএমএফের বিপিএম-৬ পরিমাপ অনুসারে। মোট রিজার্ভ থেকে স্বল্পমেয়াদি দায় বিয়োগ করলে নিট বা প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ পাওয়া যায়। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের প্রথম ১৪ দিনে দেশে প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) এসেছে ১৫৪ কোটি ২০ লাখ (১ দশমিক ৫৪২ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার। যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ দশমিক ৮০ শতাংশ বেশি। এরমধ্যে শুধু ১৪ জুলাই একদিনেই প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১১ কোটি ৫০ লাখ (১১৫ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার।
দেশের বাজারে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো সোনার দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকালে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নতুন মূল্যতালিকা প্রকাশ করা হয়, যা আজ সকাল ১০টা থেকেই কার্যকর হয়েছে। স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার (পিওর গোল্ড) দাম কমে যাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাজুস এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন নির্ধারিত দর অনুযায়ী, ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার গহনা কিনতে গ্রাহককে এখন খরচ করতে হবে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮০৮ টাকা। আজ ভরিতে ২ হাজার ১৫৮ টাকা কমানোর মাধ্যমে এই নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে গতকাল সোমবারও সোনার দাম কমানো হয়েছিল। সব মিলিয়ে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার গহনায় মোট ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা দাম কমেছে। বাজুসের নতুন তালিকা অনুযায়ী, মানভেদে অন্যান্য সোনার দামও হ্রাস পেয়েছে। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৯ হাজার ৮৯৪ টাকা (কমেছে ২ হাজার ৯৯ টাকা)। ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ১ হাজার ৮০৮ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ২৬৭ টাকা। এছাড়া সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার নতুন দাম ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩১৬ টাকা, যা আগের চেয়ে ১ হাজার ৪৫৮ টাকা কম। গতকালের দামের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ১৩ জুলাই সকাল পর্যন্ত ২২ ক্যারেটের ভরি ছিল ২ লাখ ২১ হাজার ৯৬৬ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেট ২ লাখ ১১ হাজার ৯৯৩ টাকা, ১৮ ক্যারেট ১ লাখ ৮২ হাজার ৭৫ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির সোনা ১ লাখ ৪৮ হাজার ৭৭৪ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। আজ সকাল ৯টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত এই পুরাতন মূল্যতালিকা কার্যকর ছিল। সোনার পাশাপাশি রূপার দামও পুনর্নির্ধারণ করেছে জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন। ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রূপার গহনার দাম ৪ হাজার ৬০৭ টাকা, ২১ ক্যারেটের দাম ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের দাম ৩ হাজার ৭৯১ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রূপার দাম ২ হাজার ৮৫৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গহনা ব্যবসায়ীদের মতে, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারের এই দরপতন সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে।