চব্বিশের আন্দোলনের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ আবার দেশের রাজনীতিতে ‘ফিরে এসেছে’ বলে মনে করছেন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম নেতা সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। এর বিভিন্ন কারণ তুলে ধরে তিনি দলটির ‘ফিরে আসার’ প্রেক্ষাপটও বর্ণনা করেছেন।
মঙ্গলবার কিছু সময়ের ব্যবধানে তিনি এ নিয়ে দুটো ফেইসবুক পোস্ট দেন। এর প্রথমটিতে তিনি লেখেন, “লীগ রাজনৈতিক দলের আগে একটা ধর্মতত্ত্ব, সে ধর্মতত্ত্বে ইমান আবার ফেরত এসেছে।”
কীভাবে ফিরল, সে ‘গল্পই’ তুলে ধরার কথা বলেন তিনি।
মাহফুজ লেখেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যে দিন থেকে ডানপন্থিদের উত্থানের জন্য অন্তরীণ সরকারের লোকজন কাজ করা শুরু করেসে। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন আইনের শাসনের বদলে মবের শাসনে আনন্দ পেয়েছিল গত ১৭ বছরের ‘মজলুমগণ’।“
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া মাহফুজ এমন এক সময় এই স্ট্যাটাস দিলেন, যেদিন ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ইমেইলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা শিগগিরই দেশে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ড নিয়ে ভারতের দিল্লিতে অবস্থান করা শেখ হাসিনা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারে ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে যুক্ত থাকা মাহফুজ এ সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের ফেরার প্রসঙ্গ নিয়ে দীর্ঘ পোস্ট দেন।
তবে শেখ হাসিনার বিষয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাসে মাহফুজ কোনো কথা অবশ্য লেখেননি।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্র্তী সরকারেরও কড়া সমালোচনা করে মাহফুজ বলছেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন অন্তরীণ সরকার পলিটিকাল থেকে আমলাতান্ত্রিক হল এবং আমলানির্ভর কিচেন ক্যাবিনেট থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া শুরু হল। যে কিচেন ক্যাবিনেটের অধিকাংশ লোকই ছিল জামাত-বিএনপি বা লীগের ছুপা দালাল। যাদের কাছে জুলাই মানে ছিল। নিজেদের পরিবার, প্রজন্ম আর প্রতিষ্ঠানের স্বার্থরক্ষা।”
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। এরপর থেকে তিনি ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অবস্থান করছেন। ২০২৫ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড হয় শেখ হাসিনার। বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে দুর্নীতির একাধিক মামলাতে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়। সেই থেকে দলটি কার্যত রাজনীতির মাঠে নেই। বিভিন্ন সময় মিছিল-স্লোগানের চেষ্টা করলে গ্রেপ্তার হচ্ছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
ফেইসবুক পোস্টে মাহফুজ লেখেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন থেকে উগ্রবাদীরা মাজারে হামলা করেছে, মসজিদ থেকে ভিন্নমতাবলম্বীদের বের করে দিয়েছে। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন হিন্দুদের উপর নিপীড়ন নিয়ে 'মজলুমগণ' চুপ ছিল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন সেকুলার মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষজন এদেশে সরকার প্রযোজিত ডানপন্থার উত্থানে ভয় পেয়েছিল।
“লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন মবস্টারদের এ দেশে হিরো বানানো হয়েছিল। উগ্রবাদীর সেফ স্পেইস দেয়া হইসিল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ব্যবস্থা বিলোপের বদলে ন্যুনতম সংস্কার ও ‘ঐকমত্য কমিশন’ নাম দিয়ে জনগণকে বিচ্ছিন্ন এবং হতাশ করা হল।”
আওয়ামী লীগ সেদিনই ‘ব্যাক’ করেছিল, যে দিন ছাত্ররা বিপ্লবী সংগঠনে রূপ না নিয়ে ‘লুম্পেন চরিত্রের ক্লাব’ আর মবে রূপ নিয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন মাহফুজ।
সব শেষে মাহফুজ লেখেন, “লীগ ফিরত আসবে। কারণ, সব দোষ মাহফুজ আলমের। প্রচারে- নিখিল বাংলাদেশের চিরকাল মজলুম-ডানপন্থী বলয়, অন্তরীণ কিচেনের দালাল-সুবিধাভোগী গুপ্ত বলয়, এবং দিস এন্ড দোস বটফোর্সেস, সিন্ডিকেট আর গং মানে গয়রহ।”
এ দিকে তার এ স্ট্যাটাসের পর ফেসবুকে বিভিন্ন আলোচনা শুরু হলে আরেকটি পাল্টা স্ট্যাটাস দেন তিনি। সেখানে মাহফুজ লেখেন, “যারা আগের পোস্টকে পর্যালোচনা হিসাবে পাঠ করেছেন, তাঁদের জন্য বলছি। আমাদের এখনকার কাজ হল- সকল নিপীড়নের বিরুদ্ধে, নিপীড়িতের পক্ষে থাকা। দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের মানবাধিকারের পক্ষে থাকা।
“হঠকারী, উগ্রবাদী এবং অন্তর্ঘাতমূলক রাজনীতিকে পরাস্ত করা। সংখ্যালঘু ও মাজারপন্থিদের উপর হামলার বিচার করার দাবি অব্যাহত রাখা। জুলাই গণহত্যার বিচারের দাবিকে প্রধান করে তোলা এবং বিচারের ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে থাকা। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে বর্তমান সরকারকে বাধ্য করা।
“বাংলার বহু ভাষা-সংস্কৃতিকে যাপন-উদযাপন করা এবং রিগ্রেসিভ-ডিফিটিস্ট কালচারাল লড়াইকে জায়গা না দেয়া। কালচারালি-ইন্টেলেকচুয়ালি যারা বিভিন্ন বর্গ থেকে জুলাইয়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদেরকে ঔন করা। লীগের ফ্যাসিস্টদের লক্ষ্যবস্তু এরাই।”
যে যার জায়গা থেকে সক্ষম, যতবেশি সম্ভব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন গড়ে তোলার কথাও বলেন তিনি। একইসঙ্গে জুলাইয়ের পক্ষের সব শক্তির মধ্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের একটি কমন স্পেইস/ল্যাঙ্গুয়েজ তৈরির আহ্বান করেন তিনি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
সংসদ সদস্য আমির হামজা বলেছেন, কুষ্টিয়ার লালন সাঁইয়ের মাজারে সংস্কৃতির নামে অনৈতিক কাজ চলে। সেখানে সংস্কৃতির নামে যেসব অনৈতিক কাজ ও মাদকের কারবার চলে, সেগুলো বন্ধে সংস্কৃতিমন্ত্রীর কোনো পদক্ষেপ আছে কিনা, জাতীয় সংসদে তা জানতে চেয়েছেন তিনি। বুধবার (১০ জুন) জাতীয় সংসদে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর কাছে এ প্রশ্ন রাখেন কুষ্টিয়া-৩ আসনের এই সংসদ সদস্য। আমির হামজা বলেন, কুষ্টিয়ার লালন সাঁইয়ের মাজার এলাকাকে মাদকদ্রব্যমুক্ত করার জন্য কোনো উদ্যোগ আছে কিনা, তা জানা প্রয়োজন। কারণ, প্রশাসনের পাহারায় লালন সাঁইয়ের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তিন দিন করে মোট ছয়দিনের অনুষ্ঠান হয়। আমির হামজার এই প্রশ্নের জবাবে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, শুধু কুষ্টিয়ার লালন সাঁইয়ের স্মৃতিবিজড়িত মাজার এলাকাতেই নয়, বরং পুরো দেশকেই মাদকমুক্ত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সারা বাংলাদেশকে মাদকমুক্ত করতে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে এবং এর জন্য বড় ধরনের কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। মাদক নির্মূলের বিষয়টিকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করে মন্ত্রী আরও বলেন, সমাজে যখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পায়, তখনই কেবল সমাজকে পুরোপুরি মাদকমুক্ত করা সম্ভব হয়। তিনি আরও দাবি করেন, বিগত ১৮ বছর দেশে যে ঘন অন্ধকার যুগ চলেছে, সেই সময়েই মাদক দেশজুড়ে ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছিল। এমনকি তৎকালীন অনেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক নেতাও এই মাদক ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। বিগত সরকার দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সবকিছু ধ্বংস করে দিয়ে সমাজকে একটি অন্ধকার যুগে ঠেলে দিয়েছিল। তবে, সেই অন্ধকার পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে বর্তমান সরকার একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার জোরালো উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বিগত আমলের অবসান ঘটিয়ে বর্তমান সরকার দেশে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার নবজাগরণ আনতে চায়। সারা দেশের তরুণ সমাজকে সেই অন্ধকার যুগ থেকে বের করে আনা হবে। অর্থনৈতিক উন্নতির মাধ্যমে সামগ্রিক সমাজকে পরিবর্তন করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
গ্রীষ্মকাল মানেই রসালো আমের মৌসুম। পাকা আমের মিষ্টি স্বাদ ও সুবাসে মুগ্ধ হন ছোট-বড় সবাই। তবে অনেকেই আম কাটার আগে কিছু সময় পানিতে ভিজিয়ে রাখার পরামর্শ দেন। এটি শুধু একটি প্রচলিত অভ্যাস নয়, এর পেছনে রয়েছে কিছু যৌক্তিক কারণও। গাছের আঠার প্রভাব কমাতে আম পাড়ার পর এর খোসার গায়ে অনেক সময় আঠা বা ল্যাটেক্স জাতীয় পদার্থ লেগে থাকে। এই আঠা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মুখে, ঠোঁটে বা ত্বকে অস্বস্তি, চুলকানি কিংবা অ্যালার্জির কারণ হতে পারে। কিছুক্ষণ পানিতে ভিজিয়ে রাখলে এসব আঠার প্রভাব অনেকটাই কমে যায়। ময়লা ও রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ দূর করতে বাজার থেকে কেনা আমের গায়ে ধুলাবালি, ময়লা বা বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থের অবশিষ্টাংশ থাকতে পারে। পানিতে ভিজিয়ে রাখলে এসব উপাদান কিছুটা আলগা হয়ে যায় এবং পরে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে সুবিধা হয়। ফলকে আরও সতেজ রাখতে গরম আবহাওয়ায় আম অনেক সময় অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। কিছুক্ষণ ঠাণ্ডা পানিতে ভিজিয়ে রাখলে ফলটি কিছুটা শীতল হয়, ফলে খেতেও বেশ আরাম লাগে। কতক্ষণ ভিজিয়ে রাখবেন সাধারণত ২০ থেকে ৩০ মিনিট পানিতে ভিজিয়ে রাখাই যথেষ্ট। এরপর পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে আম কেটে পরিবেশন করতে পারেন।
নির্বাচনে জয়ী হলে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের নিয়ে ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি। তবে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠন করলেও সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন খুব সীমিত। সরকারে জায়গা পেয়েছেন মাত্র তিনটি শরিক দলের তিনজন নেতা। এতে শরিকদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাঁরা বলছেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে এটা তো বিএনপি সরকার। তখন ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ সরকার। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে। ২০২২ সালে ২৮ মার্চ, লন্ডনে সেখানে স্বাধীনতা দিবসের এক আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি প্রথম ঘোষণা দেন, সরকারবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত দলগুলোকে নিয়ে একসঙ্গে আন্দোলন, একসঙ্গে নির্বাচন করবেন। নির্বাচনে জয়ী অথবা পরাজিত সবাইকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করবে বিএনপি। এরপর ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগপর্যন্ত বিএনপির নেতারা জাতীয় সরকারের কথা প্রায়ই বলতেন। নির্বাচনের ঠিক আগে, ৪ জানুয়ারি, সিলেটে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বিষয়টির উল্লেখ করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘বিএনপি জনমতের ওপর বিশ্বাসী। নির্বাচনে জয়লাভ করলে আমরা একা সরকার গঠন করব না; বরং যারা দীর্ঘ সময় আমাদের সঙ্গে রাজপথে যুগপৎ আন্দোলন করেছে, তাদের নিয়েই একটি জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। তবে এটি কোনো সর্বদলীয় সরকার হবে না।’ জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলের নেতাদের ১৫টি আসন ছেড়ে দিয়েছিল। এর মধ্যে মিত্র পাঁচটি দলকে ছাড়া হয়েছিল আটটি আসন, যারা তাদের দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে। মিত্র পাঁচটি দলের মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে (খেজুরগাছ) চারটি এবং গণসংহতি আন্দোলন (মাথাল), বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি (কোদাল), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি (গরুর গাড়ি) ও গণ অধিকার পরিষদকে (ট্রাক) একটি করে আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে জয়ী হন মাত্র তিনজন। তাঁরা হলেন গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বিজেপির আন্দালিভ রহমান পার্থ ও গণ অধিকার পরিষদের মো. নুরুল হক নূর। এ ছাড়া আরও পাঁচটি শরিক দলের প্রধানসহ সাতজন নেতা নিজস্ব দল ভেঙে দিয়ে কিংবা বিএনপিতে যোগ দিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হন। তাঁরা নিয়েছিলেন ধানের শীষ প্রতীক। তাঁরা হলেন বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ, গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (একাংশ) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব মুফতি রশীদ বিন ওয়াক্কাস। এর মধ্যে কেবল শাহাদাত হোসেন সেলিম ও ববি হাজ্জাজ জয়ী হন। নির্বাচনী ফলাফল দেখা যায়, শরিকদের ছেড়ে দেওয়া আসনে বিএনপি কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি। শরিক দলগুলোকে ছেড়ে দেওয়া ১৫টি আসনের মধ্যে মাত্র পাঁচটি আসনে জয় আসে। এই পাঁচ বিজয়ীর মধ্যে সরকারে ঠাঁই পান তিনজন। এর মধ্যে জোনায়েদ সাকি পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী, নুরুল হক প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও ববি হাজ্জাজ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। বাদ থাকেন শাহাদাত হোসেন সেলিম ও আন্দালিভ রহমান পার্থ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাদ পড়া দুজনেই বিএনপির সঙ্গে বহু বছর ধরে আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে শাহাদাত হোসেন সেলিম বিগত যুগপৎ আন্দোলন ছাড়াও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংস্কারের আলোচনায় বিএনপির পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের যাত্রা শুরু হয় ১৭ ফেব্রুয়ারি। ৫ জুন সরকারের ১০৯ দিন অতিবাহিত হয়। নির্বাচনের আগের প্রতিশ্রুত ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের বিষয়ে কথা হয় যুগপৎ আন্দোলনের একাধিক শরিক নেতার সঙ্গে। ‘কোকাকোলা ভোটের আগে ফস করে’ যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপির অন্যতম শরিক জোটের একটি হচ্ছে গণতন্ত্র মঞ্চ। সে জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না, তাঁর দল নাগরিক ঐক্য। বিএনপি তাঁকে প্রার্থী করেনি। এ নিয়ে নির্বাচনের আগমুহূর্তে কিছুটা তিক্ততাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরে কোনো পক্ষই বিষয়টি নিয়ে আগ বাড়ায়নি। এখনো বিএনপির সঙ্গে মাহমুদুর রহমান মান্নার সম্পর্ক অনেকটা সে অবস্থাতেই রয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। আন্দোলনের সময় বিএনপির ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে মাহমুদুর রহমান মান্না শ্লেষ প্রকাশ করেই প্রথম আলোকে বলেন, ‘কথায় আছে না, কোকাকোলা ভোটের আগে ফস করে, ভোটের পরে করে না।’ ভোটের পরে বিএনপি যে জাতীয় সরকারের ধারণা থেকে সরে গেছে, সেটির উল্লেখ করে মান্না বলেন, ‘বিএনপি যা বলেছিল, সেটা তারা করেনি। বলতে পারেন, দুজনকে (মন্ত্রী) তো করা হয়েছে। কিন্তু এটা যে জোটের সরকার, সেটা তো বিএনপিও বলছে না। আমি বলব, যেটা হয়েছে সেটা বিএনপি সরকার। আর অন্য দল থেকে যে এক-দুজনকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে, এটা আমাদের দেশে একটা সিস্টেম হয়ে গেছে।’ ‘রেইনবো সরকার না হলে রেইনবো নেশন কীভাবে হবে’ নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসনে বিএনপির সমর্থন পেয়েছিলেন গণতন্ত্র মঞ্চের আরেক শীর্ষ নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি দলের ‘কোদাল’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জামায়াতের প্রার্থীর কাছে বড় ব্যবধানে হেরে এখন কিছুটা নিষ্প্রভ। বিএনপির জাতীয় সরকারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে সাইফুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপির নেতারাই তো জাতীয় সরকারের কথা বলে আসছিলেন ২০২২ সাল থেকে। শরিক দলের কেউ কিন্তু বলেনি। বিএনপিই তার নির্বাচনী অঙ্গীকারে ‘রেইনবো নেশন’ গঠনের কথা বলেছে। রেইনবো সরকার না হলে রেইনবো নেশন কীভাবে হবে? এখন তো জাতীয় সরকারের কোনো আলোচনাই নেই। কেউ কেউ মনে করতে পারে, সরকারে দুই শরিক দল তো আছে। কিন্তু এর কি কোনো বহিঃপ্রকাশ আছে?’ ‘আস্থা রাখছি, প্রধানমন্ত্রী আমাদের কাজে লাগাবেন’ গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নিজের দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করে জয়ী হন। কিন্তু তাঁর দলের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রাশেদ খান বিএনপিতে যোগ দিয়ে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ঝিনাইদহ-৪ আসনে নির্বাচন করেন। তিনি ৫৬ হাজার ২২৪ ভোট পেয়ে তাঁর আসনে তৃতীয় স্থানে ছিলেন। সেখানে জামায়াতের আবু তালিব ১ লাখ ৫৯ হাজার ৯৯ ভোট পেয়ে ১ লাখ ২ হাজার ৮৭৫ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। বিএনপির বিদ্রোহী সাইফুল ইসলাম ফিরোজ ৭৭ হাজার ১০৪ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন। রাশেদ খান প্রথম আলোকে জানান, ৩ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে এবং দীর্ঘ সময় বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের কথা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি আস্থা রাখছি, আমরা যারা বিএনপিতে যোগ দিয়েছি, প্রধানমন্ত্রী তাদের যথাযথভাবে কাজে লাগাবেন।’ জাতীয় সরকারের আশা এখনো ছাড়ছেন না রাশেদ খান। তিনি বলেন, ‘জাতীয় সরকার গঠন করাসহ রাষ্ট্রকাঠামোর ৩১ দফা সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি বিএনপির ছিল, সেটি প্রধানমন্ত্রী ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করবেন বলে আমার মনে হয়েছে।’ ‘বিএনপি ভুগবে’ গত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ধর্মভিত্তিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে চারটি আসন ছাড় দিয়েছিল। শরিক দলগুলোর মধ্যে তাদেরই সবচেয়ে বেশি আসন ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে দলটির সভাপতি-মহাসচিবসহ কোনো প্রার্থীই জয়ী হননি। এসব আসনে বিএনপি প্রার্থী দেয়নি। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, এই চার আসনের একটি গেছে খেলাফত মজলিসের দখলে, একটি বিএনপির বিদ্রোহীর দখলে, একটি জামায়াতে ইসলামীর দখলে এবং একটি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দখলে। জমিয়তের সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক সিলেট-৫ আসনে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী আবুল হাসানের কাছে হেরে যান। উবায়দুল্লাহ ফারুক ৬৯ হাজার ৭৭৪ ভোট পান। আর বিজয়ী আবুল হাসান পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৩৫৫ ভোট। সেখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল। ভোটের পর এ নিয়ে জমিয়তের নেতাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ৪ জুন নির্বাচনী এলাকা সিলেটের কানাইঘাটে দলীয় এক অনুষ্ঠানে জমিয়তের সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুকের বক্তব্যে এর প্রকাশ ঘটে। দীর্ঘ বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘বিএনপি আমার সঙ্গে যে আচরণ করছে, এর ভোগান্তি বিএনপি ভুগবে।’ উবায়দুল্লাহ ফারুক দাবি করেন, জমিয়তের কারণে জামায়াতে ইসলামীর ‘কোমর ভেঙে পড়েছে’ বা ক্ষমতায় যাওয়া ঠেকানো গেছে। এই ভূমিকার মধ্য দিয়ে তিনি দেশ বাঁচিয়েছেন, কওমি মাদ্রাসা বাঁচিয়েছেন এবং আজাদির সঙ্গে বিচরণ করার পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। উবায়দুল্লাহ ফারুকের ওই বক্তব্যের কিছু অংশ ইতিমধ্যে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে এর পক্ষে–বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। সব মিলিয়ে নির্বাচনের আগে দেওয়া ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রতিশ্রুতি ও নির্বাচনের পর বাস্তব চিত্রের মধ্যে একটি স্পষ্ট ফারাক দেখা যাচ্ছে। এতে শরিক দলগুলোর অংশগ্রহণ, জোট রাজনীতির ভবিষ্যৎ এবং বিএনপির রাজনৈতিক কৌশল—সবকিছু নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। শরিক দলের নেতাদের বড় একটি অংশ মনে করছে, নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয় বিএনপিকে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের জায়গায় ঠেলে দিচ্ছে। যে কারণে দুঃসময়ের রাজনৈতিক মিত্রদের সঙ্গে বিএনপির কোনো যোগাযোগ-সম্পর্ক নেই। এটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। শরিকরা হতাশ হলেও জাতীয় সরকার নিয়ে প্রতিশ্রুতিও পূরণের আশা দিচ্ছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্প উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। চিকিৎসার জন্য চীনে অবস্থানরত রুহুল কবির রিজভী আজ সোমবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিশ্চয়ই বিএনপির নির্বাচন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জাতীয় সরকারের বিষয়ে যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তাও পূরণ করবে। এর আলামত দেখা যাচ্ছে, কারণ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনী বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। এটাও নিশ্চয়ই করবেন।’