ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পরে রাজনীতি থেকে অবসরের কথাই এক সময়ে ভেবেছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে এখন সেই ভাবনা নাকচ। দেশের ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে’ সেই চিন্তা সরিয়ে রেখে ‘নিজের দেশের মানুষের পাশে থাকা’-র সিদ্ধান্তই নিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
মঙ্গলবার (৯ জুন) নয়াদিল্লি থেকে ‘এই সময়’-কে দীর্ঘ একান্ত সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।
একান্ত সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বললেন, ‘আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে মানুষের দুঃসময়ে তাদের পাশে থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। ১৯৮১-তে আমি যখন সব হারিয়ে দেশে ফিরেছিলাম, তখন আওয়ামী লিগের কর্মীরাই ছিলেন আমার পরিবার। আজ সেই নেতা-কর্মীরা নির্যাতিত, আমার দেশের জনগণের জীবন আজ বিপর্যস্ত। আমি কী ভাবে তাদের ছেড়ে বিশ্রামে যাই?’
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর এই ‘বিশ্রামে’ যাওয়ার জল্পনা জোরালো হয়েছিল তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের একটি বক্তব্যের ভিত্তিতে। সেই সূত্রেই তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনি দিল্লি আসার পরে আপনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় জানিয়েছিলেন, আপনি রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান। আপনি কি এখনও সেই সিদ্ধান্তে অনড়? সে ক্ষেত্রে দল ও দেশের নেতৃত্ব আপনি কার বা কাদের হাতে ছেড়ে যেতে চান?’
এ প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী সভানেত্রী বলেন, ‘জয়ের বক্তব্য আমার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষ সারাজীবন একই দায়িত্বে থাকে না। আমিও বহুবার বলেছি, নতুন নেতৃত্ব আসুক, তরুণেরা দায়িত্ব নিক। আওয়ামী লীগের বিগত দুই কাউন্সিলেও আমি নতুন নেতৃত্বের কথা বলেছি। ব্যক্তিগতভাবে আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই।’
তা হলে এই ভাবনার পরিবর্তন কেন?
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজ বাংলাদেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। গণতন্ত্র আক্রান্ত। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বন্ধ করার আইন করা হয়েছে। আমার নেতা-কর্মীরা কারাগারে। অনেকে ঘরছাড়া। সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে রয়েছেন। নিরীহ শিশুরা টিকার অভাবে মারা যাচ্ছে, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হচ্ছে। রাষ্ট্রকে ১৯৭১-এর পথ থেকে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে। এমন একটা সময়ে আমি কীভাবে বলি, আমি বিশ্রামে যাচ্ছি?’
আমি ক্ষমতা চাই না উল্লেখ করে মুজিব-কন্যা বলেন, কিন্তু জনগণের প্রতি আমার দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারি না।
এসময় শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের নিরাপত্তা, তাদের উন্নত জীবনমান ও অর্থনৈতিক মুক্তি, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন, সকলের সমানাধিকার এবং আওয়ামী লীগের তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আগামী দিনের সাফল্য নিশ্চিত করে, তার পরেই আমি অবসর নেব।’
পরবর্তী নেতৃত্ব সেক্ষেত্রে কার হাতে যাবে? এ প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা, ‘নেতৃত্ব কার হাতে যাবে, সেটি কোনও ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার নয়। আওয়ামী লীগ কারও পারিবারিক সম্পত্তি নয়, একটি গণতান্ত্রিক দল। কাউন্সিল (সম্মেলন)-এর মাধ্যমে, কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে, যোগ্যতা, ত্যাগ, সাহস ও আদর্শিক দৃঢ়তার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে।’
নেতৃত্ব কোনও অলঙ্কার নয় জানিয়ে মুজিব-কন্যা বলেন, নেতৃত্ব একটি পবিত্র দায়িত্ব। যারা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না, যারা কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে পারবেন না, যারা কঠিন সময়ে সংগঠনকে ধরে রাখতে পারবেন না, তাদের বিষয়ে দলীয় কাঠামোর মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আবার এটাও মনে রাখতে হবে, আমাদের অনেক প্রবীণ নেতা সারা জীবন দলকে দিয়েছেন, জেল খেটেছেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন। তাদের অবদান কখনও অস্বীকার করা যাবে না। তাদের অভিজ্ঞতা আমাদের সম্পদ।
আপাতত নেতৃত্বে বড়সড় বদলের সম্ভাবনা নেই ইঙ্গিত দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে এনে নতুন কাউন্সিল (সম্মেলন)-এর মাধ্যমে দলকে সুসংগঠিত করা হবে। নতুন প্রজন্মের মেধাবী, দেশপ্রেমিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী তরুণদের নেতৃত্বে নিয়ে আসা হবে। সেই পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘তরুণ নেতৃত্বের বিষয়ে আমি সর্বদাই উৎসাহী। আমাদের অনেক তরুণ নেতারা আজ নিজ নিজ অবস্থান থেকে, রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল জুলুম-অত্যাচার-নির্যাতন মোকাবিলা করে দৃঢ়তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের পতাকা ধরে রেখেছেন। এরাই আমাদের ভবিষ্যৎ।’
একান্ত সাক্ষাৎকারে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হয়, ‘আপনি সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, মাথা উঁচু করে খুব দ্রুত আপনি বাংলাদেশের মাটিতে ফিরবেন। বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে আপনার ও আওয়ামী লীগের অন্য নেতাকর্মীদের প্রত্যাবর্তন ও রাজনীতি শুরু করাটা কতটা বাস্তবসম্মত?’
এ প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘পাকিস্তানি শাসকরা পারেনি, সামরিক শাসকেরা পারেনি, খুনিরা পারেনি, ষড়যন্ত্রকারীরা পারেনি, আজকের বিএনপি সরকারও আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারবে না। আমার প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তিগত বিষয় তো নয়। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের সঙ্গে যুক্ত।’ তার সংযোজন, ‘
জনগণ বুঝতে পেরেছেন আওয়ামী লীগই তাদের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয় উল্লেখ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই জনগণের শক্তিতে বলীয়ান হয়েই আমি ফিরব। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার গর্ব নিয়ে ফিরব, দেশ পুনর্গঠনের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ফিরবো।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পরে রাজনীতি থেকে অবসরের কথাই এক সময়ে ভেবেছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে এখন সেই ভাবনা নাকচ। দেশের ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে’ সেই চিন্তা সরিয়ে রেখে ‘নিজের দেশের মানুষের পাশে থাকা’-র সিদ্ধান্তই নিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। মঙ্গলবার (৯ জুন) নয়াদিল্লি থেকে ‘এই সময়’-কে দীর্ঘ একান্ত সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। একান্ত সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বললেন, ‘আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে মানুষের দুঃসময়ে তাদের পাশে থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। ১৯৮১-তে আমি যখন সব হারিয়ে দেশে ফিরেছিলাম, তখন আওয়ামী লিগের কর্মীরাই ছিলেন আমার পরিবার। আজ সেই নেতা-কর্মীরা নির্যাতিত, আমার দেশের জনগণের জীবন আজ বিপর্যস্ত। আমি কী ভাবে তাদের ছেড়ে বিশ্রামে যাই?’ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর এই ‘বিশ্রামে’ যাওয়ার জল্পনা জোরালো হয়েছিল তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের একটি বক্তব্যের ভিত্তিতে। সেই সূত্রেই তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনি দিল্লি আসার পরে আপনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় জানিয়েছিলেন, আপনি রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান। আপনি কি এখনও সেই সিদ্ধান্তে অনড়? সে ক্ষেত্রে দল ও দেশের নেতৃত্ব আপনি কার বা কাদের হাতে ছেড়ে যেতে চান?’ এ প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী সভানেত্রী বলেন, ‘জয়ের বক্তব্য আমার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষ সারাজীবন একই দায়িত্বে থাকে না। আমিও বহুবার বলেছি, নতুন নেতৃত্ব আসুক, তরুণেরা দায়িত্ব নিক। আওয়ামী লীগের বিগত দুই কাউন্সিলেও আমি নতুন নেতৃত্বের কথা বলেছি। ব্যক্তিগতভাবে আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই।’ তা হলে এই ভাবনার পরিবর্তন কেন? শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজ বাংলাদেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। গণতন্ত্র আক্রান্ত। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বন্ধ করার আইন করা হয়েছে। আমার নেতা-কর্মীরা কারাগারে। অনেকে ঘরছাড়া। সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে রয়েছেন। নিরীহ শিশুরা টিকার অভাবে মারা যাচ্ছে, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হচ্ছে। রাষ্ট্রকে ১৯৭১-এর পথ থেকে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে। এমন একটা সময়ে আমি কীভাবে বলি, আমি বিশ্রামে যাচ্ছি?’ আমি ক্ষমতা চাই না উল্লেখ করে মুজিব-কন্যা বলেন, কিন্তু জনগণের প্রতি আমার দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারি না। এসময় শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের নিরাপত্তা, তাদের উন্নত জীবনমান ও অর্থনৈতিক মুক্তি, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন, সকলের সমানাধিকার এবং আওয়ামী লীগের তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আগামী দিনের সাফল্য নিশ্চিত করে, তার পরেই আমি অবসর নেব।’ পরবর্তী নেতৃত্ব সেক্ষেত্রে কার হাতে যাবে? এ প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা, ‘নেতৃত্ব কার হাতে যাবে, সেটি কোনও ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার নয়। আওয়ামী লীগ কারও পারিবারিক সম্পত্তি নয়, একটি গণতান্ত্রিক দল। কাউন্সিল (সম্মেলন)-এর মাধ্যমে, কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে, যোগ্যতা, ত্যাগ, সাহস ও আদর্শিক দৃঢ়তার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে।’ নেতৃত্ব কোনও অলঙ্কার নয় জানিয়ে মুজিব-কন্যা বলেন, নেতৃত্ব একটি পবিত্র দায়িত্ব। যারা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না, যারা কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে পারবেন না, যারা কঠিন সময়ে সংগঠনকে ধরে রাখতে পারবেন না, তাদের বিষয়ে দলীয় কাঠামোর মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আবার এটাও মনে রাখতে হবে, আমাদের অনেক প্রবীণ নেতা সারা জীবন দলকে দিয়েছেন, জেল খেটেছেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন। তাদের অবদান কখনও অস্বীকার করা যাবে না। তাদের অভিজ্ঞতা আমাদের সম্পদ। আপাতত নেতৃত্বে বড়সড় বদলের সম্ভাবনা নেই ইঙ্গিত দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে এনে নতুন কাউন্সিল (সম্মেলন)-এর মাধ্যমে দলকে সুসংগঠিত করা হবে। নতুন প্রজন্মের মেধাবী, দেশপ্রেমিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী তরুণদের নেতৃত্বে নিয়ে আসা হবে। সেই পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘তরুণ নেতৃত্বের বিষয়ে আমি সর্বদাই উৎসাহী। আমাদের অনেক তরুণ নেতারা আজ নিজ নিজ অবস্থান থেকে, রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল জুলুম-অত্যাচার-নির্যাতন মোকাবিলা করে দৃঢ়তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের পতাকা ধরে রেখেছেন। এরাই আমাদের ভবিষ্যৎ।’ একান্ত সাক্ষাৎকারে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হয়, ‘আপনি সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, মাথা উঁচু করে খুব দ্রুত আপনি বাংলাদেশের মাটিতে ফিরবেন। বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে আপনার ও আওয়ামী লীগের অন্য নেতাকর্মীদের প্রত্যাবর্তন ও রাজনীতি শুরু করাটা কতটা বাস্তবসম্মত?’ এ প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘পাকিস্তানি শাসকরা পারেনি, সামরিক শাসকেরা পারেনি, খুনিরা পারেনি, ষড়যন্ত্রকারীরা পারেনি, আজকের বিএনপি সরকারও আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারবে না। আমার প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তিগত বিষয় তো নয়। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের সঙ্গে যুক্ত।’ তার সংযোজন, ‘ জনগণ বুঝতে পেরেছেন আওয়ামী লীগই তাদের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয় উল্লেখ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই জনগণের শক্তিতে বলীয়ান হয়েই আমি ফিরব। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার গর্ব নিয়ে ফিরব, দেশ পুনর্গঠনের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ফিরবো।
বাংলাদেশের কৃতি সন্তান তানভীর অপু ভ্রমণপ্রিয় মানুষ। ছোটবেলা থেকেই তার অদ্ভুত বাতিক ছিল। টাকা জোগাড় হলেই বেরিয়ে পড়তেন। তারই ধারাবাহিকতায় তিনি এ পর্যন্ত ৯৯টি দেশের ১ হাজার শহর ঘুরেছেন। ২০০৫ সালে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ভ্রমণের মাধ্যমে এই স্বপ্নযাত্রার সূচনা হয়। ২০ বছরের বিশ্বভ্রমণে চীনের গুইলিংয়ে পা রাখার মধ্য দিয়ে তিনি স্পর্শ করেছেন ভ্রমণজীবনের হাজারতম শহর। জানা যায়, তানভীর অপু সাতটি মহাদেশ, পাঁচটি মহাসাগর, অসংখ্য দ্বীপ, পর্বত, মরুভূমি, বনাঞ্চল এবং শত শত ঐতিহাসিক ও আধুনিক নগরী ভ্রমণ করেছেন। বিশ বছরের যাত্রায় তিনি দেখেছেন মানবসভ্যতার বিচিত্র রূপ, প্রাচীন ইতিহাসের গৌরব, আধুনিক বিশ্বের বিস্ময়কর অগ্রগতি এবং প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য। নানা দেশের শিল্প, সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য, জীবনধারা তাকে সমৃদ্ধ করেছে। কখনো আর্কটিকের নীরব তুষারভূমিতে, কখনো আফ্রিকার বন্য প্রকৃতির মাঝে, কখনো ইউরোপের শতাব্দীপ্রাচীন নগরীতে, কখনো দক্ষিণ আমেরিকার প্রান্তে দাঁড়িয়ে অনুভব করেছেন সীমাহীন বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য। তানভীর অপু বলেন, ‘গুইলিংয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে দাঁড়িয়ে মনে হলো, হাজারতম শহরে পৌঁছানোর পেছনে লুকিয়ে আছে অগণিত পথচলা, অসংখ্য সীমান্ত অতিক্রম, হাজারো মানুষের সঙ্গে পরিচয় এবং পৃথিবীকে জানার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। এটি স্বপ্ন, সাহস, অধ্যবসায় এবং অজানাকে জানার নিরন্তর প্রচেষ্টা। দিল্লি থেকে গুইলিংয়ের এ দীর্ঘযাত্রা আমার কাছে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষা, অর্জন এবং স্মৃতির অবিস্মরণীয় মহাকাব্য।’ তিনি বলেন, ‘৯৯টি দেশ, সাতটি মহাদেশ, পাঁচটি মহাসাগর এবং ১ হাজার শহর পেরোতে আড়াই লক্ষ কিলোমিটারের ওপরে সড়ক ভ্রমণ করেছি। এই দীর্ঘযাত্রায় পৃথিবীর প্রায় ৮০ শতাংশ ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও পর্যটননগরী দেখার সুযোগ পেয়েছি। প্রতিটি শহরের নিজস্ব ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি এবং গল্প আছে। সেই গল্পই জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। আশা করি আগামী মাসেই হয়তো শততম দেশে পা রাখবো।’ তিনি হেলসিংকি, লন্ডন, ডাবলিন, বার্লিন, হেমারফেস্ট, টমসো উসুঅইয়া, জুরিখ, জেনেভা, ফ্রাঙ্কফুট, নয়াদিল্লি, মুম্বাই, কলকাতা, পাঞ্জাব, জয়পুর, রাজস্থান, কেরালা, বেঙ্গালুরু, কাঠমান্ডু, পোখারা, মাস্কাট, রিয়াদ, জেদ্দা, ক্যানভ্যারা, সিডনি, কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া, রাবাত, কাসাব্লাঙ্কা, নাইরোবি, কাম্পালা, জিনজা, জেরুজালেম, তেল আবিব, তুর্কু, স্টকহোম, গথেনবার্গ, ওসলো, বার্গেন, ব্যাংকক, সিএমরিপ, পাতাইয়া, কুনমিং, রেইগেভিক, কোলোনিয়া, বেলিজ সিটি, মেরিডা, ফ্লোরেন্স, মিলান, ওয়ারশো, লুবলিন, কোপান, লিজিয়ান, ডালি, রোভানিয়েমি, তাল্লিন, তারতু, রিগা, ভিলনিয়াস, কাউনাস, ওয়ারশ, ক্রাকোভ, বুদাপেস্ট, প্রাগ, ব্রনো, ব্রাতিস্লাভা, এথেন্স, থবুখারেস্ট, ক্লুজ-নাপোকা, সোফিয়া, কিয়েভ, লাভিভ, বেলগ্রেড, সারায়েভো, প্রিস্টিনা, স্কোপিয়ে, ওহরিদ, জাগরেব, স্প্লিট,বুদভা, তিরানা,বার্ন, জুরিখ, ভিয়েনা, সালজবুর্গ, লন্ডন, লিভারপুল, সেন্ট পিটার্সবার্গ, ভাদুজ, ব্রাসেলস, অ্যান্টওয়ার্প, আমস্টারডাম, রটারডাম, লুক্সেমবার্গ সিটি, এ বার্লিন, মিউনিখ, প্যারিস, বুয়েনস আইরেস, কুইটো, গুয়ায়াকিল, লিমা, কুসকো, সান্ত, মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা, হাভানা, সান্তিয়াগো দে কিউবা, পানামা সিটি, কোলন, সান হোসে, এল চালতেন, এল কেলাফতে, তেগুসিগালপা, সানপেদ্রো মানাগুয়া, সান সালভাদর, সান্তা আনা, বেলমোপান, বেলিজ সিটি, গুয়াতেমালা সিটি, আন্তিগুয়া গুয়াতেমালা, বেইজিং, সাংহাই, ওয়াশিংটন ডিসি এবং নিউইয়র্ক সিটির মতো ১ হাজার শহর ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩টি অঙ্গরাজ্য ভ্রমণ তার জন্য অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। পেশাগত জীবনে স্থায়ী কোনো চাকরি নেই। নেশায় তিনি পরিব্রাজক। বর্তমানে বসবাস করছেন ফিনল্যান্ডে। সে দেশের নাগরিকত্ব পেয়েছেন তিনি। ফিনল্যান্ড থেকেই ভ্রমণের নেশা চেপে বসে। ফলে স্থায়ী কোনো চাকরি করা সম্ভব হয় না। মন চাইলে আর পকেটে টাকা থাকলেই বেরিয়ে পড়েন বিশ্ব ভ্রমণ করতে।
সাগর ও নদীর মোহনায় যেখানে মিঠাপানি ও লোনাপানি এসে মেশে, ঠিক সেখানে তৈরি হওয়া চাপকে কাজে লাগিয়েই এই বিদ্যুৎকেন্দ্র দিনরাত ২৪ ঘণ্টা একটানা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চলেছে। রোদ থাকুক বা না থাকুক, বাতাস বয়ে যাক বা না যাক—কিছুতেই এর কিছু যায়-আসে না। প্রকৃতি লাখোকোটি বছর ধরে পৃথিবীর প্রতিটি উপকূলে এই চাপ তৈরি করে আসছে। আর এখন জাপানি প্রকৌশলীরা সেই প্রাকৃতিক শক্তিকেই নিজেদের কাজে লাগানোর উপায় বের করে ফেলেছেন। অজমোটিক পাওয়ার আদতে কী স্কুলের বিজ্ঞান বইয়ে আপনি নিশ্চয়ই অভিস্রবণের কথা পড়েছেন। যে প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের শিকড় মাটি থেকে পানি টেনে নেয় বা আমাদের শরীরের কোষগুলো আর্দ্র থাকে, এটি ঠিক সেই একই প্রক্রিয়া। অজমোটিক পাওয়ারের ধারণাটি মূলত এই অভিস্রবণের নীতির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। সত্তরের দশকে প্রথম ধরিত্রী দিবসের সময় এই ব্লু এনার্জির ধারণা সামনে আসে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, যখন একটি বিশেষ অর্ধভেদ্য পর্দার এক পাশে কম ঘনত্বের লবণাক্ত পানি এবং অন্য পাশে বেশি ঘনত্বের লবণাক্ত পানি রাখা হয়, তখন প্রাকৃতিক নিয়মেই মিঠাপানি লোনাপানির দিকে ছুটে যায়। পানি ও আয়নের এই ছুটে চলার কারণে লোনাপানির অংশে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। এই চাপকে কাজে লাগিয়েই ঘোরানো হয় বিশাল টারবাইন। সেই টারবাইন ঘুরলেই জেনারেটরের মাধ্যমে তৈরি হয় বিদ্যুৎ। ফুকুওকার বুকে এক নতুন ইতিহাস জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর ফুকুওকা। এ শহরের আশপাশে বড় কোনো নদী নেই। কিন্তু বৃহত্তর ফুকুওকার প্রায় ২৬ লাখ মানুষের এই শহরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ সুপেয় পানির প্রয়োজন হয়। এই চাহিদা মেটাতে শহরটিতে আছে উমিনোনাকেমিচি নাতা সি ওয়াটার ডিস্যালিনেশন সেন্টার। স্থানীয়ভাবে একে মামিজুপিয়া বলা হয়। ২০০৫ সাল থেকে এই প্ল্যান্ট সমুদ্রের লোনাপানি থেকে লবণ আলাদা করে প্রতিদিন প্রায় আড়াই লাখ মানুষের জন্য ৫০ হাজার কিউবিক মিটার সুপেয় পানি তৈরি করে আসছে। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় একটি বড় সমস্যা ছিল। সুপেয় পানি আলাদা করার পর যে অতিরিক্ত ঘন লবণাক্ত পানি অবশিষ্ট থাকত, তা আবার সাগরে ফেলে দেওয়া হতো। অন্যদিকে শহরের পয়োনিষ্কাশন কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত মিঠাপানিও সাগরে গিয়ে পড়ত। জাপানি প্রকৌশলীরা ভাবলেন, এই দুধরনের অব্যবহৃত পানিকে একসঙ্গে কাজে লাগালে কেমন হয়? এ ভাবনা থেকেই ফুকুওকায় গড়ে তোলা হয়েছে এশিয়ার প্রথম এবং বিশ্বের দ্বিতীয় পূর্ণাঙ্গ অজমোটিক পাওয়ার প্ল্যান্ট। ২০২৩ সালে ডেনমার্কে প্রথম এমন একটি প্ল্যান্ট চালু হয়েছিল। তবে জাপানের এই প্ল্যান্ট আকারে বেশ বড় এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেক বেশি আধুনিক। ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বছরে প্রায় ৮ লাখ ৮০ হাজার কিলোওয়াট-আওয়ার বিদ্যুৎ উৎপন্ন হচ্ছে, যা দিয়ে ২২০ থেকে ৩০০টি সাধারণ পরিবারের সারা বছরের বিদ্যুতের চাহিদা অনায়াসে মেটানো সম্ভব। আপাতদৃষ্টিতে পরিমাণটি খুব বিশাল না হলেও এটি আদতে দুটি ফুটবল মাঠের সমান সোলার প্যানেলের উৎপাদিত বিদ্যুতের সমান। সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের চেয়ে এটি কেন আলাদা নবায়নযোগ্য শক্তির কথা উঠলেই আমাদের মাথায় সবার আগে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুতের নাম আসে। কিন্তু এই দুটি উৎসেরই একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো নির্ভরযোগ্যতা। সূর্য ডুবে গেলে বা মেঘলা দিনে সোলার প্যানেল কাজ করে না। আবার বাতাস না থাকলে উইন্ড টারবাইন ঘোরে না। এ কারণে এই বিদ্যুৎগুলোকে জমিয়ে রাখার জন্য বড় বড় ব্যাটারির প্রয়োজন হয়। কিন্তু অজমোটিক পাওয়ারের ক্ষেত্রে এমন কোনো ঝামেলা নেই। ফুকুওকার এই প্ল্যান্ট বছরের ৩৬৫ দিনই ২৪ ঘণ্টা একটানা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। সমুদ্রের লোনাপানি কখনো ফুরিয়ে যায় না, অভিস্রবণপ্রক্রিয়াও কখনো বন্ধ হয় না। আবহাওয়া বা জলবায়ুর ওপর এর কোনো নির্ভরতা নেই। প্ল্যান্টটির পরিচালনাকারী সংস্থা সিওয়াটার ডিস্যালিনেশন সেন্টারের পরিচালক কেনজি হিরোকাওয়ার মতে, এটি কার্বন নিঃসরণমুক্ত এবং সম্পূর্ণ নবায়নযোগ্য একটি পদ্ধতি। এর প্রায় ৯০ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা আছে। এটি কেন আগে ব্যবহার করা হয়নি শুনতে খুব সহজ মনে হলেও অজমোটিক পাওয়ারের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ কিন্তু পাহাড়সম। এর সবচেয়ে বড় বাধা হলো দক্ষতা। লোনা ও মিঠাপানি মেশালে শক্তি তৈরি হয় ঠিকই, কিন্তু এই পানিগুলোকে পাম্প করে পর্দার কাছে আনতে প্রচুর বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। আবার মেমব্রেনের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় ঘর্ষণের কারণে শক্তির একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে এর আগে গবেষণাগারে এটি কাজ করলেও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করা কঠিন ছিল। তবে জাপানের আধুনিক মেমব্রেন প্রযুক্তি এবং শক্তির অপচয় রোধকারী পাম্প এ সমস্যার অনেকটাই সমাধান করেছে। জাপান ডিস্যালিনেশন মেমব্রেনের বিশ্ববাজারের প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। মেমব্রেন বা পর্দার যে সমস্যা বিজ্ঞানীদের এত দিন ভাবাচ্ছিল, জাপানের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান টয়োবো তার সমাধান নিয়ে এসেছে। তাদের তৈরি রিভার্স অজমোসিস মেমব্রেনগুলো বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন প্রায় ১৬ লাখ টন সুপেয় পানি তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা দিয়ে ৬৪ লাখ মানুষের পানির চাহিদা মেটে। ফুকুওকার বিদ্যুৎকেন্দ্রে এই উন্নত মেমব্রেন ব্যবহার করায় তা অত্যন্ত উচ্চ চাপেও নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া সাধারণ সমুদ্রের পানির বদলে ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের ফেলে দেওয়া অতিরিক্ত ঘন লোনাপানি ব্যবহার করায় লবণাক্ততার পার্থক্য অনেক বেড়ে গেছে। ফলে শক্তি উৎপাদনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অজমোটিক শক্তির এ ধারণা নিয়ে বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশ কাজ করছে। জাপান ও ডেনমার্কের পাশাপাশি নরওয়ে, দক্ষিণ কোরিয়া, স্পেন ও কাতারেও এর পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় নিউ সাউথ ওয়েলস ও সিডনির চারপাশের বিশাল লবণাক্ত হ্রদগুলো ব্যবহার করেও এই শক্তি উৎপাদনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে ফুকুওকার প্ল্যান্টটি প্রমাণ করেছে, এই প্রযুক্তি এখন পরীক্ষাগারের গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। জাপানের পরবর্তী চমক কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষণ জাপান শুধু অজমোটিক পাওয়ার নিয়েই থেমে নেই। তাদের পরবর্তী লক্ষ্য আরও অনেক বড়। তারা এমন একটি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে, যা সরাসরি বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড টেনে নিয়ে তাকে কৃত্রিম জ্বালানিতে রূপান্তর করবে। এই প্রযুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে আর্টিফিশিয়াল ফটোসিনথেসিস বা কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষণ। গাছপালা যেমন সূর্যের আলো, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানি ব্যবহার করে নিজেদের খাবার তৈরি করে, ঠিক একই পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীরা সূর্যের আলো ব্যবহার করে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানি থেকে ইথানল বা হাইড্রোকার্বনের মতো প্রয়োজনীয় রাসায়নিক জ্বালানি তৈরির চেষ্টা করছেন। জাপানে একে নাসার অ্যাপোলো প্রজেক্টের মতো একটি বৈশ্বিক মিশন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা ফুয়েল সেলে ব্যবহৃত বিশেষ গ্যাস ডিফিউশন ইলেকট্রোড ও সৌরশক্তি ব্যবহার করে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে সরাসরি হাইড্রোকার্বনে রূপান্তর করতে সফল হয়েছেন। এর মাধ্যমে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে আগে পানিতে দ্রবীভূত করার ঝামেলা থেকে মুক্তি মিলেছে। এ প্রক্রিয়ায় সৌরশক্তিকে হাইড্রোকার্বনে রূপান্তরের দক্ষতা পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ৭১ শতাংশ, যা প্রকৃতির স্বাভাবিক সালোকসংশ্লেষণের প্রায় সমান। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত একটি রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এই কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষণ প্রযুক্তির আংশিক সামাজিক বাস্তবায়ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ২০৩৫ সালের মধ্যে এটিকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করারও পরিকল্পনা আছে, যাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর থেকে পৃথিবীর নির্ভরতা কমানো যায়। যদি কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষণ থেকে তৈরি ইথানলের দাম সাধারণ গ্যাসোলিন বা বায়োইথানলের চেয়ে কমে যায়, তবে বিশ্বজুড়ে এর বিশাল চাহিদা তৈরি হবে। একটি নীরব বিপ্লবের অপেক্ষায় বিশ্ব গত কয়েক দশকে পুরো বিশ্বের শক্তি উৎপাদনব্যবস্থা একটি দ্বিমুখী সংকটে আটকে আছে। একদিকে পরিবেশ ধ্বংসকারী জীবাশ্ম জ্বালানি, অন্যদিকে সৌর বা বায়ুশক্তির মতো অনিয়মিত নবায়নযোগ্য শক্তির সীমাবদ্ধতা। কিন্তু অজমোটিক পাওয়ার ও কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষণের মতো প্রযুক্তিগুলো এই দুইয়ের মাঝখানে একটি নতুন পথের সন্ধান দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিগত বাধাগুলো পার হতে পারলে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক বিদ্যুতের চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ মেটানো সম্ভব হতে পারে এই অজমোটিক পাওয়ারের সাহায্যে। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অব্যবহৃত নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস হয়ে উঠতে পারে। এসব প্রযুক্তি এখন আর কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়; বাস্তবেই কাজ করছে। ফুকুওকার প্ল্যান্টটি প্রমাণ করেছে, ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট, বন্দর, উপকূলীয় শহর ও দ্বীপ অঞ্চলগুলোয় এই প্রযুক্তি স্থাপন করা সম্ভব। পৃথিবীর যেকোনো উপকূলীয় দেশে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। আগামী দশকের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লবগুলো হয়তো বিশাল কোনো জমকালো ঘোষণার মাধ্যমে আসবে না; আসবে খুব নীরবে। টোকিওর কোনো ল্যাবরেটরিতে কিংবা ফুকুওকার কোনো প্ল্যান্টে সেসব এরই মধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে। যখন বাকি বিশ্ব এই নতুন প্রযুক্তিগুলোর দিকে নজর দেবে, তত দিনে এর অবকাঠামো পুরোপুরি দাঁড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশেও কি এভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব এককথায় বললে, অবশ্যই সম্ভব। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা শত শত নদী এঁকেবেঁকে সোজা গিয়ে মিশেছে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে। অজমোটিক পাওয়ার বা ব্লু এনার্জির মূল শর্তই হলো মিঠাপানি ও লোনাপানির মিলনস্থল। পদ্মা, মেঘনা বা ব্রহ্মপুত্রের মতো বিপুল জলরাশির মিঠাপানি যেখানে সাগরের লোনাপানির সঙ্গে মিশছে, প্রাকৃতিকভাবেই সেখানে তৈরি হচ্ছে অজমোটিক চাপের বিশাল এক আধার। আমাদের বিশাল উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পায়রা বা মোংলার মোহনাগুলো এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য আদর্শ জায়গা হতে পারে। তবে জাপানের মতো আমাদেরও কিছু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ আছে। এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র চাইলেই বানানো যাবে, কিন্তু তাতে কতটা লাভ হবে, তা–ও বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশে এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি সম্ভব কি না, তা জানতে কথা বলেছিলাম ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্স রিসার্চের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল (ইইই) বিভাগের পরিচালক ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এম রেজওয়ান খানের সঙ্গে। এম রেজওয়ান খান বলেন, ‘বিদ্যুৎ তৈরির অনেক পদ্ধতি। গরম ও ঠান্ডার পরিবর্তন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারে, সমুদ্রের ঢেউ থেকে হতে পারে। কিন্তু এসব সাধারণত বেশি ব্যবহার করা হয় না। কারণ, এসবে যে খরচ, তা আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থার চেয়ে কম নয়। জাপানের মতো দেশের এই সামর্থ্য আছে। ভবিষ্যতে তারা হয়তো আরও বড় প্রজেক্ট করবে। বাংলাদেশেও এই প্রযুক্তি কাজ না করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, খরচ কত পড়বে। ল্যাবে ছোট টেস্টের জন্য তৈরি করলে তা ভিন্ন জিনিস, কিন্তু আপনি যদি বড় পরিসরে এটা করতে চান, তাহলে খরচের ব্যাপারটা মাথায় রাখতে হবে।’