ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেন তিনি।
এ সময় তিনি রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, চামেলীবাগ গোল্ডেন ইরা কিডস স্কুল, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ, মতিঝিল এজিবি কলোনী কমিউনিটি সেন্টার, টিএন্ডটি উচ্চ বিদ্যালয় ও তেজগাঁও কলেজ ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত প্রিসাইডিং অফিসার ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি ভোটের সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
পরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, এখন পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, শেষ পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে।
এবারের নির্বাচন ঐতিহাসিক ও জাতির কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন উপদেষ্টা।
এর আগে সকাল ১০টায় রাজধানীর ডিওএইচএস বারিধারাস্থ ‘বারিধারা স্কলার্স ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ’ ভোটকেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন তিনি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আজ। একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট ২০২৬। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসন, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান এবং অন্তর্বর্তী শাসনের পর এ ভোটকে তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্রের সামনের দিনের গতিপথ নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও এরই মধ্যে একে ‘জেন জি আন্দোলন-পরবর্তী প্রথম নির্বাচন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। আরব বসন্তের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে গণ-আন্দোলন ও শাসন পরিবর্তনের পরবর্তী সময়েই রাষ্ট্র পুনর্গঠনের গতিপথ নির্ধারিত হয়। আরব দেশগুলোয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ রূপান্তর যাত্রা দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা, সংঘাত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে গড়িয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী এ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ, প্রাতিষ্ঠানিক ধারায় স্থিতিশীলতার দিকে যাবে, নাকি ফলাফল ঘিরে বিতর্ক ও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার চক্রে ঢুকে পড়বে—সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে মসৃণ ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত হয় কিনা তার ওপর। ফলাফল ঘিরে বিতর্ক, আস্থার সংকট ও রাজনৈতিক টানাপড়েন দেখা দিলে স্থিতিশীলতার বদলে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের। দেশের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯ আসনে আজ ভোটগ্রহণ হবে। ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ এবং হিজড়া (তৃতীয় লিঙ্গ) ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন। সারা দেশে স্থাপন করা হয়েছে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোট কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রে থাকছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষ। প্রায় ২৪ হাজার ভোট কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করবে সামগ্রিক নির্বাচনী পরিস্থিতি ও ভোটার উপস্থিতির হারের ওপর। উচ্চ ভোটার উপস্থিতি সাধারণত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা এবং জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ইঙ্গিত বহন করে। কিন্তু ভোটার উপস্থিতি যদি ৫০ শতাংশের কম হয়, তাহলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ভোটাররা কতটা নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন, প্রভাবমুক্ত পরিবেশ এবং কেন্দ্রভিত্তিক সহিংসতার মতো বিষয়ও নির্বাচনের মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এছাড়া ভোটগ্রহণের পর আরো বড় প্রশ্ন হলো ফলাফল মেনে নেয়ার রাজনৈতিক মানসিকতা। পরাজিত দল যদি ফলাফলকে প্রত্যাখ্যান করে রাজপথে নেমে যায়, তাহলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে পারে। সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘দেশের স্বার্থে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরবে। আর তা না হলে দেশ দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়ে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়ে সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলে বর্তমান উত্তেজনাও ধীরে ধীরে কমে আসবে।’ বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচনের ফলাফল-পরবর্তী উত্তেজনা ও অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ার নজির রয়েছে। তাই এবার রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা, দ্রুত ফল ঘোষণা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা ফলাফল গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে। এরই মধ্যে ভোটের আগের দিন বিভিন্ন জেলায় নগদ টাকা উদ্ধার ও আরো কিছু অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য গতকাল বলেন, ‘নির্বাচনের আগে যে ঘটনাগুলো ঘটছে তা উদ্বেগজনক। তবে পরবর্তী পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে তা নির্ভর করবে তিনটি পর্যায়ে—ভোটগ্রহণ, ভোট গণনা ও ফল ঘোষণা। নির্বাচন কমিশন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে আরো সতর্ক থাকতে হবে, যাতে গণনা ও ঘোষণার ক্ষেত্রে কোনো সংশয়-সন্দেহ তৈরি না হয়। কারণ শেষ পর্যন্ত ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতাই নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।’ কেবল কারিগরি দিক নয়, নৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও এখানে বড় বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যে দল পরাজিত হবে, তারা ফলাফলকে কীভাবে গ্রহণ করে এবং নাগরিক সমাজ ও পর্যবেক্ষকরা প্রক্রিয়াটি কীভাবে মূল্যায়ন করে এসবের ওপরই নির্ভর করবে নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি। মসৃণ ক্ষমতা হস্তান্তরের পথে কোনো বড় প্রতিবন্ধকতা যেন তৈরি না হয়, এটাই এখন আমাদের প্রধান প্রত্যাশা।’ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, এ নির্বাচন যদি একটি নতুন গণতান্ত্রিক উত্তরণের সূচনা হিসেবে ভূমিকা রাখে, সেটিই হবে বড় অর্জন। নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন বাহিনীর নয় লাখের বেশি সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনী ‘ইন এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় আগে থেকেই সারা দেশে মোতায়েন আছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এবার বিশেষ করে সেনাবাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের মাঠে যদি তারা ভোটার, প্রার্থী ও এজেন্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, কেন্দ্রভিত্তিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি অনিয়ম-সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়, তাহলে ভোটের গ্রহণযোগ্যতার পাশাপাশি পেশাদারত্বের একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। বলা যায়, নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারত্বের ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করছে গণতন্ত্রে উত্তরণ। এর ব্যতিক্রম হলে আরব বসন্তের মতো অভিজ্ঞতা হতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের। ২০১০ সালে তিউনিসিয়ায় জেসমিন বিপ্লবের মাধ্যমে যে আন্দোলনের সূচনা, তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মিসর, লিবিয়া, ইয়েমেন ও সিরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে। প্রথম ধাপে স্বৈরশাসকের পতন ঘিরে জনতার উচ্ছ্বাস ছিল প্রবল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বহু দেশে রাজনৈতিক রূপান্তর প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতায় রূপ নিতে পারেনি। মিসরে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব এলেও রাষ্ট্র পুনর্গঠনকালে রাজনৈতিক বিভাজন তীব্রতর হয়। লিবিয়ায় গাদ্দাফির পতনের পর প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সংঘাতে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং দীর্ঘকালীন গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। ইয়েমেনে শাসন পরিবর্তনের পরও আঞ্চলিক ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব দেশটিকে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। তিউনিসিয়া প্রথমে গণতান্ত্রিক উত্তরণের উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হলেও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বিভাজন ও অচলাবস্থা, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। এক পর্যায়ে দেশটি কর্তৃত্ববাদী শাসনেই ফিরে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এ দেশগুলোয় পুরনো ক্ষমতা কাঠামো ভাঙলেও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সংস্কার করতে পারেনি। এছাড়া রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্যের অভাব দীর্ঘ অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন ও বিনিয়োগ সংকট জনগণের অর্থনৈতিক প্রত্যাশাকে পূরণ করতে পারেনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে জনঅসন্তোষ বেড়ে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। ফলে গণ-অভ্যুত্থানের পরের নির্বাচনগুলো স্থিতিশীলতা আনার বদলে অনেক ক্ষেত্রে নতুন করে আরো গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘নির্বাচনের পর পরাজিত পক্ষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সেটাই নির্বাচন-পরবর্তী স্থিতিশীলতার বড় নির্ধারক। ১৯৯১ সালে ধরে নেয়া হয়েছিল আওয়ামী লীগ জিতবে। কিন্তু সেটা না হওয়ায় তারা ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছিল। তবে পরে তারা সংসদে গেছে। পরবর্তী সময়েও গ্রহণযোগ্য যে কয়টি নির্বাচন হয়েছে, সেগুলোতে ফলাফল নিয়ে আপত্তি থাকলেও বিরোধী দল সংসদে গেছে।’ তার মতে, ‘শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক দলগুলো সংসদীয় প্রক্রিয়ার ভেতরে থেকে কীভাবে এগোয়। বিরোধী পক্ষ যদি সংসদে অংশ নেয় এবং রাজনৈতিক বিরোধকে সংসদীয় কাঠামোর মধ্যেই ধরে রাখতে পারে, তাহলে তা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেবে। এর ইতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। যদি তা না হয় তাহলে অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে। যেমনটি আরব বসন্ত-পরবর্তী বহু দেশে দেখা গেছে।’ আরব বসন্তের বিপরীতে শ্রীলংকার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা ভিন্ন এক প্রেক্ষাপট দেখিয়েছে। ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকট ও গণবিক্ষোভে মাহিন্দা রাজাপাকশে সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, রাজস্ব সংস্কার ও ব্যয়সংকোচন নীতির পথ নেয় দেশটি। ২০২৪ সালে শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েক। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী শ্রীলংকাকে বিশ্লেষকরা দক্ষিণ এশিয়ার মডেল হিসেবে অভিহিত করেন। দেশটির অভিজ্ঞতা বলছে, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও মসৃণ ক্ষমতা হস্তান্তর ছাড়া গণ-আন্দোলনের পরবর্তী স্থিতিশীলতা টেকসই হয় না। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর শাসনভার গ্রহণ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। জন-আকাঙ্ক্ষা ছিল স্পষ্ট—দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর রাষ্ট্রকে আবার গণতান্ত্রিক পথে ফেরানো, দুর্নীতির পুরনো নেটওয়ার্ক ভাঙা, পুলিশ ও আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করাসহ রাষ্ট্র পুনর্গঠন। বলা যায়, রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করাই ছিল এ সরকারের মূল ম্যান্ডেট। যদিও গত দেড় বছরে রাষ্ট্র পুনর্গঠনে প্রত্যাশিত সংস্কার দৃশ্যমান হয়নি। মূল্যস্ফীতি কমেনি, বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটেনি, একই সঙ্গে বেকারত্ব বেড়েছে। বিপরীতে ক্ষমতা গ্রহণের পর কয়েক মাসে সরকারের সবচেয়ে সক্রিয়, দ্রুত ও দৃশ্যমান সিদ্ধান্তগুলো এসেছে এমন সব খাতে, যেগুলো রাজনৈতিক সংস্কারের চেয়ে বেশি ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ও কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার প্রাক্কালেও কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে বন্দর ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষাসংশ্লিষ্ট চুক্তি কিংবা চুক্তি প্রক্রিয়াকে কেউ কেউ ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারের নীতিগত পরিসর সংকুচিত করার ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে করা কিছু চুক্তির কারণে দেশ ভূরাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘এ সরকার বাংলাদেশকে একটা বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। গণসম্মতির বাইরে গিয়ে গোপনে ও অযৌক্তিকভাবে এমন কিছু দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের ঝুঁকি বাড়াবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘পরবর্তী সরকারের দায়িত্ব হবে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম বিশেষ করে এসব চুক্তি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা। কোন প্রক্রিয়ায়, কী যুক্তিতে এবং কার স্বার্থে এসব করা হয়েছে তা খুঁজে বের করতে হবে। এসব চুক্তির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে; তাই সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় এনে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও পদক্ষেপ নিতে হবে।’ বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রের পথে এগোতে পারবে, নাকি নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্ক ও আস্থার সংকট দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়াবে—আজকের দিনটি সেই দিকনির্দেশ নির্ধারণ করবে। তবে নির্বাচনের মাধ্যমে যদি একটি কার্যকর সংসদ গঠন ও সংস্কার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়া যায়, তাহলে সেটাই বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো যদি ফলাফল মেনে নিয়ে সহনশীল আচরণ করে, তাহলে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে।’ দেশে এখনো পরিপক্ব গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি, সেটি রাতারাতি অর্জিত হবে এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয় জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচনের আগে-পরে বিচ্ছিন্নভাবে সহিংসতা বা টাকাসহ গ্রেফতারের যে ঘটনাগুলো সামনে এসেছে তা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির দীর্ঘদিনের অসুস্থতার বহিঃপ্রকাশ। গণ-অভ্যুত্থান ঘটলেই সব ব্যাধির অবসান হয় না। রাষ্ট্রব্যবস্থা, আইন-কানুন, রাজনৈতিক আচরণ, এমনকি সামাজিক-সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আনতে হয়। গত ১৮ মাসে এসব ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল কিন্তু সেখানে একশভাগের একভাগ অগ্রগতিও হয়নি।’
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, এবারের ঐতিহাসিক নির্বাচন জাতির কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আজ দুপুরে রাজধানীর বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, চামেলীবাগ গোল্ডেন ইরা কিডস স্কুল, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ, মতিঝিল এজিবি কলোনী কমিউনিটি সেন্টার, টিএন্ডটি উচ্চ বিদ্যালয় ও তেজগাঁও কলেজ ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। উপদেষ্টা এসময় বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত প্রিজাইডিং অফিসার ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি ভোটের সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
তথ্য ও সম্প্রচার, পরিবেশ,বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, সব চ্যালেঞ্জ, অনর্থক বিতর্ক ও প্রচারণা পিছনে ফেলে আজকে আমরা ভোটের দিনে চলে এসেছি। জনগণ আজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘দেখেন এখানকার ভোটের আমেজ এবং ভোটারদের উপস্থিতি। মানুষ সত্যিকার অর্থেই ক্ষমতায়িত হয়েছে। তিনি তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরে আনন্দিত। সুশৃঙ্খলভাবে সবাই ভোট দিচ্ছে। লেটস সেলিব্রেট দিস। আসুন আমরা এই নির্বাচনটাকে,সরকারের এই প্রয়াসটাকে সেলিব্রেট করি।’ তিনি আজ ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোডে আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজে ভোট প্রদান শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন। সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘গতকাল পর্যন্ত শুনেছি ইলেকশন কি হবে? অনেকে এসএমএস করে জানতেও চেয়েছে। দেশের মানুষের শঙ্কা ছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটা হচ্ছে কি না।’ তিনি বলেন, ক্ষমতায় তো কখনই ছিলাম না। ছিলাম দায়িত্বে। দায়িত্বতো সারাজীবনের ব্যাপার। এটাকে প্রলম্বিত করা না করার ব্যাপার নাই। আগে বেলা’র প্রধান নির্বাহী হিসেবে পরিবেশ নিয়ে কাজ করেছি, এখন উপদেষ্টা হিসেবে পরিবেশের কাজ করেছি। আবার যখন চলে যাবো তখন বেলা’য় গিয়ে আবার পরিবেশ নিয়ে কাজ করবো। দেশটা নেতিবাচকতা ও সন্দেহের ভিত্তিতে এতোটা বছর রয়ে গেছে। আজকে ইলেকশনের দিনে, শান্তিপূর্ণ ভোটের দিনে এটা প্রমাণিত হলো যে যতরকমের কথাবার্তা ছিল নেতিবাচক, সেগুলো আসলে একটাও আমাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের পর ফলাফল ঘোষণার বিষয়টা আমাদের নয়,নির্বাচন কমিশনের। সুতরাং যখনই গেজেট নোটিফিকেশন হয়ে যাবে, শপথ হয়ে যাবে,তাক্ষৎনিকভাবেই আমরা দায়িত্ব হস্তান্তর করবো। আর এখনো পর্যন্ত আমরা দায়িত্বেই রয়েছি। প্রতিদিন রাষ্ট্রের কিছু না কিছু কাজ থাকেই। ফলে দায়িত্বে রয়েছি। যে মুহূর্তে শপথ হয়ে যাবে, সেই মুহূর্ত থেকে আমরা আর দায়িত্বে নাই।’