স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত মরহুম আরাফাত রহমান কোকো টি-১৬ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। স্পেন বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত এই টুর্নামেন্টের ফাইনালে জয় তুলে নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ঢাকা ফ্রুতাস ক্রিকেট টিম।
সোমবার (৮ জুন) মাদ্রিদের উপকণ্ঠ গেতাফে মাঠে অনুষ্ঠিত ফাইনালে মুখোমুখি হয় ঢাকা ফ্রুতাস ও তারুণ্য মাদ্রিদ। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এ ম্যাচে তারুণ্য মাদ্রিদকে পরাজিত করে শিরোপা নিজেদের করে নেয় ঢাকা ফ্রুতাস।
ফাইনাল শেষে অনুষ্ঠিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্পেন বিএনপির সভাপতি জামাল উদ্দিন মনির। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রমিজ উদ্দিন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাদ্রিদে বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত মাসুদুর রহমান।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন স্পেন বিএনপির নেতৃবৃন্দ, কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন সামাজিক ও আঞ্চলিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। বক্তারা বলেন, খেলাধুলা সুস্থ সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং প্রবাসী তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রাখতে ক্রীড়া আয়োজনের বিকল্প নেই।
ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করে ঢাকা ফ্রুতাস ১৬ ওভারে ১৮০ রান সংগ্রহ করে। দলের হয়ে রিপন ৪২ ও ইয়াছিন ৩৬ রান করেন। তারুণ্য মাদ্রিদের পক্ষে কাফি ৪টি এবং কামিল আহমদ সুবেল ২টি উইকেট নেন।
জয়ের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে তারুণ্য মাদ্রিদ ১৪ ওভারে ১১৬ রানে অলআউট হয়ে যায়। দুই দলের খেলোয়াড়দের দৃষ্টিনন্দন ফিল্ডিং দর্শকদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করে।
আয়োজকরা জানান, এবারের টুর্নামেন্টে মোট ১২টি দল অংশ নেয়। টুর্নামেন্ট শেষে প্রধান অতিথি ও অন্যান্য আমন্ত্রিত অতিথিরা চ্যাম্পিয়ন ও রানারআপ দলের হাতে ট্রফি ও পুরস্কার তুলে দেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
লিবিয়ায় অপহৃত হওয়ার আড়াই মাস পর নওগাঁর মান্দা উপজেলার নুরুল্লাবাদ গ্রামের প্রবাসী যুবক আলমগীর হোসেনকে হত্যা করেছে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। পরিবারের দাবি, মুক্তিপণের ২৫ লাখ টাকা না দেওয়ায় একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। মঙ্গলবার (৯ জুন) তার মৃত্যুর সংবাদ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে পুরো পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে। নিহত আলমগীর হোসেন (৩৫) উপজেলার নুরুল্লাবাদ গ্রামের মৃত দিদার বক্স খাঁনের ছেলে। তিনি দীর্ঘ সাত বছর ধরে লিবিয়ায় শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পারিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আলমগীর হোসেন লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলীর তাজুয়ারা ডিসি পৌরসভায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। গত ২৮ মার্চ মাগরিবের নামাজের পর ডিউটিরত অবস্থায় পুলিশের পোশাক পরিহিত একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মাইক্রোবাসে করে তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এরপর থেকেই তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। নিহত আলমগীরের ভাই লিবিয়া প্রবাসী জিল্লুর রহমান বলেন, আলমগীরকে অপহরণের পর তাকে উদ্ধারের জন্য লিবিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি হয়নি। সন্ত্রাসীদের ওই আস্তানায় আলমগীরসহ আরও ৩১ জন বাংলাদেশিকে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, ওই আস্তানা থেকে কয়েকজন বাংলাদেশি মুক্তিপণ দিয়ে সম্প্রতি ছাড়া পেয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, আলমগীরের কাছেও ২৫ লাখ টাকা দাবি করেছিল সন্ত্রাসীরা। কিন্তু সেই টাকা দিতে অস্বীকার করায় অন্তত এক মাস আগে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। সোমবার দূতাবাসের মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া জিম্মিদের মোবাইলে থাকা ছবি দেখে আলমগীরের মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার এবং দেশে পাঠানোর জন্য দূতাবাসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। নিহতের স্ত্রী শাহিনা আক্তার বলেন, আমার স্বামীই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ২৮ মার্চ কাজে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো ওনার সঙ্গে মোবাইলে কথা হয়েছিল। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। কোনো সন্ত্রাসী আমাদের কাছে মুক্তিপণও চায়নি। হঠাৎ ওনার মৃত্যুর খবর পাই। স্বামীর মরদেহ দ্রুত উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্ত্রী শাহিনা আক্তার ও শোকসন্তপ্ত পরিবার।
পবিত্র হিজরি নববর্ষ ১৪৪৮ উপলক্ষে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) সরকারি ও বেসরকারি খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আগামী ১৫ জুন (সোমবার) সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে, হিজরি নববর্ষের ছুটি শেষে মঙ্গলবার (১৬ জুন) থেকে দেশজুড়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু হবে। সোমবার ছুটি হওয়ায় যেসব কর্মচারীর সাপ্তাহিক ছুটি শনিবার ও রোববার, তারা টানা তিন দিনের অবকাশ উপভোগের সুযোগ পাবেন। অন্যদিকে, শারজাহে চার দিনের কর্মসপ্তাহ অনুসরণকারী সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা শুক্রবার, শনিবার ও রোববারের সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে সোমবারের সরকারি ছুটি যুক্ত হওয়ায় টানা চার দিনের ছুটি ভোগ করবেন। ইসলামী বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী মহররম মাসের প্রথম দিন থেকে নতুন হিজরি বছরের সূচনা হয়। চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে ইসলামী নববর্ষ নির্ধারিত হলেও আমিরাত সরকার ইতোমধ্যে ১৫ জুনকে হিজরি নববর্ষের সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ উপলক্ষে দুবাই সরকারি মানবসম্পদ বিভাগ দেশটির নেতৃত্ব, সরকার ও জনগণের পাশাপাশি সমগ্র মুসলিম বিশ্বের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়েছে। একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অব্যাহত উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা কামনা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, হিজরি বা ইসলামী বর্ষপঞ্জি চন্দ্রভিত্তিক হওয়ায় এর মাস ও বছর গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের তুলনায় প্রতি বছর কিছুটা এগিয়ে আসে। মহররম মাসের প্রথম দিনকে ইসলামী নতুন বছরের সূচনা হিসেবে গণ্য করা হয়।
১৯৯৭ সালের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ওড়ার অপেক্ষায় একটি বিমান। ভেতরে বসা বছর আঠেরোর এক তরণ। চোখে একরাশ স্বপ্ন, আর পকেটে কেবল কয়েক সপ্তাহের চলার মতো সীমিত কিছু ডলার। মধ্যবিত্ত পরিবারের আর দশটা সাধারণ ছেলের মতোই উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছিলেন তিনি। তখন কে জানত, ঢাকা শহরের ধুলোবালি মেখে বড় হওয়া এই ছেলেই একদিন বিশ্ব প্রযুক্তির মানচিত্র কাঁপিয়ে দেবেন? কে জানত, মাত্র ৪৪ বছরেই অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ ধনকুবেরদের তালিকায় নাম লেখাবেন তিনি? এই রূপকথার চেয়েও রোমাঞ্চকর গল্পের নায়ক আর কেউ নন; তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অজি বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা (Robin Khuda)। নিজের মেধা, সীমাহীন ঝুঁকি নেওয়ার সাহস আর দূরদর্শিতাকে পুঁজি করে যিনি আজ বিশ্বজুড়ে এক স্বনির্মিত বিলিয়নিয়ারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ঢাকায় শৈশব ও এক মধ্যবিত্তের স্বপ্ন রবিনের গল্পের শুরুটা ঢাকার চিরচেনা গলিতে। এখানেই তার বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা করেছেন শের-ই-বাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে। এরপর উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন মিরপুরের এসওএস হারম্যান মেইনার কলেজ থেকে। ঢাকার আর দশটা ছেলের মতো রবিনও ক্রিকেট খেলতেন, আড্ডা দিতেন। তবে পড়াশোনায় ছিলেন অত্যন্ত মনোযোগী। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে সন্তানদের ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বানানোর যে ট্রেন্ড ছিল, রবিন তার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন কিছু করতে চেয়েছিলেন। ব্যবসার হিসাব-নিকাশ তাকে বরাবরই টানত। সেই টানেই ১৯৯৭ সালে পাড়ি জমান ক্যাঙ্গারুর দেশ অস্ট্রেলিয়ায়। সিডনির রাজপথে এক লড়াকু ছাত্র অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছানোর পর জীবনটা মোটেও সহজ ছিল না রবিনের জন্য। বিদেশি শিক্ষার্থী হিসেবে সিডনি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইউটিএস) হিসাববিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন তিনি। পড়াশোনার খরচ চালানো এবং সিডনির মতো ব্যয়বহুল শহরে টিকে থাকার জন্য তাকে করতে হয়েছে কঠোর পরিশ্রম। দিনে বিশ্ববিদ্যালয় আর রাতে পার্ট-টাইম চাকরি—এটাই ছিল তার নিত্যদিনের রুটিন। তবে শত কষ্টের মাঝেও পড়াশোনায় ঢিল দেননি। ইউটিএস থেকে স্নাতক শেষ করার পরও তিনি থেমে যাননি। নিজের যোগ্যতাকে আরও একধাপ উঁচুতে নিয়ে যেতে পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। সেখানে বিশ্বখ্যাত ম্যানচেস্টার বিজনেস স্কুল থেকে ফাইন্যান্সে এমবিএ (এমবিএ) ডিগ্রি অর্জন করেন। এই উচ্চশিক্ষাই পরে তাকে বড় বড় করপোরেট চুক্তি বুঝতে এবং জটিল আর্থিক হিসাব মেলাতে সাহায্য করেছিল। করপোরেট ক্যারিয়ার ও অন্ধকারের মাঝে আলোর খোঁজ অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে রবিন যোগ দেন করপোরেট সেক্টরে। প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় তিনি আইটি এবং টেলিকম খাতের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ২০০৭ সালে জাপানি টেক জায়ান্ট ‘ফুজিৎসু’র টেলিকম ও ক্লাউড কম্পিউটিং বিভাগের মহাব্যবস্থাপক হন তিনি। এরপর পাইপ নেটওয়ার্কস এবং নেক্সটডিসির মতো বড় বড় কোম্পানিতে প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই চাকরিগুলো করার সময়ই রবিন এক চরম সত্য উপলব্ধি করেন। তিনি দেখতে পান, বিশ্বজুড়ে গুগল, ফেসবুক, মাইক্রোসফট আর অ্যামাজনের মতো কোম্পানিগুলো দ্রুত বড় হচ্ছে। এদের কোটি কোটি ব্যবহারকারীর ডেটা বা তথ্য জমা রাখার জন্য বিশাল জায়গার প্রয়োজন। রবিন বুঝতে পেরেছিলেন, আগামী দিনগুলো হবে ক্লাউড কম্পিউটিং আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI)। আর এই পুরো বিশ্বকে সচল রাখতে দরকার হবে বিশাল আকৃতির ‘হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার’। এই সরল আইডিয়াটাই বদলে দেয় তার জীবন। ‘এয়ারট্রাংক’ প্রতিষ্ঠা এবং দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকি ২০১৫ সাল। রবিন তার নিরাপদ, বিলাসবহুল করপোরেট চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বন্ধু ও সহকর্মীরা তাকে পাগল ভাবলেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। জন্ম নেয় তার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘এয়ারট্রাংক’ (Airtrunk)। উদ্দেশ্য ছিল এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বিশ্বমানের হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার গড়ে তোলা। কিন্তু আইডিয়া থাকলেই তো আর ব্যবসা হয় না, প্রয়োজন কোটি কোটি ডলারের তহবিল। নতুন এক অভিবাসীর ওপর ভরসা করে অস্ট্রেলিয়ার কোনো ব্যাংক তাকে ঋণ দিতে রাজি হয়নি। রবিন তখন জীবনের সবচেয়ে বড় জুয়াটি খেললেন। নিজের মাথার ওপরের একমাত্র ছাদ তথা সিডনির বাড়ি বিক্রি করে দিলেন। নিজের সারা জীবনের জমানো পেনশন ও সঞ্চয়ের শেষ সম্বলটুকু পর্যন্ত ঢেলে দিলেন এয়ারট্রাংকের পেছনে। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, রবিন প্রায় দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। এশিয়া জয় ও মেগা সফলতার গল্প কঠিন অন্ধকারের পরই আসে আলোর দেখা। রবিনের দূরদর্শিতা ভুল ছিল না। ২০১৭ সালের মধ্যে তিনি সিডনি ও মেলবোর্নে অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস তৈরি করতে সক্ষম হন। টেক জায়ান্টরা লাইন ধরে এয়ারট্রাংকের ডেটা সেন্টার ভাড়া নিতে শুরু করে। কারণ রবিন এমন এক সাশ্রয়ী ও পরিবেশ-বান্ধব গ্রিন-এনার্জি মডেল তৈরি করেছিলেন, যা বড় বড় কোম্পানির খরচ এক ধাক্কায় অনেক কমিয়ে দিয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার পর এয়ারট্রাংক ডানা মেলে আন্তর্জাতিক বাজারেও। একে একে সিঙ্গাপুর, হংকং, জাপান এবং মালয়েশিয়ায় গড়ে ওঠে এয়ারট্রাংকের চোখ ধাঁধানো সব ডেটা সেন্টার। রবিন খুদা হয়ে ওঠেন এশিয়ার ‘ডেটা সেন্টার কিং’। ঐতিহাসিক চুক্তি ও বিলিয়নিয়ার হওয়া ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসটি অস্ট্রেলিয়ার করপোরেট ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বিশ্বের বৃহত্তম সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকস্টোন এবং কানাডা পেনশন প্ল্যান রবিনের ‘এয়ারট্রাংক’ কিনে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। চুক্তির অংকটা ছিল চোখ কপালে তোলার মতো—২৪ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার (প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা)। এটি বিশ্ব ইতিহাসে ডেটা সেন্টার খাতের অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্যিক চুক্তি। এই একটি চুক্তির মাধ্যমে রাতারাতি বিশ্ব বিলিয়নিয়ারদের ক্লাবে প্রবেশ করেন রবিন খুদা। কোম্পানিতে নিজের শেয়ারের অংশ থেকেই তার ব্যক্তিগত সম্পদ এক লাফে দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যায়। ব্ল্যাকস্টোন কোম্পানিটি কিনে নিলেও রবিনের মেধার ওপর ভরসা রেখে তাকেই গ্লোবাল সিইও হিসেবে বহাল রাখে। তার এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ সংবাদমাধ্যম অস্ট্রেলিয়ান ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ তাকে ‘বিজনেস পারসন অব দ্য ইয়ার ২০২৪’ স্বীকৃতি দেয়। ২০২৫ সালে তিনি সম্মানজনক ‘সিডনিসাইডার অব দ্য ইয়ার’ খেতাবে ভূষিত হন। বর্তমানে তার কোম্পানি ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার বিনিয়োগের মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। অনুপ্রেরণার অন্য নাম রবিন ঢাকার গলিতে ক্রিকেট খেলে বড় হওয়া রবিন খুদা আজ অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বিলাসবহুল অফিস কক্ষে বসে বিশ্ব প্রযুক্তি খাত নিয়ন্ত্রণ করছেন। তার এই গল্প কোনো ভাগ্যের জোরে পাওয়া সফলতা নয়। এটি হলো কঠোর পরিশ্রম, নিজের স্বপ্নের ওপর অবিচল বিশ্বাস এবং খাদের কিনারায় দাঁড়িয়েও চরম ঝুঁকি নেওয়ার সাহসের গল্প। রবিন খুদা প্রমাণ করেছেন, স্বপ্ন যদি আকাশছোঁয়া হয় এবং তা তাড়া করার সৎ সাহস থাকে, তবে পৃথিবীর কোনো বাঁধাই মানুষকে আটকে রাখতে পারে না। বাংলাদেশের তরুণদের জন্য তিনি এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। তথ্যসূত্র: ফোর্বস, ফিন্যান্সিয়াল রিভিউ, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, বিজনেস কিউন্সিল অব অস্ট্রেলিয়া