নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের জন্য আর সরকার বা রাষ্ট্রপতির অনুমতির অপেক্ষায় থাকতে হবে না নির্বাচন কমিশনকে (ইসি)। এখন থেকে সংস্থাটি নিজস্ব সিদ্ধান্তেই সশস্ত্র বাহিনীকে মাঠে নামাতে পারবে।
বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। সংশোধিত আইনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, এখন থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর মধ্যে আর্মি, নেভি ও এয়ারফোর্সও থাকবে। ফলে নির্বাচন কমিশন চাইলে তাদের সরাসরি নিয়োগ দিতে পারবে।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, ২০০১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় অংশ নিয়েছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে তাদের সেই সংজ্ঞা থেকে বাদ দেয়। এরপর থেকে ইসিকে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার ধারায় সশস্ত্র বাহিনী নিয়োগের অনুরোধ জানাতে হতো।
নতুন সংশোধনের ফলে আর সেই প্রক্রিয়ার প্রয়োজন থাকছে না। এখন ইসি সরাসরি সশস্ত্র বাহিনী নিয়োগ করতে পারবে, যেমনটা করে থাকে পুলিশ, আনসার, বিজিবি, র্যাব ও কোস্ট গার্ডকে।
এ বিষয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে থাকবে নাকি ভোটকেন্দ্রে নিয়োগ পাবে এমন প্রশ্নে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, আরপিও অনুযায়ী নিয়োগ হবে। তারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী হিসেবেই কাজ করবে।
ইসি কর্মকর্তারা আরও জানান, এই সংশোধনের ফলে নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর অংশগ্রহণ হবে আগের চেয়ে আরও সহজ, দৃশ্যমান ও কার্যকর।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছে দেশটির সরকার। বুধবার ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (জননিরাপত্তা বিভাগ) এক অফিস স্মারকে বলা হয়েছে, এই মর্যাদা শুধু আনুষ্ঠানিক বা প্রটোকল-সংশ্লিষ্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। ব্যারাকপুরের সাবেক এমপি ও বিজেপি নেতা ত্রিবেদী দুইববার ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেছেন। নতুন দায়িত্ব গ্রহণের জন্য গত ১২ জুন তিনি বাংলাদেশে পৌঁছান। বৃহস্পতিবার তিনি ভারতের নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে তার পরিচয়পত্র পেশ করবেন। চব্বিশের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা ঘোচানোর জন্য পোড় খাওয়া এই রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রদূত করে বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দীনেশ ত্রিবেদী বাংলা বলতে পারেন এবং দুই বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কেও ভালো ধারণা রাখেন। সেতারবাদক হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে। গুজরাটি দম্পতি হীরালাল ত্রিবেদী এবং উর্মিলাবেন ত্রিবেদীর ছোট ছেলে দীনেশ ত্রিবেদী হিমাচল প্রদেশের বোর্ডিং স্কুল থেকে পড়াশোনার পর কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে কমার্সে স্নাতক ডিগ্রি পান। তারপর টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ করেন। প্রবীণ এই রাজনীতিক দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। আশির দশকে ছিলেন কংগ্রেস নেতা। পরে ১৯৯০ সালে জনতা দলে চলে যান। ১৯৯০-৯৬ পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভায় জনতা দলের সদস্য ছিলেন। ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করলে সেই দলে যোগ দেন দীনেশ ত্রিবেদী। তিনিই দলটির প্রথম সাধারণ সম্পাদক। ২০০২-০৮ পর্যন্ত রাজ্যসভায় তৃণমূলের এমপি ছিলেন দীনেশ। ২০০৯ সালে ব্যারাকপুর থেকে তৃণমূলের হয়ে লোকসভা ভোটে প্রার্থী হন। ওই আসনে জিতে কেন্দ্রের মনমোহন সিংহ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী হন। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে সেই দায়িত্ব সামলান দীনেশ। পরে তাকে সেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের নির্বাচনে ব্যারাকপুর থেকে আবারও তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছিলেন দীনেশ, কিন্তু সেবার বিজেপির অর্জুন সিংয়ের কাছে হেরে যান। তারপর তৃণমূল তাকে আবার রাজ্যসভায় পাঠায়। কিছুদিন পর তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় দীনেশের। এর ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি তৃণমূল থেকে পদত্যাগ করেন এবং ৬ মার্চ বিজেপিতে যোগ দেন।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে নাশকতার আশঙ্কায় দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্ক অবস্থান। আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দলটি গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা দলটি আজ ক্ষমতার বাইরে, সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চয়তার মুখে। শীর্ষ নেতাদের অনেকেই কারাগারে, আত্মগোপনে কিংবা দেশের বাইরে। টানা দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা দলটির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আওয়ামী লীগ কি আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরতে পারবে? দেশের অন্যতম পুরোনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন জন্ম। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে দলটি। সবচেয়ে বেশি সময় দেশের ক্ষমতায় থাকার স্বাদ নিয়েছে। দলের প্রধান শেখ হাসিনা সবচেয়ে বেশি সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এত এত সাফল্যের গল্প সবই ঢাকা পড়েছে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে। এ অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ শুধু ক্ষমতাই হারায়নি; দেড় দশকের অপশাসন, তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা—সব সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে আওয়ামী লীগের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে টিকে থাকা, অন্যদিকে জনসমর্থন ফিরে পাওয়া। ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলটির অতীতের গৌরবের চেয়ে তাই বেশি আলোচিত হচ্ছে এর ভবিষ্যৎ। পুরোনো ও প্রভাবশালী এই রাজনৈতিক দল কীভাবে এ সংকট অতিক্রম করবে, সেটিই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম বড় প্রশ্ন। জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ শুধু ক্ষমতাই হারায়নি; দেড় দশকের অপশাসন, তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা—সব সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে আওয়ামী লীগের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে টিকে থাকা, অন্যদিকে জনসমর্থন ফিরে পাওয়া। বর্তমান কৌশল কতটা কার্যকর ক্ষমতা হারানোর পর ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। দলটির ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগও নিষিদ্ধ। ফলে দলটির কার্যক্রম পুরোপুরিই ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। মাঝেমধ্যে ঝটিকা মিছিল, হরতালের ডাকও এসেছে। তবে সেটা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার মতো কিছু নয়। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, তবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই রয়েছে। এবার ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ঝটিকা মিছিল করছিল আওয়ামী লীগ। আজ মঙ্গলবার তা সারা দেশেই করার ঘোষণা দিয়েছেন দলটির আত্মগোপনে থাকা নেতারা। এ পরিস্থিতিতে রাজধানী ঢাকায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ১৮ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। এর বাইরে সেনা মোতায়েনের জন্য চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা থেকেই সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের তৎপরতা ঘিরে সরকার যে প্রস্তুতি নিয়েছে, সেটাই তাদের সাফল্য। কারণ, ঝটিকা মিছিল করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে দেওয়া যাবে না। কিন্তু দেশে এবং দেশের বাইরে এ নিয়ে যে আলোচনা হোক—এটাই চাইছে আওয়ামী লীগ। তবে আওয়ামী লীগের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগের এসব কর্মসূচি তেমন ফল বয়ে আনবে না; বরং দেশে থাকা যেসব নেতা-কর্মী জামিনে মুক্ত হয়েছেন, তাঁরা পুনরায় গ্রেপ্তার হতে পারেন। ওই নেতা আরও বলেন, ছয় মাসের একটি সরকারের ওপর এভাবে চাপ দিতে গেলে হিতে বিপরীত হবে; বরং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা ওঠানো এবং মামলা-মোকদ্দমা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া উচিত; পাশাপাশি দলের ভেতর সংস্কার দরকার। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা মনে করেন, ঝটিকা মিছিলের মতো কর্মসূচি তেমন ফল বয়ে আনবে না। বরং দেশে থাকা যেসব নেতা-কর্মী জামিনে মুক্ত হয়েছেন, তাঁরা পুনরায় গ্রেপ্তার হতে পারেন। এখন বরং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে নিষেধাজ্ঞা উঠানো এবং মামলা-মোকদ্দমা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া উচিত; পাশাপাশি দলের ভেতর সংস্কার দরকার। ইতিহাসের শক্তি, বর্তমানের দুর্বলতা ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলীর রোজ গার্ডেনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ হিসেবে যাত্রা শুরু, পরে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রসার ঘটে। আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় শক্তি সব সময়ই ছিল ইতিহাসের বিভিন্ন কালপর্বে দলটির ভূমিকা। পাকিস্তানি শাসনামলে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি বড় রাজনৈতিক বাঁকে আওয়ামী লীগ ছিল কেন্দ্রীয় শক্তি। ১৯৬৬ সালে ছয় দফাভিত্তিক বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পরিণত হয় দলটি। ১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধের পর ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এসব অর্জন আওয়ামী লীগকে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ১৬০টি আসন লাভ ছিল বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের নির্বাচনেও দলটি বিপুল বিজয় অর্জন করে; যদিও ওই নির্বাচন নিয়ে উঠেছিল প্রশ্ন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার পর পাল্টে যায় দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট। দীর্ঘ ২১ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে পরাজয় এবং ২০০৭-এর ১১ জানুয়ারির পর আরেক দফা বিপর্যয় কাটিয়ে দলটি ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তিন-চতুর্থাংশ আসনে বিজয়ী হয়। এরপর ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে পতনের আগপর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের স্থায়ী সম্পদ নয় বা পক্ষে থাকবে না—এটা হয়তো ভুলেই গিয়েছিল আওয়ামী লীগ। ইতিহাস আওয়ামী লীগকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু গত এক দশকে আওয়ামী লীগের শাসনামল দলটির জন্য সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করেছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দল। এই সময়ে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকেও অগ্রগতির দাবি করেছে দলটি। কিন্তু দীর্ঘ ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে বিরোধীদের ওপর দমন–পীড়ন আওয়ামী লীগকে আগ্রাসী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করে। দেশে–বিদেশে জোটে কর্তৃত্ববাদী শাসনের তকমা। দীর্ঘ সময় গুম-খুনের পর গণ-অভ্যুত্থানে নির্বিচার গুলি করে হত্যা—অপশাসনের চরম সীমায় নিয়ে যায় আওয়ামী লীগকে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্ক আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বৈধতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। বিরোধী দলগুলোর বর্জন এবং দেশে–বিদেশ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের কারণে ভোটারদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমে আসে। একসময় যে দল গণভিত্তিক আন্দোলনে সুনাম অর্জন করেছিল, তারাই অগণতান্ত্রিক পথে দেশ চালাতে থাকে। শেখ হাসিনাতে পুনরুত্থান, শেখ হাসিনাতেই পতন স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব আওয়ামী লীগ মাত্র সাড়ে তিন বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল। এরপর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পাঁচ মেয়াদে ২০ বছরের বেশি দেশ শাসন করেছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি চার যুগের কাছাকাছি সময় ধরে শেখ হাসিনা সভাপতি পদে আছেন। ফলে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক ইতিহাস মূলত শেখ হাসিনার ইতিহাস। ১৯৮১ সালে বিদেশে থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পান শেখ হাসিনা। এরপর এই পদে তাঁর আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীই তৈরি হয়নি দলে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে যখন দলের দায়িত্ব নেন, তখন আওয়ামী লীগ ছিল বিভক্ত ও নেতৃত্বসংকটে আক্রান্ত একটি দল। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দলটি বহু উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। সেই অবস্থায় শেখ হাসিনা দলকে পুনর্গঠিত করেন এবং ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র নেতা হয়ে ওঠেন। ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয় এবং পরবর্তী প্রায় দেড় দশক ক্ষমতা ধরে রাখা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই। ফলে দলটির ভেতরে বিকল্প নেতৃত্বের বিকাশ কার্যত থেমে যায়। এখানেই আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকটের অন্যতম উৎস। দীর্ঘ সময় ধরে দলটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক সংগঠনের চেয়ে নেতাকেন্দ্রিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে। নীতিনির্ধারণ, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক অবস্থান—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন শেখ হাসিনা। ফলে তাঁর অনুপস্থিতিতে দলটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্বের সক্ষমতা দৃশ্যমানভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৯০ সালে আন্দোলনের মাধ্যমে সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের পতন হয়। তিনি কারাগারে যান। আমৃত্যু তিনি দেশে ছিলেন এবং রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। একমাত্র শেখ হাসিনাই বাংলাদেশে প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও নেতা যিনি ক্ষমতা ছাড়ার পর দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। বেশির ভাগ মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, দলের শীর্ষ নেতা, এমনকি সহযোগী সংগঠনের নেতারাও দেশ ছাড়েন, যা বাংলাদেশে বিরল। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনার প্রতি ব্যাপক ক্ষোভ দৃশ্যমান ছিল। ফলে আওয়ামী লীগের এই করুণ পরিণতির মূল দায়ভার শেখ হাসিনারই বলে মনে করেন দলটির অনেক নেতা ও শুভাকাঙ্ক্ষী। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে পালিয়ে আশ্রয় নেন ভারতে। এখনো সেখানেই আছেন তিনি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে পালিয়ে আশ্রয় নেন ভারতে। সাংগঠনিক শক্তি কোথায় হারাল আওয়ামী লীগ সব সময় দাবি করে এসেছে যে তাদের কোটি কোটি সমর্থক রয়েছে। ক্ষমতায় থাকার দীর্ঘ সময়ে আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে দলীয় সংগঠন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে যায়। ক্ষমতা হারানোর পর দেখা যায়, সাংগঠনিক শক্তির বড় অংশও কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতার মতে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আওয়ামী লীগের এতটা দুরবস্থা হয়নি। জেল হত্যাকাণ্ড, অনেক নেতাকে কারাগারে প্রেরণের পরও দেশে অনেক নেতা ছিলেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, সহযোগী সংগঠনের সব শীর্ষ নেতা বিদেশে আত্মগোপনে চলে গেছেন। অন্যরা কারাগারে চলে গেছেন। ফলে দেশে দলটি অনেকটাই নেতৃত্বশূন্য। বিদেশে থাকা নেতাদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগই মূল ভরসা, যা রাজপথ কিংবা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়। বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সামনে মূলত চারটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে বলে মনে করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটির উৎপত্তিস্থল ছিল রাজধানীর খুব কাছাকাছি, যা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সর্বশেষ ভূমিকম্পটি অনুভূত হয় ২২শে জুন সোমবার রাত আটটা ২৮ মিনিটে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল চার দশমিক চার এবং উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে। এর আগে চলতি বছরের পহেলা ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তিন দশমিক দুই মাত্রার একটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। গত ২২শে জুনের পর এটিই হলো এ বছর ঢাকার সবচেয়ে নিকটবর্তী উৎপত্তিস্থলের ভূমিকম্প হিসেবে উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার কাছাকাছি উৎপত্তিস্থল নিয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পটি হয়েছিল গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে, নরসিংদীতে। পাঁচ দশমিক সাত মাত্রার ওই ভূমিকম্পকে গত কয়েক দশকে দেশের অভ্যন্তরে উৎপত্তি হওয়া অন্যতম শক্তিশালী কম্পন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ওই ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নরসিংদী এলাকায় আরও তিনটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছিল। যদিও এসব ভূমিকম্পের বেশিরভাগই মাঝারি বা অপেক্ষাকৃত কম মাত্রার, তবুও বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে আরেকটি বিষয়, আর তা হলো উৎপত্তিস্থলগুলোর অবস্থান। এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, ঢাকার কাছাকাছি একের পর এক ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল আসলে কী বার্তা দিচ্ছে? এগুলো কি কেবল স্বাভাবিক টেকটোনিক প্রক্রিয়ার অংশ, নাকি ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবার ইঙ্গিত দিচ্ছে? উৎপত্তিস্থল ঘুরেফিরে ঢাকার আশপাশেই ২২শে জুন রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যে ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়েছে, সেটির মাত্রা ছিল চার দশমিক চার মাত্রার এবং এর উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদী থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে। আর ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে ছিল এর উৎপত্তিস্থল। এমন তথ্যই দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক গবেষণা সংস্থা ইউএসজিএস। এ নিয়ে ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলোজিতে বলা হয়েছে, চার মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে এবং ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৬ কিলোমিটার গভীরে ছিল এর উৎপত্তিস্থল। কিন্তু বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল চার এবং উৎপত্তিস্থল ছিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে, যা ঢাকা থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার পূর্বে। উৎপত্তিস্থল সংক্রান্ত এই পার্থক্য নিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবীর বিবিসি বাংলাকে বলেন, নরসিংদী থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে গেলে সেটা নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকার মাঝেই পড়ে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২২শে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ ও এর সীমান্তবর্তী এলাকায় যতগুলো ভূমিকম্প হয়েছে, এর মাঝে বেশ কয়েকটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার কাছাকাছি। এর মধ্যে চলতি বছরের পহেলা ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তিন দশমিক দুই মাত্রার একটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব ছিল প্রায় ৪২ কিলোমিটার। এর আগে, ২০২৫ সালের ২১শে নভেম্বর রিখটার স্কেলে পাঁচ দশমিক সাত মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে হওয়া ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদী জেলা শহর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার পশ্চিম-দক্ষিণ-পশ্চিমে মাধবদী এলাকায়, ভূ-পৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব ছিল মাত্র ১৩ কিলোমিটার, যা গত কয়েক দশকে দেশের অভ্যন্তরে উৎপত্তি হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটি। ওই ভূমিকম্পে ঢাকায় চারজন, নরসিংদীতে পাঁচ জন এবং নারায়ণগঞ্জে একজন নিহত হন বলে জানিয়েছিলো তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এতে সাড়ে চার শতাধিক মানুষ আহত হন, যার মধ্যে শুধু গাজীপুরেই আহত হন ২৫২ জন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ওই ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আরও তিনবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। মোট চারটি ভূমিকম্পের মধ্যে তিনটিরই উৎপত্তিস্থলই ছিল নরসিংদী জেলার দু'টি উপজেলা এবং একটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকারই বাড্ডা এলাকায়। মাধবদীর ভূমিকম্পের পরদিন, ২২শে নভেম্বর নরসিংদীর পলাশে তিন দশমিক তিন মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়, ঢাকা থেকে সেই কেন্দ্রের দূরত্ব ছিল ২৯ কিলোমিটার। একই দিনে ঢাকার বাড্ডায় তিন দশমিক সাত মাত্রার ভূমিকম্প উৎপত্তি হয় এবং পরে নরসিংদীতে চার দশমিক তিন মাত্রার একটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। শেষেরটির কেন্দ্র ছিল ঢাকা থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দূরে। এর কয়েকদিন পর, ২৭শে নভেম্বর নরসিংদীর ঘোড়াশালে তিন দশমিক ছয় মাত্রার একটি ভূমিকম্প উৎপত্তি হয়, যার কেন্দ্র ছিল ঢাকা থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে। এরপর এক সপ্তাহের মাথায় চৌঠা ডিসেম্বর নরসিংদীর শিবপুরে চার দশমিক এক মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়, ঢাকা থেকে যার কেন্দ্র ছিল ৩৮ কিলোমিটার দূরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়া বলেন, সাম্প্রতিক এসব ভূমিকম্প টেকটোনিক কার্যকলাপের কারণে হতে পারে, আবার কোনো সক্রিয় ফল্টের সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। তার ভাষায়, "অনেক সময় নতুন ফল্ট সৃষ্টি হয়, আবার দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা কোনো পুরোনো ফল্টও পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।" বাংলাদেশের অবস্থান ইউরেশিয়ান ও ইন্ডিয়ান প্লেটের সংযোগ স্থলের মাঝামাঝি। অন্যদিকে আছে বার্মিজ প্লেট। এই তিন প্লেটের সংযোগের কারণে এখানে বারবার ভূমিকম্প হচ্ছে, বলছিলেন ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবীর। এগুলো কি ঢাকায় বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস? বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পূরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প গবেষক মেহেদি আহমেদ আনসারীর মতে, সম্প্রতি ঢাকার কাছাকাছি যেসব ছোট বা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছে, সেগুলো থেকে বড় ধরনের ভবনধস বা ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা নেই। তবে এসব ভূমিকম্প মানুষকে ভূমিকম্প সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। তিনি জানান, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ঐতিহাসিকভাবে সাত বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে সক্ষম ফল্টগুলো। তার মতে, ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি রয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং ঢাকার কাছাকাছি শ্রীমঙ্গল ও বগুড়ার শেরপুর এলাকায়। কারণ ইতিহাসে এসব অঞ্চলে সাতের বেশি মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে। ১৯১৮ সালে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে সাত দশমিক ছয় মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল এবং বগুড়ার শেরপুর এলাকায় সাত দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিলো ১৮৮৫ সালে। তিনি বলেন, "এগুলো ঢাকা থেকে দেড়শো থেকে দু'শো কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মাঝে আছে। বাকি বড় ভূমিকম্পগুলো ঢাকা থেকে আরও দূরে দূরে হয়েছিলো।" তবে ঢাকার জন্য কোনো উদ্বেগের বিষয় আছে কিনা, সে সম্পর্কে তিনি বলেন, "প্রত্যেকটি ভূমিকম্পের রিটার্ন পিরিয়ড (পুনরাবৃত্তির সময় বা চক্র) আছে।" "ঢাকা থেকে ২৩০ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বড় ভূমিকম্প হয়েছিলো। কিন্তু ওটার রিটার্ন পিরিয়ড বড় হবে। ওটা আমাদের হিসাবে প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর। সেটা হয়তো ২২৫০ সালের আশেপাশে হবে। সাত মাত্রারগুলয় দেড়শো-দুইশো বছরের মাঝে হবে।" "সাত মাত্রার ভূমিকম্প হয়তো আরও কখনও হয়েছে, কিন্তু আমাদের কাছে তথ্য নাই। সেজন্যই আমরা বলি যে সাত মাত্রার একটি ভূ্মিকম্প ঢাকায় শীঘ্রই আসার সম্ভাবনা। এখন এটা কবে আসবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। ২০ বছরও লেগে যেতে পারে," বলছিলেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে নরসিংদীতে যেভাবে একের পর এক ভূমিকম্পের উৎপত্তি হচ্ছে, হতে পারে এটি বড় কোনো ভূমিকম্পের ইঙ্গিত। কিন্তু যেসব তথ্য-উপাত্ত আছে, তাতে ঐতিহাসিকভাবে নরসিংদীতে বড় কোনো ভূমিকম্প কখনও হয়নি, জানান অধ্যাপক আনসারী। "তাই, নরসিংদী বা ঢাকার আশেপাশের ভূমিকম্পের হিসেবে ঢাকা ঝুঁকিপূর্ণ না, কিন্তু ওই অতীতের ওই বড় ভূমিকম্পগুলোর বিচারে ঢাকা খুবই ঝুঁকিতে আছে। বড় কোনো ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশের কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।" ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবীরও বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ঢাকাকেন্দ্রিক বড় ভূমিকম্পের ইতিহাস নেই। কিন্তু সীমান্তে বড় ভূমিকম্প আছে। আর আমার অভিজ্ঞতা বলছে, গত বছর দুয়েক ধরে আমাদের এই অঞ্চলে ভূমিকম্পপ্রবণতা একটু বেশি।" ভূমিকম্পে ঢাকার কোন এলাকা নিরাপদ? কোন এলাকা কতটুকু নিরাপদ তা বুঝতে হলে দুইটি দিকে নজর দিতে হবে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এক. শহরের ভূতাত্ত্বিক গঠন। দুই. শহরের অবকাঠামো। এর আগে ভূতত্ত্ববিদ সৈয়দ হুমায়ুন আখতার ভূতাত্ত্বিক বিষয়টিকে বর্ণনা করেছেন এভাবে, "ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকার ভূতাত্ত্বিক গঠন প্রায় একই। বেশিরভাগ অংশ, বিশেষ করে উত্তর দিকের মাটি মধুপুরের লাল মাটি। যেটি বেশ শক্ত।" কিন্তু মোঘল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ পিরিয়ড, পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে উত্তর দিকে এবং বুড়িগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে শহর খুব দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। তখন এই লাল মাটি 'অকুপাইড' হয়ে যায়। এরপর শহর বাড়তে শুরু করে পূর্ব-পশ্চিমে। সেখানে নরম পলিমাটি এবং জলাশয় ছিল যা ভরাট করা হয়েছে। মি. আখতার জানান, শুধু যদি ভূতাত্ত্বিক গঠন বিবেচনা করা হয়, তাহলে মধুপুরের লাল মাটির একই গড়নের যেসব এলাকা রয়েছে যেমন রমনা, মগবাজার, নিউমার্কেট, লালমাটিয়া, খিলগাঁও, মতিঝিল, ধানমন্ডি, লালবাগ, মিরপুর, গুলশান, তেজগাঁও ইত্যাদি এলাকা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। কিন্তু শুধু ভূতাত্ত্বিক গঠনের ওপর ঢাকার বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নির্ভর করছে না। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী এ প্রসঙ্গে বলেছেন, "ঢাকার কোন এলাকা নিরাপদ, কোনটি নয়- এটা বলা মুশকিল। যতক্ষণ না ভবনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে, ততক্ষণ বলা যাবে না কোনটা ঝুঁকিপূর্ণ বা ঝুঁকিমুক্ত।" মি. আনসারী'র মতে, আপাতদৃষ্টিতে পুরান ঢাকাকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও, নতুন ঢাকা ও পুরান ঢাকার মধ্যে পার্থক্য একটাই। তা হলো পুরান ঢাকার সরু রাস্তা। রাস্তাগুলো সরু হওয়ায় দুর্যোগের সময় মানুষকে দ্রুত সরানো কঠিন হতে পারে। তিনি এটাও মনে করিয়ে দেন যে পুরনো কিছু ভবন শত বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে। কোনো ভূমিকম্পেও ভেঙে পড়েনি। তাই কাঠামোর মানই বেশি গুরুত্ব পায়। ঢাকার বিপদ 'ব্লাইন্ড ফল্ট' ঢাকার ভেতরে কোনো ফল্ট লাইন নেই। তবে বাংলাদেশের ফল্ট লাইন বা চ্যুতি রেখার জন্য পাঁচটি জায়গা পরিচিত। বার্মা বা মিয়ানমার থেকে নোয়াখালী, যাকে বলে প্লেট বাউন্ডারি এক। সেখানে ১৭৬২ সালে আট দশমিক পাঁচ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। আরেকটা আছে প্লেট বাউন্ডারি দুই। যেটা নরসিংদীর ওপর দিয়ে চলে গেছে, অতীতে এখানে সাত মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। এরপরে প্লেট বাউন্ডারি তিন, যেটা সিলেট থেকে ইন্ডিয়ার দিকে চলে গেছে, এখানে ১৯১৮ এবং ১৯৬৯ সালে সাত দশমিক পাঁচ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। আর আছে ডাউকি ফল্ট যেখানে ১৮৯৭ সালে আট দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। সবশেষ আছে মধুপুর ফল্ট যেখানে ১৮৮৫ সালে সাত দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। গবেষকদের মতে, এগুলোর কিছু জায়গায় ৩৫০ বছর, আবার কিছু জায়গায় ৯০০ বছরের মতো সময় পরে বড় ভূমিকম্প হতে পারে। তবে এর বাইরেও কিছু ফল্ট লাইন আছে, যেগুলোকে বলে 'ব্লাইন্ড ফল্ট'। ব্লাউন্ড ফল্ট হলো এমন ধরনের ফল্ট যা ভূ-পৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছায় না। তাই ভূ-পৃষ্ঠে কোনো চিহ্ন না থাকায় সাধারণ ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রে এটি দেখা যায় না বা শনাক্ত করা কঠিন হয়। এই ধরনের ফল্ট বিপজ্জনক। বাংলাদেশে দুটো চিহ্নিত ব্লাইন্ড ফল্ট আছে। একটি ময়মনসিংহে, অন্যটি রংপুরে। যেহেতু এই ফল্ট লাইনগুলো শনাক্ত করা কঠিন তাই কোনো সতর্কবার্তাও পাওয়া যায় না। ঢাকার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে এই ব্লাইন্ড ফল্টগুলো।