চট্টগ্রামে জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে ডিবি পরিচয়ে হেনস্তা ও মারধরের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক সোনা চোরাচালানের একটি চালান আটকের উদ্দেশ্যে বসানো চেকপোস্টে ভুল সন্দেহের শিকার হন এই ক্রিকেটার। পরিচয় দেওয়ার পরও ওসির নির্দেশে তাকে মারধর করে থানায় নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিমানবন্দর দিয়ে প্রায়ই সোনা চোরাচালানের ঘটনা ঘটে। শুক্রবার রাতেও সোনার একটি চালান পাচারের তথ্য পেয়ে লালখান বাজার ফ্লাইওভারের মুখে চেকপোস্ট বসানো হয় খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমানের নির্দেশে। ওই অভিযানে খুলশী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলামসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য এবং সোর্স অংশ নেন।
সূত্র জানায়, বিমানবন্দরে থাকা সোর্সের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা থামান ওই পুলিশ সদস্যরা। ওই অটোরিকশাতেই ছিলেন জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসান। পুলিশ সদস্যরা প্রথমে ধারণা করেছিলেন, নাঈম তার পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছেন বা ভুয়া পরিচয় দিচ্ছেন। এরইমধ্যে নাঈমকে নিয়ে বাকবিতণ্ডার মধ্যে লোকজন জড়ো হয় ঘটনাস্থলে। তাদের অনেকে নাঈমকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার বলে শনাক্তও করেন। কিন্তু তাতে কর্ণপাত করেনি পুলিশ। বরং সেখানে থাকা পুলিশের সোর্স নাঈমকে পেটানও।
পরে ওসি আরিফুর রহমানের সঙ্গে কথা বলে নাঈম হাসানাকে থানায় নিয়ে যান এসআই শফিকুল ইসলাম।
থানায় নেওয়ার পরও নাঈম নিজেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় দেন। নিজের পরিচয়পত্র দেখানোর পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে কথা বলার একপর্যায়ে নাঈমকে হুমকি দিয়ে চোখ নামিয়ে কথা বলতে বলেন ওসি। ঠিক ওই মুহূর্তেই ওসির মোবাইলে একটি কল আসে। ফোনে কারও সাথে কথা বলার পর ওসির সুর পুরোপুরি চেঞ্জ হয়ে যায়। তখন উনি আমাকে বলেন, ‘ভাইয়া আপনি বসেন।’ অথচ প্রথমে ওনার আচরণ ছিল অন্যরকম।
নগর পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সোনা চোরাচালানের তথ্যের ভিত্তিতেই ওই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। তবে ধারণা করা হচ্ছে, যে অটোরিকশায় নাঈম ছিলেন সেটিতে কোনো চোরাকারবারি ওঠার কথা ছিল অথবা আগে কোনো চোরাকারবারি নেমে যাওয়ার পর সেখানে নাঈম উঠেছিলেন। এ কারণেই তিনি পুলিশের সন্দেহের মধ্যে পড়েন।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বিমানবন্দর ফেরত যাত্রীদের লক্ষ্য করে তল্লাশির বিষয়ে আগে থেকেই তথ্য ছিল। সাধারণত এ ধরনের অভিযান ডিবি পুলিশ বেশি পরিচালনা করে থাকে। তবে ওসি আরিফ খুলশী থানায় যোগ দেওয়ার পর থেকে প্রায় সময় অভিযানে নামেন। তার আওতাধীন এলাকায় লালখান বাজার ফ্লাইওভারে চেকপোস্ট বসানো হয়। সেখানে বিমানবন্দরে যাতায়াতকারীদের থামানো হয়।
খুলশী থানার উপ-পরিদর্শক পদমর্যাদার একজন বলেন, সোনা বহনের তথ্য পেয়েই ওসি স্যারের নির্দেশে এসআই শফিকুল ইসলাম অভিযান পরিচালনা করেন। তার নির্দেশেই নাঈমকে থানায় নেওয়া হয়।
তবে খুলশী থানার ওসি আরিফুর রহমানের দাবি উল্টো। তিনি দাবি করছেন এই অভিযানের বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না।
ঢাকা পোস্টকে ওসি বলেন, অভিযানের বিষয়ে ওই এসআই আমাকে কিছু জানাননি। রাতে কাজ শেষে আমি থানা থেকে বের হবো এমন সময়ে তাকে ধরে নিয়ে আসে এসআই শফিকসহ তার টিম। এ সময় আমি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করি এবং পরিচয় পেয়ে তাকে ছেড়ে দিই। আমার নির্দেশনা না নিয়ে অভিযানে যাওয়ায় ওই এসআইয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে ওসির এই বক্তব্যের সঙ্গে নাঈমের হাসানের বাবার বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। নাঈমের বাবা অভিযোগ করে বলেন, থানায় এসে পরিচয় দেওয়ার পরও ওসি আরিফ হোসেন আমার ছেলেকে অপমানজনক কথা বলেছেন।
নাঈম হাসানের বাবা মাহবুব আলম বলেন, রাতে খবর পেয়ে আমি দ্রুত থানায় যাই। পুলিশ আমাকে প্রথমে থানায় ঢুকতেই দেয়নি; দূরে গিয়ে বসতে বলে। পরে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে থানায় প্রবেশের সুযোগ পাই। জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় পাওয়ার পরও আমার ছেলেকে ন্যাক্কারজনকভাবে মারধর করে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। থানায় এসে পরিচয় দেওয়ার পরও ওসি আরিফ হোসেন আমার ছেলেকে অপমানজনক কথা বলেছেন।
নাঈমের গলা টিপে পুলিশ বলে ‘তুই গাড়িতে ওঠ’
শুক্রবার রাতে প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ খেলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফিরে বিমানবন্দর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বাসায় যাচ্ছিলেন নাঈম। রাত সাড়ে ১১টার দিকে লালখান বাজার ফ্লাইওভারের মুখে তাকে বহনকারী অটোরিকশা থামানো হয়।
এর পরে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নাঈম হাসান বলেন, আমি পুলিশকে বললাম, আপনি আমার ব্যাগ চেক করেন দরকার হলে। আমাকে গলা টিপে ধরে বললো– ‘তুই গাড়িতে ওঠ’। এই বলে আমাকে গাড়িতে তুলল। আমি “আপনি আমার গলা টিপে ধরছেন কেন” বলে ধাক্কা দিয়ে বের হয়ে গেলাম। এরপর ওরা গলা টিপে ধরেই আমাকে মেরেছে এবং হেনস্তা করেছে। পুলিশ ছিল দুজন, আরেকজন পাঞ্জাবি পরা মানুষ ছিল। ও কোনো পরিচয় দেয়নি, মারছিল পাইপ দিয়ে। পরে ১০০-২০০ মানুষ ছিল সেখানে, তারা আমার পরিচয় দিয়েছে, তবুও আমাকে মারছিল। বলছিল “তুই আসামি, কথা বলবি না”। আমি আইডি কার্ড দেখিয়েছি, তাও ওরা আমাকে মারছিল।’
নাঈম হাসান বলেন, ‘গাড়িতে থাকতেই ওসির সঙ্গে কথা বলেছে, উনি থানায় নিয়ে আসতে বলেন। এরপর আমাকে ব্যাগসহ এখানে (থানায়) এনে বলা হয় “স্যার (ওসিকে) নিয়ে আসছি।” আজ পর্যন্ত পুলিশ, আর্মি আমাদের ডাকলে দাঁড়ায়, উনারা চেক করে ছেড়ে দেয়। কিন্তু গায়ে হাত দেবে কেন? সোর্সটা মেরেছে, পুলিশও লাঠি দিয়ে মেরেছে। আমি সুষ্ঠু বিচার চাই। এটা স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার কিছু নেই। আজকে আমাকে মেরেছে, আরেকদিন অন্য কাউকে মারলে তার জন্য কেউ আসবে?’
এ ঘটনায় শনিবার সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে খুলশী থানায় মামলা করেছেন। মামলায় খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল ও পুলিশ সোর্স সোহেলকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগে মারধর ও অপহরণের চেষ্টার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার পর খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল ও অভিযানে থাকা আরেক পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, নাঈম ন্যায়বিচার পাবেন। পুলিশ সদস্য যেই হোক না কেন, এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশিং প্রক্রিয়ায় কাউকে মারধরের সুযোগ নেই। চোরাচালান সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সদস্যরা গিয়েছিলেন কি না, তথ্যের উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল এবং অভিযান পরিচালনার প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল কি না—সব বিষয় যাচাই করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ সদস্যরা চরম অপেশাদার আচরণ করেছেন
পুলিশের এ আচরণের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর আজ (শনিবার) বেলা ১১টার দিকে নাঈম হাসানের সঙ্গে দেখা করতে তার বাসায় যান সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। সেখানে তিনি স্বীকার করেন, পুলিশ সদস্যরা চরম অপেশাদার আচরণ করেছেন।
কমিশনার বলেন, জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযুক্ত তিন পুলিশ সদস্যকে ইতোমধ্যেই দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। এ ছাড়া ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযুক্ত একজনকে আটক করা হয়ছে। এ ঘটনায় বিভাগীয় মামলার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সিএমপির একাধিক সূত্র জানায়, ২০১৯-২০ সালের দিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে পরিদর্শক আরিফুর রহমান দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এলাকা কোম্পানিগঞ্জ থানার ওসির দায়িত্বে ছিলেন। ওই সময়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের শ্রেষ্ঠ ওসিও নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ২০২১-২০২২ সালে কুমিল্লার দেবিদ্বার থানার ওসি ছিলেন আরিফুর। ওইসময় ওই এলাকার চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. জসিম উদ্দিন সরকারের কাছ থেকে স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে ১ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছিলেন। বিষয়টি পরবর্তীতে জানাজানি হলে পুলিশ সদরদপ্তর তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক ব্যবস্থা নেয়। পরবর্তীতে সিএমপির বিশেষ শাখাতেও কাজ করেন তিনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন হলে হঠাৎ নিজেকে ছাত্রদলের সাবেক নেতা বলে পরিচয় দিতে থাকেন তিনি। এই পরিচয়ে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানায় যোগ দেন তিনি। সেখানেও ভূমি দখল এবং মাদক কারবারিদের সহায়তার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ সময়ে তার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলনও করেন ভুক্তভোগীরা। এ ছাড়া নিজের সহকর্মী ও পার্শ্ববর্তী থানা পাঁচলাইশের ওসি মোহাম্মদ সোলাইমানকে নিয়ে বিষোদগার করেন তিনি। তালিকাভুক্ত এক সন্ত্রাসীর সঙ্গে ওসি আরিফের একটি কথোপকথন ছড়িয়ে পড়লে সহকর্মীকে নিয়ে তার নানা আপত্তিকর মন্তব্যও শোনা যায়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
খেলার মাঠেও শৃঙ্খলা এবং দায়িত্ববোধের উদাহরণ হিসেবে আবারও প্রশংসা কুড়িয়েছেন জাপানের সমর্থকরা। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর অন্য দর্শকদের মতো তড়িঘড়ি স্টেডিয়াম ত্যাগ না করে, পুরো গ্যালারি পরিষ্কার করে তবেই মাঠ ছাড়েন তারা। জাপানি সমর্থকদের জন্য অবশ্য এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও প্রতিটি ম্যাচের পর একই দৃশ্য দেখা গিয়েছিল। শুধু নিজেদের দলের ম্যাচ নয়, অন্য দলের খেলা দেখতে গিয়েও গ্যালারি পরিষ্কার করার নজির স্থাপন করেছিলেন তারা। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টে নিজেদের প্রথম ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের মুখোমুখি হয় জাপান। রোমাঞ্চকর সেই ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হয়। তবে খেলার ফলের পাশাপাশি আলোচনায় উঠে আসে জাপানি সমর্থকদের অসাধারণ দায়িত্বশীল আচরণ। ম্যাচ শেষে ডালাসের স্টেডিয়ামে দেখা যায়, গ্যালারিতে পড়ে থাকা পানির বোতল, খাবারের মোড়কসহ বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা নিজেরাই সংগ্রহ করছেন জাপানের সমর্থকরা। বড় প্লাস্টিকের ব্যাগে সেগুলো ভরে নির্ধারিত বর্জ্য ফেলার স্থানে নিয়ে যান তারা। পুরো এলাকা পরিষ্কার করার পরই স্টেডিয়াম ত্যাগ করেন। এই ঘটনার ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ফুটবলপ্রেমীরা তাদের এই সচেতনতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধের ভূয়সী প্রশংসা করেন। মূলত জাপানের ক্রীড়া সংস্কৃতিরই অংশ এই অভ্যাস। দেশটির ঘরোয়া ফুটবল লিগের ম্যাচগুলোতেও খেলা শেষে সমর্থকদের স্টেডিয়াম পরিষ্কার করতে দেখা যায়। তাদের বিশ্বাস, খেলা দেখতে গিয়ে যে আবর্জনা তৈরি হয়, সেটি পরিষ্কার করার দায়িত্বও দর্শকদেরই। সে দায়িত্ববোধ থেকেই তারা নিয়মিত এ কাজ করে আসছেন। বিশ্বের বিভিন্ন ক্রীড়া আসরে বারবার একই চিত্র ফুটে ওঠে— খেলা শেষ, দর্শকশূন্য হচ্ছে গ্যালারি, আর হাতে প্লাস্টিকের ব্যাগ নিয়ে স্টেডিয়াম পরিষ্কারে ব্যস্ত জাপানের সমর্থকরা। দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের এই দৃষ্টান্ত আবারও বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হলো।
চলমান ফুটবল বিশ্বকাপে প্রায় ১৩ হাজার আর্জেন্টাইন সমর্থকের স্টেডিয়ামে প্রবেশ ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চেয়েছে দেশটির সরকার। সন্তানদের মৌলিক চাহিদা ও নিয়মিত ভরণপোষণ (চাইল্ড সাপোর্ট) না দেওয়া এবং বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এ লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তালিকা পাঠানো হয়েছে। তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের বিশ্বকাপ চলাকালে স্টেডিয়ামে প্রবেশ ঠেকাতে সহযোগিতা চেয়েছে আর্জেন্টিনার সরকার। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ ব্যক্তির বিরুদ্ধে সন্তানদের ভরণপোষণ বা ‘চাইল্ড সাপোর্ট’ বকেয়া রাখার অভিযোগ রয়েছে। আর্জেন্টিনা সরকারের ‘সেফ স্ট্যান্ডস’ কর্মসূচির আওতায় এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য যারা সন্তানদের মৌলিক চাহিদার অবহেলা করে ফুটবল ম্যাচ দেখার পেছনে টাকা ও সময় খরচ করে তাদেরকে চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা। আর্জেন্টিনা সরকারের মনে করে, যারা নিজের সন্তানের মৌলিক দায়িত্ব পালন করেন না, তাদের বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। এ বিষয়ে বুয়েনস আইরেসের মেয়র হোর্হে মাখরি বলেন, ‘যদি কেউ নিজের সন্তানের প্রয়োজন মেটাতে না পারে, তাহলে তার কোনো স্টেডিয়ামে প্রবেশের অধিকার থাকা উচিত নয়।’ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সম্প্রসারিত হওয়ার পর থেকে ‘সেফ স্ট্যান্ডস’ কর্মসূচির আওতায় আর্জেন্টিনার ১ হাজার ৩২৮টি ফুটবল ম্যাচে ৪০ লাখের বেশি দর্শককে যাচাই করা হয়েছে। এ সময় ১ হাজার ১৬৬ জনের বিরুদ্ধে বিদ্যমান গ্রেপ্তারি পরোয়ানা শনাক্ত করা হয় এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রসঙ্গত, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের এবারের আসরেও শিরোপার অন্যতম দাবিদার। ‘জে’ গ্রুপে লিওনেল স্কালোনির দল প্রথম ম্যাচ খেলবে আলজেরিয়ার বিপক্ষে। আগামী ১৭ জুন বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় ম্যাচটি মাঠে গড়াবে। গ্রুপ পর্বের পরের দুই ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়া ও জর্ডান।
উত্তর আমেরিকার তিন দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে যৌথভাবে পর্দা উঠেছে বিশ্ব ফুটবলের মহোৎসব ‘ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬’-এর। বহু বছর পর আবারও এই মেগা আসরের অন্যতম আয়োজক হিসেবে ফিরেছে ফুটবলপ্রেমী দেশ মেক্সিকো। আর নিজেদের দেশের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের ঘাটতি রাখতে চায় না মেক্সিকান সরকার। বিশ্বকাপের সময় রাস্তায় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং নিটোল নিরাপত্তা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে মেক্সিকোর প্রধানমন্ত্রী ক্লদিয়া শিনবাউম এক বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছেন। এই নির্দেশনায় সব সরকারি কর্মচারীকে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশটির সব স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে স্কুলগুলোতে অনলাইন ক্লাস চালু হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি। বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ ফুটবল দর্শক মেক্সিকোয় পা রাখছেন। বিদেশী পর্যটক ও দর্শকদের যাতায়াত যেন কোনো ধরনের ভোগান্তি বা ট্রাফিক জ্যামের মুখে না পড়ে, সে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে মেক্সিকান প্রশাসন। সরকারের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, মেক্সিকো সিটিতে অবস্থিত সমস্ত প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থাগুলির কর্মীদের আপাতত অফিস পরিহার করে বাড়ি থেকে কাজ করতে বলা হয়েছে। তবে জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের মতো জরুরি সেবাগুলোকে এই সাধারণ ছুটির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, এই খাতের কর্মীরা যথারীতি মাঠে থেকে দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আপাতত বন্ধ রাখার নির্দেশ কার্যকর করা হয়েছে। সরকারি দপ্তরের পাশাপাশি দেশের বেসরকারি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিগুলোকেও তাদের কর্মীদের এ সময়ে বাড়ি থেকে কাজ করানোর বিষয়ে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছে সরকার। উল্লেখ্য, এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো মোট ৪৮টি দেশের ১২৪৮ জন ফুটবলার অংশ নিচ্ছেন। ফুটবল ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে বড় ও বর্ধিত পরিসরে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। উত্তর আমেরিকার তিন দেশে টুর্নামেন্টটি অনুষ্ঠিত হলেও মেক্সিকোর ভাগে পড়েছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও হাইভোল্টেজ ম্যাচ, যা সফলভাবে সম্পন্ন করতে মেক্সিকান সরকার পুরো প্রশাসনকে ঢেলে সাজিয়েছে।