প্রায় ২২ লাখ কোটি টাকার সরকারি ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে যাত্রা শুরু হলো নতুন সরকারের। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা তিন লাখ কোটি টাকা। গত দেড় বছরে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদের শপথ নেওয়ার পর বিশাল অঙ্কের ঋণের দায়ভার সরকারের ওপর চলে এসেছে। বিপুল অঙ্কের মধ্যে অভ্যন্তরীণ (ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র ও কর্মচারীদের ফান্ড) ঋণ প্রায় ১২ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। তবে ঋণের হিসাবটি খসড়া। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঋণ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য এ ঋণের অঙ্ক বের করা হয়েছে। প্রকৃত ঋণের অঙ্ক কমবেশি হতে পারে। নতুন সরকার কত ঋণ নিয়ে যাত্রা শুরু করছে তার প্রকৃত হিসাবের কাজ শুরু করেছে অর্থ বিভাগ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক, ইআরডিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে ঋণ তথ্য চেয়েছে অর্থ বিভাগ থেকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। ফলে বড় অঙ্কের ঋণের অর্থনীতিতে কঠিন চাপ সৃষ্টি করছে। কারণ ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধে বছরে ব্যয় হচ্ছে সোয়া লাখ কোটি টাকার ওপরে।
নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারী নোটে সদ্য বিদায়ি অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ঋণ প্রসঙ্গে কিছু কথা লিখে গেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি ঋণের ওপর বেশিমাত্রায় নির্ভর করতে হয়েছে। অর্থায়নের চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত অভ্যন্তরীণ সম্পদ তৈরি হচ্ছে না। ফলে সুদ ব্যয় মেটাতে জিডিপির ২ শতাংশের বেশি অর্থ চলে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার আগে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত দেশে পুঞ্জীভূত ঋণের অঙ্ক ছিল ১৮ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। আর গত জানুয়ারি পর্যন্ত ঋণের অঙ্ক বেড়ে প্রায় ২২ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার মতো ঋণ নিয়েছে।
এ পর্যন্ত পুঞ্জীভূত মোট ঋণের মধ্যে ব্যাংক খাতের ঋণের পাহাড় ৮ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া ৩ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে বিদেশি ঋণের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। গত ছয় মাসে শুধু বিদেশি ঋণ নেওয়া হয় ১০৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার, দেশীয় মুদ্রায় ১৩ হাজার ১০৩ কোটি টাকা।
ঋণ প্রসঙ্গে অর্থ বিভাগ সম্প্রতি এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, দেশি ও বিদেশি ঋণ নিয়ে ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা আছে। আগামীতে এর মাত্রা আরও বাড়তে পারে। কারণ এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) উত্তরণের পর বাংলাদেশকে উচ্চসুদে ও স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। পাশাপাশি মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূলায়ন বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ব্যয়কে উসকে দিয়েছে। এতে সামনের দিনগুলোতে মূলধনসহ ঋণের সুদ পরিশোধের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হবে এমন শঙ্কা ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। এছাড়া কম রাজস্ব আহরণ ও ঋণ পরিশোধে বেশি ব্যয় নিয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে সেটিও উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজস্ব আহরণ, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনার পরামর্শ দেওয়া হয়। না হলে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তেই থাকবে এমন পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে সেখানে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক সিনিয়র অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে জানান, জিডিপির অনুপাতে এ ঋণের হার বিশ্লেষণ করলে তা এখনো অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ঋণ মোকাবিলায় নতুন সরকারের আয় বাড়ানো বিরাট চ্যালেঞ্জ হবে। কিছু অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে হবে। সরকার ঋণ না নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যয় না মেটালে অর্থনীতি সম্প্রসারণ হবে না। প্রয়োজনে ঋণ নিতে হবে, তবে তা পরিশোধ করতে নিয়মিত আয় থাকতে হবে। সে আয় হচ্ছে রাজস্ব বৃদ্ধি। এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, নতুন ঋণ গ্রহণে একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, সেটি হচ্ছে ঋণটি যেন অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কাজে আসে।
এদিকে ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে চ্যালেঞ্জে পড়েছে অর্থ বিভাগ। এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে ব্যয় বেড়েছে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূলায়নের প্রভাবে। কারণ একই পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধ করতে এখন আরও বেশি টাকার প্রয়োজন হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টাকার মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, যা এ সমস্যাকে আরও তীব্র করে তুলছে।
ইআরডি’র সূত্রমতে, বর্তমান মোট বৈদেশিক ঋণের মধ্যে প্রায় ৫৩ শতাংশই নেওয়া হয়েছে মার্কিন ডলারে। অর্থাৎ ঋণের বড় একটি অংশ মার্কিন ডলারে সঞ্চিত আছে। এছাড়া ঋণের ২২ শতাংশ হচ্ছে জাপানিজ মুদ্রা ইয়েনে নেওয়া, চীনের ইউয়ানে আছে ৭ শতাংশ এবং বাকি ৪ শতাংশ অন্যান্য মুদ্রায়।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস (জুলাই-ডিসেম্বর) পর্যন্ত ঋণ ও সুদ পরিশোধ করা হয়েছে ২১৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের আসল পরিশোধে ব্যয় হয় ২৬১ কোটি মার্কিন ডলার। তবে ধারণা করা হচ্ছে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে এ ব্যয় দাঁড়াবে ৩৩৪ কোটি ডলারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ঋণনির্ভরশীলতা থেকে অর্থনীতিকে বের করার প্রতিশ্রুতি আছে। প্রথম একশ দিনের মধ্যে বড় কাজ হবে বাজেট প্রণয়ন। ঋণনির্ভরতা কমানোর অর্থ বাজেট ঘাটতি কমানো। ফলে বড় ধরনের ঘাটতি বাজেট এ প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নতুন বাজেটের ব্যয় বাড়বে। নতুন সরকার ইশতেহার অনুযায়ী প্রত্যাশা তৈরি করেছে। এর ১০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে গেলে ঋণনির্ভরতা বাড়বে। এজন্য আগ থেকে মানুষকে অবহিত করতে হবে ইশতেহার রাতারাতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হবে। এটি কেন্দ্রীয়ভাবে নয়, মাঠপর্যায়ে লোকজনকে বোঝাতে হবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
চলতি বছরের মে মাসের প্রথম ১৯ দিনে দেশে ২৪৮ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০ হাজার ৪৭৮ কোটি ৮২ লাখ ৫০ হাজার টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা হিসাবে)। বুধবার (২০ মে) বিকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (১৯ এপ্রিল) প্রবাসী আয় এসেছে এক হাজার ৯০২ কোটি ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। গত বছরের মে মাসের প্রথম ১৯ দিনে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৭৯ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার। সেই তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৩৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের (১ জুলাই থেকে ১৯ মে পর্যন্ত) সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ পর্যন্ত দেশে তিন হাজার ১৮১ কোটি ৬০ লাখ ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই আয়ের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৬৩৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ গত অর্থবছরের তুলনায় এ বছর একই সময়ে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৩৮ দশমিক ৫০ শতাংশ।
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে মসলার বাজার এখন জমজমাট। খুচরা দোকানি ও বনেদি পরিবারগুলো ভিড় করছেন খাতুনগঞ্জের পাইকারি মসলার বাজারে। চাহিদার চেয়ে জোগান বেশি থাকায় বাজারে মসলার দাম কমছে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিসংখ্যান বলছে, জিরার আমদানি হয়েছে দুই হাজার ৭৯৩ টন, লবঙ্গ এক হাজার ২৫৭ টন, এলাচ এক হাজার ৯৮ টন এবং জায়ফল আমদানি হয়েছে ৩৪৬ টন। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই প্রধান চারটি মসলার আমদানি কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ। কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন জানান, অন্যান্য বন্দর দিয়েও মসলা আসছে এবং সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। একদিকে সরকারি হিসাবে মসলা আমদানি কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ, অন্যদিকে ১৫ দিনের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে প্রায় সব ধরনের মসলার দাম কেজিতে ৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত কমে গেছে। ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের দাবি, এই ‘রহস্যময়’ দরপতনের নেপথ্যে রয়েছে সীমান্ত দিয়ে আসা বিপুল পরিমাণ অবৈধ পণ্য। এই অনুপ্রবেশের ফলে বৈধ আমদানিকারকরা এখন চরম সংকটে পড়েছেন। আমদানিকারক ব্যবসায়ী আবদুর রাজ্জাক জানান, সাধারণত কোরবানির আগে মসলার চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সেই সুযোগে অসাধু সিন্ডিকেট দাম বাড়ানোর চেষ্টা করে। পর্যাপ্ত জোগান থাকলেও সেই জোগান বৈধ পথের নয়। খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন আড়ত ঘুরে দেখা গেছে, গত পনেরদিনে মসলার দামের গ্রাফ শুধু নিচের দিকেই নেমেছে। মে মাসের শুরুতে যে এলাচ পাইকারি পর্যায়ে চার হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, চলতি সপ্তাহে তা ২০০ টাকা কমে তিন হাজার ৯০০ টাকায় নেমে এসেছে। শুধু এলাচই নয়, লবঙ্গের দামও কেজিতে ৫০ টাকা কমে এক হাজার ৩০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। একইভাবে জিরা বিক্রি হচ্ছে ৫৩০ টাকায় ও গোলমরিচ এক হাজার ১০ টাকায়। চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ শাহ আলম জানান, এলাচ ও জিরাসহ কিছু গরম মসলা চট্টগ্রাম বন্দরের বাইরে বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়েও আমদানি হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই’ ২৫ থেকে ১০ মে’ ২৬ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এলাচ ছাড়পত্র পেয়েছে ১ হাজার ১৫০ টন, দারুচিনি ১৩ হাজার ২৯৬ টন, লবঙ্গ ১ হাজার ৩৫০ টন, জিরা ৩ হাজার ১১৫ টন, জৈত্রিক ৩৫০ টন, জায়ফল ৩৩৬ টন, গোলমরিচ ১ হাজার ৯৫৯ টন, আদা ৪৫ হাজার ৫৩৮ টন ও রসুন ৫৩ হাজার ১০১ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এলাচ এসেছিল ১ হাজার ৮৪৬ টন, দারুচিনি ১৫ হাজার ৭৩৯ টন, গোলমরিচ ১ হাজার ৬৫৯ টন আমদানি হয়েছিল। খাতুনগঞ্জের গরম মসলা ব্যবসায়ী মো. বাদশা বলেন, ডিউটি দিয়ে জিরা আমদানি মূল্য হচ্ছে কেজি ৫৩০ টাকা, সেই জিরা কিছু পাইকার বিক্রি করছে কেজি ৫শ টাকা। আবার এলাচ ডিউটি দিয়ে এলে (আমদানি হলে) প্রতি কেজি মূল্য হচ্ছে ৪১০০-৪২০০ টাকা। যারা ভিন্ন পথে আনছে, তারা ওই এলাচ বিক্রি করছে কেজি ৪০০০-৪০৫০ টাকায়। প্রতি কেজি ২শ টাকা কমে বিক্রি করছে অনেকে। এতে নিয়মিত আমদানিকারকরা মার খাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এপ্রিল মাসের শেষের দিকের তুলনায় সব ধরনের মসলার দাম কমেছে। এলএমজি এলাচ ছিল ৩৯০০ টাকা, এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৭০০ টাকা। আগে লবঙ্গ ছিল ১৩০০ টাকা। এখন বিক্রি হচ্ছে ১২৬০ টাকা। একইভাবে ৪৪০ টাকার দারুচিনি বিক্রি হচ্ছে ৪২০ টাকায়।’ মাংসসহ বিভিন্ন রান্নার উপকরণ উপাদেয় করতে মরিচ, হলুদ ও ধনিয়ার মতো সাধারণ মসলার পাশাপাশি ব্যবহৃত চিকন জিরা, লবঙ্গ, এলাচ, দারুচিনি ও গোলমরিচসহ নানান মসলাকে গরম মসলা হিসেবে ধরা হয়। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় কোরবানিতে গরম মসলার চাহিদা থাকে বেশি। খাতুনগঞ্জের ইলিয়াছ মার্কেট ও জাফর মার্কেটের মসলা ব্যবসায়ীরা জানান, দেশে মোট চাহিদার গরম মসলার ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। চিকন জিরা, লবঙ্গ, এলাচ, দারুচিনি, গোলমরিচÑ এ পাঁচ ধরনের গরম মসলা বেশি ব্যবহৃত হয়। সিলেট, কুমিল্লা, ফেনী এলাকার সীমান্ত দিয়ে জিরা, এলাচ, কিশমিশ ও কাজুসহ সব ধরনের মসলা ঢুকছে দাবি করে আমদানিকারক ব্যবসায়ী আবদুর রাজ্জাক জানান, এতে খাতুনগঞ্জে মসলা বেচাকেনায় প্রভাব পড়ছে। বৈধ আমদানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। জিরা কেজিতে ২২০-২৫০ টাকা শুল্ক, এলাচে কেজি প্রতি ৫৫০-৬০০ টাকা শুল্ক হারাচ্ছে সরকার। এলাচের দাম বেশি হওয়া প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি অমর কান্তি দাশ বলেন, এলাচের ব্যবহার বহুমুখী। ওষুধ থেকে শুরু করে মাংস, চা, বিস্কুটসহ বিভিন্ন খাবারে এলাচের ব্যবহার বাড়ছে। মধ্যবিত্তের প্রিয় মসলা হচ্ছে জিরা। তিনি জানান, ছোট আকারের এলাচ ৩ হাজার ৭০০ টাকা, বড় আকারের এলাচ ৪ হাজার টাকা ও লবঙ্গ ১ হাজার ২৬০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা বিক্রি করছি আমরা।
মধুমাস জ্যৈষ্ঠের আগমনী বার্তার সাথে সাথে রাজশাহীর আম বাগানগুলো এখন পাকা আমের সুবাসে মুখরিত হওয়ার অপেক্ষায়। চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় আমের বাম্পার ফলন এবং রেকর্ড পরিমাণ বাণিজ্যের আশা করছে কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় আমচাষিরা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার জেলায় আম বিক্রি করে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার বিশাল অর্থনৈতিক লেনদেন হতে পারে বলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করছেন। রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, রাজশাহী জেলায় এ বছর মোট ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। এরমধ্যে পবা উপজেলায় ৯২৫ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। এ থেকে ১১ হাজার ৮৪০ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হবে। তানোর উপজেলায় আম চাষ হয়েছে ৫২১ হেক্টর জমিতে। আম উৎপাদন হবে ৬ হাজার ৬৬৯ মেট্রিক টন। মোহনপুর উপজেলার ৪২২ হেক্টর জমিতে ৫ হাজার ৪০১ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হবে। বাগমারা উপজেলায় ৫৭৫ হেক্টর থেকে ৭ হাজার ৩৬ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হবে। দুর্গাপুর উপজেলায় ৭১০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। যা থেকে ৯ হাজার ৮৮ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হবে। পুঠিয়া উপজেলায় ১৫৪৭ হেক্টর জমি থেকে ১৯ হাজার ৮০২ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হবে। গোদাগাড়ী উপজেলায় ১২২৭ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। আম উৎপাদন হবে ১৫ হাজার ৭০৫ মেট্রিক টন। চারঘাট উপজেলায় ৪৯০০ হেক্টর। যা থেকে ৬২ হাজার ৭২০ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হবে। বাঘা উপজেলায় ৮০৭০ জমিতে আম চাষ হয়েছে। এ থেকে ১ লাখ ৩ হাজার ২৯৬ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হবে। মতিহার থানায় ৯ হেক্টর। এই জমি থেকে ১১৫২ মেট্রিন আম উৎপাদন হবে এবং বোয়ালিয়া থানায় ৭৫ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। এখান ৯৬০ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হবে। এই আমবাগান থেকে মোট ২ লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৩ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই আম বিক্রি করে ৮০০ কোটি টাকা বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে। চলতি মৌসুমে রাজশাহীর বিখ্যাত গোপালভোগ, ল্যাংড়া, খিরসাপাত (হিমসাগর), ফজলি, আম্রপালি ও আশ্বিনাসহ ১৯টি জাতের চাষ হয়েছে। বিশেষ করে জেলার বাঘা, চারঘাট ও পুঠিয়া এলাকার কয়েকজন আমচাষির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কিছুদিন আগের তীব্র তাপদাহের পর সাম্প্রতিক হালকা বৃষ্টি আমের গুটি শক্ত হতে এবং দ্রুত বড় হতে দারুণ সাহায্য করেছে। চাষিরা এখন শেষ মুহূর্তের পরিচর্যা ও বাগান পাহারায় দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন। যদিও ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী গত ১৫ থেকে গুটি আম দিয়ে আম পাড়া শুরু হয়েছে। গুটি ছাড়া অন্য আম বাজারে দেখা যাচ্ছে না। পবা উপজেলার রহিম নামে এক আমচাষি বলেন, এবার প্রথমের দিকে রোদ থাকায় কিছুটা আম ঝরে গেছে। তারপরও যে পরিমাণ আম আছে, তা যদি ঠিকঠাকভাবে বেচাকেনা করা যায় তাহলে লাভের মুখ দেখবো। তানোর উপজেলার আমচাষি সাইমুম বলেন, এ অঞ্চলের আম খুব সুস্বাধু। আশা করছি এবার আমের ব্যবসা ভালো হবে। সবাই লাভবান হবে। রাজশাহীর অর্থনীতি মূলত আমকেন্দ্রিক। প্রতি বছর মে থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত আমকে কেন্দ্র করে পুরো জেলায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। শুধু আম কেনাবেচায় নয়, এর সঙ্গে জড়িত প্লাস্টিক ক্যারেট ও বাঁশের ঝুড়ি তৈরি, কুরিয়ার সার্ভিস, পরিবহন খাত এবং হাজার হাজার দিনমজুরের কর্মসংস্থান মিলিয়ে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে এক বিশাল গতির সঞ্চার হয়। আমের এই বিশাল বাজারকে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে প্রতি বছরের মতো এবারও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ বা আম নামানোর সময়সূচি নির্ধারণের প্রস্তুতি চলছে, যাতে ভোক্তারা সম্পূর্ণ বিষমুক্ত ও পরিপক্ব আম পেতে পারেন। কৃষি কর্মকর্তারা মনে করছেন, বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কালবৈশাখী ঝড় না হলে ৮০০ কোটি টাকার এই লক্ষ্যমাত্রা অনায়াসেই ছাড়িয়ে যাবে এবং চাষিরা তাদের উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য পাবেন। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্যান) পাপিয়া রহমান মৌরী বাসসকে বলেন, রাজশাহী জেলায় এ বছর মোট ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। আম বাগান থেকে মোট ২ লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৩ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আম বিক্রি করে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে। আশা করছি আবহাওয়া ভালো থাকলে চাষিরা আমের ভালো দাম পাবে। এই অঞ্চলের অর্থনীতির গতি সঞ্চার হবে।