দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলে ডিজিটাল ওজনস্কেলে কারচুপি, উচ্চ শুল্কের পণ্য কম শুল্কে খালাস এবং পণ্য আত্মসাতের একের পর এক ঘটনায় সরকারের রাজস্ব আদায় নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে অর্থবছর শেষে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা।
একই সময়ে বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ ২ হাজার ১৪৪ মেট্রিক টন পণ্য। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৭ হাজার ২৯ দশমিক ৩৮ কোটি টাকা এবং আমদানি হয়েছিল ১৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০৯ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এক বছরে রাজস্ব আদায় কমেছে প্রায় ৪৭০ কোটি টাকা এবং আমদানি কমেছে প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৫ মেট্রিক টন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, উচ্চমূল্যের ফল, শাড়ি ও থ্রি-পিসের আমদানিও গত বছরের তুলনায় কমেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও একাধিক সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র পণ্যের ওজন পরিবর্তন, মিথ্যা ঘোষণা এবং সাফটা (দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তি) সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ তৈরি করছে।
যদিও সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজস্ব ঘাটতির পেছনে আমদানি কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতি এবং শুল্কহারের পরিবর্তনের মতো কারণও রয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের একটি অংশের অভিযোগ, শুল্ক ফাঁকি ও ওজন কারচুপি রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের তথ্য অনুযায়ী, সাফটা সুবিধার আওতায় আমদানিকৃত পণ্যের শুল্কহার গত তিন অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে শুল্কহার ছিল ৭ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ১১ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। শুল্কহার বৃদ্ধির পর থেকেই কিছু অসাধু চক্র কম শুল্কে পণ্য খালাসের জন্য নতুন কৌশল অবলম্বন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সাফটা সুবিধায় ভারত থেকে বাংলাদেশে পণ্য আমদানি করা হলেও বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা ভারতে একই ধরনের সুবিধা বাস্তবে পান না।
একাধিক সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ীর অভিযোগ, বন্দর ও কাস্টমসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে নিম্ন শুল্কের পণ্যের ঘোষণার আড়ালে উচ্চ শুল্কের পণ্য খালাসের সুযোগ করে দেন। অতীতেও কাস্টমস ও বিজিবি এ ধরনের একাধিক চালান জব্দ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে ওজন পরিবর্তনের মাধ্যমে ঘোষণাপত্র ও প্রকৃত পণ্যের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে কম শুল্ক পরিশোধের সুযোগ নেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বন্দরের ৩১ নম্বর পচনশীল পণ্যের শেডকে কেন্দ্র করেও বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া পণ্য একই শেডের বিভিন্ন স্থানে ভাগ করে রাখা হয়। পরে পরিস্থিতি অনুকূলে এলে ধাপে ধাপে সেগুলো খালাসের চেষ্টা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তির নজির কম থাকায় একই ধরনের অনিয়ম বারবার ঘটছে।
গত ১২ মার্চ বেনাপোল স্থলবন্দরের ৩৭ নম্বর শেড থেকে ‘সাফা ইমপেক্স’-এর বেকিং পাউডারের ঘোষণার আড়ালে আনা প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের ভারতীয় উচ্চ শুল্কের শাড়ি ও থ্রি-পিস আত্মসাতের ঘটনা উদ্ঘাটিত হয়। এ ঘটনায় দীর্ঘ তদন্ত শেষে ১০ জুন কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ১৮ জনের বিরুদ্ধে বেনাপোল পোর্ট থানায় মামলা করে।
এর মাত্র পাঁচ দিন পর ২৬ নম্বর শেডে ‘টি এস ইন্টারন্যাশনাল’-এর ইরেজার ও পেনসিল ঘোষণার আড়ালে আনা প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের ৩ হাজার ৩৮৫ পিস উচ্চ শুল্কের পণ্য জব্দ করে কাস্টমস।
এর আগে ২৫ এপ্রিল রোকেয়া ট্রেডার্সের আমদানি করা আঙুরবোঝাই একটি ভারতীয় ট্রাকের ক্ষেত্রেও ওজনের গরমিল ধরা পড়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, ট্রাকটির প্রকৃত খালি ওজন ছিল ১৩ হাজার ৩১০ কেজি। তবে ওজন স্লিপে তা ১৩ হাজার ৮৮০ কেজি দেখানো হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ধরনের ওজন পরিবর্তনের মাধ্যমে শুল্ক নির্ধারণে প্রভাব ফেলার সুযোগ তৈরি হয়।
সে সময় দায়িত্বে থাকা ওয়্যারহাউস সুপারিনটেনডেন্ট আশিকুর রহমান রনি বলেন, তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন। যন্ত্রের কারিগরি ত্রুটির কারণেও এমন পার্থক্য হতে পারে।
জুন মাসে শুল্ক ফাঁকি ও পণ্য পাচারের অভিযোগে কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ চারটি পৃথক মামলা করেছে। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামাসহ মোট ৫৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী, আরিফুল ইসলাম চৌধুরী, কাস্টমস সিপাই মোহাম্মদ সাগরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ছাড়া ২৭ জুন কেমিক্যাল জোন থেকে ভারতীয় ট্রাকের পণ্য অবৈধভাবে বাংলাদেশি ট্রাকে স্থানান্তরের ঘটনায় বন্দর কর্তৃপক্ষ পৃথক একটি মামলা দায়ের করে।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, যে ঘটনায় মামলা হয়েছে সেখানে শেড ইনচার্জকে কেন বাদ দেওয়া হলো, সেটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। শেডের ভেতর থেকে কীভাবে পণ্য বের হলো, সেটির দায় ও জবাবদিহি তদন্তে খতিয়ে দেখা উচিত। প্রকৃত দায়ীদের বাদ দিয়ে তদন্ত করলে সত্য উদ্ঘাটিত হবে না। আমরা চাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনা হোক।
ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান হবি বলেন, বেনাপোল বন্দর দেশের অন্যতম প্রধান রাজস্ব আহরণকারী বন্দর। এখানে ওজন নির্ধারণে সামান্য অসঙ্গতিও সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্বে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পুরো ওজন ব্যবস্থাকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক তদারকির আওতায় আনতে হবে।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, অভিযোগের বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বন্দরের স্বচ্ছতা ও ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামীম হোসেন বলেন, ওজনযন্ত্রে কারচুপি বা অন্য কোনো অনিয়মের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কাস্টমসের চিঠি পাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তিনি কাস্টমস, বন্দর বা ব্যবসায়ী—যেই হোন না কেন, তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের রাজস্ব সুরক্ষায় কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।
কাস্টমস কমিশনার মো. ফাইজুর রহমান বলেন, সরকারের এক টাকার রাজস্বও যাতে ফাঁকি না যায়, সে বিষয়ে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছি। ওজনস্কেলে কারচুপি, মিথ্যা ঘোষণা কিংবা শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে কয়েকটি ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। তদন্তে কাস্টমস কর্মকর্তা, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, আমদানিকারক বা অন্য কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিললে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলাও করা হবে। বেনাপোল কাস্টমসে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। রাজস্ব সুরক্ষা ও স্বচ্ছ বাণিজ্য নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা নজরদারি, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং আরও জোরদার করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত ঘেষা জঙ্গল, পাট বা ভুট্টা খেতের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে মানুষ, যাদের কাছে কোনো নথি নেই, যাতে প্রমাণ হয় তারা ভারতীয় না কি বাংলাদেশি নাগরিক। রাতের আঁধারে কিংবা নির্জন ভোরে নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-শিশুদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টায় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ তাদের এনে জড়ো করছে সীমান্তের শূন্য রেখায়। তারপর তাদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশের দিকে। কিন্তু বিএসএফের ‘পুশ ইন’ প্রচেষ্টা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি রুখে দিলে শূন্য রেখায় খোলা আকাশের নিচে আটকা পড়া ছাড়া উপায় থাকছে না সেসব মানুষের। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের এমন একটি ঘটনা মানুষের মধ্যে আলোড়ন তুলেছিল। গেল ৫ জুন গভীর রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তের শূন্য রেখায় নারী ও শিশুসহ ২৮ জনকে ঠেলে দেওয়া হয়, বাংলাদেশে ঢুকতে বাধা পাওয়ায় তারা দুই দিন শূন্য রেখায় পড়ে ছিলেন। পরে বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নেয়। এভাবে মানুষকে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনা আইনের চোখ কি বৈধ? নথিহীন মানুষকে এভাবে শূন্য রেখায় ঠেলে দেওয়া মানবাধিকারের দৃষ্টিতে কতটা অমানবিক? আর আন্তর্জাতিক আইনই বা কী বলছে? ‘পুশ ইন’কে অমানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনসহ এ সংক্রান্ত সব ধরনের আইনে বৈধ বলছেন বাংলাদেশ ও ভারতের মানবাধিকার কর্মী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে এক দফা ‘পুশ ইন’ ঘটনা ঘটে। বিএনপির নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের আলোচনার মধ্যে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ছাড়াই আবার ভারত থেকে সীমান্ত দিয়ে মানুষজনকে গোপনে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে। কেন হঠাৎ ভারত এই পথে হাঁটছে? গেল মে মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় এসেই রাজ্যে বহুল আলোচিত নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দেয় বিজেপি। ২০১৯ সালের সংশোধিত এই আইনটি ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে কার্যকর করা হয়। ওই আইন ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে যাওয়া নথিহীন অমুসলিম অভিবাসীদের ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ খুলে দেয়। সংশোধিত আইন অনুযায়ী একজন আবেদনকারীকে বিদেশি হিসেবে ঘোষণা করার পাশাপাশি বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানের সরকারি কর্তৃপক্ষের একটি নথি দিতে হবে, যাতে তার শিকড় বা উৎস প্রমাণিত হয়। ওই আইনে স্থানীয় পুরোহিত বা স্থানীয় খ্যাতিসম্পন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে আবেদনকারীর ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে প্রত্যয়ন দেওয়ারও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। হিন্দু লিখেছে, যদিও নথিহীন অভিবাসীদের জন্য এ আইনটি আনা হয়েছিল, তবু বিধিমালায় আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু নথি জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন ঘোষণার আগে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিকত্ব আবেদনগুলো নিষ্পত্তির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে চারটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। গেল ৯ মে চেয়ারে বসেই নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “যারা সিএএ অন্তর্ভুক্ত নন, তাদের গ্রেপ্তার করে সরাসরি তুলে দেওয়া হবে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে।” এভাবেই ‘পুশ ইন’ সংকটের সূত্রপাত। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ শুভেন্দুর কথার সরাসরি প্রতিবাদ না করলেও অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানোর কথা বলে আসছে বারবার। মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে দেশের বিভিন্ন সীমান্তে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ঠেলে পাঠানো লোকজনকে ঠেকাতে ঠেকাতে ‘গলদঘর্ম’ দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি। সে সময় থেকে প্রায় প্রতিদিনই সীমান্তের কোথাও না কোথাও এরকম ‘পুশ ইন’ চলছে। বাংলাদেশের তরফে কিছু লোকজনকে গ্রহণও করা হচ্ছে, যদিও সেটিকে সঠিক প্রক্রিয়া বলছেন না কর্মকর্তারা। কত লোককে ‘পুশ ইন’? গেল ৮ জুন কলকাতায় এক দলীয় অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, মে মাসে রাজ্যের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ স্থাপন করা হয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৮০০ জন লোককে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। এসব লোককে বাংলাদেশি ও অনুপ্রবেশকারী হিসেবে তুলে ধরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তখন বলেন, “বর্তমানে ৮৩৬ জন ওই হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে রয়েছেন। তবে শুভেন্দুর এই দাবির সঙ্গে দ্বিমত করেছে বিজিবি। সোমবার বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বিজিবি মোট ৮৩টি ‘পুশ ইন’ প্রচেষ্টা আটকে দিয়েছে। যার মাধ্যমে মোট ৬৫২ থেকে ৭০৪ জন নাগরিককে বাংলাদেশে ‘অবৈধভাবে’ ঠেলে পাঠানো হচ্ছিল। বিজিবির উপমহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম মঙ্গলবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “‘পুশ ইন’ বা ‘পুশব্যাক’ যাই বলেন কোনোভাবেই ‘অ্যালাউ’ করা হচ্ছে না। বিজিবি সদস্যরা এ ব্যাপারে চারগুণের বেশি পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। সীমান্ত এলাকায় কাঠোর নজদারি করা হচ্ছে। তবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অনেকেই আসছেন, সে ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হচ্ছে না।” বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে গেল বছর এপ্রিলেও ভারত সীমান্ত দিয়ে বহু মানুষকে ঠেলে পাঠিয়েছিল, যাদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকও ছিল। সে বছর জুনে সোনা বানু নামের আসামের সেই নারী, যাকে বন্দুকের মুখে বিএসএফ ঠেলে পাঠিয়ে দিয়েছিল, তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন। জীবনের অধিকাংশ সময় সোনা বানু ও তার পরিবারের আসামে কাটালেও এই নারীকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করতে হয়েছিল যে, তিনি ভারতের নাগরিক, ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ নন। সোনা বানুর মতোই ‘পুশ ইনের’ শিকার হয়েছিলেন অন্তসত্ত্বা সোনালী বিবি ও তার পরিবারের ছয় সদস্য। কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ২০ অগাস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার আলীনগর মহল্লা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে সীমান্ত অনুপ্রবেশ আইনে মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। পরে সোনালীকে ভারতে ফেরত পাঠায় বিজিবি। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে, যাদের মধ্যে ১২০ জন ভারতীয় নাগরিকও ছিলেন। আন্তর্জাতিক আইনে ‘পুশ-ইন বা পুশব্যাকের’ কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। তবে এটি সাধারণত ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ বা অ-প্রত্যর্পণ নীতির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের ৩৩(১) ধারা অনুযায়ী ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতি প্রযোজ্য। এ নীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে পাঠানো যাবে না যেখানে তার প্রাণ বা স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে। এই নীতি অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত। ‘পুশ ইন’ প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিদের কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ফেরত পাঠানো হয়, যা আন্তর্জাতিক আইনের এই মৌলিক নীতির পরিপন্থি। ‘অমানবিক ও অবৈধ’ এক দেশ থেকে মানুষকে আরেক দেশে ঠেলে পাঠানো, শূন্য রেখায় আটকে থেকে মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যে পড়াকে অমানবিক ও আইনের লঙ্ঘন বলছেন দুই দেশের মানবাধিকার কর্মী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। গেল বছর ভারতে ‘অভিবাসন ও বিদেশি নাগরিক আইন, ২০২৫’ কার্যকর হয়। এরপরই দেশটির সরকার কিছু লোকজনকে ‘অবৈধ নাগরিক’ আখ্যা দিয়ে সেই দেশ থেকে বের করে দিতে উদ্যোগী হয়। এ নিয়ে বিস্তর সমালোচনা সেখানেও হচ্ছে। বাংলাদেশ সীমান্তে চলমান ‘পুশ ইন’ নিয়ে সমালোচনার মধ্যেই আইনটি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন। তাদের অভিযোগ, নতুন আইনটি যথাযথ যাচাই ও বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই ‘সন্দেহভাজন’ ব্যক্তিদের সীমান্তে পাঠানোর সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। তাদের ভাষ্য, এ ধরনের প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড এবং আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ বিষয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাজ করা পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম)’ এর সাধারণ সম্পাদক কিরীটী রায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “‘পুশ ইন’কে আমরা বৈধ প্রক্রিয়া বলতে পারি না। যদিও ভারত সরকার সম্প্রতি যে আইন করেছে সেই আইন অনুযায়ী বৈধ। “তবে আমরা সেটিকে (আইনটিকে) ভারতের হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করেছি। আমাদের বক্তব্য, এই আইনের প্রয়োগ ভারতের সংবিধান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ২০১১ সালে দিনহাটার চৌধুরীহাট সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া মই বেয়ে পার হয়ে পরিবারের সঙ্গে দেশের ফেরার সময় বিসিএফের গুলিতে কিশোরী ফেলানী নিহত হওয়ার আলোচিত ঘটনায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টে মামলা করা এই সংগঠনটির প্রধান বলেন, “এই আইনটি কার্যকর হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তিকে অবৈধ অভিবাসী বা বিদেশি হিসেবে সন্দেহ করা হলে তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করে আদালতে হাজির করত। আদালত পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া তদারক করতেন। “এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে তার জাতীয়তা নিশ্চিত করে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হতো। কিন্তু এখন আমরা দেখছি, সেই আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অনেককে সরাসরি সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিশেষ গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে আইনটির প্রয়োগ হচ্ছে তুলে ধরে কিরীটী রায় বলছেন, “আমাদের অভিযোগ, বিশেষ করে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা মুসলিমদের লক্ষ্য করেই এই নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। এ কারণেই আমরা বিষয়টিকে বৈষম্যমূলক বলছি এবং আদালতে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেছি।” আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে কোনো ব্যক্তিকে আটক বা বহিষ্কারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিচয় যাচাই, আটক হওয়ার কারণ জানানো এবং প্রয়োজনে বিচারিক কর্তৃপক্ষের সামনে হাজির করার মতো বিষয়গুলোকে ব্যক্তির মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জাতিসংঘের ‘ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর)’ এর ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে ব্যক্তির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে খামখেয়ালি বা বেআইনি আটক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আটকের কারণ জানানো এবং দ্রুত বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে সীমান্তে ফেরত পাঠানো বা ‘পুশ ইন’ করলে এই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশই ‘ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনস, ১৯৬৩ (ভিসিসিআর)’ এর পক্ষভুক্ত। এর ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক আটক হলে তাকে তার দেশের কনস্যুলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা হাইকমিশনকে অবহিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক থাকলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও কনস্যুলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এ ছাড়া ‘কনভেনশন অন দ্য রিডাকশন অব স্টেটলেসনেস ১৯৬১’ এ রাষ্ট্রহীনতা প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই কনভেনশনের মূল উদ্দেশ্য হল, রাষ্ট্রের পদক্ষেপের ফলে কোনো ব্যক্তি যেন রাষ্ট্রহীন হয়ে না পড়েন। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মী আসিফ মুনির বলছেন, “আধুনিক বিশ্বে প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রেরই নিজস্ব ভূখণ্ড এবং সীমান্ত রক্ষা করার সার্বভৌম অধিকার রয়েছে। তবে এই সীমানা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক রীতিনীতির সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। “সম্প্রতি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ‘পুশ ইন’ বা জোরপূর্বক ‘পুশব্যাক’ করার যে প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইনের পরিপন্থি এবং চরম অমানবিক। কোনো আইনেই এই ‘পুশ ইন’কে বৈধ বলা যায় না, তবে কিছু জটিলতা থাকার কথা বলেছেন আইনজীবী শাহদীন মালিক। বিডিনিউজকে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “কোনো আইনেই এভাবে পুশ ইন বৈধ নয়। “পুশ ইন বা অবৈধ অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ায় সাজা দেওয়ার বিধান থাকলেও, অপর দেশ যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজের নাগরিক হিসেবে স্বীকার না করে, তবে কেবল আইন দিয়ে তাকে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয় না। “এমন পরিস্থিতিতে আইনের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পায় এবং বিষয়টি তখন আর কেবল আইনি পরিধিতে না থেকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়। নির্বাচনের পর বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক মেরামতের যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, পুশ ইনের কারণেও তাও হুমকিতে পড়েছে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ঘের ঘটনা ঘটলেও দুই পাশের বাসিন্দাদের মধ্যে ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। ‘হোল্ডিং সেন্টার’ থেকে শূন্য রেখায় বাংলাদেশের সীমান্তে ‘পুশ ইন’ সমস্যা জোরালো হয় মূলত পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পর। রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী বাংলাদেশিদের নিয়ে অনেকটা রূঢ় বলেই পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষকদের। কাদেরকে ভারত ছাড়তে বাধ্য করা হবে এ বিষয়ে মুখমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, “যারা সিএএর অন্তর্ভুক্ত নন, তারা সম্পূর্ণ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। তাদের সরাসরি রাজ্য পুলিশ গ্রেপ্তার করবে এবং বিএসএফের হাতে তুলে দেবে। এরপর বিজিবির সঙ্গে কথা বলে তাদের দেশ থেকে বার করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। অর্থাৎ- ‘ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট’। সীমান্ত সংলগ্ন সমস্ত থানায় দেশের স্বার্থে, রাজ্যের স্বার্থে আইন কার্যকর করলাম। শুভেন্দু অধিকারীর এই ঘোষণা আসার পর রাজ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধ সন্দেহে লোকজনকে ধরে ধরে ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ নিয়ে আসা শুরু হয়। এই হোল্ডিং সেন্টারে জড়ো করাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। গেল ৬ জুন ভোররাতে ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্ত ফাঁড়ি (বিওপি) এলাকার শূন্য রেখায় আটকে থাকা ‘পুশ ইনের’ শিকার দুজনের বয়ানে উঠে এসেছে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ ও শূন্য রেখায় দুর্দশার চিত্র। তাদের একজনের বয়স আনুমানিক ৫৮ বছর ও অপরজনের বয়স ৩৫ বছর। তারা ওই সীমান্তে প্রায় ৪২ ঘণ্টা আটকে ছিলেন। ঘটনার দিনে একজন সাংবাদিকের ধারণ করা দুটি ভিডিও চিত্র সংগ্রহ করেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। ‘পুশ ইনের’ শিকার দুই ব্যক্তি নিজেদের নাম প্রকাশ করেননি। ৫৮ বছর বয়সি সেই ব্যক্তিকে বলেছেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার দমদম বিমানবন্দর (নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) এলাকায় থাকতেন তিনি। গত ২৬ মে স্বেচ্ছায় হাকিমপুর সীমান্তে গিয়ে বিএসএফের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তার ভাষ্য, প্রথমে বিএসএফ সদস্যরা তাকে সীমান্তে বসিয়ে রাখে। পরদিন তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর একটি ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ নিয়ে তাকে ছয়-সাত দিন রাখা হয়। সেখানে তার মতো আরও প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ জনকে দেখেছেন তিনি । তিনি বলেন, এরপর আমাদের ভাগ ভাগ করে বিভিন্ন সীমান্তে পাঠানো হয়। গত পরশু দিন (৩ জুন) ১১ জনকে পুলিশের গাড়িতে করে বহরগাঁও সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রেখে পুলিশ চলে যায়। খাবার বলতে শুধু গতকাল একবার খেয়েছি, এরপর আর কিছু পাইনি। এরপর বিএসএফ তাদের বাংলাদেশের দিকে হেঁটে যেতে আদেশ দেয় তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা ১১ জন ছিলাম। বিএসএফ গেইট খুলে দিয়ে বলল, ‘সোজা ভেতরে চলে যাও’। আমরা সামনে এগিয়ে একটি ভবনের কাছে দাঁড়ালে বাংলাদেশের বিজিবির সদস্যরা আমাদের থামায়। পরে আমরা জানাই, ভারত থেকে এসেছি। এরপর তারা আমাদের নিজেদের হেফাজতে নেয়। অপর ভিডিও চিত্রে ৩৫ বছরের যুবক বলেন, বিএসএফের কাছে আত্মসমর্পণের পর তাকে প্রথমে ভারতীয় পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখানে ছয় দিন রাখার পর আরেকটি ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ নেওয়া হয়, যেখানে আরও চার দিন ছিলেন। এরপর ৪ জুন রাতে তাকে সীমান্তে এনে বাংলাদেশ অভিমুখে ঠেলে দেওয়া হয়। ছয়-সাত বছর ধরে ভারতে থাকা খুলনার তেরখাদা উপজেলার বাসিন্দা দাবিদার ওই যুবক বলেন, “‘হোল্ডিং সেন্টারে’ তখন আরও ৩০০ থেকে ৪০০ জন ছিলেন। তাদের বেশির ভাগই বাংলাদেশি বলে পরিচয় দেওয়া মুসলিম ও বাংলাভাষী। ‘হোল্ডিং সেন্টারের’ পরিবেশ অত্যন্ত মানবেতর ছিল তুলে ধরে তিনি বলেন, “বেলা ১১টার দিকে একটু চিড়া দিত। দুপুরে কখনো খিচুড়ি, কখনো ডাল-ঘন্ট। এর বাইরে তেমন কোনো খাবার দেওয়া হতো না। ষষ্ঠী চন্দ্রের ফিরে আসা গেল ১০ জুন জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা সীমান্তে বিএসএফের ঠেলে পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মন। রোদে পোড়া চেহারা, ময়লা পোশাক পরা ৬৮ বছরের ষষ্ঠী চন্দ্র প্রায় ২৪ ঘণ্টা শূন্য রেখায় পড়ে ছিলেন। গণমাধ্যমে তার অসহায় চেহারা দুই দেশের মানুষকেই নাড়া দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাকে বাংলাদেশি হিসেবে গ্রহণ করে বিজিবি। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চান্দলাই এলাকা তার বাড়ি, এটি নিশ্চিত হয়ে ১১ জুন তাকে হেফাজতে নিয়ে স্থানীয় বকশিগঞ্জ থানার মাধ্যমে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে সীমান্তরক্ষীরা। সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে থাকা ষষ্ঠী চন্দ্রকে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে জামালপুর-৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার (সিও) হাসানুর রহমান রবিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মানবিক কারণে তাকে আমরা ফিরিয়ে নিয়েছিলাম। শূন্যরেখায় আটকে থাকা নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে হাসানুর রহমান বলেন, “এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়। এটার (ফিরিয়ে নেওয়ার) কূটনৈতিক প্রক্রিয়া আছে। একটা তালিকা (ভারতে যারা বাংলাদেশি সন্দেহে আটক আছে তাদের) দেবে বাংলাদেশ সরকারকে। তারপর যাছাই-বাছাই করে দুই ‘অথোরিটির’ মাধ্যমে আসবে। এভাবে চুরি করে ‘পুশ’ করে দেওয়া এটা কোন প্রক্রিয়া না। এই যে আমরা কাগজপত্র দেখে তাকে (ষষ্ঠী চন্দ্রকে) বাসায় দিয়ে আসলাম, এটাও প্রক্রিয়া না। কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় যাওয়াটা বৈধ। ষষ্ঠী চন্দ্র কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন বলে জানাচ্ছে তার পরিবার। তার ভাই ভবানী চন্দ্র বর্মণ বলছেন, ওর মাথায় কিছু সমস্যা আছে। সে আসলে ভারতে গিয়েছিল কি না, এটা নিয়েও সন্দেহ আছে। এত ঝামেলা করে তাকে বাড়িতে আনার পরে থেকে আবারও সে আগের মতো সারাদিন এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তিনি কীভাবে ওই সীমান্তে গিয়েছিল, এমন প্রশ্ন করা হলে ভবানী বলেন, “আমরা যখন তাকে জিজ্ঞেস করছি কীভাবে গেলা, তখন সে বলছে ‘হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছি’। বাংলাদেশী মানবাধিকারকর্মী নূর খান বলছেন, “বাংলাদেশি দাবি করে এভাবে কাউকে একতরফাভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ঠেলে দেওয়ার সুযোগ আন্তর্জাতিক আইন বা প্রচলিত রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় নেই। ভারতে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক বলে সন্দেহ হলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের উচিত তাদের পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে পাঠানো। বাংলাদেশ যাচাই-বাছাই শেষে দুই দেশের পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে তাদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে পারে। দুই প্রতিবেশি দেশের মধ্যে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সেটির সমাধান আলোচনা ও প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত। সীমান্তে মানুষ জড়ো করে জোর করে ঠেলে পাঠানোর ঘটনাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে তুলে ধরে এই মানবাধিকার কর্মী বলেন, “বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্কদের দিনের পর দিন শূন্যরেখার কাছে খোলা আকাশের নিচে আটকে রাখা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও উদ্বেগজনক। ‘পুশ ইনের’ শিকার অনেকের কাছেই ভারতীয় পরিচয়পত্র, যেমন আধার কার্ড, থাকার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। তাই পরিচয় যাচাই ও দুই দেশের মধ্যে প্রয়োজনীয় আলোচনা ছাড়া এভাবে জোর করে মানুষকে সীমান্ত পার করানোর উদ্যোগ দুই দেশের স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পরিপন্থি।
গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, তিস্তা ও করতোয়াসহ সব প্রধান নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সবকটি নদীর পানিই এখন বিপৎসীমার বেশ নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে পানি কমলেও জেলাটিতে নদীভাঙনের তীব্রতা কমেনি। শুক্রবার (৩ জুলাই) গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিকেল ৩টার তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ১ সেন্টিমিটার (সেমি) হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ১১৬ সেমি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ঘাঘট নদের পানি ১০ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ১৬৬ সেমি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা নদীর পানি ১০ সেমি হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ৬৯ সেমি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, করতোয়া নদীর পানি ১২ সেমি পেয়ে বিপৎসীমার ২০৮ সেমি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। চলমান বন্যার মৌসুমে এখন পর্যন্ত গাইবান্ধায় কোনো নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। এদিকে চলতি মৌসুমে গাইবান্ধার প্রধান নদ-নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধি ও কমার মধ্যে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙন এলাকাগুলোতে প্রতিনিয়তই নতুন করে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, আবাদি জমি। গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, চলমান পানি বৃদ্ধি শুরু থেকে জেলার চার উপজেলার অন্তত ২৫টি পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার অলিপুরা ইউনিয়ন পরিষদের একাধিকবারের সাবেক চেয়ারম্যান আলী আহম্মেদ দুলু এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত। তার কারণও আছে, তিনি একাধারে জেলা তাঁতীলীগের সাবেক আহ্বায়ক; তার উপর নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাও তিনি। আলী আহম্মেদ দুলু বৃহস্পতিবার রায়পুরা প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দিয়েছেন, “অরজিনালি আমি বিএনপিতে ছিলাম, আমি ছাত্রদল করেছিলাম। এখন আমি আমার ঘরে ফিরে আসছি। এই বিএনপিতে আজকে আবার নতুন করে প্রেস ক্লাবের মাধ্যমে, সাংবাদিক ভাইদের মাধ্যমে বিএনপিতে পুরোভাবে যোগদান করলাম। “আজকে থেকে আমি সকল এমপি-মন্ত্রী যারা আছেন, সবার সাথেই আমি ফুল নিয়ে তাদের সাথে দেখা করব। বিএনপি করেছিলাম, বিএনপিতে এসেছি এবং বাকি জীবন বিএনপি করেই আমি মরতে চাই।” তার এই বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। কেউ কেউ এর সমালোচনাও করছেন। স্থানীয় একজন বলছিলেন, “আলী আহমেদ দুলু একসময় জাতীয় পার্টির রাজনীতি করতেন। পরে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর নিজেকে আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। আওয়ামী লীগের পরিচয় ব্যবহার করে একাধিকবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন এবং দল থেকে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধাও নিয়েছেন।” তবে সংবাদ সম্মেলনে আলী আহমেদ দুলু দাবি করেছেন, তিনি আওয়ামী লীগ করেননি; সমর্থন করতেন। “দুইবার আমাকে রাজু সাহেব (আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু) জোর কইরা ফেল করাইছেন এবং আমাকে হয়রানি করেছেন। আমাকে নির্বাচন অফিসে আটকিয়ে রেখেছেন, অনেক হয়রানি হইছি। “আমি কিন্তু কোনো দল করি নাই। আমি আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলাম।” আলী আহমেদ দুলু বলেন, “আমি একসময় ছাত্রদল করতাম। ১৯৮১ সাল থেকে ছাত্রদল করতে গিয়ে আমি যখন চেয়ারম্যান হইলাম, তখন যে দল ক্ষমতায় যখন আসছে, সেই দলের পাশে আমি ব্যালেন্স করে চলে আসছি। কিন্তু অরিজিনালি আমি বিএনপি ছোটবেলা থেকে করছি। আমার এলাকাতে এই যে আমার ভাইয়েরা আছেন, এরা সবাই বিএনপির লোক।” তিনি দাবি করেন, “ফেব্রুয়ারির ২ তারিখ খোকন ভাইয়ের (জেলা বিএনপির সভাপতি ও সংসদ সদস্য খায়রুল কবীর খোকন) কথামত, খোকন ভাইয়ের মাধ্যমে আমি বিএনপিতে যোগদান করেছি। আগের সবগুলি ছাইড়া দিয়া, যে যেইডাই বলুক না ক্যান!” এ ব্যাপারে নরসিংদী জেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব নরসিংদী-১ আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন বলেন, জেলা আওয়ামী লীগের কোনো উপদেষ্টা বিএনপিতে যোগদান করেছেন বা করবেন বলে তার জানা নেই। এ নিয়ে কেউ তার সঙ্গে কোনো আলোচনাও করেননি।