৯ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে লাবণী থেকে কলাতলী পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সৈকত ঘুরে অন্তত ১৫টি অংশে ভাঙনের চিত্র দেখা গেছে। কোথাও জিও ব্যাগ ছিঁড়ে গেছে, কোথাও নিচ থেকে বালু সরে গিয়ে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছে। আবার কোথাও বালুচর কেটে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ খাল।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, জোয়ারের ধাক্কায় অনেক জায়গায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ছিঁড়ে গেছে। শুধু জিও ব্যাগ দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে সমুদ্রভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়। প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি পুনর্গঠনে সাগরলতা, নিশিন্দাসহ উপকূলীয় উদ্ভিদ লাগানো প্রয়োজন। বালিয়াড়ি উঁচু ও শক্তিশালী হলে তা ঢেউয়ের আঘাত থেকে সৈকতকে প্রাকৃতিকভাবে রক্ষা করতে পারে।
কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আশরাফুল হক বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও বড় ঢেউয়ের আঘাতে জিও ব্যাগের বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভাঙনপ্রবণ এলাকায় সাময়িকভাবে বাঁশ ও কাঠের খুঁটি ব্যবহারের মতো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।
৩২ বছর ধরে লাবণী পয়েন্টে শামুক-ঝিনুকের ব্যবসা করেন বাহারছড়ার বাসিন্দা মফিজুর রহমান। তাঁর চোখের সামনে গত পাঁচ বছরে সৈকতের প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট বালুচর সাগরে বিলীন হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
মফিজুর রহমান বলেন, তিন দশক আগে বর্তমান সৈকতের জায়গা থেকে সমুদ্র অনেক দূরে ছিল। সেখানে পর্যটকদের বসার জন্য চেয়ার-ছাতা বসানো হতো। এখন ধীরে ধীরে বালুচর ভেঙে সমুদ্রের পানি ওপরে উঠে আসছে। প্রতিবছর জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তাতে ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না।
কক্সবাজার কিটকট (চেয়ার-ছাতা) ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, কলাতলী থেকে লাবণী পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার সৈকতে আগে বিশাল বালুচর ছিল। এখন লাবণী, কলাতলী ও সি-গাল পয়েন্টের কয়েকটি অংশে ভাঙন ও গর্ত তৈরি হয়েছে। এতে পর্যটকদের গোসল ও হাঁটার জায়গাও কমে এসেছে।
লাবণী পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, ভাটার সময় পর্যটকেরা জিও ব্যাগের পশ্চিম পাশে বসানো চেয়ারে বসে সমুদ্র দেখছেন। বালুচরে তৈরি হয়েছে অসংখ্য গর্ত ও কয়েকটি লম্বা খাল। সেগুলো পার হয়ে পর্যটকেরা পানির দিকে যাচ্ছেন।
দক্ষিণ দিকে সুগন্ধা পয়েন্টে অবশ্য একই সময়ে পর্যটকের ভিড় ছিল বেশি। প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় হাজারো পর্যটক দেখা গেলেও সেখানে ভাঙনের চিত্র তুলনামূলক কম।
সৈকতের বিভিন্ন অংশে দেখা যায়, একের পর এক ঢেউ জিও ব্যাগের বাঁধে আছড়ে পড়ছে। কোথাও জিও ব্যাগ বিলীন হয়েছে, কোথাও কয়েক ফুট গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে। কোথাও আবার জিও ব্যাগ ছিঁড়ে বালু বেরিয়ে গেছে।
সৈকতে পর্যটকদের উদ্ধার তৎপরতায় নিয়োজিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সি-সেফ লাইফগার্ডের কর্মী মো. ফারুক ও জয়ানাল আবেদীন বলেন, লাবণী পয়েন্ট থেকে উত্তর দিকে ডায়াবেটিকস পয়েন্ট পর্যন্ত জিও ব্যাগ দেওয়ার পরও ভাঙন কমেনি। বরং বিভিন্ন অংশে ভাঙন বেড়েছে বলে তাঁদের পর্যবেক্ষণ।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুর রশিদ বলেন, বালুচর ও বালিয়াড়ি ভেঙে ঝাউগাছও সাগরে পড়ে যাচ্ছে।
ভাঙনে ভোগান্তিতে পড়ছেন পর্যটকেরাও। ঢাকার পর্যটক ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, ছবি ও ভিডিওতে কক্সবাজার সৈকতের যে চিত্র দেখেছেন, বাস্তবে এসে তার সঙ্গে মিল পাননি। বালুচরের গর্ত ও ছড়িয়ে থাকা জিও ব্যাগের কারণে শিশুদের নিয়ে হাঁটতেও সমস্যা হচ্ছে।
কুমিল্লার পর্যটক সাজ্জাদুল কবীর বলেন, বালু সরে গিয়ে তৈরি হওয়া গর্তে পা আটকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। দ্রুত ভাঙন রোধ করা না গেলে পর্যটকেরা আগ্রহ হারাতে পারেন।
সৈকতের চেয়ার-ছাতা ব্যবসায়ী মো. আলমগীর বলেন, জোয়ারের সময় চেয়ার সরিয়ে জিও ব্যাগের পেছনে নিতে হয়। এতে পর্যটকেরা চেয়ার ব্যবহার করতে চান না। জিও ব্যাগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ব্যবসার পাশাপাশি সৈকতের সৌন্দর্যও নষ্ট হচ্ছে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলের ১৯৮৯ থেকে ২০২৪ সালের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ৩৫ বছরে এই উপকূলে ১ হাজার ৮৫ হেক্টর ভূমি সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়েছে। বিপরীতে পলি জমে নতুন করে ভূমি তৈরি হয়েছে ২৮৪ হেক্টর এলাকায়। অর্থাৎ পলি জমে যতটা ভূমি তৈরি হয়েছে, ক্ষয়ের পরিমাণ তার প্রায় চার গুণ। গবেষকেরা বলছেন, ঢেউ, সাগরের স্রোত, জোয়ার, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানুষের নানা কর্মকাণ্ডও এই ভাঙনের জন্য দায়ী।
কক্সবাজার উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার বিষয়টিও গবেষণায় উঠে এসেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের জন্য সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, কক্সবাজারে বছরে গড়ে ৫ দশমিক ০৫ মিলিমিটার এবং মহেশখালীতে ৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এই হার বৈশ্বিক গড়ের সাম্প্রতিক বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি। তবে গবেষকেরা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নয়, ভূমির ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাওয়া, জোয়ারের ধরন এবং উপকূলের ভূ-আকৃতির পরিবর্তনের মতো বিষয়ও ভূমিকা রাখে।
কক্সবাজার উপকূলের ভাঙনের ঝুঁকি নিয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণাতেও জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং মানুষের হস্তক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণাটিতে ভাঙনের ঝুঁকিতে জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব ২০ শতাংশ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মানুষের হস্তক্ষেপের প্রভাব ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ হিসেবে ধরা হয়েছে। ফলে কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলের ভাঙনকে শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পাশাপাশি উপকূলে মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
জলবায়ুবিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব থেকে কক্সবাজার রক্ষা করা না গেলে আগামী কয়েক দশকে পর্যটন শহর বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।
কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলে ভাঙনের কারণ একক নয়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একটি বিশেষজ্ঞ দল সৈকতের ভাঙন পর্যালোচনা করে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, উচ্চ জোয়ার, ঢেউ এবং প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি নষ্ট হওয়ার মতো কারণ চিহ্নিত করেছিল। দলটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা, আধা প্রকৌশল ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকৌশলগত ব্যবস্থা—তিন ধরনের পদক্ষেপের সুপারিশ করে।
সমুদ্রবিজ্ঞানী ও জলবায়ুবিষয়ক গবেষক ড. আবদুল কাইয়ুম বলেন, কক্সবাজারের দীর্ঘ সৈকতে জিও ব্যাগ ব্যবহার করে স্থায়ী সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়। উপকূল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
আবদুল কাইয়ুম বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘ইন্টেগ্রেটেড কোস্টাল জোন ম্যানেজমেন্ট’ বা সমন্বিত উপকূলীয় অঞ্চল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সৈকত রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি সংরক্ষণ, সৈকতে নিয়মিত বালি পুনঃস্থাপন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকৌশলগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
গবেষণাতেও কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলে ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনায় সৈকতে বালি পুনঃস্থাপন বা ‘বিচ নরিশমেন্ট’ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, বালিয়াড়ি উপকূলের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। কৃত্রিম বাঁধের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে সাগরলতা, নিশিন্দাসহ বালু ধরে রাখতে সক্ষম উপকূলীয় উদ্ভিদ দিয়ে বালিয়াড়ি পুনর্গঠন করা যেতে পারে।
কক্সবাজার বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. আয়াছুর রহমান বলেন, জোড়াতালি দিয়ে প্রতিবছর জিও ব্যাগ ফেলার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বালু পুনঃস্থাপন ও প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ব্যবস্থাপনার মতো প্রকৃতিনির্ভর উদ্যোগ বিবেচনা করা যেতে পারে।
সৈকতে জিও ব্যাগের প্রতিরক্ষা বাঁধ দিচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সংস্থাটির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, সমুদ্রভাঙন রোধে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির কাজ চলছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে ভাঙন রোধে কাজ শুরু করা হবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) ১৭তম সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার আট দিন পর নিজের দফতর ছেড়েছেন। রাকসুর কোষাধ্যক্ষের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার (৪ নভেম্বর) রাতে তিনি দফতর ছাড়েন। বুধবার রাত ৮টার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে দফতর ছাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন সালাহউদ্দিন আম্মার। ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, প্রিয় রাবিয়ানরা! আপনারা আমার মতো নগণ্য মানুষকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে এই সম্মান দিয়েছিলেন। আমি আপনাদের জন্য নিজের সামর্থ্য, সময়, শ্রম দিয়ে পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। অনেক ভুল করেছি, সেগুলোর জন্য আপনাদের কাছে আন্তরিক ক্ষমাপ্রার্থী। আমি আপনাদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। আমাকে আপনারা একটা নতুন জীবন দিয়েছেন। আপনারা আমাকে নির্বাচিত না করলে হয়তোবা নীরবে-নিভৃতে হারিয়ে যেতাম কচুরিপানার মতো। দফতর ছাড়ার বিষয়ে আম্মার লেখেন, প্রশাসনের চিঠি অনুযায়ী ৪ নভেম্বর রাকসুর চাবি ও আসবাবপত্র হস্তান্তরের কথা ছিল। বড় একটি দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়েছেন জানিয়ে তিনি লেখেন, শেষ সময়টা ভাগ করে নিয়েছেন রাকসুর এক বছরের সঙ্গী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে। ভবিষ্যৎ কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন থেকেই পরবর্তী রাকসুর লড়াই এবং বিগত ৯ দফা আন্দোলনের লড়াই রাবি সংস্কার আন্দোলন প্ল্যাটফর্মে চলবে। তিনি আরও লেখেন, এখান থেকেই আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। শিক্ষার্থীদের জরুরি যেকোনও সমস্যায় তাকে স্মরণ করার আহ্বান জানিয়ে আম্মার বলেন, শিক্ষার্থীদের আর্থিক বিষয়গুলো ইনশাআল্লাহ নভোকালচার প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করবেন।
রংপুর নগরীতে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাট ও স্থাপনা উচ্ছেদে সিটি করপোরেশনের অভিযান চলাকালে সাংবাদিকদের হেনস্তা ও মারধরের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমের অন্তত আটজন সাংবাদিককে ঘেরাও করে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। তাদের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেলে নগরীর কলেজ রোডের খামার মোড় থেকে লালবাগ রেলক্রসিং পর্যন্ত সড়ক ও ফুটপাতের অবৈধ দোকানপাট ও স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালায় সিটি করপোরেশন। এ সময় অভিযানে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন কয়েকজন দখলদার। খামার মোড়ে অভিযানের তথ্য সংগ্রহ ও ভিডিও ধারণ করতে গেলে সাংবাদিকেরা বাধার মুখে পড়েন। এ সময় ঢাকা পোস্টের ফরহাদুজ্জামান ফারুক, সময় টেলিভিশনের রেদওয়ান হিমেল, খবরের কাগজের সেলিম সরকার, আজকের পত্রিকার নূর মোহাম্মদ, আগামীর সময়ের লিজেন আহমেদ প্রান্ত, বার্তা২৪ ডটকমের নভেল চৌধুরী, আরএনবি নিউজের মাহজাবিন মৌ এবং আমাদের প্রতিদিনের শরিফুল ইসলাম সুমনের ওপর কয়েকজন চড়াও হন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাংবাদিকদের অভিযোগ, তাদের ঘেরাও করে আটকে রাখা হয়। এ সময় গালিগালাজ, হেনস্তা ও মারধরের চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা চলে। পুলিশের উপস্থিতিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে এমন আচরণের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযানের দায়িত্বে থাকা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি জানানো হলেও তারা তখন কোনো পদক্ষেপ নেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিব হাসানকে বিষয়টি জানান সাংবাদিকেরা। তিনি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না নিলেও পরে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনার ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এদিকে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে বাধা উপেক্ষা করে উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে সিটি করপোরেশন। অভিযান সম্পর্কে রংপুর জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাজী মো. শাহান বলেন, ফুটপাতে নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে গত এক মাস ধরে জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও মেট্রোপলিটন পুলিশ যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করছে। যেসব সড়ক ও ফুটপাত এখনো অবৈধ দখলে রয়েছে, সেগুলো দখলমুক্ত করা হবে। তিনি আরও বলেন, হাইকোর্টের বিভিন্ন নির্দেশনা অনুযায়ী সড়ক ও ফুটপাত দখল করে দোকানপাট, খাটাল বা পসরা বসানোর সুযোগ নেই। জনদুর্ভোগ কমানো এবং সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।
গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনের সময় দুপক্ষের সংঘর্ষের ভেতর পড়ে গার্মেন্টসকর্মী মো. তৌফিক হোসেন কীভাবে নিহত হয়েছেন, সেটি নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। প্রথমে দাবি করা হচ্ছে, তিনি বিক্ষোভকারীদের ভিডিও ধারণ করায় শ্রমিকদের হাতে মারধরের শিকার হন। কিন্তু ওই সময় ভুক্তভোগীর সঙ্গে থাকা তার এক বন্ধু কালবেলা অনলাইনের সঙ্গে কথা বলার সময় দাবি করেছেন, ‘একটি গার্মেন্টসের ভাড়া করা লোকের মারধরের কারণে তৌফিক মারা গেছেন।’ গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার উত্তরার শিনশিন জাপান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তৌফিকের মৃত্যু হয়। আগের দিন সোমবার আন্দোলন চলাকালে হামলার ঘটনা মোবাইল ফোনে ধারণ করার চেষ্টা করেন তৌফিক। এ সময় হামলাকারীরা তার ওপর চড়াও হয়ে বেধড়ক মারধর করে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে আন্দোলনরত শ্রমিকরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করান। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। মঙ্গলবার দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। গার্মেন্টের ভাড়া করা লোকের মারধরে তৌফিকের মৃত্যু হয়েছে দাবি করা বন্ধুর নাম মো. সাব্বির হোসেন। তিনি নিহতের সহকর্মীও। বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে কালবেলা অনলাইনকে তিনি বলেন, ‘তৌফিকের কাছে স্মার্টফোনই ছিল না। তার সঙ্গে একটি বাটন ফোন ছিল। ভিডিও করবে কীভাবে?’ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সাব্বির বলেন, ‘আমরা তখন লাঞ্চ করতে বাসায় আসি। খাওয়া-দাওয়া করে অফিসের দিকে যাওয়ার সময় একটি গার্মেন্টসের সামনে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখি দুপক্ষ হামলা করতেছে। এখানে ওই গার্মেন্টসের মালিক কিছু লোক রেখেছিল যারা বিক্ষোভকারীদের দৌড়াচ্ছিল। তো আমরা যাওয়ার সময় বিক্ষোভকারী ও ওই গার্মেন্টসের ভাড়া করা লোকেরা সামনাসামনি হামলা করলে আমরা দুইজন মাঝে পড়ে যাই।’ সাব্বির যে গার্মেন্টসের নাম বলেছেন, তাদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই করছে কালবেলা। ভুল উচ্চারণের কারণে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত গার্মেন্টসটির সঠিক নাম জানা সম্ভব হয়নি। সাব্বির বলেন, ‘গার্মেন্টসের ভাড়া করা লোকজন বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া দিলে তারা দৌড়ে অন্যদিকে চলে যায়। আমিও দৌড়ে রাস্তার অন্যপাশে চলে যাই। তখন পিছন দিকে তাকিয়ে দেখি তৌফিক নিচে পড়ে আছে। তাকে মারধর করেছে ভাড়া করা লোকেরা।’ তৌফিকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে গতকাল থেকে এখন পর্যন্ত কালবেলা একাধিক মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে। গাজীপুরের কয়েক স্থানীয় বাসিন্দা বলেছেন, আন্দোলনের সময় গার্মেন্টস রক্ষা করতে অনেক মালিক নিজেদের লোক এনেছিল। তারা গার্মেন্টস পাহারা দিচ্ছিল। তৌফিক তাদের মারধরের শিকার হয়ে মারা যেতে পারেন বলে ধারণা। নিহত তৌফিক শেখ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের তবি খাঁর ছেলে। তিনি ছয়ঘরিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০২৩ সালের এসএসসি ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও তার পরিচয় নিশ্চিত করেছে। স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বাবার মৃত্যুর পর পড়ালেখা ছেড়ে জীবিকার তাগিদে গাজীপুরে আসেন তৌফিক। পরে এক বন্ধুর মাধ্যমে লায়লা গার্মেন্টসে চাকরি নেন। তিনি গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। গত কয়েক দিন ধরে গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন চলছিল। ওই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন তৌফিক।