বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত ঘেষা জঙ্গল, পাট বা ভুট্টা খেতের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে মানুষ, যাদের কাছে কোনো নথি নেই, যাতে প্রমাণ হয় তারা ভারতীয় না কি বাংলাদেশি নাগরিক।
রাতের আঁধারে কিংবা নির্জন ভোরে নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-শিশুদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টায় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ তাদের এনে জড়ো করছে সীমান্তের শূন্য রেখায়। তারপর তাদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশের দিকে।
কিন্তু বিএসএফের ‘পুশ ইন’ প্রচেষ্টা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি রুখে দিলে শূন্য রেখায় খোলা আকাশের নিচে আটকা পড়া ছাড়া উপায় থাকছে না সেসব মানুষের।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের এমন একটি ঘটনা মানুষের মধ্যে আলোড়ন তুলেছিল।
গেল ৫ জুন গভীর রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তের শূন্য রেখায় নারী ও শিশুসহ ২৮ জনকে ঠেলে দেওয়া হয়, বাংলাদেশে ঢুকতে বাধা পাওয়ায় তারা দুই দিন শূন্য রেখায় পড়ে ছিলেন। পরে বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নেয়।
এভাবে মানুষকে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনা আইনের চোখ কি বৈধ? নথিহীন মানুষকে এভাবে শূন্য রেখায় ঠেলে দেওয়া মানবাধিকারের দৃষ্টিতে কতটা অমানবিক? আর আন্তর্জাতিক আইনই বা কী বলছে?
‘পুশ ইন’কে অমানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনসহ এ সংক্রান্ত সব ধরনের আইনে বৈধ বলছেন বাংলাদেশ ও ভারতের মানবাধিকার কর্মী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে এক দফা ‘পুশ ইন’ ঘটনা ঘটে।
বিএনপির নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের আলোচনার মধ্যে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ছাড়াই আবার ভারত থেকে সীমান্ত দিয়ে মানুষজনকে গোপনে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে। কেন হঠাৎ ভারত এই পথে হাঁটছে?
গেল মে মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় এসেই রাজ্যে বহুল আলোচিত নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দেয় বিজেপি। ২০১৯ সালের সংশোধিত এই আইনটি ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে কার্যকর করা হয়।
ওই আইন ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে যাওয়া নথিহীন অমুসলিম অভিবাসীদের ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ খুলে দেয়।
সংশোধিত আইন অনুযায়ী একজন আবেদনকারীকে বিদেশি হিসেবে ঘোষণা করার পাশাপাশি বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানের সরকারি কর্তৃপক্ষের একটি নথি দিতে হবে, যাতে তার শিকড় বা উৎস প্রমাণিত হয়।
ওই আইনে স্থানীয় পুরোহিত বা স্থানীয় খ্যাতিসম্পন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে আবেদনকারীর ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে প্রত্যয়ন দেওয়ারও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
হিন্দু লিখেছে, যদিও নথিহীন অভিবাসীদের জন্য এ আইনটি আনা হয়েছিল, তবু বিধিমালায় আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু নথি জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন ঘোষণার আগে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিকত্ব আবেদনগুলো নিষ্পত্তির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে চারটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
গেল ৯ মে চেয়ারে বসেই নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “যারা সিএএ অন্তর্ভুক্ত নন, তাদের গ্রেপ্তার করে সরাসরি তুলে দেওয়া হবে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে।”
এভাবেই ‘পুশ ইন’ সংকটের সূত্রপাত। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ শুভেন্দুর কথার সরাসরি প্রতিবাদ না করলেও অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানোর কথা বলে আসছে বারবার।
মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে দেশের বিভিন্ন সীমান্তে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ঠেলে পাঠানো লোকজনকে ঠেকাতে ঠেকাতে ‘গলদঘর্ম’ দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি। সে সময় থেকে প্রায় প্রতিদিনই সীমান্তের কোথাও না কোথাও এরকম ‘পুশ ইন’ চলছে।
বাংলাদেশের তরফে কিছু লোকজনকে গ্রহণও করা হচ্ছে, যদিও সেটিকে সঠিক প্রক্রিয়া বলছেন না কর্মকর্তারা।
কত লোককে ‘পুশ ইন’?
গেল ৮ জুন কলকাতায় এক দলীয় অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, মে মাসে রাজ্যের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ স্থাপন করা হয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৮০০ জন লোককে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।
এসব লোককে বাংলাদেশি ও অনুপ্রবেশকারী হিসেবে তুলে ধরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তখন বলেন, “বর্তমানে ৮৩৬ জন ওই হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে রয়েছেন।
তবে শুভেন্দুর এই দাবির সঙ্গে দ্বিমত করেছে বিজিবি। সোমবার বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বিজিবি মোট ৮৩টি ‘পুশ ইন’ প্রচেষ্টা আটকে দিয়েছে। যার মাধ্যমে মোট ৬৫২ থেকে ৭০৪ জন নাগরিককে বাংলাদেশে ‘অবৈধভাবে’ ঠেলে পাঠানো হচ্ছিল।
বিজিবির উপমহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম মঙ্গলবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “‘পুশ ইন’ বা ‘পুশব্যাক’ যাই বলেন কোনোভাবেই ‘অ্যালাউ’ করা হচ্ছে না। বিজিবি সদস্যরা এ ব্যাপারে চারগুণের বেশি পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। সীমান্ত এলাকায় কাঠোর নজদারি করা হচ্ছে। তবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অনেকেই আসছেন, সে ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হচ্ছে না।”
বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে গেল বছর এপ্রিলেও ভারত সীমান্ত দিয়ে বহু মানুষকে ঠেলে পাঠিয়েছিল, যাদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকও ছিল।
সে বছর জুনে সোনা বানু নামের আসামের সেই নারী, যাকে বন্দুকের মুখে বিএসএফ ঠেলে পাঠিয়ে দিয়েছিল, তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন।
জীবনের অধিকাংশ সময় সোনা বানু ও তার পরিবারের আসামে কাটালেও এই নারীকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করতে হয়েছিল যে, তিনি ভারতের নাগরিক, ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ নন।
সোনা বানুর মতোই ‘পুশ ইনের’ শিকার হয়েছিলেন অন্তসত্ত্বা সোনালী বিবি ও তার পরিবারের ছয় সদস্য। কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ২০ অগাস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার আলীনগর মহল্লা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পরে সীমান্ত অনুপ্রবেশ আইনে মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। পরে সোনালীকে ভারতে ফেরত পাঠায় বিজিবি।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে, যাদের মধ্যে ১২০ জন ভারতীয় নাগরিকও ছিলেন।
আন্তর্জাতিক আইনে ‘পুশ-ইন বা পুশব্যাকের’ কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। তবে এটি সাধারণত ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ বা অ-প্রত্যর্পণ নীতির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের ৩৩(১) ধারা অনুযায়ী ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতি প্রযোজ্য। এ নীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে পাঠানো যাবে না যেখানে তার প্রাণ বা স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে। এই নীতি অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত।
‘পুশ ইন’ প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিদের কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ফেরত পাঠানো হয়, যা আন্তর্জাতিক আইনের এই মৌলিক নীতির পরিপন্থি।
‘অমানবিক ও অবৈধ’
এক দেশ থেকে মানুষকে আরেক দেশে ঠেলে পাঠানো, শূন্য রেখায় আটকে থেকে মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যে পড়াকে অমানবিক ও আইনের লঙ্ঘন বলছেন দুই দেশের মানবাধিকার কর্মী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।
গেল বছর ভারতে ‘অভিবাসন ও বিদেশি নাগরিক আইন, ২০২৫’ কার্যকর হয়। এরপরই দেশটির সরকার কিছু লোকজনকে ‘অবৈধ নাগরিক’ আখ্যা দিয়ে সেই দেশ থেকে বের করে দিতে উদ্যোগী হয়। এ নিয়ে বিস্তর সমালোচনা সেখানেও হচ্ছে।
বাংলাদেশ সীমান্তে চলমান ‘পুশ ইন’ নিয়ে সমালোচনার মধ্যেই আইনটি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন।
তাদের অভিযোগ, নতুন আইনটি যথাযথ যাচাই ও বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই ‘সন্দেহভাজন’ ব্যক্তিদের সীমান্তে পাঠানোর সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
তাদের ভাষ্য, এ ধরনের প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড এবং আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ বিষয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাজ করা পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম)’ এর সাধারণ সম্পাদক কিরীটী রায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “‘পুশ ইন’কে আমরা বৈধ প্রক্রিয়া বলতে পারি না। যদিও ভারত সরকার সম্প্রতি যে আইন করেছে সেই আইন অনুযায়ী বৈধ।
“তবে আমরা সেটিকে (আইনটিকে) ভারতের হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করেছি। আমাদের বক্তব্য, এই আইনের প্রয়োগ ভারতের সংবিধান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
২০১১ সালে দিনহাটার চৌধুরীহাট সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া মই বেয়ে পার হয়ে পরিবারের সঙ্গে দেশের ফেরার সময় বিসিএফের গুলিতে কিশোরী ফেলানী নিহত হওয়ার আলোচিত ঘটনায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টে মামলা করা এই সংগঠনটির প্রধান বলেন, “এই আইনটি কার্যকর হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তিকে অবৈধ অভিবাসী বা বিদেশি হিসেবে সন্দেহ করা হলে তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করে আদালতে হাজির করত। আদালত পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া তদারক করতেন।
“এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে তার জাতীয়তা নিশ্চিত করে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হতো। কিন্তু এখন আমরা দেখছি, সেই আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অনেককে সরাসরি সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
বিশেষ গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে আইনটির প্রয়োগ হচ্ছে তুলে ধরে কিরীটী রায় বলছেন, “আমাদের অভিযোগ, বিশেষ করে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা মুসলিমদের লক্ষ্য করেই এই নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। এ কারণেই আমরা বিষয়টিকে বৈষম্যমূলক বলছি এবং আদালতে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেছি।”
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে কোনো ব্যক্তিকে আটক বা বহিষ্কারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিচয় যাচাই, আটক হওয়ার কারণ জানানো এবং প্রয়োজনে বিচারিক কর্তৃপক্ষের সামনে হাজির করার মতো বিষয়গুলোকে ব্যক্তির মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
জাতিসংঘের ‘ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর)’ এর ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে ব্যক্তির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে খামখেয়ালি বা বেআইনি আটক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আটকের কারণ জানানো এবং দ্রুত বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে সীমান্তে ফেরত পাঠানো বা ‘পুশ ইন’ করলে এই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশই ‘ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনস, ১৯৬৩ (ভিসিসিআর)’ এর পক্ষভুক্ত। এর ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক আটক হলে তাকে তার দেশের কনস্যুলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা হাইকমিশনকে অবহিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক থাকলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও কনস্যুলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
এ ছাড়া ‘কনভেনশন অন দ্য রিডাকশন অব স্টেটলেসনেস ১৯৬১’ এ রাষ্ট্রহীনতা প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই কনভেনশনের মূল উদ্দেশ্য হল, রাষ্ট্রের পদক্ষেপের ফলে কোনো ব্যক্তি যেন রাষ্ট্রহীন হয়ে না পড়েন।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মী আসিফ মুনির বলছেন, “আধুনিক বিশ্বে প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রেরই নিজস্ব ভূখণ্ড এবং সীমান্ত রক্ষা করার সার্বভৌম অধিকার রয়েছে। তবে এই সীমানা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক রীতিনীতির সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
“সম্প্রতি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ‘পুশ ইন’ বা জোরপূর্বক ‘পুশব্যাক’ করার যে প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইনের পরিপন্থি এবং চরম অমানবিক।
কোনো আইনেই এই ‘পুশ ইন’কে বৈধ বলা যায় না, তবে কিছু জটিলতা থাকার কথা বলেছেন আইনজীবী শাহদীন মালিক।
বিডিনিউজকে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “কোনো আইনেই এভাবে পুশ ইন বৈধ নয়।
“পুশ ইন বা অবৈধ অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ায় সাজা দেওয়ার বিধান থাকলেও, অপর দেশ যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজের নাগরিক হিসেবে স্বীকার না করে, তবে কেবল আইন দিয়ে তাকে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয় না।
“এমন পরিস্থিতিতে আইনের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পায় এবং বিষয়টি তখন আর কেবল আইনি পরিধিতে না থেকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়।
নির্বাচনের পর বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক মেরামতের যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, পুশ ইনের কারণেও তাও হুমকিতে পড়েছে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ঘের ঘটনা ঘটলেও দুই পাশের বাসিন্দাদের মধ্যে ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
‘হোল্ডিং সেন্টার’ থেকে শূন্য রেখায়
বাংলাদেশের সীমান্তে ‘পুশ ইন’ সমস্যা জোরালো হয় মূলত পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পর। রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী বাংলাদেশিদের নিয়ে অনেকটা রূঢ় বলেই পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষকদের।
কাদেরকে ভারত ছাড়তে বাধ্য করা হবে এ বিষয়ে মুখমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, “যারা সিএএর অন্তর্ভুক্ত নন, তারা সম্পূর্ণ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। তাদের সরাসরি রাজ্য পুলিশ গ্রেপ্তার করবে এবং বিএসএফের হাতে তুলে দেবে। এরপর বিজিবির সঙ্গে কথা বলে তাদের দেশ থেকে বার করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
অর্থাৎ- ‘ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট’। সীমান্ত সংলগ্ন সমস্ত থানায় দেশের স্বার্থে, রাজ্যের স্বার্থে আইন কার্যকর করলাম।
শুভেন্দু অধিকারীর এই ঘোষণা আসার পর রাজ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধ সন্দেহে লোকজনকে ধরে ধরে ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ নিয়ে আসা শুরু হয়। এই হোল্ডিং সেন্টারে জড়ো করাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গেল ৬ জুন ভোররাতে ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্ত ফাঁড়ি (বিওপি) এলাকার শূন্য রেখায় আটকে থাকা ‘পুশ ইনের’ শিকার দুজনের বয়ানে উঠে এসেছে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ ও শূন্য রেখায় দুর্দশার চিত্র।
তাদের একজনের বয়স আনুমানিক ৫৮ বছর ও অপরজনের বয়স ৩৫ বছর। তারা ওই সীমান্তে প্রায় ৪২ ঘণ্টা আটকে ছিলেন। ঘটনার দিনে একজন সাংবাদিকের ধারণ করা দুটি ভিডিও চিত্র সংগ্রহ করেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
‘পুশ ইনের’ শিকার দুই ব্যক্তি নিজেদের নাম প্রকাশ করেননি।
৫৮ বছর বয়সি সেই ব্যক্তিকে বলেছেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার দমদম বিমানবন্দর (নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) এলাকায় থাকতেন তিনি। গত ২৬ মে স্বেচ্ছায় হাকিমপুর সীমান্তে গিয়ে বিএসএফের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
তার ভাষ্য, প্রথমে বিএসএফ সদস্যরা তাকে সীমান্তে বসিয়ে রাখে। পরদিন তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর একটি ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ নিয়ে তাকে ছয়-সাত দিন রাখা হয়। সেখানে তার মতো আরও প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ জনকে দেখেছেন তিনি ।
তিনি বলেন, এরপর আমাদের ভাগ ভাগ করে বিভিন্ন সীমান্তে পাঠানো হয়। গত পরশু দিন (৩ জুন) ১১ জনকে পুলিশের গাড়িতে করে বহরগাঁও সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রেখে পুলিশ চলে যায়। খাবার বলতে শুধু গতকাল একবার খেয়েছি, এরপর আর কিছু পাইনি।
এরপর বিএসএফ তাদের বাংলাদেশের দিকে হেঁটে যেতে আদেশ দেয় তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা ১১ জন ছিলাম। বিএসএফ গেইট খুলে দিয়ে বলল, ‘সোজা ভেতরে চলে যাও’। আমরা সামনে এগিয়ে একটি ভবনের কাছে দাঁড়ালে বাংলাদেশের বিজিবির সদস্যরা আমাদের থামায়। পরে আমরা জানাই, ভারত থেকে এসেছি। এরপর তারা আমাদের নিজেদের হেফাজতে নেয়।
অপর ভিডিও চিত্রে ৩৫ বছরের যুবক বলেন, বিএসএফের কাছে আত্মসমর্পণের পর তাকে প্রথমে ভারতীয় পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখানে ছয় দিন রাখার পর আরেকটি ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ নেওয়া হয়, যেখানে আরও চার দিন ছিলেন। এরপর ৪ জুন রাতে তাকে সীমান্তে এনে বাংলাদেশ অভিমুখে ঠেলে দেওয়া হয়।
ছয়-সাত বছর ধরে ভারতে থাকা খুলনার তেরখাদা উপজেলার বাসিন্দা দাবিদার ওই যুবক বলেন, “‘হোল্ডিং সেন্টারে’ তখন আরও ৩০০ থেকে ৪০০ জন ছিলেন। তাদের বেশির ভাগই বাংলাদেশি বলে পরিচয় দেওয়া মুসলিম ও বাংলাভাষী।
‘হোল্ডিং সেন্টারের’ পরিবেশ অত্যন্ত মানবেতর ছিল তুলে ধরে তিনি বলেন, “বেলা ১১টার দিকে একটু চিড়া দিত। দুপুরে কখনো খিচুড়ি, কখনো ডাল-ঘন্ট। এর বাইরে তেমন কোনো খাবার দেওয়া হতো না।
ষষ্ঠী চন্দ্রের ফিরে আসা
গেল ১০ জুন জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা সীমান্তে বিএসএফের ঠেলে পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মন। রোদে পোড়া চেহারা, ময়লা পোশাক পরা ৬৮ বছরের ষষ্ঠী চন্দ্র প্রায় ২৪ ঘণ্টা শূন্য রেখায় পড়ে ছিলেন। গণমাধ্যমে তার অসহায় চেহারা দুই দেশের মানুষকেই নাড়া দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাকে বাংলাদেশি হিসেবে গ্রহণ করে বিজিবি।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চান্দলাই এলাকা তার বাড়ি, এটি নিশ্চিত হয়ে ১১ জুন তাকে হেফাজতে নিয়ে স্থানীয় বকশিগঞ্জ থানার মাধ্যমে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে সীমান্তরক্ষীরা।
সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে থাকা ষষ্ঠী চন্দ্রকে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে জামালপুর-৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার (সিও) হাসানুর রহমান রবিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মানবিক কারণে তাকে আমরা ফিরিয়ে নিয়েছিলাম।
শূন্যরেখায় আটকে থাকা নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে হাসানুর রহমান বলেন, “এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়। এটার (ফিরিয়ে নেওয়ার) কূটনৈতিক প্রক্রিয়া আছে। একটা তালিকা (ভারতে যারা বাংলাদেশি সন্দেহে আটক আছে তাদের) দেবে বাংলাদেশ সরকারকে। তারপর যাছাই-বাছাই করে দুই ‘অথোরিটির’ মাধ্যমে আসবে। এভাবে চুরি করে ‘পুশ’ করে দেওয়া এটা কোন প্রক্রিয়া না। এই যে আমরা কাগজপত্র দেখে তাকে (ষষ্ঠী চন্দ্রকে) বাসায় দিয়ে আসলাম, এটাও প্রক্রিয়া না। কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় যাওয়াটা বৈধ।
ষষ্ঠী চন্দ্র কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন বলে জানাচ্ছে তার পরিবার। তার ভাই ভবানী চন্দ্র বর্মণ বলছেন, ওর মাথায় কিছু সমস্যা আছে। সে আসলে ভারতে গিয়েছিল কি না, এটা নিয়েও সন্দেহ আছে। এত ঝামেলা করে তাকে বাড়িতে আনার পরে থেকে আবারও সে আগের মতো সারাদিন এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
তিনি কীভাবে ওই সীমান্তে গিয়েছিল, এমন প্রশ্ন করা হলে ভবানী বলেন, “আমরা যখন তাকে জিজ্ঞেস করছি কীভাবে গেলা, তখন সে বলছে ‘হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছি’।
বাংলাদেশী মানবাধিকারকর্মী নূর খান বলছেন, “বাংলাদেশি দাবি করে এভাবে কাউকে একতরফাভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ঠেলে দেওয়ার সুযোগ আন্তর্জাতিক আইন বা প্রচলিত রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় নেই। ভারতে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক বলে সন্দেহ হলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের উচিত তাদের পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে পাঠানো। বাংলাদেশ যাচাই-বাছাই শেষে দুই দেশের পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে তাদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে পারে। দুই প্রতিবেশি দেশের মধ্যে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সেটির সমাধান আলোচনা ও প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত।
সীমান্তে মানুষ জড়ো করে জোর করে ঠেলে পাঠানোর ঘটনাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে তুলে ধরে এই মানবাধিকার কর্মী বলেন, “বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্কদের দিনের পর দিন শূন্যরেখার কাছে খোলা আকাশের নিচে আটকে রাখা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও উদ্বেগজনক। ‘পুশ ইনের’ শিকার অনেকের কাছেই ভারতীয় পরিচয়পত্র, যেমন আধার কার্ড, থাকার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। তাই পরিচয় যাচাই ও দুই দেশের মধ্যে প্রয়োজনীয় আলোচনা ছাড়া এভাবে জোর করে মানুষকে সীমান্ত পার করানোর উদ্যোগ দুই দেশের স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পরিপন্থি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
বগুড়ায় অনুমোদনহীন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নিম্নমানের সার্জিক্যাল পণ্য ও স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরির অভিযোগে এশা এন্টারপ্রাইজ নামের একটি কারখানাকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে কারখানার অবৈধ উৎপাদন স্থান সিলগালা করেছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। রবিবার (১৬ আগস্ট) দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বগুড়া মহানগরীর ফুলদীঘি উত্তরপাড়া এলাকায় র্যাব-১২ বগুড়া ও জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ফুলদীঘি উত্তরপাড়ার একটি বাসাবাড়িতে অনুমোদন ছাড়াই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নারীদের স্যানিটারি ন্যাপকিন, শিশুদের নেবুলাইজার, ব্রেস্ট ফিডার পাম্পসহ বিভিন্ন সার্জিক্যাল সরঞ্জাম তৈরি করা হচ্ছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে এর সত্যতা পাওয়া যায়। পরে প্রতিষ্ঠানের মালিক এমদাদুল হককে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং অবৈধ উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত স্থানটি সিলগালা করে দেওয়া হয়। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বগুড়া জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক অনুমোদন ছাড়াই এসব পণ্য তৈরি করছিল। ‘জবা’ ও ‘সেফ কেয়ার’ নামের স্যানিটারি ন্যাপকিনের মোড়কে উৎপাদনস্থল হিসেবে ধামরাইয়ের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছিল। এটি ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইনের ৪৪ ধারা অনুযায়ী প্রতারণা। তিনি আরো বলেন, অত্যন্ত নিম্নমানের তুলা ও সাধারণ ফ্রেশ টিস্যু মুড়িয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি করে মোড়কজাত করা হচ্ছিল। এসব পণ্য নারীদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করার পাশাপাশি অবৈধ উৎপাদন স্থান সিলগালা করা হয়েছে। মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধে নজরদারি অব্যাহত থাকবে। র্যাব-১২ বগুড়ার কম্পানি কমান্ডার ফিরোজ আহম্মেদ বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি জানতে পেরে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে জানানো হয়। পরে তাদের সহযোগিতায় অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা ও ক্ষতিকর উৎপাদন স্থান সিলগালা করা হয়েছে। তবে কারখানার যেসব অংশে তুলনামূলক ঝুঁকিমুক্ত অন্যান্য পণ্য তৈরি করা হচ্ছিল, সেসব অংশ সচল রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের সমো এলাকার মা ক্যাশ অ্যান্ড ক্যারি সুপারশপে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ছয় বাংলাদেশি প্রবাসীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার (১৫ আগস্ট) বাদ জোহর কুইন্সটাউন জামে মসজিদে দুই দফায় জানাজা শেষে কুইন্সটাউনের ইজিবিলিনি মুসলিম কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়। জানাজায় স্থানীয় মুসল্লিদের পাশাপাশি স্থানীয় মুসলিম কমিউনিটির শীর্ষ নেতা ডা. মাকাদা, বাংলাদেশি চিকিৎসক ডা. ইউনুস, সোমালিয়া ও ইথিওপিয়ান কমিউনিটির প্রতিনিধিসহ দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন শহর থেকে আসা প্রবাসী বাংলাদেশি, বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। জানাজা শেষে নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয় এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়। কুইন্সটাউন বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতা শহিদুল হক হেলালের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং দোকান মালিকপক্ষের সহযোগিতায় দাফনের সব কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। মরদেহগুলোর পৃথক পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় ছয়জনকে তিনটি কবরে, প্রতি কবরে দুজন করে দাফন করা হয়। স্থানীয় কমিউনিটি নেতা মাহমুদুর রহমান জানান, আগুনের তীব্রতায় মরদেহগুলো সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়ায় কোনটি কার মরদেহ তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হলেও সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। পাশাপাশি মরদেহ দেশে পাঠানোর আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও জটিল হওয়ায় নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের সম্মতিতে দক্ষিণ আফ্রিকাতেই তাদের দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দোকান মালিক আলমগীর হোসেন বলেন, আগুনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে মরদেহগুলো দেখে কাউকে শনাক্ত করার কোনো উপায় ছিল না। কমিউনিটি নেতা জুলফিকার আলী টুটুল ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী মরদেহগুলো কঙ্কালে পরিণত হয়েছিল এবং প্রতিটি মরদেহের অবশিষ্টাংশ ছিল খুবই সামান্য। ফলে ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। উল্লেখ্য, গত ২৮ জুলাই ভোররাতে সমো এলাকার "মা ক্যাশ অ্যান্ড ক্যারি" সুপারশপের আবাসিক অংশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দোকানের পেছনের কক্ষে ঘুমিয়ে থাকা সাত বাংলাদেশির মধ্যে নারায়ণগঞ্জের মো. ফয়সাল (২৬), মো. ফাহিম (২৯), শামীম হাসান (৩০), মোহাম্মদ আপন (২৩), নূর মোহাম্মদ (৫৫) এবং মুন্সীগঞ্জের রাজিক বেপারী (৫৫) ঘটনাস্থলেই নিহত হন। একই ঘটনায় মো. সুমন আহত হলেও তিনি জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণ করেন। দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশ হাইকমিশনার শাহ আহমেদ শফীর নেতৃত্বে দূতাবাসের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। একই সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে পুলিশের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। মর্মান্তিক এ ঘটনায় দক্ষিণ আফ্রিকাজুড়ে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। জানাজায় অংশ নেওয়া শত শত মুসল্লি নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে গ্যাস নিঃসরণজনিত দুর্ঘটনায় নয়জনের প্রাণহানির এক দিন পরও ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের জাহাজটির বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসমুক্ত করার কাজ শেষ হয়নি। শনিবার দিনভর চেষ্টার পরেও ওই জাহাজের দুর্ঘটনা ঘটা অংশে গ্যাস ‘বিপজ্জনক মাত্রার নিচে’ নামানো সম্ভব হয়নি। বিকালে বিশেষজ্ঞরা গ্যাস মুক্ত করার কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন। রোববার আবার ওই কাজ শুরু হবে। প্রাণহানির ওই ঘটনায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি শনিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সভা করেছে। ১১ সদস্যের ওই কমিটি রোববার ফেরদৌস শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে জাহাজটি পরিদর্শনে যাবে। শনিবার দুপুরে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড পরিদর্শনে গিয়ে শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, “আমরা দেখছি কেন ঘটনাটা ঘটল। যদি এখানে কারও কোনো অবহেলা থেকে থাকে, দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে ভবিষ্যতে যেন এরকম ঘটনা না ঘটে।” ‘ওয়াটার ট্যাংকে জমেছিল’ বিষাক্ত গ্যাস ২৮০ মিটার দৈর্ঘে্যর এলএনজিবাহী ‘এমটি রাসি’ নামের জাহাজটি ভাঙার জন্য ২০২৫ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারি স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে নিয়ে আসা হয়। শুক্রবার সকালে ওই জাহাজের নিচের দিকের একটি অংশে কাটার কাজ চলছিল। একটি ট্যাংকারের একাংশ কাটার পর সেটি সরিয়ে নিতে গেলে গ্যাসের প্রভাবে অচেতন হয়ে যান কয়েকজন। পরে তাদের উদ্ধারে গিয়ে বাকিরাও অচেতন হয়ে যান। ওই ঘটনায় নয়জনের প্রাণ যায়; চিকিৎসাধীন আছেন ৭ জন। জাহাজটি কাটার আগে অনুমোদন নেওয়ার বিষয়ে বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “জাহাজ বিচিং (তীরে ভেড়ানো) এর সময় আমরা কার্গো ট্যাংক পরীক্ষা করে থাকি। তেল ও গ্যাস কার্গো ট্যাংক পরিদর্শন শেষে আমরা অনুমতি দিই। “এটারও কার্গো ট্যাংক পরিদর্শন করা হয়েছিল। কার্গো ট্যাংকে কিছু হয়নি। যে ঘটনা ঘটেছে সেটা ওয়াটার ট্যাংকে। তাতে গ্যাস জমে গিয়েছিল। সেটা কীভাবে ও কেন হয়েছে, তা তদন্ত শেষে জানা যাবে।” শনিবার দুপুরে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “শুক্রবার বিকালে আমরা দুর্ঘটনা এলাকা পরিদর্শন করি। মাল্টি গ্যাস ডিটেক্টরের মাধ্যমে হাইড্রোজেন সালফাইড অতিরিক্ত মাত্রায় ছিল বলে শনাক্ত করতে পেরেছি। আমাদের ধারণা ঘটনার মূল কারণ হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষাক্ততা।” তিনি বলেন, “সমন্বিত যে কমিটি হয়েছে, কমিটির মাধ্যমে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যে হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি আমরা পেয়েছি সেটাকে বের করে নিরাপদ করা হবে। পরে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা খতিয়ে দেখা হবে।” ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ দল জাহাজের ওই অংশে যান। তারা শনিবার বিকাল পর্যন্ত সেখানে কাজ করেন। রাতে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরিদর্শক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “হাইড্রোজেন সালফাইড পানিতে মিশে থাকে এমন একটি ভারী গ্যাস। এই গ্যাস সরাতে হলে পানি দিয়ে বের করতে হবে। কিন্তু এটা করার মত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সেখানে নেই। তাই আজ কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “২০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) পর্যন্ত হাইড্রোজেন সালফাইড সহনীয়। ২০-১০০ পিপিএম হল বিপজ্জনক মাত্রার। ১০০ পিপিএম এর উপর এই গ্যাস প্রাণঘাতী।” স্থানীয়রা বলছেন, শুক্রবার দুর্ঘটনার পর অচেতন হয়ে পড়াদের উদ্ধারে যারা জাহাজের ওই অংশে গিয়েছিল তারাও অচেতন হয়ে পড়ে। আর যারা ওই জাহাজটির কাছাকাছি এগিয়ে গিয়েছিলেন তারাও তীব্র গ্যাসের গন্ধ পেয়েছেন। ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তৌফিকুল ইসলাম ভুঁইয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আজ (শনিবার) বিকালে পরিবেশ অধিদপ্তর মাল্টি ডিটেকটর দিয়ে পরিমাপ করে দেখেছে। সেখানে ৮৪ পিপিএম, মানে উচ্চমাত্রার গ্যাস রয়ে গেছে। “গ্যাসের এরকম উপস্থিতি থাকায় আজ আর কাজ করা হয়নি। কাল আবার কাজ শুরু হবে।” বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড (বিএসআরবি) এর মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দুর্ঘটনাস্থলে পানি দিলে বিষাক্ত গ্যাস সরে যাচ্ছিল। পরে আবার গ্যাসের অস্তিত্ব পাওয়ায় আজ (শনিবার) কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে।” জাহাজটি সাগরের তীরে ভিড়িয়ে ভাঙার কাজ চলছে। জাহাজের দুর্ঘটনা যে অংশে ঘটেছে সেখানে জোয়ারের পানি আসা-যাওয়া করে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, দুর্ঘটনাস্থলে জমা হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস জোয়ারের পানিতে মিশে আশেপাশে ছড়িয়ে আছে। মামলা হয়েছিল ফেরদৌস স্টিল শিপ ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকায় গত জুলাই মাসে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন না করা, ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রতিবেদন না দেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের বেশি কাজ করালেও অতিরিক্ত সময়ের টাকা না দেওয়ার অনিয়ম ধরা পড়ে ওই শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে। চলতি বছরের শুরুর দিকে পরিদর্শনে অনিয়ম ধরা পড়ে। বিষয়গুলো সংশোধনে প্রতিষ্ঠানটিকে একাধিকবার নোটিশ দেয় কলকারখানা অধিদপ্তর। তবে যথাযথ জবাব না পেয়ে জুলাই মাসে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করা হয়। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা নিয়মিত বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন করি। সেখানে শ্রমিকরা যাযথ বেতন-বোনাস ও চাকরির বেনিফিট পান কিনা, নিরাপত্তার জন্য সরঞ্জাম আছে কিনা এবং আরো কিছু বিষয় আমরা দেখি। “এরকম নিরাপত্তাজনিত কিছু বিষয়ে ঘাটতি থাকায় নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল।” কোনো জাহাজ কাটার আগে গ্যাস মুক্ত করেই তা কাটতে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, “এক্ষেত্রে সেটা হয়েছে কিনা, তা টেকনিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবেন। তদন্ত কমিটি হয়েছে। কমিটি তথ্য সংগ্রহ ও তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দেবে।” জাহাজটিতে গ্যাস নিঃসরণজনিত দুর্ঘটনায় নয়জনের প্রাণহানির পর ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইয়ার্ডটির সব কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।