এশিয়ার বাজারে তেলের দাম আরও বেড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে দামের ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে।
শুক্রবার (৮ মে) বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের ‘উসকানিহীন’ হামলা প্রতিহত করা হয়েছে। এসব হামলার মধ্যে ছিল ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছোট নৌযানের ব্যবহার। মার্কিন নৌজাহাজগুলো উপসাগর ছেড়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় আত্মরক্ষার্থে পাল্টা হামলাও চালানো হয়েছে।
সকালবেলার লেনদেনে বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ১০১ দশমিক ৬০ ডলারে পৌঁছেছে। যদিও সেশনের শুরুতে দাম ২ শতাংশেরও বেশি বেড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে লেনদেন হওয়া অপরিশোধিত তেলের দামও ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৯৫ দশমিক ৮৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি এখনো বহাল রয়েছে। শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে গত ২১ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি।
হামলার পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা এখনো চলছে এবং ওয়াশিংটনের দাবি আগের মতোই রয়েছে। তেহরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না।
তিনি বলেন, আলোচনা খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে। তবে তাদের বুঝতে হবে, যদি চুক্তি না হয়, তাহলে তাদের অনেক ভোগান্তির মুখে পড়তে হবে। আমার বিশ্বাস, তারা এই চুক্তি আমার চেয়েও বেশি চায়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
দেশের ব্যাংকিং খাতে গত কয়েক বছরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রতিষ্ঠানের নামগুলোর মধ্যে অন্যতম ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। ব্যাংকটিতে বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের মালিকানা আবারো ফিরে দেওয়ার চেষ্টাকে কেন্দ্র করে হঠাৎ তারল্য সংকট, আমানত উত্তোলনের চাপ এবং নানা বিতর্কের মধ্য দিয়ে কঠিন সময় পার করা ব্যাংকটি এখন আবার গ্রাহকদের আস্থা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে। এমন প্রেক্ষাপটে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি কৃতজ্ঞতা বার্তা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রবিবার (২১ জুন) ইসলামী ব্যাংক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ব্যাংকটির প্রতি অগণিত গ্রাহকের অবিচল আস্থা ও সমর্থনের জন্য তারা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। ব্যাংকটির ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গ্রাহকরা দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী ব্যাংকের প্রতি যে বিশ্বাস ও আস্থা প্রদর্শন করে আসছেন, সেটিই প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় শক্তি। ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, কোনো ব্যাংকের জন্য মূলধন, শাখা নেটওয়ার্ক কিংবা প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গ্রাহকের আস্থা। কারণ ব্যাংকিং ব্যবসার ভিত্তিই গড়ে ওঠে আমানতকারীদের বিশ্বাসের ওপর। আর সেই বিবেচনায় ইসলামী ব্যাংকের এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কেবল আনুষ্ঠানিক বার্তা নয়; বরং এটি গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এদিকে মূল মালিকদের নিকট ইসলামী ব্যাংক ফিরিয়ে দেওয়াসহ ৭ দফা দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম। আস্থাই ইসলামী ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে ইসলামী ব্যাংকের অবস্থান বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। দেশের প্রথম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘ সময়ে ব্যাংকটি দেশের বৃহত্তম আমানতভিত্তিক ব্যাংকগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাংকটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। বিশেষ করে তারল্য সংকটের খবর প্রকাশের পর অনেক গ্রাহক একযোগে টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করেন। ফলে ব্যাংকটির ওপর চাপ আরও বাড়ে। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতেও বিপুল সংখ্যক গ্রাহক ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখেন, যা এখন ইসলামী ব্যাংকের পুনরুদ্ধারের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। ব্যাংকটির কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রাহকদের এই আস্থা এবং সমর্থনই তাদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জুগিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন সহায়তা এবং নতুন ব্যবস্থাপনার উদ্যোগও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ভূমিকা রাখছে। স্বাভাবিক হচ্ছে লেনদেন ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসলামী ব্যাংকের শাখাগুলোতে লেনদেনের পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে। গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক কমেছে এবং নতুন আমানতও ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যাংকের সংকট কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সূচক হলো আমানতকারীদের আচরণ। যদি গ্রাহকরা টাকা তুলে নেওয়ার পরিবর্তে ব্যাংকে জমা রাখতে আগ্রহী হন, তাহলে সেটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা বৃদ্ধিরই প্রতিফলন। কেন এই বার্তা গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকিং খাতে আস্থা সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে। বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব দেখা দেয়। তাই একটি বড় ব্যাংকের পক্ষ থেকে গ্রাহকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং আস্থা পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের জন্যও ইতিবাচক বার্তা বহন করে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকের মতো বৃহৎ গ্রাহকভিত্তিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যাংকটির সঙ্গে দেশের লাখো পরিবার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং প্রবাসীদের আর্থিক সম্পর্ক রয়েছে। সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধুমাত্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেই আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসবে না। এজন্য প্রয়োজন সুশাসন নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনা, করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করা এবং গ্রাহকসেবার মান আরও উন্নত করা। তাদের মতে, ইসলামী ব্যাংক যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের মূল নীতিগুলো কঠোরভাবে অনুসরণ করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে আবারও দেশের ব্যাংকিং খাতে নেতৃত্বের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে সক্ষম হবে। গ্রাহকদের উদ্দেশে কৃতজ্ঞতার বার্তা ইসলামী ব্যাংক বলছে, গ্রাহকদের ভালোবাসা, আস্থা ও সহযোগিতা তাদের চলার পথকে আরও শক্তিশালী করেছে। ব্যাংকটি ভবিষ্যতেও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন এবং উন্নত গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করতে চায়। ব্যাংকিং খাতের বর্তমান বাস্তবতায় ইসলামী ব্যাংকের এই বার্তা কেবল একটি ধন্যবাদ জ্ঞাপন নয়; বরং এটি একটি বড় সংকটের পর পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়ে যাওয়ার ঘোষণা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, গ্রাহকদের এই আস্থাকে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়ে ব্যাংকটি দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির নতুন অধ্যায় রচনা করতে পারে।
বাংলাদেশের শেয়ারবাজার যেন দীর্ঘদিন ধরে এক অদৃশ্য সংকটের মধ্যে আটকে আছে। রাজনৈতিক সরকার বদলেছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে এসেছে নতুন মুখ, বাজেটে ঘোষণা করা হয়েছে নানা প্রণোদনা ও সংস্কার কর্মসূচি। কিন্তু তারপরও পুঁজিবাজারে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরছে না। সূচক স্থবির, লেনদেন কম, নতুন বিনিয়োগকারীর আগ্রহ নেই, আর পুরোনো বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ এখনো আস্থাহীন। একসময় ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতের অনিয়ম, শেয়ারবাজার কারসাজি এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্যের কারণে বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। তাই সরকার পরিবর্তন হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে সংকট আরও গভীর হয়েছে। এখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—কেন শেয়ারবাজার চাঙ্গা হচ্ছে না? ১৬ বছরে হারিয়েছে ১৭ লাখ বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারের সংকট বোঝার সবচেয়ে বড় সূচক হলো বিনিয়োগকারীর সংখ্যা। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে বিও হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৪ লাখ। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ লাখে। অর্থাৎ গত ১৬ বছরে প্রায় ১৭ লাখ বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়ে গেছেন। একই সময়ে বাজার মূলধন, লেনদেন ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামার ফল নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি আস্থাহীনতার প্রতিফলন। আস্থার সংকটই সবচেয়ে বড় সমস্যা পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বাজারের সবচেয়ে বড় সংকট তারল্যের অভাব নয়, আস্থার অভাব। ২০১০ সালের ধসের পর একাধিকবার বাজার পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে টাস্কফোর্স, তদন্ত কমিটি, নীতিগত সহায়তা এবং বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তি না হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ মনে করেন, বাজার এখনো পুরোপুরি নিরাপদ হয়নি। বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত পরিষদের সভাপতি আ ন ম আতাউল্লাহ নাঈমের ভাষায়, শেয়ার কেলেঙ্কারির বিচার না হওয়াই আস্থাহীনতার অন্যতম কারণ। বাজারে বারবার কারসাজির অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি। নতুন কোম্পানি নেই, বাজারে নেই গভীরতা বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো মানসম্মত নতুন কোম্পানির অভাব। গত দুই বছরে কার্যত কোনও উল্লেখযোগ্য নতুন কোম্পানি বাজারে আসেনি। ২০২৫ সালে একটি নতুন আইপিওও অনুমোদিত হয়নি। অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি পুঁজিবাজার তখনই শক্তিশালী হয় যখন সেখানে নিয়মিত নতুন ও বড় কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বড় শিল্পগোষ্ঠী, বহুজাতিক কোম্পানি কিংবা লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই এখনো বাজারের বাইরে। ফলে একই সীমিত সংখ্যক শেয়ারকে ঘিরেই লেনদেন আবর্তিত হচ্ছে। এতে বাজারে গভীরতা তৈরি হচ্ছে না এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও কারসাজির সুযোগ বাড়ছে। ৬২ কোম্পানির সতর্ক তালিকা বাজারে নতুন উদ্বেগ সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ৬২টি কোম্পানি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছে। এর মধ্যে ৩২টি কোম্পানির কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ এবং ৩০টি কোম্পানি আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘গোয়িং কনসার্ন থ্রেট’-এর মুখে রয়েছে। এরও আগে ডিএসই ৪২টি কোম্পানিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে তালিকা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু তালিকায় কিছু নিয়মিত লভ্যাংশ দেওয়া ও কার্যক্রম চালু থাকা কোম্পানির নামও থাকায় বাজারে বিতর্ক তৈরি হয়। বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে যখন একের পর এক ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির তালিকা প্রকাশিত হয়, তখন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়ে। ফলে নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে অনেকেই বাজার থেকে দূরে সরে যান। ব্যাংকের বিকল্প হতে পারেনি পুঁজিবাজার বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলোতে শিল্পায়নের বড় অংশের অর্থায়ন হয় পুঁজিবাজারের মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো শিল্প খাত মূলত ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ব্যাংকনির্ভরতা কমাতে হলে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, উদ্যোক্তাদের বড় অংশ এখনো পুঁজিবাজারকে মূলধন সংগ্রহের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে দেখছেন না। নীতিমালার ঘনঘন পরিবর্তন, তালিকাভুক্তির জটিলতা এবং বাজারের অস্থিরতা তাদের নিরুৎসাহিত করছে। বাজেটের ঘোষণা কি যথেষ্ট? চলতি বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য একগুচ্ছ সংস্কার উদ্যোগ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— সমন্বিত ডিজিটাল তথ্য প্ল্যাটফর্ম; টি+০ সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা; বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ দ্রুত প্রত্যাবাসনের সুযোগ; বন্ড ও সুকুক বাজার সম্প্রসারণ; পৌর বন্ড চালু; দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো অর্থায়নে নতুন উপকরণ ব্যবহার। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু নীতিগত ঘোষণা দিয়ে আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়। কারণ বাজারের সমস্যা এখন কেবল প্রযুক্তিগত নয়; এটি মূলত বিশ্বাসের সংকট। বিনিয়োগকারীরা দেখতে চান ঘোষণাগুলোর বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না এবং কারসাজিকারীরা সত্যিই শাস্তি পাচ্ছে কি না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সামনে কঠিন পরীক্ষা সম্প্রতি বিএসইসির নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান দায়িত্ব নেওয়ার পর রিয়েল-টাইম নজরদারি, কারসাজির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা এবং দুর্বল কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর তদারকির ঘোষণা দিয়েছেন। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন কমিশনের জন্য এটি বড় পরীক্ষা। কারণ অতীতেও অনেকবার সংস্কারের ঘোষণা এসেছে। কিন্তু বাস্তব ফলাফল খুব বেশি দেখা যায়নি। এবার বিনিয়োগকারীরা কথার চেয়ে কাজ দেখতে চান। কী করলে ঘুরে দাঁড়াবে বাজার? বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করতে কয়েকটি মৌলিক পদক্ষেপ জরুরি— শেয়ার কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান শাস্তি; বড় ও লাভজনক কোম্পানিকে বাজারে আনা; রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠানের আইপিও; নীতিমালার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা; দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বৃদ্ধি; পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল; গুজব ও কারসাজি শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু। সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেয়ারবাজারের সংকট একদিনে তৈরি হয়নি, তাই একদিনে সমাধানও হবে না। সরকার পরিবর্তন, নতুন কমিশন কিংবা বাজেট ঘোষণার চেয়েও বড় বিষয় হলো—বিনিয়োগকারীরা বাজারকে কতটা বিশ্বাস করছেন। যতদিন পর্যন্ত সাধারণ বিনিয়োগকারী মনে করবেন যে বাজারে কারসাজি করে পার পাওয়া যায়, দুর্বল কোম্পানি তালিকাভুক্ত থেকে যাচ্ছে এবং নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা নেই, ততদিন পর্যন্ত শেয়ারবাজারে স্থায়ী গতি ফিরবে না। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার অপরিহার্য। তাই শেয়ারবাজারকে চাঙ্গা করা শুধু বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর সেই কারণেই পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরানো এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
দেশের রপ্তানি আয় বাড়ানোর জন্য এর বিপরীতে সরকার যে প্রণোদনা দিয়ে থাকে তাতে উৎসে কর কমানো হলেও এখন সাড়ে ২৭ শতাংশ করের ঝুঁকির মুখে পড়েছেন রপ্তানিকারকরা। নতুন অর্থবছরের বাজেটে আয়কর আইনে ন্যূনতম করের বিধান থেকে বেরিয়ে আসার প্রস্তাব আসায় এ ধরনের করের বোঝা চাপার ঝুঁকিতে পড়েছেন তারা। গেল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থবিল ২০২৬ এ আয়কর আইনের ১৬৩ ধারায় সংশোধনী আনার প্রস্তাব করা হয়েছে, এটি গৃহীত হলে ন্যূনতম করের ধারাটি উঠে যাবে। এর ফলে সঞ্চয়পত্র থেকে শুরু করে রপ্তানি পণ্যের প্রণোদনা পর্যন্ত সব আয়ই, মোট আয় হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয় ও প্রথম করের ধাপ ১০ শতাংশ হওয়ায় সীমিত আয়ের মানুষ কিছুটা সুফল পাবেন, কিন্তু রপ্তানি প্রণোদনায় এমন কোনো করহার বা ধাপ না থাকায় পুরো আয়ের ওপরই রপ্তানিকারককে সাড়ে ২৭ শতাংশ কর দিতে হবে। বর্তমানে রপ্তানি খাতের প্রণোদনায় উৎসে কর একজন করদাতার ন্যূনতম কর হিসেবে চূড়ান্ত কর বা করদায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আইন অনুযায়ী, রপ্তানি প্রণোদনার বিপরীতে ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রাখার বিধান রয়েছে; এটি কাটার পর করদাতাকে এর জন্য আর কর দিতে হতো না। এটিই আইনের ভাষায় ন্যূনতম কর হিসেবে চূড়ান্ত কর বা করদায়। আগামী করবর্ষের জন্য উৎসে কর নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ শতাংশ। অর্ধেক কমে যাওয়ার বিষয়টি দৃশ্যমান হলেও আয়করের নতুন বিধান অনুযায়ী উৎসে কর অগ্রিম আয়কর হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ রপ্তানিকারকের প্রণোদনা আয়ের ওপর যে পরিমাণ কর প্রযোজ্য তার থেকে ৫ শতাংশ বাদ দেওয়ার পরে বাকি কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে যাচ্ছে। আয়কর আইন অনুযায়ী, এটি রপ্তানি আয় নয় বরং রপ্তানির জন্য প্রাপ্ত প্রণোদনা থেকে আসা আয়; যেখানে সাধারণ আয়ের হিসাবে সাড়ে ২৭ শতাংশ করপোরেট করহার প্রযোজ্য হয়ে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বর্তমানে একজন রপ্তানিকারক রপ্তানি আয়ের বিপরীতে এক কোটি টাকা প্রণোদনা পেলে সেখানে ১০ লাখ টাকা উৎসে কর ছিল, অর্থাৎ ১০ শতাংশ কর প্রযোজ্য। এটিই তার ন্যূনতম কর। নতুন বিধান হলে, এক কোটি টাকার রপ্তানি প্রণোদনার বিপরীতে উৎসে কেটে রাখ ৫ লাখ টাকা হবে অগ্রিম আয়কর; বাকি সাড়ে ২২ লাখ টাকা দিতে হবে বাড়তি কর। অর্থাৎ তার ওপর সাড়ে ২৭ শতাংশ করভার পড়ল। এ বিষয়ে এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস এর পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, “দেখুন, এমনিতেই গার্মেন্টসের অবস্থা খারাপ। অনেকদিন টানা কমে যাচ্ছে রপ্তানি। এরমধ্যে রপ্তানিকারকদের এই মুহূর্তে দাবি ছিল উৎসে করটা কমিয়ে দেওয়া। তো উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ করা হয়েছে, এটা ঠিক আছে। কিন্তু দিনশেষে আপনি যখন চূড়ান্ত কর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, এটাকে ‘স্ট্যান্ডার্ড রেটে’ নিয়ে আসবেন, তখন তাদের ওপরও বোঝাটা থাকবেই। অর্থাৎ আপনি রপ্তানির জন্য একটা প্রণোদনা পাচ্ছেন, তার ওপরে এখন সাড়ে ২৭ শতাংশ কর দিতে হবে। সাড়ে ২৭ শতাংশ কেন কর হবে, এ প্রশ্নে কর নীতির এই বিশ্লেষক বলেন, “রপ্তানিকারকদের খাত হিসেবে বলা হয়েছে তাদের রপ্তানি আয়ের ওপরে ১০ শতাংশ বা ১২ শতাংশ করপোরেট কর। যেহেতু সেটা রপ্তানি আয়। কিন্তু এটা তো আসলে রপ্তানি আয় না। এটা কর প্রণোদনা। আয়কর আইন অনুযায়ী এটার ওপর ‘স্ট্যান্ডার্ট রেটে’ কর হবে। সুতরাং এটার প্রভাব কিন্তু অনেক। প্রভাব অনেক বেশি হয়ে যাবে। ন্যূনতম করের ‘রেজিম’ থেকে বেরিয়ে আসার দাবি থাকলেও কোনো খাত বা ব্যক্তিকে এর থেকে বের করে আনার আগে ফল কী হবে তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করেন স্নেহাশীষ বড়ুয়া। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এটা উচিত ছিল- এটার ‘ইমপেক্ট স্টাডি’ করা। ওই শিল্পের লোকজনের সাথে আলোচনা করা যে এটা তাদের শিল্পকে কী পরিমাণ ‘এফেক্ট’ করবে। একই সঙ্গে এ সিদ্ধান্ত চলতি অর্থবছরের আয়ের ওপর করায় রপ্তানিকারকদের ওপর ‘রেট্রোস্পেক্টিভ’ প্রভাব পড়বে বলেও তিনি তুলে ধরেন। এই বিশ্লেষক বলেন, যারা বছরান্তে হিসাব করে থাকে তারা ২০২৫ এর শেষেই তাদের প্রথম ছয়মাসের হিসাব-নিকাশ শেষ করে ফেলেছে; আর যারা জুনে তাদের ব্যবসার হিসাব করে, তাদের হাতে রয়েছে আর মাত্র পনের দিন। এ সময় সরকারের এ সিদ্ধান্ত তাদের ওপর নেতিবাচক চাপ তৈরি করবে।