অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বিগত সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে একটি চ্যালেঞ্জিং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পাওয়ার পরও বাংলাদেশের অর্থনীতি সহনশীলতা দেখিয়েছে এবং ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা একটি ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পেয়েছিলাম, কিন্তু এখন ম্যাক্রো অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা এসেছে। মূল্যস্ফীতি বেড়েছে; বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কিন্তু শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে এটিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; সরবরাহ পর্যায়ে ব্যবস্থাপনা ও বাজারে শৃঙ্খলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত মুনাফালোভ ও মজুতদারি শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দমন করা যায় না—এ জন্য পাইকার, ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতাদের সহযোগিতা প্রয়োজন।’
আজ (শনিবার) রাজধানীর সিরডাপ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘ব্যাংকিং অ্যালম্যানাক’- এর সপ্তম সংস্করণের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে অর্থ উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।
অর্থ উপদেষ্টা নীতিনির্ধারক, বিশ্লেষক ও গণমাধ্যমের প্রতি সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের অর্জন ও চ্যালেঞ্জগুলোকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে উপস্থাপনের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, অব্যাহত সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী ও সম্মানজনক অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ব্যাংকিং অ্যালম্যানাকের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ জিয়াউদ্দিন আহমেদ এবং প্রকল্প পরিচালক আবদার রহমান বইটির পরিচিতি তুলে ধরেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)-এর চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংক পিএলসি’র চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ব্যাংকিং অ্যালম্যানাকের বোর্ড অব এডিটরসের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। ধন্যবাদ জানান ব্যাংকিং অ্যালম্যানাকের নির্বাহী সম্পাদক মোহাম্মদ এমদাদুল হক।
এছাড়া বক্তব্য দেন বোর্ড অব এডিটরসের সদস্য ও অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ লিমিটেড (এবিবি)-এর সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন এবং এইচএসবিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব উর রহমান।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত, প্রভিশনিং, ঋণ প্রবৃদ্ধি, সঞ্চিত মুনাফা ও ঋণ-আমানত অনুপাতসহ ব্যাংকিং খাতের গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো বিদ্যমান চাপ ও চলমান সমন্বয়ের চিত্র তুলে ধরে।
তিনি বলেন, ২০১০ সালের মত আগের সময়ের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিস্থিতি এখনও বেশ চ্যালেঞ্জিং। তবে তথ্য-উপাত্ত ইঙ্গিত দেয় যে সংশোধনী পদক্ষেপগুলো ধীরে ধীরে কার্যকর হচ্ছে। ঋণ প্রবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রিত হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি ব্যাংকে ঝুঁকি শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও উন্নতি হয়েছে।
বিশ্বস্ত আর্থিক তথ্যের সঠিক প্রচারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সম্পূর্ণ তথ্যভাণ্ডার প্রকাশের পরিবর্তে প্রাসঙ্গিক সূচক বাছাই করে উপস্থাপন করলে ব্যাংকিং খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতির প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ সম্ভব হয়।
তিনি বলেন, এসব তথ্যের দায়িত্বশীল ব্যবহার ভুল তথ্য প্রতিরোধে সহায়ক হবে এবং জনসাধারণের বোঝাপড়া জোরদার করবে।
মুদ্রানীতির বিষয়ে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, সুদের হার কমানো একটি জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে ট্রেজারি বিলের সুদহার, ব্যাংক আমানতের হার এবং সামগ্রিক তারল্য ব্যবস্থাপনা জড়িত।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রেজারি বিলের সুদহার কমেছে, তবে বাজারে এটির পূর্ণ প্রভাব পড়তে সময় লাগে। ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি, কারণ সরকারি বিনিয়োগমুখী অতিরিক্ত ঝোঁক ব্যাংক থেকে তহবিল সরিয়ে নিতে পারে, যা আর্থিক মধ্যস্থতাকে দুর্বল করবে।
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি এখনও একটি সংবেদনশীল বিষয় এবং কেবল মুদ্রানীতির মাধ্যমে সমাধান সম্ভব নয়। সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, দক্ষ বাজার নজরদারি এবং ব্যবসায়ী ও পাইকারদের সহযোগিতা অপরিহার্য। শুধু অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে অতিরিক্ত মুনাফালোভ বা মজুতদারি ঠেকানো যায় না।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতি দীর্ঘ সময়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। বৈষম্য, দারিদ্র্য ও কৃষিপণ্যের মূল্য বিকৃতি এখনও চ্যালেঞ্জ হলেও দেশটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি অর্জন করেছে।
অতিরিক্ত নেতিবাচক প্রচারণা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এতে আস্থা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।
তিনি বলেন, নীতিনির্ধারণ কখনোই জনপ্রিয়তাবাদ বা সংকীর্ণ স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হতে পারে না; সামগ্রিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় রাজস্ব ও মুদ্রানীতিকে ভারসাম্যপূর্ণ হতে হবে।
চলমান সংস্কার কার্যক্রম আরও স্থিতিশীল ও সহনশীল অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তুলছে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও প্রস্তুত করা প্রাথমিক আর্থিক তথ্য ও বিশ্লেষণমূলক প্রকাশনা স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক, বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংকিং অ্যাসোসিয়েশন অর্থসংকটের মধ্যেও এসব কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অর্থ সচিব ড. খায়রুজ্জামান মজুমদার বলেন, গত দেড় বছরে দেশের আর্থিক খাত একটি সংকটকাল অতিক্রম করলেও এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে। বর্তমানে এলসি পরিশোধেও সমস্যা নেই।
তিনি বলেন, বেশ কয়েকটি সংকটাপন্ন ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এবং কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, ব্যাংকিং অ্যালম্যানাক সংশ্লিষ্ট অংশীজন, নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের জন্য একটি ‘পরিসংখ্যানভিত্তিক হ্যান্ডবুক’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং এটি অর্থনৈতিক ঝুঁকি বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা দিতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার বলেন, এ ধরনের গবেষণাভিত্তিক ও শ্রমসাধ্য প্রকাশনা নীতিনির্ধারকদের ব্যাংকিং খাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে।
বিএবি চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বলেন, সুদের হার কমানো কোনোভাবেই সংগঠনের ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং অ্যালম্যানাক দেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা এবং এটি বাংলাদেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগের দিক নির্দেশনা দিতেও সহায়ক।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টানে ১৩-১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে ৮ম বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল এবং নেপালের বাণিজ্য সচিব ড. রাম প্রসাদ ঘিমিরের নেতৃত্বে নেপাল প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করে। সভায় উভয় দেশের বাণিজ্য সচিব দু’দেশের মধ্যকার বিরাজমান চমৎকার সম্পর্কের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং এই ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে মর্মে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এ সময় তাদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিশেষ করে, বাণিজ্য বৃদ্ধিতে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ), ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ, ট্যারিফ, প্যারাট্যারিফ ও নন-ট্যারিফ বাধা হ্রাস, পণ্যের বাজার প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি ও পেমেন্ট ব্যবস্থার সহজীকরণ, উভয় দেশের পণ্যের পারস্পরিক বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন, রেল সংযোগ সম্প্রসারণ, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও ট্রানজিট সুবিধা কার্যকর করার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া সভায় পর্যটন উন্নয়ন ও বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ সম্ভাবনা, এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় ও বাংলাদেশ-নেপাল-ভারত ত্রিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করা হয়। সভায় বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (টিপিএ) চূড়ান্তকরণ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় উভয় পক্ষ পিটিএ’র ড্রাফট টেক্সট, রুলস অব অরিজিন টেক্সট ও পণ্যের তালিকা (রিকোয়েস্ট লিস্ট গেস অফার লিস্ট) দ্রুত চূড়ান্ত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে সীমিত পণ্যের আওতায় পিটিএ বাস্তবায়ন করে, পরবর্তীতে তা ধীরে ধীরে সম্প্রসারণের বিষয়ে বাংলাদেশ পক্ষ তাদের অবস্থান তুলে ধরে। এ লক্ষ্যে, আগামী তিন মাসের মধ্যে ট্রেড নেগোসিয়েটিং কমিটি (টিএনসি)’র সভার মাধ্যমে পিটিএ’র ড্রাফট টেক্সট, রুলস অব অরিজিন টেক্সট ও পণ্যের তালিকা চূড়ান্তকরণের জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভায় বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকসমূহের (এমওইউ) বাস্তবায়ন এবং স্যানিটারি অ্যান্ড ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) ও টেকনিক্যাল ব্যারিয়ার্স টু ট্রেড (টিবিটি) সংক্রান্ত বিষয়ে উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে উভয় দেশ একমত পোষণ করে। এ সময় ব্যবসায়িক ভিসা, পেশাজীবী ও তাদের পরিবারের জন্য ভিসা এবং পর্যটন ভিসা সহজীকরণের মাধ্যমে পারস্পরিক যাতায়াত, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও পর্যটন বৃদ্ধিতে উভয় দেশ একমত হয়। এছাড়াও ভিসা প্রক্রিয়া আরও সহজ করার জন্য উভয় দেশ সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। উভয় পক্ষ পণ্যের বাজার প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, পেমেন্ট সিস্টেম সহজীকরণ ও নির্ভরযোগ্য লেনদেন ব্যবস্থাপনা জোরদারে একমত হন। এছাড়াও সভায় নন-ট্যারিফ বাধা, পণ্যের মান পরীক্ষা প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও সম্ভাবনাময় পণ্যের জন্য বিশেষ প্রচারণার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়। এ সময় দু’পক্ষ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করার বিষয়ে একমত পোষণ করে। বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য উন্নয়ন জোরদারের লক্ষ্যে সরকারি (এ২এ) ও বেসরকারি (ই২ই) পর্যায়ে ট্রেড ফেয়ার, প্রদর্শনী ও ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দলের সফর বিনিময় নিয়ে আলোচনা হয়। উভয় পক্ষ নিয়মিত বাণিজ্য মেলা আয়োজন, বাজার সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও এমএসএমই (মাইক্রো, স্মল ও মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজেস) পর্যায়ে সহযোগিতা জোরদারে সম্মত হয়। একই সঙ্গে নবম বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের সভা পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে নেপালে আয়োজনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক এই পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাররা কোন প্রেক্ষাপটে শেয়ার কিনেছেন, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, এসব ব্যাংকের অডিটরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এসব কথা বলেন। অর্থ উপদেষ্টা জানান, শেয়ারহোল্ডারদের বিষয়টি জটিল এবং শুধু বক্তব্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। তিনি বলেন, আমানতকারীদের টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট। যাদের আমানত রয়েছে, তারা টাকা পাবেন। তবে শেয়ারধারীরা কী প্রেক্ষাপটে শেয়ার কিনেছেন—বাজারদরে কিনেছেন কি না এবং মালিকানা নেওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ৫ আগস্টের আগে এই পাঁচ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন যেসব অডিটর অডিট করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ব্যবস্থা অবশ্যই নেওয়া হবে। বিষয়টি পর্যালোচনায় রয়েছে, তবে এখনই সব বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলা ও ইরানে অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেলের দামে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। জ্বালানি দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে স্থানীয় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাওয়ার ও এনার্জি—এই দুই খাতে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অফশোর ড্রিলিং এবং কয়লার ব্যবহার। মধ্যপাড়া কয়লা খনির হার্ড রক কয়লা ব্যবহারের বিষয়টিও পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত। পে-স্কেল প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, কমিশনের ২১ সদস্য বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করছেন। খুব শিগগিরই তারা সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেবেন। কমিশনের কাজ চলমান রয়েছে এবং বিভিন্ন পক্ষ থেকে লিখিত ও সরাসরি মতামত নেওয়া হয়েছে। সব দিক বিবেচনায় নিয়েই সুপারিশ চূড়ান্ত করা হবে।
ইসলামি সামাজিক অর্থায়নের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্যসেবা ও টেকসই জীবিকায়নের পথ তৈরি করার লক্ষ্যে ‘গিভিং গ্রেস ফাউন্ডেশন’-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। জাকাত, সাদাকা, ওয়াকফ ও ক্বারযে হাসানাভিত্তিক কাঠামোর মাধ্যমে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করাই সংস্থাটির মূল লক্ষ্য। রাজধানীতে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আজ শনিবার দেশের বিশিষ্ট আলেম, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়নকর্মী, কর্পোরেট প্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের সদস্যরা অংশ নেন। এ সময় গিভিং গ্রেস ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি বোর্ড ও অ্যাডভাইজরি বোর্ডের সদস্যদের আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ট্রাস্টি ও অ্যাডভাইজরি বোর্ডের সদস্য শেখ মো. শফিকুল ইসলাম, মুহাম্মদ রাশিদ আল মাজিদ খান সিদ্দিকী মামুন, মুর্তজা জামান, মুহাম্মদ জুনায়েদুল মুনির, আরিফ বিন ইদ্রিস, কামরুজ্জামান, মো. জুলফিকার আলী সিদ্দিকী, আসিফ সাদ বিন শামস, সৈয়দ সাদিক রেজা, রেজা আহমেদ এবং আরিফুর রহমান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফাউন্ডেশনের ভিশন, মিশন ও পরিচালন কাঠামো উপস্থাপন করা হয়। এ উপলক্ষে “বাংলাদেশে জাকাত আন্দোলনকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়” শীর্ষক একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন ড. ওমর ফারুক, ড. আবুল কালাম আজাদ ও শাহ মোহাম্মদ ওয়ালি উল্লাহ। বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে জাকাতের সম্ভাব্য বার্ষিক পরিমাণ প্রায় এক লাখ কোটি টাকা হলেও এর খুব সামান্য অংশই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় আসে। পরিকল্পিত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই অর্থ দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত ব্যবস্থাপনা দাননির্ভরতা থেকে বেরিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই জীবনের পথে এগিয়ে নিতে পারে। তিনি বলেন, জাকাতকে একটি অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে হলে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও শরিয়াহসম্মত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে গিভিং গ্রেস ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইট (www.givinggrace.org.bd) উদ্বোধন করা হয়। একই সঙ্গে সংস্থাটির স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জীবিকায়ন, মানবিক সহায়তা ও আয়বর্ধক কার্যক্রম তুলে ধরা হয়। জাকাতভোগী নির্বাচন ও তহবিল ব্যবস্থাপনায় তথ্যভিত্তিক ও শরিয়াহসম্মত পদ্ধতির প্রয়োগের বিষয়েও বিস্তারিত জানানো হয়। ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শেখ মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “জাকাত শুধু দান নয়; এটি সমাজে ন্যায় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে এই আমানতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, গিভিং গ্রেস ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৩ হাজার ৫৯টি পরিবারসহ মোট ১১ হাজার ৪২৬ জন মানুষ উপকৃত হয়েছে। সংস্থাটি ১ হাজার ৪২৬টি চক্ষু অস্ত্রোপচারে সহায়তা দিয়েছে। চারটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে ২৫ হাজার ১১৯ জন রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা এবং অংশীদার হাসপাতালের মাধ্যমে ৭২ জন গুরুতর রোগীকে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মাসিক খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ১১২টি পরিবার এবং শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচিতে ৪১১ জন শিক্ষার্থী উপকৃত হচ্ছে। গিভিং গ্রেস ফাউন্ডেশনের শরিয়াহ তত্ত্বাবধান বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ মানজুর ই এলাহি জানান, সংস্থাটির সব কার্যক্রম ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা শরিয়াহসম্মত কি না, তা নিশ্চিত করতে এই বোর্ড স্বাধীনভাবে তত্ত্বাবধান করছে। বোর্ডের অন্য সদস্যরা হলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. জুবায়ের মোহাম্মদ এহসানুল হক এবং তাকওয়া মসজিদের খতিব মুফতি মাওলানা সাইফুল ইসলাম। কর্পোরেট জাকাত ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বক্তব্য দেন আইএফএ কনসালটেন্সির পরিচালক ড. মুফতি ইউসুফ সুলতান। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ফাউন্ডেশনের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হয় এবং ইসলামি আর্থিক নীতিমালার ভিত্তিতে টেকসই সামাজিক প্রভাব তৈরির অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। বর্তমানে গিভিং গ্রেস ফাউন্ডেশন দেশের পাঁচটি জেলা লালমনিরহাট, দিনাজপুর, সিরাজগঞ্জ, বরিশাল ও পটুয়াখালীতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং বিশ্বাসভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়নে কাজ সম্প্রসারণ করছে।