দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশের (পিজিসিবি) অন্দরমহলে ভয়াবহ টেন্ডার কেলেঙ্কারির তথ্য ফাঁস হয়েছে। সরকারের শীর্ষ মহলের কৃচ্ছ্রসাধন ও আর্থিক সচ্ছতার নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পিজিসিবির এক শ্রেণির উচ্চপদস্থ অসাধু কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীর সিন্ডিকেট ‘কালো তালিকাভুক্ত’ প্রতিষ্ঠানকে নরসিংদীর মাধবপুর-মনোহরদী সাবস্টেশন স্থাপন প্রকল্পের আন্তর্জাতিক দরপত্রের কাজ পাইয়ে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
জানা গেছে, বিশ্ববাজারে সুনামের সঙ্গে কাজ করা হেভিওয়েট চীনা কোম্পানিগুলোকে কৌশলে প্রতিযোগিতার মাঠ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে কালো তালিকাভুক্ত ‘এনার্জিপ্যাক বাংলাদেশ’কে একটি অখ্যাত কোম্পানির সঙ্গে ‘যৌথ উদ্যোগ’ বা জয়েন্ট ভেঞ্চারের ছদ্মবেশে পুনর্বাসিত করার সব নীলনকশা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই ষড়যন্ত্র ও দরপত্র কারসাজির ফলে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক সহযোগী দেশ চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ফাটল ও ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পরিস্থিতির স্পর্শকাতরতা বিবেচনায় রাষ্ট্রের একটি শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থা ইতোমধ্যে এই অনিয়মের অন্তরালে থাকা ‘মাস্টারমাইন্ড’দের মুখোশ উন্মোচনে এবং গোপন আন্ডার টেবিল কমিশনের অর্থ লেনদেনের খোঁজে মাঠে নেমেছে।
নিরাপত্তা সংস্থা ও বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পিজিসিবির বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে কার্যাদেশ পেয়ে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভয়াবহ গাফিলতি, চরম আর্থিক নয়ছয়, রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা অগ্রিম লোপাট এবং বছরের পর বছর প্রকল্প ঝুলিয়ে রেখে জাতীয় গ্রিডকে অচল করে দেওয়ার অকাট্য প্রমাণ মেলে এনার্জিপ্যাকের বিরুদ্ধে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পিজিসিবি পরিচালনা পর্ষদের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ‘৬১২/২০২৫’ নম্বর বোর্ড সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ‘এনার্জিপ্যাক ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড’কে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ বা ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বোর্ডের গৃহীত ওই কঠোর ও আইনি আদেশ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ২০২৮ সালের আগে পিজিসিবির ছোট বা বড়—কোনো ধরনের সরকারি দরপত্রেই অংশ নেওয়ার ন্যূনতম আইনগত যোগ্যতা হারিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, পর্ষদের এই সর্বোচ্চ আইনি ও নীতিগত নিষেধাজ্ঞাকে পিজিসিবির অভ্যন্তরীণ এক শক্তিশালী স্বার্থান্বেষী প্রকৌশলী সিন্ডিকেট বিন্দুমাত্র পাত্তা দিচ্ছে না।
গত বছরের ২৫ নভেম্বর প্রকাশিত মাধবপুর-মনোহরদী সাবস্টেশন প্রকল্পের আন্তর্জাতিক দরপত্রে এই নিষিদ্ধ কোম্পানিকেই পেছনের দরজা দিয়ে কাজ পাইয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। সরাসরি নিজের নামে অংশ নিতে আইনি ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকায়, প্রতিষ্ঠানটি ‘রিভারি পাওয়ার অ্যান্ড অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামের তুলনামূলক নতুন এবং অভিজ্ঞতাহীন একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গোপনে হাত মিলিয়ে ‘জয়েন্ট ভেঞ্চার’ নামের এক অভিনব আইনি ও চতুর ছদ্মবেশ ধারণ করেছে। মূলত রিভারি কোম্পানিকে সামনে ‘ফ্রন্ট’ বা ঢাল হিসেবে দাঁড় করিয়ে পর্দার আড়াল থেকে পুরো প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং কারিগরি কলকাঠি নাড়ছে নিষিদ্ধ কোম্পানি এনার্জিপ্যাক। সরকারি ও বোর্ড নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এটি একটি সুনিপুণ ও চতুর অপকৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।
চীনা কোম্পানিগুলোকে ‘কাগুজে’ বানানোর অপচেষ্টা
সাবস্টেশন প্রকল্পের দরপত্রে পাঁচটি কনসোর্টিয়াম বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে ১ নম্বরে রয়েছে এনার্জিপ্যাক ও রিভারির বিতর্কিত যৌথ কনসোর্টিয়াম। আর বাকি চারটিই হচ্ছে বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও চীনের প্রথম সারির স্বনামধন্য রাষ্ট্রীয় কোম্পানি। এগুলো হলো—সিসিসিই-সিএমসি-ইটিইআরএন কনসোর্টিয়াম (CCCE-CMC-ETERN Consortium), সেপকো-১ ও জিক গ্রুপ (SEPCO-1 & ZIC), শ্যানডং টাইকাই পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং (Shandong Taikai Power Engineering) এবং টিবিইএ কোম্পানি লিমিটেড (TBEA Co. Ltd.)।
জানা গেছে, দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় যেকোনো মূল্যে কালো তালিকাভুক্ত এনার্জিপ্যাককে একতরফা টেকনিক্যাল ও ফাইন্যান্সিয়াল সুবিধা দিতে বাকি চারটি চীনা কোম্পানিকে ‘কাগুজে প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে প্রমাণের অপচেষ্টা চালাচ্ছে পিজিসিবির ভেতরের ওই অসাধু কর্মকর্তা চক্র। মূল্যায়ন কমিটির একটি অংশ উপর মহলে এবং মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের কান ভারী করতে সুকৌশলে অপপ্রচার ছড়াচ্ছে যে, চীনা কোম্পানিগুলোর দাখিল করা টেকনিক্যাল নথিপত্র নাকি অত্যন্ত দুর্বল, ত্রুটিপূর্ণ এবং তারা ‘টেকনিক্যালি নন-রেসপন্সিভ’ বা অযোগ্য। উদ্দেশ্য একটাই—মূল্যায়ন শেষে যেন মাঠের সব হেভিওয়েট আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীকে কৌশলে আউট করে দিয়ে শুধু এনার্জিপ্যাক ও রিভারির জোড়াতালির কনসোর্টিয়ামকেই একমাত্র যোগ্য হিসেবে টিকিয়ে রাখা যায়। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে এই চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের সক্ষমতা ও আর্থিক ভিত্তি উচ্চমানের। মূলত দেশীয় এই কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ পাইয়ে দিয়ে বিশাল অঙ্কের গোপন পার্সেন্টেজ ভাগাভাগি করতেই বিদ্যুৎ ভবনে এই অদৃশ্য জাল বিছানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এনার্জিপ্যাক বারবার ডুবিয়েছে জাতীয় গ্রিডকে
এনার্জিপ্যাকের কাজের অতীত ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি রাষ্ট্রীয় কোষাগার এবং জাতীয় গ্রিডের জন্য একটি বড় ধরনের ‘শ্বেতহস্তী’তে পরিণত হয়েছিল। ঢাকা ও ওয়েস্টার্ন জোন ট্রান্সমিশন গ্রিড প্রকল্পসহ দেশের অন্তত তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কাজ বছরের পর বছর ফেলে রেখেছিল তারা। বারবার সময় ও প্রকল্পের রহস্যময় ব্যয় বাড়িয়েও কাজ শেষ না করায় গত জানুয়ারিতে পিজিসিবি বাধ্য হয়ে এনার্জিপ্যাকের সঙ্গে ওই তিনটি মেগা চুক্তি বাতিল করে দেয়।
এখানেই শেষ নয়। ২০২১ ও ২০২২ সালে স্বাক্ষরিত তাদের অধীনে থাকা আরো চারটি গ্রিড উপকেন্দ্র ও ক্যাপাসিটর ব্যাংক স্থাপন প্রকল্পের কাজে স্থবিরতা এবং প্রকল্পের বরাদ্দ অর্থ নয়ছয়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে সেগুলোর চুক্তিও বাতিলের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। কাশিমপুর, বোর্ডবাজার ও রাজেন্দ্রপুর সাবস্টেশনের কাজ বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রেখে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ও জাতীয় গ্রিডের নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়ার অপরাধেই মূলত তাদের নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
প্রশ্ন উঠেছে, যে কোম্পানি রাষ্ট্রীয় প্রজেক্ট মাঝপথে ফেলে পালিয়ে যেতে পটু, সেই কোম্পানিকে কোনো অদৃশ্য ইশারায় আবারও কোটি কোটি টাকার নতুন সাবস্টেশন গিলে খাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে কি না।
বিদ্যুৎমন্ত্রীর দপ্তরে চীনা কোম্পানির চিঠি
পিজিসিবির ভেতরের এই ষড়যন্ত্র ও আন্তর্জাতিক টেন্ডার ম্যানিপুলেশনের বিরুদ্ধে এবার সরাসরি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর দপ্তরে চিঠি দিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান সিএমসি। গত ১১ মে মন্ত্রীর কাছে পাঠানো চিঠিতে চীনা কোম্পানিটি এই টেন্ডার প্রক্রিয়ার চরম অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের পুঙ্খানুপুঙ্খ খতিয়ান তুলে ধরে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ এবং অবিলম্বে এর প্রতিকার চেয়েছে।
চীনা কোম্পানির চিঠির মূল নির্যাস হলো—বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিষিদ্ধ কোম্পানি কোনোভাবেই জয়েন্ট ভেঞ্চারেও অংশ নিতে পারে না। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীদের নথিপত্র উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিকৃত করা হচ্ছে। এই টেন্ডার প্রক্রিয়া অবিলম্বে স্থগিত করে উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
চিঠিতে পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখ করা হয়, যে কোম্পানির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের একাধিক মেগা চুক্তি বাতিলের রেকর্ড রয়েছে এবং যাকে খোদ পিজিসিবির বোর্ড তিন বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছে, তাকে জয়েন্ট ভেঞ্চারের ছদ্মবেশে রাতারাতি ‘যোগ্য’ ঘোষণা করে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যা বোর্ডের নীতিগত সিদ্ধান্তের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, এই উদ্দেশ্যমূলক ও পাতানো মূল্যায়ন চূড়ান্ত করার আগেই যেন সাবস্টেশন প্রকল্পের সব প্রক্রিয়া অবিলম্বে স্থগিত করা হয় এবং নিরপেক্ষ স্বাধীন উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
চীনের এই চিঠির পর বিদ্যুৎ ভবনের টেন্ডার সিন্ডিকেটের মধ্যে ব্যাপক তোড়জোড় ও তোলপাড় শুরু হলেও পিজিসিবির শীর্ষ কর্মকর্তারা রহস্যময় নীরবতা পালন করছেন।
দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ঝুঁকি
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই আন্তর্জাতিক প্রকল্পে এমন জালিয়াতির ঘটনায় খোদ বিদ্যুৎ বিভাগের সৎ ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তারা চরম বিব্রত। ওই বিভাগের উচ্চপদস্থ একাধিক কর্মকর্তা আমার দেশ-এর কাছে নিজেদের বিব্রতকর পরিস্থিতির কথা প্রকাশ করেন।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বীকৃত চীনের প্রথম সারির কোম্পানিগুলোকে বাদ দিয়ে কালো তালিকাভুক্ত অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করা হলে তা বিশ্বদরবারে অত্যন্ত নেতিবাচক বার্তা দেবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মেগা অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে চীনের যে বিশাল বিনিয়োগ প্রবাহ রয়েছে, তা আগামীতে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাছাড়া এডিবি ও বিশ্বব্যাংকের মতো উন্নয়ন সহযোগীরা যদি মনে করে যে বাংলাদেশের দরপত্র প্রক্রিয়ায় কোনো স্বচ্ছতা নেই এবং এখানে বোর্ডের নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত কালো টাকার সিন্ডিকেটই শেষ কথা, তবে তারা ভবিষ্যতে এই খাতে নতুন করে অর্থায়ন করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।
এই আন্তর্জাতিক টেন্ডার কারসাজির বিষয়ে জানতে পিজিসিবির প্রধান প্রকৌশলী (পিঅ্যান্ডডি) সরদার মোহাম্মদ জাফরুল হাসানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমি সংশ্লিষ্ট নই।’
অন্যদিকে এনার্জিপ্যাকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রবিউল আলমের বক্তব্য নেওয়ার জন্য প্রশ্ন পাঠানো হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হুমায়ুন রশিদেরও একই প্রক্রিয়ায় বক্তব্য নেওয়ার জন্য পাঠানো হলে তিনি এসএমএসের মাধ্যমে লিখিত জবাবে এনার্জিপ্যাক কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘এনার্জিপ্যাক ১০ হাজার বাংলাদেশি নাগরিক নিয়োগ দিয়েছে এবং একজন চীনা কর্মচারীও নেয়নি। আর এটি ভারতের কাছে কোয়ালিফাইড ট্রান্সফরমার রপ্তানিকারক।’
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
প্রবাসীদের মেধা-দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে সরকার ‘ব্রেন ড্রেন’ থেকে ‘ব্রেন সার্কুলেশন’ করতে চায় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাণিজ্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কূটনৈতিক কর্মপরিকল্পনা’ শীর্ষক সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ওই সম্মেলনের আয়োজন করে। মাহদী আমিন বলেন, ‘আমি মূলত ব্লু-কালার চাকরি নিয়ে কথা বলেছি। কিন্তু ভবিষ্যতে হোয়াইট-কালার চাকরির ক্ষেত্রেও আমরা নিশ্চিত করতে চাই , বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারেন। আর যে ‘ব্রেইন ড্রেন’ আমরা ঐতিহাসিকভাবে দেখেছি, সেটিকে ‘ব্রেন সার্কুলেশনে’ রূপান্তর করতে চাই। যেখানে প্রবাসী ও বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা বাংলাদেশের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন।’ তিনি বলেন, ‘তারা বাংলাদেশে আসতে পারেন, বিনিয়োগ করতে পারেন। তাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাংলাদেশের ইকোসিস্টেমে স্থানান্তর করতে পারেন এবং অবশ্যই বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা ও বাংলাদেশে তাদের প্রতিনিধিরা বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। যদি আমরা তাদের সঠিক নীতি ও সঠিক উপকরণ দিয়ে সহায়তা করতে পারি, তাহলে তা বাংলাদেশের বৈশ্বিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা বলেন, বিদেশে কর্মসংস্থান ও অভিবাসন বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে, যিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা। আর যে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিত্ব করছি, সেই প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সুতরাং, অভিবাসন শুরু হয়েছিল যখন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় ছিলেন এবং এটি বিকশিত হয়েছিল যখন বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাই বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসন বিএনপির রাজনৈতিক দল হিসেবে ডিএনএতেই রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যদি আমরা নির্বাচনের পূর্ববর্তী প্রচারণার দিকে তাকাই, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বারবার সেই ভিশনের কথা তুলে ধরেছেন, যা আমরা আমাদের জনগণের বিদেশে গিয়ে কাজ করার বিষয়ে ধারণ করি। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন আমাদের অভিবাসন নীতি হতে হবে সুশৃঙ্খল, যাতে আমরা যথাযথ যাচাই-বাছাই ও এমন একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করি যা স্বচ্ছ, কার্যকর এবং যেখানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারি। আমাদের ভিশন হলো বাজারের বহুমুখীকরণ।’ মাহদী আমিন বলেন, ‘শুধু অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য নয়, বরং দক্ষতা উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া, যাতে আমরা নিশ্চিত করতে পারি যে আরও বেশি দক্ষ মানুষ বিদেশে কাজ করতে পারে। শুধু কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশে নয়, যদি আমরা সেই বাজারকেই বহুমুখী করতে পারি এবং একই সঙ্গে নারী অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে পারি, যা বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ৫ থেকে ৭ শতাংশ। আমরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীকে বিদেশে পাঠাতে পারি, কারণ আমাদের দেশের জনসংখ্যার ৫০ শতাংশেরও বেশি নারী। তাই আমরা বাজারের বহুমুখীকরণ চাই, তারা যে ধরনের কাজে যাবে তার বহুমুখীকরণ চাই এবং জনসংখ্যাগত বৈচিত্র্যও চাই।’ তিনি বলেন, ‘সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করার জন্য আমরা “প্রবাসী কার্ড” বা “এক্সপ্যাট্রিয়েট কার্ড” চালুর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। ভবিষ্যতে যখন আমরা এটি চালু করব, তখন বিদেশে যাওয়া প্রত্যেক বাংলাদেশিকে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এবং সেটি সরকারি অবকাঠামোর আওতায় থাকবে। পাশাপাশি আমরা ভিসা আবেদন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও সুশৃঙ্খল করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।’ উদাহরণস্বরূপ মাহদী আমিন বলেন, ভিসার জন্য আবেদনকারী প্রত্যেক বাংলাদেশির আর্থিক নথিপত্র কিউআর কোডের মাধ্যমে অনুসরণযোগ্য হবে, তাদের শিক্ষাগত সনদও অনুসরণযোগ্য হবে। প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে দুই মাস আগেএকটি নতুন কর্মসূচি চালু করেছি, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যদি তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বা স্বল্পমেয়াদি কোর্সের জন্য বিদেশে যেতে চায়, তাহলে তারা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পেতে পারে। আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করছি এবং তারা ইতোমধ্যেই চাহিদা নিরূপণের কাজ শুরু করেছে। বাংলাদেশে একটি বিশাল জনমিতিক সুবিধা রয়েছে, যেখানে বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী বিদেশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। তাই সরবরাহ প্রচুর, কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের বুঝতে হবে অন্যান্য দেশে কী ধরনের চাহিদা রয়েছে, তারা কী ধরনের দক্ষতা ও সক্ষমতা চায়। এরপর আমরা আমাদের মানুষদের সেই অনুযায়ী আমাদের টিভিইটি (টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেইনিং) ব্যবস্থা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে প্রশিক্ষণ দেব।’ মাহদী আমিন বলেন, ‘সুতরাং, দেশভিত্তিক বৈশ্বিক চাহিদাকে আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করব এবং সেই অনুযায়ী আমাদের জনগণকে প্রশিক্ষণ দেব। তবে আমরা সনদের গুরুত্বও বুঝি। তারা যে সনদগুলো অর্জন করছে, সেগুলোকে বৈশ্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য করার জন্য আমরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে যোগাযোগ করছি, যাতে আমাদের মানুষ বিদেশে গেলে তাদের সনদগুলো গ্রহণকারী দেশগুলোতে স্বীকৃত হয়।’ তিনি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে আমরা অভিবাসনকে একটি বৃহত্তর ইকোসিস্টেমের অংশ হিসেবে দেখি, যেখানে আমরা আলাদাভাবে কাজ করতে পারি না। আমাদের গ্রহণকারী দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করতে হবে, বৈশ্বিক সমন্বয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে কীভাবে আমরা তাদের সঠিক উপকরণ, প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় ভাষাগত দক্ষতা দিতে পারি এবং নিশ্চিত করতে পারি যে অভিবাসন একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে, যা শনাক্ত করা সম্ভব। কিছু ক্ষেত্রে আমরা বুঝি কিছু মানুষ নির্দিষ্ট কোনো দেশকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে। আমরা সেটিও বন্ধ করতে চাই। এবং সুশৃঙ্খল অভিবাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের জনগণের যে সম্ভাবনা রয়েছে, আমরা তা উন্মোচন করতে পারব।’ মাহদী আমিন বলেন, ‘আরও একটি বিষয় আমি যোগ করতে চাই। অনেক দেশে বাংলাদেশি শ্রমিক গ্রহণ করা একটি অগ্রাধিকার, কারণ তারা শৃঙ্খলা প্রদর্শন করেছে। অবশ্যই ব্যয়-সাশ্রয়িতা একটি বিষয়, কিন্তু কর্মদক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় মাত্রার সহায়তা ছাড়াই যদি তারা এভাবে সফল হতে পারে, তাহলে আমি বিশ্বাস করি যে যখন নীতিগত সমন্বয় হবে, তখন তারা আরও এগিয়ে যেতে পারবে এবং আরও বেশি সুযোগ পাবে। আর গ্রহণকারী বা আতিথ্যদানকারী দেশগুলোও আরও বেশি বাংলাদেশিকে গ্রহণ করবে।’ প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টাদের মধ্যে মাহদী আমিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন।
সংকটে থাকা পাঁচটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধের প্রক্রিয়ায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি আমানতকারীরা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বন্ধের প্রক্রিয়ায় নেওয়া পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হলো- এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। অন্যদিকে বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স ও প্রাইম ফাইন্যান্সকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দিয়ে তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের মূল অর্থ পরিশোধে সক্ষমতা দেখাতে না পারলে সেগুলোকেও রেজল্যুশন বা অবসায়ন প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৭ হাজার ব্যক্তি আমানতকারীর ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার আমানত রয়েছে। প্রথম ধাপে এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করা হবে। এরপর প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও দায়-দেনা মূল্যায়ন করে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার এফএএস ফাইন্যান্সের ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, আভিভা ফাইন্যান্সের ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, পিপলস লিজিংয়ের প্রায় ৯৫ শতাংশ ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশে পৌঁছেছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট ও আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে গত বছরের মে মাসে ২০টি এনবিএফআইকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে তাদের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা মূল্যায়ন করে নয়টি প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ধারাবাহিক পর্যালোচনার পর বর্তমানে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে অবসায়ন বা বন্ধের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিগত বছরগুলোতে অনিয়ম, দুর্বল সুশাসন ও ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে আলোচিত পি কে হালদারের বিরুদ্ধে পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স ও বিআইএফসি থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন
পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী ও টেকসই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে এক বিশাল প্রণোদনার প্রস্তাব করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে সৌরবিদ্যুৎ খাতে আগামী ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য শতাংশ কর হার নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে এই প্রস্তাব করেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিদ্যুৎ বিলে রেয়াত ও শুল্ক সুবিধা বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, কেবল উৎপাদন খাতেই নয়, ব্যবহারকারীদের উৎসাহিত করতে সৌরবিদ্যুৎ বিল পরিশোধের বিপরীতে ৫ শতাংশ কর রেয়াতের সুবিধা রাখা হয়েছে। এছাড়া সোলার প্যানেল সহ সৌরবিদ্যুৎ শিল্পসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ আমদানির ওপর প্রযোজ্য আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং আগাম কর শূন্য শতাংশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা যেন শিল্পখাতকে বিকশিত করতে পারে, সেজন্য নতুন প্রজ্ঞাপনের মেয়াদ ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যকর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশীয় শিল্প সুরক্ষা ও কয়লা আমদানি তবে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু কড়াকড়িও রাখা হয়েছে। মাউন্টিং স্ট্রাকচার, লিথিয়াম সেল, ব্যাটারি প্যাক ও ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের মতো পণ্যের বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধা ২০২৮ সালের ৩০ জুনের পর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে এই সময়ের মধ্যে দেশে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে ওঠে। পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ঝুঁকি মোকাবিলা এবং বিদ্যুতের মূল্য সহনীয় রাখতে বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃক কয়লা আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক-কর রেয়াত সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রভাব সরকার আশা করছে, প্রস্তাবিত এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের এক বড় দুয়ার উন্মোচিত হবে। এর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশে ২৫ লাখের বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তাছাড়া নতুন এই স্কিমের আওতায় টেকসই জ্বালানি উদ্যোক্তাদের চলতি মূলধন সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন বাড়াতে সরকার ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকির ব্যবস্থাও রাখছে। খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমিয়ে দেশীয় সৌরশক্তির এই প্রসার দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও টেকসই উন্নয়নে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।